📄 সুপারিশ গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজা-বাদশাদের রীতিনীতি ও সুপারিশকারীদের শ্রেণিবিভাগ
আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِّنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَواتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَ مَا لَهُمْ فِيهِمَا مِنْ শِرْكٍ وَ مَا لَهُ مِنْهُمْ مِّنْ ظَهِيْرٍ وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَةً إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ حَتَّى إِذَا فُزِعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَا ذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
'(হে রাসূল! ওই কাফেরদেরকে) বলে দাও, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে উপাস্য মনে করতে, তাদেরকে ডাক। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে তারা অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয় এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে (কোনও বিষয়ে আল্লাহর সাথে) তাদের কোনও অংশীদারিত্ব নেই এবং তাদের মধ্যে কেউ তাঁর সাহায্যকারীও নয়। যার জন্য তিনি (সুপারিশের) অনুমতি দেন, তার ছাড়া (অন্য কারও) কোনও সুপারিশ আল্লাহর সামনে কাজে আসবে না। পরিশেষে যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় দূর করে দেওয়া হয়, তখন তারা বলে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা উত্তর দেয়, সত্য (কথা বলেছেন) এবং তিনিই সমুচ্চ, মহান'।
অর্থাৎ কেউ যদি কারও কাছে সাহায্য চায়, বিপদের সময় ডাকে, আর সে তার প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয় তাহলে এর কয়েকটি সুরত হতে পারে। হয়ত সে নিজেই মালিক, কিংবা মালিকের শরীক অথবা মালিকের উপর তার প্রভাব রয়েছে। যেমন- বড় বড় আমীরদের কথা বাদশা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নেয়। কেননা তারা তার ডান হাত এবং তার রাজ্যের স্তম্ভ। তারা বেজার হলে রাজ্য বিগড়ে যাবে। অথবা সুপারিশকারী এমন যে, মালিকের কাছে সুপারিশ করলে তার সুপারিশ ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কবুল করে নেয়। দিল থেকে খুশি হোক কিংবা বেজার। যেমন- কন্যা ও স্ত্রীগণ। মুহাব্বতের কারণে বাদশা তাদের সুপারিশ রদ করতে পারে না। ফলে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাদের সুপারিশ কবুল করে নেয়।
টিকাঃ
৫৮. সূরা সাবা, ২২-২৩
📄 সুপারিশগ্রহণ ও প্রভাবশালীদের সন্তুষ্টকরণের ক্ষেত্রে দুনিয়ার রাজা-বাদশাদের সাথে আল্লাহর কোনও তুলনা চলে না
এখন আল্লাহকে ছেড়ে এসব লোক যাদেরকে ডাকে এবং যাদের কাছে সাহায্য কামনা করে, তারা তো আসমান-জমিনে অণু পরিমাণ জিনিসেরও মালিক নয় এবং তাদের কোনও অংশীদারিত্বও নেই। আবার তারা আল্লাহর সাম্রাজ্যের স্তম্ভ বা তাঁর ডান হাতও নয় যে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের কথা মেনে নেবেন। আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার ক্ষমতাও রাখে না যে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মঞ্জুর করে নেবেন।
বরং তাঁর দরবারে তাদের অবস্থা তো এমন যে, তিনি যখন কিছু বলেন, তখন তারা ভয়ে বেহুঁশ হয়ে যায় এবং আদব ও ভয়ের কারণে কথাটি দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করার হিম্মতটুকু করতে পারে না। তাই একে অপরকে জিজ্ঞাসা করে। পরস্পর আলোচনা দ্বারা যখন কথাটি সবাই বুঝে নেয় তখন 'ঈমান আনলাম ও মেনে নিলাম' ছাড়া আর কিছু বলতে পারে না। নির্দেশ পাল্টে দেওয়া বা কারও ওকালতি করার তো প্রশ্নই আসে না।
