📄 তাওহীদবাদী মুমিন হন আত্মনিয়ন্ত্রিত ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী, আর দুর্বলবিশ্বাসী হয়ে থাকে পেরেশান ও বিক্ষিপ্ত চিন্তার অধিকারী
সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত আছে, عَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مِنْ قَلْبِ ابْنِ آدَمَ بِكُلِّ وَادٍ শুْعْبَةً، فَمَنْ أَتْبَعَ قَلْبَهُ الشُّعَبَ كُلَّهَا ، لَمْ يُبَالِ اللَّهُ بِأَيِّ وَادٍ أَهْلَكَهُ ، وَمَنْ تَوَكَّلَ عَلَى اللَّهِ ، كَفَاهُ الشُّعَبَ.
হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- (প্রবৃত্তির) প্রত্যেকটি উপত্যকায় আদম সন্তানের অন্তরের একটি পথ আছে। যে তার অন্তরকে এই সকল পথের অনুগামী করে, আল্লাহ তাআলা তাকে যে কোনও উপত্যকায় ধ্বংস করতে কোনও পরোয়া করবেন না। আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করবে, আল্লাহ তার জন্য ওই সকল পথ থেকে যথেষ্ট হয়ে যাবেন'।
অর্থাৎ যখন মানুষের কোনওকিছুর প্রয়োজন হয় কিংবা কোন বিপদ সামনে আসে, তখন তার মন বিভিন্ন দিকে ছুটতে থাকে- অমুক নবীকে ডাকি, অমুক ইমামের কাছে সাহায্য চাই, অমুক পীর বা শহীদের নামে মানত করি, অমুক পরী বা জ্যোতিষীর দ্বারস্থ হই, কিংবা অমুক মৌলভীর মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করি ইত্যাদি।
তো যে ব্যক্তি এই সকল চিন্তা-কল্পনার পিছনে পড়ে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে কবুলিয়াতের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন এবং তাকে খাঁটি বান্দাদের দল থেকে বের করে দেন। ফলে সে খোদায়ী হেদায়াত ও তরবিয়তের পথ থেকে ছিটকে পড়ে এবং ওই সকল কল্পনার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ধ্বংস হয়ে যায়। কেউ বেদ্বীন-নাস্তিক হয়ে যায়, কেউ মুশরিক হয়ে যায়।
আর যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং অন্য কোনও কল্পনার পিছনে না পড়ে তাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর মাকবুল বান্দাদের মধ্যে গণ্য করেন এবং তার জন্য হেদায়েতের রাস্তা খুলে দেন। তার অন্তরে আল্লাহ তাআলা এমন প্রশান্তি দান করেন, যা কল্পনার পিছনে পড়া ব্যক্তিদের কখনো অর্জন হয় না।
তাছাড়া যার তাকদীরে যতটুকু লিখা আছে, ততটুকু লাভ হবেই। কিন্তু যারা কল্পনার পিছনে ছোটে তারা মাঝখানে শুধু শুধু কষ্ট পায়, আর তাওয়াক্কুলকারীরা নিশ্চিন্তে পেয়ে যায়।
টিকাঃ
৬৪. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪১৬৬। আল্লামা বুসীরী বলেন- হাদীসটির সনদ যঈফ। -মিসবাহুয যুজাজাহ, ৪/২২৭। তবে হযরত ইবনে উমর রাযি.-এর বর্ণনায় সহীহ সূত্রে এর কাছাকাছি মর্মের একটি হাদীস রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- 'যে তার সকল চিন্তাকে এক চিন্তায় পরিণত করে নেয় অর্থাৎ পরকালের চিন্তা, আল্লাহ তাআলা তার দুনিয়া-আখেরাতের সকল চিন্তা-পেরেশানীর জন্য যথেষ্ট হয়ে যান এবং তার অন্তরে অনপেক্ষতা ঢেলে দেন। আর যার চিন্তাসমূহ বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে যায়, সে দুনিয়ার যে উপত্যকায় ধ্বংস হোক তাতে আল্লাহর কোনও পরোয়া নেই'। -আয-যুহদ, ইবনে আবী আসেম, হাদীস ১৬৬; শাইখ শুআইব আলআরনাউত কৃত সুনানে ইবনে মাজাহর তাখরীজ, ২৫৭ নং হাদীস। -অনুবাদক
📄 ছোট-বড় সকল বিষয়ে আল্লাহর দ্বারস্থ হওয়া যায়; দুনিয়ার রাজা-বাদশারা যেভাবে দেশ পরিচালনা করে তিনি সেভাবে করেন না
জামে তিরমিযীতে বর্ণিত আছে, عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لِيَسْأَلْ أَحَدُكُمْ رَبَّهُ حَاجَتَهُ كُلَّهَا ، حَتَّى يَسْأَلَ শِسْعَ نَعْلِهِ إِذَا انْقَطَعَ .
