📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ২. কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্যে তাকওয়ার মাহাত্ম্য

📄 ২. কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্যে তাকওয়ার মাহাত্ম্য


কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَّفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرٌۢ بِمَا تَعْمَلُونَ
“হে বিশ্বাসীরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া অর্জন করো)। আর প্রত্যেকে যেন খেয়াল রাখে যে, সে আগামীর জন্য কী প্রেরণ করেছে। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত।”[১]

• আল্লাহকে ভয় করার ব্যাখ্যা ইমাম কুরতুবি (রহঃ) দিয়েছেন এভাবে—তাঁর বেঁধে দেওয়া সীমাকে সমীহ করা, আদেশ পূর্ণ করা এবং পাপ থেকে বিরত থাকা। 'আগামী' বলতে এই আয়াতে বোঝানো হয়েছে পরকালকে। অত্যাসন্ন যেকোনো কিছু বোঝাতেও আরবিতে 'আগামীকাল' এর প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়। [২]

জাহিলি যুগের কবি কুরাদ ইবনু আজদা' বলেন, فَإِنْ يَكُ صَدْرُ هَذَا الْيَوْمِ وَلَّى ... فَإِنَّ غَدًا لِنَاظِرِهِ قَرِيبُ
“আজকের দিন ভালোয় ভালোয় কাটুক প্রসন্ন, চেয়ে দেখো ওই, আগামীকাল অত্যাসন্ন।”[১]

• হাসান বাসরি ও কাতাদা বলেন, কিয়ামাতকে 'আগামীকাল' বলার মাধ্যমে এর নৈকট্য বোঝানো হচ্ছে। যেন সত্যি সত্যিই আগামীকাল কিয়ামাত হয়ে যাবে। আগামীর জন্য প্রেরিত জিনিস হলো মানুষের পুণ্য কিংবা পাপকাজ।

আয়াতে 'আল্লাহকে ভয় করা' তথা তাকওয়া অবলম্বনের আদেশটি পুনরাবৃত্তি করার কারণ আছে। এভাবে পুনরাবৃত্তি করা হয় গুরুত্ব বোঝানোর উদ্দেশ্যে। আবার দুটি জায়গায় আলাদা দুটি অর্থও হতে পারে। অনেকের মতে প্রথম 'ভয়ে'র অর্থ অতীত পাপের অনুশোচনা আর দ্বিতীয়টির অর্থ ভবিষ্যতে পাপ পরিহারের প্রত্যয়।[২]

• ইমাম ইবনু কাসীর ব্যাখ্যা দেন, “আল্লাহ তাঁকে ভয় করার আদেশ করেছেন। তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এই ভয় করার অন্তর্ভুক্ত। 'প্রত্যেকে যেন দেখে (বা খেয়াল রাখে)' বলতে বোঝানো হয়েছে কিয়ামাতের দিন হিসেব হওয়ার আগে নিজেই নিজের কাজকর্মের হিসেব নেওয়া। আল্লাহ তাআলার কাছে উপস্থাপনের আগেই নেক আমলের বিনিয়োগের পরিমাণ দেখে নেওয়া।”[৩]

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, “নিজের আমলের হিসাব নেওয়ার গুরুত্ব বোঝা যায় এই আয়াত থেকে।”[৪]

আরেক আয়াতে এসেছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ )
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সেভাবেই ভয় করো, যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা (পরিপূর্ণ) মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না”[৫]

• ইবনু মাসউদ এই আয়াতের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা তো আগে উল্লেখ করাই হলো। এখন ইবনু আব্বাস এর ব্যাখ্যায় কী বলেছেন, তা দেখা যাক,
“যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো' এই কথা দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার রাস্তায় সেভাবেই চলতে হবে, যেভাবে চলা উচিত। এ ব্যাপারে কারও সমালোচনার পরোয়া করা যাবে মোহনীয় না। আপনজনের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও থাকতে হবে ন্যায়ের সাথে। আর '... যেন তোমাদের মৃত্যু না হয়' অংশটুকু দিয়ে বোঝানো হয়েছে সুস্বাস্থ্য-অসুস্থতা সকল অবস্থায় ইসলাম পালন করা। জীবদ্দশায় এভাবে চললে মৃত্যুও হবে এরকমই।”[১]

• সাইয়িদ কুতুব বিষয়টি তুলে ধরেন এভাবে, “আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য সমীহ বা ভয় আসলে সীমাহীন। তাই অন্তর যেন সাধ্যের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করে যায়। হৃদয় যতক্ষণ তাকওয়া লাভের অভিযানে একদম ডুবে থাকবে, ততক্ষণই সে নতুন নতুন গভীরতা ও দিগন্তের সন্ধান পেতে থাকবে। এমনই গভীরতা ঈমানের। এটিই তাকওয়া। আর তাকওয়ার চূড়ান্ত (স্তর) হলো অন্তিম মুহূর্তেও আল্লাহ তাআলার জন্যই বিলীন হয়ে থাকা। এমন তাকওয়া এক মুহূর্তের জন্যও নড়বড় হয় না, বা হড়কে যায় না।”[২]

আরেকটি আয়াত,
وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَإِيَّاكُمْ أَنِ اتَّقُوا اللَّهَ
“আর আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন। তোমাদের পূর্বে যাদেরকে আমি কিতাব দান করেছিলাম তাদেরকে এবং তোমাদেরকেও আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলাম।”[৩]

• ইবনু কাসীর বলেন, “পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবেও আল্লাহ তাআলা তাকওয়া অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। একই আদেশ আমাদের প্রতিও বলবৎ আছে।”[১]

• সাইয়িদ কুতব বলেন, “আল্লাহ তাআলার ভয় থাকলে অন্তরের সংশোধন একেবারে নিশ্চিত। আল্লাহ আমাদের এই উপদেশ দিয়েছেন—যাতে করে প্রয়োজন ও বিপদের সময় তিনি আমাদেরকে সাহায্য ও সুরক্ষা দিতে পারেন। নতুবা তিনি তো আমাদের উচ্ছেদ করে নতুন মানবজাতি নিয়ে আসতে সক্ষম। তিনি চান, মানুষ যেন নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির জন্যই আল্লাহকে ভয় করে।”[২]

আরও একটি আয়াত,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ))
“হে ঈমানদাররা, তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার- পরিজনকে (জাহান্নামের) ও সন্তান-সন্ততিকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো-যার জ্বালানি হবে মানুষ এবং পাথর। সেখানে রুঢ় স্বভাব ও কঠোর হৃদয়ের ফেরেশতারা নিয়োজিত থাকবে যারা কখনো আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অমান্য করে না এবং তাদেরকে যে নির্দেশ দেওয়া হয় তা-ই পালন করে।”[৩]

• আলি বলেন, “নিজেকে রক্ষা করতে হবে নিজের নেক আমলের মাধ্যমে আর পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে হবে উপদেশের মাধ্যমে।”[৪]

• কাতাদা বলেন, “আল্লাহ তাআলার বাণীর মাধ্যমে পরিবারকে আদেশ করতে হবে। নিষেধ করতে হবে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার ব্যাপারে। আর এই উভয় কাজে তাদেরকে সাহায্যও করতে হবে। তারা অবাধ্য হলে ফিরিয়ে আনতে হবে ধমক ও বাধা দিয়ে।”[৫]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বিস্তারিতভাবে বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীরা, তোমরা নিজেদেরকে, সংসার-সঙ্গীকে ও সন্তান-সন্ততিদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আগুন থেকে রক্ষা করো। আর তা করার উপায় হলো নিজে গুনাহ থেকে বাঁচা ও নেক আমল করা এবং পরিবারকে এসবের শিক্ষা দেওয়া।” [১]

