📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 দলীল

📄 দলীল


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন-
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعاً.
“আর তিনি কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম অবতীর্ণ করেছেন যে, যখন আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃ তি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতোক্ষণ না তারা অন্য কথা শুরু করে। অন্যথায় তোমরাও তাদেরই মতো হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফিক ও কাফের উভয় শ্রেণীকে একসাথে সমবেত করবেন।”১০৯
শাইখ আলাবী বিন আব্দুল কাদের শাক্কাফ রহ. বলেন-
أَنَّ الآية على ظاهرها، أَنَّ الرجل إذا سمع آيات الله يُكْفَرَ بها ويستهزأ بها، فجلس عند الكافرين المستهزئين بآيات الله من غير إكراه ولا إنكار ولا قيام عنهم حتى يخوضوا في حديث غيره، فهو كافر مثلهم، وإن لم يفعل فعلهم، لأنَّ ذلك يتضمن الرضا بالكفر، والرضا بالكفر كفر، وبهذه الآية ونحوها استدل العلماء على أنَّ الرضا بالذنب كفاعله، فإن ادعى أَنَّه يكره ذلك بقلبه لم يقبل منه لأنَّ الحكم بالظاهر، وهو قد أظهر الكفر فيكون كافراً.
অর্থাৎ এখানে আয়াতের বাহ্যিক অর্থটাই নেয়া হবে। আর তা হলো, যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকৃতি ও এর ব্যাপারে ঠাট্টা-বিদ্রুপ হতে শুনবে, অতঃপর তারা অন্য কথা শুরু করার আগেই সে উক্ত মজলিসে তাদের কোনোরূপ প্রতিবাদ ও বিরোধিতা করা ব্যতীত স্বেচ্ছায় বসবে, তখন সে তাদের মতোই কাফের হয়ে যাবে। যদিও সে তাদের মতো উক্ত কাজগুলো না করুক। কেননা, তার বসে থাকা কুফরীর প্রতি তার সন্তুষ্টি প্রমাণ করে। আর কুফরীর প্রতি সন্তুষ্টি কুফরী। এ আয়াত ও এরকম অন্যান্য আয়াতগুলোর দ্বারা উলামায়ে কেরাম দলীল দিয়ে থাকেন যে, গুনাহের কাজে সন্তুষ্ট ব্যক্তিও গুনাহকারীর মতো। যদি সে দাবি করে যে, কাজটা সে অন্তর থেকে ঘৃণা করে তথাপি তার এ ওযর গ্রহণ করা হবে না। কেননা, প্রকাশ্য অবস্থার উপরই বিধান প্রযোজ্য হয়ে থাকে। আর যেহেতু সে কুফরী প্রকাশ করেছে, তাই সে কাফের বলে পরিগণিত হবে।১১০
আমরা বলতে পারি, যদি কোনো মজলিসে কুফরী চর্চা হয়, তাহলে তাদের মাঝে থাকা মুসলিম ব্যক্তিটি তাদের মতোই কাফের বলে পরিগণিত হবে। আর যদি কোনো মজলিসে কুফরী নয়; বরং গুনাহের চর্চা হয়, তাহলে উক্ত ব্যক্তি গুনাহগার বলে গণ্য হবে, কাফের নয়। মজলিসে কী চলছে বা কী সংঘটিত হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে বিধান প্রযোজ্য হবে।
মুজামুল কাবীর তাবারানীতে বর্ণিত হয়েছে- عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ .... مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَجْلِسْ عَلَى مَائِدَةٍ يُشْرَبُ عَلَيْهَا الْخَمْرُ.
ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন... যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেনো এমন আসরে না বসে, যেখানে মদপান করা হয়।১১১
যেহেতু মদের আসরে যে বসে, সে কাফের হয় না বিধায় এখানে মদের আসরে উপবিষ্ট ব্যক্তিকে মদপানকারীর হুকুমে ধরা হবে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন- وَرُفِعَ لِعُمَرِ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ قَوْمُ يَشْرَبُونَ الْخَمْرَ فَأَمَرَ بِجَلْدِهِمْ فَقِيلَ لَهُ: إِنَّ فِيهِمْ صَائِمًا، فَقَالَ: ابْدَءُوا بِهِ. أَمَا سَمِعْتُمُ اللَّهَ يَقُولُ: وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ}