হযরত আনাস রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- 'তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজের সকল প্রয়োজন তার রবের নিকট চায়। এমনটি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলে সেটাও চাবে'।
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাকে দুনিয়ার বাদশাদের মত মনে করো না, যারা বড় বড় কাজ নিজেরা করে আর ছোট ছোট কাজ চাকর-নোকরদের উপর ন্যস্ত করে। আর তাই ছোট কাজে লোকদেরকে তাদের দ্বারস্থ হতে হয়!
কিন্তু আল্লাহর দরবার এমন নয়। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, এক মুহূর্তে ছোট-বড় কোটি কাজ সম্পন্ন করতে পারেন এবং তাঁর রাজত্বে কারও কোনও ক্ষমতা চলে না। সুতরাং ছোট বস্তুও তাঁর নিকটই চাওয়া উচিত। অন্য কেউ ছোট-বড় কোনও বস্তুই দিতে সক্ষম নয়।
টিকাঃ
৬৫. জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৬০৪/৮; সহীহ ইবনে হিব্বান (শাইখ শুআইব-এর তাহকীককৃত), হাদীস ৮৬৬। -অনুবাদক
📄 বংশ ও আত্মীয়তার উপর নির্ভর করে আমলবিমুখ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁর আত্মীয়দের সতর্কীকরণ
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: لَمَّا أُنْزِلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ ﴿وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴾ [الشعراء: ২১৪] ، دَعَا رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُرَيْشًا، فَاجْتَمَعُوْا، فَعَمَّ وَখَصَّ ، فَقَالَ : يَا بَنِي كَعْبِ بْنِ لُؤَيِّ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ ، يَا بَنِي مُرَّةَ بنِ كَعْبٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ شَمْسٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ أَنْقِذُوا أَنْفُসَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي هَاشِمٍ ! أَنْقِذُوا أَنْفُসَكُمْ مِنَ النَّارِ ، يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ! أَنْقِذُوا أَنْفُসَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا فَاطِمَةُ، أَنْقِذِي نَفْسَكِ مِنَ النَّارِ، فَإِيِّ لَا أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِمًا سَأَبَلُهَا بِبَلَالِهَا.
হযরত আবূ হুরাইরা রাযি. বলেন- যখন সূরা শুআরার এই আয়াত নাযিল হলো যে, 'আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে ভীতি প্রদর্শন করুন', তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশকে ডাকলেন। তারা একত্রিত হলো। তখন তিনি তাদেরকে আম ও খাস-দুইভাবেই সম্বোধন করলেন। বললেন-
'হে কা'ব বিন লুআইয়্যের বংশধর! তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা কর। হে মুররা বিন কা'বের বংশধর! তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা কর। হে আবদে শামসের বংশধর! তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা কর। হে আবদে মানাফের বংশধর! তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা কর। হে হাশেমের বংশধর! তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা কর। হে ফাতেমা! তুমি জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা কর। কারণ আল্লাহর বিপরীতে আমি তোমাদের কোনও উপকার করার সামর্থ্য রাখি না। তবে আমার সাথে তোমাদের যে রক্তের সম্পর্ক রয়েছে, (দুনিয়াতে) তা আমি অটুট রাখব'।
অর্থাৎ যেসব লোক কোনও বুযুর্গের আত্মীয় হয়, তারা ওই বুযুর্গের সাহায্যের উপর ভরসা করে থাকে এবং এই আত্মীয়তার অহংকার আল্লাহর ভয় কমিয়ে দেয়। এই জন্য আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নির্দেশ দিয়েছেন- নিজের আত্মীয়দেরকে সতর্ক কর।
সুতরাং তিনি নিজের কন্যা ফাতেমা পর্যন্ত সকলকে শুনিয়ে দিয়েছেন যে, আত্মীয়তার হক আদায় করা এমন জিনিসের ক্ষেত্রেই কেবল হতে পারে, যা নিজের এখতিয়ারে আছে। অতএব এই যে আমার সম্পদ আছে, তাতে আমার কোনও কার্পণ্য নেই। কিন্তু আল্লাহর বিষয় আমার এখতিয়ারে নেই। সেখানে আমি কারও সাহায্য করতে পারব না, কারও উকিল হতে পারব না। সেখানকার লেনদেন প্রত্যেকেই নিজেরটা নিজে ঠিক করতে হবে এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য সকল উপায় গ্রহণ করতে হবে।
এই হাদীস থেকে বোঝা গেল, কোনও বুযুর্গের সাথে শুধু আত্মীয়তা আল্লাহর নিকট কোনও কাজে আসবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত কিছু বিষয় আল্লাহর কাছ থেকে সাফ না করে নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনও কাজ হবে না।
টিকাঃ
৬৬. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২০৪; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৪৮। -অনুবাদক