📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 একটি সংশোধন ও সতর্কীকরণ

📄 একটি সংশোধন ও সতর্কীকরণ


উম্মতের পূর্বসূরী ও উত্তরসূরী উলামায়ে কেরাম ইজতিহাদী বিভিন্ন বিষয়ে হালাল ও হারাম হওয়া নিয়ে মতভেদ করেছেন, বাতিল হওয়া না হওয়া নিয়ে ভিন্নমত অবলম্বন করেছেন। কিন্তু কখনো যিনি কোনো বস্তুকে হালাল বলেছেন, তিনি হারাম বলে ফাতওয়া দানকারীকে কাফের বলেননি অথবা যিনি কোনো বস্তুকে হারাম বলেছেন, তিনি হালাল বলে ফাতওয়া দানকারীকে কাফের বলেননি। কেননা, হালাল-হারাম বা অন্য কোনো মাসআলাতে তাদের ভুল হওয়া শরীয়তের বিরোধিতা বা শরীয়তের প্রতি মিথ্যা আরোপের কারণে হয়নি; বরং তাদের মতপার্থক্যের কারণ হলো, শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত ইজতিহাদ ও তাবীল। তাদের ধারণা ছিলো, তারা নিজ ইজতিহাদের কারণে যে ফলাফল বের করেছেন তা সঠিক হয়েছে এবং তা শরীয়ত অনুযায়ী হয়েছে। তাই যার অবস্থা এমন হবে, তার ব্যাপারে উক্ত মূলনীতি প্রয়োগ করা জায়েয হবে না যে, “যে হারামকে হালাল করবে সে কুফরী করলো।” বরং যিনি শরীয়তসম্মত ইজতিহাদ করেও ভুল করবেন তার জন্য রয়েছে একগুণ সাওয়াব আর যিনি সঠিক সিদ্ধান্ত দিবেন তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব।
যেমন সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ عَمْرِو بْنِ العَاصِ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرُ.
আমর বিন আস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, যখন কোনো ফয়সালাদাতা ফয়সালা দিতে গিয়ে ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবে, তবে তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান। আর যে ইজতিহাদ করেও ভুল সিদ্ধান্ত দিবে, তার জন্য রয়েছে একগুণ প্রতিদান। ২৫২
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
فَتَبَيَّنَ أَنَّ الْمُجْتَهِدَ مَعَ خَطَئِهِ لَهُ أَجْرُ؛ وَذَلِكَ لِأَجْلِ اجْتِهَادِهِ وَخَطَؤُهُ مَغْفُورُ لَهُ؛ لِأَنَّ دَرْكَ الصَّوَابِ فِي جَمِيعِ أَعْيَانِ الْأَحْكَامِ إِمَّا مُتَعَذِّرُ أَوْ مُتَعَسِّرُ وَقَدْ قَالَ تَعَالَى: {وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ}
অর্থাৎ সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, মুজতাহিদ ভুল করলে তার জন্য রয়েছে একগুণ প্রতিদান। প্রতিদানের কারণ হলো তার ইজতিহাদ। আর তার ভুলটি ক্ষমা করা হবে। কেননা, প্রত্যেক বিধানের ক্ষেত্রে সঠিকতায় পৌঁছানো হয় অসম্ভব, নয় তো অনেক কঠিন। ২৫৩
তিনি আরো বলেন-
فَإِنَّ الْإِيمَانَ بِوُجُوبِ الْوَاجِبَاتِ الظَّاهِرَةِ الْمُتَوَاتِرَةِ وَتَحْرِيمِ الْمُحَرَّمَاتِ الظَّاهِرَةِ الْمُتَوَاتِرَةِ: هُوَ مِنْ أَعْظَمِ أُصُولِ الْإِيمَانِ وَقَوَاعِدِ الدِّينِ وَالْجَاحِدُ لَهَا كَافِرُ بِالاتَّفَاقِ مَعَ أَنَّ الْمُجْتَهِدَ فِي بَعْضِهَا لَيْسَ بِكَافِرِ بِالْاتَّفَاقِ مَعَ خَطَئِهِ.
অর্থাৎ সর্বসম্মতিক্রমে স্পষ্ট মুতাওয়াতির ফরযসমূহের আবশ্যকীয়তার প্রতি ঈমান রাখা এবং স্পষ্ট মুতাওয়াতির হারামসমূহের প্রতি হারাম হওয়ার ব্যাপারে ঈমান রাখা ঈমানের বৃহৎ একটি মূলনীতি ও দীনের একটি মূলভিত্তি। আর এর অস্বীকারকারী কাফের। অন্যদিকে সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও ফরয হওয়ার ব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্তকারী মুজতাহিদ কাফের নয়। ২৫৪