• সাইয়িদ কুতুব বলেন এরকম, “পরিবারের ব্যাপারে মুমিনের কাঁধে যে দায়িত্ব, তা সত্যিই ভারী ও ভয়ংকর। সামনেই আগুন তার অপেক্ষায়। পরিবার নিয়ে এটি পার করে যেতে হবে। নিজেকে তো বাঁচাতে হবেই, পরিবারের কেউ যেন পড়ে না যায়, সেদিকেও চোখ খোলা রাখতে হবে। এর জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। এখানে মানুষকে পাথরের সমপর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। যন্ত্রণা আর লাঞ্ছনার সমন্বয়ে গড়া এ শাস্তি কতই না ভয়ানক! সময় শেষ হওয়ার আগেই তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার মুমিনের কাঁধে।” [২]

আরেকটি আয়াত,
وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ
"আর তোমরা নিজেদের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করো, কেননা তাকওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আর তোমরা আমাকে ভয় করো, হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা।”[৩]

• ইবনু কাসীর ব্যাখ্যা করেন, "দুনিয়ার পাথেয় সম্পর্কে তো জানানোই হয়েছে, তাই আল্লাহ এখানে আখিরাতের পাথেয় তথা তাকওয়ার ব্যাপারে জানিয়ে দিলেন। অনুরূপ আরেক আয়াতে আছে,
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ
'হে আদম সন্তান, তোমাদের লজ্জাস্থানগুলো ঢাকার এবং তোমাদের দেহের সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বিধানের উদ্দেশ্যে আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।[১]
বাহ্যিক পোশাকের কথা বলার পর আল্লাহ দিলেন অন্তরের পোশাকের সন্ধান। সাথে এ-ও বলে দিলেন, বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অন্তরের তাকওয়া কত উত্তম।”

• নবিযুগের জাহিলি কবি আশা ইবনু ছা'লাবাহ কায়সী নবিজির প্রশংসায় লেখা কবিতায় বলেন,
إِذْ أَنْتَ لَمْ تَرْحَلْ بِزَادٍ مِنَ التَّقَى ... وَلَا قَيْتَ بَعْدَ الْمَوْتِ مَنْ قَدْ تَزَوَّدَا نَدِمْتَ عَلَى أَلَّا تَكُونَ كَمِثْلِهِ ... وَأَنَّكَ لَمْ تَرْصُدْ كَمَا كَانَ أَرْصَدًا
ছন্নছাড়া ক্লান্ত পথিক বেশে, পাথেয় ছাড়া পথ ভ্রমণে এসে দেখবে যখন পাথেয়সহ কেউ, জাগবে মনে অনুতাপের ঢেউ।[৩]

• আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ হারিরি রহ. বলেন, আমি সিরিয়ার ঈলা শহরের এক কবর ফলকে লিপিবদ্ধ নিচের পঙক্তিমালা পাঠ করি,
الْمَوْتُ بَحْرُ طَامِحُ مَوْجُهُ ... تَذْهَبُ فِيْهِ حِيْلَةُ السَّابِخِ يَا نَفْسُ إِنِّي قَائِلٌ فَاسْمَعِي ... مَقَالَةٌ مِنْ مُشْفِقٍ نَاصِحِ لَا يَصْحَبُ الْإِنْسَانَ فِي قَبْرِهِ ... غَيْرَ التَّقَى وَالْعَمَلِ الصَّالِحِ
মরণ যেন সাগরসম, লহরী তার সর্বগ্রাসী সাঁতারুর সব পাথেয় গিলেতো হয় সে ভয়াল সর্বনাশী। হে আমার নফস, শুনে যাও এক শুভাকাঙ্ক্ষীর কথা আমলনামা হোক তাকওয়া ভরা, হোক না কবর যথা-তথা।[১]

অপর আয়াত, وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ “যেদিন তোমরা আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসবে, সেদিনের অপমান ও বিপদ থেকে বাঁচো। সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জিত সৎকর্মের ও অপকর্মের (ভালো ও মন্দ) উপার্জনের (যথাযথ) পুরোপুরি প্রতিদান দেওয়া হবে এবং কারও ওপর কোনো যুলুম করা হবে না।”[২]

• ইবনু কাসীর এর ব্যাখ্যায় বলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপদেশ দিচ্ছেন পৃথিবীর সমাপ্তি ও আখিরাতের অবশ্যম্ভাবিতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে। বর্ণিত আছে যে, এটিই সর্বশেষ নাযিলকৃত কুরআনের আয়াত। এটি নাযিল হওয়ার পর নবি মাত্র নয় রাত বেঁচে ছিলেন।”[৩]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সেই ভয়ানক দিনের ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছেন, যেদিন সৎকর্ম ছাড়া বাকি সবই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। ওহির ধারা সমাপ্ত হয় এই ব্যাপক অর্থবোধক আয়াতের মাধ্যমে।”
আর এই (কুরআন নাযিলের ধারা) সমাপ্ত হয়েছে তাকওয়ার প্রসঙ্গ আলোচনার মধ্য দিয়ে। [৪]

অন্য আয়াত,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ “হে বিশ্বাসীরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।”[১]

• ইবনু কাসীর বলেন, “সত্যবাদী হও এবং এ স্বভাব আঁকড়ে ধরে থাকো। এভাবেই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এতে ধ্বংস থেকে নিস্তার পাওয়া যায়, খুলে যায় সুযোগ-সুবিধার দুয়ারগুলো।” [২]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বলেন, “এর অর্থ প্রতিটি কথা ও কাজে আল্লাহ তাআলার (বিধি-নিষেধের) ব্যাপারে সচেতন থাকা। আর নিয়ত ও কাজের মাধ্যমে ঈমান সংশোধনকারী সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।”[৩]

আরেকটি আয়াত,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ “হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয় কিয়ামাতের প্রকম্পন বড় ভয়ানক একটি ব্যাপার।”[৪]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বলেন, “এটি সমগ্র মানবজাতির প্রতি সম্বোধন। আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলো। কিছু আলিম তাকওয়াকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে, 'আল্লাহ যেন তোমাকে তাঁর নিষেধকৃত স্থানে উপস্থিত না দেখেন এবং তাঁর আদিষ্ট স্থানে অনুপস্থিত না পান।'”[৫]

আসলে এ ব্যাপারে আরও অনেক আয়াত তুলে আনা যায়। তবে উল্লেখিত কয়েকটি আয়াত থেকেই এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহ আমাদেরকে অসার কার্যকলাপের জন্য সৃষ্টি করেননি। আমাদের জীবনের একটি উদ্দেশ্য আছে।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“নিশ্চয় আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য।"[১]

গন্তব্যহীন যাত্রায় পাথেয় অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু যে সফরের গন্তব্য আছে, সে পথের জন্য পাথেয় আবশ্যক। আল্লাহ তাআলার নৈকট্য এবং তাঁর জান্নাতের আনন্দ যাদের লক্ষ্য, তাকওয়া তাদের পাথেয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল -এর মুখ দিয়েও তাকওয়া অর্জনের আদেশ শুনিয়েছেন。

আবু যর গিফারি থেকে বর্ণিত আছে নবি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
اتَّقِ اللَّهِ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ
"তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো। গুনাহ হয়ে গেলে এর পরপরই (কোনো) নেক আমল করে নাও। আর মানুষের সাথে সদাচরণ করো।"[২]

ইরবায ইবনু সারিয়াহ বর্ণনা করেন, “নবি একদিন এমন এক খুতবা দিলেন যে, আমাদের অন্তর প্রকম্পিত আর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আমরা বললাম (কিংবা তারা বলল), 'হে আল্লাহর রাসূল , এ যেন বিদায়ী বক্তৃতার মতো শোনাল। আমাদের কিছু উপদেশ দিয়ে যান তা হলে।' তিনি বললেন,
أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشُ مِنْكُمْ يَرَى بَعْدِى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ وَعَضُوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
আমি তোমাদের উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় (তাকওয়া অবলম্বন) করো। কোনো দাসও যদি আমির হিসেবে নিযুক্ত হয়, তাকে মান্য করো। আমার পর বেঁচে থাকলে তোমরা অনেক ফিতনা দেখতে পাবে। কাজেই আমার সুন্নাহ (পথ) ও সুপথপ্রাপ্ত খলীফাদের পথ আঁকড়ে ধরে থেকো। রীতিমতো মাড়ির দাঁতে সেগুলো কামড়ে ধরে পড়ে থেকো। আর দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয় (বিদআত) থেকে দূরে থাকবে। কারণ এ-সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় পথভ্রষ্টতা।”[১]

