📄 হারামকে হালালকারী ব্যক্তি কাফের হয়ে যাওয়ার কারণ
১. আল্লাহ তাআলার হারামকৃত বস্তুকে হালাল করার কারণে হালালকারী আল্লাহর ফয়সালাকে প্রত্যাখ্যান করলো, তাঁর ফয়সালা থেকে বিমুখ হয়ে গেলো, তাঁর দেয়া ফয়সালা অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানালো। যার ফলে সে কুফরে আকবারে লিপ্ত হয়ে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, তার মাঝে একেবারেই ঈমান নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
فَلا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجاً مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيماً.
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা ততোক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতোক্ষণ না তারা আপনাকে বিবাদমান বিষয়সমূহে বিচারক বানাবে। অতঃপর আপনার ফয়সালাকৃত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের মনে কোনো দ্বিধা-সংশয় না রাখবে এবং হৃষ্টচিত্তে তারা তা মেনে নিবে।”২৪০
আদ্দুররুল মানসূরে বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي الأسود قَالَ: اختصم رجلانِ إِلَى رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَقضَى بَينهمَا فَقَالَ الَّذِي قضي عَلَيْهِ: ردنا إِلَى عمر بن الخطاب. فَقَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: نعم انطلقا إلى عمر. فَلَمَّا أَتَيَا عمر قَالَ الرجل: يا ابن الخطاب قضى لي رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم على هَذَا فَقَالَ: ردنا إلى عمر فَرَدَّنَا إِلَيْكَ. فَقَالَ: أَكَذَلِكَ قَالَ: نعم، فَقَالَ عمر : مَكَانَكُمَا حَتَّى أخرج إِلَيْكُمَا فأقضي بَيْنَكُمَا فَخرج إِلَيْهِمَا مُشْتَمِلًا على سَيْفِهِ فَضرب الَّذِي قال: ردنا إلى عمر فقتله وأدبر الآخر فَارًّا إِلَى رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَقَالَ: يَا رَسُول الله قتل عمر وَاللَّهِ صَاحِبِي وَلَوْلَا أَنِّي أَعْجَرْته لَقَتَلَنِي. فَقَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: ما كنت أظن أن يجترىء عمر على قتل مؤمنين فأنزل الله {فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ} الآية. فهدر دم ذلك الرجل وبرأ عمر من قتله.
অর্থাৎ আবুল আসওয়াদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দু'জন ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট বিচার দায়ের করে। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাঝে ফয়সালা করে দিলেন। তখন যার বিরুদ্ধে ফয়সালা হলো, সে বললো, আমাদেরকে উমার রাযি.-এর নিকট পাঠান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঠিক আছে, তোমরা উমারের কাছেই যাও। অতঃপর তারা দু'জন যখন উমার রাযি.-এর নিকট এলো, তখন যার পক্ষে ফয়সালা হয়েছিলো সে বললো, হে উমার পুত্র, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ লোকটির বিপরীত আমার পক্ষে রায় দিলে লোকটি বললো, আমাদেরকে উমার রাযি.-এর নিকট পাঠান। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তখন যার বিপক্ষে রায় হয়েছিলো উমার রাযি. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বিষয়টি কি এমনই? সে বললো, হ্যাঁ।
তারপর উমার রাযি. বললেন, তোমরা নিজ স্থানে থাকো। আমি এসে তোমাদের বিচার করবো। তারপর তিনি একটি তলোয়ার নিয়ে বের হলেন। অতঃপর যে বলেছিলো, আমাদেরকে উমারের নিকট পাঠান তাকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করে দিলেন। অন্যজন পিছন দিক ফিরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট দৌঁড় দিয়ে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ! উমার আমার সঙ্গীকে হত্যা করেছে। আমি যদি তাকে অক্ষম না করতাম (অর্থাৎ তার কাছে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিচার মেনে নেয়ার কথা না বলতাম) তাহলে সে আমাকেও মেরে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমার ধারণাই ছিলো না যে, উমার একজন মুমিনকে হত্যা করার মতো স্পর্ধা দেখাবে! তারপর আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন- "কিন্তু না আপনার রবের শপথ! তারা ততোক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না; যতক্ষণ না তারা আপনাকে বিবাদমান বিষয়সমূহে বিচারক বানাবে।” অতএব নিহত লোকটির রক্ত বৃথা গেলো। আর আল্লাহ তাআলা উক্ত হত্যা থেকে উমার রাযি.-কে মুক্ত করলেন। ২৪১
২. আল্লাহর হারামকৃত বস্তুকে হালাল করে, আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করার দ্বারা হালালকারী আল্লাহর ফয়সালাকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করলো। বিষয়টি এরকম যে, আল্লাহ তাআলা বললেন, এ বস্তুটি হারাম। আর সে এসে বললো, না; বরং তা হালাল। অথবা আল্লাহ বললেন, অমুক জিনিসটি হালাল। সে এসে বললো, না; বরং তা হারাম। এটা সরাসরি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ এবং কুফরে বাওয়াহ তথা সুস্পষ্ট কুফরী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ.
“আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই। আর তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।”২৪২
তিনি আরো বলেন-
إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ.
“নিশ্চয় আল্লাহ তাই আদেশ দেন, যা তিনি চান।”২৪৩
৩. আল্লাহর হারামকৃত বস্তুকে হালাল করে হালালকারী বলতে চাচ্ছে, আল্লাহ তাঁর দীনের মধ্যে যা শরীয়তসম্মত করেছেন, তাতে আল্লাহ ভুল করেছেন। সে আল্লাহর ব্যাপারে অপূর্ণতা ও দুর্বলতা আরোপ করছে, যদ্বারা সে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করছে। আর নিঃসন্দেহে এটি কুফরে বাওয়াহ তথা সুস্পষ্ট কুফরী।
এর দৃষ্টান্ত এরূপ যে, আল্লাহ তাআলা কোনো বিষয়ে বলছেন, এটা হারাম। আর সে এসে বললো না; বরং তা হালাল। কেননা, এটির হারামকরণ শুদ্ধ ও বৈধ হয়নি। তা যুগের উপযোগী হয়নি। মানব সভ্যতার সাথে এর হারামকরণ মিলে না। তা মানব সভ্যতার চাহিদা পূরণ করে না। আর নিশ্চয়ই এ ধরনের কথাবার্তা সুস্পষ্ট কুফরী।
৪. আল্লাহর হারামকৃত বস্তুকে হালালকারী নিজেকে আল্লাহর অংশীদাররূপে দাঁড় করিয়েছে। বিধান দান ও আইন প্রণয়নে আল্লাহকে ছেড়ে নিজেকে যুক্ত করেছে, যা সরাসরি কুফর ও শিরক।
তার দৃষ্টান্ত এরকম যে, আল্লাহ তাআলা বলছেন, “আল্লাহ ছাড়া বিধানদাতা কেউ নেই।” [সূরা আনআম: ৫৭] আর সে এসে বলতে চাইছে, না; বরং আমি ছাড়া বিধানদাতা কেউ নেই। আমি যা হালাল বলবো, তাই হালাল। আমি যা হারাম বলবো, তাই হারাম। এ ব্যাপারে সবাইকে আমার আনুগত্য করতে হবে।
আর এটাই তো উলুহিয়্যাতের দাবি, যা করেছিলো ফেরাউন। সে বলেছিলো, “হে পরিষদবর্গ, আমি জানি না যে, আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য আছে।” [সূরা কাসাস: ৩৮] অর্থাৎ আমার জানা নেই যে, আমি ব্যতীত তোমাদের এমন কোনো সত্তা আছে কিনা, যাকে তোমরা আনুগত্য করবে এবং তিনি এ সকল বিষয়ে বিধান দিবেন। তাই আইন প্রণয়ন, হালালকরণ, হারামকরণ একমাত্র আমার ক্ষমতা, অন্য কেউ এর উপযুক্ত নয়। আর এটাই তাগুত ফেরাউনের উলুহিয়্যাতের দাবি, যা সে নিজের জন্য করে নিকৃষ্ট কাফেরে রূপান্তরিত হয়েছিলো।
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَداً.
