📄 দলীল
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِداً لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ.
“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিলো একমাত্র মাবুদের ইবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তারা যা কিছু শরীক সাব্যস্ত করে তিনি তা থেকে পবিত্র। ২২৫
ইমাম বগাবী রহ. বলেন-
فَإِنْ قِيلَ: إِنَّهُمْ لَمْ يَعْبُدُوا الْأَحْبَارَ وَالرُّهْبَانَ؟ قُلْنَا: مَعْنَاهُ أَنَّهُمْ أَطَاعُوهُمْ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ وَاسْتَحَلُّوا مَا أَحَلُّوا وَحَرَّمُوا مَا حَرَّمُوا، فَاتَّخَذُوهُمْ كَالْأَرْبَابِ. رُوِيَ عَنْ عُدَيِّ بْنِ حَاتِمٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي عُنُقِي صليب من ذَهَبٍ فَقَالَ لِي: يَا عُدَيُّ اطْرَحْ هَذَا الْوَثَنَ مِنْ عُنُقِكَ، فَطَرَحْتُهُ ثُمَّ انْتَهَيْتُ إِلَيْهِ وَهُوَ يَقْرَأُ : اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللهِ، حَتَّى فَرَغَ مِنْهَا، قُلْتُ : إِنَّا لَسْنَا نَعْبُدُهُمْ ، فَقَالَ : أَلَيْسَ يُحَرِّمُونَ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فَتُحَرِّمُونَهُ ، وَيُحِلُّونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَتَسْتَحِلُّونَهُ؟ قَالَ : فَقُلْتُ : بَلَى، قَالَ : فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ.
অর্থাৎ যদি প্রশ্ন করা হয়, তারা তো পণ্ডিত ও সংসার বিরাগীদের ইবাদত করতো না। এর জবাবে বলবো, এর ব্যাখ্যা হলো, তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় গিয়ে তাদের অনুসরণ করতো। পাদ্রি ও সন্যাসীরা যা কিছু হালাল করতো তারা তা হালাল হিসেবে মেনে নিতো, তারা যা কিছু হারাম করতো তারা তা হারাম হিসেবে মেনে নিতো। এভাবেই তারা পাদ্রি ও সন্যাসীদেরকে রবের মতো করে গ্রহণ করলো। আদী বিন হাতিম রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এলাম। তখন আমার ঘাড়ে একটি স্বর্ণের ক্রুশ ছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে আদী, এ মূর্তিটিকে তোমার ঘাড় থেকে ছুঁড়ে ফেলো। আমি তা ফেলে দিলাম এবং তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটবর্তী হলাম। তখন তিনি তিলাওয়াত করছিলেন, “তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে।” যখন তিনি তিলাওয়াত শেষ করলেন, আমি বললাম, আমরা তো তাদের ইবাদত করতাম না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তারা তা হারাম করতো আর তোমরাও তা হারাম হিসেবে মেনে নিতে এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তারা তা হালাল করতো আর তোমরাও তা হালাল হিসেবে মেনে নিতে? আমি বললাম, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটাই তাদের ইবাদত। ২২৬
আদী রাযি. জানতেন না যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রমাণ থাকা ব্যতীত পাদ্রি ও সন্যাসী কর্তৃক হালালকরণ ও হারামকরণের ক্ষেত্রে আনুগত্য করা মানে তাদের ইবাদত করা। আর ইবাদতের সামান্য পরিমাণও আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো জন্য করা জায়েয নয়। আর এ ধরনের আনুগত্য শিরকে আকবার।
আদী রাযি. জানতেন না যে, হালালকরণ ও হারামকরণের ক্ষেত্রে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে মানা তার ইবাদত করার নামান্তর। এটা আল্লাহর সাথে সুস্পষ্ট শিরক। তবে এটা শিরকী বিশ্বাস হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উপর কাফের, মুরতাদের হুকুম আরোপ করেননি বা নতুন করে তাকে আবার ইসলাম গ্রহণ করতে বলেননি। কারণ, তিনি ছিলেন নওমুসলিম। আর একজন নওমুসলিমের জন্য এ বিষয়টি না জানা স্বাভাবিক।
তাফসীরে তাবারীতে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ أَبِي الْبَخْتَرِيِّ قَالَ: قِيلَ لِحُذَيْفَةَ: أَرَأَيْتَ قَوْلَ اللَّهِ: {اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ} [التوبة: ٣١] قَالَ: أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَصُومُونَ لَهُمْ، وَلَا يُصَلُّونَ لَهُمْ، وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحِلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ، وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا أَحَلَّهُ اللَّهُ لَهُمْ حَرَّمُوهُ، فَتِلْكَ كَانَتْ رُبُوبِيَّتَهُمْ.