• আবু সাঈদ খুদরি বলেন, নবি বলেন, إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَابِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ “নিশ্চয়ই দুনিয়া সুমিষ্ট শ্যামল (সুস্বাদু দর্শনীয় ও) আল্লাহ তা'আলা সেখানে তোমাদের খলীফা হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখতে চান যে, তোমরা কী কর? অতএব তোমরা দুনিয়া ও নারী থেকে সাবধান থাকো। কেননা বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম ফিতনা দেখা দিয়েছিল নারীকে কেন্দ্র করেই।”[২]

আরেক বর্ণনায় এসেছে নবি বলেন, لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيُّ “মুমিন ছাড়া আর কারও সঙ্গ গ্রহণ কোরো না। আর মুত্তাকি ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ যেন তোমার খাবারে শরিক না হয়।”[৩]

নবি নিজের জন্যও তাকওয়া অর্জনের দুআ করতেন। ইবনু মাসঊদ বলেন, নবিজি দুআ করতেন এভাবে, اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتَّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পথনির্দেশ (হিদায়াত), তাকওয়া (আপনার ভয়), চারিত্রিক পবিত্রতা ও সচ্ছলতা কামনা করছি।”[৪]

তাকওয়ার এমন বিশেষ গুরুত্বের কারণেই সাহাবিরা এটি অর্জনে ব্যস্ত থাকতেন ও পরস্পরকে এ ব্যাপারে তাগাদা দিতেন। আসলে উম্মাতের মধ্যে দুনিয়া-আখিরাতের পাথেয়র বাস্তবতা তাঁদের চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে!

টিকাঃ
[১] সূরা হাশর ৫৯ : ১৮
[২] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/৪৩।
[১] প্রাগুক্ত। ইমাম কুরতুবী পঙক্তিটি ইমাম গাযালীর ফারাইদুল লাআলী হতে উদ্ধৃত করেছেন। তবে পঙ্কতিটি কবি কুরাদ ইবনু আজদা'র। আমরা এখানে পুরো পঙক্তিটি তুলে ধরেছি। দেখুনঃ মু'জামুশ শুআরাইল আরব, ৮৭৮। আলী ইবনু মাহদির মুখে এই পঙক্তি পাঠের বর্ণনা পাওয়া যায়। বায়হাকী; শুআবুল ঈমান, ৯৫৫০।
[২] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/৪৩।
[৩] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/১০৫,১০৬।
[৪] ইগাসাতুল লাহফান, ১/৮৪।
[৫] সূরা আল ইমরান ৩: ১০২
[১] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ২/৭৫।
[২] তাফসীরু ফী যিলালিল কুরআন, ৩/১৪৬,৪৭। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[৩] সূরা আন-নিসা ۴: ১৩১
[১] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ২/৩৮২
[২] তাফসীরু ফী যিলালিল কুরআন, ৪/৩৪৪,৪৫। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[৩] সূরা আত-তাহরীম ৬৬: ০৬
[৪] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/১৯৪।
[৫] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/১৮৮।
[১] সফওয়াতুত তাফাসীর (দারুস সাবুনি, কায়রো), ৩/৩৮৬।
[২] তাফসীরু ফী যিলালিল কুরআন, ২০/২৯০। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[৩] সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৯৭
[১] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ২৬
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৪০৮।
[৩] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/১৯৪। মূল বর্ণনা রয়েছেঃ সীরাতু ইবনি হিশাম, ১/৩৮৮। কবি আ'শা অবশ্য ইসলাম গ্রহণ করেননি। ইসলামে মদ্যপান হারাম শুনে ইসলাম গ্রহণ না করে ফিরে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন।
[১] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/১৯৪। মূল বর্ণনা রয়েছে: ইবনু আবিদ দুনিয়া, কিতাবুল কুবুর, ২২৫।
[২] সূরা আল-বাকারা ২ : ২৮১
[৩] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৫৫৭,৫৫৮। তবে সর্বশেষ নাযিল হওয়া আয়াত নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এই মতটি জমহুর আলিমদের মত। তাছাড়া সর্বশেষ আয়াত নাযিলের পর রাসুল সা. কতদিন দুনিয়ার বুকে ছিলেন তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তন্মধ্যে নয় রাত ও একত্রিশ দিনের মত রয়েছে।
[৪] সফওয়াতুত তাফাসীর, ১/১৫৮,১৫৯。
[১] সূরা আত-তাওবা ৯: ১১৯
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৪/২০৪।
[৩] সফওয়াতুত তাফাসীর, ১/৫২৮।
[৪] সূরা আল-হাজ্জ ২২: ১
[৫] সফওয়াতুত তাফাসীর, ২/২৫৭।
[১] সূরা আয-যারিয়াত ৫১ : ৫৬
[২] সুনানু তিরমিযি, ১৯৮৭। মুসনাদু আহমাদ, ২১৩৫৪, ২১৪০৩। ইমাম আহমাদের সনদ হাসান লিগাইরিহি।
[১] মুসনাদু আহমাদ, ১৭১৪৪। সনদ সহিহ। সমার্থক বর্ণনা রয়েছে : সুনানু আবি দাউদ, ৪৬০৭। সুনানু তিরমিযি, ২৬৭৬。
[২] সহিহ মুসলিম, ২৭৪২। ই.ফা, ৬৬৯৭।
[৩] সুনানু আবি দাউদ, ৪৮৩২। সুনানু তিরমিযি, ২৩৯৫। মুসনাদু আহমাদ, ১১৩৩৭। সনদ হাসান।
[৪] সহিহ মুসলিম, ২৭২১।

📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ৩. তাকওয়া অর্জনে সালাফদের তাগিদ

📄 ৩. তাকওয়া অর্জনে সালাফদের তাগিদ


তাকওয়ার ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ছিলেন আমাদের নেককার পূর্বসূরি তথা সালফে সালিহীনগণ। একে অপরকে এ ব্যাপারে খুব বেশি বেশি তাগাদা দিতেন তাঁরা。

• আবু বকর রা. খুতবায় বলতেন, “তাকওয়া অবলম্বন করো আর যথাযথভাবে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করো। আশা ও আশঙ্কা এবং চেষ্টা ও দুআর মধ্যে সুষম সমন্বয় রাখো। যাকারিয়্যা আ.-এর প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ ۞
'তারা নেক কাজে দ্রুত অগ্রসর হতো এবং আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার প্রতি অতিশয় অনুগত।[১][২]

• আবু বকর রা. তাঁর মৃত্যুশয্যায় উমর রা.-কে ডাকিয়ে এনে কিছু পরামর্শ দেন। এর মধ্যে প্রথমটিই ছিল আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে।[৩]

• উমর রা. তাঁর ছেলের কাছে এক চিঠিতে লেখেন,
“আল্লাহকে ভয় করবে। কারণ তাঁকে ভয় করা মানে নিজেকে তাঁর শাস্তি থেকে নিরাপদ করে ফেলা। তাঁকে ঋণ দিলে তিনি তা পরিশোধ করে দেন। আর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হলে আরও বাড়িয়ে দান করেন। তাকওয়াকে করে নাও তোমার জীবনের লক্ষ্য আর হৃদয়ের প্রলেপ।”[১]

• এক যুদ্ধে নিযুক্ত সেনাপতিকে উদ্দেশ্য করে আলি উপদেশ দেন, “আল্লাহকে ভয় করবেন। তাঁরই কাছে আপনাকে ফিরে যেতে হবে, তিনিই আপনার অদ্বিতীয় গন্তব্য। দুনিয়া ও আখিরাতের তিনিই নিয়ন্ত্রক।”[২]

