📄 তৃতীয় অবস্থা: বড় কুফরকে প্রতিহত করা
কখনো পরিস্থিতি এমন হয় যে, দুটি কুফরী থেকে বাধ্যতামূলক যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হয়। এমতাবস্থায় শরয়ী বিধান হলো, যে কুফরটি নিম্নমানের ও কম ক্ষতিকর সেটিকে গ্রহণ করে তুলনামূলকভাবে অধিক জঘন্য ও কঠিন কুফর থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
এর ধরন হলো এরকম যে, উম্মাহ কোনো তাগুত দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত হলো, যার কুফরী একটির চেয়ে অপরটি জঘন্য হয় এবং যার ফিতনা শহর-বন্দর ছেয়ে আল্লাহর বান্দাদের উপর প্রকট হতে থাকে। এমতাবস্থায় যদি আল্লাহর বান্দাদেরকে বাঁচানোর জন্য ও সে তাগুতের মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে তার সেনাবাহিনীতে বা তাদের অভ্যন্তরে অবস্থান করা ব্যতীত অন্য কোনো পথ না থাকে এবং তাদের কাছে নিজেকে একজন একনিষ্ঠ সৈন্য বলে প্রমাণ করতে হয়, তাহলে প্রয়োজনবশত নিজেকে তাই করতে হবে; যতোক্ষণ না তাগুতের ঘাড় হাতের নাগালে নিয়ে তাকে হত্যা করা যায়।
যদি তাগুত বা কুফরের নেতাকে হত্যা করার প্রয়োজনে তাদের সেনার ভিতরে থাকতে হয়, নিজেকে তাদের একজন হিসেবে প্রকাশ করতে হয়, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে নিয়ত হতে হবে তাগুতের মূলোৎপাটন এবং তার অনিষ্টতা ও জঘন্য কুফরী থেকে উম্মাহকে মুক্তি দেয়া।
📄 দলীল
এর পক্ষে দু'টি দলীল উল্লেখ করা হলো। প্রথম দলীল কাব বিন আশরাফকে হত্যার ঘটনা, যা এ বিষয়টি জায়েয হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে।
যেমন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
قَالَ عَمْرُو سَمِعْتُ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الْأَشْرَفِ، فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ، فَقَامَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، أَتُحِبُّ أَنْ أَقْتُلَهُ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَأْذَنْ لِي أَنْ أَقُولَ شَيْئًا، قَالَ: قُلْ، فَأَتَاهُ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ فَقَالَ: إِنَّ هَذَا الرَّجُلَ قَدْ سَأَلَنَا صَدَقَةً، وَإِنَّهُ قَدْ عَنَّانَا وَإِنِّي قَدْ أَتَيْتُكَ أَسْتَسْلِفُكَ، قَالَ: وَأَيْضًا وَاللَّهِ لَتَمَلُّنَّهُ، قَالَ: إِنَّا قَدِ اتَّبَعْنَاهُ، فَلا نُحِبُّ أَنْ نَدَعَهُ حَتَّى نَنْظُرَ إِلَى أَيُّ شَيْءٍ يَصِيرُ شَأْنُهُ، وَقَدْ أَرَدْنَا أَنْ تُسْلِفَنَا وَسْقًا أَوْ وَسْقَيْنِ.
فَلَمَّا اسْتَمْكَنَ مِنْهُ، قَالَ: دُونَكُمْ، فَقَتَلُوهُ، ثُمَّ أَتَوُا النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرُوهُ.
অর্থাৎ হযরত জাবির রাযি. বলেন, (একদিন) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কাব বিন আশরাফের জন্য কে আছো? কেননা, সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি চান আমি তাকে হত্যা করি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে আমাকে আপনার বিরুদ্ধে কিছু বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঠিক আছে বলো। তারপর মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. কাব বিন আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ লোকটি আমাদের কাছে দান-সদাকা চায়। লোকটা আমাদেরকে অর্থনৈতিক মন্দাতে ফেলে দিয়েছে। আপনার কাছে এসেছি কিছু ঋণ নিবো বলে। কাব বললো, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! তোমরা তার কাজে আরো বিরক্ত হবে। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. বললেন, আমরা তার অনুসরণ করেছি, তাই আমরা তাকে ছেড়ে দিতে পারি না। আমরা দেখতে চাই, তার শেষ পরিণাম কী হয়? আমরা চাই তুমি আমাদেরকে এক অসাক বা দু'অসাক পরিমাণ ঋণ দাও। .....অবশেষে মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. যখন কাবকে হাতের নাগালে পেলেন তখন সাথীদেরকে বললেন, একে ধরো। অতঃপর তাঁরা তাকে হত্যা করলেন। এরপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে তাঁকে ঘটনা জানালেন। ৫৮
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন-
فِي رِوَايَةِ الْوَاقِدِيِّ سَأَلَنَا الصَّدَقَةَ وَنَحْنُ لَا نَجِدُ مَا تَأْكُلُ وَفِي مُرْسَلِ عِكْرِمَةَ فَقَالُوا يَا أَبَا سَعِيدٍ إِنَّ نَبِيَّنَا أَرَادَ مِنَّا الصَّدَقَةَ وَلَيْسَ لَنَا مَالُ نَصْدُقُهُ
অর্থাৎ ওয়াকেদী রহ. এর এক বর্ণনায় এসেছে, এ লোকটি আমাদের কাছে দান-সদাকা চায়, অথচ আমরা খেতেই পারি না। ইকরামা রহ. এর মুরসাল বর্ণনায় এসেছে, অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম রাযি. বললেন, হে আবু সাঈদ, (কাব বিন আশরাফের উপনাম) আমাদের নবী আমাদের কাছে সদাকা চায়, অথচ আমাদের কোনো সহায়-সম্পত্তি নেই যে, আমরা সদাকা করবো। ৫৯
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন-
وَعِنْدَ الْوَاقِدِيَّ، أَنَّ كَعْبًا قَالَ لِأَبِي نَائِلَةَ: أَخْبِرْنِي مَا فِي نَفْسِكَ؟ مَا الَّذِي تُرِيدُونَ فِي أَمْرِهِ؟ قَالَ: خِذْلَانَهُ وَالتَّخَلَّى عَنْهُ. قَالَ: سَرَرْتَنِي.
