📄 দলীল
আল্লাহ তাআলা বলেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلامَ لَسْتَ مُؤْمِناً تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ كَذَلِكَ كُنْتُمْ مِنْ قَبْلُ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيراً.
“হে মুমিনগণ, তোমরা যখন আল্লাহর পথে সফর করো, তখন ভালো করে যাচাই-বাছাই করো। আর কেউ তোমাদেরকে সালাম দিলে দুনিয়ার সম্পদের লোভে তোমরা তাকে বলো না যে, তুমি মুমিন নও। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে অগাধ সম্পদ। তোমরা তো ইতঃপূর্বে এমনই ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং তোমরা ভালো করে যাচাই-বাছাই করে নিবে। তোমরা যা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত।” ২৫৮
এর ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারী রহ. বলেন- يَقُولُ: فَتَأَنَّوْا فِي قَتْلِ مَنْ أَشْكَلَ عَلَيْكُمْ أَمْرُهُ, فَلَمْ تَعْلَمُوا حَقِيقَةً إِسْلامِهِ وَلَا كُفْرَهِ, وَلَا تَعْجَلُوا فَتَقْتُلُوا مَنِ الْتَبَسَ عَلَيْكُمْ أَمْرُهُ, وَلَا تَتَقَدَّمُوا عَلَى قَتْلِ أَحَدٍ إِلَّا عَلَى قَتْلِ مَنْ عَلِمْتُمُوهُ يَقِينًا حَرْبًا لَكُمْ وَللَّهِ وَلِرَسُولِهِ.
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বলছেন, যার ব্যাপারে তোমাদের দ্বিধা হচ্ছে তোমরা তাকে হত্যা করার ব্যাপারে দেরি করো। কেননা, তোমরা তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বা তার কুফরী সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানো না। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তার ব্যাপারে তোমরা তাড়াহুড়ো করো না। যে ব্যক্তি আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বলে তোমাদের অকাট্য জ্ঞান রয়েছে, তাকে ব্যতীত অন্য কারো হত্যায় তোমরা অগ্রসর হয়ো না। ২৫৯
আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ: مَرَّ رَجُلٌ مِنْ بَنِي سُلَيْمٍ بِنَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْعَى غَنَمًا لَهُ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ، فَقَالُوا: لاَ يُسَلِّمُ عَلَيْنَا إِلَّا لِيَتَعَوَّذَ مِنَّا ، فَعَمَدُوا إِلَيْهِ فَقَتَلُوهُ، وَأَتَوْا بِغَنَمِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَنَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِلَى آخِرِهَا.
অর্থাৎ আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনী সুলাইমের এক ব্যক্তি ছাগল চরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলো। সে তাদেরকে সালাম দিলো। সাহাবা রাযি. বললেন, সে আমাদের থেকে বাঁচার জন্য সালাম দিয়েছে। তারা সে লোকটির প্রতি মনোনিবেশ করলেন এবং তাকে হত্যা করলেন। তার ছাগলগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এলেন। তখন يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا এ পুরা আয়াতটি নাযিল হয়। ২৬০
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْماً بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ.
“হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনয়ন করে, তাহলে তোমরা যাচাই করে দেখবে। নচেৎ আশঙ্কা আছে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত হয়ে পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।”২৬১
এর ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারী রহ. বলেন- فَتَبَيَّنُوا لِئَلَّا تُصِيبُوا قَوْمًا بُرَآءَ مِمَّا قُذِفُوا بِهِ بِجِنَايَةٍ بِجَهَالَةٍ مِنْكُمْ. অর্থাৎ তোমরা যাচাই-বাছাই করে দেখো, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত নিরপরাধ কোনো দলকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে ফেলো। ২৬২
না জেনে কোনো প্রমাণ ছাড়া নিষ্পাপ মানুষকে কুফরী ও ইরতিদাদের অপবাদ দেয়া ভয়ানক অপরাধ ও কঠিন যুলম। যেহেতু এর দ্বারা মারাত্মক পরিণতির আশঙ্কা রয়েছে, যার শেষ ফল ভালো নয়।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ جُنَادَةَ بْنِ أَبِي أُمَيَّةَ، قَالَ: دَخَلْنَا عَلَى عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ وَهُوَ مَرِيضُ، فَقُلْنَا: حَدَّثْنَا أَصْلَحَكَ اللَّهُ، بِحَدِيثٍ يَنْفَعُ اللَّهُ بِهِ سَمِعْتَهُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: دَعَانَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَايَعْنَاهُ، فَكَانَ فِيمَا أَخَذَ عَلَيْنَا: أَنْ بَايَعَنَا عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِي مَنْشَطِنَا وَمَكْرَهِنَا، وَعُسْرِنَا وَيُسْرِنَا، وَأَثَرَةٍ عَلَيْنَا، وَأَنْ لَا نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ، قَالَ: إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانُ.