• উমর ইবনু আব্দুল আযীয এক ব্যক্তির কাছে চিঠিতে লিখেন, “আল্লাহভীতি অবলম্বন করুন। তাকওয়া ছাড়া কোনোকিছুই তিনি গ্রহণ করেন না। তাকওয়াবানদের তিনি দয়া দেখান, এরই ভিত্তিতে পুরস্কৃত করেন। মুখে মুখে অনেকেই তাকওয়ার কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে এর চর্চাকারীর সংখ্যা খুবই কম। আল্লাহ আমাদের সকলকে মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”[৩]

• উমর খলিফা হওয়ার পর একটি ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন, "আমি আপনাদেরকে তাকওয়া অবলম্বন ও সদাচরণের উপদেশ দিচ্ছি। কারণ তিনি (অর্থাৎ আল্লাহ) মুত্তাকী ও সদাচারীদের সাথেই রয়েছেন।”
হাজ্জের সফরে বেরোবার আগে এক লোক তাঁর কাছে কিছু উপদেশ চায়। উমর বলেন, “আল্লাহকে ভয় করো। যে তাঁকে ভয় করে, সে কখনো একাকিত্বে ভুগবে না।”[৪]

• শু'বা বলেন যে, কোনো সফরে বেরোবার সময় তিনি হাকাম -এর সাথে কথা বলে নিতেন। তিনি বলতেন, “মুআয -কে নবি যে কথার মাধ্যমে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমিও তোমাকে তা-ই দিচ্ছি। যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো। গুনাহ হয়ে গেলে নেক আমল করে নাও। আর মানুষের সাথে সদাচরণ করো।”[৫]

• জনৈক সালাফ তাঁর ভাইয়ের কাছে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন,
“আল্লাহকে ভয় কোরো। এটি সর্বোত্তম গুপ্তধন, সুন্দরতম প্রদর্শনীয় বস্তু আর সবচেয়ে দামি সম্পদ। আল্লাহ যেন আমাদের উভয়কে এটি অর্জনে ও এর সুফল লাভে সাহায্য করেন।”[১]

• আরেক ব্যক্তি নিজের ভাইকে চিঠিতে লিখেছেন,
“আমি তোমাকে এবং নিজেকে উপদেশ দিচ্ছি তাকওয়া অবলম্বন করার। দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোত্তম পাথেয় এটিই। একে বানিয়ে নাও প্রতিটি ভালো কাজের দিকে যাবার রাস্তা ও প্রতিটি মন্দ পথের বাধা। মুত্তাকীদের দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার ও কল্পনাতীত উৎস থেকে রিযক দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ।”[২]

• সিফফিনের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে কুফার বাইরে এক গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আলি। এমন সময় তিনি বললেন,
“একাকিত্বের বাসিন্দারা, অন্ধকার কবরের অধিবাসীরা! ওহে বিস্মৃত মাটি হয়ে যাওয়া মানুষেরা! তোমরা আমাদের আগে গিয়েছ, আমরা তোমাদের পরেই আসছি। তোমাদের ঘর? তাতে অন্যরা এসে থাকছে। তোমাদের সংসার-সঙ্গীরা? তারা বিয়ে করে নিয়েছে অন্যত্র। আর সম্পদ? সেগুলোর ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে। তোমাদের জন্য এই ছিল আমার কাছে খবরাখবর। আমাদের জন্য তোমাদের কাছে কী বার্তা আছে, বলো তো!”
এরপর আলি তাঁর বাহিনীর দিকে ফিরে বলেন,
“এদের যদি কথা বলার সামর্থ্য থাকত, তা হলে তারা বলত—তাকওয়াই সর্বশ্রেষ্ঠ পাথেয়।”[৩]

টিকাঃ
[১] সূরা আল-আম্বিয়া ২১: ৯০
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৫/৩২৫। মুসান্নাফু ইবনি আবি শায়বাহ, ৩৪৪৩১।
[৩] মুসান্নাফু ইবনি আবি শায়বাহ, ৩৭০৫৬。
[১] ইবনু কুতায়বা দিনওয়ারি; উয়ুনুল আখবার, ১/৩৫৭।
[২] মুসান্নাফু ইবনি আবি শায়বাহ, ৩৪৪৯৯।
[৩] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৫/২৬৭।
[৪] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৫/২৯৭।
[৫] মুসনাদু ইবনিল জা'আদ, ৩১২। মুআজ ইবনু জাবাল -এর বর্ণনাটি রয়েছে: মুসনাদু আহমাদ, ২২০৫৯। সনদ হাসান গরীব।
[১] আবু হাইয়্যান তাওহিদী; আল-বাসাইরু ওয়ায-যাখাইর, ২/১৪।
[২] ইবনু রজব হাম্বলি; জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ১/৪০৭।
[৩] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ২/১৪৮ [২৭৮]।

📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ৪. মুত্তাকিদের গুণাবলি

📄 ৪. মুত্তাকিদের গুণাবলি


কুরআনের অসংখ্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের গুণাবলি জানিয়ে দিয়েছেন। কোমলতা, ভদ্রতা ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ হলো তাঁদের পরিচয়। এ সংক্রান্ত আয়াতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তারিত একটি হলো:
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوْا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ أَمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتٰبِ وَالنَّبِيِّينَ وَأَتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِى الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّابِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلُوةَ وَأَتَى الزَّكُوةَ وَالْمُوْفُوْنَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عُهَدُوا وَالصَّبِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِيْنَ الْبَأْسِ أُولَ بِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَ بِكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ
“তোমাদের মুখ (শুধু) পূর্ব দিকে বা পশ্চিম দিকে ফিরানোর মধ্যে কোনো পুণ্য নেই। বরং সৎকাজ হচ্ছে—আল্লাহ তাআলা, কিয়ামাত-দিবস, ফেরেশতা, আল্লাহ তাআলার অবতীর্ণ কিতাব ও নবিদের মনেপ্রাণে মেনে নেবে। এবং আল্লাহ তাআলার প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় ধন-সম্পদ—আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য ব্যয় করবে। আর সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করবে; এবং বিপদে-অনটনে ও সংগ্রামে সবর করবে, তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।”[১]

টিকাঃ
[১] সূরা আল-বাকারা ২: ১৭৭

📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ৫. পাথেয় লাভের পথ

📄 ৫. পাথেয় লাভের পথ


মুত্তাকিদের স্তরে উন্নীত হওয়া যেনতেন ব্যাপার নয়। তবে নবি -এর সুন্নাহ ও সালাফদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে আল্লাহ তাআলার সাহায্যে তা সহজ হয়ে যায়। এ পথের প্রধান ধাপগুলো এরকম :

*প্রথম ধাপ: নিজের হিসেব নেওয়া
দুনিয়ায় নিজের নেক আমল, বদ আমলের হিসেব রাখাটা আখিরাতে সাফল্যের একটি কারণ। কুরআনে এই বাস্তবতা বর্ণিত হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ *
“হে বিশ্বাসীরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া অর্জন করো)। আর প্রত্যেকে যেন খেয়াল রাখে যে, সে আগামীর জন্য কী প্রেরণ করেছে। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত।”[১]
এখানে নিজের বিগত আমলের হিসেব নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

• উমর বলেন, “তোমার হিসেব গৃহীত হওয়ার আগে, নিজেই নিজের হিসেব নাও। তোমার আমল ওজন হওয়ার আগে, নিজেই তার ওজন করো।”[১]

• মাইমুন বিন মাহরান বলেন, “ব্যবসায়িক অংশীদারের হিসেব নেওয়ার চেয়ে নিজের হিসেব বেশি না নিলে, কেউই মুত্তাকী হতে পারবে না।”[২]

• হাসান বাসরি এর ভাষ্য অনুযায়ী, “মুমিন নিজেই নিজের পাহারাদার। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সে নিজের হিসেব নেয়। দুনিয়ায় নিজের হিসেব নিলে আখিরাতে তার হিসেব সহজভাবে নেওয়া হবে। আর দুনিয়ায় এই বিষয়টিকে যে হালকাভাবে নেবে, আখিরাতে তার হিসেব বড় কড়াকড়ি হবে।”[৩]

