📄 ৩ নং মাসআলা
মুসলিম হওয়ার জন্য এটা কোনো শর্ত নয় যে, তাওহীদের কালেমা উচ্চারণ করার পরে তাকে এর ব্যাখ্যা বলতে হবে কিংবা সে তাওহীদ এবং তাওহীদ ভঙ্গকারী কারণসমূহ বুঝতে পেরেছে এমন কোনো নিদর্শন তাকে পেশ করতে বলা হবে। মূলত এসব কতিপয় মূর্খ বাড়াবাড়িকারী লোকের কাজ, যার নির্দেশ শরীয়ত দেয়নি; বরং এটি সুন্নাহবিরোধী একটি কাজ। উম্মাহর প্রত্যেক ব্যক্তির উপর এ ধরনের কোনো কাজ আবশ্যক নয়।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ السُّلَمِيِّ، قَالَ: بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .... فَقَالَ لَهَا: أَيْنَ اللَّهُ؟ قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ، قَالَ: مَنْ أَنَا؟ قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ، قَالَ: أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ.
মুআবিয়া ইবনুল হাকাম আস সুলামী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর সাথে নামায পড়লাম.... অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে (দাসীকে) জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কোথায়? সে বললো, আকাশে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? সে বললো, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন তিনি (তার মনিব মুআবিয়া ইবনুল হাকাম রাযি.-কে) বললেন, তাকে মুক্ত করে দাও। কেননা, সে একজন মুমিন নারী। ১৭৩
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন দাসীর ঈমান থাকার ব্যাপারে ফয়সালা করলেন শুধু তার এ কথার উপর যে, আল্লাহ তাআলা আকাশে এবং তিনি আল্লাহর রাসূল।
এমনিভাবে একব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুনে বলেছিলেন, তুমি জাহান্নাম থেকে মুক্ত। এছাড়াও আরো অনেক বর্ণনা রয়েছে, যেখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু কালিমাতুত তাওহীদের উচ্চারণের ভিত্তিতে তাদের ঈমান থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাদের কাছে তিনি ব্যাখ্যা চাননি বা এর শর্তসমূহ মুখস্থ বলতে বলেননি।
ইমাম গাযালী রহ. বলেন- أَسْرَفَتْ طَائِفَةٌ فَكَفَّرُوا عَوَامَ الْمُسْلِمِينَ وَزَعَمُوا أَنَّ مَنْ لَمْ يَعْرِفِ الْعَقَائِدَ الشَّرْعِيَّةَ بِالْأَدِلَّةِ الَّتِي حَرَّرُوهَا فَهُوَ كَافِرُ فَضَيَّقُوا رَحْمَةَ اللَّهِ الْوَاسِعَةَ وَجَعَلُوا الْجَنَّةَ مُخْتَصَّةً بِشِرْذِمَةٍ يَسِيرَةٍ مِنَ الْمُتَكَلِّمِينَ.
অর্থাৎ একদল লোক সীমালঙ্ঘন করে ব্যাপকভাবে মুসলমানদেরকে কাফের বলে অভিহিত করলো। তারা ধারণা করছিলো, যদি কেউ শরয়ী আকীদাসমূহ সুপ্রমাণিত দলীলের আলোকে না জানে, তাহলে সে কাফের। তারা আল্লাহর প্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করে জান্নাতকে কতিপয় ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তর্ককারী কিছু মানুষের সাথে নির্দিষ্ট করে দিলো। ১৭৪
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন-
وَتَقَلَ عَنْ أَكْثَرِ أَئِمَّةِ الْفَتْوَى أَنَّهُمْ قَالُوا لَا يَجُوزُ أَنْ تُكَلِّفَ الْعَوَامَّ اعْتِقَادَ الْأُصُولِ بِدَلَائِلِهَا لِأَنَّ فِي ذَلِكَ مِنَ الْمَشَقَّةِ أَشَدَّ مِنَ الْمَشَقَّةِ فِي تَعَلُّمِ الْفُرُوعِ الْفِقْهِيَّةِ.
অর্থাৎ অধিকাংশ ইমাম থেকে এ ফাতওয়া বর্ণিত যে, তারা বলেন, সাধারণ মুসলিমদের দীনের মৌলিক বিষয়সমূহকে দলীলের আলোকে জেনে বিশ্বাস করতে বাধ্য করা বৈধ নয়। কারণ, এগুলো ফিকহের শাখাগত মাসআলাগুলো শিখার চাইতেও অধিক কষ্টকর। ১৭৫
এমনিভাবে অনেক মানুষের বাচনিক শক্তি না থাকার কারণে সে কোন বিশ্বাসের উপর আছে, কোন মর্মকথার উপর সে আছে, তার প্রকাশ করতে সক্ষম হয় না। যেমনটি কতিপয় সাহাবীর সাথে ঘটেছিলো।
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ بَعْضِ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِرَجُلٍ: كَيْفَ تَقُولُ فِي الصَّلَاةِ؟ قَالَ: أَتَشَهَدُ وَأَقُولُ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ أَمَا إِنِّي لَا أُحْسِنُ دَنْدَنَتَكَ وَلَا دَنْدَنَةً مُعَادٍ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حَوْلَهَا نُدَنْدِنُ.