জুনাদা বিন আবু উমাইয়া রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা উবাদা বিন সামিত রাযি.-এর নিকট আসলাম, যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। আমরা বললাম, আল্লাহ আপনার পরিশুদ্ধি দান করুন! আপনি আমাদেরকে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যদ্বারা আল্লাহ (আমাদের) উপকৃত করবেন, যা আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ থেকে শুনেছেন। তখন তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (একবার) আমাদেরকে ডাকলেন। অতঃপর আমরা তার হাতে বাইআত হলাম। তিনি আমাদের থেকে যে সকল বিষয়ে প্রতিশ্রুতি নিলেন তা হলো- আমরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, সুখে-দুঃখে এবং আমাদের উপর কাউকে প্রাধান্য দেয়া হলেও আমরা শুনবো ও মান্য করবো। আর আমরা আমীরের সাথে কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হবো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তবে হ্যাঁ, যদি তোমরা কুফরে বাওয়াহ তথা সুস্পষ্ট কুফরী দেখো, যে ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ রয়েছে তাহলে ভিন্ন কথা। ২৬৩
কুফরে বাওয়াহ হলো সুস্পষ্ট কুফরী। তা এমন প্রকাশ্য কুফর, যা অন্য কোনো ব্যাখ্যা বা অর্থ পরিবর্তনের সম্ভাবনা রাখে না এবং যে ব্যাপারে কুরআন এবং সুন্নাহতে সুস্পষ্ট দলীল রয়েছে।
হাদীসের মর্মার্থ হলো, যদি শাসকের মাঝে কুফরে মুহতামাল তথা সন্দেহপূর্ণ কুফরী দেখা যায়, যা স্পষ্ট কুফরীর পর্যায়ে পড়ে না, যার বাহ্যিক অর্থ ছাড়াও ভিন্ন কোনো অর্থ বা ব্যাখ্যা হওয়া সম্ভব তাহলে সেক্ষেত্রে शासককে কাফের বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। তার বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করা যাবে না। কারণ, শাসকের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন তথা যুদ্ধ তখনই করা হবে, যখন সে সুস্পষ্ট কুফরীতে নিমজ্জিত হওয়ায় তাকে তাকফীর করা আবশ্যক হয়ে পড়বে। আর তাকে তাকফীর করার পর সামর্থ্য থাকলে মুরতাদ শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হওয়া আবশ্যক।
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন- قَوْلُهُ عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانُ أَيْ نَصُّ آيَةٍ أَوْ خَبَرٌ صَحِيحٌ لَا يَحْتَمِلُ التَّأْوِيلَ وَمُقْتَضَاهُ أَنَّهُ لَا يَجُوزُ الْخُرُوجُ عَلَيْهِمْ مَا دَامَ فِعْلُهُمْ يَحْتَمِلُ التَّأْوِيلَ.
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী “যে ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ রয়েছে।” এর ব্যাখ্যা হলো, এমন কোনো আয়াত বা সহীহ হাদীস, যা ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না। এ হাদীস অনুযায়ী যতোক্ষণ পর্যন্ত উক্ত শাসকের কর্মকাণ্ড কুফর ভিন্ন অন্য ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা জায়েয হবে না। ২৬৪
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: سَتَكُونُ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ، فَمَنْ عَرَفَ بَرِئَ، وَمَنْ أَنْكَرَ سَلِمَ، وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ، قَالُوا: أَفَلَا نُقَاتِلُهُمْ؟ قَالَ: لَا ، مَا صَلَّوْا.
