📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 একটি অনুধাবন ও সতর্কীকরণ

📄 একটি অনুধাবন ও সতর্কীকরণ


এ মূলনীতিটি ঢালাওভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। যারা কোনো কাফেরকে কাফের বলে না, তাদের প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, অনেকেই এ রকম আছে, যারা ইজতিহাদ ও বিভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে তাকফীর করেন না। কেউ আছেন ওযর ও না জানার কারণে তাকফীর করেন না। তাই এদের একেকজনের হুকুম একেক রকম। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ হলো-
১. যে ব্যক্তি শরীয়তসম্মত ইজতিহাদ ও ব্যাখ্যার কারণে কোনো কাফেরকে তাকফীর করবে না; যেমন অনেক আহলে ইলম নামায পরিত্যাগকারীকে তাকফীর করা থেকে বিরত থেকেছেন, তেমনিভাবে কতিপয় বাতিল ফিরকাকে তাকফীর করার ক্ষেত্রে তাদের মাঝে ইখতিলাফ হয়েছে; যেমন খারেজী, মুতাযিলা ইত্যাদি। আর ইতিহাসে এ রকম কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে, কোনো আহলে ইলম এদেরকে কাফের না বলার কারণে তাদের উপর এ মূলনীতি প্রয়োগ করেছেন যে, “যে ব্যক্তি কোনো কাফেরকে কাফের বলবে না সে নিজেই কাফের।” কারণ, তাকফীর থেকে বিরত থাকার মতটি তাদের কাছে অগ্রগণ্য। এটা তাদের ইজতিহাদ ও ব্যাখ্যার ফলাফল। আর মুজতাহিদ যখন সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হোন, তখন তার জন্য রয়েছে দু'টি প্রতিদান। আর যখন ভুল করেন, তখন তার জন্য রয়েছে একটি প্রতিদান।
যদি কারো কুফরী স্পষ্ট না হয় এবং তার অবস্থা কাফের হওয়া বা না হওয়া যে কোনোটির সম্ভাবনা রাখে, সেক্ষেত্রে মতানৈক্য অনুমোদিত। তাই যে তাগুতের মাঝে ঈমান ভঙ্গের সকল কারণ একত্রিত হয়েছে তার কুফরীর ব্যাপারে কোনো রকমের ইজতিহাদ বা ইখতিলাফ অনুমোদিত নয়। যেহেতু তার কুফরী সাধারণ ও বিশেষ সকলের নিকটই স্পষ্ট। সেটা আকাশের মধ্যমণি সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট।
তাই আমরা বলতে পারি, যার মাঝে কুফরীর বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে তাকে ইসলামের গণ্ডিতে প্রবেশ করানোর জন্য যে ব্যক্তি কোনো ইজতিহাদ ও বিতর্ক করলো, ইসলাম ও ঈমানের হুকুমকে তার সাথে সম্বন্ধিত করলো এবং ইসলাম ও মুসলিমদের উপর থাকা হক তথা বন্ধুত্ব ও সাহায্য করার বিষয়গুলো সে তার জন্য সাব্যস্ত করলো, তাহলে সে উক্ত ব্যক্তিরই শ্রেণীভুক্ত। যদিও সে দাবি করুক যে, সে মুসলিম।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُم.
"তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই একজন।”৩০৮
উপরে উল্লিখিত মূলনীতিটি এ ধরনের লোকদের এবং তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে, যারা অন্যায়ভাবে কাফের, মুশরিক ও তাগুতদের পক্ষ নিয়ে বিতর্ক করে।
ইখতিলাফ তার ক্ষেত্রেই অনুমোদিত হবে, যার কুফর সন্দেহ ও সংশয়যুক্ত হবে। সে একদিক থেকে ঈমান প্রকাশ করে এবং অন্যদিক থেকে তার বিপরীত প্রকাশ করে। কখনো একটি প্রকাশ করে আবার কখনো তার বিপরীতটি প্রকাশ করে। এক্ষেত্রে মানুষের জন্য তার বিষয়টি নির্ধারণ করা কষ্টকর হয়ে যায়। তাই তারা তার কুফরী ও তাকে তাকফীর করার ব্যাপারে মতানৈক্য করে। এমনটি হওয়া সম্ভব এবং ইতঃপূর্বে বাস্তবে এমনটা ঘটেছেও।
তবে যার কুফরী স্পষ্ট হবে, যে ব্যাপারে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহতে অকাট্য ও স্পষ্ট দলীল থাকবে তার কুফর এবং তাকে তাকফীর করার ব্যাপারে কোনো ধরনের মতানৈক্য গ্রহণযোগ্য ও অনুমোদিত নয়।
২. ওযরযোগ্য মূর্খতার কারণে যে ব্যক্তি কাফেরকে কাফের বলে না: আল্লাহর শরীয়তের বিরোধী হয়ে বা শরীয়তের প্রতি হঠকারিতা দেখিয়ে নয়, বরং মাসআলা না জানার কারণে সে কোনো কাফেরকে কাফের মনে করে না। এ ধরনের লোক দু প্রকার:
ক. ঈমান ভঙ্গের সকল কারণ বা কিছু কারণ সম্পর্কে অজ্ঞ:
