📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ১. তাকওয়া : শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

📄 ১. তাকওয়া : শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ


শাব্দিক অর্থ: ফিরোজাবাদি বলেন, “'تقوی' (তাকওয়া) ক্রিয়াপদটির তিন বর্ণের মূল ধাতুর অর্থ হলো নিজেকে পাপাচার হতে রক্ষা করা, নিষিদ্ধ কাজ হতে সুরক্ষিত রাখা।”[১]
শাইখ মুহাম্মাদ তানতাবি-এর মতে, “'متق' মুত্তাকির বহুবচন 'متقون' মুত্তাকুন। ক্রিয়াপদ 'تقی।' ইত্তাকা (সে নিরাপত্তা লাভ করল) থেকে এসেছে ক্রিয়া- বিশেষ্য মুত্তাকি। ইত্তাকা এসেছে ক্রিয়ামূল 'وق' ওয়াকা থেকে, যার অর্থ 'ক্ষতিকর জিনিস থেকে সে নিজেকে রক্ষা করল।”[২]।
পারিভাষিক (শারঈ) অর্থ: আলি বলেন, “তাকওয়া মানে (এই চারটি গুণের সমন্বয়)-সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ভয় করা, ওহির আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং বিচার-দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।”[৩]
আবুদ দারদা বলেছেন, “পরিপূর্ণ তাকওয়া হলো আল্লাহকে এই পরিমাণ ভয় করা যে, সরিষা দানা পরিমাণ গুনাহ থেকে তো বাঁচবেই, সন্দেহজনক হালাল বিষয় থেকে ও বিরত থাকবে। এ কথারই নিগূঢ় অর্থমর্ম ওঠে এসেছে (কুরআনের) এই আয়াত দুটিতে : فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ * “অতএব, যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করেছে, সে তা দেখবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করেছে, সেও তা দেখবে।”[১],[২]
তাই অবহেলা করে কোনো নেক আমলই ছেড়ে দিয়ো না। আবার কোনো বদ আমলকেই ছোট ভেবে তাতে জড়িয়ে পড়ো না।”
ইবনু আব্বাস বলেন, “তাকওয়াবান ব্যক্তি বলতে সেসব মুমিনদেরকে বোঝায়, যারা শিরক থেকে নিজেদের বিরত রাখে।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা সঠিক পথের নির্দেশনা অনুসরণ করতে কোনো ভুল হয়ে যায় কি না, এ নিয়ে তারা শঙ্কিত থাকে। আবার আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁর দয়ার ব্যাপারেও আশাবাদী থাকে।”[৩]
শাকীক ইবনু সালামাহ রহ. বর্ণনা করেন, মুআয ইবনু জাবাল বলেন, “বিচার-দিবসে ঘোষণা করা হবে, 'তাকওয়াবান ব্যক্তিরা কোথায়?' রহমানের আরশের ছায়া থেকে তারা উঠে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাদের কাছে অদেখা থাকবেন না।” (শাকীক রহ. বলেন,) আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাকওয়াবান কারা? তিনি উত্তর দিলেন, “যারা শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকে এবং দ্বীনকে আল্লাহ তাআলার জন্য একনিষ্ঠ করে নেয়।” [৪] يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ) “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সেভাবেই ভয় করো, যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা (পরিপূর্ণ) মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না"[১]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু মাসউদ বলেন, “এর অর্থ তাঁকে মান্য করা, তাঁর অবাধ্যতা না করা, তাঁকে স্মরণ করা, ভুলে না যাওয়া, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, অকৃতজ্ঞ না হওয়া।”[২]
আবু হুরায়রা -কে তাকওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি প্রশ্নকারীকে পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি কখনো কাঁটাভরা পথে হেঁটেছেন?” লোকটি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিল। আবু হুরায়রা জানতে চাইলেন যে, কীভাবে হেঁটেছেন। লোকটি বলল, “কাঁটা চোখে পড়লে সতর্ক হয়ে গেছি, যাতে কাঁটার ওপর পা না পড়ে যায়।” আবু হুরায়রা বললেন, “তাকওয়ার অর্থ এটাই (গুনাহ থেকে সতর্ক হয়ে পথচলা)।”[৩]
আব্বাসী খলিফা ও বিশিষ্ট কবি আব্দুল্লাহ ইবনুল মু'তায (২৪৭-২৯৬ হিঃ) এই বিষয়টি এভাবে বলেছেন,
خَلِ الذُّنُوْبَ صَغِيْرَهَا ... وَكَبِيْرَهَا فَهُوَ التَّقَى وَاصْنَعْ كَمَاشٍ فَوْقَ أَرْضِ ... الشَّوْكِ يَحْذَرُ مَا يَرَى لَا تَحْقِرَنَّ صَغِيرَةً ... إِنَّ الْجِبَالَ مِنَ الْحَصَى
পথের কাঁটা দেখতে পেয়ে পথিক যেমন সতর্ক রয়, ছোট-বড় পাপ দেখে ঠিক এমনিভাবে বাঁচতে (তাকওয়া) হয়।
ছোট বলে তা যেন আর অবহেলার পাত্র নয়, ছোট ছোট পাথরকণা মিলেই তো ওই পাহাড় হয়।
কুরতুবি এবং ইবনু কাসীর বলেছেন যে, এটি ইবনুল মু'তাযের রচনা।[১]
হাসান বাসরি বলেন, “তাকওয়াবান ব্যক্তিরা আল্লাহ তাআলার হারামকৃত বিষয় থেকে বিরত থাকে এবং তাঁর আদেশসমূহ মেনে চলে। এমনকি সন্দেহজনক অনেক হালাল বস্তুও তারা পরিত্যাগ করে।”[২]
সুফইয়ান সাওরি-এর ভাষায়, “তাদেরকে আলাদা করে ‘(আল্লাহ)ভীরু’ ডাকার কারণ হলো, সাধারণত যেসব বিষয় নিয়ে কেউ ভয় করে না, তারা সেগুলোর ব্যাপারেও ভীত থাকে।”[৩]
তালক ইবনু হাবিব-এর মতে, “তাকওয়া হলো আল্লাহ তাআলার পুরস্কার ও শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহর দেয়া অন্তর্দৃষ্টি খোলা রেখে তাঁকে মান্য করা ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা।”[৪]
উমার ইবনু আব্দুল আযীয বিষয়টি বলেছেন এভাবে, “দিনে সিয়াম পালন করা আর রাতে তাহাজ্জুদ পড়াকেই তাকওয়া বলে না। বরং তাকওয়া হলো আল্লাহ তাআলার নিষেধকৃত বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর আদেশ মান্য করা। যাকে এর চেয়েও উঁচু পর্যায়ের (আনুগত্যের) সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সে কল্যাণের ওপর কল্যাণ লাভ করেছে।”[৫]
ইবনু রজব বলেন, “তাকওয়া হলো আল্লাহ তাআলার ক্রোধ ও শাস্তি থেকে বাঁচার ঢাল। আর এই ঢাল হলো হলো আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। পরিপূর্ণ তাকওয়ার দাবি হলো—ফরযের পাশাপাশি নফল আমল করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার সাথে সাথে মাকরুহ ও সন্দেহজনক জিনিসও পরিত্যাগ করা। এটিই তাকওয়ার চূড়ান্ত রূপ।”[৬]
সাহাল ইবনু আব্দুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ ছাড়া কোনো সাহায্যকারী নেই, আল্লাহ তাআলার রাসূল ছাড়া নেই কোনো পথপ্রদর্শক। তাকওয়া ছাড়া কোনো রিযিক নেই, আর তাকওয়া দৃঢ় করা ছাড়া কোনো আমল নেই। তাকওয়া সুদৃঢ় রাখতে চাইলে সকল গুনাহ থেকে বাঁচতেই হবে।”[১]
আল্লামা আবুল কাসিম নাস্রাবাযি'র ভাষ্য অনুযায়ী, “তাকওয়া দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে দুনিয়ার মোহ উবে যায়। আল্লাহ বলেন,
وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ *
'আর তাকওয়াবানদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়। তোমরা কি বোঝো না?'”[২][৩]
ইমাম কুরতুবী বলেন, “সকল ভালোর সমষ্টিই তাকওয়া। পূর্বের ও পরের সকল প্রজন্মের প্রতি এটিই আল্লাহ তাআলার হুকুম।[৪]
আবুদ দারদা কেন কাব্যচর্চার সাথে জড়িত হন না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান:
يُرِيدُ الْمَرْءُ أَنْ يُؤْتَى مُنَاهُ ... وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا مَا أَرَادَا يَقُولُ الْمَرْءُ فَابِدَتِي وَمَالِي ... وَتَقْوَى اللَّهِ أَفْضَلُ مَا اسْتَفَادَا
'মানুষ, সে তো কতকিছুই চায়, আল্লাহ যা চান, তা-ই সে শুধু পায়। মানুষ বলল, 'আমার ধন, এই তো আমার চাওয়া!' অথচ কিনা তাকওয়া হলো সবচেয়ে বড় পাওয়া।”[৫]
তাই খেয়াল রাখুন আপনি তাকওয়াবান, নাকি সীমালঙ্ঘনকারী উদাসীন। নেককার পূর্বসূরিদের মতো আপনি আল্লাহকে ভয় করেন, নাকি পেছনে পড়ে থাকেন?

