📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 নবী-রাসূলগণ গায়েবের খবর জানতেন না

📄 নবী-রাসূলগণ গায়েবের খবর জানতেন না


আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَ لَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَا سْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَ مَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
'বল, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ইচ্ছা না করেন, আমি আমার নিজেরও কোনও উপকার ও অপকারের ক্ষমতা রাখি না। আমার যদি গায়েব সম্পর্কে জানা থাকত, তবে ভালো-ভালো জিনিস প্রচুর পরিমাণে সংগ্রহ করে নিতাম এবং কোনও রকম কষ্ট আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা- সেই সকল লোকের জন্য, যারা (আমার কথা) মানে'।⁵⁰

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল নবী-ওলীদের সর্দার ছিলেন। মানুষ তাঁর অনেক বড় বড় মুজিযা দেখেছে। তাঁরই কাছ থেকে সবাই দ্বীনের একান্ত বিষয় জেনেছে। সকল বুযুর্গের বুযুর্গীও কেবল তাঁরই অনুসরণে অর্জিত হয়েছে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকেই নির্দেশ দিয়েছেন যে, নিজের অবস্থা লোকদের সামনে স্পষ্ট করো, যেন এর মাধ্যমে অন্য সবার অবস্থা জানা হয়ে যায়।

সুতরাং তিনি বলে দিয়েছেন- আমার না আছে কোনও ক্ষমতা আর না আমি গায়েবের কোনও বিষয় জানি। আমার ক্ষমতার তো এমন অবস্থা যে, অন্যের কথা দূরে থাক, আমি নিজেরও কোনও উপকার বা অপকারের সামর্থ্য রাখি না!

গায়েব জানা যদি আমার এখতিয়ারে থাকত, তাহলে আমি সকল কাজের পরিণাম শুরুতেই জেনে যেতাম! পরিণাম ভালো জানা গেলে সেটা করতাম আর মন্দ জানা গেলে শুরুতেই তা থেকে বিরত থাকতাম!

মোটকথা, কোনও ক্ষমতা এবং গায়েবের কোনও ইলম আমার কাছে নেই। আর না আমি কোনও খোদা হওয়ার দাবি করি। আমি তো কেবল পয়গম্বর হওয়ার দাবি করি। আর পয়গম্বরের দায়িত্ব কেবল এতটুকু যে, মন্দ কাজ দেখলে সতর্ক করবে এবং ভালো কাজে সুসংবাদ শোনাবে। আর এই সতর্কতা ও সুসংবাদও কেবল তাদেরকে উপকার করে যাদের অন্তরে ঈমান আছে। তবে অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করা আমার কাজ না, সেটা কেবল আল্লাহর কাজ।

টিকাঃ
৫০. সূরা আরাফ, ১৮৮

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 আল্লাহর দেওয়া সংবাদ ছাড়া নবীরা গায়েব জানতেন না

📄 আল্লাহর দেওয়া সংবাদ ছাড়া নবীরা গায়েব জানতেন না


এ আয়াত থেকে বোঝা গেল, অন্য লোকদের তুলনায় নবী-ওলীদেরকে আল্লাহ তাআলা যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, সেই শ্রেষ্ঠত্ব এটাই যে, তারা আল্লাহর পথ দেখান এবং তারা জ্ঞান রাখেন- ভালো কাজ কোনটি, মন্দ কাজ কোনটি এবং লোকদেরকে তা শেখান। আল্লাহ তাআলা তাদের কথায় প্রভাব দান করেন, ফলে অনেক লোক তাতে সরল পথে চলে আসে।

এ ছাড়া পৃথিবীতে স্বাধীন কর্তৃত্ব করার দিক থেকে নবী-ওলীদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সেই ক্ষমতা দেননি যে, তারা যাকে চাবে মেরে ফেলবে; কাউকে সন্তান দান করবে; কারও বিপদাপদ দূর করে দেবে; কারও কামনা-বাসনা পূরণ করবে; জয়-পরাজয় দান করবে; কাউকে ধনী বা গরিব বানিয়ে দেবে; কাউকে রাজা-বাদশা ও উজির বানিয়ে দেবে বা কারও থেকে রাজত্ব ছিনিয়ে নেবে; কারও অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করে দেবে বা কারও থেকে ঈমান ছিনিয়ে নেবে; কোনও অসুস্থকে সুস্থ করে দেবে বা সুস্থকে অসুস্থ বানিয়ে দেবে-এসব বিষয়ে নবী-ওলীদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা এমন কোনও ক্ষমতা দেননি। বরং এসব ক্ষেত্রে সকল বান্দা সমান অক্ষম!

