📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 তা কয়েকটি কারণে

📄 তা কয়েকটি কারণে


ক. সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো মুসলিমকে কাফের বলা এমন ভুল, যার কারণে অন্যায়ভাবে তার সব ধরনের নিরাপত্তা চলে যায়, যা ইসলাম তাকে প্রদান করেছে। এমনিভাবে তার ও মুমিনদের মাঝে থাকা সকল ধরনের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। তাই কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে কাফের বলা তাকে হত্যা করার নামান্তর।
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ ثَابِتِ بْنِ الضَّحَاكِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ حَلَفَ بِمِلَّةٍ غَيْرِ الإِسْلَامِ كَاذِبًا فَهُوَ كَمَا قَالَ، وَمَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ عُذِّبَ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ، وَلَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ، وَمَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهُوَ كَقَتْلِهِ.
সাবিত ইবনুল যাহহাক রাযি. সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মের নামে মিথ্যা শপথ করবে, সে তেমনই হবে যেমনটা সে বলেছে। যে ব্যক্তি কোনো বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে, তাকে ঐ বস্তু দ্বারাই জাহান্নামে শাস্তি দেয়া হবে। মুমিনকে অভিশাপ দেয়া তাকে হত্যা করারই নামান্তর। আর যে কোনো মুমিনকে কুফরীর অপবাদ দিবে, তাহলে তা তাকে হত্যা করার মতোই। ২৭১
এর বিপরীত কোনো কাফেরকে মুসলিম বলার দ্বারা তার এরকম কোনো ক্ষতি হয় না; বরং তার আরো উপকার হয়। যেহেতু এর দরুন উক্ত কাফের ইসলামের সুরক্ষা লাভ করে তার জান, মাল ও সম্মান নিরাপদ হয়ে যায়। তার সাথে ও মুসলমানদের সাথে সাম্য ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। এছাড়াও মুসলিমগণ যে অধিকার লাভ করে, সেও উক্ত অধিকারগুলো লাভ করে।
খ. কোনো মুসলিমকে তাকফীর করার দ্বারা দ্বিগুণ ভুল হয়ে থাকে। প্রথমত, আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে ভুল করা হয় তথা আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো মুসলিমের উপর কুফরীর অপবাদ দিয়ে দেয়া। এর দ্বারা মূলত আল্লাহর হুকুমকে ভুল প্রতিপন্ন করা হয়। দ্বিতীয়ত, বান্দার অধিকারের পক্ষেও এটি ভুল আরোপ করা হয়। কেননা, যখন তার ব্যাপারে কুফরী সাব্যস্ত করা হয়, তখন তার থেকে ঐ সমস্ত অধিকার হরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ইসলাম তাকে প্রদান করেছে। সুতরাং এখানে একত্রে দুটি ভুল পাওয়া যায় তথা আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে একটি ভুল এবং বান্দার হকের ক্ষেত্রে আরেকটি ভুল।
অন্যদিকে কোনো কাফেরের ক্ষেত্রে ইসলামের হুকুম দেয়ার মধ্যে শুধু আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে ভুল করা হয়। যেনো সে আল্লাহর হুকুমের বিপরীত হুকুম প্রদান করলো যে, আল্লাহর দেয়া হুকুম সঠিক হয়নি। যদি এরকম কোনো ভুল শরীয়তসম্মত ইজতিহাদের কারণে হয়, তাহলে তার ক্ষেত্রে এ নীতি প্রয়োগ হবে না যে, “যে ব্যক্তি কোনো কাফেরকে কাফের সাব্যস্ত করলো না, সে কুফরী করলো।” আর নিঃসন্দেহে শুধু আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে ভুল করার চেয়ে আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের হকের ক্ষেত্রে ভুল করা অধিক জঘন্য।
মুসনাদে বাযযারে বর্ণিত হয়েছে- عَن أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الظُّلْمُ ثَلَاثَةٌ فَظُلْمُ لَا يَغْفِرُهُ اللهُ وظلم يغفره الله وَظُلْمُ لَا يَتْرُكُهُ اللَّهُ فَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَغْفِرُهُ اللهُ فَالشَّرْكُ، وَقال الله {إِنَّ الشرك لظلم عظيم} وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي يَغْفِرُهُ اللهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ لِأَنْفُسِهِمْ فِيمَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَبِّهِمْ وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَتْرُكُهُ اللَّهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ بَعْضِهِمْ بَعْضًا حَتَّى يَدِينَ لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ.
অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যুলম তিন প্রকার। প্রথমত, যে যুলম আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। দ্বিতীয়ত, যে যুলম তিনি ক্ষমা করবেন। তৃতীয়ত, যে যুলম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না। সুতরাং যে যুলমের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, তাহলো শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহাঅন্যায়।” আর যে যুলমের অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করবেন, তাহলো বান্দার নিজের উপর কৃত যুলম, যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। আর যে যুলম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না, তাহলো বান্দাদের মাঝে সংঘটিত পারস্পরিক যুলম। এ যুলম ততোক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমা করা হবে না, যতোক্ষণ না অপর ব্যক্তি থেকে পাওনা পরিশোধ করা হয়। ২৭২
