📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 দ্বিতীয় অবস্থা: তুকিয়া তথা সাবধানতা অবলম্বন

📄 দ্বিতীয় অবস্থা: তুকিয়া তথা সাবধানতা অবলম্বন


তুকিয়া হলো, নিজের উপর বা পরিবারের উপর কাফেরদের পক্ষ থেকে কোনো বিপদের আশঙ্কা করলে অন্তরে তাদের প্রতি পূর্ণ ঘৃণা ও শত্রুতা বজায় রেখে মুখে তাদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রকাশ করা। এর বিপরীত নিফাক বা মুনাফেকী হলো, অন্তরে মুমিনদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করে মুখে তাদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রকাশ করা। নিফাক পরিষ্কার কুফরী, কিন্তু তুকিয়া কুফরী নয়; বরং শরীয়াহ অনুমোদিত একটি সাময়িক কৌশল মাত্র। অন্তরের গোপন বিষয়টি প্রকাশ্য বিষয় থেকে ভিন্ন হওয়ার কারণে নিফাক বা মুনাফেকী পরিভাষাটা তুকিয়া অবলম্বনকারী কোনো মুমিনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা জায়েয নয়। কেননা, প্রত্যেক প্রকাশ্য বিষয় অন্তরস্থ বিষয়ের সাথে অমিল হলেই তাকে নিফাকী বলা হয় না; বরং নিফাকীর সম্পর্ক শুধুমাত্র অন্তরে কুফর গোপন করে মুখে ঈমান প্রকাশ করার সাথে, যা সম্পূর্ণরূপে তুকিয়ার বিপরীত। তুকিয়ার মধ্যে মৌখিকভাবে কাফেরদের জন্য বন্ধুত্ব প্রকাশ করা কুফরী হলেও এখানে যেহেতু তাদের অনিষ্টতা থেকে বাঁচার জন্য এটা অবলম্বন করা হচ্ছে, তাই এতে সে কাফের হবে না। কিন্তু কেউ যদি ওযর হিসেবে বিবেচিত তুকিয়া ব্যতীত এমনিতেই কাফেরদের প্রতি বন্ধুত্ব ও আনুগত্য প্রকাশ করে, তাহলে তাকে কাফের বলে সাব্যস্ত করা হবে।