টিকাঃ
[১] আল্লামা ফিরোজাবাদি; বাসাইরু যাওয়িত তামীয, ২/১১৫
[২] মুহাম্মাদ সায়্যিদ তানতাবি; তাফসীরুল ওয়াসীত, ১/৪০। সূরা বাকারা ২:১-৫ এর ব্যাখ্যায়।
[৩] সালিহ শামী; সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ, ১/৪২১।
[১] সূরা যিলযাল ৯৯ : ৭-৮
[২] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ২/১৯। নুআইম ইবনু হাম্মাদের যোগকৃত অতিরিক্ত অংশে বর্ণনাটি রয়েছে।
[৩] তাফসীরু ইবনি কাসীর (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ), ১/৭৪। সূরা বাকারা ২:২ এর ব্যাখ্যায়।
[৪] প্রাগুক্ত। ইবনু আবি হাতিমের উদ্ধৃতিতে।
[১] সূরা আল ইমরান ৩: ১০২
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ২/৭৪।
[৩] বায়হাকী, যুহদুল কাবীর, ৯৬৩।
[১] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৭৫। সূরা বাকারা ২:৩ এর ব্যাখ্যায়। তাফসীরু কুরতুবী (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ), ১/১৬২। একই আয়াতের ব্যাখ্যায়।
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৭۴। সূরা বাকারা ২:২ এর ব্যাখ্যায়।
[৩] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৭/২৮৪।
[৪] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ১৩৪৩। তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৬/৩৩৫। সূরা আহযাব ৩৩:১ এর ব্যাখ্যায়।
[৫] বায়হাকী, যুহদুল কাবীর, ৯৬৪।
[৬] ইবনু রজব হাম্বলি; জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/৩৯৮। ১৮ নং হাদিসের ব্যাখ্যায় (শাইখ শুআইব আল আরনাউত সম্পাদিত)। গ্রন্থকার এখানে ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[১] বায়হাকী, যুহদুল কাবীর, ৮৯৮।
[২] সূরা আল-আনআম ৬: ৩২
[৩] আব্দুল কারিম কুশাইরি; রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যাহ, ১/২৮৮। গ্রন্থকার নাসরাবাদি লিখেছেন। মূলত নাসরাবাযি হবে।
[৪] তাফসীরু কুরতুবী, ১/১৬২। সূরা বাকারা ২:৩ এর ব্যাখ্যায়।
[৫] প্রাগুক্ত। মূল বর্ণনা রয়েছে: ইবনু আব্দিল বার; আল-ইসতিআব, ৪/৫৪৮ [আবুদ দারদা : ২৯৪০]।