এভাবে যে, কোনো ব্যক্তির মাঝে ঈমান ভঙ্গের একটি কারণ পাওয়া গেলো। কোনো মুসলমান সে সকল কারণ না জানার ফলে তাকে মুসলিম হিসেবে ধারণা করে নিলো। এক্ষেত্রে তার অজ্ঞতা ওযরযোগ্য হলে তাকে মাযূর ধরা হবে। যেমন কেউ নওমুসলিম হওয়ার কারণে তার ঈমান ভঙ্গের কারণসমূহ অজানা রয়ে যায়, যে অজানা জ্ঞান অর্জন করা তার জন্য সম্ভব হয়নি। অথবা এমন দুর্গম অঞ্চলে তার বসবাস, যা জ্ঞান অর্জনের উপায়- উপকরণ থেকে দূরে। এমতাবস্থায় উক্ত ব্যক্তি অনুমান করেও জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম নয়। আর যদি তার বসবাস মুসলিম দেশে হয়, যেখানে শরীয়তের জ্ঞানের চর্চা আছে, যেখানে যে কেউ সহজেই জ্ঞান তালাশ ও অর্জন করতে পারে, কিন্তু সে দুনিয়া ও তার সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তাহলে এমতাবস্থায় তার অজ্ঞতা ওযর হিসেবে ধর্তব্য হবে না।
খ. কাফেরের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ:
কাফের সম্পর্কে কোনো কিছু উক্ত ব্যক্তির জানা নেই বিধায় সে তাকে কাফের মনে করে না অথবা সে তাকে চিনলেও যে কারণে সে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে সে কারণটি তার অজানা। এমতাবস্থায় ধারণা বা সন্দেহ বহির্ভূত অকাট্য ও সুস্পষ্ট প্রমাণ জানা পর্যন্ত তাকে তার না জানার কারণে মাযূর হিসেবে ধরা হবে। যদি জানার পরেও সে উক্ত কাফেরের কুফরীতে সন্দেহ করে এবং তাকে কাফের মনে না করে, তখন উক্ত ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। তার ক্ষেত্রে উক্ত মূলনীতিটি ব্যবহৃত হবে, “যে ব্যক্তি কোনো কাফেরকে কাফের মনে না করে অথবা তার কুফরীতে সন্দেহ করে; সেও কাফের হয়ে যাবে।”
তবে খেয়াল রাখতে হবে, যে কাফের অপরিচিত- সমাজে ও মানুষের জীবনে তার কোনো প্রভাব নেই; এমন কাফেরের অবস্থা না জানা আর যে কাফেরের ফিতনা দেশ ও দশের উপর প্রভাব ফেলে, তার কুফরী ও ফিতনার বিষয়টি স্পষ্ট, সে মানুষকে দীনের ব্যাপারে পরীক্ষায় ফেলে, যমীনে ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করে; এ উভয় কাফেরের মাঝে বিস্তর পার্থক্য আছে। কেননা, প্রথম প্রকার কাফেরের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকা সম্ভব। তার সম্পর্কে তথ্য জানা আবশ্যক কিছু নয়। কখনো কখনো তার সম্পর্কে এবং তার মতো অন্যদের সম্পর্কে জানা মুস্তাহাব পর্যায়ে হয়ে থাকে। তাদের সম্পর্কে অমনোযোগিতা দীন ও দুনিয়া কোনোটির জন্যই ক্ষতিকর হয় না।
কিন্তু অন্যজনের সম্পর্কে না জানা অসম্ভব, তার বিষয়ে না জানার প্রশ্নই আসে না, বিশেষ করে আহলে ইলম ও বিশেষ মুসলিমদের জন্য তো কল্পনাই করা যায় না। যেহেতু তার কুফরী সম্পর্কে না জানার কারণে ফিতনা, ফাসাদ ও গোমরাহী ইত্যাদির সৃষ্টি হয়।
তাই আমরা বলতে পারি, যে কাফেরের ফিতনা মানুষের উপর ব্যাপক হবে তার সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ ও তার বিষয়টি খোলাসা করা, তার বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষকে জানানো, সে যে হুকুমের যোগ্য তার ব্যাপারে সে হুকুমকে প্রকাশ করা উলামায়ে কেরামের উপর ফরয। যেনো মানুষ তাকে পরিত্যাগ করতে পারে, তার থেকে সাবধান থাকতে পারে, তার বিষয়ে শরয়ী ওয়াজিবসমূহকে বাস্তবায়ন করতে পারে। এক্ষেত্রে শরীয়ত চুপ থাকার অনুমতি দেয় না; বরং চুপ থাকা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের সাথে খিয়ানতের নামান্তর।
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَكَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ وَلِتَسْتَبِينَ سَبِيلُ الْمُجْرِمِينَ. "আর এমনিভাবে আমি নিদর্শনসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি, যাতে অপরাধীদের পথ সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।"৩০৯
সুতরাং অপরাধীদের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার জন্য তাদের প্রকৃত রূপ তুলে ধরা এবং তাদের সম্পর্কে আল্লাহর ফয়সালাকে বর্ণনা করা আবশ্যক।
মুজামুল কাবীর তাবারানীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّمَا رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ عِلْمًا فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ.
অর্থাৎ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা ইলম দান করেছেন, অতঃপর সে ইলমকে গোপন করলো, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আগুনের লাগাম পরাবেন। ৩১০

টিকাঃ
৩০৮. সূরা মায়িদা: ৫১
৩০৯. সূরা আনআম: ৫৫
৩১০. মুজামুল কাবীর তাবারানী: ১০/১২৮, হা. নং ১০১৯৭ (মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়া, কায়রো)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00