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 দলীল

📄 দলীল


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন- لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةٌ وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ.
“মুমিনগণ যেনো মুমিনদের ছেড়ে কোনো কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো, তাহলে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করছেন এবং সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। ৫১
ইমাম ইবনে জারীর তাবারী রহ. এ আয়াতের তাফসীরে বলেন- وَمَعْنَى ذَلِكَ : لَا تَتَّخِذُوا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ الْكُفَّارَ ظَهْرًا وَأَنْصَارًا، تُوَالُونَهُمْ عَلَى دِينِهِمْ، وَتُظَاهِرُونَهُمْ عَلَى الْمُسْلِمِينَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ، وَتَدُلُّونَهُمْ عَلَى عَوْرَاتِهِمْ، فَإِنَّهُ مَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللهِ فِي شَيْءٍ؛ يَعْنِي بِذَلِكَ فَقَدْ بَرِئَ مِنَ اللَّهِ، وَبَرِئَ اللَّهُ مِنْهُ بِارْتِدَادِهِ عَنْ دِينِهِ، وَدُخُولِهِ فِي الْكُفْرِ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً، إِلَّا أَنْ تَكُونُوا فِي سُلْطَانِهِمْ، فَتَخَافُوهُمْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ، فَتُظْهِرُوا لَهُمُ الْوَلَايَةَ بِأَلْسِنَتِكُمْ، وَتُضْمِرُوا لَهُمُ الْعَدَاوَةَ، وَلَا تُشَابِعُوهُمْ عَلَى مَا هُمْ عَلَيْهِ مِنَ الْكُفْرِ، وَلَا تُعِينُوهُمْ عَلَى مُسْلِمٍ بِفِعْلٍ.
অর্থাৎ এর অর্থ হলো, হে মুমিনগণ, তোমরা কাফেরদেরকে পৃষ্ঠপোষক ও সহায়তাকারী হিসেবে গ্রহণ করো না। যদ্দরুন তোমরা তাদেরকে তাদের দীনের ক্ষেত্রে ভালোবাসবে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুমিনদের পরিবর্তে তাদেরকে সাহায্য করবে এবং মুসলিমদের গোপন তথ্য তাদের নিকট প্রকাশ করে দিবে। যে ব্যক্তি এমন করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। অর্থাৎ সে স্বীয় দীন থেকে বিচ্যুত হয়ে কুফরে প্রবেশ করায় আল্লাহ তাআলা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তাআলাও তার থেকে মুক্ত। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো তাহলে ভিন্ন কথা। যেমন তোমরা তাদের রাজত্বে থাকাবস্থায় তোমাদের প্রাণ নিয়ে আশঙ্কা করো, ফলে তোমরা মুখে তাদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রকাশ করো, কিন্তু অন্তরে তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো এবং তারা যে কুফরীর উপরে আছে তাদেরকে সেক্ষেত্রে সমর্থন করো না; এমনকি সামান্য একটি কাজের দ্বারাও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করবে না। ৫২
ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَوْلُهُ: إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً فَالتَّقِيَّةُ بِالنِّسَانِ مَنْ حُمِلَ عَلَى أَمَرٍ يَتَكَلَّمُ بِهِ وَهُوَ مَعْصِيَةُ لِلَّهِ، فَيَتَكَلَّمَ بِهِ مَخَافَةَ النَّاسِ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنُّ بِالإِيمَانِ فَإِنَّ ذَلِكَ لَا يَضُرَّهُ إِنَّمَا التَّقِيَّةُ بِالنِّسَانِ.
অর্থাৎ আল্লাহর বাণী "তবে তোমরা যদি তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো।” এর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, মুখের মাধ্যমে তুকিয়া হলো, কাউকে আল্লাহর অবাধ্যতা জাতীয় কোনো কথা বলতে বলা হয়েছে, যদ্দরুন সে মানুষের ভয়ে সে কথা বলে ফেলে, কিন্তু তার অন্তর ঈমানের উপর অটল থাকে। তাহলে এতে তার কোনো গুনাহ হবে না। নিশ্চয়ই তুকিয়া একমাত্র মুখ দ্বারাই হয়ে থাকে। ৫৩
সুদ্দী রহ. বলেন-
عَنِ السُّدِّيِّ: {لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ} [آل عمران: ٢٨] إِلَى {إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةٌ} [آل عمران: ٢٨] أَمَّا أَوْلِيَاءَ: فَيُوَالِيهِمْ فِي دِينِهِمْ، وَيُظْهِرُهُمْ عَلَى عَوْرَةِ الْمُؤْمِنِينَ، فَمَنْ فَعَلَ هَذَا فَهُوَ مُشْرِكٌ، فَقَدْ بَرِئَ اللَّهُ مِنْهُ، إِلَّا أَنْ يَتَّقِيَ مِنْهُمْ تُقَاةٌ، فَهُوَ يُظْهِرُ الْوَلَايَةَ لَهُمْ في دِينِهِمْ وَالْبَرَاءَةَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ.
অর্থাৎ সুদ্দী রহ. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর বাণী “মুমিনগণ যেনো মুমিনদের ছেড়ে কোনো কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। ....তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো।” এখানে বন্ধুগণ অর্থ- কাফেরদেরকে তাদের দীনের ক্ষেত্রে ভালোবাসবে এবং মুসলিমদের গোপন তথ্য তাদের নিকট প্রকাশ করে দিবে। যে ব্যক্তি এমন করবে সে মুশরিক। আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে তাদের পক্ষ থেকে যদি কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে (বাহ্যত) তাদের দীনের ক্ষেত্রে তাদের সাথে বন্ধুত্ব এবং মুমিনদের সাথে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করবে। ৫৪
