📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 ইলমে গায়েবের দাবীদার কাফির

📄 ইলমে গায়েবের দাবীদার কাফির


পূর্বের আয়াত থেকে জানা গেল, কেউ যদি দাবি করে যে, আমার নিকট এমন ইলম আছে, যার মাধ্যেমে আমি যখন ইচ্ছা গায়েবের কথা জানতে পারি এবং ভবিষ্যতের বিষয়ে অবগত হওয়ার ক্ষমতা আমার আছে- তাহলে সে মিথ্যাবাদী; সে মূলত খোদা হওয়ার দাবি করছে!

আর কেউ যদি কোনও নবী-ওলী, জিন-ফেরেশতা, ইমাম ও ইমামের সন্তান, পীর-শহীদ, গণক-জ্যোতিষী, কিতাব⁴⁴ ইত্যাদির মাধ্যমে শুভ-অশুভ লক্ষণ নির্ধারণকারী, ভবিষ্যদ্বক্তা-পুরোহিত কিংবা কোনও জিন-পরীর ব্যাপারে এমন বিশ্বাস করে যে, তারা গায়েবের কথা বা ভবিষ্যতের বিষয় জানে, তাহলে সে মুশরিক হয়ে যাবে এবং উক্ত আয়াতের অস্বীকারকারী সাব্যস্ত হবে!

এখন সংশয় জাগতে পারে যে, কখনো কখনো কোনও জ্যোতিষী- গণক বা পুরোহিত একটা কথা বলে এবং বাস্তবেও তেমনি ঘটে, এতে তো তাদের গায়েব জানার প্রমাণ পাওয়া যায়- তো এই সংশয় সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ তাদের অনেক কথাই অবাস্তব প্রমাণিত হয়। তাতে বোঝা যায় যে, গায়েবের ইলম তাদের এখতিয়ারাধীন নয়। কখনো তাদের অনুমান সঠিক হয় আর কখনো গলদ হয়। এস্তেখারা ও কাশফের অবস্থাও এমনই।

টিকাঃ
৪৪. হিন্দুস্তানে ও হিন্দুস্তানের বাইরে অনেক লোকের অভ্যাস আছে, যখন তাদের নিকট কোনও বিষয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়, তখন এমন কোনও একটি কিতাব হাতে নেয় যার লেখক সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা রয়েছে। অতঃপর অনির্দিষ্টভাবে কিতাবটি খোলে। এভাবে যে পৃষ্ঠাটি বের হয়, তা থেকে লক্ষণ নির্ধারণ করে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে ইরান ও ভারত উপমহাদেশে সর্বাধিক নির্ভর করা হয় ইরানের সূফী কবি হাফিয (৭৯৩ হিজরী)-এর কাব্যসমগ্রের উপর। এটাকে তারা 'লক্ষণ দেখা' বলে। -নদভী

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 নবী-রাসূলগণ গায়েবের খবর জানতেন না

📄 নবী-রাসূলগণ গায়েবের খবর জানতেন না


আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَ لَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَا سْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَ مَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
'বল, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ইচ্ছা না করেন, আমি আমার নিজেরও কোনও উপকার ও অপকারের ক্ষমতা রাখি না। আমার যদি গায়েব সম্পর্কে জানা থাকত, তবে ভালো-ভালো জিনিস প্রচুর পরিমাণে সংগ্রহ করে নিতাম এবং কোনও রকম কষ্ট আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা- সেই সকল লোকের জন্য, যারা (আমার কথা) মানে'।⁵⁰

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল নবী-ওলীদের সর্দার ছিলেন। মানুষ তাঁর অনেক বড় বড় মুজিযা দেখেছে। তাঁরই কাছ থেকে সবাই দ্বীনের একান্ত বিষয় জেনেছে। সকল বুযুর্গের বুযুর্গীও কেবল তাঁরই অনুসরণে অর্জিত হয়েছে। এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকেই নির্দেশ দিয়েছেন যে, নিজের অবস্থা লোকদের সামনে স্পষ্ট করো, যেন এর মাধ্যমে অন্য সবার অবস্থা জানা হয়ে যায়।

সুতরাং তিনি বলে দিয়েছেন- আমার না আছে কোনও ক্ষমতা আর না আমি গায়েবের কোনও বিষয় জানি। আমার ক্ষমতার তো এমন অবস্থা যে, অন্যের কথা দূরে থাক, আমি নিজেরও কোনও উপকার বা অপকারের সামর্থ্য রাখি না!

