📄 কুফরী সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত হওয়া
নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফের সাব্যস্ত করার জন্য শর্ত হলো, তার কুফরী সুস্পষ্ট ও সুসাব্যস্ত হওয়া। কেননা, সন্দেহ বা ধারণার ভিত্তিতে কাউকে তাকফীর করা জায়েয নেই। প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়ার পরই নির্দিষ্টভাবে কাউকে তাকফীর করা যায়, এর পূর্বে নয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ.
“হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনয়ন করে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।”৬৯
তিনি আরো বলেন-
وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا
“আর সত্যের ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়।”৭০
অন্য আয়াতে তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ كَذَلِكَ كُنْتُمْ مِنْ قَبْلُ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا.
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন আল্লাহর পথে সফর করো, তখন যাচাই করে নিও এবং যে তোমাদেরকে সালাম করে তাকে বলো না যে, তুমি মুসলমান নও। তোমরা পার্থিব জীবনের সম্পদ অন্ব্বেষণ করছো, অথচ আল্লাহর নিকট অনেক সম্পদ রয়েছে। তোমরাও তো এমনি ছিলে ইতঃপূর্বে; অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। অতএব ভালো করে যাচাই করে নিও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কাজকর্মের খবর রাখেন।”৭১
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: مَرَّ رَجُلٌ مِنْ بَنِي سُلَيْمٍ بِنَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَهُوَ يَسُوقُ غَنَمًا لَهُ، فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ، فَقَالُوا: مَا سَلَّمَ عَلَيْنَا إِلا لِيَتَعَوَّذَ مِنَّا، فَعَمَدُوا إِلَيْهِ فَقَتَلُوهُ، وَأَتَوْا بِغَنَمِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَنَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا} [النساء: ٩٤]
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনু সুলাইমের একব্যক্তি ছাগল চরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন। সাহাবাগণ রাযি. বললেন, সে আমাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য সালাম দিয়েছে। অতঃপর তাঁরা তাকে ধরে হত্যা করলেন। তার ছাগলগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এলেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয় “হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন আল্লাহর পথে সফর করো তখন যাচাই করে নিও।” [সূরা নিসা: ৯৪]৭২
তাওহীদের সাক্ষ্য দেয়ার পরও মিকদাদ রাযি. একজন লোককে হত্যা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভর্ৎসনা করেন। যেমন সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْمِقْدَادِ: إِذَا كَانَ رَجُلٌ مُؤْمِنٌ يُخْفِي إِيمَانَهُ مَعَ قَوْمٍ كُفَّارٍ، فَأَظْهَرَ إِيمَانَهُ فَقَتَلْتَهُ؟ فَكَذَلِكَ كُنْتَ أَنْتَ تُخْفِي إِيمَانَكَ بِمَكَّةَ مِنْ قَبْلُ.
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিকদাদ রাযি.-কে বললেন, “যখন একজন ঈমানদার লোক কাফের কওমের কাছে নিজ ঈমান গোপন রেখে তার ঈমানকে প্রকাশ করলো, তখন তুমি তাকে হত্যা করে দিলে?! ইতঃপূর্বে তুমিও তো মক্কায় নিজের ঈমানকে গোপন রেখেছিলে।”৭৩
হাদীসের মর্মার্থ হলো- তোমার উপর আবশ্যক ছিলো তার প্রকাশ করা ঈমানকে কবুল করে নেয়া এবং তাকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকা। যে সন্দেহের কারণে তুমি তাকে হত্যা করতে প্ররোচিত হয়েছো ইতঃপূর্বে তুমিই সে অবস্থা দিয়ে গমন করেছো, সে অবস্থার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেছো। তুমি কি চাও, তোমার সাথে সেরূপ আচরণ করা হোক, যেরূপ আচরণ করে তুমি তাকে হত্যা করলে?
