📄 ১ নং মাসআলা
প্রশ্ন: যখন কোনো ব্যক্তির মাঝে বাহ্যিকভাবে ঈমান ও কুফরীর সংমিশ্রণ দেখা যাবে, তখন তার হুকুম কী? এমতাবস্থায় কোনটি প্রাধান্য পাবে?
উত্তর: যদি একই সময়ে কারো মাঝে এমন কিছু প্রকাশ পায়, যা তার ঈমানকে প্রমাণ করে এবং সাথে সাথে এমন কিছু প্রকাশ পায়, যা তার দীন থেকে বিচ্যুতি ও কুফরীর প্রমাণ বহন করে, তাহলে সে উক্ত কুফরী ও ঈমান বিনষ্টকারী কারণ দূর করে তাওবার আগ পর্যন্ত কাফের ও মুরতাদ বলে সাব্যস্ত হবে।
মোটকথা যদি ঈমান ও সুস্পষ্ট কুফর একত্রিত হয়, তাহলে এমতাবস্থায় কুফরীরই প্রাধান্য হবে। কেননা, সে একই সাথে একটি বিষয়কে তার বিপরীতটার সাথে একত্রিত করেছে। একই সময়ে সে আল্লাহ ও তাগুতের ইবাদত করছে। আর কুফরী থাকাবস্থায় কারো ঈমান কাজে আসবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ.
“তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, যে অবস্থায় তারা মুশরিক।”১৬৫
এর ব্যাখ্যা হলো, তারা রব হিসেবে ঈমান আনে এবং উলুহিয়্যাতের দিক থেকে শিরক করে। তাদের এই ঈমান তাদেরকে বিন্দু পরিমাণও উপকার করবে না।
আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন- وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْشُوراً.
“আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করলাম। অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় রূপান্তরিত করে দিলাম।”১৬৬
তবে এটা অসম্ভব নয় যে, একজন ব্যক্তির অন্তরে ঈমানের পাশাপাশি কুফরে আমলী বা শিরকে আসগর, যেমন রিয়া ইত্যাদি একত্রিত হতে পারে। এমনিভাবে ঈমানের সাথে কুফর ও শিরক ব্যাতীত অন্যান্য গুনাহও একত্রিত হতে পারে। কেননা, এসব গুনাহ ঈমানকে শেষ করে দেয় না; বরং ঈমানকে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অনুরূপ একজন ব্যক্তির সুস্পষ্ট ইসলামের সাথে সন্দেহপূর্ণ কুফরও একত্রিত হতে পারে। এমতাবস্থায় তার ঈমানেরই প্রাধান্য থাকবে। কেননা, সন্দেহপূর্ণ কুফর কখনো সুস্পষ্ট ঈমানের সমমানের নয়। ঈমানের মোকাবেলায় সন্দেহপূর্ণ কুফর অগ্রাহ্য বলে গণ্য হয়।
টিকাঃ
১৬৫. সূরা ইউসুফ: ১০৬
১৬৬. সূরা ফুরকান: ২৩
📄 ২ নং মাসআলা
প্রশ্ন: তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্যদান যদি উত্তোলিত তরবারিকে নামিয়ে দেয় এবং সাক্ষ্যদানকারীর জান-মালকে নিরাপদ করে দেয়, তাহলে আনুগত্য মেনে নেয়ার পর যদি সে ইসলামের কোনো নিদর্শন বা ফরযকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তার পূর্বোক্ত সাক্ষ্য কি তার কোনো কাজে আসবে? এভাবে যখন তাকে ইসলামের কোনো কথা বলতে বলা হয়, তখন সে তা বলে। অন্যদিকে শরয়ী ওযর ব্যতীতই সে ঈমান ভঙ্গকারী কোনো কাজ করে। এমতাবস্থায় কি উক্ত সাক্ষ্য তার কোনো কাজে আসবে?