গায়েব জানা যদি আমার এখতিয়ারে থাকত, তাহলে আমি সকল কাজের পরিণাম শুরুতেই জেনে যেতাম! পরিণাম ভালো জানা গেলে সেটা করতাম আর মন্দ জানা গেলে শুরুতেই তা থেকে বিরত থাকতাম!

মোটকথা, কোনও ক্ষমতা এবং গায়েবের কোনও ইলম আমার কাছে নেই। আর না আমি কোনও খোদা হওয়ার দাবি করি। আমি তো কেবল পয়গম্বর হওয়ার দাবি করি। আর পয়গম্বরের দায়িত্ব কেবল এতটুকু যে, মন্দ কাজ দেখলে সতর্ক করবে এবং ভালো কাজে সুসংবাদ শোনাবে। আর এই সতর্কতা ও সুসংবাদও কেবল তাদেরকে উপকার করে যাদের অন্তরে ঈমান আছে। তবে অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করা আমার কাজ না, সেটা কেবল আল্লাহর কাজ।

টিকাঃ
৫০. সূরা আরাফ, ১৮৮

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 আল্লাহর দেওয়া সংবাদ ছাড়া নবীরা গায়েব জানতেন না

📄 আল্লাহর দেওয়া সংবাদ ছাড়া নবীরা গায়েব জানতেন না


এ আয়াত থেকে বোঝা গেল, অন্য লোকদের তুলনায় নবী-ওলীদেরকে আল্লাহ তাআলা যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, সেই শ্রেষ্ঠত্ব এটাই যে, তারা আল্লাহর পথ দেখান এবং তারা জ্ঞান রাখেন- ভালো কাজ কোনটি, মন্দ কাজ কোনটি এবং লোকদেরকে তা শেখান। আল্লাহ তাআলা তাদের কথায় প্রভাব দান করেন, ফলে অনেক লোক তাতে সরল পথে চলে আসে।

এ ছাড়া পৃথিবীতে স্বাধীন কর্তৃত্ব করার দিক থেকে নবী-ওলীদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সেই ক্ষমতা দেননি যে, তারা যাকে চাবে মেরে ফেলবে; কাউকে সন্তান দান করবে; কারও বিপদাপদ দূর করে দেবে; কারও কামনা-বাসনা পূরণ করবে; জয়-পরাজয় দান করবে; কাউকে ধনী বা গরিব বানিয়ে দেবে; কাউকে রাজা-বাদশা ও উজির বানিয়ে দেবে বা কারও থেকে রাজত্ব ছিনিয়ে নেবে; কারও অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করে দেবে বা কারও থেকে ঈমান ছিনিয়ে নেবে; কোনও অসুস্থকে সুস্থ করে দেবে বা সুস্থকে অসুস্থ বানিয়ে দেবে-এসব বিষয়ে নবী-ওলীদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা এমন কোনও ক্ষমতা দেননি। বরং এসব ক্ষেত্রে সকল বান্দা সমান অক্ষম!

অনুসন্ধিৎসুভাবে গায়েবের বিষয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সেই ক্ষমতা দেননি যে, তারা যে কারও দিলের অবস্থা যখন ইচ্ছা জানতে পারবে; গায়েবের যে কোনও বিষয় যখন ইচ্ছা জেনে নেবে, যেমন- অমুক ব্যক্তি জীবিত আছে নাকি মরে গেছে, বা কোন শহরে কী অবস্থায় আছে ইত্যাদি; ভবিষ্যতের যে কোনও বিষয় যখন ইচ্ছা জানতে পারবে, যেমন- অমুকের সন্তান হবে, অমুক ব্যবসায় লাভ হবে নাকি লোকসান হবে, এই যুদ্ধে জয়ী হবে নাকি পরাজিত ইত্যাদি—এই সকল বিষয়ে ছোট-বড় সকল বান্দা সমান বেখবর এবং অজ্ঞ।