📄 আল্লাহ তাআলার দরবারে যেসব সুপারিশ চলবে না
এখানে একটি কথা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনে রাখা দরকার। তা হলো, অধিকাংশ লোক নবী-ওলীদের সুপারিশের উপর অতিরিক্ত ভরসা রাখে। তারা সুপারিশের গলদ অর্থ বুঝে আল্লাহকেই ভুলে গেছে। সুতরাং সুপারিশের হাকীকত বুঝতে হবে। সুপারিশকে আরবীতে শাফাআত বলে। দুনিয়াতে সুপারিশ কয়েক ধরনের হয়ে থাকে।
যেমন- বাদশার নিকট কোনও ব্যক্তির চুরি প্রমাণিত হলো। তখন কোনও আমীর বা মন্ত্রী সুপারিশ করে তাকে বাঁচিয়ে দিল। সুপারিশের একটি প্রকার এটি। বাদশার মন তো চায় যে, চোরকে পাকড়াও করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হোক। কিন্তু ওই আমীরের কারণে বাধ্য হয়ে তার সুপারিশ মেনে নেয় এবং চোরের অপরাধ মার্জনা করে দেয়। কারণ ওই আমীর তার সাম্রাজ্যের একজন বড় রুকন বা স্তম্ভ। সে তার রাজত্বের শোভা বর্ধন করে। তাই বাদশা চিন্তা করে, একবার রাগ সংবরণ করা আর একজন চোরকে মাফ করে দেওয়া এত বড় একজন আমীরকে বেজার করার চেয়ে অনেক ভালো। কারণ তাকে বেজার করলে বড় বড় কাজ বিগড়ে যাবে এবং রাজত্বের শান-শওকত কমে যাবে। এটাকে 'শাফাআতে ওয়াজাহাত' বলে। অর্থাৎ ওই আমীরের ওয়াজাহাত বা মর্যাদার কারণে তার সুপারিশ মঞ্জুর করা হয়েছে। এই ধরনের সুপারিশ আল্লাহর নিকট কোনওভাবেই চলবে না। কেউ যদি কোনও নবী-ওলী, ইমাম-শহীদ কিংবা কোনও ফেরেশতা বা পীরকে আল্লাহর দরবারে এমন সুপারিশকারী মনে করে তাহলে সে খাঁটি মুশরিক। সে এত বড় মূর্খ যে, খোদা হওয়ার অর্থ কী তাই জানে না এবং রাজত্বের মালিক ওই মহান সত্তার কোনও মর্যাদাই সে বোঝে না।
এই শাহানশাহের শান্ তো এমন যে, তিনি চাইলে একটি 'কুন' হুকুম দ্বারা এক মুহূর্তের মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরাঈলের মত কোটি কোটি নবী-ফেরেশতা এবং ওলী-জিন সৃষ্টি করতে পারেন। অনুরূপভাবে আরশ থেকে জমিন পর্যন্ত সারা বিশ্বকে এক মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দিয়ে তাঁর জায়গায় আরেকটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। তাঁর কেবল ইচ্ছাতেই সবকিছু হয়ে যায়। তাঁর কোনও কাজের জন্য আসবাবপত্র জমা করার কোনও প্রয়োজন হয় না।
যদি আগে-পরের সকল জিন-ইনসান জিবরাঈল বা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মত হয়ে যায়, তাতে তাঁর রাজত্বের ঔজ্জ্বল্য কোনও অংশে বাড়বে না। আবার যদি সকলেই শয়তান বা দাজ্জালে পরিণত হয়, তাতেও তাঁর রাজত্বের শান-শওকত কিছুমাত্র কমবে না। তিনি সর্বাবস্থায় সকলের চেয়ে বড় এবং সকল বাদশার বাদশা। কেউ তাঁর কোনওকিছু বিগড়াতে বা সজ্জিত করতে পারে না।
সুপারিশের দ্বিতীয় সুরত হলো, কোনও স্ত্রী বা যুবরাজ কিংবা বাদশার কোনও প্রিয় মানুষ এই চোরের পক্ষে সুপারিশ করতে দাঁড়িয়ে গেল এবং শাস্তি প্রয়োগে বাঁধা দিল, আর বাদশা ওই সুপারিশকারীর ভালোবাসার সামনে অপারগ হয়ে চোরের অপরাধ ক্ষমা করে দিল- তো এটাকে 'শাফাআতে মুহাব্বত' বলে। অর্থাৎ বাদশা মুহাব্বতের দরুন সুপারিশ কবুল করে নিয়েছে। বাদশা চিন্তা করেছে, একবার রাগ সংবরণ করা ও একজন চোরকে মাফ করে দেওয়া ওই দুঃখ- কষ্টের তুলনায় উত্তম, যা এই প্রেমাষ্পদ বেজার হলে আমাকে ভোগ করতে হবে। আল্লাহর দরবারে এই ধরনের সুপারিশেরও কোনও অবকাশ নেই। কেউ যদি কারও ব্যাপারে বিশ্বাস করে যে, সে আল্লাহর দরবারে এমন সুপারিশকারী