জনৈক সাহাবী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন লোককে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কীভাবে নামাযে দুআ করবে? সে বলল, আমি তাশাহহুদ পড়বো এবং দুআ করবো, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই। আমি তো জানি না আপনি (বৈঠকে) গুণগুণ আওয়ায করে কী বলেন এবং মুআয গুণগুণ করে কী বলে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমরাও তাই করি, যেমন তুমি দুআ করো। ১৭৬
টিকাঃ
১৭২. সহীহ বুখারী: ১/১৪, হা. নং ২৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
১৭৩. সহীহ মুসলিম: ১/৩৮১, হা. নং ৫৩৭ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
১৭৪. ফাতহুল বারী: ১৩/৩৪৯ (দারুল মারিফা, বৈরূত)
১৭৫. ফাতহুল বারী: ১৩/৩৪৯ (দারুল মারিফা, বৈরূত)
১৭৬. সুনানে আবু দাউদ: ১/২১০, হা. নং ৭৯২ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
📄 ৪ নং মাসআলা
প্রশ্ন: যদি ঈমান ও কুফরের বিধান প্রকাশ্য অবস্থা বিবেচনা করেই দেয়া হয়, তাহলে কোনো গুনাহকারীর কাফের হওয়ার ক্ষেত্রে কেনো উক্ত গুনাহকে হালাল মনে করা কিংবা তার হারাম হওয়াকে অস্বীকার করা শর্ত? অথচ হালালকরণ ও অস্বীকার করার স্থান হলো অন্তর, যা প্রকাশ্য অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত নয়।
উত্তর: কুফর ও শিরক ব্যতীত অন্যান্য গুনাহের ক্ষেত্রে গুনাহকারী কাফের হওয়ার জন্য গুনাহকে হালালকরণ ও গুনাহের হারাম হওয়াকে অস্বীকার করা এজন্যই শর্ত যে, এসব গুনাহ মূলত কুফরী নয়। তাই এগুলো করলে কাউকে ততোক্ষণ পর্যন্ত কাফের বলা যাবে না, যতোক্ষণ না সে এগুলোকে হালাল সাব্যস্ত করে এবং এগুলো হারাম হওয়াকে অস্বীকার করে। কারণ, এমনটি করলে তখন তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার নামান্তর হয়ে যায় এবং আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। আর শুধু গুনাহ কুফরী না হলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করা সুস্পষ্ট কুফরী।
অন্যদিকে কুফর অথবা শিরক এমনিতেই কুফরী। তার সাথে হালালকরণ বা হারাম অস্বীকার করণের প্রয়োজন পড়ে না। তাই যে মুখে বা কাজে কুফরী করবে; চাই সে উক্ত কুফরীকে হালালকারী হয়ে করুক বা হালালকারী না হয়ে করুক উভয় অবস্থায় তার একই ফলাফল।
📄 ৫ নং মাসআলা
প্রশ্ন: কুফর, শিরক ব্যতীত অন্য কোনো গুনাহকারী উক্ত গুনাহকে হালাল সাব্যস্ত করেছে কিনা, তা আমরা প্রকাশ্য অবস্থা ব্যতীত কীভাবে জানবো? অথচ অন্তরের উপর আমাদের কোনো হাত নেই।
উত্তর: কুফর, শিরক ব্যতীত অন্য গুনাহকারী উক্ত গুনাহকে হালাল সাব্যস্ত করেছে কিনা তা মুখে অথবা কাজে প্রকাশিত আলামত থেকে বোঝা যাবে। এর জন্য আমাদেরকে তার অন্তর ও মন-মানসিকতার পিছনে এমনভাবে লেগে থাকা ঠিক হবে না যে, আমরা তার অন্তরে কী আছে, সর্বদা তার খোঁজে লেগে থাকবো এবং জানার চেষ্টা করবো যে, সে তা হালাল সাব্যস্ত করে করেছে কিনা। এ দায়িত্ব আমাদেরকে দেয়া হয়নি। আর এমন করা সুন্নাহবিরোধী এবং সালাফে সালেহীন এমনটি কখনো করেননি।
📄 সারকথা
কাফের ও মুমিন হওয়ার হুকুম দেয়া হবে বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। কোনো ব্যক্তি কথা বা কাজে যা প্রকাশ করবে তাই ধর্তব্য হবে। অন্য কোনো পদ্ধতিতে তার উদ্দেশ্য জানার কোনো পথ নেই। এর উপর ভিত্তি করে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি- “যে ব্যক্তি কুফরী প্রকাশ করবে তার ক্ষেত্রে কোনো শরয়ী প্রতিবন্ধকতা না থাকলে তাকে কাফের বলে সাব্যস্ত করা হবে।” তেমনিভাবে আমরা এ সিদ্ধান্তেও উপনীত হতে পারি- “যে ব্যক্তি ইসলাম প্রকাশ করবে, আমরা তাকে মুসলিম বলে স্বীকার করবো; যতোক্ষণ না উক্ত ব্যক্তি ইসলামের বিপরীত কোনো কাজ প্রকাশ করে।"