অর্থাৎ ওয়াকেদী রহ. এর এক বর্ণনায় এসেছে, কাব বিন আশরাফ আবু নায়িলা রাযি.-কে জিজ্ঞাসা করলো, আমাকে জানাও তোমার মনে কী চলছে? তাঁর ব্যাপারে কী করতে চাচ্ছো? তিনি বললেন, তাঁর লাঞ্ছনা ও তাঁর থেকে মুক্তি চাই। কাব বললো, তুমি আমাকে সন্তুষ্ট করলে। ৬০
উপরোক্ত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবা ও কাবের মাঝে চলমান কথোপকথন সন্দেহাতীতভাবে কুফরী, যা সাধারণ অবস্থায় প্রকাশ করা বা উচ্চারণ করা সম্ভব নয়। সাহাবীদের জন্য এ কুফরীর বৈধতার কারণ হচ্ছে, এখানে এমন এক তাগুতের মূলোৎপাটন উদ্দেশ্য ছিলো, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রচণ্ডভাবে কষ্ট দিয়েছে।
উপরোক্ত বর্ণনাগুলো থেকে কয়েকভাবে কুফরীর প্রকাশ বোঝা যায়:
১. মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. এর উক্তি- “এ লোকটি আমাদের কাছে দান-সদাকা চায়, অথচ আমরা খেতেই পারি না।” এ কথার মর্ম হচ্ছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর যুলম ও অত্যাচারের অপবাদ। যেহেতু তিনি মানুষের কাছে সদাকা চান, তাই তিনি তাদেরকে অর্থনৈতিক মন্দাতে ফেলে দিয়েছেন। সন্দেহাতীতভাবে এ অপবাদ কুফরী।
২. তাঁর উক্তি- “তিনি আমাদেরকে অর্থনৈতিক দুর্গতিতে ফেলে দিয়েছেন।” অর্থাৎ কথার ধরনে বোঝা যায়, তিনি সদাকা চাইতে চাইতে আমাদেরকে ক্লান্ত করে ফেলেছেন, অথচ আমাদের সদাকা দেয়ার মতো কিছুই নেই। কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি কুফর। কেননা, এতে বোঝা যায়, তিনি তাদের নিকট ঘ্যানঘ্যান করেন এবং এজন্য তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অসন্তুষ্ট। তিনি যে শরীয়ত নিয়ে এসেছেন তার প্রতি তারা অসন্তুষ্ট।
৩. কাব বিন আশরাফের উক্তি- "তোমরা তার কাজে আরো বিরক্ত হবে।" এর অর্থ দাঁড়ায়, এমন একদিন আসবে, যেদিন এ যুলমের কারণে তোমরা নবীর প্রতি বিরক্ত হয়ে যাবে, তার দাওয়াতের প্রতি তোমাদের বিরক্তি এসে যাবে। তোমাদের কাছে সদাকা দেয়ার মতো কিছু থাকবে না, অথচ তিনি তোমাদের কাছে সদাকা খুঁজতে থাকবেন। এখানে কথাটি যদিও কাব বিন আশরাফের, কিন্তু কথাটি সে সাহাবীর মন্তব্য- "আমাদেরকে আর্থিক দুর্গতিতে ফেলে দিয়েছে" এর পরিপ্রেক্ষিতেই বলার সুযোগ পেয়েছিলো। কুফরী নিজে করা যেমন কুফরী, তেমনি অন্যকে কুফরী কথা বলার সুযোগ করে দেয়াও কুফরী।
৪. মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. এর উক্তি- “আমরা তাকে ছেড়ে দিতে চাই না। আমরা দেখতে চাই, তার শেষ পরিণাম কী হয়?” এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা তাঁর সাথে আছি শেষ পরিণতির বিবেচনায়। যদি শেষ পরিণতি ভালো হয়, তবে আমরা তাঁর সাথে থাকবো এবং এতে করে আমরা ভালোটার ভাগীদার হতে পারবো। আর যদি দেখি, তাঁর শত্রুদের পরিণতি ভালো এবং তাঁর পরিণতি মন্দ, তাহলে আমরা তাঁকে পরিত্যাগ করবো এবং তাঁর থেকে মুক্তি পাবো। মোটকথা, আমরা দেখতে চাই তার শেষ পরিণতি কেমন হয়? কোনো সন্দেহ নেই যে, এ কথাটি সুস্পষ্ট কুফরী।
৫. আবু নায়িলা রাযি. এর উক্তি- “আমরা তাকে লাঞ্ছিত অবস্থায় দেখতে চাই। তাঁর থেকে মুক্তি চাই।” কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি কুফরে বাওয়াহ তথা সুস্পষ্ট কুফর। এতে কোনো ব্যাখ্যা বা অন্য কোনো অর্থ নেয়ার কোনো সুযোগই নেই। যদি এ কথাটি সাধারণ অবস্থায় বলা হতো, তাহলে কথক তাৎক্ষণিকভাবে কাফের হয়ে যেতো।