শাব্দিক অর্থ: ফিরোজাবাদি বলেন, “'تقوی' (তাকওয়া) ক্রিয়াপদটির তিন বর্ণের মূল ধাতুর অর্থ হলো নিজেকে পাপাচার হতে রক্ষা করা, নিষিদ্ধ কাজ হতে সুরক্ষিত রাখা।”[১]
শাইখ মুহাম্মাদ তানতাবি-এর মতে, “'متق' মুত্তাকির বহুবচন 'متقون' মুত্তাকুন। ক্রিয়াপদ 'تقی।' ইত্তাকা (সে নিরাপত্তা লাভ করল) থেকে এসেছে ক্রিয়া- বিশেষ্য মুত্তাকি। ইত্তাকা এসেছে ক্রিয়ামূল 'وق' ওয়াকা থেকে, যার অর্থ 'ক্ষতিকর জিনিস থেকে সে নিজেকে রক্ষা করল।”[২]।
পারিভাষিক (শারঈ) অর্থ: আলি বলেন, “তাকওয়া মানে (এই চারটি গুণের সমন্বয়)-সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ভয় করা, ওহির আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং বিচার-দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।”[৩]
আবুদ দারদা বলেছেন, “পরিপূর্ণ তাকওয়া হলো আল্লাহকে এই পরিমাণ ভয় করা যে, সরিষা দানা পরিমাণ গুনাহ থেকে তো বাঁচবেই, সন্দেহজনক হালাল বিষয় থেকে ও বিরত থাকবে। এ কথারই নিগূঢ় অর্থমর্ম ওঠে এসেছে (কুরআনের) এই আয়াত দুটিতে : فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ * “অতএব, যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করেছে, সে তা দেখবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করেছে, সেও তা দেখবে।”[১],[২]
তাই অবহেলা করে কোনো নেক আমলই ছেড়ে দিয়ো না। আবার কোনো বদ আমলকেই ছোট ভেবে তাতে জড়িয়ে পড়ো না।”
ইবনু আব্বাস বলেন, “তাকওয়াবান ব্যক্তি বলতে সেসব মুমিনদেরকে বোঝায়, যারা শিরক থেকে নিজেদের বিরত রাখে।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা সঠিক পথের নির্দেশনা অনুসরণ করতে কোনো ভুল হয়ে যায় কি না, এ নিয়ে তারা শঙ্কিত থাকে। আবার আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁর দয়ার ব্যাপারেও আশাবাদী থাকে।”[৩]
শাকীক ইবনু সালামাহ রহ. বর্ণনা করেন, মুআয ইবনু জাবাল বলেন, “বিচার-দিবসে ঘোষণা করা হবে, 'তাকওয়াবান ব্যক্তিরা কোথায়?' রহমানের আরশের ছায়া থেকে তারা উঠে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাদের কাছে অদেখা থাকবেন না।” (শাকীক রহ. বলেন,) আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাকওয়াবান কারা? তিনি উত্তর দিলেন, “যারা শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকে এবং দ্বীনকে আল্লাহ তাআলার জন্য একনিষ্ঠ করে নেয়।” [৪] يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ) “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সেভাবেই ভয় করো, যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা (পরিপূর্ণ) মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না"[১]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু মাসউদ বলেন, “এর অর্থ তাঁকে মান্য করা, তাঁর অবাধ্যতা না করা, তাঁকে স্মরণ করা, ভুলে না যাওয়া, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, অকৃতজ্ঞ না হওয়া।”[২]
আবু হুরায়রা -কে তাকওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি প্রশ্নকারীকে পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি কখনো কাঁটাভরা পথে হেঁটেছেন?” লোকটি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিল। আবু হুরায়রা জানতে চাইলেন যে, কীভাবে হেঁটেছেন। লোকটি বলল, “কাঁটা চোখে পড়লে সতর্ক হয়ে গেছি, যাতে কাঁটার ওপর পা না পড়ে যায়।” আবু হুরায়রা বললেন, “তাকওয়ার অর্থ এটাই (গুনাহ থেকে সতর্ক হয়ে পথচলা)।”[৩]
আব্বাসী খলিফা ও বিশিষ্ট কবি আব্দুল্লাহ ইবনুল মু'তায (২৪৭-২৯৬ হিঃ) এই বিষয়টি এভাবে বলেছেন,
خَلِ الذُّنُوْبَ صَغِيْرَهَا ... وَكَبِيْرَهَا فَهُوَ التَّقَى وَاصْنَعْ كَمَاشٍ فَوْقَ أَرْضِ ... الشَّوْكِ يَحْذَرُ مَا يَرَى لَا تَحْقِرَنَّ صَغِيرَةً ... إِنَّ الْجِبَالَ مِنَ الْحَصَى
পথের কাঁটা দেখতে পেয়ে পথিক যেমন সতর্ক রয়, ছোট-বড় পাপ দেখে ঠিক এমনিভাবে বাঁচতে (তাকওয়া) হয়।
ছোট বলে তা যেন আর অবহেলার পাত্র নয়, ছোট ছোট পাথরকণা মিলেই তো ওই পাহাড় হয়।
কুরতুবি এবং ইবনু কাসীর বলেছেন যে, এটি ইবনুল মু'তাযের রচনা।[১]
হাসান বাসরি বলেন, “তাকওয়াবান ব্যক্তিরা আল্লাহ তাআলার হারামকৃত বিষয় থেকে বিরত থাকে এবং তাঁর আদেশসমূহ মেনে চলে। এমনকি সন্দেহজনক অনেক হালাল বস্তুও তারা পরিত্যাগ করে।”[২]
সুফইয়ান সাওরি-এর ভাষায়, “তাদেরকে আলাদা করে ‘(আল্লাহ)ভীরু’ ডাকার কারণ হলো, সাধারণত যেসব বিষয় নিয়ে কেউ ভয় করে না, তারা সেগুলোর ব্যাপারেও ভীত থাকে।”[৩]
তালক ইবনু হাবিব-এর মতে, “তাকওয়া হলো আল্লাহ তাআলার পুরস্কার ও শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহর দেয়া অন্তর্দৃষ্টি খোলা রেখে তাঁকে মান্য করা ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা।”[৪]
উমার ইবনু আব্দুল আযীয বিষয়টি বলেছেন এভাবে, “দিনে সিয়াম পালন করা আর রাতে তাহাজ্জুদ পড়াকেই তাকওয়া বলে না। বরং তাকওয়া হলো আল্লাহ তাআলার নিষেধকৃত বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর আদেশ মান্য করা। যাকে এর চেয়েও উঁচু পর্যায়ের (আনুগত্যের) সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সে কল্যাণের ওপর কল্যাণ লাভ করেছে।”[৫]
ইবনু রজব বলেন, “তাকওয়া হলো আল্লাহ তাআলার ক্রোধ ও শাস্তি থেকে বাঁচার ঢাল। আর এই ঢাল হলো হলো আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। পরিপূর্ণ তাকওয়ার দাবি হলো—ফরযের পাশাপাশি নফল আমল করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার সাথে সাথে মাকরুহ ও সন্দেহজনক জিনিসও পরিত্যাগ করা। এটিই তাকওয়ার চূড়ান্ত রূপ।”[৬]
সাহাল ইবনু আব্দুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ ছাড়া কোনো সাহায্যকারী নেই, আল্লাহ তাআলার রাসূল ছাড়া নেই কোনো পথপ্রদর্শক। তাকওয়া ছাড়া কোনো রিযিক নেই, আর তাকওয়া দৃঢ় করা ছাড়া কোনো আমল নেই। তাকওয়া সুদৃঢ় রাখতে চাইলে সকল গুনাহ থেকে বাঁচতেই হবে।”[১]
আল্লামা আবুল কাসিম নাস্রাবাযি'র ভাষ্য অনুযায়ী, “তাকওয়া দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে দুনিয়ার মোহ উবে যায়। আল্লাহ বলেন,
وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ *
'আর তাকওয়াবানদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়। তোমরা কি বোঝো না?'”[২][৩]
ইমাম কুরতুবী বলেন, “সকল ভালোর সমষ্টিই তাকওয়া। পূর্বের ও পরের সকল প্রজন্মের প্রতি এটিই আল্লাহ তাআলার হুকুম।[৪]
আবুদ দারদা কেন কাব্যচর্চার সাথে জড়িত হন না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান:
يُرِيدُ الْمَرْءُ أَنْ يُؤْتَى مُنَاهُ ... وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا مَا أَرَادَا يَقُولُ الْمَرْءُ فَابِدَتِي وَمَالِي ... وَتَقْوَى اللَّهِ أَفْضَلُ مَا اسْتَفَادَا
'মানুষ, সে তো কতকিছুই চায়, আল্লাহ যা চান, তা-ই সে শুধু পায়। মানুষ বলল, 'আমার ধন, এই তো আমার চাওয়া!' অথচ কিনা তাকওয়া হলো সবচেয়ে বড় পাওয়া।”[৫]
তাই খেয়াল রাখুন আপনি তাকওয়াবান, নাকি সীমালঙ্ঘনকারী উদাসীন। নেককার পূর্বসূরিদের মতো আপনি আল্লাহকে ভয় করেন, নাকি পেছনে পড়ে থাকেন?

