📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 ভুল ইজতিহাদ

📄 ভুল ইজতিহাদ


কোনো মুজতাহিদ আলেম গ্রহণযোগ্য ওযরের কারণে ভুল করেছেন বা তার কাছে শরয়ী নস পৌঁছেনি বা পৌঁছলেও তিনি তা ভুলে গেছেন বা সনদ বা মতনের দিক থেকে কোনো নস তার কাছে বিশুদ্ধ মনে হয়নি কিংবা বিশুদ্ধ মনে হলেও এতে থাকা ইঙ্গিতপূর্ণ বিধান তিনি বুঝতে পারেননি বা তিনি দলীলটিকে মানসূখ (রহিত) বা মুকাইয়াদ (শর্তযুক্ত) বিবেচনা করেছেন বা এ জাতীয় অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুলের কারণে উক্ত আলেম কোনো হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম বলেছেন বা শরীয়তের কোনো বিধানের বিপরীত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, এমতাবস্থায় তাকে স্বীয় ভুল ইজতিহাদের কারণে মাযূর ধরা হবে এবং এর কারণে তিনি একগুণ সাওয়াবের অধিকারী হবেন।

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 দলীল

📄 দলীল


সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَمْرِو بْنِ العَاصِ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرُ.
আমর বিন আস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, “যখন হাকিম (ফয়সালাকারী) ফয়সালা করতে গিয়ে ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তখন তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব।
আর যখন ফয়সালা করতে গিয়ে ইজতিহাদ করে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তখন তার জন্য রয়েছে একগুণ সাওয়াব।”২৯
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- ابْنُ أَبِي كَثِيرٍ، قَالَ: سَمِعْتُ عُقْبَةَ بْنَ عَبْدِ الْغَافِرِ، يَقُولُ: سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ، يَقُولُ: جَاءَ بِلَالُ بِتَمْرٍ بَرْنِي، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مِنْ أَيْنَ هَذَا؟ فَقَالَ بِلَالُ: تَمْرُ كَانَ عِنْدَنَا رَدِيءُ، فَبِعْتُ مِنْهُ صَاعَيْنِ بِصَاعٍ لِمَطْعَمِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ عِنْدَ ذَلِكَ : أَوَّهُ عَيْنُ الرِّبَا، لَا تَفْعَلْ، وَلَكِنْ إِذَا أَرَدْتَ أَنْ تَشْتَرِيَ التَّمْرَ فَبِعْهُ بِبَيْعِ آخَرَ، ثُمَّ اشْتَرِ بِهِ.
উকবা বিন আব্দুল গাফির রহ. বলেন, আমি আবু সাঈদ খুদরী রাযি.-কে বলতে শুনেছি যে, (একবার) বিলাল রাযি. উন্নতমানের কিছু বরনী খেজুর নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এগুলো কোথায় পেলে? বিলাল রাযি. বললেন, আমাদের কাছে কিছু নিম্নমানের খেজুর ছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মেহমানদারী করার জন্য আমি এক সা' ভালো খেজুরের বিনিময়ে দুই সা' নিম্নমানের খেজুর বিক্রয় করেছি। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হায়! এটা তো একেবারে খাঁটি সুদ! এরূপ করো না। যদি তুমি উৎকৃষ্ট খেজুর কিনতেই চাও, তাহলে (প্রথমে) নিম্নমানের খেজুর অন্য বস্তুর বিনিময়ে বিক্রি করো। তারপর সেই মূল্যের বিনিময়ে উৎকৃষ্ট খেজুর কিনে নাও।৩০
মুসনাদে আবী ইয়ালাতে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءُ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদ ভক্ষণকারী, সুদ দানকারী, তার সাক্ষী, তার লেখক সকলের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান।”৩১
আল আহাদ ওয়াল মাসানী গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: دِرْهَمُ رِبًا أَشَدُّ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ سِتَّةٍ وَثَلَاثِينَ زَنْيَةٍ
আব্দুল্লাহ বিন হানযালা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জেনেশুনে এক দিরহাম পরিমাণ সুদ খাওয়ার গুনাহ আল্লাহর নিকট ছত্রিশবার ব্যভিচার করার চেয়েও জঘন্য গুনাহ। ৩২
যদিও এ হুকুমটি ব্যাপক, কিন্তু বিলাল রাযি. এর ক্ষেত্রে আমরা এটি প্রয়োগ করতে পারবো না। কারণ, তাঁর ইজতিহাদ মতে উক্ত কর্মটি সুদের আওতায় পড়ে না। এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এটাকে বিলাল রাযি. এর ত্রুটি বলে তাঁকে মাসআলাটি শিখিয়ে দিয়ে তাঁর ভুলটিকে শুধরে দিলেন।
একবার একটি ঘটনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য বোঝা নিয়ে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এর মাঝে মতভিন্নতা দেখা দেয়। তাঁরা দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে দু'রকম আমল করেন। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব জেনে কাউকেই ভর্ৎসনা করলেন না।