গ. কোনো মুসলিমকে কাফের বলা এমন ভুল, যার কারণে সে নিজেই বড় বিপদের সম্মুখীন হয়। এ ভুল তাকে তার অগোচরে ধ্বংসের দিকে উপনীত করে তাকে কুফরে নিপতিত করে। বিশেষ করে যখন কোনো মুসলিমকে তাকফীর করা কোনো বিশুদ্ধ দলীল বা শরীয়তসম্মত কোনো ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে না হয়।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ دِينَارٍ أَنَّهُ سَمِعَ ابْنَ عُمَرَ، يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّمَا امْرِئٍ قَالَ لِأَخِيهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا، إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ، وَإِلَّا رَجَعَتْ عَلَيْهِ.
আব্দুল্লাহ বিন উমার রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইকে বলল, 'হে কাফের!' তাহলে এর দ্বারা তাদের দু'জনের একজন উপযুক্ত হবে। যাকে এটা বললো বাস্তবে যদি সে এমন হয়ে থাকে, তাহলে তো ঠিক আছে। অন্যথায় যে বলেছে তার দিকেই সেটা (কুফরী) ফিরবে। ২৭৩
মুস্তাদরাকে হাকিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِنٍ مَا لَيْسَ فِيهِ، حُبِسَ فِي رَدْغَةِ الْخَبَالِ حَتَّى يَأْتِيَ بِالْمَخْرَجِ مِمَّا قَالَ.
আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন.... আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে এমন কিছু বললো, যা তার মাঝে নেই, তাহলে উক্ত ব্যক্তি জাহান্নামীদের পুঁজের মাঝে আবদ্ধ থাকবে; যতোক্ষণ না সে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়। ২৭৪
কিন্তু কোনো কাফেরকে মুসলিম বললে এমন কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হয় না। বিশেষ করে যখন এ ভুল ইজতিহাদ ও ব্যাখ্যার কারণে হয়।
ঘ. যদি ক্ষমা করার কোনো পথ পাওয়া যায়, তবে তা অবলম্বনের প্রতি শরয়ী নুসূস ও কায়েদাসমূহতে আকৃষ্ট করা হয়েছে। ভুলে শাস্তি দেয়ার চাইতে ভুলে ক্ষমা করে দেয়া অনেক সহজ।
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قُتِلَ رَجُلٌ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَرُفِعَ ذَلِكَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَدَفَعَهُ إِلَى وَلِيِّ الْمَقْتُولِ، فَقَالَ الْقَاتِلُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَاللَّهِ مَا أَرَدْتُ قَتْلَهُ، قَالَ: فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْوَلِيِّ: أَمَا إِنَّهُ إِنْ كَانَ صَادِقًا، ثُمَّ قَتَلْتَهُ، دَخَلْتَ النَّارَ. قَالَ: فَخَلَّى سَبِيلَهُ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে এক লোক নিহত হলো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করা হলো। তিনি হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকের নিকট সমর্পণ করলেন। হত্যাকারী বললো, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম! আমি তাকে হত্যা করতে চাইনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার অভিভাবককে বললেন, যদি সে তার কথায় সত্যবাদী হয়, তাহলে তাকে হত্যা করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর অভিভাবক তাকে যেতে দিলেন।২৭৫
সুনানে আবু দাউদে আরো বর্ণিত হয়েছে- عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رُفِعَ إِلَيْهِ شَيْءٌ فِيهِ قِصَاصُ، إِلَّا أَمَرَ فِيهِ بِالْعَفْوِ.
আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দেখেছি, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট কিসাসের বিচার আসলে তিনি ক্ষমা করার উপদেশ দিতেন। ২৭৬
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইমাম গাযালী রহ.-এর উদ্ধৃতিতে বলেন- وَقَالَ الْغَزَالِيُّ فِي كِتَابِ التَّفْرِقَةُ بَيْنَ الْإِيمَانِ وَالزَّنْدَقَةِ وَالَّذِي يَنْبَغِي الاحْتِرَازُ عَنِ التَّكْفِيرِ مَا وَجَدَ إِلَيْهِ سَبِيلًا فَإِنَّ اسْتِبَاحَةَ دِمَاءِ الْمُصَلِّينَ الْمُقِرِّينَ بِالتَّوْحِيدِ خَطَأً وَالْخَطَأُ فِي تَرْكِ أَلْفِ كَافِرٍ فِي الْحَيَاةِ أَهْوَنُ مِنَ الْخَطَإِ فِي سَفْكِ دَمٍ لِمُسْلِمٍ وَاحِدٍ.
অর্থাৎ ইমাম গাযালী রহ. 'কিতাবুত তাফরিকা বাইনাল ঈমান ওয়ায যানদাকা' গ্রন্থে বলেন, যদি তাকফীর না করে বেঁচে থাকার পথ বের করা যায়, তাহলে তাকফীর থেকে দূরে থাকা উচিত। কেননা, তাওহীদ স্বীকারকারী মুসল্লীর রক্তকে হালাল করা ভুল। আর একজন মুসলমানের রক্ত প্রবাহের ক্ষেত্রে ভুল করার চেয়ে এক হাজার কাফেরকে জীবিত ছেড়ে দেয়া অধিক সহজ। ২৭৭