৬. আল্লাহর ও রাসূলের শত্রু কাবের উক্তি- “তুমি আমাকে সন্তুষ্ট করলে।” এ কথা স্পষ্টত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য অপমানসূচক ছিলো। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম রাযি. কাবের একথার বিরোধিতা বা নিন্দা করেননি। অপারেশন শেষ করা পর্যন্ত তাঁরা সেখানেই অবস্থান করছিলেন। শরীয়তের বিধান হলো, যদি কোনো ব্যক্তি কুফরীর মজলিসে অথবা আল্লাহ, রাসূল ও দীনকে নিয়ে কটুক্তি করা হয় এমন স্থানে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুফরী ও কটুক্তির নিন্দা না করে বসে থাকে, তাহলে সেটাও কুফর হিসেবে পরিগণিত হবে।
৭. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে সাহাবা রাযি. অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন যে, তাঁরা তাঁর শানে অশালীন ও বিরূপ কিছু বলতে চান। অর্থাৎ বৈধ কথা বলতে তো আর অনুমতি লাগে না, তাই তাঁরা এমন নিন্দনীয় ও আঘাতমূলক কথা বলার অনুমতি চেয়েছিলেন, যা সাধারণত কোনো কাফেরই বলতে পারে।
এ ব্যাপারে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে উল্লেখ করেছেন-
قَوْلُهُ فائدن لِي أَنْ أَقُولَ شَيْئًا قَالَ قُلْ كَأَنَّهُ اسْتَأْذَنَهُ أَنْ يَفْتَعِلَ شَيْئًا يَحْتَالُ بِهِ وَمِنْ ثَمَّ بَوَّبَ عَلَيْهِ الْمُصَنِّفُ الْكَذِبُ فِي الْحَرْبِ وَقد ظهر من سِيَاق بن سَعْدٍ لِلْقِصَّةِ أَنَّهُمُ اسْتَأْذَنُوا أَنْ يَشْكُوا مِنْهُ وَيَعِيبُوا رَأْيَهُ.. وَفِي مُرْسَلِ عِكْرِمَةَ وَائْذَنْ لَنَا أَنْ نُصِيبَ مِنْكَ فَيَطْمَئِنَّ إِلَيْنَا قَالَ قُولُوا مَا شِئْتُمْ.
অর্থাৎ ইবনে মাসলামা রাযি. এর উক্তি- “আমাকে কিছু বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি বলতে পারো।” যেনো তিনি বানোয়াট কিছু একটা বলে কৌশল অবলম্বন করার অনুমতি চাচ্ছেন। আর এখান থেকেই ইমাম বুখারী রহ. “যুদ্ধের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা” নামে একটি অধ্যায় তৈরি করেছেন। ইমাম ইবনে সাদ রহ. এর বর্ণিত ঘটনার বিবরণে স্পষ্ট হয়েছে যে, তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের কথা বা তাঁর ব্যাপারে দোষ বর্ণনা করার অনুমতি চেয়েছেন। ....ইকরামা রহ. কর্তৃক মুরসাল সনদে বর্ণিত আছে- আমাদেরকে অনুমতি দিন, যেনো আমরা আপনার সম্বন্ধে কোনো মন্দ কথা বলতে পারি, যাতে সে আমাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা যা চাও বলো। ৬১
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বর্ণনা করেন-
قَالَ ابْنُ إِسْحَاقَ : فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا حَدَّثَنِي عَبْدُ اللهِ بن المغيث بن أبي بردة من لابن الْأَشْرَفِ؟ فَقَالَ لَهُ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ أَخُو بَنِي عَبْدِ الْأَشْهَلِ: أَنَا لَكَ بِهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَا أَقْتُلُهُ، قَالَ فَافْعَلْ إِنْ قَدَرْتَ عَلَى ذَلِكَ، قَالَ فَرَجَعَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ فَمَكَثَ ثَلَاثًا لَا يَأْكُلُ وَلَا يَشْرَبُ إِلَّا مَا يُعَلِّقُ نَفْسَهُ، فَذُكِرَ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَعَاهُ فَقَالَ لَهُ: لِمَ تَرَكْتَ الطَّعَامَ وَالشَّرَابَ ؟ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْتُ لَكَ قَوْلًا لَا أَدْرِي هَلْ أَفِي لَكَ بِهِ أَمْ لَا. قَالَ: إِنَّمَا عَلَيْكَ الْجَهْدُ. قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إنه لا بد لنا أَنْ نَقُولَ، قَالَ: فَقُولُوا مَا بَدَا لَكُمْ فَأَنْتُمْ فِي حِلٌّ مِنْ ذَلِكَ.