হবে, তাহলে সেও তেমনই মুশরিক যেমন প্রথম সুরতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বান্দাদেরকে যতই নেয়ামত দান করুক এবং কাউকে হাবীব (প্রিয়, অর্থাৎ আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), কাউকে খলীল (ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অর্থাৎ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম), কাউকে কালীম (আল্লাহর সাথে যিনি সরাসরি কথা বলেন, অর্থাৎ মুসা আলাইহিস সালাম) ও কাউকে রূহুল্লাহ (আল্লাহ প্রদত্ত রূহ অর্থাৎ ঈসা আলাইহিস সালাম) উপাধি দান করুক; আবার কাউকে রাসূলুন কারীম, মাকীন, রূহুল কুদস এবং রূহুল আমীন বলুক, আখের মালিক মালিকই এবং গোলাম গোলামই। গোলাম কখনো গোলামীর স্তর থেকে ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না এবং গোলামীর সীমানা থেকে আগে বাড়তে পারে না। যেমন তাঁর রহমতে সর্বদা আনন্দচিত্তে তাঁর সামনে মাথা অবনত করে রাখে, তেমনি তাঁর ভয়ে সর্বদা কম্পমান থাকে।
টিকাঃ
৫৯. আল্লাহ তাআলার এই বড়ত্ব-মহত্ত্ব ও মাখলুক থেকে অনপেক্ষতার সামনে বড় বড় ওলী-আরেফরা বিনয়াবনত হয়েছেন এবং তাঁর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা-ক্ষমতার সামনে নিজেদের ভীতি ও হতবুদ্ধিতা প্রকাশ করেছেন। এসব আরেফদের মধ্যে রয়েছেন হিন্দুস্তানের বড় বুযুর্গ, শাইখ শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মুনীরী বিহারী (মৃ. ৭৭২ হিজরী)। তিনি তাঁর একজন মুরীদ বরাবর লিখিত চিঠিতে বলেন- 'হে ভাই! আমরা একজন মহাপ্রতাপশালী সত্তার সামনে রয়েছি। তিনি এমন ক্ষমতাধর যে, তিনি চাইলে জান্নাতকে জাহান্নাম ও আযাবে পরিণত করতে পারেন এবং জাহান্নামকে জান্নাত ও প্রশান্তিতে রূপান্তর করতে পারেন! তিনি কা'বা থেকে গির্জা তৈরি করতে পারেন এবং গির্জাকে কা'বায় পরিণত করতে পারেন! এমন প্রতাপশালীর সামনে কিভাবে তুমি নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত জীবন যাপন করছ? তাঁর ভয়ে তোমার কলিজা টুকরো টুকরো হয় না কেন? কেন তোমার অন্তর বিগলিত হয় না? প্রতি মুহূর্তে ভীত ও সতর্ক থাক, যেন আল্লাহর কুদরতি হাত -যা কোনও আসবাবের মুখাপেক্ষী না- গায়েবের পর্দা থেকে প্রকাশিত হয়ে সকল মস্তিষ্ককে হতবিহ্বল না করে দেয়! তাঁর দাপট কোনওকিছুর সাথে শর্তযুক্ত নয়, যেমন তাঁর করুণাও কোনওকিছুর সাথে শর্তযুক্ত নয়! যেমন তাঁর দয়া-অনুগ্রহ কখনো কোনও গুনাহগারকে ডেকে ক্ষমার জলে ধৌত করে পূতপবিত্র করে দেয়, এমনকি খোদ ওই ব্যক্তির হৃদয় থেকে করুণার ঝর্ণা প্রবাহিত হয় এবং তার বক্ষ উপচে পড়ে, তেমনি তাঁর ক্রোধ কখনো কখনো কোনও নেককার মুত্তাকীকে পাকড়াও করে ত্যাগ ও বিচ্ছেদের ধোঁয়া এবং গজবের আগুন দিয়ে তার চেহারাকে কালো করে দেয়, ফলে বিশ্ববাসীর নিকট এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই মহান সত্তা সকল আসবাব-উপকরণ থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী! তিনি কখনো হতভাগার পেট থেকে নবী জন্ম দেন, আবার কখনো নবীর ঔরসে দুর্ভাগা পয়দা করেন'। -নদভী
