📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ৫. পাথেয় লাভের পথ

📄 ৫. পাথেয় লাভের পথ


মুত্তাকিদের স্তরে উন্নীত হওয়া যেনতেন ব্যাপার নয়। তবে নবি -এর সুন্নাহ ও সালাফদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে আল্লাহ তাআলার সাহায্যে তা সহজ হয়ে যায়। এ পথের প্রধান ধাপগুলো এরকম :

*প্রথম ধাপ: নিজের হিসেব নেওয়া
দুনিয়ায় নিজের নেক আমল, বদ আমলের হিসেব রাখাটা আখিরাতে সাফল্যের একটি কারণ। কুরআনে এই বাস্তবতা বর্ণিত হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ *
“হে বিশ্বাসীরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া অর্জন করো)। আর প্রত্যেকে যেন খেয়াল রাখে যে, সে আগামীর জন্য কী প্রেরণ করেছে। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত।”[১]
এখানে নিজের বিগত আমলের হিসেব নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

• উমর বলেন, “তোমার হিসেব গৃহীত হওয়ার আগে, নিজেই নিজের হিসেব নাও। তোমার আমল ওজন হওয়ার আগে, নিজেই তার ওজন করো।”[১]

• মাইমুন বিন মাহরান বলেন, “ব্যবসায়িক অংশীদারের হিসেব নেওয়ার চেয়ে নিজের হিসেব বেশি না নিলে, কেউই মুত্তাকী হতে পারবে না।”[২]

• হাসান বাসরি এর ভাষ্য অনুযায়ী, “মুমিন নিজেই নিজের পাহারাদার। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সে নিজের হিসেব নেয়। দুনিয়ায় নিজের হিসেব নিলে আখিরাতে তার হিসেব সহজভাবে নেওয়া হবে। আর দুনিয়ায় এই বিষয়টিকে যে হালকাভাবে নেবে, আখিরাতে তার হিসেব বড় কড়াকড়ি হবে।”[৩]

• আনাস বিন মালিক বলেন যে, উমর একবার হাঁটতে বেরিয়ে একটি বাগানে পৌঁছলেন। বললেন, “আল্লাহ ও আমার মাঝে রয়েছে এক বাধা। হে আমার নফস! মুমিনদের নেতা! হয় তুমি আল্লাহকে ভয় করবে, নয়তো আমি তোমায় শাস্তি দেবো।” [৪]

• মালিক ইবনু দিনার বলেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে নিজেকে বলে- 'অমুক লোকটা তো নেক আমলে তোমার থেকে এই এই পরিমাণ এগিয়ে গেল!' তারপর নিজেকে তিরস্কার করে আরও ভালোভাবে দ্বীন পালন করতে শুরু করে।” [৫]
তিনি আরও বলেছেন, “আমি হাজ্জাজকে বলতে শুনেছি—'আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে তার আমলনামা অন্যের হাতে পড়ার আগেই নিজে তার হিসেব নেয়। আল্লাহ তাকে রহম করুন, যে নিজের কাজকর্মকে লাগামছাড়া হতে দেয় না। আল্লাহ তাকে রহম করুন, যে নিজেই মিযানে নিজের আমল ওজন করে।' (ইবনু দীনার বলেন,) তার এই বক্তব্য আমাকে অশ্রুসিক্ত করে তুলল।”[৬]

আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ التَّوَّامَةِ
“না![১] তিরস্কারকারী নফসের শপথ...."[২]

• এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বাসরি বলেন, “মুমিন সব সময়ই নিজেকে পর্যালোচনার অধীন রাখবে। এমনকি পানাহার ও কথাবার্তার ক্ষেত্রেও। আর পাপাচারী কখনোই নিজের সমালোচনা করে না।”[৩]

• তাউবাহ ইবনুস সিমাত ষাট বছর বয়স পর্যন্ত এভাবে নিজের হিসেব নিয়েছেন। গণনা করে দেখলেন মোট দিনের সংখ্যা ২১,৫০০। তিনি কেঁপে উঠে বললেন, “গোটা জগতের প্রতিপালকের কাছে যদি আমি ২১,৫০০টা গুনাহ নিয়ে যাই, কী দুর্গতিই না হবে! আর যদি দিনে ১০,০০০টা করে গুনাহ হয়ে থাকে, তা হলে তো সর্বনাশ!" [৪]

• একজন সালাফের মতে, “একেকটি পাপকাজের বিনিময়ে মানুষ নিজের ঘরে এক একটি ঢিল ছুড়লে, সারা ঘর ভরে যেতে তেমন একটা সময় লাগবে না।”[৫]

• ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেন, “দাউদ-এর পরিবারের জ্ঞানগর্ভ কথামালায় লেখা আছে, 'বুদ্ধিমান কখনো চারটি বিষয়ে অবহেলা করে না: প্রতিপালকের কাছে দুআ করা, নিজের হিসেব নেওয়া, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে নিজের দোষ শোনা এবং একাকিত্বের সময়।[৬]

• উমর তাঁর অধীনস্থদের কাছে বার্তা পাঠান: “দুর্দশার হিসেব আসার আগেই প্রাচুর্যের সময় নিজের হিসেব নিন। এতে সন্তুষ্ট ও ঈর্ষণীয় হওয়া যায়। আর যে এ ব্যাপারে উদাসীন থেকে দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়, তার সামনে দুর্দশা আসন্ন।”[৭]

• ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, “মোটকথা, প্রথমে ফরয আমলের হিসেব নিতে হবে। এখানে কমতি থাকলে পূরণ করে নিতে হবে। তারপর আসে হারাম কাজের হিসেব। এখানে ত্রুটি পেলে ইস্তিগফার করে নিতে হবে এবং নেক আমল বাড়িয়ে দিতে হবে, যাতে পাপ কেটে যায়। এরপর দেখতে হবে নিজের উদাসীন ও অবহেলায় কাটানো সময়গুলো। এখানে ঘাটতি থাকলে তাওবা ও যিকর-আযকার করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। সবশেষে মুখ, পা, হাত, চোখ, কানের হিসেব। এই অঙ্গ দিয়ে ওই কাজটা কেন করলাম? সেই কাজটা কেন করলাম না? ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন,
فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
‘আপনার প্রতিপালকের শপথ! আমি তাদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করব। তারা (ভালো বা মন্দ) যা কিছু করছে সে সম্পর্কে।'[১]
তিনি আরও বলেন,
فَلَنَسْأَلَنَّ الَّذِينَ أُرْسِلَ إِلَيْهِمْ وَلَنَسْأَلَنَّ الْمُرْسَلِينَ فَلَنَقُصَّنَّ عَلَيْهِم بِعِلْمٍ وَمَا كُنَّا غَابِبِينَ
অতঃপর যাদের নিকট রাসূল পাঠানো হয়েছিল আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব আর রাসূলদেরও (আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়া সম্পর্কে) অবশ্যই জিজ্ঞেস করব। তখন আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দিব, আর আমি তো বেখবর নই।[২]
لِيَسْأَلَ الصَّادِقِينَ عَن صِدْقِهِمْ وَأَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا أَلِيمًا
“(পূর্ববর্তী নবি ও রাসূলগণ হতে যে অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়েছে তা মূলত) সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার জন্য।”[৩]

সত্যবাদীকেই যেখানে জেরার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেখানে মিথ্যেবাদীর অবস্থা কতটা খারাপ হতে পারে, ভাবুন তো![১]

আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا “নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর—সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”[২]

দেখুন, বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে যেতে পারে। কাজেই, আসল হিসেবের সময় আসার আগে নিজের হিসেব নেওয়া উচিত।”

এই অভ্যাস থাকলে বান্দার প্রচুর উপকার হবে। এর মাঝে একটি হলো নিজের ভুলভ্রান্তি ধরতে পারা। ভুল যদি বুঝতেই না পারে, তা হলে সংশোধন করবে কীভাবে?