অর্থাৎ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, আব্দুল্লাহ বিন মুগীস বিন আবু বুরদা রহ.-এর বর্ণনা মতে এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কাব বিন আশরাফের জন্য কে আছো? বনু আব্দুল আশহালের ভাই মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার পক্ষ থেকে তার জন্য আমি আছি। আমি তাকে হত্যা করবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঠিক আছে, পারলে করো। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. চলে গেলেন এবং তিনদিন জীবনধারণের প্রয়োজনীয় পানাহার ছাড়া আর কোনো কিছু পানাহার করলেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর নিকট এটি বলা হলে তিনি তাঁকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, তুমি পানাহার ছেড়ে দিলে কেনো? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে একটি কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারছি না যে, আমি তা পূর্ণ করতে পারবো কিনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার কাজ তো কেবল চেষ্টা করা। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে কিছু মন্দ বলতে হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যা প্রয়োজন মনে করো তা বলো। তোমাদেরকে এক্ষেত্রে বৈধতা দেয়া হয়েছে। ৬২
ইমাম সারাখসী রহ. বলেন-
فَاجْتَمَعَ فِي قَتْلِهِ مُحَمَّدٌ وَأُنَاسٌ مِنْ الْأَوْسِ مِنْهُمْ عُبَادَةُ بْنُ بِشْرِ بْنِ وَقْشِ، وَأَبُو نَائِلَةَ سِلْكَانُ بْنُ سَلَامَةَ بْنِ وَقْشِ، وَالْحَارِثُ بْنُ أَوْسٍ، وَأَبُو عَبْسِ بْنِ جَبْرٍ. فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ نَحْنُ نَقْتُلُهُ. فَأْذَنْ لَنَا فَلِنَقُلْ، فَإِنَّهُ لَا بُدَّ لَنَا مِنْهُ، أَيْ نَخْدَعُهُ بِاسْتِعْمَالِ الْمَعَارِيضِ وَإِظْهَارِ النَّيْلِ مِنْكَ.
অর্থাৎ তাকে হত্যা করার জন্য মুহাম্মাদ রাযি. এবং আওস গোত্র থেকে উবাদা বিন বিশর রাযি., আবু নায়িলা রাযি., হারিস বিন আওস রাযি. আবু আবস বিন জার রাযি. একত্রিত হলেন। অতঃপর তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তাকে হত্যা করতে চলেছি, অতএব আমাদেরকে কিছু বলার অনুমতি দিন। কেননা, সেটা আমাদের জন্য জরুরি। অর্থাৎ আমরা আপনার ব্যাপারে মন্দ ও কটুক্তিকর কথা বলে তাকে ধোঁকা দিবো। ৬৩
উলামাদের উপলব্ধি মতে উপরোক্ত ঘটনাটি সার্বিক দিক থেকে এ মাসআলার জন্য একটি শক্তিশালী প্রমাণ। যদি এর একটি দিককে ব্যাখ্যা করা সম্ভবও হয়, তবুও সকল দিক হতে এটাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। যার বিশদ বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা-ই অধিক জ্ঞাত।
দ্বিতীয় দলীল হলো, তাগুত খালিদ বিন নাবীহ আল-হুযালীকে হত্যা করার ঘটনা। সে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে লড়ার জন্য একটি দল প্রস্তুত করছিলো।
যেমন মুজামুল কাবীর তাবারানীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُنَيْسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ لِسُفْيَانَ الْهُذَلِيَّ؟، يَهْجُونِي وَيَشْتُمُنِي وَيُؤْذِينِي، فَقُلْتُ لَهُ: أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، ابْعَثْنِي لَهُ، فَبَعَثَهُ لَهُ.