অর্থাৎ আবুল বাখতারী রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযাইফা রাযি.-কে বলা হলো, আল্লাহ তাআলার বাণী "তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে।” এ সম্পর্কে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন, তারা তাদের উদ্দেশ্যে রোযা রাখতো না, তাদের উদ্দেশ্যে নামায পড়তো না; বরং তারা যখন কোনো কিছুকে হালাল বলতো, তারা তা হালাল হিসেবে মান্য করতো। আর তারা যখন আল্লাহ কর্তৃক হালালকৃত কোনো কিছুকে হারাম করতো, তারা তা হারাম হিসেবে মান্য করতো। এটাই তাদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করা।২২৭
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন- وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقُ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ.
“যেসব জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়নি, সেগুলো ভক্ষণ করো না; এ ভক্ষণ করা গুনাহ। নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে, যেনো তারা তোমাদের সাথে তর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো, তোমরাও মুশরিক হয়ে যাবে।”২২৮
মানে তারা যা কিছু হালাল করে এবং যা হারাম করে, তোমরা যদি তাদেরকে সেক্ষেত্রে অনুসরণ করো, তাহলে তোমরাও মুশরিক হয়ে যাবে।
আল্লামা বগাভী রহ. বলেন- وَذَلِكَ أَنَّ الْمُشْرِكِينَ قَالُوا: يَا مُحَمَّدُ أَخْبِرْنَا عَنِ الشَّاةِ إِذَا مَاتَتْ مَنْ قَتَلَهَا؟ فَقَالَ: اللَّهُ قَتَلَهَا، قَالُوا: أَفَتَزْعُمُ أَنَّ مَا قَتَلْتَ أَنْتَ وَأَصْحَابُكَ حَلَالُ، وَمَا قَتَلَهُ الْكَلْبُ وَالصَّقْرُ حَلَالُ، وَمَا قَتَلَهُ اللهُ حَرَامٌ؟ فَأَنْزَلَ اللهُ هَذِهِ الْآيَةَ، وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ، فِي أَكْلِ الْمَيْتَةِ، إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ، قَالَ الزَّجَّاجُ: وَفِيهِ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّ مَنْ أَحَلَّ شَيْئًا مِمَّا حَرَّمَ اللَّهُ أَوْ حَرَّمَ مَا أَحَلَّ الله فهو مشرك.
অর্থাৎ আর তা (তর্ক) হলো, মুশরিকরা বললো, হে মুহাম্মাদ, যে ছাগলগুলো মারা গেলো, আমাদেরকে বলো, এগুলোকে কে মারলো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাদেরকে মেরেছেন। তারা বললো, তুমি কি এ রকম ধারণা করো যে, তুমি এবং তোমার সাথীরা যেগুলো মারো তা হালাল, কুকুর, বাজপাখি যা শিকার করে তাও হালাল আর আল্লাহ যা মারেন তা হারাম? অতঃপর আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন, “যদি তোমরা তাদের অনুসরণ করো” তথা মৃত প্রাণী ভক্ষণের ক্ষেত্রে, “তাহলে তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে।” যাজ্জাজ বলেন, এতে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত বস্তুকে হালাল করবে এবং হালালকৃত বস্তুকে হারাম করবে সে মুশরিক। ২২৯
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
وَقَوْلُهُ تَعَالَى: وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ أَيْ حَيْثُ عَدَلْتُمْ، عَنْ أَمْرِ اللَّهِ لَكُمْ وَشَرْعِهِ إِلَى قَوْلِ غَيْرِهِ، فَقَدَّمْتُمْ عَلَيْهِ غَيْرَهُ، فَهَذَا هو الشرك، كقوله تَعَالَى: اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْباباً مِنْ دُونِ اللهِ [التوبة: ٣١] الآية.
