📄 দলীল
আল্লাহ তাআলা বলেন- صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ. “তারা বধির, মূক এবং অন্ধ। ফলে তারা কিছুই বোঝে না।”৩১৬
আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِنْدَ اللَّهِ الصُّمُّ الْبُكْمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ. “নিঃসন্দেহে আল্লাহ নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় তারাই মূক ও বধির, যারা উপলব্ধি করে না।”৩১৭
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَيَجْعَلُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ.
“পক্ষান্তরে তিনি অপবিত্রতা আরোপ করেন, যারা বুদ্ধি প্রয়োগ করে না তাদের উপর।”৩১৮
আল্লাহ তাআলা বলেন- أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَكِنْ لَا يَعْلَمُونَ.
“মনে রেখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা, কিন্তু তারা তা বোঝে না।”৩১৯
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَطَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ.
“আর আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহে মোহর এঁটে দিয়েছেন। ফলে তারা জানতে পারে না।"৩২০
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيراً مِنَ الْجِنِّ وَالْأَنْسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ.
"আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না; তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না; তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং এদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।”৩২১
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ. “এবং মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে তাদের অন্তরসমূহের উপর। ফলে তারা বোঝে না।"৩২২.
আল্লাহ তাআলা বলেন- ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ. “এটা এজন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফের হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না।"৩২৩
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ. "কিন্তু মুনাফিকরা তো বোঝে না।”৩২৪
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ. "তারা আরো বলবে, হায়! যদি আমরা শুনতাম অথবা বুঝতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।”৩২৫ তারা স্বীকার করছে যে, তারা বুদ্ধি খাটায় না। যদি তারা বুদ্ধি খরচ করতো, তাহলে তাদের বুদ্ধি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে পথ দেখাতো এবং তারা জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতো না।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন-
قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ الْهُدَى أَوْ نَعْقِلُهُ، أَوْ لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ سَمَاعَ مَنْ يَعِي وَيُفَكِّرُ، أَوْ نَعْقِلُ عَقْلَ مَنْ يُمَيِّزُ وَيَنْظُرُ. وَدَلَّ هَذَا عَلَى أَنَّ الْكَافِرَ لَمْ يُعْطَ مِنَ الْعَقْلِ شَيْئًا.
অর্থাৎ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, (আয়াতের অর্থ হবে,) হায়! যদি আমরা হিদায়াতের বাণী শুনতাম! অথবা যদি আমরা চিন্তাশীল ও সচেতনদের মতো শুনতাম বা বুদ্ধিমান ও পর্যবেক্ষণকারীদের মতো বুঝতাম! এটা প্রমাণ করে যে, এ কাফেরদেরকে সামান্য পরিমাণ বুদ্ধিও দেয়া হয়নি। ৩২৬
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন-
أَمْ تَأْمُرُهُمْ أَحْلَامُهُمْ بِهَذَا أَمْ هُمْ قَوْمٌ طَاغُونَ.
“তাদের বুদ্ধি কি এ বিষয়ে তাদেরকে আদেশ করে, না তারা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়?”৩২৭
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন-
(أَحْلامُهُمْ) أَيْ أَذْهَانُهُمْ، لِأَنَّ الْعَقْلَ لَا يُعْطَى لِلْكَافِرِ وَلَوْ كَانَ لَهُ عَقْلُ لَآمَنَ وَإِنَّمَا يُعْطَى الْكَافِرُ الذَّهْنَ فَصَارَ عَلَيْهِ حُجَّةٌ. وَالذَّهْنُ يَقْبَلُ الْعِلْمَ جُمْلَةً، وَالْعَقْلُ يُمَيِّزُ الْعِلْمَ وَيُقَدِّرُ الْمَقَادِيرَ لِحُدُودِ الْأَمْرِ وَالنَّهْيِ.