“বিধানদানের ক্ষেত্রে তিনি কাউকে অংশীদার করেন না।”২৪৪
এখন হালালকারী এসে বলবে, বরং আমি বিধানদান ও আইন প্রণয়নের ব্যাপারে আল্লাহর অংশীদার, যা মানুষকে দীনের মতোই পালন করতে হবে। আল্লাহ যা হালাল বলেছেন তা নয়; বরং আমি যা হালাল বলবো তাই হালাল। আল্লাহ যা হারাম বলেছেন তা নয়; বরং আমি যা হারাম বলবো তাই হারাম। আর এটি এমন শিরক এবং কুফরে বাওয়াহ, যা আল্লাহ তাআলা পরিশুদ্ধ তাওবা ব্যতীত ক্ষমা করবেন না।
৫. আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত জিনিসকে হালালকারী যেনো নিজ প্রবৃত্তিকে উপাস্যতুল্য বলছে। সে নিজ প্রবৃত্তিকে ইবাদত ও আনুগত্য পাওয়ার যোগ্য বিবেচনা করছে। ফলে তার প্রবৃত্তি যা কিছুকে হালাল বলবে, তাই হালাল এবং যা কিছুকে হারাম বলবে, তাই হারাম। মূলত সে তার প্রবৃত্তির পূজা করছে, এছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন- أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ. “আপনি কি দেখেননি, যে নিজ প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে। আল্লাহ জ্ঞাতসারেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।”২৪৫
তিনি আরো বলেন- وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدىً مِنَ اللَّهِ. “আল্লাহর হিদায়াতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে? ২৪৬
তিনি আরো বলেন- وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ. “আপনি তার অনুগত্য করবেন না, যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং সে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে।”২৪৭
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
فَمَنْ كَانَ يَعْبُدُ مَا يَهْوَاهُ فَقَدْ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ فَمَا هَوِيَهُ هَوِيَةٍ إِلَهُهُ فَهُوَ لَا يَتَأَلَّهُ مَنْ يَسْتَحِقُّ التَّأَلُّهَ بَلْ يَتَأَلَّهُ مَا يَهْوَاهُ وَهَذَا الْمُتَّخِذُ إِلَهَهُ هَوَاهُ لَهُ مَحَبَّةٌ كَمَحَبَّةِ الْمُشْرِكِينَ لِآلِهَتِهِمْ، وَمَحَبَّةِ عُبَّادِ الْعِجْلِ لَهُ وَهَذِهِ مَحَبَّةٌ مَعَ اللَّهِ لَا مَحَبَّةُ لِلَّهِ وَهَذِهِ مَحَبَّةُ أَهْلِ الشَّرْكِ.
অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বীয় মন যা চায় তার ইবাদত করে (প্রকৃতপক্ষে) সে তার প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করলো। সে যাকে মন চায় ইলাহ বানায়। কিন্তু যে সত্তা ইলাহ হওয়ার উপযুক্ত তাকে সে ইলাহরূপে গ্রহণ করে না; বরং সে যাকে চায় তাকে ইলাহরূপে গ্রহণ করে। আর এ ব্যক্তিই হলো নিজ প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণকারী। মুশরিকরা নিজেদের উপাস্যকে যেরকম ভালোবাসে, গো-পূজারিরা গরুকে যেরকম ভালোবাসে, সেও নিজ প্রবৃত্তিকে সেরূপ ভালোবাসে। আর এটি হলো আল্লাহর সাথে সাথে অন্য কাউকে ভালোবাসা, এটি আল্লাহর জন্য ভালোবাসা নয়। আর মুশরিকরাই এ ধরনের ভালোবাসা পোষণ করে। ২৪৮
এ সমস্ত কারণে উম্মতের পূর্বসূরী ও উত্তরসূরীগণের সকলে একমত যে, আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত বস্তুকে হালালকারী এবং হালালকৃত বস্তুকে হারামকারী কাফের। এ ব্যাপারে কোনো আলেমই ভিন্নমত পোষণ করেননি।
টিকাঃ
২৪০. সূরা নিসা: ৬৫
২৪১. আদ্দুররুল মানসূর: ২/৫৮৫ (দারুল ফিকর, বৈরূত)
২৪২. সূরা রাদ: ৪১
২৪৩. সূরা মায়িদা: ০১
২৪৪. সূরা কাহফ: ২৬
২৪৫. সূরা জাসিয়া: ২৩
২৪৬. সূরা কাসাস: ৫০
২৪৭. সূরা কাহফ: ২৮
২৪৮. মাজমূউল ফাতাওয়া: ৮/৩৫৯ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদীনা)
📄 হারামকে হালালকারী ব্যক্তির তাওবা কবুলের শর্তসমূহ
পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, মুরতাদের ব্যাপারে বিধান হলো, তাকে কুফর থেকে তাওবা করার জন্য বলা হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ.