• আনাস বিন মালিক বলেন যে, উমর একবার হাঁটতে বেরিয়ে একটি বাগানে পৌঁছলেন। বললেন, “আল্লাহ ও আমার মাঝে রয়েছে এক বাধা। হে আমার নফস! মুমিনদের নেতা! হয় তুমি আল্লাহকে ভয় করবে, নয়তো আমি তোমায় শাস্তি দেবো।” [৪]

• মালিক ইবনু দিনার বলেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে নিজেকে বলে- 'অমুক লোকটা তো নেক আমলে তোমার থেকে এই এই পরিমাণ এগিয়ে গেল!' তারপর নিজেকে তিরস্কার করে আরও ভালোভাবে দ্বীন পালন করতে শুরু করে।” [৫]
তিনি আরও বলেছেন, “আমি হাজ্জাজকে বলতে শুনেছি—'আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে তার আমলনামা অন্যের হাতে পড়ার আগেই নিজে তার হিসেব নেয়। আল্লাহ তাকে রহম করুন, যে নিজের কাজকর্মকে লাগামছাড়া হতে দেয় না। আল্লাহ তাকে রহম করুন, যে নিজেই মিযানে নিজের আমল ওজন করে।' (ইবনু দীনার বলেন,) তার এই বক্তব্য আমাকে অশ্রুসিক্ত করে তুলল।”[৬]

আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ التَّوَّامَةِ
“না![১] তিরস্কারকারী নফসের শপথ...."[২]

• এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বাসরি বলেন, “মুমিন সব সময়ই নিজেকে পর্যালোচনার অধীন রাখবে। এমনকি পানাহার ও কথাবার্তার ক্ষেত্রেও। আর পাপাচারী কখনোই নিজের সমালোচনা করে না।”[৩]

• তাউবাহ ইবনুস সিমাত ষাট বছর বয়স পর্যন্ত এভাবে নিজের হিসেব নিয়েছেন। গণনা করে দেখলেন মোট দিনের সংখ্যা ২১,৫০০। তিনি কেঁপে উঠে বললেন, “গোটা জগতের প্রতিপালকের কাছে যদি আমি ২১,৫০০টা গুনাহ নিয়ে যাই, কী দুর্গতিই না হবে! আর যদি দিনে ১০,০০০টা করে গুনাহ হয়ে থাকে, তা হলে তো সর্বনাশ!" [৪]

• একজন সালাফের মতে, “একেকটি পাপকাজের বিনিময়ে মানুষ নিজের ঘরে এক একটি ঢিল ছুড়লে, সারা ঘর ভরে যেতে তেমন একটা সময় লাগবে না।”[৫]

• ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেন, “দাউদ-এর পরিবারের জ্ঞানগর্ভ কথামালায় লেখা আছে, 'বুদ্ধিমান কখনো চারটি বিষয়ে অবহেলা করে না: প্রতিপালকের কাছে দুআ করা, নিজের হিসেব নেওয়া, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে নিজের দোষ শোনা এবং একাকিত্বের সময়।[৬]

• উমর তাঁর অধীনস্থদের কাছে বার্তা পাঠান: “দুর্দশার হিসেব আসার আগেই প্রাচুর্যের সময় নিজের হিসেব নিন। এতে সন্তুষ্ট ও ঈর্ষণীয় হওয়া যায়। আর যে এ ব্যাপারে উদাসীন থেকে দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়, তার সামনে দুর্দশা আসন্ন।”[৭]

• ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, “মোটকথা, প্রথমে ফরয আমলের হিসেব নিতে হবে। এখানে কমতি থাকলে পূরণ করে নিতে হবে। তারপর আসে হারাম কাজের হিসেব। এখানে ত্রুটি পেলে ইস্তিগফার করে নিতে হবে এবং নেক আমল বাড়িয়ে দিতে হবে, যাতে পাপ কেটে যায়। এরপর দেখতে হবে নিজের উদাসীন ও অবহেলায় কাটানো সময়গুলো। এখানে ঘাটতি থাকলে তাওবা ও যিকর-আযকার করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। সবশেষে মুখ, পা, হাত, চোখ, কানের হিসেব। এই অঙ্গ দিয়ে ওই কাজটা কেন করলাম? সেই কাজটা কেন করলাম না? ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন,
فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
‘আপনার প্রতিপালকের শপথ! আমি তাদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করব। তারা (ভালো বা মন্দ) যা কিছু করছে সে সম্পর্কে।'[১]
তিনি আরও বলেন,
فَلَنَسْأَلَنَّ الَّذِينَ أُرْسِلَ إِلَيْهِمْ وَلَنَسْأَلَنَّ الْمُرْسَلِينَ فَلَنَقُصَّنَّ عَلَيْهِم بِعِلْمٍ وَمَا كُنَّا غَابِبِينَ
অতঃপর যাদের নিকট রাসূল পাঠানো হয়েছিল আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব আর রাসূলদেরও (আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়া সম্পর্কে) অবশ্যই জিজ্ঞেস করব। তখন আমি তাদের সমস্ত বিবরণ অকপটে প্রকাশ করে দিব, আর আমি তো বেখবর নই।[২]
لِيَسْأَلَ الصَّادِقِينَ عَن صِدْقِهِمْ وَأَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا أَلِيمًا
“(পূর্ববর্তী নবি ও রাসূলগণ হতে যে অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়েছে তা মূলত) সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার জন্য।”[৩]

সত্যবাদীকেই যেখানে জেরার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেখানে মিথ্যেবাদীর অবস্থা কতটা খারাপ হতে পারে, ভাবুন তো![১]

আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا “নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর—সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”[২]

দেখুন, বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে যেতে পারে। কাজেই, আসল হিসেবের সময় আসার আগে নিজের হিসেব নেওয়া উচিত।”

এই অভ্যাস থাকলে বান্দার প্রচুর উপকার হবে। এর মাঝে একটি হলো নিজের ভুলভ্রান্তি ধরতে পারা। ভুল যদি বুঝতেই না পারে, তা হলে সংশোধন করবে কীভাবে?

• আবুদ দারদা বলেন, “ইসলামের বুঝ পরিপূর্ণ হওয়ার লক্ষণ হলো আল্লাহ তাআলার ওয়াস্তে (সংশোধনের নিয়তে) মানুষকে তিরস্কার করা, তারপর ঘরে ফিরে তার চেয়েও বেশি করে নিজেকে তিরস্কার করা।”[৩]

• আইয়ুব সাখতিয়ানি বলেন, “দ্বীনদার ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করা হলে আমি নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিই (অর্থাৎ, নিজেকে তাঁদের মাঝে গণ্য করি না)।”[৪]

• মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি বলেন, “পাপের যদি দুর্গন্ধ থাকত, তা হলে আমার ধারেকাছেও কেউ ঘেঁষতে পারত না।”[৫]

•ইউনুস ইবনু উবাইদ এর ভাষ্য, “ভেবে দেখলাম ভালো মানুষের একশোটির মতো গুণাবলি আছে। কিন্তু নিজের মাঝে তার একটিও পেলাম না।”[৬]

• উকবা ইবনু সাহবান বলেন, “আমি আয়িশা -কে এই আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলাম :
ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ وَمِنْهُمُ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ ‘তারপর আমি এমন লোকদেরকে এ কিতাবের উত্তরাধিকারী করেছি যাদেরকে আমি নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে বাছাই করে নিয়েছি। এখন তাদের মধ্য থেকে কেউ নিজের প্রতি জুলুমকারী, কেউ মধ্যপন্থি এবং কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুমে সৎকাজে অগ্রবর্তী। আর এটাই (মানুষের প্রতি আল্লাহ তাআলার) মহা অনুগ্রহ’[১]