যেমন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَنَا لَمَّا رَجَعَ مِنَ الأَحْزَابِ: لَا يُصَلِّيَنَّ أَحَدُ العَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ. فَأَدْرَكَ بَعْضَهُمُ العَصْرُ فِي الطَّرِيقِ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: لَا نُصَلِّي حَتَّى نَأْتِيَهَا، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: بَلْ نُصَلِّي، لَمْ يُرِدْ مِنَّا ذَلِكَ، فَذُكِرَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمْ يُعَنِّفْ وَاحِدًا مِنْهُمْ.
ইবনে উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আহযাবের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসলেন, তখন বললেন, সবাই যেনো আসরের নামায বনু কুরাইযায় গিয়েই আদায় করে। অতঃপর তাদের মাঝে কিছু সাহাবা পথিমধ্যে থ াকাবস্থায়ই আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেলো। তখন কতক সাহাবা বললেন, আমরা বনু কুরাইযায় পৌঁছেই নামায আদায় করবো। আর কতক সাহাবা বললেন, বরং আমরা এখানেই নামায আদায় করে নেবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে এটা চাননি (বরং চেয়েছেন, আমরা যেনো তাড়াতাড়ি সেখানে যাই)। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট বিষয়টি বলা হলে তিনি কাউকেই ভর্ৎসনা করলেন না।৩৩
এ ঘটনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের কোনো দলকেই তিরস্কার না করার কারণ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উক্ত হুকুমে তাদের এ ইজতিহাদ ও মতভিন্নতা করার সুযোগ ছিলো। তা যেহেতু উভয় অর্থের সম্ভাবনা রাখে, তাই কোনোটিই তিরস্কারযোগ্য হয়নি।
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: خَرَجَ رَجُلَانِ فِي سَفَرٍ، فَحَضَرَتِ الصَّلَاةُ وَلَيْسَ مَعَهُمَا مَاءُ، فَتَيَمَّمَا صَعِيدًا طَيِّبًا فَصَلَّيَا، ثُمَّ وَجَدَا الْمَاءَ فِي الْوَقْتِ، فَأَعَادَ أَحَدُهُمَا الصَّلَاةَ وَالْوُضُوءَ وَلَمْ يُعِدِ الْآخَرُ، ثُمَّ أَتَيَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَا ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ لِلَّذِي لَمْ يُعِدْ: أَصَبْتَ السُّنَّةَ، وَأَجْزَأَتْكَ صَلَاتُكَ. وَقَالَ لِلَّذِي تَوَضَّأَ وَأَعَادَ: لَكَ الْأَجْرُ مَرَّتَيْنِ
আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার দু'ব্যক্তি সফরে বের হলো। নামাযের সময় হলো, কিন্তু তারা অযু করার পানি পেলো না। তাই উভয়ে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নিলো। অতঃপর ওয়াক্ত থাকা অবস্থায় তারা পানি পেয়ে গেলে তাদের একজন অযু করে পুনরায় নামায পড়ে নিলো, কিন্তু অন্যজন পড়লো না। তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে এ ব্যাপারে জানালেন। যে ব্যক্তি পুনরায় নামায আদায় করেনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করেছো। তোমার নামায পূর্ণ হয়েছে। আর যে ব্যক্তি অযু করেছিলো এবং নামায পুনরায় আদায় করেছিলো তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব। ৩৪
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
مَنْ نَشَأَ بِبَادِيَةٍ أَوْ كَانَ حَدِيثَ عَهْدٍ بِالْإِسْلَامِ, وَفَعَلَ شَيْئًا مِنْ الْمُحَرَّمَاتِ غَيْرَ عَالِم بِتَحْرِيمِهَا, لَمْ يَأْثَمْ, وَلَمْ يُحَدَّ, وَإِنْ لَمْ يَسْتَنِدْ في اسْتِحْلَالِهِ إِلَى دَلِيلٍ شَرْعِيَّ فَمَنْ لَمْ يَبْلُغْهُ الْحَدِيثُ الْمُحَرِّمُ وَاسْتَنَدَ فِي الْإِبَاحَةِ إِلَى دَلِيلٍ شَرْعِيَّ, أَوْلَى أَنْ يَكُونَ مَعْذُورًا. وَلِهَذَا كَانَ هَذَا مَأْجُورًا مَحْمُودًا لِأَجْلِ اجْتِهَادِهِ
অর্থাৎ যে ব্যক্তি জনশূন্য উপত্যকায় বেড়ে উঠেছে অথবা নতুন করে মুসলমান হয়েছে; এমতাবস্থায় না জেনে কোনো হারাম কাজ করে ফেলেছে, তাহলে সে গুনাহগার হবে না এবং তাকে এজন্য শাস্তিও দেয়া হবে না। যদিও হারাম কাজটিকে হালাল করার ক্ষেত্রে সে শরয়ী কোনো দলীলের উপর নির্ভর করেনি। আর যার কাছে কোনো বিষয় হারাম হওয়ার জ্ঞান পৌঁছেনি এবং সে শরয়ী কোনো দলীলের আলোকে সেটিকে বৈধ সাব্যস্ত করে; তবে তো সে মাযূর হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য হবে। তার এ ইজতিহাদের কারণে সে প্রতিদানযোগ্য ও প্রশংসিত হবে।৩৫

টিকাঃ
২৯. সহীহ বুখারী: ৯/১০৮, হা. নং ৭৩৫২ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
৩০. সহীহ মুসলিম: ৩/১২১৫, হা. নং ১৫৯৪ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
৩১. মুসনাদে আবী ইয়ালা: ৩/৩৭৭, হা. নং ১৮৪৯ (দারুল মামুন লিত্তুরাস, দামেশক)
৩২. আল আহাদ ওয়াল মাসানী: ৫/২২৯, হা. নং ২৭৫৯ (দারুর রায়া, রিয়াদ)
৩৩. সহীহ বুখারী: ২/১৫, হা. নং ৯৪৬ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
৩৪. সুনানে আবু দাউদ: ১/৯৩, হা. নং ৩৩৮ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরূত)
৩৫. রফউল মালাম: ৩৮ (আর রিয়াসাতুল আম্মাহ, রিয়াদ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00