“তবে যারা তাওবা করে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে আর সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, আমি সে সমস্ত লোকের তাওবা কবুল করি। আর আমি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।”২৪৯
আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন, তিনি রিদ্দাহ বা ধর্মত্যাগের পর তাওবাকারীর জন্যও ক্ষমাশীল ও দয়ালু। এদ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতে তার ক্ষমার আশা করা যায়। তাই তাওবা চাওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা যাবে না। অর্থাৎ তাওবা তার উপর থেকে হত্যার শাস্তিকে বাদ করে দিবে এবং তার পূর্বের গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দিবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ. فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.
“অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসসমূহ অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন মুশরিকদেরকে যেখানে পাবে হত্যা করো। কিন্তু যদি তারা তাওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দিবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।”২৫০
আর সাহাবায়ে কেরামের ইজমাও এর পক্ষে। যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করলেন মক্কা, মদীনা ও তায়েফ অঞ্চল ব্যতীত অধিকাংশ আরব মুরতাদ হয়ে যায়। একদল লোক মুসাইলামা, আনসী, তুলায়হা আসাদীর মতো ভণ্ড নবুয়তের দাবিদারদের অনুসারী হয়। তাদের অধিকাংশই ইসলামে ফিরে আসা পর্যন্ত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এবং সকল সাহাবী রাযি. তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. তাদের ফিরে আসাকে মেনে নিলেন। যারা ইসলামে ফিরে এসেছে তাদের একজনকেও এর পরে আর হত্যা করা হয়নি। ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে আবার ফিরে আসা একজন বড় নেতা হলো মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার তুলায়হা আসাদী, আশআস বিন কাইস। আর এ ব্যাপারটি কোনো গোপনীয় বিষয় নয়; বরং সকলের নিকটই তা স্পষ্ট।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন- من كان كفره بإنكار أمر ضروري كحرمة الخمر مثلاً أنه لابد من تبرؤه مما كان يعتقده، لأنه كان يقر بالشهادتين معه، فلابد من تبرؤه منه، كما صرح به الشافعية، وهو ظاهر رد المحتار من الارتداد. قلت: وفي جامع الفصولين: ثم لو أتى بكلمة الشهادة على وجه العادة لم ينفعه ما لم يرجع عما قال، إذ لا يرتفع بها كفره.