• আবুদ দারদা বলেন, “ইসলামের বুঝ পরিপূর্ণ হওয়ার লক্ষণ হলো আল্লাহ তাআলার ওয়াস্তে (সংশোধনের নিয়তে) মানুষকে তিরস্কার করা, তারপর ঘরে ফিরে তার চেয়েও বেশি করে নিজেকে তিরস্কার করা।”[৩]

• আইয়ুব সাখতিয়ানি বলেন, “দ্বীনদার ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করা হলে আমি নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিই (অর্থাৎ, নিজেকে তাঁদের মাঝে গণ্য করি না)।”[৪]

• মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি বলেন, “পাপের যদি দুর্গন্ধ থাকত, তা হলে আমার ধারেকাছেও কেউ ঘেঁষতে পারত না।”[৫]

•ইউনুস ইবনু উবাইদ এর ভাষ্য, “ভেবে দেখলাম ভালো মানুষের একশোটির মতো গুণাবলি আছে। কিন্তু নিজের মাঝে তার একটিও পেলাম না।”[৬]

• উকবা ইবনু সাহবান বলেন, “আমি আয়িশা -কে এই আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলাম :
ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ وَمِنْهُمُ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ ‘তারপর আমি এমন লোকদেরকে এ কিতাবের উত্তরাধিকারী করেছি যাদেরকে আমি নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে বাছাই করে নিয়েছি। এখন তাদের মধ্য থেকে কেউ নিজের প্রতি জুলুমকারী, কেউ মধ্যপন্থি এবং কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুমে সৎকাজে অগ্রবর্তী। আর এটাই (মানুষের প্রতি আল্লাহ তাআলার) মহা অনুগ্রহ’[১]

• তিনি জবাব দিলেন, 'শোনো ছেলে, তারা তো এখন জান্নাতে আছে। যারা ভালো কাজে দ্রুত ধাবমান, তাঁরা নবি -এর সময়কার এবং তাঁর জবানের মাধ্যমেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছে। মধ্যমপন্থিরা হলেন তাঁর অনুসারী সাথি, যারা একসময় তাঁদের নাগাল পেয়েছেন। আর নিজেদের ওপর অবিচারকারী হলাম আমার আর তোমার মতো মানুষেরা।' আয়িশা নিজেকে এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন।”[২]

• ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, “সত্যবাদীদের একটি স্বভাব হলো নিজেকে তিরস্কার করা। নেক আমলের মাধ্যমে বান্দা যত-না আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী হয়, তার চেয়ে বেশি হয় এ কাজের মাধ্যমে।”
নিজের হিসেব গ্রহণের আরেকটি উপকারিতা হলো আল্লাহ তাআলার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া। এই বিষয়টি যারা উপলব্ধি করতে পারে না, তারা নেক আমল ও ইবাদত থেকে উপকৃত হয়ক্ত হয় না।[৩]

• ওয়াহহাব থেকে ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন যে, একবার মূসা এক লোকের পাশ দিয়ে গেলেন। লোকটি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে করতে কান্নাকাটি করছিল। মূসা বললেন, “হে আল্লাহ, এর ওপর দয়া করুন। তার জন্য আমার খুবই খারাপ লাগছে।” আল্লাহ তাআলা মুসা -এর প্রতি ওহি করলেন, “সে দুআ করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়লেও আমি তা কবুল করব না, যতক্ষণ না সে তার ওপর আমার (কর্তৃত্বের) অধিকার স্বীকার করছে।”[১]

• ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, “বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার অধিকার উপলব্ধি করার একটি উপকারিতা হলো—নিজের ক্ষুদ্রতা বুঝতে পারা, অহংকার ও লোকদেখানো (অভ্যাস) থেকে মুক্তিলাভ। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলার সামনে নম্রতার দরজা খুলে যায়, অহমিকার দরজা বন্ধ হয়। বোধোদয় হয় যে, মুক্তি কেবল আল্লাহ তাআলার দয়া ও করুণার মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। আনুগত্য পাওয়া, ইয়াদ রাখা ও কৃতজ্ঞতা পাওয়া আল্লাহ তাআলার অধিকার। অবাধ্যতা, বিস্মৃতি ও একাগ্রতার অকৃতজ্ঞতা তাঁর প্রাপ্য নয়।
এ বিষয়গুলো নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করলে টের পাওয়া যায় যে, কেবল নিজের চেষ্টায় এসব অধিকার পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব নয়। ভরসা করতে হয় আল্লাহ তাআলার দয়ার ওপর। নিজের আমলের ওপর নির্ভর করতে গেলে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলার ওপর নিজের অধিকার নিয়ে অনেকেই সচেতন অথচ উলটোটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার লোক খুবই কম। এভাবেই আল্লাহ তাআলার সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তাঁর সাক্ষাৎ লাভের ইচ্ছে মরে যায়। এ হলো প্রতিপালক ও নিজের ব্যাপারে অজ্ঞতার একশেষ।”[২]

• ইমাম গাযালি -এর মতে, “হিসেব গৃহীত হওয়ার আগেই যে নিজের হিসেব নেয়, কিয়ামাতের দিন তার আসল হিসেব সহজ হবে। প্রশ্নের উত্তর সে সহজে দিতে পারবে, ফলে তার পরিণতি হবে ভালো। আর যে এমনটা করবে না, সে আফসোসে মরবে আর কিয়ামাতের প্রতিটি স্তরে আটকে যাবে। জীবদ্দশার এই ভুল তাকে নিয়ে যাবে অপমান ও তিরস্কারের দিকে।”[৩]

হে আল্লাহ তাআলার বান্দা, নিজের মাঝে এই গুণগুলোর পরিমাণ মেপে দেখুন। নিজের হিসেব গ্রহণকারী হলে আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। আর বিপরীত দলভুক্ত হলে এখনই মিনতি সহকারে তাওবা করে নিন, যেভাবে অনুতপ্ত দাস তার মনিবের কাছে ফিরে আসে।

• ইমাম গাযালি বলেছেন, “আল্লাহ ও শেষ-দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী প্রতিটি ব্যক্তির দায়িত্ব হলো নিজের হিসেব গ্রহণের এই বিষয়টিকে অবহেলা না করা। জীবনের প্রতিটি নিশ্বাস একেকটি দামি রত্ন। একেকটির বিনিময়ে চিরস্থায়ী শান্তি ক্রয় করা সম্ভব। এই শ্বাসগুলোকে অসার বা মন্দ কাজে ব্যয় করা কোনো বিবেকবান লোকের কাজ হতে পারে না। একটিমাত্র জীবন, এটিই পুঁজি। জীবন শেষ তো পুরো মূলধন শেষ। আরও একটি দিন ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারা মানে আগের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার অপূর্ব সুযোগ। আল্লাহ যদি ঘুমের মধ্যে তার প্রাণ নিয়ে নিতেন, তা হলে শত অনুরোধ করেও সে আর একটি সুযোগ পেত না। তাই ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারাকে নতুন জীবন পাওয়ার মতো মূল্য দিতে হবে। এই অমূল্য রত্নগুলো হেলায় হারানো যাবে না।
দিনে চব্বিশটি ঘণ্টা, তাই আজই শুরু হোক সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। ইল্লিয়্যিন (সৎকর্মশীলদের আত্মা যেখানে থাকে) এর ওপর অধিকার হারিয়ে যেন আফসোসে পুড়তে না হয়।” [১]

