📄 দলীল
যম্মুল কালাম ওয়া আহলিহী-তে বর্ণিত হয়েছে- عَنِ أَبِي ذَرٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّكُمُ الْيَوْمَ فِي زَمَانٍ كَثِيرٍ عُلَمَاؤُهُ قَلِيلٍ خُطَبَاؤُهُ مَنْ تَرَكَ عَشِيرَ مَا يَعْرِفُ فَقَدْ هَوَى وَيَأْتِي مِنْ بَعْدُ زَمَانٌ كَثِيرُ خُطَبَاؤُهُ قَلِيلٌ عُلَمَاؤُهُ مَنِ اسْتَمْسَكَ بِعَشِيرِ مَا يَعْرِفُ فَقَدْ نجا.
আবু যার রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “তোমরা এমন একটি যুগে বসবাস করছো, যে যুগে আলেম অনেক এবং বক্তা স্বল্প। তোমাদের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তি যা জানে তার এক দশমাংশ পরিমাণ আমল পরিত্যাগ করলো তো সে ধ্বংস। আর তোমাদের পরে এমন এক সময় আসবে যখন বক্তা হবে অনেক, আলেম হবে কম। যে যুগে কোনো ব্যক্তি যা জানবে তার এক দশমাংশের উপর আমল করলেও সে জাহান্নাম থেকে মুক্ত।”২৪
উক্ত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যামানাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। একটি হলো, এমন যামানা, যখন আলেম হবে অধিক। এ সময় কেউ যা জানে তার এক দশমাংশের উপর আমল করা ছেড়ে দিলে তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধ্বংস এবং শাস্তির কথা বলেছেন। দ্বিতীয়টি হলো, এমন যামানা, যখন আলেম হবে স্বল্পসংখ্যক। এ সময় কেউ যতোটুকু জানে তার এক দশমাংশের উপর আমল করলেও সে সফল এবং নাজাতপ্রাপ্ত হবে। কারণ, এ সময় আলেমরা হবেন স্বল্পসংখ্যক।
সুনানে ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ الْيَمَانِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَدْرُسُ الْإِسْلَامُ كَمَا يَدْرُسُ وَشْيُ الثَّوْبِ، حَتَّى لَا يُدْرَى مَا صِيَامُ، وَلَا صَلَاةً، وَلَا نُسُكُ، وَلَا صَدَقَةٌ، وَلَيُسْرَى عَلَى كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي لَيْلَةٍ، فَلَا يَبْقَى فِي الْأَرْضِ مِنْهُ آيَةٌ، وَتَبْقَى طَوَائِفُ مِنَ النَّاسِ الشَّيْخُ الْكَبِيرُ وَالْعَجُوزُ، يَقُولُونَ: أَدْرَكْنَا آبَاءَنَا عَلَى هَذِهِ الْكَلِمَةِ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، فَنَحْنُ نَقُولُهَا. فَقَالَ لَهُ صِلَةُ: مَا تُغْنِي عَنْهُمْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَهُمْ لَا يَدْرُونَ مَا صَلَاةٌ، وَلَا صِيَامُ، وَلَا نُسُكُ، وَلَا صَدَقَةً؟ فَأَعْرَضَ عَنْهُ حُذَيْفَهُ، ثُمَّ رَدَّهَا عَلَيْهِ ثَلَاثًا، كُلَّ ذَلِكَ يُعْرِضُ عَنْهُ حُذَيْفَهُ، ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْهِ فِي الثَّالِثَةِ، فَقَالَ: يَا صِلَةُ، تُنْجِيهِمْ مِنَ النَّارِ ثَلَاثًا.
