📄 সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শরীয়তের বিধান তার কাছে না পৌঁছা
শরীয়তের বিধিবিধান না পৌঁছার কারণে যে ব্যক্তি কুফরীতে লিপ্ত হয়, তাকে শাস্তির উপযুক্ত বলে গণ্য করা হবে না এবং তাকে তাকফীরও করা হবে না। হ্যাঁ, যদি শরীয়তের হুকুম জানা সত্ত্বেও সে তা অস্বীকার বা নিন্দা ও তিরস্কার করে কিংবা বিষয়টিকে উপেক্ষা করে, তাহলে এমতাবস্থায় তাকে নির্দিষ্টভাবে তাকফীর করা যাবে।
দলীল: আল্লাহ তাআলা বলেন-
رُسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ
“আমি রাসূলগণকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী করে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে মানুষের জন্য আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ না থাকে।"৭
অন্য আয়াতে তিনি বলেন-
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً
“কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।”৮
অন্যত্র তিনি বলেন-
ذَلِكَ أَنْ لَمْ يَكُنْ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا غَافِلُونَ
“এটা এজন্য যে, তোমার রব অন্যায়ভাবে কোনো জনপদকে ধ্বংস করেন না, যখন তার অধিবাসীরা অজ্ঞ থাকে।”৯
আল্লামা শানকীতী রহ. বলেন-
وهذه الآية الكريمة تدلُّ على أن الله لن يعذب قوما لا بهلاك مُسْتَأْصِل في الدنيا، ولا بعذاب في الآخرة، حتى يُنْذِرَهُمْ على ألسنة رسله في دار الدنيا، وَيُكَذِّبُوا.
অর্থাৎ এ আয়াতে কারীমা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে কোনো জাতিকে সমূলে ধ্বংস এবং আখিরাতে আযাব প্রদান করবেন না, যতোক্ষণ না পার্থিব জগতে তাঁর রাসূলের মাধ্যমে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। ১০
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ سَعْدِ بْنِ عُبَيْدَةَ، سَمِعَ ابْنُ عُمَرَ، رَجُلًا يَقُولُ: وَالْكَعْبَةِ فَقَالَ: لَا تَحْلِفُ بِغَيْرِ اللَّهِ، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ وَأَشْرَكَ.
সাদ বিন উবাইদা রহ. থেকে বর্ণিত যে, আব্দুল্লাহ বিন উমার রাযি. এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, 'কাবার শপথ'। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে বলতে শুনেছি, যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করলো, সে কুফর ও শিরকে নিপতিত হলো।১১
এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করা কুফর ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। অথচ লোকটি এমনটা করা সত্ত্বেও আব্দুল্লাহ বিন উমার রাযি. তাকে কাফের বা মুশরিক আখ্যায়িত করেননি। আর এর একমাত্র কারণ ছিলো, তিনি এ মাসআলার ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলেন। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَدْرَكَ عُمَرَ بْنَ الخَطَّابِ، وَهُوَ يَسِيرُ فِي رَكْبٍ، يَحْلِفُ بِأَبِيهِ، فَقَالَ: أَلَا إِنَّ اللَّهَ يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفُ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ.