দ্বিতীয় ধাপ : নফসকে শাস্তিপ্রদান
বান্দা যতই আল্লাহকে মান্য করার চেষ্টা করুক, ভুলভ্রান্তি হবেই। সালাফদের কারও ভুল-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তাঁরা নিজেদের শাস্তি দিতেন। শুনতে সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ আনুগত্য যতটা কঠিন, সে অনুপাতেই কঠিন শাস্তি নিজেদের দিতেন তাঁরা।
একবার আসরের সালাতের জামাত ছুটে যাওয়ায় উমর দুই লাখ দিরহাম সমমূল্যের এক খণ্ড জমি সদাকা করে দেন।

• ইবনু উমর এক ওয়াক্ত জামাত ধরতে না পারলে সারা রাত জেগে জেগে নফল ইবাদাত করতেন এবং দুজন দাস মুক্ত করে দিতেন।[১]

• তামিম দারি এক রাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারেননি। এরপর পুরো একটা বছর তিনি রাত্রিজাগরণ করেছেন।[২]

একবার নিজের বাগানে সালাতরত অবস্থায় তালহা -এর মনোযোগ একটি পাখির দিকে চলে যায়। তিনি এই ভুলের কাফফারা হিসেবে বাগানটি সদাকা করে দেন।[৩]

• হাসসান ইবনু আবী সিনান একটি দালানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লোকজনকে এর নির্মাণকালের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন যে, তিনি অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে ফেলেছেন। এরপর পুরো এক বছর নফল সিয়াম পালন করে তিনি এর প্রায়শ্চিত্ত করেন।[৪]

• আব্দুল্লাহ ইবনু কায়স বলেন, “আমরা তখন এক প্রবল যুদ্ধের ময়দানে। চারিদিকে শত্রু আর চিৎকার। আবহাওয়া উত্তপ্ত। উমামা গোত্রের এক লোক নিজেকে বলছিল, 'আমি তো অমুক-তমুক যুদ্ধও দেখেছি। হে নফস! তুমি আমাকে পরিবার- পরিজনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সেগুলো থেকে ফিরে আসতে বাধ্য করেছ। আল্লাহ তাআলার কসম! আজ তোমায় কঠোর শাস্তি দিয়ে ছাড়ব আর নয়তো তোমাকে একদম ছেড়েই চলে যাব।'
যুদ্ধের ময়দানে লোকটিকে দেখলাম নিজ সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়ে শত্রুসারিকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে। শত্রুরা পালটা আক্রমণ করলে আবার আমরা ছত্রভঙ্গ হলাম। কিন্তু এই একটি লোক আপন স্থানে অটল থেকে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যায়। পরে তার এবং তার বাহনের লাশে প্রায় ষাটটি আঘাতের চিহ্ন পেয়েছি।”[৫]

• ইমাম গাযালি বলেন, “দৃঢ়চেতা মানুষেরা এভাবেই নফসকে শাস্তি দিতেন। মানুষ অবাধ্যতার ভয়ে পরিবারের সদস্যদের শাস্তি দেয়। অথচ নিজের নফসকে ঠিকই ছেড়ে দেয়। ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত। পরিবারকে যদি আপনি ছেড়ে দেন, তবে সে আপনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। কিন্তু নফসকে যদি ছেড়ে দেন, তবে এটা (পরিবারের চেয়েও) ঘোরতর শত্রুতে পরিণত হবে, এবং আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসবে। আর এটির অনিষ্টের পরিমাণ পারিবারিক অনিষ্টের চেয়ে ঢের বেশি। পরিবার আপনার দুনিয়ার জীবনের ক্ষতি করতে পারে, যা বড়জোর দিন খানিক ভোগাবে। কিন্তু নফস তো আখিরাতের চিরস্থায়ী আবাসকে বরবাদ করে ছাড়বে। তাই এটিই শাস্তির বেশি যোগ্য।[১]

তৃতীয় ধাপ : নফসকে নেক আমলের দিকে ধাবিত করা
আখিরাতের পরম শান্তির প্রকৃত মূল্য বুঝলেই কেবল বান্দা এ বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে। জনৈক সালাফ বলেন, “কাঙ্ক্ষিত বস্তুর মূল্য উপলব্ধি করলে তা অর্জনের পেছনে ব্যয় করা সহজ হয়।” এজন্যই তাঁদের কাজকর্ম হতো কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী। নেক আমল করার সৌভাগ্য হলে তাঁরা এ জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে তা কবুল হওয়ার দুআ করতেন। আর ভুলত্রুটি হয়ে গেলে অনুতপ্ত মনে করে নিতেন যথাযথ তাওবা।

• একবার একদল লোক উমর ইবনু আব্দুল আযীয-এর কাছে আসে। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। আগন্তুকদের মাঝে একজন ছিল একেবারে জীর্ণশীর্ণ। উমর তাকে এ অবস্থার জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, “বিশ্বাসীদের নেতা, আমি দুনিয়ার স্বাদ নিয়ে দেখেছি সেটা তেতো। এর চাকচিক্য আমাকে টানে না, সোনাকেও মনে হয় পাথর। এমনভাবে জীবন যাপনের চেষ্টা করি, যেন আল্লাহ তাআলার আরশ চোখের সামনে দেখছি, দেখছি জান্নাত ও জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া মানুষদের। তাই দিনে সিয়াম পালন করি আর রাতে সালাতে দাঁড়িয়ে থাকি। আল্লাহ তাআলার পুরস্কার ও শাস্তির তুলনায় আমার এতটুকু কষ্টভোগ নিতান্তই তুচ্ছ।”[২]

• আবু নুআইম বর্ণনা করেন যে, দাউদ তাঈ রুটি না খেয়ে রুটির ছাতু গুলিয়ে পান করতেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, “রুটি চিবানোর বদলে ছাতু (গুলিয়ে) পান করলে যে সময়টুকু বেঁচে যায়, তাতে আমি কুরআনের আরও পঞ্চাশটি আয়াত তিলাওয়াত করতে পারি।”[১]

আল্লাহ তাআলার বান্দা, বোঝার চেষ্টা করুন। কীভাবে তাঁরা সময়ের সদ্‌ব্যবহার করেছেন, আর আমরা তা (হেলায়-ফেলায়) নষ্ট করছি। তবে আল্লাহ যাদের ওপর দয়া করেছেন, তাদের কথা আলাদা।

• মাসরুক-এর স্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সালাতের কারণে মাসরুকের পা সব সময় ফুলে থাকত। (তিনি যখন সালাত আদায় করতেন, তখন) আমি পেছনে বসে বসে মায়ার টানে কান্না করতাম।[২]

