📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 আমাদের উপদেশ

📄 আমাদের উপদেশ


কুফর ও তাকফীরের মাসআলা দু'ধরনের আছে। এক. মুহকাম তথা বিরোধমুক্ত ও সুস্পষ্ট মাসআলা। যার ব্যাপারে অধিক ইজতিহাদ ও গবেষণার প্রয়োজন নেই। দুই. মুতাশাবিহ তথা বিরোধপূর্ণ মাসআলা। যা কিছু কারণে জটিলও বটে। যার ব্যাপারে ইজতিহাদের মাধ্যমে মূলনীতি ও নসসমূহের মাঝে প্রাধান্যদানের প্রয়োজন হয়। যাতে করে সঠিকভাবে শরীয়তসম্মত বিধান নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
তাকফীরের যে মাসআলাগুলো সুস্পষ্ট ও মুহকাম হবে, সেক্ষেত্রে বিশেষ ও সাধারণ উভয় শ্রেণীর লোকই মাসআলা বলতে পারবে এবং আল্লাহর হুকুম বর্ণনা করতে পারবে। তাদেরকে এক্ষেত্রে নিষেধ করা হবে না। বলা হবে না যে, “কাফেরদেরকে তাকফীর করা তোমার কাজ নয়, তাই এ থেকে বিরত থাকো; বরং এটি আলেমদের কাজ।” তাদেরকে এ ধরনের কথা বলা ভুল। এ কথাটি স্বয়ং এ হুকুমেরই বিপরীত যে, প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব তাগুতদেরকে কাফের বলা, তাদেরকে তাকফীর করা, তাদের পূজারিদেরকে তাকফীর করা এবং তাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করা।
একজন মুসলিম কীভাবে শরীয়ত কর্তৃক ওয়াজিব 'ওয়ালা বারা' তথা বন্ধুত্ব ও শত্রুতার আকীদা, তাগুতকে অস্বীকারের আকীদা ইত্যাদি প্রাণবন্ত রাখবে? অন্যদিকে কোনো মুসলিম আলেম না হওয়ার কারণে আমরা যদি তার উপর আবশ্যক করে দেই যে, সে কাউকে তাকফীর করতে পারবে না, সে তাদের তাকফীরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, কেননা কে কাফের কে মুসলিম- এ ব্যাপারে সে পার্থক্য করতে পারবে না! তাহলে সে তার ওয়াজিব দায়িত্বগুলো পালন করবে কীভাবে? বিষয়টি স্ববিরোধী হয়ে গেলো না?
আমরা কীভাবে চাইছি যে, একজন মুসলিম মিল্লাতে ইবরাহীমের আদর্শকে আঁকড়ে রাখবে? যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলছেন-
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَاءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَداً حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ.
“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলো, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।”৩৩৮
মোটকথা, স্পষ্ট কুফরীর ক্ষেত্রে তাকফীরের মূলনীতি সম্পর্কে জ্ঞাত যে কোনো সাধারণ ব্যক্তিই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, কে কাফের আর কে মুসলিম। এর জন্য প্রাজ্ঞ আলেম বা পণ্ডিত হওয়ার আবশ্যকীয়তা নেই।
আর যদি কুফর স্পষ্ট না হয়ে সন্দেহপূর্ণ হয়, যার বিভিন্ন দিক থাকে, একদিক থেকে কুফরীর সম্ভাবনা রাখে, অপরদিক থেকে কুফর না থাকার সম্ভাবনা রাখে, এ ধরনের সন্দেহপূর্ণ কুফরের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ, ফিকহ ও তাকওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। এ ধরনের অবস্থায় মূলনীতি ও নসসমূহ নিরীক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ মুসলিমদের নিকট আমাদের চাওয়া হলো, নিজেদের অজ্ঞতার কারণে আলেমদের নিকট জিজ্ঞাসা করা ব্যতীত এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হবে না। কারণ,
প্রথমত, সাধারণ মুসলমানগণ তাকফীর না করলে তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে না যে, এরকম কুফরে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে কেনো তোমরা স্বপ্রণোদিত হয়ে তাকফীর করলে না বা তাকফীর করার কাজে প্রবৃত্ত হলে না? তবে যার কুফরী স্পষ্ট, তাকে তাকফীর থেকে বিরত থাকা শরীয়ত বিরোধী কাজ।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের উপর কাজটি আবশ্যক নয়। কারণ, তাদের পক্ষ থেকে ভুল তাকফীর করার আশঙ্কা রয়েছে। এটি এমন ভুল, যার কারণে পদস্খলন ঘটবে এবং এ ভুলের কারণে এমন পরিণতির শিকার হবে, যার পরিণাম শুভ নয়। এটি তাদের জন্য কোনো কাফেরকে মুসলিম হিসেবে সাব্যস্ত করণের ক্ষেত্রে হওয়া ভুলের চাইতে আরো মারাত্মক। তাই আমরা বলতে পারি, যার অবস্থা অস্পষ্ট হবে, সেক্ষেত্রে সাধারণ লোকদেরকে অবশ্যই প্রাজ্ঞ আলেমদের নিকট যেতে হবে। আলেমদের আগে এ রকম মাসআলার ক্ষেত্রে কোনো হুকুম বা কথা বলা যাবে না।
হে আল্লাহর বান্দা! মনে রেখো, নিশ্চয় রোগাক্রান্ত দুর্বল নফসের অধিকারীরা সীমালঙ্ঘনে এক ধরনের মজা পায়। তেমনিভাবে ছাড়াছাড়ি ও ইরজায় কিছু লোক মজা পায়। এ দু'টিই দুর্বল নফসের অধিকারীদের জন্য শয়তানের তৈরি মাসলাক বা পদ্ধতি। তাই যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন, চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ির পথে এগুতে অক্ষম হয়; সে ইরজা, শিথিলতা ও ছাড়াছাড়ির পথে অগ্রসর হয় এবং নিজের জন্য একে সুশোভিত করে নেয়। আর যে ছাড়াছাড়ি ও ইরজার পথে অক্ষম হয়; সে সীমালঙ্ঘন, চরমপন্থা, বাড়াবাড়ির পথ বেছে নেয় এবং নিজের জন্য একে সুশোভিত করে নেয়। অন্যদিকে মধ্যপন্থার মানহাজ হলো সত্য কর্মপন্থা, যে পথকে আল্লাহ ভালোবাসেন ও যে পথের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। যা সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ির দিকে এবং ইরজা ও ছাড়াছাড়ির দিকে ঝুঁকে না। যে পথ অবলম্বন করা দুর্বল রোগাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য কঠিন হয়ে পড়ে এবং সুস্থ মনের অধিকারী মুমিনের কাছে পছন্দনীয় হয়ে থাকে। তারা না শয়তানের দোসরদের পথে হাঁটে আর না তার অনুসারীদের পথে।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে তাঁর পথে অবিচল রাখেন। আমাদের জীবনকে সুন্দর সমাপ্তি দান করেন। আমাদের সকলকে মধ্যমপন্থী ও ন্যায়পরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করেন। সকল ধরনের বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি, সীমালঙ্ঘন-শিথিলতা বাদ দিয়ে তাঁর হাবীব মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণের তাওফীক দেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রোতা, সদা নিকটবর্তী ও প্রার্থনা কবুলকারী।
وَصَلَّى اللهُ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ. وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

টিকাঃ
৩৩৮. সূরা মুমতাহিনা: ০৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00