আব্দুল্লাহ বিন উমার রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার উমার বিন খাত্তাব রাযি.-কে দেখতে পেলেন যে, তিনি একটি দলের সহিত সফররত অবস্থায় স্বীয় পিতার নামে শপথ করছেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নিজ পিতৃপুরুষের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। কেউ শপথ করতে চাইলে সে যেনো আল্লাহর নামেই করে, অন্যথায় সে যেনো চুপ থাকে।”১২
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, কুফরী বাক্য উচ্চারণ করার কারণে সর্বদাই তার উচ্চারণকারীকে কাফের বা মুশরিক সাব্যস্ত করা যায় না। উমার রাযি. যেহেতু আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করার এ নিষেধাজ্ঞাটি পূর্বে শুনেননি তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এ ওযর গ্রহণ করে তাকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাকে কাফের না বলে বরং মাসআলাটি জানিয়ে ভবিষ্যতে এ থেকে নিবৃত্ত থাকার আদেশ করাই যথেষ্ট মনে করলেন।
মুসনাদে আহমাদে এমন আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে- عَنْ حَفْصٍ، عَنْ عَمِّهِ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ ..... فَقَالَ لَهُ أَصْحَابُهُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ، هَذِهِ بَهِيمَةً لَا تَعْقِلُ تَسْجُدُ لَكَ وَنَحْنُ نَعْقِلُ، فَنَحْنُ أَحَقُّ أَنْ نَسْجُدَ لَكَ، فَقَالَ: لَا يَصْلُحُ لِبَشَرٍ أَنْ يَسْجُدَ لِبَشَرٍ، وَلَوْ صَلَحَ لِبَشَرٍ أَنْ يَسْجُدَ لِبَشَرٍ، لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا، مِنْ عِظَمِ حَقَّهِ عَلَيْهَا،
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন...... অতঃপর তাঁর সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর নবী, এটা একটি অবুঝ পশু হয়েও আপনাকে সিজদা করছে! আর আমরা তো বুঝমান, তাই আমরাই আপনাকে সিজদা করার অধিক হকদার। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কোনো মানুষের জন্য অন্য মানুষকে সিজদা করা শোভা পায় না। যদি কোনো মানুষ সিজদা পাওয়ার উপযুক্ত হতো, তাহলে অবশ্যই আমি স্বামীর হকের সম্মানার্থে স্ত্রীকে তার স্বামীর সিজদা করতে আদেশ করতাম। ১৩
শিরকী কাজের ইচ্ছা করাটা শিরক হলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সিজদা করতে ইচ্ছা পোষণকারী সাহাবাকে মুশরিক সাব্যস্ত করেননি; শুধু মাসআলা শিক্ষা দেয়াই যথেষ্ট মনে করলেন।
এর বিপরীত কারো নিকট শরীয়তের বিধান পৌঁছার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে শরীয়তবিরোধী কাজ করলে তার ব্যাপারে কোনো ওযর গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশেষ করে, যখন সে বিরোধিতা কুফরের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। যেমন সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَصَابَ غَنِيمَةً أَمَرَ بِلَالًا فَنَادَى فِي النَّاسِ فَيَجِيئُونَ بِغَنَائِمِهِمْ فَيَخْمُسُهُ وَيُقَسِّمُهُ، فَجَاءَ رَجُلٌ بَعْدَ ذَلِكَ بِزِمَامٍ مِنْ شَعَرٍ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ هَذَا فِيمَا كُنَّا أَصَبْنَاهُ مِنَ الغَنِيمَةِ. فَقَالَ: أَسَمِعْتَ بِلَالًا يُنَادِي ثَلَاثًا؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: فَمَا مَنَعَكَ أَنْ تَجِيءَ بِهِ؟ فَاعْتَذَرَ إِلَيْهِ، فَقَالَ: كُنْ أَنْتَ تَجِيءُ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَلَنْ أَقْبَلَهُ عَنْكَ.
আব্দুল্লাহ বিন উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিয়ম ছিলো, যখন গনীমত আসতো, তখন মানুষদেরকে আহ্বান করার জন্য বিলাল রাযি.- কে আদেশ দিতেন। তারা গনীমতের মাল নিয়ে এলে গনীমতকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করে মানুষের মাঝে তা বণ্টন করা হতো। একবার একলোক গনীমত বণ্টনের পরে চুলের তৈরি একটি নাকলাগাম নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি এটি গনীমত হিসেবে পেয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তিনবার বিলালের ডাক শুনতে পাওনি? লোকটি বললো, জি, শুনতে পেয়েছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে তুমি এটি নিয়ে আসলে না কেনো? সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে ক্ষমা চাইলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এটি কিয়ামতের দিন সাথে নিয়ে উঠবে। তোমার নিকট থেকে এটি কখনো গ্রহণ করা হবে না। ১৪