ইকরামা রহ. বলেন-
عَنْ عِكْرِمَةَ فِي قَوْلِهِ: إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً مَا لَمْ يَهْرِقْ دَمَ مُسْلِمٍ وَمَا لَمْ يَسْتَحِلَّ مَالَهُ.
অর্থাৎ আল্লাহর বাণী "তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো।” এর ব্যাখ্যায় ইকরামা রহ. বলেন, এ ভয় ও আশঙ্কার অবস্থা ততোক্ষণ পর্যন্ত সাব্যস্ত হবে না, যতোক্ষণ না কোনো মুসলিমের রক্ত প্রবাহিত করা হয় এবং তার ধন-সম্পদ বৈধ করা হয়। ৫৫
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
وقوله تعالى: إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةٌ أَيْ إِلَّا مَنْ خَافَ فِي بَعْضِ الْبُلْدَانِ أَوِ الْأَوْقَاتِ مِنْ شَرِّهِمْ، فَلَهُ أَنْ يَتَّقِيَهُمْ بِظَاهِرِهِ لَا بباطنه ونيته، كما قال الْبُخَارِيُّ عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ: أَنَّهُ قَالَ: إِنَّا لَتَكْشِرُ فِي وُجُوهِ أَقْوَامٍ وَقُلُوبُنَا تَلْعَنُهُمْ. وَقَالَ الثوري: قال ابن عباس: لَيْسَ التَّقِيَّةُ بِالْعَمَلِ إِنَّمَا التَّقِيَّةُ بِالنِّسَانِ، وَكَذَا رَوَاهُ الْعَوْفِيُّ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: إِنَّمَا التَّقِيَّةُ بِالنِّسَانِ، وَكَذَا قَالَ أَبُو الْعَالِيَةِ وَأَبُو الشَّعْثَاءِ وَالضَّحَاكُ وَالرَّبِيعُ بْنُ أَنَسٍ. وَيُؤَيِّدُ مَا قَالُوهُ قَوْلُ اللَّهِ تَعَالَى: مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنُّ بِالْإِيمَانِ [النَّحْلِ: ١٠٦]. وَقَالَ الْبُخَارِيُّ: قَالَ الْحَسَنُ: التَّقِيَّةُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
অর্থাৎ আল্লাহর বাণী “তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো।” এর ব্যাখ্যা হলো, যে ব্যক্তি কোনো শহরে বা কোনো সময়ে কাফেরদের পক্ষ থেকে অনিষ্টের আশঙ্কা করে, তাহলে তার জন্য অন্তর দিয়ে নয়; বরং বাহ্যিকভাবে কিছু প্রকাশ করে তাদের থেকে আত্মরক্ষা করার অবকাশ আছে। যেমনটি ইমাম বুখারী রহ. আবু দারদা রাযি. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নিশ্চয় আমরা কিছু লোকের সাথে দাঁত বের করে হাসি, অথচ অন্তর তাদেরকে অভিশাপ দেয়। ইমাম সাওরী রহ. বলেন, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন, তুকিয়া কাজের মাধ্যমে নয়; বরং তা একমাত্র মুখ দিয়েই করা হয়। এমনিভাবে আওফী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, তুকিয়া শুধুমাত্র মুখ দিয়েই সংঘটিত হয়। এভাবে আবুল আলীয়া রহ., আবুশ শা'সা রহ., যাহহাক রহ., রবী ইবনে আনাস রহ. এমন মতই ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের উপরোক্ত ব্যাখ্যা আল্লাহর এ বাণী সমর্থন করে, “যাকে (কুফরী করতে) বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার অন্তর ঈমানের উপর অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ ঈমান আনার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরীর জন্য হৃদয়-মন উন্মুক্ত করে দেয়, তাদের উপর আল্লাহর গযব আপতিত হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা নাহল: ১০৬] ইমাম বুখারী রহ. বলেন, হাসান বসরী রহ. বলেছেন, তুকিয়া কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। ৫৬
মূলত তুকিয়ার করার জন্য উপযুক্ত হলো দুর্বল শ্রেণীর মুসলমান, যারা যুলমের দেশ থেকে বের হওয়ার সামর্থ্য রাখে না বা এর কোনো পথ-পদ্ধতি খুঁজে পায় না। এমতাবস্থায় তারা একান্ত বাধ্য হলে তুকিয়ার আশ্রয় গ্রহণ করবে। অর্থাৎ তারা এ দুর্বল অবস্থায় জিহাদের মাধ্যমে কাফেরদেরকে মূলোৎপাটন করতে সক্ষম না হওয়ায় নিজেদের জান-মাল ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে তুকিয়া করবে। এরাই হলো নিম্নে উল্লিখিত আয়াত দ্বারা উদ্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন- إِلَّا الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلَا يَهْتَدُونَ سَبِيلًا - فَأُولَئِكَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَعْفُوَ عَنْهُمْ وَكَانَ اللَّهُ عَفُوًا غَفُورًا
"কিন্তু পুরুষ, নারী ও শিশুদের মধ্য হতে যারা অসহায়, যারা কোনো উপায় বের করতে পারে না এবং পথও জানে না তাদের কথা ভিন্ন। এদের ব্যাপারে আশা করা যায়, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।”৫৭
তুকিয়া হলো এই ধরনের দুর্বল মুসলমানদের জন্য, সে সকল মুসলমানের জন্য নয়, যারা কোনো কৌশল অবলম্বন করতে কিংবা হিজরতের কোনো পথ বের করতে সক্ষম।