অর্থাৎ যে ব্যক্তি দীনের স্বতঃসিদ্ধ কোনো বিধানকে অস্বীকার করার কারণে কাফের হয়ে যাবে; যেমন মদ হারাম হওয়া, তাহলে সে যে বিশ্বাস পালন করে তা থেকে তার মুক্ত হওয়া আবশ্যক। কারণ, সে এ বিশ্বাস নিয়েই তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছিলো। তাই তাকে আগে এ বিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে হবে; যেমনটা শাফেয়ীগণ উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে রদ্দুল মুহতারের ভাষ্য থেকে উক্ত ব্যক্তি মুরতাদ হওয়া বুঝা যায়। আমি বলবো, জামিউল ফুসূলাইনে আছে- সে যা বলেছে তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা ব্যতীত যদি সে অভ্যাসবশত কালিমায়ে শাহাদত পাঠ করে, তাহলে এ পাঠ করার দ্বারা তার কোনো উপকার হবে না। কেননা, এতে তার কুফরী বিদূরিত হয়ে যাবে না।” ২৫১
সে কাফেরই থেকে যাওয়ার কারণ তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য অস্বীকার করা নয়; বরং সে মদকে হালাল করা এবং মদের হারাম হওয়াকে অস্বীকার করার কারণে সে কাফের হয়ে গেছে। আর যার অবস্থা এমন হবে, ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া ও তার কাফের হওয়ার কারণটি মূলোৎপাটিত করা পর্যন্ত সে যদি অন্য সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে আনুগত্য করে, তবুও তা তার কোনো উপকারে আসবে না। তার থেকে কুফর ও ইরতিদাদের হুকুম উঠে যেতে হলে তাকে তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্যদানের সাথে সাথে উক্ত বিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে হবে এবং ঈমান ভঙ্গকারী উক্ত বিষয় থেকে তাকে তাওবা করতে হবে।
মাসআলাটি স্পষ্ট করার জন্য এ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে যে, যদি কেউ বলে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয নয়। মুসলমানদের উপর তা আদায় করা আবশ্যক নয়। তা সত্ত্বেও সে নামায পড়ে, রমযানের রোযা রাখে, বায়তুল্লাহর হজ করে, আল্লাহর পথে জিহাদ করে, আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট সকল ইবাদত করে। কিন্তু তার এ সকল ইবাদত কোনো কাজেই আসবে না। এগুলো নতুন করে তাকে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করাবে না; যতোক্ষণ না সে তার পূর্বে বলা কথার মূলোৎপাটন করে নামায ফরয হওয়া ও তা আদায় করা ফরয হওয়ার ব্যাপারটি স্বীকার করে নিবে। আর এটি স্পষ্ট। এতে কোনো ধরনের মতানৈক্য নেই।
বোঝা গেলো, নেককাজ যতোই বড় হোক, যদি তার মোকাবেলায় কুফরে বাওয়াহ বা শিরকে আকবার আসে, তাহলে শাহাদতের সাক্ষ্য দিলেও তার জন্য সুপারিশের কারণ হবে না এবং তা তার কোনো ধরনের উপকারও করতে পারবে না। আল্লাহর ইচ্ছায় তা তখনই উপকারী হবে, যখন কুফর ও শিরক থেকে মুক্ত থাকা হবে এবং যখন কাজটি একদিক থেকে কুফরী হওয়ার সম্ভাবনা রাখবে এবং অপর দিক থেকে কুফরী না হওয়ার সম্ভাবনা রাখবে।
টিকাঃ
২৪৯. সূরা বাকারা: ১৬০
২৫০. সূরা তাওবা: ০৫
২৫১. ইকফারুল মুলহিদীন: পৃ. ৬৩ (আল মাজলিসুল ইলমী, পাকিস্তান)
📄 একটি সংশোধন ও সতর্কীকরণ
উম্মতের পূর্বসূরী ও উত্তরসূরী উলামায়ে কেরাম ইজতিহাদী বিভিন্ন বিষয়ে হালাল ও হারাম হওয়া নিয়ে মতভেদ করেছেন, বাতিল হওয়া না হওয়া নিয়ে ভিন্নমত অবলম্বন করেছেন। কিন্তু কখনো যিনি কোনো বস্তুকে হালাল বলেছেন, তিনি হারাম বলে ফাতওয়া দানকারীকে কাফের বলেননি অথবা যিনি কোনো বস্তুকে হারাম বলেছেন, তিনি হালাল বলে ফাতওয়া দানকারীকে কাফের বলেননি। কেননা, হালাল-হারাম বা অন্য কোনো মাসআলাতে তাদের ভুল হওয়া শরীয়তের বিরোধিতা বা শরীয়তের প্রতি মিথ্যা আরোপের কারণে হয়নি; বরং তাদের মতপার্থক্যের কারণ হলো, শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত ইজতিহাদ ও তাবীল। তাদের ধারণা ছিলো, তারা নিজ ইজতিহাদের কারণে যে ফলাফল বের করেছেন তা সঠিক হয়েছে এবং তা শরীয়ত অনুযায়ী হয়েছে। তাই যার অবস্থা এমন হবে, তার ব্যাপারে উক্ত মূলনীতি প্রয়োগ করা জায়েয হবে না যে, “যে হারামকে হালাল করবে সে কুফরী করলো।” বরং যিনি শরীয়তসম্মত ইজতিহাদ করেও ভুল করবেন তার জন্য রয়েছে একগুণ সাওয়াব আর যিনি সঠিক সিদ্ধান্ত দিবেন তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব।
যেমন সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ عَمْرِو بْنِ العَاصِ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرُ.