অর্থাৎ أَحْلَامُهُمْ অর্থ 'তাদের মস্তিষ্কসমূহ।' কেননা, কাফেরকে বুদ্ধি দেয়া হয়নি। যদি তার বুদ্ধি থাকতো, তাহলে সে ঈমান আনতো। কিন্তু কাফেরকে মস্তিষ্ক দেয়া হয়েছে, যা তার বিরুদ্ধে দলীল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আর মস্তিষ্ক সামগ্রিকভাবে জ্ঞান ধারণ করতে পারে। আর বুদ্ধি জ্ঞানের মাঝে পার্থক্য করে এবং আদেশ- নিষেধের সীমানা নির্ধারণ করে থাকে। ৩২৮
তাফসীরে কুরতুবীতে একটি বর্ণনার উল্লেখ এসেছে- وَرُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا أَعْقَلَ فُلَانًا النَّصْرَانِي فَقَالَ: (مَهُ إِنَّ الْكَافِرَ لَا عَقْلَ لَهُ أَمَا سَمِعْتَ قَوْلَ اللَّهِ تَعَالَى: وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ. وَفِي حَدِيثِ ابْنِ عُمَرَ: فَزَجَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ قَالَ: (مَهُ فَإِنَّ الْعَاقِلَ مَنْ يَعْمَلُ بِطَاعَةِ اللَّهِ)
অর্থাৎ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এক লোক এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল, অমুক খ্রিস্টান কতোই না বুদ্ধিমান! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, থামো! কাফেরের কোনো বুদ্ধি নেই। তুমি কী আল্লাহর এ বাণীটি শুনোনি, “তারা বলবে, হায়! যদি আমরা শুনতাম অথ বা বুঝতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না!” ইবনে উমার রাযি.-এর বর্ণনায় আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধমক দিলেন। অতঃপর বললেন, থামো! নিশ্চয় বুদ্ধিমান হলো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্যের উপর আমল করে। ৩২৯
কাফেরের মূর্খতার কারণ বিবিধ। তন্মধ্যে অহংকার, হঠকারিতা, সত্যকে অপছন্দ করা, পিতৃপুরুষ, পাদ্রি ও সন্যাসীদের অনুসরণ, দুনিয়া ও তার উপভোগে ব্যস্ত থাকা ইত্যাদি। এ সকল কারণে কাফেরকে জাহেল বলে মাযূর ধরা হয় না; বরং এগুলো তাকে গুনাহের পর আরো অধিক গুনাহে লিপ্ত করে, কুফরের পর আরো জঘন্য কুফরীতে নিমজ্জিত করে, যা কিয়ামতের দিন তার লাঞ্ছনা ও লজ্জার কারণ হবে।
টিকাঃ
৩১৬. সূরা বাকারা: ১৭১
৩১৭. সূরা আনফাল ২২
৩১৮. সূরা ইউনুস: ১০০
৩১৯. সূরা বাকারা: ১৩
৩২০. সূরা তাওবা: ৯৩
৩২১. সূরা আরাফ: ১৭৯
৩২২. সূরা তাওবা: ৮৭
৩২৩. সূরা মুনাফিকূন: ০৩
৩২৪. সূরা মুনাফিকূন: ০৭
৩২৫. সূরা মুলক: ১০
৩২৬. তাফসীরে কুরতুবী: ১৮/২১২ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
৩২৭. সূরা তূর: ৩২
৩২৮. তাফসীরে কুরতুবী: ১৭/৭৩ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
৩২৯. তাফসীরে কুরতুবী: ১৭/৭৩ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
📄 পরিশিষ্ট
তাকফীরের মূলনীতিসমূহ শেষ হলো। এগুলো ভালো করে অধ্যয়ন করে, বুঝেশুনে তারপর এর যথাযথ প্রয়োগ করা উচিত। সাবধান! এমন যেনো না হয় যে, এর কিছু মূলনীতির উপর আমল করা হবে আর কিছু মূলনীতি ছেড়ে দেয়া হবে। এ ধরনের কাজের ফলাফল হবে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা ও গোমরাহী। ফাতওয়াদাতা নিজেও গোমরাহ হবে এবং মানুষকেও বিভ্রান্তিতে ফেলে দিবে।
কেননা, কোনো একটি মূলনীতি যদি কোনো বিষয়ে নিঃশর্ত থাকে, তাহলে অপর মূলনীতি তাকে ভিন্ন ক্ষেত্রে শর্তযুক্ত করে ফেলে। যদি একটি মূলনীতি কোনো বিষয়কে সংক্ষেপে বর্ণনা করে, তাহলে অন্যটি তার বিস্তারিত বর্ণনা করে। যদি কোনো মূলনীতি কোনো বিষয়কে নিষিদ্ধ করে, তাহলে অপর মূলনীতি তার সিদ্ধতার ব্যাপারে বলে থাকে। তাই শান্তির ঝাণ্ডাবাহীদের উচিত তাকফীরের প্রতিটি মূলনীতি সামনে রেখে আমল করা এবং কোনো ধরনের অবহেলা ব্যতীত প্রত্যেকটি মূলনীতির ভিত্তিতে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা।
কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা বাড়াবাড়ি অথবা ছাড়াছাড়ি করছে, কঠোরতা ও সীমালঙ্ঘন করছে, দেখা যায় তারা তাকফীরের কিছু মূলনীতি গ্রহণ করেছে আর কিছু মূলনীতিকে ছেড়ে দিয়েছে। এক মূলনীতির স্থানে অপর মূলনীতি প্রয়োগ করেছে। তারা সকল কুফর ও ঈমানের মাসআলার ক্ষেত্রে এ রকমই করছে। তাদের উপর যা আরোপিত হয়েছে, তা তারা একটি অথবা দু'টি মূলনীতির উপর নির্ভর করার কারণে হয়েছে। ফলে তারা বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।
অনেক সন্দেহপূর্ণ অবস্থার সিদ্ধান্ত নিতে শরয়ী হুকুম বর্ণনার প্রয়োজন হয়, তখন তাকফীরের মূলনীতির চাইতে নুসূসকে প্রয়োগ করা অধিক সঙ্গতিপূর্ণ। এ রকম সন্দেহপূর্ণ অবস্থায় সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে শরীয়তের সঠিক হুকুম বর্ণনার একান্ত প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি তাকফীরের মূলনীতি ও নিয়মগুলোর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেও বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে।
📄 আমাদের উপদেশ
কুফর ও তাকফীরের মাসআলা দু'ধরনের আছে। এক. মুহকাম তথা বিরোধমুক্ত ও সুস্পষ্ট মাসআলা। যার ব্যাপারে অধিক ইজতিহাদ ও গবেষণার প্রয়োজন নেই। দুই. মুতাশাবিহ তথা বিরোধপূর্ণ মাসআলা। যা কিছু কারণে জটিলও বটে। যার ব্যাপারে ইজতিহাদের মাধ্যমে মূলনীতি ও নসসমূহের মাঝে প্রাধান্যদানের প্রয়োজন হয়। যাতে করে সঠিকভাবে শরীয়তসম্মত বিধান নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
তাকফীরের যে মাসআলাগুলো সুস্পষ্ট ও মুহকাম হবে, সেক্ষেত্রে বিশেষ ও সাধারণ উভয় শ্রেণীর লোকই মাসআলা বলতে পারবে এবং আল্লাহর হুকুম বর্ণনা করতে পারবে। তাদেরকে এক্ষেত্রে নিষেধ করা হবে না। বলা হবে না যে, “কাফেরদেরকে তাকফীর করা তোমার কাজ নয়, তাই এ থেকে বিরত থাকো; বরং এটি আলেমদের কাজ।” তাদেরকে এ ধরনের কথা বলা ভুল। এ কথাটি স্বয়ং এ হুকুমেরই বিপরীত যে, প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব তাগুতদেরকে কাফের বলা, তাদেরকে তাকফীর করা, তাদের পূজারিদেরকে তাকফীর করা এবং তাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করা।
একজন মুসলিম কীভাবে শরীয়ত কর্তৃক ওয়াজিব 'ওয়ালা বারা' তথা বন্ধুত্ব ও শত্রুতার আকীদা, তাগুতকে অস্বীকারের আকীদা ইত্যাদি প্রাণবন্ত রাখবে? অন্যদিকে কোনো মুসলিম আলেম না হওয়ার কারণে আমরা যদি তার উপর আবশ্যক করে দেই যে, সে কাউকে তাকফীর করতে পারবে না, সে তাদের তাকফীরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, কেননা কে কাফের কে মুসলিম- এ ব্যাপারে সে পার্থক্য করতে পারবে না! তাহলে সে তার ওয়াজিব দায়িত্বগুলো পালন করবে কীভাবে? বিষয়টি স্ববিরোধী হয়ে গেলো না?
আমরা কীভাবে চাইছি যে, একজন মুসলিম মিল্লাতে ইবরাহীমের আদর্শকে আঁকড়ে রাখবে? যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলছেন-
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَاءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَداً حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ.