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইসলাম মলিন হয়ে যাবে, যেমন কাপড়ের উপরের কারুকার্য মলিন হয়ে যায়। শেষে পরিস্থিতি এমন হবে যে, মানুষ জানবে না রোযা কী, নামায কী, কুরবানী কী, যাকাত কী? একরাতে পৃথিবী থেকে মহান আল্লাহর কিতাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ফলে পৃথিবীতে একটি আয়াতও অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষের কয়েকটি দল অবশিষ্ট থাকবে। তাদের মধ্যকার বৃদ্ধ- বৃদ্ধারা বলবে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালেমার অনুসারী দেখতে পেয়েছি, তাই আমরাও সে কালেমা বলি। বর্ণনাকারী সিলা রহ. হুযাইফা রাযি.-কে বললেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলায় তাদের কী উপকার হবে? অথচ তারা জানে না নামায কী, রোযা কী, হজ কী, কুরবানী কী এবং যাকাত কী? তিনি তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। সিলা রহ. তিনবার কথাটির পুনরাবৃত্তি করলে তিনি প্রতিবারই তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেন। তৃতীয়বারের পর তিনি তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, হে সিলা, এই কালেমা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবে, কথাটি তিনি তিনবার বললেন। ২৫
জাহালত বা মূর্খতা ওযর হিসেবে ধর্তব্য হওয়ার ক্ষেত্রে এ হাদীসটি একটি দলীল। এ থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তি এমন সময় বা স্থানে বসবাস করে, যেখানে ইসলামের শিক্ষা অপ্রচলিত, যেখানে শরীয়তের ইলম পৌঁছে না বা সে ইলম পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয় না; যদ্দরুন সে নামায, রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাকার বিধিবিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়, তাহলে এমতাবস্থায় তাকে মাযূর হিসেবে ধরা হবে এবং তাওহীদের কালেমা তার জন্য মুক্তির কারণ বলে বিবেচিত হবে।
তাই যখন দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ ইলম থেকে বঞ্চিত থাকে; এমনকি অনুমান করে নিতেও ব্যর্থ হয়, যখন তারা এমন স্থানে সফর করতে সক্ষম হয়ে থাকে, যেখানে গেলে তাদের শরয়ী ইলম পূর্ণতা পাবে এক্ষেত্রে তার কোনো বাধাও না থাকে, কিন্তু সে অলসতা করে বাসস্থানে বসে থাকে ও সম্পদকে অগ্রাধিকার দেয়, ইলম অর্জনে কোনোরূপ চেষ্টা-প্রচেষ্টা তার মাঝে পরিলক্ষিত হয় না, অজ্ঞতাকে দূর করার জন্য কোনোরূপ পরিশ্রমও করে না; এমতাবস্থায় তার এ অবহেলার কারণে যদি সে কুফরে পতিত হয়ে থাকে, তাহলে সে স্বীয় জাহালাত বা মূর্খতার কারণে মাযূর হিসেবে ধর্তব্য হবে না। কেননা, জাহালত বা অজ্ঞতাকে দূর করার সক্ষমতা তার ছিলো, কিন্তু সে তা করেনি। অতএব তার এ অজ্ঞতাকে একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার অপরাধের জন্য শাস্তিও পেতে হবে।
টিকাঃ
২৪. যম্মুল কালাম ওয়া আহলিহী: ১/১১০-১১১, হা. নং ৯৭ (মাকতাবাতুল উলূম ওয়াল হিকাম, মদীনা)
২৫. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২/১৩৪৪, হা. নং ৪০৪৯ (দারু ইহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যা, ফয়সাল ঈসা হালবী)
📄 অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল
নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাকফীরের প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি হলো, অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে কোনো কিছু উচ্চারণ করা। যেনো ভুলটা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তার থেকে প্রকাশ পেয়েছে বা তার জিহ্বার অনিচ্ছাকৃত পদস্খলনের কারণে ভুলে কোনো কুফরী বাক্য বা কুফরী কাজ প্রকাশ পেয়েছে। এমতাবস্থায় উক্ত ব্যক্তিকে মাযূর ধরা হবে।
📄 দলীল
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন- وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَحِيمًا.
“তোমাদের কোনো বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্ন কথা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”২৬
মুস্তাদরাকে হাকিমে বর্ণিত হয়েছে- عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَجَاوَزَ اللَّهُ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ، وَالنَّسْيَانَ، وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ.