উম্মে সালামা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মাঝে অচিরেই কিছু শাসকের আবির্ভাব ঘটবে, যাদের মধ্যে তোমরা ভালো-মন্দ দেখতে পাবে। যে তাদের আসল চিনতে পারলো, সে বেঁচে গেলো। যে তাদেরকে অপছন্দ করলো, সে নিরাপদ রইলো। কিন্তু যে তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলো এবং তাদের অনুসরণ করলো (সে অপরাধে জড়ালো)। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না; যতোক্ষণ তারা নামায আদায় করে। ২৬৫
সহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُحِبُّونَهُمْ وَيُحِبُّونَكُمْ، وَيُصَلُّونَ عَلَيْكُمْ وَتُصَلُّونَ عَلَيْهِمْ، وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُبْغِضُونَهُمْ وَيُبْغِضُونَكُمْ، وَتَلْعَنُونَهُمْ وَيَلْعَنُونَكُمْ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَلَا نُنَا بِذُهُمْ بِالسَّيْفِ؟ فَقَالَ: لَا ، مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلَاةِ.
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম শাসক তারা, যাদেরকে তোমরা ভালোবাসো এবং তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দুআ করো, তারাও তোমাদের জন্য দুআ করে। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট শাসক তারা, যাদেরকে তোমরা ঘৃণা করো এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দাও, তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দেয়। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না; যতোক্ষণ তারা তোমাদের মাঝে নামায কায়েম রাখে।”২৬৬
সুতরাং যতোক্ষণ পর্যন্ত শাসকেরা নামায কায়েম করবে, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন লোকদেরকে তা কায়েম করতে বলবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে কাফের সাব্যস্ত করা যাবে না। তারা যা করে তা যতো বড় গুনাহই হোক না কেনো, তাদের মাঝে সুস্পষ্ট কুফরী না দেখা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না। অনুরূপ তাদের প্রকাশ্য অবস্থা কুফরী হলেও যদি তা সন্দেহপূর্ণ হয়; যেমন তারা নামায কায়েম করে, তাহলে এমতাবস্থায় সন্দেহের উপস্থিতি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে পদস্খলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় তাদেরকে সরাসরি কাফের বলে আখ্যায়িত করা যাবে না।
এ থেকে আরো বোঝা যায়, যে শাসক নামায ত্যাগ করে কিংবা অধীনস্তদেরকে নামাযের প্রতি আহ্বানও করে না তাকে বলপ্রয়োগ করে অপসারণ করতে হবে; এমনকি যদি এর জন্য তলোয়ার হাতে নিতে হয় তবুও। কেননা, এমতাবস্থায় সে স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত হওয়ায় কাফের বলে বিবেচিত হবে। উবাদা বিন সামিত রাযি. ও অন্যান্যদের বর্ণিত হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি কুফরে বাওয়াহ বা স্পষ্ট কুফরী করে, তার বিরুদ্ধে সামর্থ্য থাকলে যুদ্ধ করা আবশ্যক।
কাযী ইয়ায রহ. বলেন-
أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ عَلَى أَنَّ الْإِمَامَةَ لَا تَنْعَقِدُ لِكَافِرٍ وَعَلَى أَنَّهُ لَوْ طَرَأَ عَلَيْهِ الْكُفْرُ انْعَزَلَ قَالَ وَكَذَا لَوْ تَرَكَ إِقَامَةَ الصَّلَوَاتِ وَالدُّعَاءَ إِلَيْهَا.