• আব্দুল্লাহ ইবনু দাউদ বলেন যে, “চল্লিশ বছর হয়ে গেলেই তাঁরা বিছানা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতেন (অর্থাৎ ঘুমের পরিমাণ কমিয়ে দিতেন)।”[৩]

• আবুদ দারদা এর ভাষ্য, “তিনটি জিনিস না থাকলে এই দুনিয়াতে আর একটা মুহূর্তও থাকতে চাইতাম না—আল্লাহ তাআলার জন্য কাটানো তৃষ্ণার্ত বিকেল (সিয়াম), আল্লাহ তাআলার সামনে রাতভর সিজদা, আর ওই সব লোকেদের সঙ্গ; যারা তরতাজা ফল বেছে নেওয়ার মতো করে যারা কল্যাণকর কথা বেছে নেয়, ওই সব।” [৪]

• আলি ইবনু আবি তালিব বলেন, “দ্বীনদার লোকের লক্ষণ হলো (গুনাহ থেকে) সতর্কতাবশত মলিন চেহারা, অধিক কান্নার কারণে দুর্বল দৃষ্টিশক্তি, সিয়ামের কারণে শুকনো ঠোঁট, আর ইবাদাতের কারণে ধূলিমলিন অবস্থা।”[৫]

• হাসান বসরি-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “তাদের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা এ কথার বিরোধিতা করে দ্বীনদার লোকদেরকে সুদর্শন বলে?” রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের চেহারা অন্যদের তুলনায় উজ্জল (সুদর্শন) হওয়ার রহস্য কী?
আলি রা. জবাব দিলেন, “এটা হলো দয়াময়ের সাথে একাকী সময় কাটানোর (পুরস্কার)।” এর কারণ হল, তারা নির্জনে দয়াময় আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য গ্রহণ করে থাকে। যদ্দরুন তিনি আপন নুর দ্বারা তাদের জড়িয়ে নেন (নুরানি করে দেন)।[১] (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লোকজনের সামনে তাদের চেহারাকে নূরানি করে দেন)

কাজেই, হে আল্লাহ তাআলার বান্দা! আল্লাহ তাআলার দয়া ও জান্নাত পাওয়ার জন্য কঠোর চেষ্টা করুন। নতুবা উভয় জীবনে ব্যর্থ হয়ে যাবেন। আল্লাহ আমাদের এহেন ব্যর্থতা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, “পার্থিব নিআমাতের পেছনে ছুটে অনেকেই ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রশংসার ফিতনা আর দোষগোপনের ফাঁদে পড়ে শেষ হয়ে গেছে কত মানুষ!।”[২]

ইয়াহইয়া ইবনু মুআয রা. বলেন, “পৃথিবী তাকে ছেড়ে যাবার আগেই যে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তাকে অভিনন্দন। কবরে ঢোকার আগে যারা কবর সাজায় আর প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আগেই যারা তাঁকে সন্তুষ্ট করে, তাদেরকেও অভিনন্দন।”[৩]

আলি রা. বলেন, “যে জান্নাত আশা করে, সে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা করবে। জাহান্নামের প্রতি ভীত ব্যক্তি বিরত থাকবে লোভ-লালসা থেকে। মৃত্যুর বাস্তবতা যার বুঝে এসেছে, সে আর আনন্দ খুঁজে বেড়বে না। আর দুনিয়ার হাকীকত যে বুঝতে পেরেছে, সে কষ্টের ভেতরেও আনন্দ খুঁজে নেবে।”[৪]

হামিদ লাফিফ বলেন, “আমরা সম্পদের মাঝে প্রাচুর্য খুঁজেছিলাম। কিন্তু তা খুঁজে পেলাম অল্পে তুষ্টির মাঝে। প্রশান্তি খুঁজেছিলাম অধিক অর্জনে, কিন্তু তা পেলাম স্বল্প আয়ে।”[৫]

আব্দুল্লাহ আনতাকি বলেন, “হৃদয়ের ঔষধ পাঁচটি: নেককারদের সঙ্গ, কুরআন তিলাওয়াত, গুনাহ থেকে আত্মার পরিশুদ্ধি, তাহাজ্জুদের সালাত এবং ভোরবেলা কান্নাকাটি সহকারে দুআ।”[১]

* চতুর্থ ধাপ : নেককারদের উক্তি শোনা
উপরিউক্ত ধাপগুলোর পর শ্রেষ্ঠতম কাজ হলো নেককারদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সঙ্গলাভ এবং কথায়-কাজে তাঁদের অনুকরণ। এটি তাকওয়ার দিকে ধাবিত করে। এখানে আমরা নেককারদের অল্প কিছু বাণী তুলে ধরছি,

• আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “পরকালের পাথেয় ছাড়া কবরে যাওয়া মানে জাহাজ ছাড়া সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া।”[২]

• উসমান বলেন, “দুনিয়ার ভাবনা অন্তরের আঁধার আর আখিরাতের ভাবনা অন্তরের আলো।”[৩]

• আলি বলেন, “যে জ্ঞান অন্বেষণ করে, জান্নাত তাকে খুঁজে বেড়ায়। আর যে পাপ অন্বেষণ করে, তাকে ধাওয়া করে জাহান্নাম।”[৪]

• শাকিক বালখি বলেছেন, “পাঁচটি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকুন—
নিজের মুখাপেক্ষিতার অনুপাতে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত,
পার্থিব জীবনের দৈর্ঘ্যের অনুপাতে পার্থিব সম্পদ,
জাহান্নামের শাস্তিভোগের সহ্যক্ষমতা অনুপাতে পাপ,
কবরের জীবনের দৈর্ঘ্যের অনুপাতে আখিরাতের পাথেয়,
আর জান্নাতের আকাঙ্ক্ষার অনুপাতে নেক আমল।"[১]

• হাসান বসরি বলেছেন, “ছয় ভাবে অন্তর কলুষিত হয় :
* একসময় তাওবা করে নেব, এই আশায় গুনাহ করা
* জ্ঞান অর্জন করেও তা প্রয়োগ না করা
* নিষ্ঠাবিহীন আমল
* আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে তাঁর দেওয়া রিযিক ভোগ
* আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত ফয়সালায় (অর্থাৎ তাকদীরের ওপর) সন্তুষ্ট না হওয়া
* মৃতকে কবর দিয়েও কোনো শিক্ষা না নেওয়া।”[২]

• ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, “তাকওয়ার লক্ষণ হলো ইবাদাতে আত্মনিয়োগ, আর ইবাদাতের লক্ষণ হলো সন্দেহজনক বিষয় থেকে বিরত থাকা। আশার লক্ষণ আল্লাহর আনুগত্য। সহনশীলতার লক্ষণ মিথ্যে আশা পরিত্যাগ।

• ইবনুল কাইয়্যিম তাকওয়া সম্পর্কে বলেন, “তাকওয়ার মূল হল
* আল্লাহ তাআলার দেয়া আদেশ-নিষেধ মাথা পেতে নিয়ে পরিপূর্ণ ঈমান ও আশার সাথে তাঁর আনুগত্য করা।
* তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে আমল করা।
❖ তাঁর প্রতিশ্রুতিকে সত্য বলে স্বীকার করা।
❖ তাঁর সতর্কতা ও শাস্তির ভয়ে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ হতে বিরত থাকা।”[১]