আব্দুল্লাহ বিন উনাইস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কে আমার জন্য সুফইয়ান হুযালীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে? সে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে, আমাকে গালি দিয়েছে এবং আমাকে কষ্ট দিয়েছে।” আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আছি, তার বিরুদ্ধে আমাকে পাঠান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পাঠালেন। ৬৪
মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ أُنَيْسٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: دَعَانِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّهُ قَدْ بَلَغَنِي أَنَّ خَالِدَ بْنَ سُفْيَانَ بْنِ نُبَيْحٍ الْهُذَلِيَّ يَجْمَعُ لِي النَّاسَ لِيَغْزُوَنِي، وَهُوَ بِعُرَنَةَ، فَأْتِهِ فَاقْتُلْهُ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، انْعَتْهُ لِي حَتَّى أَعْرِفَهُ، قَالَ: إِذَا رَأَيْتَهُ وَجَدْتَ لَهُ إِقْشَعْرِيَرَةً. قَالَ: فَخَرَجْتُ مُتَوَشِّحًا بِسَيْفِي حَتَّى وَقَعْتُ عَلَيْهِ، وَهُوَ بِعُرَنَةَ مَعَ ظُعُنٍ يَرْتَادُ لَهُنَّ مَنْزِلًا، وَحِينَ كَانَ وَقْتُ الْعَصْرِ، فَلَمَّا رَأَيْتُهُ وَجَدْتُ مَا وَصَفَ لِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْإِقْشَعْرِيرَةِ فَأَقْبَلْتُ نَحْوَهُ، وَخَشِيتُ أَنْ يَكُونَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ مُحَاوَلَةٌ تَشْغَلُنِي عَنِ الصَّلَاةِ، فَصَلَّيْتُ وَأَنَا أَمْشِي نَحْوَهُ أُومِنُ بِرَأْسِي الرُّكُوعَ ، وَالسُّجُودَ، فَلَمَّا انْتَهَيْتُ إِلَيْهِ قَالَ: مَنِ الرَّجُلُ؟ قُلْتُ: رَجُلٌ مِنَ الْعَرَبِ سَمِعَ بِكَ، وَبِجَمْعِكَ لِهَذَا الرَّجُلِ فَجَاءَكَ لِهَذَا، قَالَ: أَجَلْ أَنَا فِي ذَلِكَ، قَالَ: فَمَشَيْتُ مَعَهُ شَيْئًا حَتَّى إِذَا أَمْكَنَنِي حَمَلْتُ عَلَيْهِ السَّيْفَ حَتَّى قَتَلْتُهُ، ثُمَّ خَرَجْتُ، وَتَرَكْتُ ظَعَائِنَهُ مُكِبَّاتٍ عَلَيْهِ، فَلَمَّا قَدِمْتُ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَآنِي فَقَالَ: أَفْلَحَ الْوَجْهُ. قَالَ: قُلْتُ: قَتَلْتُهُ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: صَدَقْتَ. قَالَ: ثُمَّ قَامَ مَعِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَخَلَ بِي بَيْتَهُ فَأَعْطَانِي عَصَّا، فَقَالَ: أَمْسِكْ هَذِهِ عِنْدَكَ يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ أُنَيْسٍ.
قَالَ: فَخَرَجْتُ بِهَا عَلَى النَّاسِ فَقَالُوا: مَا هَذِهِ الْعَصَا؟ قَالَ: قُلْتُ: أَعْطَانِيهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَمَرَنِي أَنْ أَمْسِكَهَا، قَالُوا: أَوَلَا تَرْجِعُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَسْأَلَهُ عَنْ ذَلِكَ؟ قَالَ: فَرَجَعْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ لِمَ أَعْطَيْتَنِي هَذِهِ الْعَصَا؟ قَالَ: آيَةٌ بَيْنِي وَبَيْنَكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، إِنَّ أَقَلَّ النَّاسِ الْمُتَخَصِّرُونَ يَوْمَئِذٍ. قَالَ: فَقَرَنَهَا عَبْدُ اللَّهِ بِسَيْفِهِ فَلَمْ تَزَلْ مَعَهُ حَتَّى إِذَا مَاتَ أَمَرَ بِهَا فَصُبَّتْ مَعَهُ فِي كَفَنِهِ، ثُمَّ دُفِنَا جَمِيعًا
অর্থাৎ আব্দুল্লাহ বিন উনাইস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন, আমার কাছে সংবাদ এসেছে খালিদ বিন সুফইয়ান হুযালী আমার সাথে যুদ্ধ করবে বলে মানুষদেরকে একত্র করছে। সে উরানা নামক স্থানে আছে। তুমি গিয়ে তাকে হত্যা করে আসো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাকে তার কিছু বৈশিষ্ট্য বলুন, যেনো আমি তাকে চিনতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি যখন তাকে দেখতে পাবে, তোমার শরীরে কাঁপন ধরবে। আব্দুল্লাহ রাযি. বললেন, এরপর আমি তলোয়ার দ্বারা সজ্জিত হয়ে বের হলাম। আমি তাকে উরানা নামক স্থানে পেলাম। আমি তাকে মহিলাদের সাথে দেখলাম, সে মহিলাদের জন্য একটি বাস করার স্থান খুঁজছিলো। ইতোমধ্যে আসরের ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছিলো। যখন আমি তাকে দেখলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেরকম বলেছিলেন আমার শরীরে কাঁপন ধরেছিলো। অতঃপর আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি আশঙ্কা করছিলাম যে, আমার ও তার মাঝে কোনো লড়াইয়ের সম্ভাবনা আছে। তাই আমি মাথা দিয়ে ইশারায় রুকূ এবং সিজদা করে নামায পড়ছিলাম।
যখন লোকটির নিকটবর্তী হলাম সে বললো, কে? আমি বললাম, আমি একজন আরব। আমি এ লোকটির বিরুদ্ধে তোমার ও তোমার জমায়েত করা সৈন্য সম্পর্কে শুনতে পেলাম। তাই সে ব্যাপারে তোমার কাছে এসেছি। সে বললো, হ্যাঁ, আমি সে ব্যাপার নিয়েই আছি। আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন, আমি তার সাথে কিছুটা হাঁটার পর আমার জন্য সুযোগ হলো। তার উপর তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তাকে হত্যা করে তার উষ্ট্রবাহনকে তার উপর উপুড় করে ফেলে এলাম। যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আগমন করলাম তিনি আমাকে দেখে বললেন, সফল হোক তোমার চেহারা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি তাকে বধ করে এসেছি। তিনি বললেন, সত্য বলেছো। তারপর তিনি আমাকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়ে আমাকে তাঁর লাঠিটি দান করলেন। তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ! এ লাঠিটি ধরো। তোমার কাছে এটি রেখে দাও। আমি লাঠি হাতে লোকদের নিকট আসলে তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, এটা কীসের লাঠি? আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এটা দিয়েছেন এবং এটাকে আমার কাছে রাখতে বলেছেন। তারা বললো, তুমি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট গিয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করে আসবে না? অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর নিকট গিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে এ লাঠি কী জন্য দান করেছেন? তিনি উত্তরে বললেন, কিয়ামতের দিন এটি আমার ও তোমার মাঝে একটি নিদর্শন হবে, যেদিন খুব কম মানুষই কোমরে হাত রেখে দাঁড়াবে। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আব্দুল্লাহ রাযি. লাঠিটিকে তাঁর তলোয়ারের সাথে যুক্ত করে নিলেন। লাঠিটি সর্বদা তার সাথেই থাকতো। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলো, তখন তিনি লাঠিটিকে তার সাথে দেয়ার জন্য অসিয়ত করলেন। অতঃপর লাঠি এবং তাঁকে একসাথে দাফন করা হলো। ৬৫
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আব্দুল্লাহ রাযি. এর কথা- “আমি এ লোকটির বিরুদ্ধে তোমার ও তোমার জমায়েত করা সৈন্য সম্পর্কে শুনতে পেলাম। তাই সে ব্যাপারে তোমার কাছে এসেছি।” এর অর্থ দাঁড়ায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি, তোমার লোক সংখ্যা বাড়াতে এসেছি। সন্দেহ নেই যে, এ কথাগুলো কুফরী। কোনো তাগুতের নির্মূল করার ক্ষেত্র ছাড়া যদি স্বাভাবিকভাবে এগুলো বলা হতো, তাহলে তা কুফর বলে সাব্যস্ত হতো। আরো লক্ষ্য করুন, যদি ইসলামী দাওয়াতের শিশুকালে এ তাগুতকে ছেড়ে দেয়া হতো, তাহলে তা পরবর্তীতে বড় বিপদজনক হয়ে উঠতো।
তৃতীয় আরেকটি দলীল হলো- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাঈম বিন মাসউদ রাযি.-কে আহযাব যুদ্ধের সময় মুসলমানদের দল পরিত্যাগ করে কাফেরদের দলে যাওয়ার আদেশ দিলেন; যেনো কাফেরদের বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করা যায়।
যেমন আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বিদায়া ওয়ান নিয়াহা গ্রন্থে বর্ণনা করেন- فَقَالَ لِأَبِي سُفْيَانَ بْنِ حَرْبٍ وَمَنْ مَعَهُ مِنْ رِجَالِ قُرَيْشٍ: قَدْ عَرَفْتُمْ وُدِّي لَكُمْ وَفِرَاقِي مُحَمَّدًا، وَإِنَّهُ قَدْ بَلَغَنِي أَمْرُ قَدْ رَأَيْتُ عَلَيَّ حَقًّا أَنْ أُبَلِّغَكُمُوهُ نُصْحًا لَكُمْ فَاكْتُمُوا عَنِّي ...
অর্থাৎ অতঃপর তিনি (নাঈم বিন মাসউদ রাযি.) আবু সুফইয়ান বিন হারব ও তার কুরাইশ সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তো তোমাদের জন্য আমার হৃদ্যতা ও মুহাম্মাদের সাথে আমার বিরোধিতার কথা জানো। আমার কাছে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা তোমাদের কল্যাণার্থে তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া আমার কর্তব্য মনে করছি। তবে আমার বলার ব্যাপারটি তোমরা গোপন রাখবে।
যদি বলা হয়, “তোমরা তো তোমাদের জন্য আমার হৃদ্যতার কথা এবং মুহাম্মদের সাথে আমার বিরোধিতার কথা জানো" এ কথা কুফরী বুঝায় না, তাহলে আমি বলবো, যে মজলিসে কুফরী কথাবার্তা চলে, দীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও গালি-গালাজ করা হয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশল নির্ণয় করা হয়; কোনো প্রতিবাদ করা ছাড়া শুধু সে মজলিসে বসা বা তার আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকাও তো কুফরী। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا.
“আর কুরআনের মাধ্যমে তিনি তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না; যতোক্ষণ না তারা ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা শুরু করে। তা না হলে তোমরাও তাদেরই মতো (কাফের) হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফিক ও কাফের উভয়কে একই জায়গায় সমবেত করবেন।”৬৭
এ আয়াতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, যদি তোমরা কোনো রকম ঘৃণা প্রকাশ করা ব্যতীত সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বসে থাকো, তাহলে তোমরাও তাদের মতো কাফের হয়ে যাবে। তাহলে একজন সাহাবী কীভাবে এমনটি করলেন? তিনি কুফরী ও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী একটি মজলিসে বসে থাকা, পাশাপাশি পূর্বে বর্ণিত কথাটি বলা কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি কুফরে বাওয়াহ তথা স্পষ্ট কুফরী।
কিন্তু সাহাবী নাঈম বিন মাসঊদ রাযি.-কে এ অপবাদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে তাঁর একনিষ্ঠ নিয়ত। তার নিয়ত ছিলো, মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ না করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসলামের দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী কুফফার জোটকে ভেঙে দেয়া। তাঁর এ কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এবং এর ফলাফলও ছিলো সুদূরপ্রসারী, যা তাঁর বলা আগের কথাগুলোর ক্ষতিকে বিলীন করে দেয়।
ইমাম সারাখসী রহ. বলেন- وَإِذَا دَخَلَ الْمُسْلِمُ دَارَ الْحَرْبِ بِغَيْرِ أَمَانٍ فَأَخَذَهُ الْمُشْرِكُونَ فَقَالَ لَهُمْ: أَنَا رَجُلٌ مِنْكُمْ، أَوْ جِئْتُ أُرِيدُ أَنْ أُقَاتِلَ مَعَكُمُ الْمُسْلِمِينَ، فَلَا بَأْسَ بِأَنْ يَقْتُلَ مَنْ أَحَبَّ مِنْهُمْ وَيَأْخُذَ مِنْ أَمْوَالِهِمْ مَا شَاءَ.