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অনিচ্ছাকৃত ভুল, বিস্মরণ ও বাধ্যতামূলক পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন।২৭
“অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল তাকফীরের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে” বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য আরো একটি দলীল হলো- ঐ ব্যক্তির কথা, যে মরুভূমিতে নিজ উট হারিয়ে চরম হতাশা ও আশঙ্কায় পড়েছিলো। পরবর্তীতে তার বাহনটি পানাহারের বস্তুসামগ্রীসহ খুঁজে পেয়ে আনন্দের আতিশয্যে সে বলে ফেলেছিলো- اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ -অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনি আমার বান্দা আর আমি আপনার রব। আনন্দের চরম মুহূর্তে সে ভুল বলে ফেলেছিলো।
যেমন সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ وَهُوَ عَمُّهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَلهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ، مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ، فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ، فَأَيْسَ مِنْهَا، فَأَتَى شَجَرَةً، فَاضْطَجَعَ فِي ظِلَّهَا، قَدْ أَبِسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ، فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا، قَائِمَةٌ عِنْدَهُ، فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا، ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ: اللهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ، أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ.
আনাস বিন মালেক রাযি. বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবাতে তোমাদের সে ব্যক্তির চেয়েও বেশি খুশি হোন, যে বিজন প্রান্তরে তার বাহনের উপর ছিলো। এরপর বাহনটি তার খাদ্য-পানীয়সহকারে তার কাছ থেকে মরুভূমিতে হারিয়ে গেলো। একপর্যায়ে (এটাকে খুঁজে না পেয়ে) সে হতাশ হয়ে পড়লো। এরপর সে নিরাশাবস্থায় একটি গাছের নিচে এসে এর ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়লো। তারপর ঘুম থেকে জেগেই দেখে বাহনখানি তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার লাগাম ধরে ফেলে এবং খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে ফেললো, হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার প্রভু। ভীষণ খুশির চোটেই সে ভুল বলে ফেললো।২৮
অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল দ্বারা উদ্দেশ্য ভুলে পতিত হওয়ার ইচ্ছা না করা, ভুলের কারণে কুফরী করার ইচ্ছা করা উদ্দেশ্য নয়। কারণ, যে ব্যক্তি ভুলে কোনো কিছুর ইচ্ছা করে এবং এ ভুলটি কুফরী হয়, তাহলে সে কুফরীর ইচ্ছা করুক বা না করুক তাকে কাফের সাব্যস্ত করা হবে।
এখানে দু'টি বিষয়ের মাঝে পার্থক্য আছে। একটি হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করা, যা শাস্তির উপযুক্ত বিবেচিত হওয়াকে আবশ্যক করে। আর অন্যটি হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করার পিছনে কুফরীতে পতিত হওয়ার ইচ্ছা করা। এটি তাকফীর বা শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার বিবেচনার জন্য শর্ত নয়। এ রকম আকীদা কেবল জাহমিয়া ও মুরজিয়ারা পোষণ করে। এ ব্যাপারে পূর্বে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
টিকাঃ
২৬. সূরা আহযাব: ৫
২৭. মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/২১৬, হা. নং ২৮০১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
২৮. সহীহ মুসলিম: ৪/২১০৪, হা. নং ২৭৪৭ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
📄 ভুল ইজতিহাদ
কোনো মুজতাহিদ আলেম গ্রহণযোগ্য ওযরের কারণে ভুল করেছেন বা তার কাছে শরয়ী নস পৌঁছেনি বা পৌঁছলেও তিনি তা ভুলে গেছেন বা সনদ বা মতনের দিক থেকে কোনো নস তার কাছে বিশুদ্ধ মনে হয়নি কিংবা বিশুদ্ধ মনে হলেও এতে থাকা ইঙ্গিতপূর্ণ বিধান তিনি বুঝতে পারেননি বা তিনি দলীলটিকে মানসূখ (রহিত) বা মুকাইয়াদ (শর্তযুক্ত) বিবেচনা করেছেন বা এ জাতীয় অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুলের কারণে উক্ত আলেম কোনো হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম বলেছেন বা শরীয়তের কোনো বিধানের বিপরীত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, এমতাবস্থায় তাকে স্বীয় ভুল ইজতিহাদের কারণে মাযূর ধরা হবে এবং এর কারণে তিনি একগুণ সাওয়াবের অধিকারী হবেন।