📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 যে সকল ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যা ওযর হিসেবে গ্রহণযোগ্য

📄 যে সকল ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যা ওযর হিসেবে গ্রহণযোগ্য


নসের মধ্যে কোনো ইঙ্গিত বা নিদর্শন থাকা, যদ্দরুন এমন ভুল ব্যাখ্যা বোঝার সম্ভাবনা থাকে। চাই তা আভিধানিক অর্থের কারণে হোক বা শরীয়তের কোনো মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যতা থাকার কারণে হোক। কিংবা প্রাধান্যপ্রাপ্ত ও রহিতকারী নস সম্পর্কে না জানা থাকায় কোনো অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত বা রহিত দলীলের উপর নির্ভর করার কারণে হোক। অথবা কোনো ব্যাপক দলীলের বিপরীত নির্দিষ্টকারী দলীল না জানা থাকায় কিংবা কোনো নিঃশর্ত দলীলের বিপরীত শর্তযুক্ত দলীল না জানা থাকার কারণে হোক। এ ধরনের কোনো কারণে যদি সে কুফরী কথা বা ব্যাখ্যা বলে থাকে, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার এ ভুল ব্যাখ্যাটি ওযর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে এবং তা তার কাফের হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হবে।

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 নওমুসলিম হওয়া

📄 নওমুসলিম হওয়া


কোনো ব্যক্তি নতুন মুসলমান হয়ে যদি কোনো শরীয়তবিরোধী কাজ বা কুফরী কর্ম করে ফেলে, তাহলে তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা যাবে না; বরং তাকে মাযূর বলে গণ্য করা হবে। কেননা, স্বাভাবিকত একজন নওমুসলিম ইসলাম গ্রহণের পরপরই বিশুদ্ধ আকীদা ও প্রয়োজনীয় মাসআলা শিখতে সক্ষম হয় না। আর ইতঃপূর্বে গত হয়েছে যে, অক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো হুকুম আরোপিত হওয়াকে রহিত করে দেয়। আর যে ব্যক্তি এমন (নওমুসলিম) হবে অনুমান করা কঠিন নয় যে, তার থেকে এমন কোনো কর্ম সংঘটিত হয়ে যাবে, যা কুফর বলে পরিগণিত হয়। সে হয়তো ভাববে, এ কাজটি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 দলীল

📄 দলীল


সুনানে তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي وَاقِدٍ اللَّيْنِي، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا خَرَجَ إِلَى حُنَيْنٍ مَرَّ بِشَجَرَةٍ لِلْمُشْرِكِينَ يُقَالُ لَهَا: ذَاتُ أَنْوَاطٍ يُعَلِّقُونَ عَلَيْهَا أَسْلِحَتَهُمْ، فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ ، اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: سُبْحَانَ اللهِ هَذَا كَمَا قَالَ قَوْمُ مُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَرْكَبُنَّ سُنَّةَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ.
আবু ওয়াকিদ লাইসী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুনাইন যুদ্ধে বের হলেন, তখন পথিমধ্যে 'যাতু আনওয়াত' নামক মুশরিকদের বিশেষ একটি গাছের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। এর উপর তারা তলোয়ার লটকিয়ে রাখতো। অতঃপর কতিপয় (নওমুসলিম) সাহাবা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওদের যেমন একটা যাতু আনওয়াত আছে আমাদের জন্যও একটা যাতু আনওয়াত নির্ধারণ করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সুবহানাল্লাহ! এটা তো তেমনই কথা যেমনটি বলেছিলো মূসা আ.-এর সম্প্রদায় যে, 'তাদের যেমন অনেক মাবুদ আছে, তেমনি আমাদের জন্যও একটি মাবুদ নির্ধারণ করে দিন।' ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের অভ্যাস অবশ্য অবশ্যই পালন করে ছাড়বে।” ২১
এটা একটি শিরকী কথা। কিন্তু তাঁরা মাত্রই মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। অর্থাৎ যখন তাঁরা কথাটি বলেন ঐতিহাসিকদের নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী তার মাত্র পনেরো দিন আগেই তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এজন্য তাদের একথার কারণে তারা মুশরিক সাব্যস্ত হয়ে যায়নি।
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ السُّلَمِيِّ، قَالَ: صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم.... قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّا قَوْمٌ حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ، وَقَدْ جَاءَنَا اللهُ بِالْإِسْلَامِ، وَمِنَّا رِجَالٌ يَأْتُونَ الْكُهَانَ، قَالَ: فَلَا تَأْتِهِمْ.
মুআবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর সাথে নামায পড়লাম। ....আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এতোদিন আমরা ছিলাম মূর্খতায় নিমজ্জিত একটি জাতি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা গণকদের কাছে যাতায়াত করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তাদের কাছে যেও না। ২২
ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. বর্ণনা করেন- وَقَالَ عَدِيُّ بْنُ حَاتِمٍ: أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي عُنُقِي صَلِيبٌ فَقَالَ لِي: يَا عَدِيَّ بْنَ حَاتِمٍ: أَلْقِ هَذَا الْوَثَنَ مِنْ عُنُقِكَ. وَانْتَهَيْتُ إِلَيْهِ وَهُوَ يَقْرَأُ سُورَةَ بَرَاءَةٍ حَتَّى أَتَى عَلَى هَذِهِ الْآيَةِ {اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ} [التوبة: ٣١] قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا لَمْ نَتَّخِذْهُمْ أَرْبَابًا، [ص:٩٧٦] قَالَ: بَلَى، أَلَيْسَ يُحِلُّونَ لَكُمْ مَا حُرِّمَ عَلَيْكُمْ فَتُحِلُّونَهُ، وَيُحَرِّمُونَ عَلَيْكُمْ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ فَتُحَرِّمُونَهُ؟ فَقُلْتُ: بَلَى، قَالَ: تِلْكَ عِبَادَتُهُمْ.
আদী বিন হাতিম রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, গলায় ক্রুশ ঝুলানো অবস্থায় আমি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসলাম। তখন তিনি বললেন, হে হাতিম পুত্র আদী, তোমার গলা থেকে এ মূর্তি ফেলে দাও। আমি তা ফেলে দিলাম এবং তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটবর্তী হলাম। তখন তিনি তিলাওয়াত করছিলেন- اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ [“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার বিরাগীদেরকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে।”] পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা তো তাদেরকে প্রভুরূপে গ্রহণ করিনি! তিনি বললেন, হ্যাঁ করেছো; তোমাদের জন্য যা হারাম করা হয়েছিলো তারা কি তা হালাল করেনি, যদ্দরুন তোমরাও তা হালাল বলে গ্রহণ করেছো? আর তোমাদের জন্য যা হালাল করা হয়েছিলো তারা কি তা হারাম করেনি, যদ্দরুন তোমরাও তা হারাম বলে গ্রহণ করেছো? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, এটাই ছিলো তাদের ইবাদত ও উপাসনা। ২০
এখানে গলায় ক্রুশ ঝুলানো শিরক হওয়া সত্ত্বেও আদী বিন হাতিম রাযি. যেহেতু নওমুসলিম ছিলেন বিধায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে শুধু তা পরিহার করার আদেশ দিয়েই ক্ষান্ত করেন। তাঁকে কাফের বা মুশরিক বলে নতুন করে ঈমান আনতে বলেন নি।
এ দলীলগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, ইসলাম গ্রহণের পর নতুন অবস্থায় কারো থেকে কোনো কুফরী বা শিরকী কাজ প্রকাশ পেলেও এতে সে কাফের বা মুশরিক হয়ে যায় না। হ্যাঁ, নওমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও যদি তার কোনো কাজের ব্যাপারে কুফরী হওয়ার বিষয়টি জানা থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে তা করার দ্বারা সে কাফের হয়ে যাবে।