তাছাড়া তিনি তাকওয়ার তিনটি স্তর বর্ণনা করেছেন।
❖ যাবতীয় পাপাচার ও হারাম থেকে বেঁচে থাকা।
❖ সমস্ত মাকরুহ ও অপছন্দনীয় বিষয় হতে বিরত থাক।
❖ এবং অহেতুক ও অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা।[২]

এই হলো তাকওয়ার পথে চারটি ধাপ। নিজেকে যাচাই করে দেখুন কতটা পথ বাকি। শুধু আল্লাহই পারেন আমাদের নিয়ত ও কাজে সমন্বয় ঘটাতে।”

টিকাঃ
[১] সূরা হাশর ৫৯ : ১৮
[১] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল; কিতাবুয যুহদ, ৬৩৩।
[২] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৭।
[৩] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১৭১।
[৪] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল; কিতাবুয যুহদ, ৬০০।
[৫] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৮।
[৬] ইমাম গাযালী, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪০৫ (দারুল মা'রিফা, বৈরুত)। তবে মূল বর্ণনায় রহমের কথা নেই। ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১১।
[১] আয়াতে '১' না'- অব্যয়টি অতিরিক্ত। মূলত আরবি ভাষায় বিরোধিদের দাবী খণ্ডন করে শপথের পূর্বে এ ধরণের অব্যয় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/২৮৩。
[২] সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫: ২
[৩] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৪।
[৪] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৭৬।
[৫] ইমাম গাযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৪০৬।
[৬] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১২।
[৭] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১৬।
[১] সূরা আল-হিজর ১৫ : ৯২-৯৩
[২] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ৬-৭
[৩] সূরা আল-আহযাব ৩৩ : ৮
[১] ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮৩ (মাকতাবাতুল মা'আরিফ, রিয়াদ)।
[২] সূরা আল-ইসরা (বনি ইসরাঈল) ১৭:৩৬
[৩] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ২৩।
[৪] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৩/৫।
[৫] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৩৭।
[৬] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৩৪。
[১] সূরা ফাতির ৩৫: ৩২
[২] মুসনাদু আবি দাউদ তয়ালিসি, ১৫৯২। ইবনু হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এই বর্ণনাটি দুর্বল।
[৩] ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮৭।
[১] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল; কিতাবুয যুহদ, ৪৫১।
[২] ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮৮।
[৩] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৩৯৪।
[১] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৩৯৪,৯৫।
[১] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৪০৮।
[২] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৫৫।
[৩] মুআত্তা ইমাম মালিক, ৬৯ (ইহইয়াউত তুরাছ, বৈরুত)।
[৪] বায়হাকী; শুআবুল ঈমান, ৪৭৩১।
[৫] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ২১।
[১] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৪০৭। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[২] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ২/২৫৫ [৩৮৯]।
[১] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৭/৩৫০।
[২] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ৯৫।
[৩] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ১/৪৪৪ [১৩১]।
[৪] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ২৭৭।
[৫] ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪১২। ইমাম গাযালি এ যে শব্দে বর্ণনা করেছেন তার সনদ পাওয়া যায় না। কিছুটা ভিন্নভাবে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৪/৭৮ [১২৪৯]। সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
[১] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ১/৪৪৫ [১৩৩]।
[২] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৫১৪।
[৩] বায়হাকী, যুহদুল কাবির, ৪৮৮।
[৪] ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ২২৪। বায়হাকী; শুআবুল ঈমান, ১০১৩৯। হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৫/১০।
[৫] বায়হাকী; যুহদুল কাবীর, ৮০।
[১] আবু নুআইম; হিলয়াতুল আওলিয়া, ১০/৩২৭。
[২] আল-মুনাব্বিহাত; ৮।
[৩] আল-মুনাব্বিহাত; ৯। জা'ফর ইবনু সুলাইমান হতে এই বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবনু আবিদ দুনিয়া; যাম্মুদ দুনিয়া, ৪৬৭।
[৪] আল-মুনাব্বিহাত; ১০। সুয়ূতী, জামিউল আহাদিস, ২৩৫৫৪।
[১] আল-মুনাব্বিহাত; ৬৪।
[২] আল-মুনাব্বিহাত; ৭০। বর্ণনাটির কোনো সনদ পাওয়া যায় না।
[১] যাদুল মুহাজিরি ইলা রব্বিহি (রিসালাতুত তাবুকিয়্যাহ), ১/৮।
[২] আল-ফাওয়াইদ, ৩১,৩২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)।

📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ৬. তাকওয়ার উপকারিতা

📄 ৬. তাকওয়ার উপকারিতা


১. তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা পাওয়া যায়। তিনি বলেন,
بَلَى مَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ وَاتَّقَى فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
“যে ব্যক্তিই তার অঙ্গীকার পূর্ণ করবে এবং অসৎকাজ থেকে দূরে থাকবে, সে আল্লাহ তাআলার প্রিয়ভাজন হবে। কারণ আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।”[১]

২. তাকওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয় আল্লাহ তাআলার নৈকট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ
“আর আমার অনুগ্রহ সবকিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে। সুতরাং আমি তা মুত্তাকিদের জন্য লিখে দেব।”[২]

৩. আল্লাহ সর্বদা মুত্তাকি বান্দাদের সঙ্গে থাকেন,
وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ )
“আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে আছেন।”[১]
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوا وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ )
“নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।”[২]

৪. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার আযাব থেকে রেহাই পায়,
فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ )
“অতএব, যারা আল্লাহকে ভয় করে ও নিজেদের সংশোধন করে, তাদের কোনো ভয় নেই, দুশ্চিন্তাও নেই।”[৩]

৫. বান্দা সহায়-সম্বলহীন হোক কিংবা হতদরিদ্র, (তাতে কিছুই আসে যায় না)। কেবল তাকওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়,
زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ اتَّقَوْا فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“কাফিরদের জন্য দুনিয়ার জীবনকে মনোমুগ্ধকর করে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের লোকেরা ঈমানদারদেরকে উপহাস করে। কিন্তু কিয়ামাতের দিন তাকওয়াবানরাই তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে।”[১]

৬. তাকওয়ার মাধ্যমেই বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং অনন্ত সুখ উপভোগ করবে,
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجُ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ *
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে জান্নাত, তার নিম্নদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে। পবিত্র স্ত্রীরা হবে তাদের সঙ্গী। এবং তারা লাভ করবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর প্রখর নজর রাখেন।”[২]

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ .
"আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের জন্য প্রতিযোগিতা করো, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান। তা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য।”[৩]

تِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي نُورِثُ مِنْ عِبَادِنَا مَن كَانَ تَقِيًّا *
“এ তো সেই জান্নাত, যা আমি আমার মুত্তাকি বান্দাদের দান করব।”[৪]

وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا
“আর যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে) তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।”[১]

قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى
“(হে নবি,) বলুন, পার্থিব সুখশান্তি তো সামান্যই। অথচ মুত্তাকিদের জন্য আখিরাতের আবাসস্থল উত্তম।”[২]

৭. তাকওয়ার কারণে বান্দা উভয় জাহানে মহাপুরস্কার ও সুসংবাদ লাভ করে,
الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“যারা ঈমান আনে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে সুসংবাদ রয়েছে।”[৩]

وَإِن تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ )
“যদি তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তা হলে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান।”[৪]