কেউ আমাদেরকে কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে অজানা এমন একটি তথ্য জানালো, যার অবস্থা সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। যেমন কেউ বললো, অমুক ব্যক্তি কুফরী কথা বলেছে বা কুফরী কাজ করেছে অথবা কুফরে বিশ্বাস রাখে। এক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর কথার ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে তাকফীর করা আমাদের জন্য জায়েয হবে না। কেননা, উক্ত বর্ণনাকারীর কথা মিথ্যা হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। সে হয়তো তার অনিষ্ট করতে চায় বা সে উক্ত ব্যক্তির কথার উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করেছে বা কর্মের উদ্দেশ্য বুঝতে অক্ষম হয়েছে। তাই প্রথমে বর্ণনার সত্যতা ও স্পষ্টতা যাচাই করতে হবে, যার ভিত্তিতে আমরা তাকে নির্দিষ্ট করে কাফের সাব্যস্ত করতে পারি। উক্ত ব্যক্তির মাঝে কাফের হওয়ার মতো যথাপোযুক্ত নিদর্শন পাওয়া পর্যন্ত আমরা তার কাফের হওয়ার সিদ্ধান্ত দিতে পারবো না।
টিকাঃ
৬৯. সূরা হুজুরাত: ০৬
৭০. সূরা নাজম: ২৮
৭১. সূরা নিসা: ৯৪
৭২. মুসনাদে আহমাদ: ৩/৪৬৭, হা. নং ২০২৩ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৭৩. সহীহ বুখারী: ৯/৩, হা. নং ৬৮৬৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
📄 প্রমাণ সাব্যস্ত হওয়া
নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাকফীর করার জন্য তার কুফরী সুনিশ্চিতভাবে সাব্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি এটাও দেখা জরুরি যে, কুফরীর বিষয়ে তার কোনো ওযর বা অক্ষমতা আছে কিনা। যদি সে অজ্ঞতার কারণে বা শরীয়তের হুকুম তার কাছে না পৌঁছার কারণে কুফরী করে, তাহলে তাকে শরীয়তের বিধান জানিয়ে দেয়া হবে। এরপর যদি সে প্রমাণকে প্রত্যাখ্যান করে বা হঠকারিতা করে মানতে অস্বীকার করে, তাহলে তাকে তাকফীর করা হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً
“কোনো রাসূল প্রেরণ করার আগে আমি কাউকে শাস্তি প্রদান করি না।”৭৪
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন-
رُسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُسُلِ وَكَانَ اللهُ عَزِيزاً حَكِيماً
“আমি সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী হিসেবে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে মানুষের জন্য রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ না থাকে। আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রাজ্ঞ।”৭৫
সুতরাং তার উপর কুফরের হুকুম আরোপিত হওয়ার জন্য তার কাছে শরীয়তের দলীল পৌঁছতে হবে। যেমন এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা এরকম বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরকম বলেছেন। আর তা এ পরিমাণ পৌঁছতে হবে যে, অজ্ঞতা ও না বোঝার দরুন তার কোনো ওযর বাকি না থাকে।
অবশ্য তাকফীর করার আগে কুফরী করার কারণে তাকে তাওবা করানোর শর্তটি একটি বাতিল ও ভুল শর্ত। অর্থাৎ অনেকে মনে করেন, নির্দিষ্টভাবে কাউকে তাকফীর করতে হলে আগে তাকে উক্ত কুফরী থেকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করে নেয়, তাহলে তাকে কাফের বলা যাবে না, অন্যথায় তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করতে আর কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু এটা সঠিক নয়; বরং সুস্পষ্ট কুফরী প্রমাণিত হওয়ার পর তার কুফরীর ক্ষেত্রে যদি গ্রহণযোগ্য কোনো ওযর না থাকে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে কাফের বলা হবে। এখানে তাকফীরের জন্য তাওবা প্রত্যাখ্যান করার কোনো শর্ত নেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.
“অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসসমূহ অতিবাহিত হয়ে যায়, তখন মুশরিকদের যেখানে পাও, সেখানেই তাদেরকে হত্যা করো, বন্দী করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওত পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তাওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে; তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”৭৬
আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট তাওবা চাওয়া বা তারা তাওবা করার আগেই তাদের উপর শিরকের হুকুম দিয়ে তাদেরকে মুশরিক বলে সম্বোধন করলেন এবং তাদেরকে হত্যা করার আদেশ দিলেন। বুঝা গেলো, কাফের বলার জন্য প্রথমে তাকে তাওবার আহবান জানানো আবশ্যকীয় কোনো শর্ত নয়।
তাওবার আহবান জানানো হবে, যখন শরীয়তের বিরোধিতাকারীর উপর হদ বা শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। সে সময়ে শেষ বারের মতো তাকে একটি সুযোগ দেওয়া হবে তাওবা করার জন্য, যেনো সে নিজে আরেকবার নিজের ব্যাপারে পর্যালোচনা করে সত্য ও হিদায়াতের পথে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির উপর কুফর বা ইরতিদাদের হুকুম প্রয়োগ করার আগে তার নিকট তাওবা তালাশ করা কোনো আবশ্যকীয় শর্ত নয়।
টিকাঃ
৭৪. সূরা ইসরা: ১৫
৭৫. সূরা নিসা: ১৬৫
৭৬. সূরা তাওবা: ০৫