• তিনি জবাব দিলেন, 'শোনো ছেলে, তারা তো এখন জান্নাতে আছে। যারা ভালো কাজে দ্রুত ধাবমান, তাঁরা নবি -এর সময়কার এবং তাঁর জবানের মাধ্যমেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছে। মধ্যমপন্থিরা হলেন তাঁর অনুসারী সাথি, যারা একসময় তাঁদের নাগাল পেয়েছেন। আর নিজেদের ওপর অবিচারকারী হলাম আমার আর তোমার মতো মানুষেরা।' আয়িশা নিজেকে এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন।”[২]

• ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, “সত্যবাদীদের একটি স্বভাব হলো নিজেকে তিরস্কার করা। নেক আমলের মাধ্যমে বান্দা যত-না আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী হয়, তার চেয়ে বেশি হয় এ কাজের মাধ্যমে।”
নিজের হিসেব গ্রহণের আরেকটি উপকারিতা হলো আল্লাহ তাআলার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া। এই বিষয়টি যারা উপলব্ধি করতে পারে না, তারা নেক আমল ও ইবাদত থেকে উপকৃত হয়ক্ত হয় না।[৩]

• ওয়াহহাব থেকে ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন যে, একবার মূসা এক লোকের পাশ দিয়ে গেলেন। লোকটি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে করতে কান্নাকাটি করছিল। মূসা বললেন, “হে আল্লাহ, এর ওপর দয়া করুন। তার জন্য আমার খুবই খারাপ লাগছে।” আল্লাহ তাআলা মুসা -এর প্রতি ওহি করলেন, “সে দুআ করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়লেও আমি তা কবুল করব না, যতক্ষণ না সে তার ওপর আমার (কর্তৃত্বের) অধিকার স্বীকার করছে।”[১]

• ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, “বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার অধিকার উপলব্ধি করার একটি উপকারিতা হলো—নিজের ক্ষুদ্রতা বুঝতে পারা, অহংকার ও লোকদেখানো (অভ্যাস) থেকে মুক্তিলাভ। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলার সামনে নম্রতার দরজা খুলে যায়, অহমিকার দরজা বন্ধ হয়। বোধোদয় হয় যে, মুক্তি কেবল আল্লাহ তাআলার দয়া ও করুণার মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। আনুগত্য পাওয়া, ইয়াদ রাখা ও কৃতজ্ঞতা পাওয়া আল্লাহ তাআলার অধিকার। অবাধ্যতা, বিস্মৃতি ও একাগ্রতার অকৃতজ্ঞতা তাঁর প্রাপ্য নয়।
এ বিষয়গুলো নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করলে টের পাওয়া যায় যে, কেবল নিজের চেষ্টায় এসব অধিকার পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব নয়। ভরসা করতে হয় আল্লাহ তাআলার দয়ার ওপর। নিজের আমলের ওপর নির্ভর করতে গেলে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলার ওপর নিজের অধিকার নিয়ে অনেকেই সচেতন অথচ উলটোটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার লোক খুবই কম। এভাবেই আল্লাহ তাআলার সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তাঁর সাক্ষাৎ লাভের ইচ্ছে মরে যায়। এ হলো প্রতিপালক ও নিজের ব্যাপারে অজ্ঞতার একশেষ।”[২]

• ইমাম গাযালি -এর মতে, “হিসেব গৃহীত হওয়ার আগেই যে নিজের হিসেব নেয়, কিয়ামাতের দিন তার আসল হিসেব সহজ হবে। প্রশ্নের উত্তর সে সহজে দিতে পারবে, ফলে তার পরিণতি হবে ভালো। আর যে এমনটা করবে না, সে আফসোসে মরবে আর কিয়ামাতের প্রতিটি স্তরে আটকে যাবে। জীবদ্দশার এই ভুল তাকে নিয়ে যাবে অপমান ও তিরস্কারের দিকে।”[৩]

হে আল্লাহ তাআলার বান্দা, নিজের মাঝে এই গুণগুলোর পরিমাণ মেপে দেখুন। নিজের হিসেব গ্রহণকারী হলে আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। আর বিপরীত দলভুক্ত হলে এখনই মিনতি সহকারে তাওবা করে নিন, যেভাবে অনুতপ্ত দাস তার মনিবের কাছে ফিরে আসে।

• ইমাম গাযালি বলেছেন, “আল্লাহ ও শেষ-দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী প্রতিটি ব্যক্তির দায়িত্ব হলো নিজের হিসেব গ্রহণের এই বিষয়টিকে অবহেলা না করা। জীবনের প্রতিটি নিশ্বাস একেকটি দামি রত্ন। একেকটির বিনিময়ে চিরস্থায়ী শান্তি ক্রয় করা সম্ভব। এই শ্বাসগুলোকে অসার বা মন্দ কাজে ব্যয় করা কোনো বিবেকবান লোকের কাজ হতে পারে না। একটিমাত্র জীবন, এটিই পুঁজি। জীবন শেষ তো পুরো মূলধন শেষ। আরও একটি দিন ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারা মানে আগের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার অপূর্ব সুযোগ। আল্লাহ যদি ঘুমের মধ্যে তার প্রাণ নিয়ে নিতেন, তা হলে শত অনুরোধ করেও সে আর একটি সুযোগ পেত না। তাই ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারাকে নতুন জীবন পাওয়ার মতো মূল্য দিতে হবে। এই অমূল্য রত্নগুলো হেলায় হারানো যাবে না।
দিনে চব্বিশটি ঘণ্টা, তাই আজই শুরু হোক সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। ইল্লিয়্যিন (সৎকর্মশীলদের আত্মা যেখানে থাকে) এর ওপর অধিকার হারিয়ে যেন আফসোসে পুড়তে না হয়।” [১]

দ্বিতীয় ধাপ : নফসকে শাস্তিপ্রদান
বান্দা যতই আল্লাহকে মান্য করার চেষ্টা করুক, ভুলভ্রান্তি হবেই। সালাফদের কারও ভুল-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তাঁরা নিজেদের শাস্তি দিতেন। শুনতে সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ আনুগত্য যতটা কঠিন, সে অনুপাতেই কঠিন শাস্তি নিজেদের দিতেন তাঁরা।
একবার আসরের সালাতের জামাত ছুটে যাওয়ায় উমর দুই লাখ দিরহাম সমমূল্যের এক খণ্ড জমি সদাকা করে দেন।

• ইবনু উমর এক ওয়াক্ত জামাত ধরতে না পারলে সারা রাত জেগে জেগে নফল ইবাদাত করতেন এবং দুজন দাস মুক্ত করে দিতেন।[১]

• তামিম দারি এক রাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারেননি। এরপর পুরো একটা বছর তিনি রাত্রিজাগরণ করেছেন।[২]

একবার নিজের বাগানে সালাতরত অবস্থায় তালহা -এর মনোযোগ একটি পাখির দিকে চলে যায়। তিনি এই ভুলের কাফফারা হিসেবে বাগানটি সদাকা করে দেন।[৩]

• হাসসান ইবনু আবী সিনান একটি দালানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লোকজনকে এর নির্মাণকালের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন যে, তিনি অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে ফেলেছেন। এরপর পুরো এক বছর নফল সিয়াম পালন করে তিনি এর প্রায়শ্চিত্ত করেন।[৪]

• আব্দুল্লাহ ইবনু কায়স বলেন, “আমরা তখন এক প্রবল যুদ্ধের ময়দানে। চারিদিকে শত্রু আর চিৎকার। আবহাওয়া উত্তপ্ত। উমামা গোত্রের এক লোক নিজেকে বলছিল, 'আমি তো অমুক-তমুক যুদ্ধও দেখেছি। হে নফস! তুমি আমাকে পরিবার- পরিজনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সেগুলো থেকে ফিরে আসতে বাধ্য করেছ। আল্লাহ তাআলার কসম! আজ তোমায় কঠোর শাস্তি দিয়ে ছাড়ব আর নয়তো তোমাকে একদম ছেড়েই চলে যাব।'
যুদ্ধের ময়দানে লোকটিকে দেখলাম নিজ সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়ে শত্রুসারিকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে। শত্রুরা পালটা আক্রমণ করলে আবার আমরা ছত্রভঙ্গ হলাম। কিন্তু এই একটি লোক আপন স্থানে অটল থেকে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যায়। পরে তার এবং তার বাহনের লাশে প্রায় ষাটটি আঘাতের চিহ্ন পেয়েছি।”[৫]