অর্থাৎ উমার বিন আব্দুল আযীয রহ.-এর নিকট একদল লোক সম্পর্কে নালিশ জানানো হলো, যারা মদপান করছে। তিনি তাদেরকে বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিলেন। তখন তাঁকে বলা হলো, তাদের মাঝে একজন রোযাদার (উপবিষ্ট) আছেন! উমার রহ. বললেন, তাকে দিয়েই শুরু করো। তোমরা কি আল্লাহর এ বাণীটি শুনোনি, “আর তিনি কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম অবতীর্ণ করেছেন যে, যখন আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতোক্ষণ না তারা অন্য কথা শুরু করে। অন্যথায় তোমরাও তাদেরই মতো হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফিক ও কাফের উভয় শ্রেণীকে একসাথে সমবেত করবেন।”১১২
উমার বিন আব্দুল আযীয রহ. কর্তৃক উক্ত আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, উপরস্থ কোনো কিছুর দলীল দ্বারা নিম্নস্থ কোনো কিছুর ব্যাপারে দলীল দেয়া যায়। যদিও আয়াত দ্বারা কুফরে আকবার উদ্দেশ্য, কিন্তু এখানে তিনি পাপীদের মজলিসে উপবিষ্ট এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ আয়াত থেকে দলীল গ্রহণ করাকে জায়েয মনে করেছেন। তাকে এ আয়াতের হুকুমের অধীন করার কারণ হলো, সে আয়াতের অংশবিশেষ বলে সাব্যস্ত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ. كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ.
“বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে দাউদ ও মারইয়াম তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করতো এবং সীমালঙ্ঘন করতো। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করতো না, যা তারা করতো। অবশ্যই তাদের কৃতকর্ম কতোই না মন্দ!১১৩
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরো বলেন- وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ.
“আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তাহলে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং ঠাট্টা-কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর বিধিবিধানের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা করো না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছো ঈমান প্রকাশ করার পর! তোমাদের মধ্যে হতে যদি একদলকে আমি ক্ষমা করে দেই, তাহলে অবশ্যই অন্য একদলকে আযাবও দেবো; এজন্য যে, তারা ছিলো গুনাহগার।”১১৪
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন- فَإِنْ لَمْ يَكُنْ مُبْغِضًا لِشَيْءٍ مِنْ الْمُحَرَّمَاتِ أَصْلًا؛ لَمْ يَكُنْ مَعَهُ إِيمَانُ أَصْلًا
অর্থাৎ যদি সে কোনো হারাম কাজের প্রতি ঘৃণা পোষণ না করে, তাহলে তার ভিতরে মূলত একেবারেই ঈমান নেই।”১১৫
এ ব্যাপারে সাইয়েদ কুতুব রহ. বলেন-
مجرد الاعتراف بشرعية منهج أو وضع أو حكم من صنع غير الله، هو بذاته خروج من دائرة الإسلام الله، فالإسلام الله هو توحيد الدينونة له دون سواه.
মানবরচিত আইন-কানুন, সংবিধান ও বিধি-বিধানের প্রতি স্বীকৃতি দেয়া মানেই ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া। কেননা, ইসলাম হলো দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই সাব্যস্ত করার নাম, অন্য কারো জন্য নয়। ১১৬

টিকাঃ
১০৯. সূরা নিসা: ১৪০
১১০. আত তাওয়াসসুতু ওয়াল ইকতিসাদ: পৃ. নং ১১৪-১১৫ (দারু ইবনে কাইয়িম, দাম্মام), মাজমূআতুত তাওহীদ: পৃ. নং ৪৮ (মাকতাবাতুল মুআইয়াদ), সাবীলুন নাজাত ওয়াল ফাকাক: পৃ. নং ৫৪ (দারুল কুরআনিল কারীম)
১১১. মুজামুল কাবীর তাবারানী: ১/১৯১, হা. নং ১১৪৬২ (মাকতাবা ইবনে তাইমিয়া, কায়রো)
১১২. মাজমুউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া: ২৮/২২১ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদীনা)
১১৩. সূরা মায়িদা: ৭৮-৭৯
১১৪. সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬
১১৫. মাজমুউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া: ৭/৪১ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদীনা)
১১৬. তরীকাতুত দাওয়াহ ফী যিলালিল কুরআন: ২/৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00