টিকাঃ
[১] আল্লামা ফিরোজাবাদি; বাসাইরু যাওয়িত তামীয, ২/১১৫
[২] মুহাম্মাদ সায়্যিদ তানতাবি; তাফসীরুল ওয়াসীত, ১/৪০। সূরা বাকারা ২:১-৫ এর ব্যাখ্যায়।
[৩] সালিহ শামী; সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ, ১/৪২১।
[১] সূরা যিলযাল ৯৯ : ৭-৮
[২] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ২/১৯। নুআইম ইবনু হাম্মাদের যোগকৃত অতিরিক্ত অংশে বর্ণনাটি রয়েছে।
[৩] তাফসীরু ইবনি কাসীর (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ), ১/৭৪। সূরা বাকারা ২:২ এর ব্যাখ্যায়।
[৪] প্রাগুক্ত। ইবনু আবি হাতিমের উদ্ধৃতিতে।
[১] সূরা আল ইমরান ৩: ১০২
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ২/৭৪।
[৩] বায়হাকী, যুহদুল কাবীর, ৯৬৩।
[১] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৭৫। সূরা বাকারা ২:৩ এর ব্যাখ্যায়। তাফসীরু কুরতুবী (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ), ১/১৬২। একই আয়াতের ব্যাখ্যায়।
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৭۴। সূরা বাকারা ২:২ এর ব্যাখ্যায়।
[৩] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৭/২৮৪।
[৪] আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; কিতাবুয যুহদ, ১৩৪৩। তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৬/৩৩৫। সূরা আহযাব ৩৩:১ এর ব্যাখ্যায়।
[৫] বায়হাকী, যুহদুল কাবীর, ৯৬৪।
[৬] ইবনু রজব হাম্বলি; জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/৩৯৮। ১৮ নং হাদিসের ব্যাখ্যায় (শাইখ শুআইব আল আরনাউত সম্পাদিত)। গ্রন্থকার এখানে ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[১] বায়হাকী, যুহদুল কাবীর, ৮৯৮।
[২] সূরা আল-আনআম ৬: ৩২
[৩] আব্দুল কারিম কুশাইরি; রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যাহ, ১/২৮৮। গ্রন্থকার নাসরাবাদি লিখেছেন। মূলত নাসরাবাযি হবে।
[৪] তাফসীরু কুরতুবী, ১/১৬২। সূরা বাকারা ২:৩ এর ব্যাখ্যায়।
[৫] প্রাগুক্ত। মূল বর্ণনা রয়েছে: ইবনু আব্দিল বার; আল-ইসতিআব, ৪/৫৪৮ [আবুদ দারদা : ২৯৪০]।

📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ২. কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্যে তাকওয়ার মাহাত্ম্য

📄 ২. কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্যে তাকওয়ার মাহাত্ম্য


কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَّفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرٌۢ بِمَا تَعْمَلُونَ
“হে বিশ্বাসীরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া অর্জন করো)। আর প্রত্যেকে যেন খেয়াল রাখে যে, সে আগামীর জন্য কী প্রেরণ করেছে। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত।”[১]

• আল্লাহকে ভয় করার ব্যাখ্যা ইমাম কুরতুবি (রহঃ) দিয়েছেন এভাবে—তাঁর বেঁধে দেওয়া সীমাকে সমীহ করা, আদেশ পূর্ণ করা এবং পাপ থেকে বিরত থাকা। 'আগামী' বলতে এই আয়াতে বোঝানো হয়েছে পরকালকে। অত্যাসন্ন যেকোনো কিছু বোঝাতেও আরবিতে 'আগামীকাল' এর প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়। [২]

জাহিলি যুগের কবি কুরাদ ইবনু আজদা' বলেন, فَإِنْ يَكُ صَدْرُ هَذَا الْيَوْمِ وَلَّى ... فَإِنَّ غَدًا لِنَاظِرِهِ قَرِيبُ
“আজকের দিন ভালোয় ভালোয় কাটুক প্রসন্ন, চেয়ে দেখো ওই, আগামীকাল অত্যাসন্ন।”[১]

• হাসান বাসরি ও কাতাদা বলেন, কিয়ামাতকে 'আগামীকাল' বলার মাধ্যমে এর নৈকট্য বোঝানো হচ্ছে। যেন সত্যি সত্যিই আগামীকাল কিয়ামাত হয়ে যাবে। আগামীর জন্য প্রেরিত জিনিস হলো মানুষের পুণ্য কিংবা পাপকাজ।

আয়াতে 'আল্লাহকে ভয় করা' তথা তাকওয়া অবলম্বনের আদেশটি পুনরাবৃত্তি করার কারণ আছে। এভাবে পুনরাবৃত্তি করা হয় গুরুত্ব বোঝানোর উদ্দেশ্যে। আবার দুটি জায়গায় আলাদা দুটি অর্থও হতে পারে। অনেকের মতে প্রথম 'ভয়ে'র অর্থ অতীত পাপের অনুশোচনা আর দ্বিতীয়টির অর্থ ভবিষ্যতে পাপ পরিহারের প্রত্যয়।[২]

• ইমাম ইবনু কাসীর ব্যাখ্যা দেন, “আল্লাহ তাঁকে ভয় করার আদেশ করেছেন। তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এই ভয় করার অন্তর্ভুক্ত। 'প্রত্যেকে যেন দেখে (বা খেয়াল রাখে)' বলতে বোঝানো হয়েছে কিয়ামাতের দিন হিসেব হওয়ার আগে নিজেই নিজের কাজকর্মের হিসেব নেওয়া। আল্লাহ তাআলার কাছে উপস্থাপনের আগেই নেক আমলের বিনিয়োগের পরিমাণ দেখে নেওয়া।”[৩]

• ইবনুল কাইয়িম বলেন, “নিজের আমলের হিসাব নেওয়ার গুরুত্ব বোঝা যায় এই আয়াত থেকে।”[৪]

আরেক আয়াতে এসেছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ )
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সেভাবেই ভয় করো, যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা (পরিপূর্ণ) মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না”[৫]