অর্থাৎ উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোনো কাফেরের জন্য নেতৃত্ব প্রযোজ্য নয়। এছাড়াও যদি কোনো (মুসলিম) শাসক কুফরীতে লিপ্ত হয়, তাহলে সে অপসারণযোগ্য হয়ে যায়। তিনি বলেন, এমনিভাবে শাসক যদি নামায কায়েম করা এবং এর দিকে আহ্বান করা ছেড়ে দেয়, তখনও সে অপসারণযোগ্য হয়ে যায়। ২৬৭
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ - وَهَذَا حَدِيثُ ابْنِ أَبِي شَيْبَةَ - قَالَ: بَعَثَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَرِيَّةٍ، فَصَبَّحْنَا الْحُرَقَاتِ مِنْ جُهَيْنَةَ، فَأَدْرَكْتُ رَجُلًا فَقَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَطَعَنْتُهُ فَوَقَعَ فِي نَفْسِي مِنْ ذَلِكَ، فَذَكَرْتُهُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَقَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَقَتَلْتَهُ؟ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّمَا قَالَهَا خَوْفًا مِنَ السِّلَاحِ، قَالَ: أَفَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى تَعْلَمَ أَقَالََهَا أَمْ لَا؟ فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا عَلَيَّ حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي أَسْلَمْتُ يَوْمَئِذٍ.
উসামা বিন যায়েদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে একটি অভিযানে পাঠালেন। আমরা সকাল বেলা জুহাইনা গোত্রের হুরুকাত শাখার নিকট গিয়ে উপনীত হলাম। অতঃপর আমি একজন ব্যক্তিকে সামনে পেলে সে বলে উঠলো, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। তথাপি আমি তাকে হত্যা করে ফেললাম। অতঃপর এ বিষয়ে আমার মনে সংশয় আসায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর নিকট তা উপস্থাপন করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলা সত্ত্বেও তুমি তাকে হত্যা করে ফেললে? উসামা রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, সে তো তরবারির ভয়ে তা বলেছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি তার অন্তর ফেঁড়ে দেখলে না কেনো, যাতে তুমি বুঝতে পারতে যে, সে সত্যিই মন থেকে কালেমা পাঠ করেছে কিনা? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথাটিকে আমার সামনে বারবার বলতে থাকলেন। এমনকি আমি আকাঙ্খা করছিলাম, হায়! যদি আজ আমি ইসলাম গ্রহণ করতাম! ২৬৮
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসামা ইবনে যায়েদ রাযি.-এর কর্মকে মারাত্মকভাবে অপছন্দ করেছেন। কারণ, লোকটি নিজ ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে স্পষ্ট করে উল্লেখ করলেও তিনি সন্দেহবশত তাকে হত্যা করেছিলেন। তিনি সন্দেহ দিয়ে স্পষ্ট বিষয়কে খণ্ডন করেছেন। আর শরীয়তের মূলনীতি হলো, স্পষ্ট ইসলামকে সন্দেহমূলক কুফর খণ্ডন করতে পারে না। যে সন্দেহ নিশ্চয়তার ভিত্তিতে নয়; বরং ধারণার ভিত্তিতে জন্ম নেয়, তা সত্য পর্যন্ত পৌঁছতে কোনোরূপ সাহায্য করে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئاً. “তারা কেবল অনুমানের উপর চলে। অথচ সত্যের ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়।”২৬৯
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
أَنَّ المِقْدَادَ بْنَ عَمْرٍو الْكِنْدِيَّ، وَكَانَ حَلِيفًا لِبَنِي زُهْرَةَ، وَكَانَ مِمَّنْ شَهِدَ بَدْرًا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخْبَرَهُ: أَنَّهُ قَالَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَقِيتُ رَجُلًا مِنَ الكُفَّارِ فَاقْتَتَلْنَا، فَضَرَبَ إِحْدَى يَدَيَّ بِالسَّيْفِ فَقَطَعَهَا، ثُمَّ لَأَذَ مِنِّي بِشَجَرَةٍ، فَقَالَ: أَسْلَمْتُ اللَّهِ، أَأَقْتُلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ بَعْدَ أَنْ قَالَهَا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَقْتُلْهُ. فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ قَطَعَ إِحْدَى يَدَيَّ، ثُمَّ قَالَ ذَلِكَ بَعْدَ مَا قَطَعَهَا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَقْتُلْهُ، فَإِنْ قَتَلْتَهُ فَإِنَّهُ بِمَنْزِلَتِكَ قَبْلَ أَنْ تَقْتُلَهُ، وَإِنَّكَ بِمَنْزِلَتِهِ قَبْلَ أَنْ يَقُولَ كَلِمَتَهُ الَّتِي قَالَ