টিকাঃ
৫১. সূরা আলে ইমরান: ২৮
৫২. তাফসীরে তাবারী: ৬/৩১৩ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৫৩. তাফসীরে ইবনে আবী হাতিম: ২/৬২৯, হা. নং ৩৩৮১ (মাকতাবাতু নাযযার মুস্তাফা আল বায, সৌদিআরব)
৫৪. তাফসীরে তাবারী: ৬/৩১৪, হা. নং ৬৮২৮ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৫৫. তাফসীরে ইবনে আবী হাতিম: ২/৬২৯, হা. নং ৩৩৮০ (মাকতাবাতু নাযযার মুস্তাফা আল বায, সৌদিআরব)
৫৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/২৫ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
৫৭. সূরা নিসা: ৯৮-৯৯

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 তুকিয়া এবং ইকরাহের মাঝে পার্থক্য

📄 তুকিয়া এবং ইকরাহের মাঝে পার্থক্য


১. ইকরাহ কথা এবং কাজ উভয়টা দিয়ে হয়। অন্যদিকে তুকিয়া শুধু কথার মাধ্যমে হয়। কাঠামোগত দিক থেকে তুকিয়ার তুলনায় ইকরাহ হলো ব্যাপক। সুতরাং কাউকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করা হলে তাকে ইকরাহ বলা হবে, তুকিয়া নয়। আর কোনো কথা বলতে বাধ্য হলে বা বাধ্য করা হলে সেটাকে ইকরাহ ও তুকিয়া উভয় বিশেষণে বিশেষিত করা যায়।
২. সময় ও স্থানভেদে ইকরাহের তুলনায় তুকিয়া হলো ব্যাপক। ইকরাহের ধরণ হলো, কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট স্থানে অথবা নির্দিষ্ট সময়ে তার অসম্মতিতে কোনো নির্দিষ্ট কথা বা কাজের ব্যাপারে এমনভাবে জোর করা, যে অবস্থায় ব্যক্তি কুফর বা শরীয়তের পরিপন্থী কোনো কাজ করলে তাকে অপরাধ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। যখন সে সময় চলে যায় এবং সে স্থান থেকে সরে আসে তখন ইকরাহের অবস্থা শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে তুকিয়ার ধরণ হলো, এর সময় ও স্থান আরো বেশি বিস্তৃত। মুসলিম ব্যক্তি বিপদাপন্ন অবস্থায় যতোক্ষণ পর্যন্ত যুলমের দেশে অবস্থান করে, ততোক্ষণ পর্যন্ত তুকিয়ার সময় বিস্তৃত থাকে। যখনই বিপদাপন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় ব্যক্তি তুকিয়ার অবস্থায় প্রবেশ করে। এ অবস্থা ততোক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর থাকে, যতোক্ষণ না উক্ত যালেম সম্প্রদায়কে প্রতিহত করা হয়।
তুকিয়ার তুলনায় ইকরাহ হয় তাৎক্ষণিকভাবে এবং এর প্রয়োগও হয় খুব তাড়াতাড়ি। অন্যদিকে তুকিয়া হলো ইকরাহের একটি অংশ। এটি তাৎক্ষণিকভাবে হয় না। এক্ষেত্রে নির্যাতন কখনো কখনো দেরিতে আসে। যতোক্ষণ না যালেম গোষ্ঠী তুকিয়াকারীকে পর্যবেক্ষণ করে এবং তার পিছনে গোয়েন্দগিরি করে তার গোপন তথ্য বের করতে সক্ষম হয়। এগুলো হলো তুকিয়া ও ইকরাহের মাঝে পার্থক্য।

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 তৃতীয় অবস্থা: বড় কুফরকে প্রতিহত করা

📄 তৃতীয় অবস্থা: বড় কুফরকে প্রতিহত করা


কখনো পরিস্থিতি এমন হয় যে, দুটি কুফরী থেকে বাধ্যতামূলক যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হয়। এমতাবস্থায় শরয়ী বিধান হলো, যে কুফরটি নিম্নমানের ও কম ক্ষতিকর সেটিকে গ্রহণ করে তুলনামূলকভাবে অধিক জঘন্য ও কঠিন কুফর থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
এর ধরন হলো এরকম যে, উম্মাহ কোনো তাগুত দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত হলো, যার কুফরী একটির চেয়ে অপরটি জঘন্য হয় এবং যার ফিতনা শহর-বন্দর ছেয়ে আল্লাহর বান্দাদের উপর প্রকট হতে থাকে। এমতাবস্থায় যদি আল্লাহর বান্দাদেরকে বাঁচানোর জন্য ও সে তাগুতের মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে তার সেনাবাহিনীতে বা তাদের অভ্যন্তরে অবস্থান করা ব্যতীত অন্য কোনো পথ না থাকে এবং তাদের কাছে নিজেকে একজন একনিষ্ঠ সৈন্য বলে প্রমাণ করতে হয়, তাহলে প্রয়োজনবশত নিজেকে তাই করতে হবে; যতোক্ষণ না তাগুতের ঘাড় হাতের নাগালে নিয়ে তাকে হত্যা করা যায়।
যদি তাগুত বা কুফরের নেতাকে হত্যা করার প্রয়োজনে তাদের সেনার ভিতরে থাকতে হয়, নিজেকে তাদের একজন হিসেবে প্রকাশ করতে হয়, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে নিয়ত হতে হবে তাগুতের মূলোৎপাটন এবং তার অনিষ্টতা ও জঘন্য কুফরী থেকে উম্মাহকে মুক্তি দেয়া।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00