৮. তাকওয়া থাকলে বান্দার আমল সাথে সাথে কবুল হয়ে যায়,
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ )
“(হাবিল ইবনু আদম আ. বললেন,) আল্লাহ শুধু মুত্তাকিদের থেকেই (কুরবানী) কবুল করেন।”[৫]

৯. তাকওয়া থাকলে বান্দা নিজের আমল সংশোধন ও প্রতিপালকের ক্ষমা অর্জন করতে পারে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا * يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا )
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ মাফ করে দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করবে।”[১]

১০. শত্রুর মোকাবিলায় বান্দা (আল্লাহ তাআলার) সাহায্য পায় তাকওয়ার মাধ্যমে,
وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا
“যদি তোমরা দৃঢ় থাকো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তা হলে তাদের কূটচাল কখনো তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।”[২]

بَلَى إِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُم مِّن فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُم بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ )
"অবশ্য যদি তোমরা সবর করো এবং আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো, তা হলে যে মুহূর্তে দুশমন তোমাদের ওপর চড়াও হবে ঠিক তখনি তোমাদের রব পাঁচ হাজার চিহ্নযুক্ত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন।”[৩]

তাই তো সেনাপতি সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস রা.-কে খলিফা উমর রা. বলেছিলেন, "আপনাকে ও আপনার সেনাবাহিনীকে সর্বদা তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহ তাআলার ভয়ই শত্রুদের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধকৌশল”[১]

১১. তাকওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ গুনাহও মাফ হয়ে যায়,
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْكِتَابِ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَكَفَّرْنَا عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ
“আহলুল কিতাব (ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান জাতি) যদি বিশ্বাস করত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তা হলে আমি তাদের পাপ ক্ষমা করে দিতাম।”[২]

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا *
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন ও তার প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেবেন।”[৩]

১২. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দার কাজকর্ম সহজ হয়ে যায় ও রিযিক বৃদ্ধি পায়,
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكْتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
“যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তা হলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম।” [৪]

ج وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে বেরোবার) কোনো না কোনো পথ খুলে দেবেন এবং তাকে রিযিক দেবেন তার ধারণাতীত উৎস থেকে।”[১]

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا
“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার কাজকর্ম সহজ করে দেবেন।”[২]

১৩. তাকওয়ার মাধ্যমে শয়তানের স্পর্শ ও আঘাত থেকে বান্দা সুরক্ষিত থাকে,
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, শয়তানের স্পর্শে তাদের মনে কুমন্ত্রণা জাগলে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের চক্ষু খুলে যায়।”[৩]

আল্লাহ এ কথা বলেননি যে, তাকওয়াবানরা নিষ্পাপ। তিনি বলেছেন, শয়তান যখন তাদের দিকে ধেয়ে আসে, তখন তাকওয়া তাদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব জাগিয়ে তোলে, আর তারা ফিরে আসে।

১৪. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দা সত্য-মিথ্যা ও আলো-আঁধারের পার্থক্য বুঝতে পারে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
“হে ঈমানদারগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তা হলে তিনি তোমাদের ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার শক্তি প্রদান করবেন, তোমাদের দোষত্রুটি দূর করে দেবেন, তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।”[১]

১৫. তাকওয়া থাকলে বান্দা আল্লাহ তাআলার সাহায্য লাভ করে,
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى )
“যারা দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে, আমি তাদের জন্য সহজ পথে চলা সুগম করে দেব।”[২]

১৬. তাকওয়ার দ্বারা উভয় জাহানে বান্দা কামিয়াব হবে,
فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ *
"অতএব, হে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা! আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।”[৩]

১৭. তাকওয়া থাকলে বান্দা আল্লাহ তাআলার বন্ধুত্ব লাভ করে,
وَإِنَّ الظَّالِمِينَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ *
“সীমালঙ্ঘনকারীরা পরস্পরের বন্ধু আর আল্লাহ মুত্তাকিদের বন্ধু।”[৪]

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ *
“সাবধান! আল্লাহ তাআলার বন্ধুদের কোনো ভয় নেই, দুশ্চিন্তা নেই। তারাই বিশ্বাসী ও মুত্তাকি।”[১]

১৮. জাহান্নামের শাস্তি থেকে বান্দার বাঁচার মাধ্যম হলো তাকওয়া,
وَإِن مِّنكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا *
“তোমাদের প্রত্যেকেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করবে। এটা তোমার রবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তারপর আমি তাকওয়া অবলম্বনকারীদের এ থেকে মুক্তি দেব আর জালিমদেরকে তার মধ্যে রেখে দেব নতজানু অবস্থায়।”[২]

১৯. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দার পরিসমাপ্তি সুন্দর হবে,
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
“আখিরাতের সেই নিবাস আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করব, যারা জমিনে অহংকার ও অপরাধ করে না। সর্বোত্তম পরিণতি মুত্তাকিদের জন্যই।”[৩]

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَّحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
(হে নবি,) আপনি আপনার পরিবারকে সালাতের আদেশ দিন এবং নিজেও তা নিয়মিত পালন করতে থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না, রিযিক তো আমিই আপনাকে দিই। আর সর্বোত্তম পরিণতি তো তাকওয়াবানদের জন্যই।”[১]

২০. তাকওয়ার মাধ্যমে কিয়ামাতের দিন বান্দা নিরাপত্তার মঞ্জিলে পৌঁছে যাবে,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ ۞
“নিশ্চয় মুত্তাকিগণ থাকবে নিরাপদ স্থানে।”[২]

২১. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে উত্তম মর্যাদা লাভ করে,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“নিশ্চয় তোমাদের মধ্য হতে আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি উত্তম, যে তাকওয়া অবলম্বন করে।”[৩]

এই হলো তাকওয়ার উপকারিতার মধ্য থেকে অল্প কয়েকটি। আল্লাহ আমাদের অন্তর প্রশস্ত করে দিন ও তাতে তাকওয়া দান করে তা থেকে উপকৃত করুন। আমীন।

তাকওয়ার ব্যাপারে আলি (রাঃ)-এর উক্তি
আলি ইবনু আবী তালিব (রাঃ) বলেন, “তাকওয়া অবলম্বন করুন। কারণ, এটি বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার অধিকার। তাকওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার সাহায্য চাইতে হয়। তাকওয়া আজ একটি ঢাল হিসেবে কাজ করছে, আগামীকাল এটি আপনাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।”[৪]

তিনি আরও বলেন, “হে আল্লাহ তাআলার বান্দারা! তাকওয়া আল্লাহ তাআলার বন্ধুদেরকে তাঁর নিষেধকৃত বস্তু থেকে দূরে রাখে। আর অন্তরে তাঁর ভয় সৃষ্টি করে। এর ফলে বান্দা রাতে জাগ্রত ও দিনে তৃষ্ণার্ত থাকে (সালাত ও সিয়ামের মাধ্যমে)। ক্লান্তি থেকে প্রশান্তি আর তৃষ্ণা থেকে তৃপ্তি লাভ হয়। মুত্তাকিগণ সময়ের সংক্ষিপ্ততা নিয়ে সচেতন বলে কাজে ত্বরা করে। অলীক কল্পনা পরিত্যাগ করে মৃত্যুর ব্যাপারে সচেতন থাকে।” [১]