উত্তর: এর জবাব তাই যা আমরা পূর্বের মাসআলাতে উল্লেখ করেছি। আর তা হলো, এমতাবস্থায় কালেমার সাক্ষ্যদান দুনিয়া ও আখিরাতে তার কোনো উপকারে আসবে না। কেননা, মুখে তাওহীদের সাক্ষ্যদান করে যে ব্যক্তি তাওহীদ ভঙ্গকারী কোনো কাজ করে, সে যেনো একই সময়ে কোনো কথা বলে সাথে সাথে তার বিপরীত কথাও বললো। যেমন কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়লো, অন্যদিকে সে বললো, আল্লাহ ছাড়াও আরেকজন ইলাহ আছে। এমতাবস্থায় সে একই সাথে একটি জিনিসকে সত্যায়িত এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا.
“অতএব যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে এমন সুদৃঢ় হাতল ধারণ করেছে, যা ভাঙবার নয়।”১৬৭
আল্লাহ তাআলা এখানে তাগুত অস্বীকার করাকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের পূর্বে এনেছেন। কারণ, এটা ঈমান শুদ্ধ হওয়ার জন্য পূর্ব শর্ত। তাই যে ব্যক্তি ঈমান আনবে, কিন্তু তাগুতকে অস্বীকার করবে না, তাহলে তার ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পূর্বে ঈমান এনে থাকলেও তা বাতিল হয়ে যাবে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ. “আর আমি প্রত্যেক জাতির মাঝে রাসূল প্রেরণ করেছি এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে বর্জন করো।”১৬৮
আর এটাই তাওহীদের কালেমার অর্থ যার উপর আমল করা আবশ্যক। অন্যদিকে, এ কালেমার দু'টি রোকন বা ভিত্তি আছে, যার একটি অপরটির উপর নির্ভরশীল। আর তা হলো, 'কুফর বিত-তাগুত' ও 'ঈমান বিল্লাহ'। 'কুফর বিত-তাগুত' এর মর্মকথা হলো, তাগুতকে অস্বীকার করা, তাগুত ও তাগুতের পূজারি থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করা, তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা এবং তাদেরকে তাকফীর করা তথা কাফের বলা। আর দ্বিতীয় রোকন হলো, ঈমান বিল্লাহ। বিশ্বাস, কথা ও কাজে আল্লাহ তাআলাকে সত্যিকার মাবুদ বলে জানা এবং তিনি ছাড়া যা কিছুর ইবাদত করা হয়, তা বাতিল বলে বিশ্বাস করা।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন- من كان كفره بإنكار أمر ضروري كحرمة الخمر مثلاً أنه لابد من تبرؤه مما كان يعتقده، لأنه كان يقر بالشهادتين معه، فلابد من تبرؤه منه، كما صرح به الشافعية وهو ظاهر «رد المحتار» من الارتداد. قلت: وفي «جامع الفصولين»: ثم لو أتى بكلمة الشهادة على وجه العادة لم ينفعه ما لم يرجع عما قال، إذ لا يرتفع بها كفره اهـ
অর্থাৎ দীনের স্বতঃসিদ্ধ হুকুম যেমন মদ হারাম হওয়া এ জাতীয় বিধানকে অস্বীকার করায় যার কুফরী সাব্যস্ত হবে সেক্ষেত্রে (ঈমান আনতে হলে) তাকে এ বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে হবে। কেননা, সে মদ হারাম হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করা অবস্থায়ই তাওহীদ ও রিসালাতের স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই তাকে এ বিশ্বাস পরিত্যাগ করে তা থেকে মুক্ত হতে হবে। যেমনটি শাফেয়ীগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। 'রদ্দুল মুহতার' এর ভাষ্য থেকে মুরতাদ হওয়াই বুঝা যায়। আমি (আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.) বলবো, 'জামিউল ফুসূলাইন' গ্রন্থে আছে- এরপর যদি সে অভ্যাসবশত শাহাদাতাইন উচ্চারণও করে, তথ াপিও এ সাক্ষ্যদান তার কোনো উপকারে আসবে না; যতোক্ষণ না পূর্বোক্ত কথা থেকে ফিরে আসে। কেননা, এদ্বারা তার কুফরী বিদূরিত হয়নি।১৬৯
টিকাঃ
১৬৭. সূরা বাকারা: ২৫৬
১৬৮. সূরা নাহল: ৩৬
১৬৯. ইকফারুল মুলহিদীন: পৃ. নং ৬৩ (আল মাজলিসুল ইলমী, পাকিস্তান)