অনুসন্ধিৎসুভাবে গায়েবের বিষয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সেই ক্ষমতা দেননি যে, তারা যে কারও দিলের অবস্থা যখন ইচ্ছা জানতে পারবে; গায়েবের যে কোনও বিষয় যখন ইচ্ছা জেনে নেবে, যেমন- অমুক ব্যক্তি জীবিত আছে নাকি মরে গেছে, বা কোন শহরে কী অবস্থায় আছে ইত্যাদি; ভবিষ্যতের যে কোনও বিষয় যখন ইচ্ছা জানতে পারবে, যেমন- অমুকের সন্তান হবে, অমুক ব্যবসায় লাভ হবে নাকি লোকসান হবে, এই যুদ্ধে জয়ী হবে নাকি পরাজিত ইত্যাদি—এই সকল বিষয়ে ছোট-বড় সকল বান্দা সমান বেখবর এবং অজ্ঞ।

সুতরাং যেমন অন্য সব মানুষ কোনো বোধশক্তি থেকে বা আলামত দেখে কোন একটি কথা বলে দেয়, পরে ঘটনাক্রমে কখনো তা বাস্তব হয়, ঠিক তেমনি এই সকল নবী-ওলীগণও যে কথা বোধ ও উপলব্ধি থেকে বা কোন লক্ষণ দেখে বলে দেয় তা কখনো বাস্তব হয়, আর কখনো ভুল হয়। তবে যে কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা ইল্হামের মাধ্যমে লাভ হয়, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু তা তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়।

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 নবীজীর ইলমে গায়েব ছিল না

📄 নবীজীর ইলমে গায়েব ছিল না


হযরত রুফাই বিনতে মুআবিয়া রাযি. বলেন- جَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَخَلَ حِيْنَ بَنَى بِي عَلِيٌّ ، فَজَلَسَ عَلَى فُرَاشِي كَمَجْلِسِ مِنِّي ، فَجَعَلَتْ جُوَيْرِيَاتُ لَنَا يَضْرِبْنَ بِالدُّفِّ ، وَيَنْدُبْنَ مَنْ قُتِلَ مِنْ أَبَائِي يَوْمَ بَدْرٍ ، إِذْ قَالَتْ إِحْدَاهُنَّ : وَفِيْنَا نَبِيٌّ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ ، فَقَالَ : دَعِي هَذِهِ، وَقُوْلِي بِالَّذِي কُنْتِ تَقُوْلِينَ.

‘আমার বাসর রাতের পরের দিন সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন এবং আমার বিছানার উপর বসলেন যেমন তুমি বসে আছ। তখন আমাদের ছোট ছোট মেয়েরা দফ বাজিয়ে বদর যুদ্ধে শহীদ হওয়া আমার বাপ-দাদার শোকগাঁথা গাচ্ছিল। হঠাৎ তাদের একজন বলে বসল- আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন যিনি আগামীকাল কী হবে তা জানেন! তখন তিনি বললেন- এ কথা বাদ দাও, আগে যা বলছিলে তাই বল'। -বুখারী

হযরত রুবায়্যি' একজন আনসারী নারী ছিলেন। তার বিবাহের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন এবং তার কাছে বসলেন। তখন তাদের কতক বালিকা কিছু কবিতা আবৃত্তি করছিল। এক পর্যায়ে তারা রাসূলের প্রশংসায় বলে উঠল- তাঁকে আল্লাহ তাআলা এমন মর্যাদা দিয়েছেন যে, তিনি ভবিষ্যতের কথা জানেন। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বারণ করলেন এবং বললেন- এটা বাদ দাও, আগে যা গাচ্ছিলে তাই গাও!

এই হাদীস থেকে বোঝা গেল, কোনও নবী-ওলী বা ইমাম-শহীদের ব্যাপারে কখনোই এই আকীদা পোষণ করা যাবে না যে, তারা গায়েব জানেন! এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারেও এরূপ আকীদা রাখা যাবে না এবং এমন প্রশংসা করা যাবে না!