টিকাঃ
২৫২. সহীহ বুখারী: ৯/১০৮, হা. নং ৭৩৫২ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
২৫৩. মাজমুউল ফাতাওয়া: ২০/২৫২ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদীনা)
২৫৪. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১২/৪৯৬ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, সৌদিআরব)

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 একটি সংশয়ের অপনোদন

📄 একটি সংশয়ের অপনোদন


সংশয়: বর্তমান কালের মুরজিয়ারা বিদআতপূর্ণ একটি বিভক্তিকরণ করে থাকে। তারা ইস্তিহলালকে দু'ভাগে ভাগ করে। এক. কোনো হারামকে অন্তরের মধ্যে ইস্তিহলাল করা। এটা ব্যক্তিকে দীন থেকে বের করে দেয়। দুই. প্রকাশ্য আমলের মাধ্যমে হারামকে হালাল করা। এটা দীন থেকে বের করে না।
শাইখ আলবানী রহ. বলেন-
لا بد من معرفة أن الكفر كالفسق والظلم ينقسم إلى قسمين: كفر ظلم فسق يخرج عن الملة، وكل ذلك يعود للاستحلال القلبي، وخلاف ذلك يعود إلى الاستحلال العملي.
অর্থাৎ জানা আবশ্যক যে, ফিসক এবং যুলমের ন্যায় কুফরও দু'প্রকার। প্রথমত, এমন কুফর, ফিসক, যুলম যা মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আর এ সকল পাপই ইস্তিহলালুল কলবী তথা কোনো বস্তু হালাল হওয়ার ব্যাপারে অন্তরের মাধ্যমে বিশ্বাস করা। আর এর বিপরীত যে কুফর মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে না, তা ফিরবে ইস্তিহলালুল আমলী তথা কাজের মাধ্যমে হালাল করার দিকে। ২৫৫
এমনিভাবে তার নিকট কুফরের প্রতি সন্তুষ্টি দু'প্রকারের। এক: অন্তরের মধ্যে কুফরের প্রতি সন্তুষ্টি, যা ব্যক্তিকে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। দুই: প্রকাশ্য কাজের মাধ্যমে কুফরীর প্রতি সন্তুষ্টি, যা ব্যক্তিকে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে না।
নিরসন: এটি বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী ও বাতিলপন্থী বিদআতীদের বিভক্তিকরণ, যা সালাফে সালেহীনের কেউই করেননি। হালাল হওয়ার বিশ্বাস করা হয়ে থাকে অন্তরের মাধ্যমে। তাই যে ব্যক্তি প্রকাশ্য কাজের মাধ্যমে কোনো গুনাহকে হালাল করলো, তাহলে তো এর আগেই সে অন্তরে ও তার মন-মানসিকতায় তা হালাল হওয়ার বিশ্বাস করে নিয়েছে। কেননা, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য উভয়ের মাঝে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে কুফর ব্যতীত অন্য কোনো গুনাহকারীকে বলা যাবে না যে, সে গুনাহে নিপতিত হওয়ার কারণে সে উক্ত গুনাহকে হালাল সাব্যস্তকারী হয়ে গেছে। হালালকরণ অন্তরকে উন্মাদনা দেয় ও অন্তরকে মানিয়ে নেয় এবং উক্ত বিষয়ে তার দ্বারা করিয়ে নেয়। আর শুধু গুনাহ করা অন্য জিনিস, তাকে হালালকরণের নাম দেয়া হবে না। কেননা, ইস্তিহলাল হলো গুনাহটি করা হালাল হওয়ার ব্যাপারে অন্তরে বিশ্বাস করা। তাই প্রত্যেক গুনাহকারীই যেহেতু হালালকারী হয় না, তাই তাকে ইস্তিহলালকারী বলা হবে না।
মানুষ যখন ঐকমত্য সমর্থিত কোনো হারাম জিনিসকে হালাল করে অথবা ঐকমত্য সমর্থিত কোনো হালাল জিনিসকে হারাম করে কিংবা ঐকমত্য সমর্থিত কোনো শরয়ী হুকুমকে পরিবর্তন করে, তখন সে ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। - ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ.

টিকাঃ
২৫৫. মাওসূআতুল আলবানী ফিল আকীদা: ৪/২৭৭ (মারকাযুন নুমান, সানআ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00