টিকাঃ
২৭১. সহীহ বুখারী: ৮/২৬, হা. নং ৬১০৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
২৭২. মুসনাদে বাযযার: ১৩/১১৪, হা. নং ৬৪৯১ (মাকতাবাতুল উলূম ওয়াল হিকাম, মদীনা)
২৭৩. সহীহ মুসলিম: ১/৭৯, হা. নং ৬০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়ি‍্য, বৈরূত)
২৭৪. মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩২, হা. নং ২২২২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
২৭৫. সুনানে আবু দাউদ: ৪/১৬৯, হা. নং ৪৪৯৮ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরূত)
২৭৬. সুনানে আবু দাউদ: ৪/১৬৯, হা. নং ৪৪৯৭ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
২৭৭. ফাতহুল বারী: ১২/৩০০ (দারুল মারিফা, বৈরূত)

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 সতর্কীকরণ

📄 সতর্কীকরণ


উপরোক্ত মূলনীতিটির উপর আমল করার দাবি হলো, কুফরে আকবার ও শিরকে আকবার ব্যতীত নিম্নবর্তী গুনাহকারী তথা কবীরা গুনাহকারীকে তাকফীর করা থেকে বিরত থাকা।
এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاء.
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না। শিরক ব্যতীত অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন।”২৭৮

টিকাঃ
২৭৮. সূরা নিসা: ৪৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00