আমর বিন আস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, যখন কোনো ফয়সালাদাতা ফয়সালা দিতে গিয়ে ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবে, তবে তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান। আর যে ইজতিহাদ করেও ভুল সিদ্ধান্ত দিবে, তার জন্য রয়েছে একগুণ প্রতিদান। ২৫২
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
فَتَبَيَّنَ أَنَّ الْمُجْتَهِدَ مَعَ خَطَئِهِ لَهُ أَجْرُ؛ وَذَلِكَ لِأَجْلِ اجْتِهَادِهِ وَخَطَؤُهُ مَغْفُورُ لَهُ؛ لِأَنَّ دَرْكَ الصَّوَابِ فِي جَمِيعِ أَعْيَانِ الْأَحْكَامِ إِمَّا مُتَعَذِّرُ أَوْ مُتَعَسِّرُ وَقَدْ قَالَ تَعَالَى: {وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ}
অর্থাৎ সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, মুজতাহিদ ভুল করলে তার জন্য রয়েছে একগুণ প্রতিদান। প্রতিদানের কারণ হলো তার ইজতিহাদ। আর তার ভুলটি ক্ষমা করা হবে। কেননা, প্রত্যেক বিধানের ক্ষেত্রে সঠিকতায় পৌঁছানো হয় অসম্ভব, নয় তো অনেক কঠিন। ২৫৩
তিনি আরো বলেন-
فَإِنَّ الْإِيمَانَ بِوُجُوبِ الْوَاجِبَاتِ الظَّاهِرَةِ الْمُتَوَاتِرَةِ وَتَحْرِيمِ الْمُحَرَّمَاتِ الظَّاهِرَةِ الْمُتَوَاتِرَةِ: هُوَ مِنْ أَعْظَمِ أُصُولِ الْإِيمَانِ وَقَوَاعِدِ الدِّينِ وَالْجَاحِدُ لَهَا كَافِرُ بِالاتَّفَاقِ مَعَ أَنَّ الْمُجْتَهِدَ فِي بَعْضِهَا لَيْسَ بِكَافِرِ بِالْاتَّفَاقِ مَعَ خَطَئِهِ.
