📄 তাকফীরের প্রতিবন্ধকতাসমূহ
যে সকল অক্ষমতা চেষ্টা-সাধনা করা সত্ত্বেও দূরা করা সম্ভব হয়নি, সে সকল অক্ষমতার কারণে ব্যক্তির উপর সংশ্লিষ্ট হুকুম আরোপিত করা যায় না। সেটা যে ধরনের হুকুমই হোক না কেনো। তার অক্ষমতা ততোক্ষণ পর্যন্ত ধর্তব্য হবে, যতোক্ষণ না সে উক্ত অক্ষমতাকে দূর করতে সক্ষম হবে।
যে কারণে তার এ অক্ষমতা হয়ে থাকে, শরীয়তে সেসব কারণে নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর শাস্তি আরোপ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়। এ প্রতিবন্ধকতা শরীয়তের কোনো প্রমাণের ভিত্তিতে অগ্রাহ্য হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। এ কারণটা ব্যক্তির সত্তাগত হতে পারে। যেমন, সে বধির (যে কারণে সে শুনতে সক্ষম নয়) বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শরীয়তের হুকুম বুঝতে সে অক্ষম হয়। অথবা সে কারণটা ব্যক্তির সত্তাগত না হয়ে সে যে পরিবেশে বসবাস করে অথবা যে সময়ে জীবনযাপন করছে তার সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। শরীয়তের বিপরীত কাজকারী যে কারণে শরীয়তবিরোধী কাজ করেছিলো অথবা যে কারণে কোনো নিষিদ্ধ বিষয়ে পতিত হয়েছিলো, সে কারণটি বা অক্ষমতাটি দূর করার শক্তি অর্জিত হয়ে যাওয়ার পরও যদি দুনিয়া, দুনিয়াবী ব্যস্ততা ও দুনিয়ার আকর্ষণের প্রতি ঝুঁকে থাকে এবং তার অক্ষমতা কাটিয়ে উঠার কোনো রকম চেষ্টাই না করে, অক্ষমতা থেকে মুক্তির জন্য সাধ্যমতো পরিশ্রম না করে, তাহলে এমতাবস্থায় শাস্তি আরোপের প্রতিবন্ধকতাসমূহ তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তেমনিভাবে যদি কেউ শরীয়তবিরোধী কাজ বা শরীয়ত নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে কুফরে আকবারে পতিত হয়, তার ক্ষেত্রেও কোনো রকম ওযর-আপত্তি গ্রহণ করা হবে না। তখন তাকে নির্দিষ্ট করে তাকফীর করতে হবে।
পবিত্র কালামুল্লাহতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন- ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ مَا ٱسْتَطَعْتُمْ. “অতএব তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য পরিমাণে ভয় করো।”
আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন- لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا. “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার চাপিয়ে দেন না।”২
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. এ আয়াতের তাফসীরে বলেন- وَقَوْلُهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا أَيْ لَا يُكَلِّفُ أَحَدًا فَوْقَ طَاقَتِهِ، وَهَذَا مِنْ لُطْفِهِ تَعَالَى بِخَلْقِهِ وَرَأْفَتِهِ بِهِمْ وَإِحْسَانِهِ إِلَيْهِمْ. অর্থাৎ আল্লাহর বাণী “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার চাপিয়ে দেন না”- এর অর্থ হলো, তিনি কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেননি। এটি সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর অসীম দয়া, অনুগ্রহ ও অনুকম্পার বহিঃপ্রকাশ।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- انَ أَبُو هُرَيْرَةَ يُحَدِّثُ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ، فَاجْتَنِبُوهُ وَمَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَافْعَلُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ،
আবু হুরাইরা রাযি. বর্ণনা করেন, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, “আমি তোমাদের যা করতে নিষেধ করি, তা থেকে বিরত থাকো আর যা করতে আদেশ করি, তা সাধ্য অনুযায়ী পালন করো।”৪
ইমাম ইযযুদ্দীন আব্দুল আযীয বিন আব্দুস সালাম রহ. বলেন-
(قَاعِدَةٌ) وَهِيَ أَنَّ مَنْ كُلِّفَ بِشَيْءٍ مِنْ الطَّاعَاتِ فَقَدَرَ عَلَى بَعْضِهِ وَعَجَزَ عَنْ بَعْضِهِ فَإِنَّهُ يَأْتِي بِمَا قَدَرَ عَلَيْهِ وَيَسْقُطُ عَنْهُ مَا عَجَزَ عَنْهُ.
অর্থাৎ মূলনীতি হলো- যার উপর কোনো ইবাদত বাধ্য করা হয়েছে, অথচ সে তার কিছু করতে সক্ষম আর কিছু করতে অক্ষম, তাহলে সে যতোটুকু করতে সক্ষম ততোটুকুই আদায় করবে এবং অক্ষম হওয়া অংশটুকু তার দায়িত্ব থেকে বাদ পড়ে যাবে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
أَنَّ هَذَا الْعُذْرَ لَا يَكُونُ عُذْرًا إِلَّا مَعَ الْعَجْزِ عَنْ إِزَالَتِهِ, وَإِلَّا فَمَتَى أَمْكَنَ الْإِنْسَانُ مَعْرِفَةَ الْحَقِّ, فَقَصَّرَ فِيهَا لَمْ يَكُنْ مَعْذُورًا.
অর্থাৎ ওযর তখনই শরীয়তে গ্রহণযোগ্য হবে, যখন কোনো ব্যক্তি তার অক্ষমতাকে দূর করতে সমর্থ হবে না। কিন্তু কেউ যদি সত্যটা জানতে সক্ষম হয়েও চেষ্টায় ত্রুটি করে, তাহলে সে আর মাযূর (অপারগ) বলে গণ্য হবে না।
টিকাঃ
১. সূরা তাগাবুন: ১৬
২. সূরা বাকারা: ২৮৬
৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৫৭২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
৪. সহীহ মুসলিম: ৪/১৮৩০, হা. নং ১৩৩৭ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
৫. কাওয়ায়িদুল আহকাম: ২/৭ (মাকতাবাতুল কুল্লিয়্যাতিল আযহারিয়্যা, কায়রো)
৬. রফউল মালাম: পৃ. ৭৫ (আর রিয়াসাতুল আম্মাহ, রিয়াদ)