📄 তামাশাচ্ছলে ঠাট্টাকারী
যে কোনো মুসলিমকে বাস্তবিক অর্থে নয়; বরং ঠাট্টা, উপহাস ও তামাশাচ্ছলে কাফের বলে থাকে। এ ধরনের ব্যক্তির কাফের হওয়ার ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ. لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
“(হে নবী) আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ওযর পেশ করো না। নিশ্চিত তোমরা ঈমান প্রকাশ করার পর কাফের হয়ে গেছো।”৩০০
এ আয়াতদ্বয় তাদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা কথার কথায়, তামাশাচ্ছলে, উপহাসের ছলে এমন কথা বলেছিলো, যা তাকফীরের চেয়েও নিম্নস্তরের কথা ছিলো। এমতাবস্থায় তারা পূর্বে ঈমান আনা সত্ত্বেও কাফের হয়ে যাবে।
তারা মুমিনদের সম্পর্কে বলেছিলো, “আমাদের এ বন্ধুর মতো অধিক পেট পূজারি, অধিক মিথ্যাবাদী, যুদ্ধের সময় অধিক ভীত আর দেখিনি।” এ ধরনের কথা বলার কারণে যদি ঈমান আনার পরে কাফের হয়ে যায়, তাহলে তার কী অবস্থা হবে, যে মুমিনদেরকে কথার কথায়, উপহাসের ছলে কাফের বলে গালি দেয়? নিঃসন্দেহে তার ব্যাপারে আরো ভালোভাবে এ আয়াত প্রযোজ্য হবে যে, قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ ‘তোমরা ঈমান আনার পর কাফের হয়ে গেছো।' আর পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, কুফর নিয়ে উপহাস করাও কুফরী।
টিকাঃ
৩০০. সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬
📄 ভুল ব্যাখ্যাদানকারী
যেমন একব্যক্তি কোনো মুসলিমকে সন্দেহ অথবা ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাকফীর করলো। যদিও এ ব্যক্তি না জেনে অজ্ঞতাবশত ফাতওয়া দেয়ার কারণে গুনাহগার হবে, কিন্তু তাকে তাকফীর করা হবে না। কারণ, তার কাছে অনির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা রয়েছে, যেটাকে সে নির্ভরযোগ্য মনে করছে। অনুরূপভাবে খারেজীরা, যারা কতিপয় সাহাবী রাযি., মুসলমানদের কতিপয় নেতা ও মুসলিমদের মাঝে যারা কবীরা গুনাহ করে তাদেরকে তাকফীর করতো। কিন্তু তাদের সন্দেহ ও ভুল ব্যাখ্যার কারণে কোনো সাহাবীকেই আমরা দেখি না যে, তাদেরকে কাফের বলে ঘোষণা করেছেন বা খারেজীদের ক্ষেত্রে “যে মুসলিমকে কাফের বললো সে কাফের হয়ে গেলো” এ নীতি প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু তারা সকলে এ ব্যাপারে একমত ছিলেন যে, খারেজীরা গুনাহগার, যাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও কিতাল করা ওয়াজিব।
খারেজী এবং অন্যান্য নফসের পূজারি ভ্রান্তপন্থীরা সন্দেহের পরিমাণ, প্রকার, দুর্বল, সবল হওয়ার দিক থেকে একরকম নয়। যেমনিভাবে বাড়াবাড়ি, বিভ্রান্তির দিক থেকে তারা এক স্তরের নয়। তাই প্রত্যেক অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন হুকুম হওয়া আবশ্যক। প্রত্যেকের সন্দেহের পরিমাণ, সন্দেহের প্রকার, বিভ্রান্তকরণের স্তর অনুযায়ী তার হুকুমের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা আসবে।
মৌলিকভাবে আমরা বলবো, যখন তাদের মাঝে তাকফীরের শর্তসমূহ ও তাকফীরকে আবশ্যককারী বিষয়সমূহ পাওয়া যাবে এবং তাকফীরের কোনো প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যাবে না, তখন তাদেরকে নির্দিষ্টভাবে তাকফীর করা হবে। চাই সে খারেজী হোক বা অন্য কেউ হোক।
সুতরাং যখন তাকফীরের শর্তসমূহ ও তার কারণগুলো কারো মাঝে পূর্ণরূপে পাওয়া যাবে, তখন খারেজী বা অন্য কোনো প্রবৃত্তিপূজারি নামের সম্পৃক্ততা তাকফীরের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার অন্তর্ভুক্ত হবে না। অর্থাৎ খারেজী, রাফেযী, মুরজিয়া ইত্যাদি নামগুলো তাকফীরের প্রতিবন্ধক কোনো বিষয় নয়। তাই যখনই এদের মাঝে তাকফীরের শর্তসমূহ ও তার কারণগুলো পূর্ণরূপে পাওয়া যাবে, তখনই তাদেরকে তাকফীর করা হবে।
📄 ক্রটিকারী মুজতাহিদ
যেমন একজন মুজতাহিদ শরয়ী নুসূস, মূলনীতি ও বিধিবিধান থেকে ইজতিহাদ করার পরে ভুলক্রমে কোনো মুসলিমকে তাকফীর করলেন। তাহলে তার ভুল হওয়া সত্ত্বেও সে ক্ষমার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে এবং পাশাপাশি একগুণ সাওয়াবেরও অধিকারী হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন মুজতাহিদ ভুল করে তার জন্য রয়েছে একটি প্রতিদান।
এমনিভাবে উমার বিন খাত্তাব রাযি. হাতিব বিন আবী বালতাআ রাযি. সম্পর্কে বলেছিলেন যে, তিনি মুনাফিক হয়ে গেছেন, তিনি নিফাকী করেছেন, কুফরী করেছেন, দীন বদল করেছেন। আর এটি তখনকার কথা, যখন তিনি মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে মুসলিমদের সেনা অভিযান করার গোপন কথা কুরাইশ কাফেরদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। যে কারণে উমার রাযি. তার গর্দান কেটে ফেলার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চাইলেন। কিন্তু তিনি জানিয়ে দিলেন যে, হাতিব রাযি. মুনাফিক নন। তার আকীদা নিরাপদ রয়েছে। অন্যদিকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমার রাযি.-কেও বলেননি যে, তুমি তোমার মুসলিম ভাইকে মুনাফিক, কাফের ইত্যাদি বলেছো, তাই নিফাকী ও কুফরী তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরকম বলেননি; কারণ উমার রাযি. তার এরকম বলেছিলেন নিজের ইজতিহাদ থেকে।