অর্থাৎ মিকদাদ বিন আমর কিন্দী রাযি.-যিনি ছিলেন বনী যুহরার মিত্র এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন-তিনি বর্ণনা করেন যে, তিনি (একবার) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন, যদি আমি কোনো কাফেরের সম্মুখীন হই এবং আমরা পরস্পরে যুদ্ধ করতে করতে সে তার তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে আমার একটি হাত কেটে ফেলে। এরপর সে আমার থেকে কোনো এক গাছের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে বলে, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইসলাম গ্রহণ করলাম, তাহলে হে আল্লাহর রাসূল, এ কথা বলার পরও কি আমি তাকে হত্যা করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে হত্যা করো না। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, সে আমার একটি হাত কেটে তারপর ইসলাম গ্রহণের কথা বলেছে! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে হত্যা করো না। যদি তুমি তাকে হত্যা করো, তাহলে এ হত্যার পূর্বে তোমার যে অবস্থান ছিলো সে ব্যক্তি সে স্থানে পৌঁছবে এবং কালেমা পড়ার আগে সে ব্যক্তি যে অবস্থানে ছিলো তুমি সে স্থানে পৌঁছবে। ২৭০
লক্ষ্য করি, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট সাহাবী মিকদাদ রাযি. প্রমাণ করতে চাইলেন যে, সম্ভবত লোকটি ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছে তার তলোয়ার থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু তবুও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করতে নিষেধ করলেন। তার সুযোগ রয়েছে যে, সে তাকে হত্যা করবে। কারণ, উক্ত ব্যক্তি তার হাত কেটে দিয়েছে। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে স্পষ্টভাবে হত্যা করতে নিষেধ করে দিলেন। কেননা, সন্দেহ ও ধারণার উপর ভিত্তি করে কোনো হুকুম দেয়া যায় না, সন্দেহ যতোই শক্তিশালী হোক। আর যখন সুস্পষ্টভাবে কারো মুসলিম হওয়া সাব্যস্ত হবে, তখন কেবল সুস্পষ্ট কুফরের মাধ্যমেই তার ঈমান ভঙ্গ হবে।
টিকাঃ
২৫৮. সূরা নিসা: ৯৪
২৫৯. তাফসীরে তাবারী: ৯/৭০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
২৬০. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩৩৮ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
২৬১. সূরা হুজুরাত: ০৬
২৬২. তাফসীরে তাবারী: ২২/২৮৯ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
২৬৩. সহীহ মুসলিম: ৩/১৪৭০, হা. নং ১৭০৯ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
২৬৪. ফাতহুল বারী: ১৩/৮ (দারুল মারিফা, বৈরূত)
২৬৫. সহীহ মুসলিম: ৩/১৪৮০, হা. নং ১৮৫৪ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
২৬৬. সহীহ মুসলিম: ৩/১৪৮১, হা. নং ১৮৫৫ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
২৬৭. শরহে সহীহ মুসলিম: ১২/২২৯ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
২৬৮. সহীহ মুসলিম: ১/৯৬, হা. নং ৯৬ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
২৬৯. সূরা নাজম: ২৮
২৭০. সহীহ বুখারী: ৫/৮৫, হা. নং ৪০১৯ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
📄 মাসআলা
এ মূলনীতির উপর ভিত্তি করে একদল উলামায়ে কেরাম বলেছেন, কারো । কুফরীর ব্যাপারে দ্বিধা ও সন্দেহ থাকলে তাকে তাকফীর করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। এমনকি যদি কোনো একটি বাক্যের নিরান্নব্বইটি কুফরী অর্থের সম্ভাবনা থাকে আর কুফর ব্যতীত অন্য অর্থের সম্ভাবনা থাকে মাত্র একটি, তাহলে এ অবস্থায়ও উত্তম হলো, তাকফীর করা থেকে বিরত থ াকা। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
মাসআলা:
কোনো কাফেরের উপর ইসলামের হুকুম দেয়ার চেয়ে কোনো মুসলিমকে কাফের বলা অধিক ক্ষতিকর ও জঘন্যতম ভুল। এ থেকে বোঝা যায়, যখন কারো কুফরীর ব্যাপারে সন্দেহ ও দ্বিধা হবে এবং হৃদয়কে প্রশান্তকারী নিশ্চয়তা থাকবে না, তখন তাকফীর থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা, কোনো কাফেরের উপর ইসলামের হুকুম দেয়ার চেয়ে কোনো মুসলিমকে তাকফীর করা অধিক ক্ষতিকর।
📄 তা কয়েকটি কারণে