• ইবনু মাসউদ এই আয়াতের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা তো আগে উল্লেখ করাই হলো। এখন ইবনু আব্বাস এর ব্যাখ্যায় কী বলেছেন, তা দেখা যাক,
“যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো' এই কথা দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার রাস্তায় সেভাবেই চলতে হবে, যেভাবে চলা উচিত। এ ব্যাপারে কারও সমালোচনার পরোয়া করা যাবে মোহনীয় না। আপনজনের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও থাকতে হবে ন্যায়ের সাথে। আর '... যেন তোমাদের মৃত্যু না হয়' অংশটুকু দিয়ে বোঝানো হয়েছে সুস্বাস্থ্য-অসুস্থতা সকল অবস্থায় ইসলাম পালন করা। জীবদ্দশায় এভাবে চললে মৃত্যুও হবে এরকমই।”[১]

• সাইয়িদ কুতুব বিষয়টি তুলে ধরেন এভাবে, “আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য সমীহ বা ভয় আসলে সীমাহীন। তাই অন্তর যেন সাধ্যের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করে যায়। হৃদয় যতক্ষণ তাকওয়া লাভের অভিযানে একদম ডুবে থাকবে, ততক্ষণই সে নতুন নতুন গভীরতা ও দিগন্তের সন্ধান পেতে থাকবে। এমনই গভীরতা ঈমানের। এটিই তাকওয়া। আর তাকওয়ার চূড়ান্ত (স্তর) হলো অন্তিম মুহূর্তেও আল্লাহ তাআলার জন্যই বিলীন হয়ে থাকা। এমন তাকওয়া এক মুহূর্তের জন্যও নড়বড় হয় না, বা হড়কে যায় না।”[২]

আরেকটি আয়াত,
وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَإِيَّاكُمْ أَنِ اتَّقُوا اللَّهَ
“আর আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন। তোমাদের পূর্বে যাদেরকে আমি কিতাব দান করেছিলাম তাদেরকে এবং তোমাদেরকেও আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলাম।”[৩]

• ইবনু কাসীর বলেন, “পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবেও আল্লাহ তাআলা তাকওয়া অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। একই আদেশ আমাদের প্রতিও বলবৎ আছে।”[১]

• সাইয়িদ কুতব বলেন, “আল্লাহ তাআলার ভয় থাকলে অন্তরের সংশোধন একেবারে নিশ্চিত। আল্লাহ আমাদের এই উপদেশ দিয়েছেন—যাতে করে প্রয়োজন ও বিপদের সময় তিনি আমাদেরকে সাহায্য ও সুরক্ষা দিতে পারেন। নতুবা তিনি তো আমাদের উচ্ছেদ করে নতুন মানবজাতি নিয়ে আসতে সক্ষম। তিনি চান, মানুষ যেন নিজেদের কল্যাণ ও উন্নতির জন্যই আল্লাহকে ভয় করে।”[২]

আরও একটি আয়াত,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ))
“হে ঈমানদাররা, তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার- পরিজনকে (জাহান্নামের) ও সন্তান-সন্ততিকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো-যার জ্বালানি হবে মানুষ এবং পাথর। সেখানে রুঢ় স্বভাব ও কঠোর হৃদয়ের ফেরেশতারা নিয়োজিত থাকবে যারা কখনো আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অমান্য করে না এবং তাদেরকে যে নির্দেশ দেওয়া হয় তা-ই পালন করে।”[৩]

• আলি বলেন, “নিজেকে রক্ষা করতে হবে নিজের নেক আমলের মাধ্যমে আর পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে হবে উপদেশের মাধ্যমে।”[৪]

• কাতাদা বলেন, “আল্লাহ তাআলার বাণীর মাধ্যমে পরিবারকে আদেশ করতে হবে। নিষেধ করতে হবে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার ব্যাপারে। আর এই উভয় কাজে তাদেরকে সাহায্যও করতে হবে। তারা অবাধ্য হলে ফিরিয়ে আনতে হবে ধমক ও বাধা দিয়ে।”[৫]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বিস্তারিতভাবে বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীরা, তোমরা নিজেদেরকে, সংসার-সঙ্গীকে ও সন্তান-সন্ততিদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আগুন থেকে রক্ষা করো। আর তা করার উপায় হলো নিজে গুনাহ থেকে বাঁচা ও নেক আমল করা এবং পরিবারকে এসবের শিক্ষা দেওয়া।” [১]

• সাইয়িদ কুতুব বলেন এরকম, “পরিবারের ব্যাপারে মুমিনের কাঁধে যে দায়িত্ব, তা সত্যিই ভারী ও ভয়ংকর। সামনেই আগুন তার অপেক্ষায়। পরিবার নিয়ে এটি পার করে যেতে হবে। নিজেকে তো বাঁচাতে হবেই, পরিবারের কেউ যেন পড়ে না যায়, সেদিকেও চোখ খোলা রাখতে হবে। এর জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। এখানে মানুষকে পাথরের সমপর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। যন্ত্রণা আর লাঞ্ছনার সমন্বয়ে গড়া এ শাস্তি কতই না ভয়ানক! সময় শেষ হওয়ার আগেই তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার মুমিনের কাঁধে।” [২]

আরেকটি আয়াত,
وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ
"আর তোমরা নিজেদের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করো, কেননা তাকওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আর তোমরা আমাকে ভয় করো, হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা।”[৩]

• ইবনু কাসীর ব্যাখ্যা করেন, "দুনিয়ার পাথেয় সম্পর্কে তো জানানোই হয়েছে, তাই আল্লাহ এখানে আখিরাতের পাথেয় তথা তাকওয়ার ব্যাপারে জানিয়ে দিলেন। অনুরূপ আরেক আয়াতে আছে,
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ
'হে আদম সন্তান, তোমাদের লজ্জাস্থানগুলো ঢাকার এবং তোমাদের দেহের সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বিধানের উদ্দেশ্যে আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।[১]
বাহ্যিক পোশাকের কথা বলার পর আল্লাহ দিলেন অন্তরের পোশাকের সন্ধান। সাথে এ-ও বলে দিলেন, বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অন্তরের তাকওয়া কত উত্তম।”

• নবিযুগের জাহিলি কবি আশা ইবনু ছা'লাবাহ কায়সী নবিজির প্রশংসায় লেখা কবিতায় বলেন,
إِذْ أَنْتَ لَمْ تَرْحَلْ بِزَادٍ مِنَ التَّقَى ... وَلَا قَيْتَ بَعْدَ الْمَوْتِ مَنْ قَدْ تَزَوَّدَا نَدِمْتَ عَلَى أَلَّا تَكُونَ كَمِثْلِهِ ... وَأَنَّكَ لَمْ تَرْصُدْ كَمَا كَانَ أَرْصَدًا
ছন্নছাড়া ক্লান্ত পথিক বেশে, পাথেয় ছাড়া পথ ভ্রমণে এসে দেখবে যখন পাথেয়সহ কেউ, জাগবে মনে অনুতাপের ঢেউ।[৩]

• আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ হারিরি রহ. বলেন, আমি সিরিয়ার ঈলা শহরের এক কবর ফলকে লিপিবদ্ধ নিচের পঙক্তিমালা পাঠ করি,
الْمَوْتُ بَحْرُ طَامِحُ مَوْجُهُ ... تَذْهَبُ فِيْهِ حِيْلَةُ السَّابِخِ يَا نَفْسُ إِنِّي قَائِلٌ فَاسْمَعِي ... مَقَالَةٌ مِنْ مُشْفِقٍ نَاصِحِ لَا يَصْحَبُ الْإِنْسَانَ فِي قَبْرِهِ ... غَيْرَ التَّقَى وَالْعَمَلِ الصَّالِحِ
মরণ যেন সাগরসম, লহরী তার সর্বগ্রাসী সাঁতারুর সব পাথেয় গিলেতো হয় সে ভয়াল সর্বনাশী। হে আমার নফস, শুনে যাও এক শুভাকাঙ্ক্ষীর কথা আমলনামা হোক তাকওয়া ভরা, হোক না কবর যথা-তথা।[১]

অপর আয়াত, وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ “যেদিন তোমরা আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসবে, সেদিনের অপমান ও বিপদ থেকে বাঁচো। সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জিত সৎকর্মের ও অপকর্মের (ভালো ও মন্দ) উপার্জনের (যথাযথ) পুরোপুরি প্রতিদান দেওয়া হবে এবং কারও ওপর কোনো যুলুম করা হবে না।”[২]

• ইবনু কাসীর এর ব্যাখ্যায় বলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপদেশ দিচ্ছেন পৃথিবীর সমাপ্তি ও আখিরাতের অবশ্যম্ভাবিতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে। বর্ণিত আছে যে, এটিই সর্বশেষ নাযিলকৃত কুরআনের আয়াত। এটি নাযিল হওয়ার পর নবি মাত্র নয় রাত বেঁচে ছিলেন।”[৩]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সেই ভয়ানক দিনের ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছেন, যেদিন সৎকর্ম ছাড়া বাকি সবই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। ওহির ধারা সমাপ্ত হয় এই ব্যাপক অর্থবোধক আয়াতের মাধ্যমে।”
আর এই (কুরআন নাযিলের ধারা) সমাপ্ত হয়েছে তাকওয়ার প্রসঙ্গ আলোচনার মধ্য দিয়ে। [৪]

অন্য আয়াত,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ “হে বিশ্বাসীরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।”[১]

• ইবনু কাসীর বলেন, “সত্যবাদী হও এবং এ স্বভাব আঁকড়ে ধরে থাকো। এভাবেই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এতে ধ্বংস থেকে নিস্তার পাওয়া যায়, খুলে যায় সুযোগ-সুবিধার দুয়ারগুলো।” [২]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বলেন, “এর অর্থ প্রতিটি কথা ও কাজে আল্লাহ তাআলার (বিধি-নিষেধের) ব্যাপারে সচেতন থাকা। আর নিয়ত ও কাজের মাধ্যমে ঈমান সংশোধনকারী সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।”[৩]

আরেকটি আয়াত,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ “হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। নিশ্চয় কিয়ামাতের প্রকম্পন বড় ভয়ানক একটি ব্যাপার।”[৪]

• শাইখ আলী আস-সাবুনি বলেন, “এটি সমগ্র মানবজাতির প্রতি সম্বোধন। আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলো। কিছু আলিম তাকওয়াকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে, 'আল্লাহ যেন তোমাকে তাঁর নিষেধকৃত স্থানে উপস্থিত না দেখেন এবং তাঁর আদিষ্ট স্থানে অনুপস্থিত না পান।'”[৫]

আসলে এ ব্যাপারে আরও অনেক আয়াত তুলে আনা যায়। তবে উল্লেখিত কয়েকটি আয়াত থেকেই এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহ আমাদেরকে অসার কার্যকলাপের জন্য সৃষ্টি করেননি। আমাদের জীবনের একটি উদ্দেশ্য আছে।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“নিশ্চয় আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য।"[১]

গন্তব্যহীন যাত্রায় পাথেয় অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু যে সফরের গন্তব্য আছে, সে পথের জন্য পাথেয় আবশ্যক। আল্লাহ তাআলার নৈকট্য এবং তাঁর জান্নাতের আনন্দ যাদের লক্ষ্য, তাকওয়া তাদের পাথেয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল -এর মুখ দিয়েও তাকওয়া অর্জনের আদেশ শুনিয়েছেন。

আবু যর গিফারি থেকে বর্ণিত আছে নবি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
اتَّقِ اللَّهِ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ
"তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো। গুনাহ হয়ে গেলে এর পরপরই (কোনো) নেক আমল করে নাও। আর মানুষের সাথে সদাচরণ করো।"[২]

ইরবায ইবনু সারিয়াহ বর্ণনা করেন, “নবি একদিন এমন এক খুতবা দিলেন যে, আমাদের অন্তর প্রকম্পিত আর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আমরা বললাম (কিংবা তারা বলল), 'হে আল্লাহর রাসূল , এ যেন বিদায়ী বক্তৃতার মতো শোনাল। আমাদের কিছু উপদেশ দিয়ে যান তা হলে।' তিনি বললেন,
أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشُ مِنْكُمْ يَرَى بَعْدِى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ وَعَضُوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
আমি তোমাদের উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় (তাকওয়া অবলম্বন) করো। কোনো দাসও যদি আমির হিসেবে নিযুক্ত হয়, তাকে মান্য করো। আমার পর বেঁচে থাকলে তোমরা অনেক ফিতনা দেখতে পাবে। কাজেই আমার সুন্নাহ (পথ) ও সুপথপ্রাপ্ত খলীফাদের পথ আঁকড়ে ধরে থেকো। রীতিমতো মাড়ির দাঁতে সেগুলো কামড়ে ধরে পড়ে থেকো। আর দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয় (বিদআত) থেকে দূরে থাকবে। কারণ এ-সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় পথভ্রষ্টতা।”[১]

• আবু সাঈদ খুদরি বলেন, নবি বলেন, إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَابِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ “নিশ্চয়ই দুনিয়া সুমিষ্ট শ্যামল (সুস্বাদু দর্শনীয় ও) আল্লাহ তা'আলা সেখানে তোমাদের খলীফা হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখতে চান যে, তোমরা কী কর? অতএব তোমরা দুনিয়া ও নারী থেকে সাবধান থাকো। কেননা বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম ফিতনা দেখা দিয়েছিল নারীকে কেন্দ্র করেই।”[২]