ভেবে দেখুন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত সাহাবীর এ ওযর গ্রহণ করেননি। কেননা, শরীয়তের আহ্বান তার নিকট পৌঁছা সত্ত্বেও সে অমান্য করেছে। অথচ তার এ অমান্য করাটা কুফরের পর্যায়ে ছিলো না। তাহলে ঐ ব্যক্তির হুকুম কী হবে, যার কর্ম কুফরের পর্যায়ে উপনীত হয়? নিঃসন্দেহে তার ক্ষেত্রে আরো নিশ্চিতভাবে কোনো ওযর ধর্তব্য হবে না।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيُّ، وَلَا نَصْرَانِيُّ، ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ঐ সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! এ উম্মতের কোনো ইয়াহুদী-নাসারা আমার সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তার প্রতি ঈমান না এনেই মৃত্যুবরণ করে, তবে সে জাহান্নামের অধিবাসী।১৫
এ হাদীসে আযাব এবং জাহান্নামে প্রবেশকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর দাওয়াত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও ঈমান না আনার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, অজানা অবস্থায় কোনো কুফর বা শিরক প্রকাশ পেলে তা ক্ষমাযোগ্য হবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু জ্ঞাতসারে কোনো ওযর শোনা হবে না।
টিকাঃ
৭. সূরা নিসা: ১৬৫
৮. সূরা বনী ইসরাঈল: ১৫
৯. সূরা আনআম: ১৩১
১০. আল আযবুন নামীর: ২/২৮০ (দারু আলামিল ফাওয়ায়েদ, মক্কা)
১১. মুসনাদে আহমাদ: ১০/২৪৯, হা. নং ৬০৭২ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
১২. সহীহ বুখারী: ৮/১৩২, হা. নং ৬৬৪৭ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
১৩. মুসনাদে আহমাদ: ২০/৬৪-৬৫, হা. নং ১২৬১৪ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
১৪. সুনানে আবু দাউদ: ৩/৬৮, হা. নং ২৭১২ (আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
১৫. সহীহ মুসলিম: ১/১৩৪, হা. নং ১৫৩ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
📄 শরীয়তের কোনো নসের ভুল ব্যাখ্যা বা ভুল অনুধাবন
যদি কেউ শরীয়তের কোনো নসের উদ্দেশ্য বুঝতে গিয়ে ভুল ব্যাখ্যা বা ভুল অনুধাবনের শিকার হয়ে শরীয়ত বিরোধিতা বা কুফরে নিপতিত হয় আর আভিধানিকভাবে উক্ত নসটি এ ব্যাখ্যা বা অনুধাবনের সম্ভাবনাও রাখে, তাহলে তাকে তাকফীর করা হবে না।
দলীল:
কুদামা বিন মাযঊন রাযি. এবং তাঁর কিছু সাথীর ঘটনা। তারা একটি আয়াতের ভুল অনুধাবনের কবলে পড়ে মদকে হালাল সাব্যস্ত করেন। তাদের পক্ষ থেকে পেশকৃত আয়াতের ব্যাখ্যা এ রকম হওয়ার ক্ষেত্রে সংশয় জাগে। তাই তাদেরকে নির্দিষ্ট করে ব্যক্তি পর্যায়ে কাফের সাব্যস্ত করা হয়নি। তারা যে আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন তা হলো-
لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا إِذَا مَا اتَّقَوْا وَآمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ
“যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তারা পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে, সেজন্য তাদের কোনো গুনাহ নেই; যখন তারা সংযত হয়েছে, বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে।”১৬
এ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে তারা মদপান করেন। তারা ভেবেছিলেন, ঈমান আনার পর সৎকর্ম ও তাকওয়া অবলম্বন করলে মদপান বৈধ হয়ে যায়। অথচ এ আয়াতে শুধু পূর্ববর্তীদের অজ্ঞাত অবস্থায় মদপান করার দ্বারা কোনো গুনাহ হয়নি- সে কথা বোঝানো হয়েছে।
আয়াতটির শানে নুযূল:
উহুদ যুদ্ধের পর মদ হারাম করা হয়। তখন কিছু সাহাবী বলে উঠলেন, তাহলে আমাদের যে সকল সাথী মদপান করা অবস্থায় মারা গেছে তাদের কী হবে? এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করে স্পষ্ট করে দিলেন যে, কোনো বস্তুকে হারাম করার আগে যদি কেউ সে বস্তু থেকে ভক্ষণ করে, তাহলে সে তাকওয়া অবলম্বন ও সৎকর্ম করে থাকলে তার কোনো গুনাহ নেই। কিন্তু কুদামা রাযি. এবং তাঁর কতিপয় সাথী এ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা বুঝে নিজেদের জন্যও তা সাব্যস্ত করেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এ আয়াতটি তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে তারা নিজেদের জন্য মদকে হালাল করে ফেলেন।
