📄 ইঙ্গিতবহ কথা
একজন মানুষের মুখের কথা অন্তরের অবস্থা প্রকাশের একটি বড় মাধ্যম। বিষয়টি এরকম যে, কোনো ব্যক্তি বাধ্যবাধকতা ব্যতীতই সুস্পষ্ট ভাষায় এমন কথা বলে, যদ্বারা কুফরীর প্রতি তার সন্তুষ্টি ও কুফরীকে হালালকরণের আভাস পাওয়া যায়। যেমন কেউ আল্লাহর শরীয়তের বিরোধী মানবরচিত কোনো সংবিধানকে উত্তম বলে ঘোষণা করে। মানবরচিত সংবিধানকে উন্নয়ন ও সফলতার মাধ্যম হিসেবে প্রকাশ করে, যদ্বারা তার মনের ভিতর লালিত বিশ্বাস ও সন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এ ধরনের ব্যক্তি কাফের হওয়ার ব্যাপারে এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে তার বের হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মাঝে কোনো মতভেদ নেই।
📄 ইঙ্গিতবহ কাজ
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশিত কাজসমূহ দ্বারা কোনো ব্যক্তির অপ্রকাশ্য বা আভ্যন্তরীণ বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। তার মনের ভিতরে কী বিশ্বাস রয়েছে তা জানা যায়। অধিকাংশ সময় একজন মানুষের অপ্রকাশ্য বিষয়ের উপর হুকুম প্রদানের জন্য তার অন্তরে কীসের প্রতি সন্তুষ্টি আছে, তা জিজ্ঞেস করা ব্যতীতই শুধু তার কাজ দেখাই যথেষ্ট হয়ে থাকে।
নিম্নে এ ধরনের ইঙ্গিতবহ কথা ও কাজের কয়েকটি নমুনা দেয়া হলো-
📄 দীন নিয়ে ঠাট্টা ও নিন্দা করা
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ. لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ.
“আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর বিধিবিধানের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?”১১৭
বোঝা গেলো, যদি কেউ আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে নিয়ে গুরুতরভাবে নয়; বরং সাধারণভাবে কথার কথা বা তামাশাচ্ছলেও ঠাট্টা করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কাফের হয়ে যায়। এরূপ ঠাট্টা-বিদ্রুপই তার অপ্রকাশ্য বা আন্তরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রমাণ বহন করে। যদিও সে মুখে স্বীকার করে যে, সে যে বিষয়ে ঠাট্টা করেছিলো, তা সে হালাল মনে করে করেনি কিংবা সে দৃঢ়বিশ্বাস বা গুরুতরভাবে করেনি; বরং কথার কথা ও সমান্য আমোদ-প্রমোদের জন্য করেছিলো। মূলত যদি তার অন্তরে সামান্য পরিমাণও ঈমান থাকতো, তাহলে দীনের ব্যাপারে ঠাট্টা-মশকরা করার আগে তার মনে অবশ্যই ভীতি কাজ করতো এবং এ থেকে নিবৃত্ত থাকতো।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
فَقَدْ أَخْبَرَ أَنَّهُمْ كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ مَعَ قَوْلِهِمْ: إِنَّا تَكَلَّمْنَا بِالْكُفْرِ مِنْ غَيْرِ اعْتِقَادٍ لَهُ بَلْ كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ وَبَيَّنَ أَنَّ الاسْتِهْزَاءَ بِآيَاتِ اللَّهِ كُفْرُ وَلَا يَكُونُ هَذَا إِلَّا مِمَّنْ شَرَحَ صَدْرَهُ بِهَذَا الْكَلَامِ وَلَوْ كَانَ الْإِيمَانُ فِي قَلْبِهِ مَنَعَهُ أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهَذَا الْكَلَامِ.
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা তাদের ঈমান আনয়নের পর কাফের হয়ে গিয়েছে। অথচ তাদের দাবি হলো, আমরা বিশ্বাস করে নয়; বরং তামাশাচ্ছলে, কথার কথায় এরকম বলেছিলাম। পাশাপাশি আল্লাহ এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা কুফরী। আর এটা তখনই ঘটে থাকে, যখন কারো অন্তর উক্ত কথার প্রতি সমর্থন দিয়ে থাকে। যদি তার অন্তরে ঈমান থাকতো, তাহলে তার ঈমান অবশ্যই তাকে এ ধরনের কথা বলতে বাধা দিতো। ১১৮
টিকাঃ
১১৭. সূরা তাওবা: ৬৬
১১৮. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৭/২২০ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদীনা)
📄 দীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয় এমন মজলিসে বসা
আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ, তাঁর রাসূল ও ইসলামের অকাট্য কোনো বিধানকে নিয়ে ঠাট্টা করা হয় এমন মজলিসে কোনো ধরনের বাধ্যবাধ্যকতা ও যারা এরকম করে তাদেরকে তিরস্কার করা ব্যতীত বসে থাকা প্রমাণ করে যে, উক্ত ব্যক্তি তাদের কুফরী ও কুৎসিত কাজের প্রতি সন্তুষ্ট। তাই উক্ত ব্যক্তিও তাদের মতো একজন কাফেরে পরিণত হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعاً.
"আর তিনি কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম অবতীর্ণ করেছেন যে, যখন আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতোক্ষণ না তারা অন্য কথা শুরু করে। অন্যথায় তোমরাও তাদেরই মতো হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফিক ও কাফের উভয় শ্রেণীকে একসাথে সমবেত করবেন।”১১৯
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন-
لِأَنَّ مَنْ لَمْ يَجْتَنِبُهُمْ فَقَدْ رَضِيَ فِعْلَهُمْ، وَالرِّضَا بِالْكُفْرِ كُفْرُ، قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: (إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ). فَكُلُّ مَنْ جَلَسَ فِي مَجْلِسِ مَعْصِيَةٍ وَلَمْ يُنْكِرْ عَلَيْهِمْ يَكُونُ مَعَهُمْ فِي الْوِزْرِ سَوَاءٌ
কেননা, যে এরকম কাজ পরিহার করলো না তাহলে সে তাদের কাজে সন্তুষ্ট হলো। আর কুফরীর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া কুফরী। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তখন তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে।” অতএব যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের মজলিসে বসলো, অথচ তাদেরকে তিরস্কার করলো না, তাহলে সে তাদের সাথে গুনাহের ক্ষেত্রে সমান অংশীদার বলে পরিগণিত হবে। ১২০
আল্লামা শাওকানী রহ. বলেন-
قَوْلُهُ: إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ تَعْلِيلُ لِلنَّهْيِ، أَيْ: إِنَّكُمْ إِنْ فَعَلْتُمْ ذَلِكَ وَلَمْ تَنْتَهُوا فَأَنْتُمْ مِثْلُهُمْ فِي الْكُفْرِ.
অর্থাৎ আল্লাহর বাণী “তখন তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে।” এটা নিষেধের কারণ। এর অর্থ হলো, যদি তোমরা তাই করো এবং উক্ত কাজ থেকে বিরত না থাকো, তাহলে কুফরীর ক্ষেত্রে তোমরাও তাদের মতো বলে গণ্য হবে। ১২১
টিকাঃ
১১৯. সূরা নিসা: ১৪০
১২০. তাফসীরে কুরতুবী: ৫/৪১৮ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
১২১. ফাতহুল কাদীর, শাওকানী: ১/৬০৭ (দারু ইবনে কাসীর, দামেশক)