৬০. সহীহ মুসলিমে (হাদীস ২৫৭৭) হযরত আবূ যর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন- 'হে আমার বান্দারা! তোমরা কখনো এমন অবস্থানে পৌঁছতে পারবে না যে আমাকে ক্ষতি করবে, আবার এমন অবস্থানেও পৌঁছতে পারবে না যে, আমার উপকার করবে। হে আমার বান্দারা! তোমাদের আদি-অন্ত সমস্ত জিন-ইনসান যদি তোমাদের মাঝে সবচেয়ে পরহেযগার ব্যক্তির ন্যায় অন্তরের অধিকারী হয়ে যায়, তাহলেও তা আমার রাজত্বে বিন্দুমাত্র বৃদ্ধি ঘটাবে না। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের আদি-অন্ত সকল জিন-ইনসান যদি তোমাদের মধ্যকার সবচেয়ে পাপিষ্ঠ ব্যক্তির মত অন্তরের ধারক হয়, তবে তা আমার রাজত্বে বিন্দুমাত্র হ্রাস ঘটাবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের আদি-অন্ত সকল জিন-ইনসান যদি একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে আমর নিকট প্রার্থনা করে এবং আমি প্রত্যেককে তার চাহিদার বস্তু প্রদান করি, তবে তা আমার ভাণ্ডারে অতটুকুর বেশি হ্রাস ঘটাবে না, যতটুকু হ্রাস ঘটিয়ে থাকে সমুদ্রে সুঁই প্রবেশ করালে। হে আমার বান্দারা! আমি তোমাদের এই সকল আমল গণনা করে রাখছি, অতঃপর আমি তোমাদেরকে এগুলোর পূর্ণ বদলা দেব। অতএব তখন কেউ যদি কোনও কল্যাণ লাভ করে তাহলে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর কেউ যদি অন্যকিছু (অর্থাৎ অকল্যাণ) পায়, তাহলে সে যেন নিজেকেই তিরস্কার করে'। -নদভী
৬১. এগুলো কুরআনে বর্ণিত হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম-এর বিভিন্ন উপাধি। দ্রষ্টব্য- সূরা তাকবীর, ১৯-২১; সূরা বাকারা, ৮৭; সূরা শুআরা, ১৯৩-১৯৪। -অনুবাদক
৬২. মহান বুযুর্গ আরেফ, শাইখ শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মুনীরী রহ. তার শাগরেদদের নিকট প্রেরিত এক চিঠিতে আল্লাহ তাআলার মহত্ত্ব-বড়ত্ব ও মাখলুকের উপর তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের এমন বিবরণ দিয়েছেন, যা দ্বারা অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে এবং শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। তিনি বলেন- 'তিনি যা ইচ্ছা করেন, এতে কারও মরা-বাঁচার পরোয়া করেন না। দেখ, মরুভূমিতে একজন তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে এবং (আফসোস করে) বলছে- আমার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছে অথচ আমি তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছি, কিন্তু পানির একটি ফোটাও আমার ভাগ্যে জুটছে না! তখন তাকে সম্বোধন করে গায়েব থেকে আওয়াজ আসে- আমি হাজারো সিদ্দীককে অন্ধকারচ্ছন্ন ভয়ানক জঙ্গলে কিংবা অনুর্বর শুকনো মুরুভূমিতে নিয়ে আসি এবং তাদের সকলকে আমার কুদরতের তরবারি দ্বারা হত্যা করি, যেন কিছু কাক-শকুন তাদের চোখ ও গাল থেকে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে! কেউ যদি অভিযোগ করতে উদ্যত হয়, তবে আমি তার জিহ্বার উপর মহর এঁটে দিই এবং বলি- কোনও কাজের জন্য কারও কাছে তাঁর জবাবদিহিতা করতে হয় না। এই পাখিরাও আমার, সিদ্দীকীনরাও আমার। তাহলে এই অনধিকার চর্চাকারী তৃতীয় ব্যক্তি কে, যে আমার কাজের উপর আপত্তি করে?'। -নদভী
📄 ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য সুপারিশ
সুপারিশের তৃতীয় সুরত হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তির উপর চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে গেল। কিন্তু সে পেশাদার চোর না এবং সর্বদা চুরি করে না। কিন্তু প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে চুরি করে ফেলেছে। সেজন্য সে লজ্জিত এবং সর্বদা ভীত। সে বাদশার আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং নিজেকে অপরাধী ও শাস্তির উপযুক্ত মনে করে। সে বাদশার কাছ থেকে পলায়ন করে কোনও আমীর বা মন্ত্রীর আশ্রয় তালাশ করে না। বাদশার বিপরীতে অন্য কারও সাহায্য কামনা করে না বরং রাতদিন তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অপেক্ষা করে যে, তার ব্যাপারে বাদশা কী ফায়সালা করে? তখন তার এই অবস্থা দেখে বাদশার মনে মায়া জাগে।