ঘটনাটি শারহু মাআনিল আসারে এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَلِيَّ قَالَ: شَرِبَ نَفَرٌ مِنْ أَهْلِ الشَّامِ الْخَمْرَ وَعَلَيْهِمْ يَوْمَئِذٍ يَزِيدُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ وَقَالُوا هِيَ حَلَالُ وَتَأَوَّلُوا لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا} [المائدة: ٩٣] الْآيَةَ. فَكَتَبَ فِيهِمْ إِلَى عُمَرَ، فَكَتَبَ عُمَرُ أَنِ ابْعَثْ بِهِمْ إِلَيَّ قَبْلَ أَنْ يُفْسِدُوا مَنْ قِبَلَكَ. فَلَمَّا قَدِمُوا عَلَى عُمَرَ اسْتَشَارَ فِيهِمِ النَّاسَ فَقَالُوا: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ نَرَى أَنَّهُمْ قَدْ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ وَشَرَعُوا فِي دِينِهِمْ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ فَاضْرِبْ أَعْنَاقَهُمْ وَعَلِيُّ سَاكِتُ. فَقَالَ مَا تَقُولُ يَا أَبَا الْحَسَنِ؟ قَالَ أَرَى أَنْ تَسْتَتِيبَهُمْ، فَإِنْ تَابُوا ضَرَبْتُهُمْ ثَمَانِينَ ثَمَانِينَ لِشُرْبِهِمِ الْخَمْرَ، وَإِنْ لَمْ يَتُوبُوا ضَرَبْتُ أَعْنَاقَهُمْ فَإِنَّهُمْ قَدْ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ، وَشَرَعُوا فِي دِينِهِمْ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ فَاسْتَتَابَهُمْ فَتَابُوا, فَضَرَبَهُمْ ثَمَانِينَ ثَمَانِينَ.
অর্থাৎ আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সিরিয়ার কতিপয় লোক মদপান করেছিলো। তখন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন ইয়াযীদ বিন আবু সুফইয়ান রহ.। তারা দাবি করলো, এটা হালাল এবং দলীলস্বরূপ এ আয়াত বললো, “যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তারা পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে, সেজন্য তাদের কোনো গুনাহ নেই।” [সূরা মায়েদা: ৯৩] ইয়াযীদ রহ. তাদের ব্যাপারে ফয়সালার জন্য উমার রাযি.-এর নিকট পত্র লিখলেন।
উত্তরে উমার রাযি. লিখলেন, তোমার ওখানে ফাসাদ সৃষ্টি করার পূর্বেই তাদেরকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। তারা যখন উমার রাযি.-এর নিকট আসলো, তখন তিনি তাদের ব্যাপারে সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন। তাঁরা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা দেখছি যে, তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে এবং আল্লাহ অনুমতি দেননি এমন জিনিসকে তারা বৈধ করেছে। অতএব আপনি তাদেরকে হত্যা করুন। আলী রাযি. তখন চুপ করে ছিলেন। উমার রাযি. তাঁকে বললেন, হে আবুল হাসান, তাদের ব্যাপারে আপনার মত কী? জবাবে আলী রাযি. বলেন, আমার মতে আপনি তাদেরকে তাওবা করতে বলুন। যদি তারা তাওবা করে, তাহলে আপনি তাদেরকে মদপান করার শাস্তি হিসেবে আশিটি বেত্রাঘাত করবেন। আর যদি তারা তাওবা না করে, তাহলে আপনি তাদেরকে হত্যা করে ফেলুন। কারণ, তারা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করেছে এবং দীনের মধ্যে এমন কিছু বৈধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। এরপর উমার রাযি. তাদেরকে তাওবা করতে বললে তাঁরা তাওবা করলেন। অতঃপর তাদের প্রত্যেককে আশিটি করে বেত্রাঘাত করা হলো। ১৭
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন- حتى أجمع رأي عمر وأهل الشورى أن يستتاب هو أصحابه فإن أقروا بالتحريم جلدوا وإن لم يقروا به كفروا. অর্থাৎ একপর্যায়ে উমার রাযি. ও শূরা সদস্য সবাই একমত হলেন যে, কুদামা বিন মাযউন রাযি. এবং তাঁর সাথীদেরকে তাওবা করতে বলা হবে। অতঃপর যদি তারা হারাম হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নেয়, তাহলে (মদপানের শাস্তিস্বরূপ) বেত্রাঘাত করা হবে। আর যদি তা স্বীকার না করে, তাহলে তাদেরকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা হবে। ১৮
ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় আল আদাবুল মুফরাদে বর্ণনা করেন- عَنْ طَلْقِ بْنِ حَبِيبٍ قَالَ: كُنْتُ أَشَدَّ النَّاسِ تَكْذِيبًا بِالشَّفَاعَةِ فَسَأَلْتُ جَابِرًا فَقَالَ: يَا طُلَيْقُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: (يَخْرُجُونَ مِنَ النَّارِ بعد دخول) ونحن نقرأ الذي تقرأ.