সুতরাং যেমন অন্য সব মানুষ কোনো বোধশক্তি থেকে বা আলামত দেখে কোন একটি কথা বলে দেয়, পরে ঘটনাক্রমে কখনো তা বাস্তব হয়, ঠিক তেমনি এই সকল নবী-ওলীগণও যে কথা বোধ ও উপলব্ধি থেকে বা কোন লক্ষণ দেখে বলে দেয় তা কখনো বাস্তব হয়, আর কখনো ভুল হয়। তবে যে কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা ইল্হামের মাধ্যমে লাভ হয়, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু তা তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়।

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 নবীজীর ইলমে গায়েব ছিল না

📄 নবীজীর ইলমে গায়েব ছিল না


হযরত রুফাই বিনতে মুআবিয়া রাযি. বলেন- جَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَخَلَ حِيْنَ بَنَى بِي عَلِيٌّ ، فَজَلَسَ عَلَى فُرَاشِي كَمَجْلِسِ مِنِّي ، فَجَعَلَتْ جُوَيْرِيَاتُ لَنَا يَضْرِبْنَ بِالدُّفِّ ، وَيَنْدُبْنَ مَنْ قُتِلَ مِنْ أَبَائِي يَوْمَ بَدْرٍ ، إِذْ قَالَتْ إِحْدَاهُنَّ : وَفِيْنَا نَبِيٌّ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ ، فَقَالَ : دَعِي هَذِهِ، وَقُوْلِي بِالَّذِي কُنْتِ تَقُوْلِينَ.

‘আমার বাসর রাতের পরের দিন সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন এবং আমার বিছানার উপর বসলেন যেমন তুমি বসে আছ। তখন আমাদের ছোট ছোট মেয়েরা দফ বাজিয়ে বদর যুদ্ধে শহীদ হওয়া আমার বাপ-দাদার শোকগাঁথা গাচ্ছিল। হঠাৎ তাদের একজন বলে বসল- আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন যিনি আগামীকাল কী হবে তা জানেন! তখন তিনি বললেন- এ কথা বাদ দাও, আগে যা বলছিলে তাই বল'। -বুখারী

হযরত রুবায়্যি' একজন আনসারী নারী ছিলেন। তার বিবাহের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন এবং তার কাছে বসলেন। তখন তাদের কতক বালিকা কিছু কবিতা আবৃত্তি করছিল। এক পর্যায়ে তারা রাসূলের প্রশংসায় বলে উঠল- তাঁকে আল্লাহ তাআলা এমন মর্যাদা দিয়েছেন যে, তিনি ভবিষ্যতের কথা জানেন। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বারণ করলেন এবং বললেন- এটা বাদ দাও, আগে যা গাচ্ছিলে তাই গাও!

এই হাদীস থেকে বোঝা গেল, কোনও নবী-ওলী বা ইমাম-শহীদের ব্যাপারে কখনোই এই আকীদা পোষণ করা যাবে না যে, তারা গায়েব জানেন! এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারেও এরূপ আকীদা রাখা যাবে না এবং এমন প্রশংসা করা যাবে না!

এই যে কবি-সাহিত্যিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসায় কিংবা নবী-ওলী, পীর-বুযুর্গ বা উস্তাদদের প্রশংসায় সীমালঙ্ঘন করে এবং তাদের প্রশংসায় খোদায়ীসূলভ গুণ-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে, আর বলে যে, কবিতায় অতিশয়োক্তি চলে- তাদের এই কথা সম্পূর্ণ গলদ! যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ বালিকাদেরকে তাঁর প্রশংসায় এ জাতীয় কবিতা বলতে দিলেন না, তখন সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী কোনও ব্যক্তি কি এগুলো বলতে বা শুনতে পছন্দ করতে পারে!

টিকাঃ
৫১. সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৪৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯২২; জামে তিরমিযী, হাদীস ১০৯০। আর সুনানে ইবনে মাজাহ'র বর্ণনায় (হাদীস ১৮৯৭) এ কথাও আছে যে, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- 'এ কথা বাদ দাও, কারণ আগামীকাল কী হবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না'। -অনুবাদক

ফন্ট সাইজ
15px
17px