টিকাঃ
[১] সূরা আল ইমরান ৩: ৭৬
[২] সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৫৬
[১] সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৯৪
[২] সূরা আন-নাহল ১৬: ১২৮
[৩] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ৩৫
[১] সূরা আল-বাকারাহ ২: ২১২
[২] সূরা আল-ইমরান ৩: ১৫
[৩] সূরা আল ইমরান ৩: ১৩৩
[৪] সূরা মারইয়াম ১৯:৬৩
[১] সূরা যুমার ৩۹: ৭৩
[২] সূরা আন-নিসা ৪: ৭৭
[৩] সূরা ইউনুস ১০: ৬৩-৬৪
[৪] সূরা আল ইমরান ৩: ১৭৯
[৫] সূরা আল-মাইদা ৫: ২৭
[১] সূরা আল-আহযাব ৩৩: ৭০-৭১
[২] সূরা আল ইমরান ৩: ১২০
[৩] সূরা আল ইমরান ৩: ১২৫
[১] ইবনু আব্দি রব্বিহি উন্দুলুসী; আল-ইকদুল ফারীদ, ১/১১৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)। তবে বর্ণনাটির কোনো সনদ পাওয়া যায় না।
[২] সূরা আল-মাইদা ৫: ৬৫
[৩] সূরা আত-তালাক ৬৫ : ৫
[৪] সূরা আল-আ'রাফ ৭: ৯৬
[১] সূরা আত-তালাক ৬৫: ২-৩
[২] সূরা আত-তালাক ৬৫ : ৪
[৩] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ২০১
[১] সূরা আল-আনফাল ৮: ২৯
[২] সূরা আল-লাইল ৯২: ৫-৭
[৩] সূরা আল-মাইদা ৫: ১০০
[৪] সূরা আল-জাসিয়াহ ৪৫: ১৯
[১] সূরা ইউনুস ১০: ৬২-৬৩
[২] সূরা মারইয়াম ১৯: ৭১-৭২
[৩] সূরা আল-কাসাস ২৮ : ৮৩
[১] সূরা ত্বহা ২০: ১৩২
[২] সূরা আদ-দুখান ৪৪ : ৫১
[৩] সূরা আল-হুজুরাত ৪৯ : ১৩
[৪] নাহজুল বালাগাহ, ৩৭৯।
[১] নাহজুল বালাগাহ, ২২৪,২৫।

১. তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা পাওয়া যায়। তিনি বলেন,
بَلَى مَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ وَاتَّقَى فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
“যে ব্যক্তিই তার অঙ্গীকার পূর্ণ করবে এবং অসৎকাজ থেকে দূরে থাকবে, সে আল্লাহ তাআলার প্রিয়ভাজন হবে। কারণ আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।”[১]

২. তাকওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয় আল্লাহ তাআলার নৈকট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ
“আর আমার অনুগ্রহ সবকিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে। সুতরাং আমি তা মুত্তাকিদের জন্য লিখে দেব।”[২]

৩. আল্লাহ সর্বদা মুত্তাকি বান্দাদের সঙ্গে থাকেন,
وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ )
“আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে আছেন।”[১]
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوا وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ )
“নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।”[২]

৪. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার আযাব থেকে রেহাই পায়,
فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ )
“অতএব, যারা আল্লাহকে ভয় করে ও নিজেদের সংশোধন করে, তাদের কোনো ভয় নেই, দুশ্চিন্তাও নেই।”[৩]

৫. বান্দা সহায়-সম্বলহীন হোক কিংবা হতদরিদ্র, (তাতে কিছুই আসে যায় না)। কেবল তাকওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়,
زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ اتَّقَوْا فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“কাফিরদের জন্য দুনিয়ার জীবনকে মনোমুগ্ধকর করে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের লোকেরা ঈমানদারদেরকে উপহাস করে। কিন্তু কিয়ামাতের দিন তাকওয়াবানরাই তাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় থাকবে।”[১]

৬. তাকওয়ার মাধ্যমেই বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং অনন্ত সুখ উপভোগ করবে,
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجُ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ *
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে জান্নাত, তার নিম্নদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে। পবিত্র স্ত্রীরা হবে তাদের সঙ্গী। এবং তারা লাভ করবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর প্রখর নজর রাখেন।”[২]

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ .
"আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের জন্য প্রতিযোগিতা করো, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান। তা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য।”[৩]

تِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي نُورِثُ مِنْ عِبَادِنَا مَن كَانَ تَقِيًّا *
“এ তো সেই জান্নাত, যা আমি আমার মুত্তাকি বান্দাদের দান করব।”[৪]

وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا
“আর যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে) তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।”[১]

قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى
“(হে নবি,) বলুন, পার্থিব সুখশান্তি তো সামান্যই। অথচ মুত্তাকিদের জন্য আখিরাতের আবাসস্থল উত্তম।”[২]

৭. তাকওয়ার কারণে বান্দা উভয় জাহানে মহাপুরস্কার ও সুসংবাদ লাভ করে,
الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“যারা ঈমান আনে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে সুসংবাদ রয়েছে।”[৩]

وَإِن تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ )
“যদি তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তা হলে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান।”[৪]

৮. তাকওয়া থাকলে বান্দার আমল সাথে সাথে কবুল হয়ে যায়,
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ )
“(হাবিল ইবনু আদম আ. বললেন,) আল্লাহ শুধু মুত্তাকিদের থেকেই (কুরবানী) কবুল করেন।”[৫]

৯. তাকওয়া থাকলে বান্দা নিজের আমল সংশোধন ও প্রতিপালকের ক্ষমা অর্জন করতে পারে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا * يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا )
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ মাফ করে দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করবে।”[১]

১০. শত্রুর মোকাবিলায় বান্দা (আল্লাহ তাআলার) সাহায্য পায় তাকওয়ার মাধ্যমে,
وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا
“যদি তোমরা দৃঢ় থাকো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তা হলে তাদের কূটচাল কখনো তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।”[২]

بَلَى إِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُم مِّن فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُم بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ )
"অবশ্য যদি তোমরা সবর করো এবং আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো, তা হলে যে মুহূর্তে দুশমন তোমাদের ওপর চড়াও হবে ঠিক তখনি তোমাদের রব পাঁচ হাজার চিহ্নযুক্ত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন।”[৩]

তাই তো সেনাপতি সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস রা.-কে খলিফা উমর রা. বলেছিলেন, "আপনাকে ও আপনার সেনাবাহিনীকে সর্বদা তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহ তাআলার ভয়ই শত্রুদের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধকৌশল”[১]

১১. তাকওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ গুনাহও মাফ হয়ে যায়,
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْكِتَابِ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَكَفَّرْنَا عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ
“আহলুল কিতাব (ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান জাতি) যদি বিশ্বাস করত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তা হলে আমি তাদের পাপ ক্ষমা করে দিতাম।”[২]

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا *
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন ও তার প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেবেন।”[৩]

১২. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দার কাজকর্ম সহজ হয়ে যায় ও রিযিক বৃদ্ধি পায়,
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكْتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
“যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তা হলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম।” [৪]

ج وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে বেরোবার) কোনো না কোনো পথ খুলে দেবেন এবং তাকে রিযিক দেবেন তার ধারণাতীত উৎস থেকে।”[১]

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا
“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার কাজকর্ম সহজ করে দেবেন।”[২]