অর্থাৎ সর্বসম্মতিক্রমে স্পষ্ট মুতাওয়াতির ফরযসমূহের আবশ্যকীয়তার প্রতি ঈমান রাখা এবং স্পষ্ট মুতাওয়াতির হারামসমূহের প্রতি হারাম হওয়ার ব্যাপারে ঈমান রাখা ঈমানের বৃহৎ একটি মূলনীতি ও দীনের একটি মূলভিত্তি। আর এর অস্বীকারকারী কাফের। অন্যদিকে সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও ফরয হওয়ার ব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্তকারী মুজতাহিদ কাফের নয়। ২৫৪
টিকাঃ
২৫২. সহীহ বুখারী: ৯/১০৮, হা. নং ৭৩৫২ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
২৫৩. মাজমুউল ফাতাওয়া: ২০/২৫২ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদীনা)
২৫৪. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১২/৪৯৬ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, সৌদিআরব)
📄 একটি সংশয়ের অপনোদন
সংশয়: বর্তমান কালের মুরজিয়ারা বিদআতপূর্ণ একটি বিভক্তিকরণ করে থাকে। তারা ইস্তিহলালকে দু'ভাগে ভাগ করে। এক. কোনো হারামকে অন্তরের মধ্যে ইস্তিহলাল করা। এটা ব্যক্তিকে দীন থেকে বের করে দেয়। দুই. প্রকাশ্য আমলের মাধ্যমে হারামকে হালাল করা। এটা দীন থেকে বের করে না।
শাইখ আলবানী রহ. বলেন-
لا بد من معرفة أن الكفر كالفسق والظلم ينقسم إلى قسمين: كفر ظلم فسق يخرج عن الملة، وكل ذلك يعود للاستحلال القلبي، وخلاف ذلك يعود إلى الاستحلال العملي.
অর্থাৎ জানা আবশ্যক যে, ফিসক এবং যুলমের ন্যায় কুফরও দু'প্রকার। প্রথমত, এমন কুফর, ফিসক, যুলম যা মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আর এ সকল পাপই ইস্তিহলালুল কলবী তথা কোনো বস্তু হালাল হওয়ার ব্যাপারে অন্তরের মাধ্যমে বিশ্বাস করা। আর এর বিপরীত যে কুফর মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে না, তা ফিরবে ইস্তিহলালুল আমলী তথা কাজের মাধ্যমে হালাল করার দিকে। ২৫৫
এমনিভাবে তার নিকট কুফরের প্রতি সন্তুষ্টি দু'প্রকারের। এক: অন্তরের মধ্যে কুফরের প্রতি সন্তুষ্টি, যা ব্যক্তিকে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। দুই: প্রকাশ্য কাজের মাধ্যমে কুফরীর প্রতি সন্তুষ্টি, যা ব্যক্তিকে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে না।
নিরসন: এটি বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী ও বাতিলপন্থী বিদআতীদের বিভক্তিকরণ, যা সালাফে সালেহীনের কেউই করেননি। হালাল হওয়ার বিশ্বাস করা হয়ে থাকে অন্তরের মাধ্যমে। তাই যে ব্যক্তি প্রকাশ্য কাজের মাধ্যমে কোনো গুনাহকে হালাল করলো, তাহলে তো এর আগেই সে অন্তরে ও তার মন-মানসিকতায় তা হালাল হওয়ার বিশ্বাস করে নিয়েছে। কেননা, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য উভয়ের মাঝে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে কুফর ব্যতীত অন্য কোনো গুনাহকারীকে বলা যাবে না যে, সে গুনাহে নিপতিত হওয়ার কারণে সে উক্ত গুনাহকে হালাল সাব্যস্তকারী হয়ে গেছে। হালালকরণ অন্তরকে উন্মাদনা দেয় ও অন্তরকে মানিয়ে নেয় এবং উক্ত বিষয়ে তার দ্বারা করিয়ে নেয়। আর শুধু গুনাহ করা অন্য জিনিস, তাকে হালালকরণের নাম দেয়া হবে না। কেননা, ইস্তিহলাল হলো গুনাহটি করা হালাল হওয়ার ব্যাপারে অন্তরে বিশ্বাস করা। তাই প্রত্যেক গুনাহকারীই যেহেতু হালালকারী হয় না, তাই তাকে ইস্তিহলালকারী বলা হবে না।
মানুষ যখন ঐকমত্য সমর্থিত কোনো হারাম জিনিসকে হালাল করে অথবা ঐকমত্য সমর্থিত কোনো হালাল জিনিসকে হারাম করে কিংবা ঐকমত্য সমর্থিত কোনো শরয়ী হুকুমকে পরিবর্তন করে, তখন সে ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। - ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ.
টিকাঃ
২৫৫. মাওসূআতুল আলবানী ফিল আকীদা: ৪/২৭৭ (মারকাযুন নুমান, সানআ)