• ইমাম গাযালি বলেন, “দৃঢ়চেতা মানুষেরা এভাবেই নফসকে শাস্তি দিতেন। মানুষ অবাধ্যতার ভয়ে পরিবারের সদস্যদের শাস্তি দেয়। অথচ নিজের নফসকে ঠিকই ছেড়ে দেয়। ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত। পরিবারকে যদি আপনি ছেড়ে দেন, তবে সে আপনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। কিন্তু নফসকে যদি ছেড়ে দেন, তবে এটা (পরিবারের চেয়েও) ঘোরতর শত্রুতে পরিণত হবে, এবং আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসবে। আর এটির অনিষ্টের পরিমাণ পারিবারিক অনিষ্টের চেয়ে ঢের বেশি। পরিবার আপনার দুনিয়ার জীবনের ক্ষতি করতে পারে, যা বড়জোর দিন খানিক ভোগাবে। কিন্তু নফস তো আখিরাতের চিরস্থায়ী আবাসকে বরবাদ করে ছাড়বে। তাই এটিই শাস্তির বেশি যোগ্য।[১]

তৃতীয় ধাপ : নফসকে নেক আমলের দিকে ধাবিত করা
আখিরাতের পরম শান্তির প্রকৃত মূল্য বুঝলেই কেবল বান্দা এ বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে। জনৈক সালাফ বলেন, “কাঙ্ক্ষিত বস্তুর মূল্য উপলব্ধি করলে তা অর্জনের পেছনে ব্যয় করা সহজ হয়।” এজন্যই তাঁদের কাজকর্ম হতো কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী। নেক আমল করার সৌভাগ্য হলে তাঁরা এ জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে তা কবুল হওয়ার দুআ করতেন। আর ভুলত্রুটি হয়ে গেলে অনুতপ্ত মনে করে নিতেন যথাযথ তাওবা।

• একবার একদল লোক উমর ইবনু আব্দুল আযীয-এর কাছে আসে। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। আগন্তুকদের মাঝে একজন ছিল একেবারে জীর্ণশীর্ণ। উমর তাকে এ অবস্থার জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, “বিশ্বাসীদের নেতা, আমি দুনিয়ার স্বাদ নিয়ে দেখেছি সেটা তেতো। এর চাকচিক্য আমাকে টানে না, সোনাকেও মনে হয় পাথর। এমনভাবে জীবন যাপনের চেষ্টা করি, যেন আল্লাহ তাআলার আরশ চোখের সামনে দেখছি, দেখছি জান্নাত ও জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া মানুষদের। তাই দিনে সিয়াম পালন করি আর রাতে সালাতে দাঁড়িয়ে থাকি। আল্লাহ তাআলার পুরস্কার ও শাস্তির তুলনায় আমার এতটুকু কষ্টভোগ নিতান্তই তুচ্ছ।”[২]

• আবু নুআইম বর্ণনা করেন যে, দাউদ তাঈ রুটি না খেয়ে রুটির ছাতু গুলিয়ে পান করতেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, “রুটি চিবানোর বদলে ছাতু (গুলিয়ে) পান করলে যে সময়টুকু বেঁচে যায়, তাতে আমি কুরআনের আরও পঞ্চাশটি আয়াত তিলাওয়াত করতে পারি।”[১]

আল্লাহ তাআলার বান্দা, বোঝার চেষ্টা করুন। কীভাবে তাঁরা সময়ের সদ্‌ব্যবহার করেছেন, আর আমরা তা (হেলায়-ফেলায়) নষ্ট করছি। তবে আল্লাহ যাদের ওপর দয়া করেছেন, তাদের কথা আলাদা।

• মাসরুক-এর স্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সালাতের কারণে মাসরুকের পা সব সময় ফুলে থাকত। (তিনি যখন সালাত আদায় করতেন, তখন) আমি পেছনে বসে বসে মায়ার টানে কান্না করতাম।[২]

• আব্দুল্লাহ ইবনু দাউদ বলেন যে, “চল্লিশ বছর হয়ে গেলেই তাঁরা বিছানা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতেন (অর্থাৎ ঘুমের পরিমাণ কমিয়ে দিতেন)।”[৩]

• আবুদ দারদা এর ভাষ্য, “তিনটি জিনিস না থাকলে এই দুনিয়াতে আর একটা মুহূর্তও থাকতে চাইতাম না—আল্লাহ তাআলার জন্য কাটানো তৃষ্ণার্ত বিকেল (সিয়াম), আল্লাহ তাআলার সামনে রাতভর সিজদা, আর ওই সব লোকেদের সঙ্গ; যারা তরতাজা ফল বেছে নেওয়ার মতো করে যারা কল্যাণকর কথা বেছে নেয়, ওই সব।” [৪]

• আলি ইবনু আবি তালিব বলেন, “দ্বীনদার লোকের লক্ষণ হলো (গুনাহ থেকে) সতর্কতাবশত মলিন চেহারা, অধিক কান্নার কারণে দুর্বল দৃষ্টিশক্তি, সিয়ামের কারণে শুকনো ঠোঁট, আর ইবাদাতের কারণে ধূলিমলিন অবস্থা।”[৫]

• হাসান বসরি-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “তাদের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা এ কথার বিরোধিতা করে দ্বীনদার লোকদেরকে সুদর্শন বলে?” রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের চেহারা অন্যদের তুলনায় উজ্জল (সুদর্শন) হওয়ার রহস্য কী?
আলি রা. জবাব দিলেন, “এটা হলো দয়াময়ের সাথে একাকী সময় কাটানোর (পুরস্কার)।” এর কারণ হল, তারা নির্জনে দয়াময় আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য গ্রহণ করে থাকে। যদ্দরুন তিনি আপন নুর দ্বারা তাদের জড়িয়ে নেন (নুরানি করে দেন)।[১] (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা লোকজনের সামনে তাদের চেহারাকে নূরানি করে দেন)

কাজেই, হে আল্লাহ তাআলার বান্দা! আল্লাহ তাআলার দয়া ও জান্নাত পাওয়ার জন্য কঠোর চেষ্টা করুন। নতুবা উভয় জীবনে ব্যর্থ হয়ে যাবেন। আল্লাহ আমাদের এহেন ব্যর্থতা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, “পার্থিব নিআমাতের পেছনে ছুটে অনেকেই ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রশংসার ফিতনা আর দোষগোপনের ফাঁদে পড়ে শেষ হয়ে গেছে কত মানুষ!।”[২]

ইয়াহইয়া ইবনু মুআয রা. বলেন, “পৃথিবী তাকে ছেড়ে যাবার আগেই যে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তাকে অভিনন্দন। কবরে ঢোকার আগে যারা কবর সাজায় আর প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আগেই যারা তাঁকে সন্তুষ্ট করে, তাদেরকেও অভিনন্দন।”[৩]

আলি রা. বলেন, “যে জান্নাত আশা করে, সে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা করবে। জাহান্নামের প্রতি ভীত ব্যক্তি বিরত থাকবে লোভ-লালসা থেকে। মৃত্যুর বাস্তবতা যার বুঝে এসেছে, সে আর আনন্দ খুঁজে বেড়বে না। আর দুনিয়ার হাকীকত যে বুঝতে পেরেছে, সে কষ্টের ভেতরেও আনন্দ খুঁজে নেবে।”[৪]

হামিদ লাফিফ বলেন, “আমরা সম্পদের মাঝে প্রাচুর্য খুঁজেছিলাম। কিন্তু তা খুঁজে পেলাম অল্পে তুষ্টির মাঝে। প্রশান্তি খুঁজেছিলাম অধিক অর্জনে, কিন্তু তা পেলাম স্বল্প আয়ে।”[৫]