এমনিভাবে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইলেন ওই ব্যক্তির গর্দান উড়ানোর জন্য, যে মুনাফেকী করেছিলো এবং দীনকে পরিবর্তন করেছিলো। উক্ত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেছিলো, আল্লাহকে ভয় করুন। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খালিদ রাযি.-কে নিষেধ করেছিলেন এবং তাকে বলেছিলেন, সম্ভবত সে নামায পড়ে। আর আমাকে আদেশ দেয়া হয়নি যে, আমি মানুষের অন্তরে কী আছে, তা উঁকি দিয়ে দেখবো এবং তার মনোবাঞ্ছা জানার জন্য তার পেট ফেঁড়ে নিবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ রাযি.-কে বলেননি যে, তুমি উক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছো, তা তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। কারণ, এটা খালিদ রাযি. নিজ ইজতিহাদ থেকে বলেছিলেন।
এমনিভাবে মুনাফিদের নেতা ইবনে উবাইকে নিয়ে বিতর্ক করার সময় উসাইদ বিন হুযাইর রাযি. সাদ বিন উবাদা রাযি.-কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতে বলেছিলেন, তুমি একজন মুনাফিক, মুনাফিকদের পক্ষ নিয়ে বিতর্ক করছো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসাইদ রাযি.-কে বলেননি যে, মুনাফিকের হুকুম তোমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। কেননা, উসাইদ রাযি. নিজ ইজতিহাদের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলেছিলেন।
এমনিভাবে একটি আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে আব্দুল্লাহ বিন মাযউন রাযি.- সহ একদল লোক মদকে হালাল বলেছিলো। তাদের ক্ষেত্রে কতিপয় সাহাবা রাযি.-এর প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি লক্ষ্যণীয়। উমার রাযি. যখন তাদের ব্যাপারে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন, তখন তারা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা দেখছি যে, তারা আল্লাহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। আল্লাহ অনুমতি দেননি দীনের ভিতরে এমন জিনিসকে বৈধ বলছে; তাই আপনি তাদেরকে হত্যা করুন। এর মানে হলো, এ সকল সাহাবী রাযি. সে দলটির উপর কুফর ও ইরতিদাদের হুকুম আরোপ করেছিলেন।
কিন্তু পরবর্তীতে আলী রাযি.-এর রায় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়, যার উপর সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর ইজমা হয়েছিলো। সেটা হলো, তাদেরকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি তারা তাওবা করে তাহলে মদপানের শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে আশিটি দোররা মারা হবে। আর যদি তারা তাওবা না করে, তাহলে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করার কারণে তাদেরকে হত্যা করা হবে।
এখন যে সকল সাহাবী রাযি. শুরুতে মদ হালাল বলে ভুল ব্যাখ্যাকারীদেরকে কাফের ও মুরতাদ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, কুফরের হুকুম তাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। কেননা, তাদের এ সিদ্ধান্তদান ছিলো তাদের ইজতিহাদের ফল।
এমনিভাবে খারেজী এবং অন্যান্য নফসের পূজারিদেরকে কাফের বলা হবে কিনা- এ ব্যাপারে আহলে ইলমের মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান। তাই যারা তাদেরকে কাফের সাব্যস্ত করে না, তাদের জন্য যারা খারেজীদেরকে কাফের সাব্যস্ত করে তাদেরকে এ কথা বলা জায়েয হবে না যে, 'আপনারা মুসলমানদেরকে কাফের বলছেন আর যে কোনো মুসলিমকে কাফের বলে সে কাফের হয়ে যায়।' এ ধরনের কথা বলা যাবে না, তার কারণ হলো- খারেজীদেরকে কাফের বলা থেকে বিরত থাকা তাদের ইজতিহাদের ফলাফল, যা শরীয়তের নুসূস ও মূলনীতিকে সামনে রেখে করা হয়েছে।
এমনিভাবে নামায ও ইসলামের অন্যান্য রোকন আদায় পরিত্যাগকারীর হুকুম সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মাঝে ইখতিলাফ আছে। তাই যারা তাদেরকে কাফের বলবে না তাদের জন্য জায়েয হবে না, যারা এদেরকে কাফের বলে তাদেরকে বলবে যে, আপনারা মুসলিমদেরকে কাফের বলছেন, আর যে কোনো মুসলিমকে কাফের বলবে, সে কাফের হয়ে যাবে এবং তার দিকে কুফরীর হুকুম প্রত্যাবর্তিত হবে। কেননা, যারা নামায ও অন্যান্য রোকন আদায় পরিত্যাগকারীকে কাফের বলেন, তারা তা নিজেদের ইজতিহাদ থেকে বলেন এবং তাদের এ মতের উপর তাদের নিকট শরয়ী দলীল রয়েছে। যদি তারা তাদের ইজতিহাদে ভুলও করেন, তবুও তারা প্রতিদান পাবেন। আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।