কিন্তু আইনের প্রতি খেয়াল করে কোনও কারণ ছাড়া মাফও করতে পারে না, অন্যথায় আইনের প্রতি মানুষের মনে অশ্রদ্ধা তৈরি হতে পারে। তাই বাদশার ইশারায় কোনও আমীর বা মন্ত্রী ওই ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করে। তখন বাদশা এই আমীরের সম্মানার্থে তার সুপারিশ গ্রহণ করার বাহানায় চোরের অপরাধকে মার্জনা করে দেয়।
তো এখানে আমীর সাহেব এই চোরের জন্য এই কারণে সুপারিশ করেনি যে, তার সাথে কোনও আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব আছে, কিংবা সে তাকে কোনও সাহায্য করেছিল। বরং সে কেবল বাদশার মর্জির কারণে সুপারিশ করেছে। কারণ সে তো বাদশার আমীর, চোরদের পৃষ্ঠপোষক নয় যে, সে চোরদের সহযোগী হয়ে তাদের জন্য সুপারিশ করবে। কারণ তাহলে তো সে নিজেও চোর সাব্যস্ত হবে। এটাকে শাফাআত বিল-ইযন বলে। অর্থাৎ এই সুপারিশ স্বয়ং মালিকের অনুমতি সাপেক্ষে হয়ে থাকে।
আল্লাহর দরবারে কেবল এই ধরনের সুপারিশ চলতে পারে এবং কুরআন-হাদীসে নবী-ওলীদের যে সুপারিশের কথা আছে, তা দ্বারা এই সুপারিশই উদ্দেশ্য। সুতরাং প্রত্যেক বান্দার কর্তব্য হলো, সর্বদা আল্লাহকেই ডাকবে; তাঁকেই ভয় করবে; তাঁর নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করবে; কেবল তাঁর সামনেই নিজের গুনাহের স্বীকারোক্তি প্রদান করবে; তাঁকেই নিজের মালিক ও সাহয্যকারী মনে করবে।
আল্লাহকে ছাড়া কাউকে নিজের আশ্রয়স্থল মনে করবে না; অন্য কারও সাহায্যের উপর ভরসা করবে না। কেননা তিনি অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল প্রতিপালক, সকল মুসিবত নিজ অনুগ্রহে দূর করে দেবেন এবং নিজ দয়ায় সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি যাকে চাবেন নিজ হুকুমে তার জন্য সুপারিশকারী নিযুক্ত করবেন।
মোটকথা, যেমন নিজের অন্য সকল প্রয়োজনকে তাঁর কাছে সোপর্দ করা উচিত, তেমনি এই প্রয়োজনও তাঁরই এখতিয়ারে ছেড়ে দেওয়া উচিত যে, তিনি যাকে ইচ্ছা আমাদের সুপারিশকারী নির্বাচন করবেন। এমনটি কখনোই উচিত নয় যে, কারও সাহায্যের উপর ভরসা করবে এবং সাহায্যের জন্য তাকে ডাকবে। তাকে সাহায্যকারী মনে করে আসল মালিককেই ভুলে যাবে এবং তাঁর আহকাম ও শরীয়তকে অবমূল্যায়ন করে ওই কল্পিত সাহায্যকারীদের পন্থা ও রসম-রেওয়াজকে প্রাধান্য দেবে!
এগুলো অত্যন্ত নিকৃষ্ট কথা এবং সকল নবী-ওলীরা এগুলোর প্রতি অসন্তুষ্ট। তারা কখনোই এমন লোকদের সুপারিশকারী হবেন না। বরং রাগান্বিত হবেন এবং উল্টো তাদের দুশমন হবেন। কেননা তাদের বুযুর্গির মূল কথা তো এটাই যে, তারা স্ত্রী-সন্তান, শাগরেদ-মুরীদ, চাকর-নোকর ও বন্ধু-বান্ধবের সন্তুষ্টির উপর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতেন। আর যখন এসব নিকটজনেরা আল্লাহর সন্তুষ্টির খেলাফ কাজ করত, তখন তারা ওই সকল বুযুর্গদের দুশমন হয়ে যেত।
তাহলে গাইরুল্লাহকে আহ্বানকারী এই সকল লোক এমন কী হয়ে গেছে যে, বড় বড় লোক (অর্থাৎ নবী-ওলীরা) নিজেদের মর্জির খেলাফ তাদের পক্ষ নিয়ে আল্লাহর দরবারে ঝগড়া করবেন? বরং 'আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্যই দুশমনি'- এটাই তো তাদের শান! ফলে যাকে জাহান্নামে দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে, তারা তাকে আরও দু'চারটি ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে ফেলার জন্য প্রস্তুত থাকবেন!