আরেক বর্ণনায় এসেছে নবি বলেন, لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيُّ “মুমিন ছাড়া আর কারও সঙ্গ গ্রহণ কোরো না। আর মুত্তাকি ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ যেন তোমার খাবারে শরিক না হয়।”[৩]

নবি নিজের জন্যও তাকওয়া অর্জনের দুআ করতেন। ইবনু মাসঊদ বলেন, নবিজি দুআ করতেন এভাবে, اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتَّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পথনির্দেশ (হিদায়াত), তাকওয়া (আপনার ভয়), চারিত্রিক পবিত্রতা ও সচ্ছলতা কামনা করছি।”[৪]

তাকওয়ার এমন বিশেষ গুরুত্বের কারণেই সাহাবিরা এটি অর্জনে ব্যস্ত থাকতেন ও পরস্পরকে এ ব্যাপারে তাগাদা দিতেন। আসলে উম্মাতের মধ্যে দুনিয়া-আখিরাতের পাথেয়র বাস্তবতা তাঁদের চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে!

টিকাঃ
[১] সূরা হাশর ৫৯ : ১৮
[২] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/৪৩।
[১] প্রাগুক্ত। ইমাম কুরতুবী পঙক্তিটি ইমাম গাযালীর ফারাইদুল লাআলী হতে উদ্ধৃত করেছেন। তবে পঙ্কতিটি কবি কুরাদ ইবনু আজদা'র। আমরা এখানে পুরো পঙক্তিটি তুলে ধরেছি। দেখুনঃ মু'জামুশ শুআরাইল আরব, ৮৭৮। আলী ইবনু মাহদির মুখে এই পঙক্তি পাঠের বর্ণনা পাওয়া যায়। বায়হাকী; শুআবুল ঈমান, ৯৫৫০।
[২] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/৪৩।
[৩] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/১০৫,১০৬।
[৪] ইগাসাতুল লাহফান, ১/৮৪।
[৫] সূরা আল ইমরান ৩: ১০২
[১] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ২/৭৫।
[২] তাফসীরু ফী যিলালিল কুরআন, ৩/১৪৬,৪৭। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[৩] সূরা আন-নিসা ۴: ১৩১
[১] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ২/৩৮২
[২] তাফসীরু ফী যিলালিল কুরআন, ৪/৩৪৪,৪৫। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[৩] সূরা আত-তাহরীম ৬৬: ০৬
[৪] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/১৯৪।
[৫] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/১৮৮।
[১] সফওয়াতুত তাফাসীর (দারুস সাবুনি, কায়রো), ৩/৩৮৬।
[২] তাফসীরু ফী যিলালিল কুরআন, ২০/২৯০। গ্রন্থকার ভাবার্থ তুলে ধরেছেন।
[৩] সূরা আল-বাকারাহ ২: ১৯৭
[১] সূরা আল-আ'রাফ ৭ : ২৬
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৪০৮।
[৩] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/১৯৪। মূল বর্ণনা রয়েছেঃ সীরাতু ইবনি হিশাম, ১/৩৮৮। কবি আ'শা অবশ্য ইসলাম গ্রহণ করেননি। ইসলামে মদ্যপান হারাম শুনে ইসলাম গ্রহণ না করে ফিরে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন।
[১] তাফসীরু কুরতুবী, ১৮/১৯৪। মূল বর্ণনা রয়েছে: ইবনু আবিদ দুনিয়া, কিতাবুল কুবুর, ২২৫।
[২] সূরা আল-বাকারা ২ : ২৮১
[৩] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ১/৫৫৭,৫৫৮। তবে সর্বশেষ নাযিল হওয়া আয়াত নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এই মতটি জমহুর আলিমদের মত। তাছাড়া সর্বশেষ আয়াত নাযিলের পর রাসুল সা. কতদিন দুনিয়ার বুকে ছিলেন তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তন্মধ্যে নয় রাত ও একত্রিশ দিনের মত রয়েছে।
[৪] সফওয়াতুত তাফাসীর, ১/১৫৮,১৫৯。
[১] সূরা আত-তাওবা ৯: ১১৯
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৪/২০৪।
[৩] সফওয়াতুত তাফাসীর, ১/৫২৮।
[৪] সূরা আল-হাজ্জ ২২: ১
[৫] সফওয়াতুত তাফাসীর, ২/২৫৭।
[১] সূরা আয-যারিয়াত ৫১ : ৫৬
[২] সুনানু তিরমিযি, ১৯৮৭। মুসনাদু আহমাদ, ২১৩৫৪, ২১৪০৩। ইমাম আহমাদের সনদ হাসান লিগাইরিহি।
[১] মুসনাদু আহমাদ, ১৭১৪৪। সনদ সহিহ। সমার্থক বর্ণনা রয়েছে : সুনানু আবি দাউদ, ৪৬০৭। সুনানু তিরমিযি, ২৬৭৬。
[২] সহিহ মুসলিম, ২৭৪২। ই.ফা, ৬৬৯৭।
[৩] সুনানু আবি দাউদ, ৪৮৩২। সুনানু তিরমিযি, ২৩৯৫। মুসনাদু আহমাদ, ১১৩৩৭। সনদ হাসান।
[৪] সহিহ মুসলিম, ২৭২১।

📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ৩. তাকওয়া অর্জনে সালাফদের তাগিদ

📄 ৩. তাকওয়া অর্জনে সালাফদের তাগিদ


তাকওয়ার ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ছিলেন আমাদের নেককার পূর্বসূরি তথা সালফে সালিহীনগণ। একে অপরকে এ ব্যাপারে খুব বেশি বেশি তাগাদা দিতেন তাঁরা。

• আবু বকর রা. খুতবায় বলতেন, “তাকওয়া অবলম্বন করো আর যথাযথভাবে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করো। আশা ও আশঙ্কা এবং চেষ্টা ও দুআর মধ্যে সুষম সমন্বয় রাখো। যাকারিয়্যা আ.-এর প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ ۞
'তারা নেক কাজে দ্রুত অগ্রসর হতো এবং আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার প্রতি অতিশয় অনুগত।[১][২]

• আবু বকর রা. তাঁর মৃত্যুশয্যায় উমর রা.-কে ডাকিয়ে এনে কিছু পরামর্শ দেন। এর মধ্যে প্রথমটিই ছিল আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে।[৩]

• উমর রা. তাঁর ছেলের কাছে এক চিঠিতে লেখেন,
“আল্লাহকে ভয় করবে। কারণ তাঁকে ভয় করা মানে নিজেকে তাঁর শাস্তি থেকে নিরাপদ করে ফেলা। তাঁকে ঋণ দিলে তিনি তা পরিশোধ করে দেন। আর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হলে আরও বাড়িয়ে দান করেন। তাকওয়াকে করে নাও তোমার জীবনের লক্ষ্য আর হৃদয়ের প্রলেপ।”[১]