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার বাণী- “আর যদি তোমরা তাঁদের অনুসরণ করো, তাহলে তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে।” তথা যদি তোমরা আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট বিষয় এবং তাঁর শরীয়ত থেকে সরে অন্য কারো কথার দিকে গিয়ে তোমরা শরীয়তের উপর উক্ত কথাকে প্রাধান্য দাও, তাহলে তা প্রকৃষ্ট শিরক। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পাদ্রি ও সন্যাসীদেরকে নিজেদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।” [সূরা তাওবা: ৩১/২৩০
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
وَالْإِنْسَانُ مَتَى حَلَّلَ الْحَرَامَ - الْمُجْمَعَ عَلَيْهِ - أَوْ حَرَّمَ الْحَلَالَ - الْمُجْمَعَ عَلَيْهِ - أَوْ بَدَّلَ الشَّرْعَ - الْمُجْمَعَ عَلَيْهِ - كَانَ كَافِرًا مُرْتَدًا بِاتِّفَاقِ الْفُقَهَاءِ.
অর্থাৎ মানুষ যখন ঐকমত্য সমর্থিত কোনো হারাম জিনিসকে হালাল করে অথবা ঐকমত্য সমর্থিত কোনো হালাল জিনিসকে হারাম করে কিংবা ঐকমত্য সমর্থিত কোনো শরয়ী হুকুমকে পরিবর্তন করে, তখন সে ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। ২৩১
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقاً مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ.
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোনো দলের কথা মান্য করো, তাহলে ঈমান আনার পর তারা তোমাদেরকে কাফেরে পরিণত করে দিবে।”২৩২
তিনি আরো বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ.
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা যদি কাফেরদের কথা শোনো, তাহলে তারা তোমাদেরকে পিছনে ফিরিয়ে দিবে। ফলে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।”২৩৩
উল্লিখিত আয়াতসমূহে তাদের আনুগত্য দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর হারামকৃত বিষয়কে হালাল করার ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা অথবা আল্লাহ যা মন্দ বলে উল্লেখ করেছেন তাকে উত্তম বলার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা কিংবা আল্লাহ যাকে উত্তম বলেছেন তাকে মন্দ বলার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা।
ইস্তিহসান তথা উত্তমতার হুকুম দেয়া; ইস্তিহলাল তথা হালালকরণের চেয়েও অধিক ব্যাপক। কেননা, প্রত্যেক ইস্তিহসানকারী ইস্তিহলাল করে থাকে, কিন্তু প্রত্যেক ইস্তিহলালকারী ইস্তিহসান করে না। শাফেয়ী রহ. বলেন, যে উত্তমতার হুকুম দিলো সে আইন প্রণয়ন করলো।
টিকাঃ
২২৫. সূরা তাওবা: ৩১
২২৬, তাফসীরে বগাবী: ২/৩৪০, হা. নং ১০৫৮ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
২২৭. তাফসীরে তাবারী: ১০/১১৫, হা. নং ১৬৬৩৬ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
২২৮. সূরা আনআম: ১২১
২২৯. তাফসীরে বগাবী: ২/১৫৬, হা. নং ৮৮৯ সংশ্লিষ্ট (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
২৩০. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৩/২৯৫ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
২৩১. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩/২৬৭ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদীনা)
২৩২. সূরা আলে ইমরান: ১০০
২৩৩. সূরা আলে-ইমরান: ১৪৯