১৩. তাকওয়ার মাধ্যমে শয়তানের স্পর্শ ও আঘাত থেকে বান্দা সুরক্ষিত থাকে,
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, শয়তানের স্পর্শে তাদের মনে কুমন্ত্রণা জাগলে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের চক্ষু খুলে যায়।”[৩]

আল্লাহ এ কথা বলেননি যে, তাকওয়াবানরা নিষ্পাপ। তিনি বলেছেন, শয়তান যখন তাদের দিকে ধেয়ে আসে, তখন তাকওয়া তাদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব জাগিয়ে তোলে, আর তারা ফিরে আসে।

১৪. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দা সত্য-মিথ্যা ও আলো-আঁধারের পার্থক্য বুঝতে পারে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
“হে ঈমানদারগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তা হলে তিনি তোমাদের ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার শক্তি প্রদান করবেন, তোমাদের দোষত্রুটি দূর করে দেবেন, তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।”[১]

১৫. তাকওয়া থাকলে বান্দা আল্লাহ তাআলার সাহায্য লাভ করে,
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى )
“যারা দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে, আমি তাদের জন্য সহজ পথে চলা সুগম করে দেব।”[২]

১৬. তাকওয়ার দ্বারা উভয় জাহানে বান্দা কামিয়াব হবে,
فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ *
"অতএব, হে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা! আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।”[৩]

১৭. তাকওয়া থাকলে বান্দা আল্লাহ তাআলার বন্ধুত্ব লাভ করে,
وَإِنَّ الظَّالِمِينَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ *
“সীমালঙ্ঘনকারীরা পরস্পরের বন্ধু আর আল্লাহ মুত্তাকিদের বন্ধু।”[৪]

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ *
“সাবধান! আল্লাহ তাআলার বন্ধুদের কোনো ভয় নেই, দুশ্চিন্তা নেই। তারাই বিশ্বাসী ও মুত্তাকি।”[১]

১৮. জাহান্নামের শাস্তি থেকে বান্দার বাঁচার মাধ্যম হলো তাকওয়া,
وَإِن مِّنكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا *
“তোমাদের প্রত্যেকেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করবে। এটা তোমার রবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তারপর আমি তাকওয়া অবলম্বনকারীদের এ থেকে মুক্তি দেব আর জালিমদেরকে তার মধ্যে রেখে দেব নতজানু অবস্থায়।”[২]

১৯. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দার পরিসমাপ্তি সুন্দর হবে,
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
“আখিরাতের সেই নিবাস আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করব, যারা জমিনে অহংকার ও অপরাধ করে না। সর্বোত্তম পরিণতি মুত্তাকিদের জন্যই।”[৩]

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَّحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
(হে নবি,) আপনি আপনার পরিবারকে সালাতের আদেশ দিন এবং নিজেও তা নিয়মিত পালন করতে থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না, রিযিক তো আমিই আপনাকে দিই। আর সর্বোত্তম পরিণতি তো তাকওয়াবানদের জন্যই।”[১]

২০. তাকওয়ার মাধ্যমে কিয়ামাতের দিন বান্দা নিরাপত্তার মঞ্জিলে পৌঁছে যাবে,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ ۞
“নিশ্চয় মুত্তাকিগণ থাকবে নিরাপদ স্থানে।”[২]

২১. তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে উত্তম মর্যাদা লাভ করে,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“নিশ্চয় তোমাদের মধ্য হতে আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি উত্তম, যে তাকওয়া অবলম্বন করে।”[৩]

এই হলো তাকওয়ার উপকারিতার মধ্য থেকে অল্প কয়েকটি। আল্লাহ আমাদের অন্তর প্রশস্ত করে দিন ও তাতে তাকওয়া দান করে তা থেকে উপকৃত করুন। আমীন।

তাকওয়ার ব্যাপারে আলি (রাঃ)-এর উক্তি
আলি ইবনু আবী তালিব (রাঃ) বলেন, “তাকওয়া অবলম্বন করুন। কারণ, এটি বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার অধিকার। তাকওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার সাহায্য চাইতে হয়। তাকওয়া আজ একটি ঢাল হিসেবে কাজ করছে, আগামীকাল এটি আপনাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।”[৪]

তিনি আরও বলেন, “হে আল্লাহ তাআলার বান্দারা! তাকওয়া আল্লাহ তাআলার বন্ধুদেরকে তাঁর নিষেধকৃত বস্তু থেকে দূরে রাখে। আর অন্তরে তাঁর ভয় সৃষ্টি করে। এর ফলে বান্দা রাতে জাগ্রত ও দিনে তৃষ্ণার্ত থাকে (সালাত ও সিয়ামের মাধ্যমে)। ক্লান্তি থেকে প্রশান্তি আর তৃষ্ণা থেকে তৃপ্তি লাভ হয়। মুত্তাকিগণ সময়ের সংক্ষিপ্ততা নিয়ে সচেতন বলে কাজে ত্বরা করে। অলীক কল্পনা পরিত্যাগ করে মৃত্যুর ব্যাপারে সচেতন থাকে।” [১]

টিকাঃ
[১] সূরা আল ইমরান ৩: ৭৬
[২] সূরা আল-আ'রাফ ৭: ১৫৬
[১] সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৯৪
[২] সূরা আন-নাহল ১৬: ১২৮
[৩] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ৩৫
[১] সূরা আল-বাকারাহ ২: ২১২
[২] সূরা আল-ইমরান ৩: ১৫
[৩] সূরা আল ইমরান ৩: ১৩৩
[৪] সূরা মারইয়াম ১৯:৬৩
[১] সূরা যুমার ৩۹: ৭৩
[২] সূরা আন-নিসা ৪: ৭৭
[৩] সূরা ইউনুস ১০: ৬৩-৬৪
[৪] সূরা আল ইমরান ৩: ১৭৯
[৫] সূরা আল-মাইদা ৫: ২৭
[১] সূরা আল-আহযাব ৩৩: ৭০-৭১
[২] সূরা আল ইমরান ৩: ১২০
[৩] সূরা আল ইমরান ৩: ১২৫
[১] ইবনু আব্দি রব্বিহি উন্দুলুসী; আল-ইকদুল ফারীদ, ১/১১৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)। তবে বর্ণনাটির কোনো সনদ পাওয়া যায় না।
[২] সূরা আল-মাইদা ৫: ৬৫
[৩] সূরা আত-তালাক ৬৫ : ৫
[৪] সূরা আল-আ'রাফ ৭: ৯৬
[১] সূরা আত-তালাক ৬৫: ২-৩
[২] সূরা আত-তালাক ৬৫ : ৪
[৩] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ২০১
[১] সূরা আল-আনফাল ৮: ২৯
[২] সূরা আল-লাইল ৯২: ৫-৭
[৩] সূরা আল-মাইদা ৫: ১০০
[৪] সূরা আল-জাসিয়াহ ৪৫: ১৯
[১] সূরা ইউনুস ১০: ৬২-৬৩
[২] সূরা মারইয়াম ১৯: ৭১-৭২
[৩] সূরা আল-কাসাস ২৮ : ৮৩
[১] সূরা ত্বহা ২০: ১৩২
[২] সূরা আদ-দুখান ৪৪ : ৫১
[৩] সূরা আল-হুজুরাত ৪৯ : ১৩
[৪] নাহজুল বালাগাহ, ৩৭৯।
[১] নাহজুল বালাগাহ, ২২৪,২৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px