“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলো, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।”৩৩৮
মোটকথা, স্পষ্ট কুফরীর ক্ষেত্রে তাকফীরের মূলনীতি সম্পর্কে জ্ঞাত যে কোনো সাধারণ ব্যক্তিই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, কে কাফের আর কে মুসলিম। এর জন্য প্রাজ্ঞ আলেম বা পণ্ডিত হওয়ার আবশ্যকীয়তা নেই।
আর যদি কুফর স্পষ্ট না হয়ে সন্দেহপূর্ণ হয়, যার বিভিন্ন দিক থাকে, একদিক থেকে কুফরীর সম্ভাবনা রাখে, অপরদিক থেকে কুফর না থাকার সম্ভাবনা রাখে, এ ধরনের সন্দেহপূর্ণ কুফরের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ, ফিকহ ও তাকওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। এ ধরনের অবস্থায় মূলনীতি ও নসসমূহ নিরীক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ মুসলিমদের নিকট আমাদের চাওয়া হলো, নিজেদের অজ্ঞতার কারণে আলেমদের নিকট জিজ্ঞাসা করা ব্যতীত এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হবে না। কারণ,
প্রথমত, সাধারণ মুসলমানগণ তাকফীর না করলে তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে না যে, এরকম কুফরে লিপ্ত ব্যক্তিদেরকে কেনো তোমরা স্বপ্রণোদিত হয়ে তাকফীর করলে না বা তাকফীর করার কাজে প্রবৃত্ত হলে না? তবে যার কুফরী স্পষ্ট, তাকে তাকফীর থেকে বিরত থাকা শরীয়ত বিরোধী কাজ।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের উপর কাজটি আবশ্যক নয়। কারণ, তাদের পক্ষ থেকে ভুল তাকফীর করার আশঙ্কা রয়েছে। এটি এমন ভুল, যার কারণে পদস্খলন ঘটবে এবং এ ভুলের কারণে এমন পরিণতির শিকার হবে, যার পরিণাম শুভ নয়। এটি তাদের জন্য কোনো কাফেরকে মুসলিম হিসেবে সাব্যস্ত করণের ক্ষেত্রে হওয়া ভুলের চাইতে আরো মারাত্মক। তাই আমরা বলতে পারি, যার অবস্থা অস্পষ্ট হবে, সেক্ষেত্রে সাধারণ লোকদেরকে অবশ্যই প্রাজ্ঞ আলেমদের নিকট যেতে হবে। আলেমদের আগে এ রকম মাসআলার ক্ষেত্রে কোনো হুকুম বা কথা বলা যাবে না।
হে আল্লাহর বান্দা! মনে রেখো, নিশ্চয় রোগাক্রান্ত দুর্বল নফসের অধিকারীরা সীমালঙ্ঘনে এক ধরনের মজা পায়। তেমনিভাবে ছাড়াছাড়ি ও ইরজায় কিছু লোক মজা পায়। এ দু'টিই দুর্বল নফসের অধিকারীদের জন্য শয়তানের তৈরি মাসলাক বা পদ্ধতি। তাই যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন, চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ির পথে এগুতে অক্ষম হয়; সে ইরজা, শিথিলতা ও ছাড়াছাড়ির পথে অগ্রসর হয় এবং নিজের জন্য একে সুশোভিত করে নেয়। আর যে ছাড়াছাড়ি ও ইরজার পথে অক্ষম হয়; সে সীমালঙ্ঘন, চরমপন্থা, বাড়াবাড়ির পথ বেছে নেয় এবং নিজের জন্য একে সুশোভিত করে নেয়। অন্যদিকে মধ্যপন্থার মানহাজ হলো সত্য কর্মপন্থা, যে পথকে আল্লাহ ভালোবাসেন ও যে পথের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। যা সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ির দিকে এবং ইরজা ও ছাড়াছাড়ির দিকে ঝুঁকে না। যে পথ অবলম্বন করা দুর্বল রোগাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য কঠিন হয়ে পড়ে এবং সুস্থ মনের অধিকারী মুমিনের কাছে পছন্দনীয় হয়ে থাকে। তারা না শয়তানের দোসরদের পথে হাঁটে আর না তার অনুসারীদের পথে।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে তাঁর পথে অবিচল রাখেন। আমাদের জীবনকে সুন্দর সমাপ্তি দান করেন। আমাদের সকলকে মধ্যমপন্থী ও ন্যায়পরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করেন। সকল ধরনের বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি, সীমালঙ্ঘন-শিথিলতা বাদ দিয়ে তাঁর হাবীব মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণের তাওফীক দেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রোতা, সদা নিকটবর্তী ও প্রার্থনা কবুলকারী।
وَصَلَّى اللهُ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ. وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
টিকাঃ
৩৩৮. সূরা মুমতাহিনা: ০৪