ক. সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো মুসলিমকে কাফের বলা এমন ভুল, যার কারণে অন্যায়ভাবে তার সব ধরনের নিরাপত্তা চলে যায়, যা ইসলাম তাকে প্রদান করেছে। এমনিভাবে তার ও মুমিনদের মাঝে থাকা সকল ধরনের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। তাই কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে কাফের বলা তাকে হত্যা করার নামান্তর।
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ ثَابِتِ بْنِ الضَّحَاكِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ حَلَفَ بِمِلَّةٍ غَيْرِ الإِسْلَامِ كَاذِبًا فَهُوَ كَمَا قَالَ، وَمَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ عُذِّبَ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ، وَلَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ، وَمَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهُوَ كَقَتْلِهِ.
সাবিত ইবনুল যাহহাক রাযি. সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মের নামে মিথ্যা শপথ করবে, সে তেমনই হবে যেমনটা সে বলেছে। যে ব্যক্তি কোনো বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে, তাকে ঐ বস্তু দ্বারাই জাহান্নামে শাস্তি দেয়া হবে। মুমিনকে অভিশাপ দেয়া তাকে হত্যা করারই নামান্তর। আর যে কোনো মুমিনকে কুফরীর অপবাদ দিবে, তাহলে তা তাকে হত্যা করার মতোই। ২৭১
এর বিপরীত কোনো কাফেরকে মুসলিম বলার দ্বারা তার এরকম কোনো ক্ষতি হয় না; বরং তার আরো উপকার হয়। যেহেতু এর দরুন উক্ত কাফের ইসলামের সুরক্ষা লাভ করে তার জান, মাল ও সম্মান নিরাপদ হয়ে যায়। তার সাথে ও মুসলমানদের সাথে সাম্য ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। এছাড়াও মুসলিমগণ যে অধিকার লাভ করে, সেও উক্ত অধিকারগুলো লাভ করে।
খ. কোনো মুসলিমকে তাকফীর করার দ্বারা দ্বিগুণ ভুল হয়ে থাকে। প্রথমত, আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে ভুল করা হয় তথা আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো মুসলিমের উপর কুফরীর অপবাদ দিয়ে দেয়া। এর দ্বারা মূলত আল্লাহর হুকুমকে ভুল প্রতিপন্ন করা হয়। দ্বিতীয়ত, বান্দার অধিকারের পক্ষেও এটি ভুল আরোপ করা হয়। কেননা, যখন তার ব্যাপারে কুফরী সাব্যস্ত করা হয়, তখন তার থেকে ঐ সমস্ত অধিকার হরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ইসলাম তাকে প্রদান করেছে। সুতরাং এখানে একত্রে দুটি ভুল পাওয়া যায় তথা আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে একটি ভুল এবং বান্দার হকের ক্ষেত্রে আরেকটি ভুল।
অন্যদিকে কোনো কাফেরের ক্ষেত্রে ইসলামের হুকুম দেয়ার মধ্যে শুধু আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে ভুল করা হয়। যেনো সে আল্লাহর হুকুমের বিপরীত হুকুম প্রদান করলো যে, আল্লাহর দেয়া হুকুম সঠিক হয়নি। যদি এরকম কোনো ভুল শরীয়তসম্মত ইজতিহাদের কারণে হয়, তাহলে তার ক্ষেত্রে এ নীতি প্রয়োগ হবে না যে, “যে ব্যক্তি কোনো কাফেরকে কাফের সাব্যস্ত করলো না, সে কুফরী করলো।” আর নিঃসন্দেহে শুধু আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে ভুল করার চেয়ে আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের হকের ক্ষেত্রে ভুল করা অধিক জঘন্য।
মুসনাদে বাযযারে বর্ণিত হয়েছে- عَن أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الظُّلْمُ ثَلَاثَةٌ فَظُلْمُ لَا يَغْفِرُهُ اللهُ وظلم يغفره الله وَظُلْمُ لَا يَتْرُكُهُ اللَّهُ فَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَغْفِرُهُ اللهُ فَالشَّرْكُ، وَقال الله {إِنَّ الشرك لظلم عظيم} وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي يَغْفِرُهُ اللهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ لِأَنْفُسِهِمْ فِيمَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَبِّهِمْ وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَتْرُكُهُ اللَّهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ بَعْضِهِمْ بَعْضًا حَتَّى يَدِينَ لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ.
অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যুলম তিন প্রকার। প্রথমত, যে যুলম আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। দ্বিতীয়ত, যে যুলম তিনি ক্ষমা করবেন। তৃতীয়ত, যে যুলম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না। সুতরাং যে যুলমের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, তাহলো শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহাঅন্যায়।” আর যে যুলমের অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করবেন, তাহলো বান্দার নিজের উপর কৃত যুলম, যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। আর যে যুলম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না, তাহলো বান্দাদের মাঝে সংঘটিত পারস্পরিক যুলম। এ যুলম ততোক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমা করা হবে না, যতোক্ষণ না অপর ব্যক্তি থেকে পাওনা পরিশোধ করা হয়। ২৭২
গ. কোনো মুসলিমকে কাফের বলা এমন ভুল, যার কারণে সে নিজেই বড় বিপদের সম্মুখীন হয়। এ ভুল তাকে তার অগোচরে ধ্বংসের দিকে উপনীত করে তাকে কুফরে নিপতিত করে। বিশেষ করে যখন কোনো মুসলিমকে তাকফীর করা কোনো বিশুদ্ধ দলীল বা শরীয়তসম্মত কোনো ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে না হয়।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ دِينَارٍ أَنَّهُ سَمِعَ ابْنَ عُمَرَ، يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّمَا امْرِئٍ قَالَ لِأَخِيهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا، إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ، وَإِلَّا رَجَعَتْ عَلَيْهِ.
আব্দুল্লাহ বিন উমার রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইকে বলল, 'হে কাফের!' তাহলে এর দ্বারা তাদের দু'জনের একজন উপযুক্ত হবে। যাকে এটা বললো বাস্তবে যদি সে এমন হয়ে থাকে, তাহলে তো ঠিক আছে। অন্যথায় যে বলেছে তার দিকেই সেটা (কুফরী) ফিরবে। ২৭৩
মুস্তাদরাকে হাকিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِنٍ مَا لَيْسَ فِيهِ، حُبِسَ فِي رَدْغَةِ الْخَبَالِ حَتَّى يَأْتِيَ بِالْمَخْرَجِ مِمَّا قَالَ.
আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন.... আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে এমন কিছু বললো, যা তার মাঝে নেই, তাহলে উক্ত ব্যক্তি জাহান্নামীদের পুঁজের মাঝে আবদ্ধ থাকবে; যতোক্ষণ না সে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়। ২৭৪
কিন্তু কোনো কাফেরকে মুসলিম বললে এমন কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হয় না। বিশেষ করে যখন এ ভুল ইজতিহাদ ও ব্যাখ্যার কারণে হয়।
ঘ. যদি ক্ষমা করার কোনো পথ পাওয়া যায়, তবে তা অবলম্বনের প্রতি শরয়ী নুসূস ও কায়েদাসমূহতে আকৃষ্ট করা হয়েছে। ভুলে শাস্তি দেয়ার চাইতে ভুলে ক্ষমা করে দেয়া অনেক সহজ।
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قُتِلَ رَجُلٌ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَرُفِعَ ذَلِكَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَدَفَعَهُ إِلَى وَلِيِّ الْمَقْتُولِ، فَقَالَ الْقَاتِلُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَاللَّهِ مَا أَرَدْتُ قَتْلَهُ، قَالَ: فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْوَلِيِّ: أَمَا إِنَّهُ إِنْ كَانَ صَادِقًا، ثُمَّ قَتَلْتَهُ، دَخَلْتَ النَّارَ. قَالَ: فَخَلَّى سَبِيلَهُ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে এক লোক নিহত হলো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করা হলো। তিনি হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকের নিকট সমর্পণ করলেন। হত্যাকারী বললো, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম! আমি তাকে হত্যা করতে চাইনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার অভিভাবককে বললেন, যদি সে তার কথায় সত্যবাদী হয়, তাহলে তাকে হত্যা করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর অভিভাবক তাকে যেতে দিলেন।২৭৫
সুনানে আবু দাউদে আরো বর্ণিত হয়েছে- عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رُفِعَ إِلَيْهِ شَيْءٌ فِيهِ قِصَاصُ، إِلَّا أَمَرَ فِيهِ بِالْعَفْوِ.
আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দেখেছি, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট কিসাসের বিচার আসলে তিনি ক্ষমা করার উপদেশ দিতেন। ২৭৬
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইমাম গাযালী রহ.-এর উদ্ধৃতিতে বলেন- وَقَالَ الْغَزَالِيُّ فِي كِتَابِ التَّفْرِقَةُ بَيْنَ الْإِيمَانِ وَالزَّنْدَقَةِ وَالَّذِي يَنْبَغِي الاحْتِرَازُ عَنِ التَّكْفِيرِ مَا وَجَدَ إِلَيْهِ سَبِيلًا فَإِنَّ اسْتِبَاحَةَ دِمَاءِ الْمُصَلِّينَ الْمُقِرِّينَ بِالتَّوْحِيدِ خَطَأً وَالْخَطَأُ فِي تَرْكِ أَلْفِ كَافِرٍ فِي الْحَيَاةِ أَهْوَنُ مِنَ الْخَطَإِ فِي سَفْكِ دَمٍ لِمُسْلِمٍ وَاحِدٍ.
অর্থাৎ ইমাম গাযালী রহ. 'কিতাবুত তাফরিকা বাইনাল ঈমান ওয়ায যানদাকা' গ্রন্থে বলেন, যদি তাকফীর না করে বেঁচে থাকার পথ বের করা যায়, তাহলে তাকফীর থেকে দূরে থাকা উচিত। কেননা, তাওহীদ স্বীকারকারী মুসল্লীর রক্তকে হালাল করা ভুল। আর একজন মুসলমানের রক্ত প্রবাহের ক্ষেত্রে ভুল করার চেয়ে এক হাজার কাফেরকে জীবিত ছেড়ে দেয়া অধিক সহজ। ২৭৭
টিকাঃ
২৭১. সহীহ বুখারী: ৮/২৬, হা. নং ৬১০৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
২৭২. মুসনাদে বাযযার: ১৩/১১৪, হা. নং ৬৪৯১ (মাকতাবাতুল উলূম ওয়াল হিকাম, মদীনা)
২৭৩. সহীহ মুসলিম: ১/৭৯, হা. নং ৬০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়ি্য, বৈরূত)
২৭৪. মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩২, হা. নং ২২২২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
২৭৫. সুনানে আবু দাউদ: ৪/১৬৯, হা. নং ৪৪৯৮ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
২৭৬. সুনানে আবু দাউদ: ৪/১৬৯, হা. নং ৪৪৯৭ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
২৭৭. ফাতহুল বারী: ১২/৩০০ (দারুল মারিফা, বৈরূত)
📄 সতর্কীকরণ
উপরোক্ত মূলনীতিটির উপর আমল করার দাবি হলো, কুফরে আকবার ও শিরকে আকবার ব্যতীত নিম্নবর্তী গুনাহকারী তথা কবীরা গুনাহকারীকে তাকফীর করা থেকে বিরত থাকা।
এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاء.
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না। শিরক ব্যতীত অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন।”২৭৮
টিকাঃ
২৭৮. সূরা নিসা: ৪৮