অর্থাৎ যদি মুসলিম দারুল হরবে নিরাপত্তা ব্যতীতই প্রবেশ করে, অতঃপর মুশরিকরা তাকে ধরে ফেললে সে বলে, আমি তো তোমাদেরই একজন কিংবা বলে, আমি তোমাদের কাছে এ উদ্দেশ্যে এসেছি, যেনো তোমাদের সাথে মিলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি, তাহলে তার জন্য এতে কোনো সমস্যা নেই যে, সেখানে সে যাকে ইচ্ছা হত্যা করবে ও তাদের মাল যতোটুকু ইচ্ছা নিয়ে আসবে।
এরপর ইমাম সারাখসী রহ. প্রসিদ্ধ দুই তাগুত তথা খালিদ বিন সুফইয়ান হুযালী ও কাব বিন আশরাফকে হত্যা করার ঘটনা দিয়ে দলীল প্রদান করেছেন।
আমরা বলতে পারি, উক্ত ব্যক্তির কথা- “আমি তোমাদেরই একজন অথবা আমি তোমাদের সাথে মিলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো” সুস্পষ্ট কুফরী। কিন্তু ইমাম সারাখসী রহ. এ কারণে তার এ কথাকে জায়েয বলেছেন যে, সে তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হত্যা করতে পারবে এবং যার মাল নিতে মনে চায় তার মাল ছিনিয়ে নিতে পারবে। তাহলে যদি বিষয়টি এমনই হয়, তাহলে যে তাগুত কুফরী ও অবাধ্যতার মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করেছে, মুসলমানদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছে এমন এক তাগুতের মূলোৎপাটনে এরকম কুফরী প্রকাশের বৈধতা আরো অধিক যুক্তিযুক্ত ও শরীয়তসম্মত।
দ্বিতীয়ত, শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো, দু'টি ক্ষতিকর বস্তুর মধ্যে হতে কম ক্ষতিকর বস্তুটিকে গ্রহণ করে অধিক ক্ষতিকর জিনিসকে প্রতিহত করা। এ নীতিটিই দীনের সকল মাসআলা তথা মৌলিক ও শাখাগত মাসআলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর আলোচ্য মাসআলাটিও সে সকল মাসআলারই একটি অংশ।
এর ধরন হলো এরকম- যদি কোনো ব্যক্তিকে দু'টি কুফরের মাঝে একটিকে বেছে নিতে হয়, তাহলে স্বাভাবিক যে, সে একটিকে বেছে নিয়ে অপরটি প্রতিহত করবে। এমতাবস্থায় শরীয়ত ও স্বাভাবিক বিবেক থেকে সমাধান একটিই আসবে যে, দু'টির মধ্যে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর ও ছোট কুফর নির্ণয় করে তা অবলম্বন করবে এবং এর মাধ্যমে অধিক ক্ষতিকর ও বড় কুফরকে প্রতিহত করবে।
তাগুত উম্মাহর বুকের উপর চেপে বসে আছে। উম্মাহর ভাগ্যাকাশে কালো ছায়ারূপে আবির্ভূত হয়েছে। সে সকল ধরনের কুফরী কর্মকাণ্ড, সব প্রকারের অপরাধ করেছে, মুসলমানদের হত্যা করেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে, সেই সবচেয়ে জঘন্য ও সবচেয়ে বড় কাফের। সুতরাং যখন নিশ্চিত হবে যে, কৌশল হিসেবে কুফরের সামান্য প্রতিচ্ছবি ধারণ না করলেই নয়; যেমনটি কাব ও সুফইয়ান নামক দু'তাগুত বধের ঘটনায় উল্লিখিত হয়েছে, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। তুমি কৌশল অনুযায়ী অগ্রসর হও। আর এটি হলো যদি তোমার উপর কাজটি করা ওয়াজিব না হয় তখনকার হুকুম।
এখন যদি কেউ বলে, আরে এটা তো দেখছি কুফরীকে বৈধতা দান করার একটি পন্থা মাত্র! তার উত্তরে বলবো, এ পন্থার অনুপস্থিতি তোমাকে এর চেয়েও অধিক জঘন্য ও বড় কুফরীকে মৌন সমর্থন দিয়ে স্থায়ীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা আবশ্যক করবে, যা ইসলাম ও উম্মাহর জন্য আরো অধিক ভয়ংকর হয়ে দেখা দিবে। এবার চিন্তা করে দেখো, তোমার দীন-দুনিয়া ঠিক রাখতে দু'টি পদ্ধতির মধ্য হতে কোনটি বেশি নিরাপদ ও অধিক উত্তম?
