📄 শরীয়তের বিচার-ফয়সালা থেকে বিমুখ হওয়া
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَیَقُوْلُوْنَ اٰمَنَّا بِاللّٰهِ وَبِالرَّسُوْلِ وَاَطَعْنَا ثُمَّ یَتَوَلّٰى فَرِیْقٌ مِّنْهُمْ مِّنْ بَعْدِ ذٰلِكَ وَمَاۤ اُولٰٓىِٕكَ بِالْمُؤْمِنِیْنَ وَاِذَا دُعُوْۤا اِلَى اللّٰهِ وَرَسُوْلِهٖ لِیَحْكُمَ بَیْنَهُمْ اِذَا فَرِیْقٌ مِّنْهُمْ مُّعْرِضُوْنَ.
“তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং আনুগত্য করেছি। অতঃপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়, বস্তুত তারা বিশ্বাসী নয়। তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়।”১২৮
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ. “(হে নবী,) আপনি বলুন, আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করো। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে তাহলে আল্লাহ কাফেরদেরকে ভালোবাসেন না।”১২৯
বোঝা গেল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট বিচার চাওয়া থেকে বিমুখতা ঈমান না থাকার আলামত বহন করে। যার অবস্থা এমন হবে, সে যদি হাজার বারও মুখে ঈমানের দাবি করে, তার দাবি কোনো কাজে আসবে না। একদিকে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার কথা বলছে। অন্যদিকে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান থেকে বিমুখ হয়ে তার ঈমানের দাবিকে মিথ্যা সাব্যস্ত করছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবদ্দশায় সরাসরি তাঁর নিকট বিচার প্রার্থনা করার নির্দেশ ছিলো। আর তাঁর ওফাতের পর তাঁর রেখে যাওয়া কুরআন ও সুন্নাহের দিকে বিচারকে সোপর্দ করার হুকুম হবে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন- فبين سبحانه أن من تولى عن طاعة الرسول وأعرض عن حكمه فهو من المنافقين وليس بمؤمن وأن المؤمن هو الذي يقول: سمعنا وأطعنا فإذا كان النفاق يثبت ويزول الإيمان بمجرد الإعراض عن حكم الرسول وإرادة التحاكم إلى غيره مع أن هذا ترك محض وقد يكون سببه قوة الشهوة فكيف بالتنقص والسب ونحوه؟
অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য পরিত্যাগ করবে এবং তাঁর বিচার-ফয়সালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে মুমিন নয়; বরং সে মুনাফিক। মুমিন তো সেই, যে বলে, শুনলাম এবং মানলাম। যদি শুধু আল্লাহর রাসূল থেকে বিমুখ হয়ে অন্য কারো কাছে বিচার ফয়সালা নিয়ে যাওয়ার কারণেই নিফাক প্রমাণিত হয় এবং ঈমান বিনষ্ট হয়ে যায়, অথচ এটা একটি বিধান লঙ্ঘন মাত্র, তা ছাড়া অনেক সময় প্রবৃত্তির তাড়নায়ও এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে ঐ ব্যক্তির কী বিধান হবে, যে শরীয়তের সমালোচনা ও গালমন্দ ইত্যাদি করে? ১৩০
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
ثم قال تعالى آمِرًا لِكُلِّ أَحَدٍ مِنْ خَاصٌ وَعَامٌ قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا أَيْ خَالَفُوا عَنْ أَمْرِهِ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ فَدَلَّ عَلَى أَنَّ مُخَالَفَتَهُ فِي الطَّرِيقَةِ كُفْرُ، وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ مَنِ اتَّصَفَ بِذَلِكَ، وَإِنِ ادعى وزعم في نفسه أنه محب لِلَّهِ وَيَتَقَرَّبُ إِلَيْهِ.
অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ তাআলা সাধারণ ও বিশেষ সব শ্রেণীর লোককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “(হে নবী,) আপনি বলুন, আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করো। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে অর্থাৎ তার আদেশের বিরোধিতা করে, তাহলে আল্লাহ কাফেরদেরকে ভালোবাসেন না।” বোঝা গেলো, বিধিবিধানের ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা করা কুফরী। আর আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। যদিও সে দাবি করে এবং মনে মনে ধারণা করে যে, সে আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তাঁর নৈকট্য অর্জন করছে। ১৩১
টিকাঃ
১২৮. সূরা নূর: ৪৮
১২৯. সূরা আলে ইমরান: ৩২
১৩০. আস-সারিমুল মাসলূল: ৩৮ (আল হারসুল ওয়াতনী, সৌদিআরব)
১৩১. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/২৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
📄 কুফরী বিষয়ে মুশরিকদের অনুসরণ করা
ঈমান না থাকার আরো একটি আলামত হলো, হারামকে হালালকরণ বা হালালকে হারামকরণে মুশরিকদের অনুসরণ করা কিংবা তাদের জাতিসত্তাকে অনুকরণ করা অথবা কুফরী কোনো বিষয়ে তাদের আনুগত্য করা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন- إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُمْ. ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لِلَّذِينَ كَرِهُوا مَا نَزَّلَ اللَّهُ سَنُطِيعُكُمْ فِي بَعْضِ الْأَمْرِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِسْرَارَهُمْ
“নিশ্চয় যারা হিদায়াতের পথ স্পষ্ট হওয়ার পর মুরতাদ হয়ে গেছে, শয়তান তাদের জন্য তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এজন্য যে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে তাদেরকে তারা বলে, আমরা তোমাদের কিছু বিষয়ে আনুগত্য করবো। আর আল্লাহ তাদের গোপন বিষয়গুলো জানেন।” ১৩২
সুতরাং এ সকল লোকেরা ঈমান আনার পর এবং হিদায়াতের পথ স্পষ্ট হওয়ার পর কাফের হয়ে মুরতাদ হয়ে গেছে। কারণ, তারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অপছন্দকারীদেরকে বলছে, “আমরা তোমাদের কিছু বিষয়ে আনুগত্য করবো।” তাদের এ কথাটি তাদের অন্তর বিনষ্ট হওয়া এবং অন্তরে পোষণ করা কুফরীর প্রমাণ বহন করে। কেননা, কারো অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান থাকলেও তাকে মুরতাদ বলা ঠিক নয়। যেহেতু আয়াতে তাদেরকে মুরতাদ বলা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে, তাদের অন্তরে ঈমানের ছিটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই।
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِمْ أَيْ فَارَقُوا الْإِيمَانَ وَرَجَعُوا إِلَى الْكُفْرِ.
“নিশ্চয় যারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে মুরতাদ হয়ে গেছে।” তথা ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কুফরের দিকে ফিরে গেছে।” ১৩৩
আমি বলবো, তারা মুমিন হওয়ার পর তাদের উপর কুফর ও নিফাক আপতিত হওয়ার কারণ তাদের এ বক্তব্য- “আমরা কিছু বিষয়ে তোমাদের কথা মান্য করবো”। কেননা, তাদের এ কথা বলার আগেই যদি তারা মুনাফিক হতো, তাহলে তাদের ব্যাপারে এ কথা বলা ঠিক হতো না যে, “তারা ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কুফরে ফিরে গেছে।” কারণ, মুনাফিক তো এমন কাফের, পূর্বে যার কোনো ঈমানই ছিলো না। সুতরাং তার ব্যাপারে “ঈমান আনার পর মুরতাদ হয়ে গেছে।” এ কথা বলাও সঠিক হবে না।
আল্লাহ তাআলা অন্য একটি আয়াতে বলেন-
وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ.
“নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে, যেনো তারা তোমাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো, তোমরাও নিশ্চিত মুশরিক হয়ে যাবে।” ১৩৪
এর অর্থ হলো, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা খাওয়া হালাল করার ক্ষেত্রে যদি তোমরা তাদের অনুসরণ করো, তাহলে তোমরা পূর্বে মুমিন থাকলেও এখন তাদের মতোই মুশরিক হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১৩২. সূরা মুহাম্মাদ: ২৫-২৬
১৩৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৭/২৯৬ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১৩৪. সূরা আনআম: ১২১