টিকাঃ
২১. সুনানে তিরমিযী: ৪/৪৫, হা. নং ২১৮০ (দারুল গারবিল ইসলামী, বৈরূত)
২২. সুনানে আবু দাউদ: ১/২৪৪, হা. নং ৯৩০ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরূত)
২০. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী: ২/৯৭৫, হা. নং ১৮৬২ (দারু ইবনুল জাওযী, সৌদিআরব)

📘 তাকফীরের মূলনীতি > 📄 শরীয়তের ইলম পৌঁছেনি এমন দুর্গম অঞ্চলে বসবাস করা

📄 শরীয়তের ইলম পৌঁছেনি এমন দুর্গম অঞ্চলে বসবাস করা


যে ব্যক্তি দুর্গম অঞ্চলে বসবাস করবে; যেমন জনশূন্য উপত্যকা, আফ্রিকার গহীন জঙ্গল অথবা এমন শহর ও এলাকা, যেখানে রাসূলদের সতর্কীকরণ বার্তার বিপরীত অজ্ঞতারই প্রাবল্যতা রয়েছে। ফলে তার কাছে কোনো ইলমই পৌঁছতে পারেনি এবং সেও ইলম পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। যে কারণে সে ব্যক্তি শরীয়তবিরোধী কাজ বা কুফরীতে নিমজ্জিত হয়েছে। তাহলে এ রকম না-জানার কারণে সে যে বিষয়ে শরীয়তের বিরোধিতা করেছিলো সেসব ক্ষেত্রে ততোক্ষণ পর্যন্ত তাকে মাযূর ধরা হবে, যতোক্ষণ না তার বিরুদ্ধে শরয়ী কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠা পায় এবং শরীয়তের ইলম তালাশ করতে সে সক্ষম হয়।
তাকফীরের এ প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে দলীল দু'প্রকার। এক. ইতেবারুয যামান তথা সময় হিসেবে। দুই. ইতেবারুল মাকান তথা স্থান ভেদে।
স্থান ও সময় ভেদে যখন ইলম ও জাহালাতের যেটি প্রাধান্য পাবে, তার আলোকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি শাস্তির উপযুক্ত ও অনুপোযুক্ত বলে বিবেচিত হবে। সুতরাং যদি সে স্থান বা সময়ে ইলমের প্রাধান্য থাকে তবে ব্যক্তি কুফরী বা শরীয়তবিরোধী কাজের জন্য শাস্তির উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে। আর যদি জাহালাতের প্রাধান্য থাকে, তাহলে সে মাযূর ও অপারগ বলে গণ্য হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00