যদি বলা হয়, জরুরি অবস্থা ব্যতীত কুফরী কথা বা কাজ বৈধ নয়। আর তাগুতকে অপসারণ করা জরুরত তথা অতীব প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা হাজত তথা সাধারণ প্রয়োজন মাত্র!!!
তাহলে এর উত্তরে বলা হবে, তাগুত শরীয়তের উপর আমল করা বন্ধ করে দিয়েছে, তাওহীদ ও তাওহীদপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, দীনের উপর চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করছে, দীন নিয়ে কটুক্তি করছে, কুফরী ও পাপাচারিতার কোনো পথই বাকি রাখেনি; বরং জঘন্যভাবে সেগুলোকে আঞ্জাম দিয়েছে। সে মুসলিম ও মুসলিমদের দেশের বিনাশ সাধন করেছে, তাদেরকে সর্বনিকৃষ্ট শাস্তি, লাঞ্ছনা ও অপদস্ততা আস্বাদন করিয়েছে। যদি এরকম কোনো তাগুতকে অপসারণ করা এবং তার কুফরী ও অনিষ্টতা থেকে উম্মাহকে মুক্ত করা হাজত হয়ে থাকে, এটাও যদি জরুরতের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে; তবে হে জ্ঞানবান ব্যক্তিবর্গ! আর কোন সীমা অতিক্রম করলে এ তাগুতকে অপসারণ করা জরুরতের অন্তর্ভুক্ত হবে?
তৃতীয়ত, ইবনে মাসউদ রাযি. যেভাবে বলেছেন- এক চাবুক বা দু'চাবুকের প্রহার থেকে বাঁচার জন্য শরীয়তের বিপরীত কোনো কথা বলা জায়েয, তাহলে এমন কথা বলা কেনো জায়েয হবে না, যার মাধ্যমে উম্মাহর নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও সকল নিকৃষ্ট কুফরী থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? যদি এক চাবুক বা দু'চাবুক প্রতিহতকরণ জরুরতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; যা অবৈধ বিষয়কে বৈধ করে দেয়, তাহলে মুসলিম উম্মাহের পুরুষ, নারী ও শিশুদেরকে তাগুতের গণহত্যা থেকে বাঁচানো কি জরুরতের অন্তর্ভুক্ত হবে না? এখানেও যদি জরুরত পাওয়া না যায়, তাহলে পৃথিবীতে আর কোথায় জরুরত পাওয়া যাবে?
চতুর্থত, এ পথেই উম্মাহর বিজ্ঞ মুজাহিদগণ চলে আসছেন। এটাই তাদের পন্থা ও মাসলাক। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি., নাঈম বিন মাসউদ রাযি., আবু নায়িলা রাযি., আব্দুল্লাহ বিন উনাইস রাযি. থেকে শুরু করে সালাহুদ্দীন আইউবী রহ. পর্যন্ত, যিনি সক্ষমতা অর্জন করার পর ফাতেমী সালতানাতের মন্ত্রী কাফের উবাইদী ও তার ভেলকিতে মত্ত কাফেরদের প্রতিকৃতিকে নির্মূল করেন। একটা বিদআতী রাষ্ট্রকে পুরো সুন্নী জিহাদী ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় চলেছেন খালিদ ইসলামবুলী রহ. ও তাঁর সঙ্গীগণ, যারা সাদাতের মতো বিশ্বাসঘাতক থেকে উম্মাহকে মুক্তি দিয়েছেন। পূর্বে আলোচিত বিষয়ের বিরুদ্ধে কোনো কথা বা বিরূপ মন্তব্য করা এ সকল বীর সাহাবী ও সালাফকে কাফের বলার নামান্তর। আল্লাহ তাআলা আমাদের রক্ষা করুন!
টিকাঃ
৫৮. সহীহ বুখারী: ৫/৯০, হা. নং ৪০৩৭ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
৫৯. ফাতহুল বারী: ৭/৩৩৮ (দারুল মারিফা, বৈরূত)
৬০. ফাতহুল বারী: ৭/৩৩৮ (দারুল মারিফা, বৈরূত)
৬১. ফাতহুল বারী: ৭/৩৩৮ (দারুল মারিফা, বৈরূত)
৬২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৭ (দারুল ফিকর, বৈরূত)
৬৩. শারহুস সিয়ারিল কাবীর: পৃ ২৭২ (আশ শিরকাতুশ শারকিয়্যা)
৬৪. মুজামুল কাবীর, তাবারানী: ১৩/১৩৩, হা. নং ১৪৯১৫ (মাকতাবায়ে ইবনে তাইমিয়া, কায়রো)
৬৫. মুসনাদে আহমাদ: ২৫/৪৪০, হা. নং ১৬০৪৭ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৬৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/১১২ (দারুল ফিকর, বৈরূত)
৬৭. সূরা নিসা: ১৪০
৬৮. শারহুস সিয়ারিল কাবীর: পৃ ২৬৬ (আশ শিরকাতুশ শারকিয়্যা)