এই যে কবি-সাহিত্যিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসায় কিংবা নবী-ওলী, পীর-বুযুর্গ বা উস্তাদদের প্রশংসায় সীমালঙ্ঘন করে এবং তাদের প্রশংসায় খোদায়ীসূলভ গুণ-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে, আর বলে যে, কবিতায় অতিশয়োক্তি চলে- তাদের এই কথা সম্পূর্ণ গলদ! যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ বালিকাদেরকে তাঁর প্রশংসায় এ জাতীয় কবিতা বলতে দিলেন না, তখন সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী কোনও ব্যক্তি কি এগুলো বলতে বা শুনতে পছন্দ করতে পারে!

টিকাঃ
৫১. সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৪৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯২২; জামে তিরমিযী, হাদীস ১০৯০। আর সুনানে ইবনে মাজাহ'র বর্ণনায় (হাদীস ১৮৯৭) এ কথাও আছে যে, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- 'এ কথা বাদ দাও, কারণ আগামীকাল কী হবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না'। -অনুবাদক

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 আল্লাহর ইলমের সাথে কারো ইলমের তুলনা করা কুফরি

📄 আল্লাহর ইলমের সাথে কারো ইলমের তুলনা করা কুফরি


হযরত আয়শা রাযি. বলেন- مَنْ أَخْبَرَكَ أَنَّ مُحَمَّدًا ... يَعْلَمُ الْخَمْسَ الَّتِي قَالَ اللَّهُ تَعَالَى ﴿إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ فَقَدْ أَعْظَمَ الْفِرْيَةَ.

'যে তোমাকে বলে- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পাঁচটি বিষয়ে জানতেন যেগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, সেগুলোর ইলম একমাত্র তাঁরই নিকট রয়েছে (দ্রষ্টব্য- সূরা লুকমান, ৩৪), সে বড় মিথ্যা রটনা করল!'- বুখারী

অর্থাৎ সূরা লুকমানের শেষে যে পাঁচটি বিষয় আলোচিত হয়েছে এবং যার ব্যাখ্যা এই পরিচ্ছেদের শুরুতে গিয়েছে, গায়েবের সকল বিষয় মূলত এই পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে বলবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পাঁচটি বিষয় জানতেন, অর্থাৎ গায়েবের সকল বিষয় জানতেন, সে বড়ই মিথ্যাবাদী। কারণ গায়েবের কথা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

বুখারী শরীফে হযরত উম্মুল 'আলা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- وَاللَّهِ مَا أَدْرِي وَأَنَا رَسُوْلُ اللَّهِ - مَا يُفْعَلُ بِيْ وَلَا بِكُمْ. 'আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও এটা জানি না যে, আমার সাথে এবং তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে!'।

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে, কবরে বা আখেরাতে স্বীয় বান্দাদের সাথে কী আচরণ করবেন, তা সুনিশ্চিতভাবে কেউ জানে না। চাই সে নবী হোক বা ওলী, নিজের অবস্থা হোক বা অন্যদের অবস্থা! আর কোনও বিষয়ে যদি আল্লাহ তাআলা কোনও খাস বান্দাকে ওহী বা ইলহামের মাধ্যমে সংক্ষিপ্তভাবে অবহিত করেন যে, অমুক কাজের পরিণাম ভালো আর অমুক কাজের পরিণাম মন্দ- তো সেটা একটা সংক্ষিপ্ত কথা। এর চেয়ে বেশি জানা এবং এর বিস্তারিত বিবরণ লাভ করা তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়।

টিকাঃ
৫২. উল্লিখিত শব্দ মূলত জামে তিরমিযী (হাদীস ৩২৭৮)-এর। আর সহীহ বুখারী (হাদীস ৪৮৫৫)-এর বর্ণনায় শব্দ এমন- 'আর যে তোমাকে বলে যে, তিনি আগামীকাল কী হবে তা জানেন, সে মিথ্যা বলল! অতঃপর আয়শা রাযি. সূরা লুকমানের ৩৪ নং আয়াত পাঠ করেছেন'। লেখক হাদীসটি মিশকাতের হাওয়ালায় উল্লেখ করেছেন। সেখানেও উল্লিখিত শব্দ তিরমিযীর বর্ণনার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বুখারী ও মুসলিম রহ. হাদীসটি শব্দের সামান্য ভিন্নতাসহ বর্ণনা করেছেন। আর গায়েবের এই পাঁচটি বিষয় আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না মর্মে সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস রয়েছে। দেখুন- সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬৯৭ ও ৭৩৮৯; সুনানে কুবরা নাসাঈ, হাদীস ১১১৯৪। -অনুবাদক
৫৩. সহীহ বুখারী, হাদীস ৭০১৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px