📄 ক্রটিকারী মুজতাহিদ
যেমন একজন মুজতাহিদ শরয়ী নুসূস, মূলনীতি ও বিধিবিধান থেকে ইজতিহাদ করার পরে ভুলক্রমে কোনো মুসলিমকে তাকফীর করলেন। তাহলে তার ভুল হওয়া সত্ত্বেও সে ক্ষমার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে এবং পাশাপাশি একগুণ সাওয়াবেরও অধিকারী হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন মুজতাহিদ ভুল করে তার জন্য রয়েছে একটি প্রতিদান।
এমনিভাবে উমার বিন খাত্তাব রাযি. হাতিব বিন আবী বালতাআ রাযি. সম্পর্কে বলেছিলেন যে, তিনি মুনাফিক হয়ে গেছেন, তিনি নিফাকী করেছেন, কুফরী করেছেন, দীন বদল করেছেন। আর এটি তখনকার কথা, যখন তিনি মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে মুসলিমদের সেনা অভিযান করার গোপন কথা কুরাইশ কাফেরদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। যে কারণে উমার রাযি. তার গর্দান কেটে ফেলার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চাইলেন। কিন্তু তিনি জানিয়ে দিলেন যে, হাতিব রাযি. মুনাফিক নন। তার আকীদা নিরাপদ রয়েছে। অন্যদিকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমার রাযি.-কেও বলেননি যে, তুমি তোমার মুসলিম ভাইকে মুনাফিক, কাফের ইত্যাদি বলেছো, তাই নিফাকী ও কুফরী তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরকম বলেননি; কারণ উমার রাযি. তার এরকম বলেছিলেন নিজের ইজতিহাদ থেকে।
এমনিভাবে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইলেন ওই ব্যক্তির গর্দান উড়ানোর জন্য, যে মুনাফেকী করেছিলো এবং দীনকে পরিবর্তন করেছিলো। উক্ত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেছিলো, আল্লাহকে ভয় করুন। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খালিদ রাযি.-কে নিষেধ করেছিলেন এবং তাকে বলেছিলেন, সম্ভবত সে নামায পড়ে। আর আমাকে আদেশ দেয়া হয়নি যে, আমি মানুষের অন্তরে কী আছে, তা উঁকি দিয়ে দেখবো এবং তার মনোবাঞ্ছা জানার জন্য তার পেট ফেঁড়ে নিবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ রাযি.-কে বলেননি যে, তুমি উক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছো, তা তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। কারণ, এটা খালিদ রাযি. নিজ ইজতিহাদ থেকে বলেছিলেন।
এমনিভাবে মুনাফিদের নেতা ইবনে উবাইকে নিয়ে বিতর্ক করার সময় উসাইদ বিন হুযাইর রাযি. সাদ বিন উবাদা রাযি.-কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতে বলেছিলেন, তুমি একজন মুনাফিক, মুনাফিকদের পক্ষ নিয়ে বিতর্ক করছো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসাইদ রাযি.-কে বলেননি যে, মুনাফিকের হুকুম তোমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। কেননা, উসাইদ রাযি. নিজ ইজতিহাদের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলেছিলেন।
এমনিভাবে একটি আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে আব্দুল্লাহ বিন মাযউন রাযি.- সহ একদল লোক মদকে হালাল বলেছিলো। তাদের ক্ষেত্রে কতিপয় সাহাবা রাযি.-এর প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি লক্ষ্যণীয়। উমার রাযি. যখন তাদের ব্যাপারে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন, তখন তারা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা দেখছি যে, তারা আল্লাহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। আল্লাহ অনুমতি দেননি দীনের ভিতরে এমন জিনিসকে বৈধ বলছে; তাই আপনি তাদেরকে হত্যা করুন। এর মানে হলো, এ সকল সাহাবী রাযি. সে দলটির উপর কুফর ও ইরতিদাদের হুকুম আরোপ করেছিলেন।
কিন্তু পরবর্তীতে আলী রাযি.-এর রায় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়, যার উপর সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর ইজমা হয়েছিলো। সেটা হলো, তাদেরকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি তারা তাওবা করে তাহলে মদপানের শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে আশিটি দোররা মারা হবে। আর যদি তারা তাওবা না করে, তাহলে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করার কারণে তাদেরকে হত্যা করা হবে।
এখন যে সকল সাহাবী রাযি. শুরুতে মদ হালাল বলে ভুল ব্যাখ্যাকারীদেরকে কাফের ও মুরতাদ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, কুফরের হুকুম তাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। কেননা, তাদের এ সিদ্ধান্তদান ছিলো তাদের ইজতিহাদের ফল।
এমনিভাবে খারেজী এবং অন্যান্য নফসের পূজারিদেরকে কাফের বলা হবে কিনা- এ ব্যাপারে আহলে ইলমের মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান। তাই যারা তাদেরকে কাফের সাব্যস্ত করে না, তাদের জন্য যারা খারেজীদেরকে কাফের সাব্যস্ত করে তাদেরকে এ কথা বলা জায়েয হবে না যে, 'আপনারা মুসলমানদেরকে কাফের বলছেন আর যে কোনো মুসলিমকে কাফের বলে সে কাফের হয়ে যায়।' এ ধরনের কথা বলা যাবে না, তার কারণ হলো- খারেজীদেরকে কাফের বলা থেকে বিরত থাকা তাদের ইজতিহাদের ফলাফল, যা শরীয়তের নুসূস ও মূলনীতিকে সামনে রেখে করা হয়েছে।
এমনিভাবে নামায ও ইসলামের অন্যান্য রোকন আদায় পরিত্যাগকারীর হুকুম সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মাঝে ইখতিলাফ আছে। তাই যারা তাদেরকে কাফের বলবে না তাদের জন্য জায়েয হবে না, যারা এদেরকে কাফের বলে তাদেরকে বলবে যে, আপনারা মুসলিমদেরকে কাফের বলছেন, আর যে কোনো মুসলিমকে কাফের বলবে, সে কাফের হয়ে যাবে এবং তার দিকে কুফরীর হুকুম প্রত্যাবর্তিত হবে। কেননা, যারা নামায ও অন্যান্য রোকন আদায় পরিত্যাগকারীকে কাফের বলেন, তারা তা নিজেদের ইজতিহাদ থেকে বলেন এবং তাদের এ মতের উপর তাদের নিকট শরয়ী দলীল রয়েছে। যদি তারা তাদের ইজতিহাদে ভুলও করেন, তবুও তারা প্রতিদান পাবেন। আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।