তাল্ক বিন হুবাইব রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শাফাআত অস্বীকার করার ক্ষেত্রে সবচে বেশি কঠোর ছিলাম। তারপর এ ব্যাপারে জাবির রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, হে তুলাইক, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “জাহান্নামে প্রবেশের পর কিছু মানুষকে বের করে আনা হবে। তুমি যে কিতাব পড়ো, আমরাও একই কিতাব পড়ি।”১৯
মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ طَلْقِ بْنِ حَبِيبٍ، قَالَ: كُنْتُ مِنْ أَشَدَّ النَّاسِ تَكْذِيبًا بِالشَّفَاعَةِ، حَتَّى لَقِيتُ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ، فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ كُلَّ آيَةٍ ذَكَرَهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِيهَا خُلُودُ أَهْلِ النَّارِ، فَقَالَ: يَا طَلْقُ، أَتْرَاكَ أَقْرَأَ لِكِتَابِ اللَّهِ مِنِّي، وَأَعْلَمَ بِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَاتُضِعْتُ لَهُ، فَقُلْتُ: لَا وَاللَّهِ، بَلْ أَنْتَ أَقْرَأُ لِكِتَابِ اللَّهِ مِنِّي، وَأَعْلَمُ بِسُنَّتِهِ مِنِّي، قَالَ: فَإِنَّ الَّذِي قَرَأْتَ أَهْلُهَا هُمُ الْمُشْرِكُونَ، وَلَكِنْ قَوْمُ أَصَابُوا ذُنُوبًا، فَعُذِّبُوا بِهَا، ثُمَّ أُخْرِجُوا، صُمَّتَا - وَأَهْوَى بِيَدَيْهِ إِلَى أُذُنَيْهِ - إِنْ لَمْ أَكُنْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يَخْرُجُونَ مِنَ النَّارِ»، وَنَحْنُ نَقْرَأُ مَا تَقْرَأُ
তাল্ল্ক বিন হুবাইব রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শাফাআত অস্বীকার করার ক্ষেত্রে সবচে বেশি কঠোর ছিলাম। এরপর একবার জাবির রাযি.-এর সাথে আমার সাক্ষাত হলে আমি তার নিকট ঐসব আয়াত পড়ে শোনালাম, যেথায় আল্লাহ তাআলা জাহান্নামীদের চিরস্থায়ী হওয়ার কথা বলেছেন। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে তাল্ল্ক, তুমি কি নিজেকে আমার চেয়ে কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ভাবো? আমি নত হয়ে বললাম, না, আল্লাহর শপথ; বরং আপনিই আমার চেয়ে কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক অবগত। তিনি বললেন, তুমি যাদের ব্যাপারে কিতাবুল্লাহতে পড়েছো যে, তারা জাহান্নাম থেকে বের হবে না, তারা হলো মুশরিক। কিন্তু কিছু গুনাহগার লোক থাকবে, যাদেরকে শাস্তি দেয়ার পর জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে। তিনি স্বীয় দু'কানের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এ কানদ্বয় বধির হয়ে যাক, যদি না আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, “তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে। তুমি যে কিতাব পড়ো, আমরাও একই কিতাব পড়ি।”২০
তাল্ক রহ. ছিলেন তাবেয়ীদের মধ্যে অগ্রবর্তী একজন তাবেয়ী। কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহ দ্বারা শাফাআত সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি কিতাবুল্লাহর কিছু আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা বুঝে শাফাআতকে অস্বীকার করতেন। মুশরিকদের ক্ষেত্রে নাযিলকৃত সে সকল আয়াতকে তিনি গুনাহগার মুসলমানদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন। অবশেষে জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাযি. তাঁর এ ভুল অনুধাবন দূর করে দেন।
সতর্কতা:
সব ধরনের ভুল ব্যাখ্যাকারীই মাযূর বলে গণ্য হয় না এবং যে কোনো ধরনের ভুল ব্যাখ্যাই ভুল ব্যাখ্যাকারীর তাকফীরের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয় না। যদি কোনো ব্যক্তি এমন ভুল ব্যাখ্যা করে যে, নসের আভিধানিক অর্থ, নসের কোনো ইঙ্গিত বা লক্ষণ এমন ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না; যেমন দীনের নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘনকারী বাতেনী এবং অন্যান্য বাতিলপন্থীদের ব্যাখ্যা। এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যা মূলত দীনের বিকৃ তি, দীনের উপর মিথ্যারোপ এবং দীনকে অস্বীকৃতির নামান্তর। এরকম ভুল ব্যাখ্যাকারীর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ওযর গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ভুল ব্যাখ্যা তাদেরকে নাস্তিকতা এবং সুস্পষ্ট কুফরীতে নিমজ্জিত করে। তাই দীনের এ বিকৃতিসাধনকে যতোই ভুল ব্যাখ্যা নাম দেয়া হোক, তা তাদের কোনো উপকারে আসবে না। এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যাকারীকে উলামায়ে কেরাম কাফের বলেই আখ্যায়িত করেছেন।
যে সকল ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যা ওযর হিসেবে গ্রহণযোগ্য: নসের মধ্যে কোনো ইঙ্গিত বা নিদর্শন থাকা, যদ্দরুন এমন ভুল ব্যাখ্যা বোঝার সম্ভাবনা থাকে। চাই তা আভিধানিক অর্থের কারণে হোক বা শরীয়তের কোনো মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যতা থাকার কারণে হোক। কিংবা প্রাধান্যপ্রাপ্ত ও রহিতকারী নস সম্পর্কে না জানা থাকায় কোনো অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত বা রহিত দলীলের উপর নির্ভর করার কারণে হোক। অথবা কোনো ব্যাপক দলীলের বিপরীত নির্দিষ্টকারী দলীল না জানা থাকায় কিংবা কোনো নিঃশর্ত দলীলের বিপরীত শর্তযুক্ত দলীল না জানা থাকার কারণে হোক। এ ধরনের কোনো কারণে যদি সে কুফরী কথা বা ব্যাখ্যা বলে থাকে, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার এ ভুল ব্যাখ্যাটি ওযর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে এবং তা তার কাফের হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হবে।
এক্ষেত্রে তাকফীরের প্রতিবন্ধকটিকে শক্তিশালী ও দুর্বল করবে ভুল ব্যাখ্যাকারী ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক লক্ষণগুলো। দেখতে হবে- সে কী মুতাশাবিহাত তথা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য আয়াতের অনুকরণ করে মুহকামাত তথা স্পষ্ট ও অকাট্য আয়াতের উপর তাকে প্রাধান্য দিয়েছে? তার সম্পর্কে কি এটা জানা গেছে যে, সে সীমালঙ্ঘন করে নাস্তিকতাপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়? কিংবা সে কি শরীয়তের দলীলগুলোর আলোকে ফয়সালা না করে নিজ জ্ঞানবুদ্ধির আলোকে বিচার করে? সে বিদআতী এবং প্রবৃত্তির পূজারি হিসেবে কুখ্যাত নাকি আহুলুস সুন্নাহর মতাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত? তারপর দেখতে হবে, কতোগুলো মাসআলার ক্ষেত্রে তার পদস্খলন ঘটেছে? কোনগুলো বেশি হয়েছে? সঠিক মাসআলা না ভুল মাসআলা? সে ভুলগুলো ইচ্ছে করে করেছে নাকি ভুল ইজতিহাদের কারণে হয়ে গেছে? এ সকল বিষয়াদির আলোকে বিবেচনা করতে হবে ভুল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাকে মাযূর ধরা হবে নাকি ধরা হবে না। আল্লাহ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।
টিকাঃ
১৬. সূরা মায়িদা: ৯০
১৭. শারহু মাআনিল আসার: ৩/১৫৪, হা. নং ৪৮৯৯ (আলামুল কুতুব, বৈরূত)
১৮. আস সারিমুল মাসলূল: পৃ. ৫৩০ (আল হারাসুল ওয়াতনী, সৌদিআরব)
১৯. আল আদাবুল মুফরাদ: পৃ. ৪০৯-৪৪০, হা. নং ৮১৮ (মাকতাবাতুল মাআরিফ, রিয়াদ)
২০. মুসনাদে আহমাদ: ২২/৪০৪-৪০৫, হা. নং ১৪৫৩৪ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)