📄 দলীল
আল্লাহ তায়ালা বলেন- إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
“নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।”
তিনি আরো বলেন- قُلْ أَذَلِكَ خَيْرٌ أَمْ جَنَّةُ الْخُلْدِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ كَانَتْ لَهُمْ جَزَاءً وَمَصِيراً
“বলুন, এটা উত্তম না চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদেরকে? সেটা হবে তাদের প্রতিদান ও প্রত্যাবর্তন স্থান।”
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
أَنَّ عُبَادَةَ بْنَ الصَّامِتِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ وَكَانَ شَهِدَ بَدْرًا وَهُوَ أَحَدُ الثَّقَبَاءِ لَيْلَةَ العَقَبَةِ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ، وَحَوْلَهُ عِصَابَةٌ مِنْ أَصْحَابِهِ: بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَا تَسْرِقُوا، وَلَا تَزْنُوا، وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ، وَلَا تَأْتُوا بِبُهْتَانٍ تَفْتَرُونَهُ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ، وَلَا تَعْصُوا فِي مَعْرُوفٍ، فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ فِي الدُّنْيَا فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا ثُمَّ سَتَرَهُ اللَّهُ فَهُوَ إلَى اللهِ ، إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَاقَبَهُ. فَبَايَعْنَاهُ عَلَى ذَلِكَ.
উবাদা বিন সামিত রাযি. বর্ণনা করেন-যিনি বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন এবং আকাবার রাতে বাইআত গ্রহণকারীদের একজন ছিলেন-তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট একদল সাহাবীর উপস্থিতিতে তিনি ইরশাদ করেন, “তোমরা আমার কাছে এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করো যে, আল্লাহর সঙ্গে কিছু শরীক করবে না, চুরি করবে না, যিনা করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, নিজেদের পক্ষ থেকে বানিয়ে কাউকে মিথ্যা যিনার অপবাদ দিবে না এবং সৎ কাজে অবাধ্য হবে না। তোমাদের মধ্যে যে তা পূরণ করবে তার বিনিময় আল্লাহর কাছে। আর কেউ এর কোনো একটিতে লিপ্ত হয়ে পড়লে এবং দুনিয়াতেই তার শাস্তি হলে তা হবে তার জন্য কাফফারা। আর কেউ এর কোনো একটিতে লিপ্ত হয়ে পড়লে এবং আল্লাহ তাআলা তা গোপন রাখলে তা হবে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন আর চাইলে শাস্তি দিবেন। অতঃপর আমরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম।”৭৯
আল্লাহ তাআলা নিজের উপর আবশ্যক করে নিয়েছেন যে, বান্দার নেক আমল অনুসারে প্রতিশ্রুত প্রতিদান দান করবেন। তেমনিভাবে বদ আমলকে নিজ ইচ্ছার সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। তিনি চাইলে শাস্তি দিবেন, না হলে দিবেন না।
ইবনে আবী আসেম বিরচিত আস-সুন্নাহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে-
حَدَّثَنِي ابْنُ عُمَرَ، قَالَ: كُنَّا نُوجِبُ لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ النَّارَ، حَتَّى نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ} [النساء: ٤٨] ، فَنَهَانَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُوجِبَ لِأَحَدٍ مِنْ أَهْلِ الدِّينِ النَّارَ.
অর্থাৎ ইবনে উমার রাযি. বর্ণনা করেন, আমরা কবীরা গুনাহকারীদের জন্য জাহান্নাম আবশ্যক মনে করতাম। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর এ আয়াতটি নাযিল হলো- "নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।" [সূরা নিসা: ৪৮] তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে কোনো মুসলমানের জন্য জাহান্নাম সাব্যস্ত করতে নিষেধ করলেন। ৮০
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ নিঃসৃত বাণী مِنْ أَهْلِ الدِّينِ বলতে এখানে শুধুমাত্র আহলে কেবলা তথা মুসলমান উদ্দেশ্য। এ হাদীসটি এ ব্যাপারে একটি সুস্পষ্ট দলীল যে, আহলে কিবলা ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্য হতে যারা ইসলাম গ্রহণ ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে আমরা তাদের জন্য জাহান্নাম সাব্যস্ত করি।
তবে বান্দার হক ও মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক যুলমের বিষয়টি ভিন্ন। এক্ষেত্রে কিয়ামত দিবসে অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তি নিঃসন্দেহে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে এবং তার থেকে অত্যাচারিত ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। যেমনটি একাধিক হাদীসের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়।
মুসনাদে বাযযারে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الظُّلْمُ ثَلَاثَةٌ فَظُلْمُ لَا يَغْفِرُهُ اللهُ وظلم يغفره الله وَظُلْمُ لَا يَتْرُكُهُ اللَّهُ فَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَغْفِرُهُ اللهُ فَالشَّرْكُ، وَقال الله {إِنَّ الشرك لظلم عظيم} وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي يَغْفِرُهُ اللهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ لِأَنْفُسِهِمْ فِيمَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَبِّهِمْ وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَتْرُكُهُ اللَّهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ بَعْضِهِمْ بَعْضًا حَتَّى يَدِينَ لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ.
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যুলম তিন প্রকার। প্রথমত, যে যুলম আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না। দ্বিতীয়ত, যে যুলম তিনি ক্ষমা করবেন। তৃতীয়ত, যে যুলম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না। সুতরাং যে যুলমের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, তাহলো শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন- “নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহাঅন্যায়।” আর যে যুলমের অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করবেন, তাহলো বান্দার নিজের উপর কৃত যুলম, যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। আর যে যুলম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না, তাহলো বান্দাদের মাঝে সংঘটিত পারস্পরিক যুলম। এ যুলম ততোক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমা করা হবে না, যতোক্ষণ না অপর ব্যক্তি থেকে পাওনা পরিশোধ করা হয়।”৮১
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يُقَادَ لِلشَّاةِ الْجَلْحَاءِ، مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন অধিকার বঞ্চিতদের সকল অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। এমনকি শিংযুক্ত ছাগলের কাছ থেকে শিংবিহীন ছাগলের প্রতিশোধও গ্রহণ করা হবে।”৮২
টিকাঃ
১. সূরা নিসা: ৪৮
২. সূরা ফুরকান: ১৫
৭৯. সহীহ বুখারী: ১/১২, হা. নং ১৮ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
৮০. আস-সুন্নাহ, ইবনে আবী আসেম: ২/৪৭১, হা. নং ৯৭৩ (আল মাকতাবুল ইসলামী, বৈরূত)
৮১. মুসনাদে বাযযার: ১৩/১১৪, হা. নং ৬৪৯১ (মাকতাবাতুল উলূম ওয়াল হিকাম, মদীনা)
৮২. সহীহ মুসলিম: ৪/১৯৯৭, হা. নং ২৫৮২ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
📄 সতর্কীকরণ
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেলো, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাকফীর করার প্রত্যেক প্রতিবন্ধকতা নির্দিষ্ট ব্যক্তি শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে। কিন্তু শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার প্রত্যেকটি প্রতিবন্ধকতা তাকফীরের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয় না। তবে তাওবার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা, তাওবা তার পূর্বেকার সকল গুনাহকে মিটিয়ে দেয়।