• এক যুদ্ধে নিযুক্ত সেনাপতিকে উদ্দেশ্য করে আলি উপদেশ দেন, “আল্লাহকে ভয় করবেন। তাঁরই কাছে আপনাকে ফিরে যেতে হবে, তিনিই আপনার অদ্বিতীয় গন্তব্য। দুনিয়া ও আখিরাতের তিনিই নিয়ন্ত্রক।”[২]

• উমর ইবনু আব্দুল আযীয এক ব্যক্তির কাছে চিঠিতে লিখেন, “আল্লাহভীতি অবলম্বন করুন। তাকওয়া ছাড়া কোনোকিছুই তিনি গ্রহণ করেন না। তাকওয়াবানদের তিনি দয়া দেখান, এরই ভিত্তিতে পুরস্কৃত করেন। মুখে মুখে অনেকেই তাকওয়ার কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে এর চর্চাকারীর সংখ্যা খুবই কম। আল্লাহ আমাদের সকলকে মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”[৩]

• উমর খলিফা হওয়ার পর একটি ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন, "আমি আপনাদেরকে তাকওয়া অবলম্বন ও সদাচরণের উপদেশ দিচ্ছি। কারণ তিনি (অর্থাৎ আল্লাহ) মুত্তাকী ও সদাচারীদের সাথেই রয়েছেন।”
হাজ্জের সফরে বেরোবার আগে এক লোক তাঁর কাছে কিছু উপদেশ চায়। উমর বলেন, “আল্লাহকে ভয় করো। যে তাঁকে ভয় করে, সে কখনো একাকিত্বে ভুগবে না।”[৪]

• শু'বা বলেন যে, কোনো সফরে বেরোবার সময় তিনি হাকাম -এর সাথে কথা বলে নিতেন। তিনি বলতেন, “মুআয -কে নবি যে কথার মাধ্যমে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমিও তোমাকে তা-ই দিচ্ছি। যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো। গুনাহ হয়ে গেলে নেক আমল করে নাও। আর মানুষের সাথে সদাচরণ করো।”[৫]

• জনৈক সালাফ তাঁর ভাইয়ের কাছে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন,
“আল্লাহকে ভয় কোরো। এটি সর্বোত্তম গুপ্তধন, সুন্দরতম প্রদর্শনীয় বস্তু আর সবচেয়ে দামি সম্পদ। আল্লাহ যেন আমাদের উভয়কে এটি অর্জনে ও এর সুফল লাভে সাহায্য করেন।”[১]

• আরেক ব্যক্তি নিজের ভাইকে চিঠিতে লিখেছেন,
“আমি তোমাকে এবং নিজেকে উপদেশ দিচ্ছি তাকওয়া অবলম্বন করার। দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোত্তম পাথেয় এটিই। একে বানিয়ে নাও প্রতিটি ভালো কাজের দিকে যাবার রাস্তা ও প্রতিটি মন্দ পথের বাধা। মুত্তাকীদের দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার ও কল্পনাতীত উৎস থেকে রিযক দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ।”[২]

• সিফফিনের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে কুফার বাইরে এক গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আলি। এমন সময় তিনি বললেন,
“একাকিত্বের বাসিন্দারা, অন্ধকার কবরের অধিবাসীরা! ওহে বিস্মৃত মাটি হয়ে যাওয়া মানুষেরা! তোমরা আমাদের আগে গিয়েছ, আমরা তোমাদের পরেই আসছি। তোমাদের ঘর? তাতে অন্যরা এসে থাকছে। তোমাদের সংসার-সঙ্গীরা? তারা বিয়ে করে নিয়েছে অন্যত্র। আর সম্পদ? সেগুলোর ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে। তোমাদের জন্য এই ছিল আমার কাছে খবরাখবর। আমাদের জন্য তোমাদের কাছে কী বার্তা আছে, বলো তো!”
এরপর আলি তাঁর বাহিনীর দিকে ফিরে বলেন,
“এদের যদি কথা বলার সামর্থ্য থাকত, তা হলে তারা বলত—তাকওয়াই সর্বশ্রেষ্ঠ পাথেয়।”[৩]

টিকাঃ
[১] সূরা আল-আম্বিয়া ২১: ৯০
[২] তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৫/৩২৫। মুসান্নাফু ইবনি আবি শায়বাহ, ৩৪৪৩১।
[৩] মুসান্নাফু ইবনি আবি শায়বাহ, ৩৭০৫৬。
[১] ইবনু কুতায়বা দিনওয়ারি; উয়ুনুল আখবার, ১/৩৫৭।
[২] মুসান্নাফু ইবনি আবি শায়বাহ, ৩৪৪৯৯।
[৩] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৫/২৬৭।
[৪] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৫/২৯৭।
[৫] মুসনাদু ইবনিল জা'আদ, ৩১২। মুআজ ইবনু জাবাল -এর বর্ণনাটি রয়েছে: মুসনাদু আহমাদ, ২২০৫৯। সনদ হাসান গরীব।
[১] আবু হাইয়্যান তাওহিদী; আল-বাসাইরু ওয়ায-যাখাইর, ২/১৪।
[২] ইবনু রজব হাম্বলি; জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ১/৪০৭।
[৩] আবু বকর দিনওয়ারী; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ২/১৪৮ [২৭৮]।

📘 তাকওয়া মুমিনের সম্বল 📄 ৪. মুত্তাকিদের গুণাবলি

📄 ৪. মুত্তাকিদের গুণাবলি


কুরআনের অসংখ্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের গুণাবলি জানিয়ে দিয়েছেন। কোমলতা, ভদ্রতা ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ হলো তাঁদের পরিচয়। এ সংক্রান্ত আয়াতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তারিত একটি হলো:
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوْا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ أَمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتٰبِ وَالنَّبِيِّينَ وَأَتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِى الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّابِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلُوةَ وَأَتَى الزَّكُوةَ وَالْمُوْفُوْنَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عُهَدُوا وَالصَّبِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِيْنَ الْبَأْسِ أُولَ بِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَ بِكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ
“তোমাদের মুখ (শুধু) পূর্ব দিকে বা পশ্চিম দিকে ফিরানোর মধ্যে কোনো পুণ্য নেই। বরং সৎকাজ হচ্ছে—আল্লাহ তাআলা, কিয়ামাত-দিবস, ফেরেশতা, আল্লাহ তাআলার অবতীর্ণ কিতাব ও নবিদের মনেপ্রাণে মেনে নেবে। এবং আল্লাহ তাআলার প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় ধন-সম্পদ—আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য ব্যয় করবে। আর সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করবে; এবং বিপদে-অনটনে ও সংগ্রামে সবর করবে, তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।”[১]

টিকাঃ
[১] সূরা আল-বাকারা ২: ১৭৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px