আব্দুল্লাহ আনতাকি বলেন, “হৃদয়ের ঔষধ পাঁচটি: নেককারদের সঙ্গ, কুরআন তিলাওয়াত, গুনাহ থেকে আত্মার পরিশুদ্ধি, তাহাজ্জুদের সালাত এবং ভোরবেলা কান্নাকাটি সহকারে দুআ।”[১]

* চতুর্থ ধাপ : নেককারদের উক্তি শোনা
উপরিউক্ত ধাপগুলোর পর শ্রেষ্ঠতম কাজ হলো নেককারদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সঙ্গলাভ এবং কথায়-কাজে তাঁদের অনুকরণ। এটি তাকওয়ার দিকে ধাবিত করে। এখানে আমরা নেককারদের অল্প কিছু বাণী তুলে ধরছি,

• আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “পরকালের পাথেয় ছাড়া কবরে যাওয়া মানে জাহাজ ছাড়া সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া।”[২]

• উসমান বলেন, “দুনিয়ার ভাবনা অন্তরের আঁধার আর আখিরাতের ভাবনা অন্তরের আলো।”[৩]

• আলি বলেন, “যে জ্ঞান অন্বেষণ করে, জান্নাত তাকে খুঁজে বেড়ায়। আর যে পাপ অন্বেষণ করে, তাকে ধাওয়া করে জাহান্নাম।”[৪]

• শাকিক বালখি বলেছেন, “পাঁচটি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকুন—
নিজের মুখাপেক্ষিতার অনুপাতে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত,
পার্থিব জীবনের দৈর্ঘ্যের অনুপাতে পার্থিব সম্পদ,
জাহান্নামের শাস্তিভোগের সহ্যক্ষমতা অনুপাতে পাপ,
কবরের জীবনের দৈর্ঘ্যের অনুপাতে আখিরাতের পাথেয়,
আর জান্নাতের আকাঙ্ক্ষার অনুপাতে নেক আমল।"[১]

• হাসান বসরি বলেছেন, “ছয় ভাবে অন্তর কলুষিত হয় :
* একসময় তাওবা করে নেব, এই আশায় গুনাহ করা
* জ্ঞান অর্জন করেও তা প্রয়োগ না করা
* নিষ্ঠাবিহীন আমল
* আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে তাঁর দেওয়া রিযিক ভোগ
* আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত ফয়সালায় (অর্থাৎ তাকদীরের ওপর) সন্তুষ্ট না হওয়া
* মৃতকে কবর দিয়েও কোনো শিক্ষা না নেওয়া।”[২]

• ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, “তাকওয়ার লক্ষণ হলো ইবাদাতে আত্মনিয়োগ, আর ইবাদাতের লক্ষণ হলো সন্দেহজনক বিষয় থেকে বিরত থাকা। আশার লক্ষণ আল্লাহর আনুগত্য। সহনশীলতার লক্ষণ মিথ্যে আশা পরিত্যাগ।

• ইবনুল কাইয়্যিম তাকওয়া সম্পর্কে বলেন, “তাকওয়ার মূল হল
* আল্লাহ তাআলার দেয়া আদেশ-নিষেধ মাথা পেতে নিয়ে পরিপূর্ণ ঈমান ও আশার সাথে তাঁর আনুগত্য করা।
* তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে আমল করা।
❖ তাঁর প্রতিশ্রুতিকে সত্য বলে স্বীকার করা।
❖ তাঁর সতর্কতা ও শাস্তির ভয়ে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ হতে বিরত থাকা।”[১]

তাছাড়া তিনি তাকওয়ার তিনটি স্তর বর্ণনা করেছেন।
❖ যাবতীয় পাপাচার ও হারাম থেকে বেঁচে থাকা।
❖ সমস্ত মাকরুহ ও অপছন্দনীয় বিষয় হতে বিরত থাক।
❖ এবং অহেতুক ও অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা।[২]

এই হলো তাকওয়ার পথে চারটি ধাপ। নিজেকে যাচাই করে দেখুন কতটা পথ বাকি। শুধু আল্লাহই পারেন আমাদের নিয়ত ও কাজে সমন্বয় ঘটাতে।”

টিকাঃ
[১] সূরা হাশর ৫৯ : ১৮
[১] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল; কিতাবুয যুহদ, ৬৩৩।
[২] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৭।
[৩] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১৭১।
[৪] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল; কিতাবুয যুহদ, ৬০০।
[৫] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৮।
[৬] ইমাম গাযালী, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪০৫ (দারুল মা'রিফা, বৈরুত)। তবে মূল বর্ণনায় রহমের কথা নেই। ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১১।
[১] আয়াতে '১' না'- অব্যয়টি অতিরিক্ত। মূলত আরবি ভাষায় বিরোধিদের দাবী খণ্ডন করে শপথের পূর্বে এ ধরণের অব্যয় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/২৮৩。
[২] সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫: ২
[৩] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৪।
[৪] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৭৬।
[৫] ইমাম গাযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৪০৬।
[৬] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১২।
[৭] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ১৬।
[১] সূরা আল-হিজর ১৫ : ৯২-৯৩
[২] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ৬-৭
[৩] সূরা আল-আহযাব ৩৩ : ৮
[১] ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮৩ (মাকতাবাতুল মা'আরিফ, রিয়াদ)।
[২] সূরা আল-ইসরা (বনি ইসরাঈল) ১৭:৩৬
[৩] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ২৩।
[৪] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৩/৫।
[৫] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৩৭।
[৬] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৩৪。
[১] সূরা ফাতির ৩৫: ৩২
[২] মুসনাদু আবি দাউদ তয়ালিসি, ১৫৯২। ইবনু হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এই বর্ণনাটি দুর্বল।
[৩] ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮৭।
[১] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল; কিতাবুয যুহদ, ৪৫১।
[২] ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮৮।
[৩] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৩৯৪।
[১] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৩৯৪,৯৫।
[১] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৪০৮।
[২] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ৫৫।
[৩] মুআত্তা ইমাম মালিক, ৬৯ (ইহইয়াউত তুরাছ, বৈরুত)।
[৪] বায়হাকী; শুআবুল ঈমান, ৪৭৩১।
[৫] ইবনু আবিদ দুনিয়া; মুহাসাবাতুন নাফস, ২১।
[১] ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৪০৭। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[২] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ২/২৫৫ [৩৮৯]।
[১] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৭/৩৫০।
[২] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ৯৫।
[৩] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ১/৪৪৪ [১৩১]।
[৪] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ২৭৭।
[৫] ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪১২। ইমাম গাযালি এ যে শব্দে বর্ণনা করেছেন তার সনদ পাওয়া যায় না। কিছুটা ভিন্নভাবে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৪/৭৮ [১২৪৯]। সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
[১] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ১/৪৪৫ [১৩৩]।
[২] ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৫১৪।
[৩] বায়হাকী, যুহদুল কাবির, ৪৮৮।
[৪] ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ২২৪। বায়হাকী; শুআবুল ঈমান, ১০১৩৯। হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৫/১০।
[৫] বায়হাকী; যুহদুল কাবীর, ৮০।
[১] আবু নুআইম; হিলয়াতুল আওলিয়া, ১০/৩২৭。
[২] আল-মুনাব্বিহাত; ৮।
[৩] আল-মুনাব্বিহাত; ৯। জা'ফর ইবনু সুলাইমান হতে এই বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবনু আবিদ দুনিয়া; যাম্মুদ দুনিয়া, ৪৬৭।
[৪] আল-মুনাব্বিহাত; ১০। সুয়ূতী, জামিউল আহাদিস, ২৩৫৫৪।
[১] আল-মুনাব্বিহাত; ৬৪।
[২] আল-মুনাব্বিহাত; ৭০। বর্ণনাটির কোনো সনদ পাওয়া যায় না।
[১] যাদুল মুহাজিরি ইলা রব্বিহি (রিসালাতুত তাবুকিয়্যাহ), ১/৮।
[২] আল-ফাওয়াইদ, ৩১,৩২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px