📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ

📄 শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ


ফেতনা ও মুসিবতের সময় তাওহীদের আকীদাকে আঁকড়ে ধরে তার উপর অটল থাকা

হযরত মুআয বিন জাবাল রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অসিয়ত করেছেন- لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا وَإِنْ قُتِلْتَ وَحُرِّقْتَ. 'তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় এবং জ্বালিয়ে দেওয়া হয়'!

অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কাউকে মানবে না এবং কোনও জিন বা ভূত ক্ষতি করবে—এই ভয় করবে না! সুতরাং একজন মুসলিম যেমন বাহ্যিক বিপদাপদের উপর সবর করবে এবং কারও ভয়ে নিজের দ্বীনের ক্ষতি করবে না, ঠিক তেমনি জিন-ভূতের ক্ষতির উপরও ধৈর্য ধারণ করবে এবং ভয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করবে না। বরং চিন্তা করবে যে, বাস্তবে তো সবকিছুই আল্লাহর এখতিয়ারাধীন। তবে তিনিই কখনো কখনো বান্দাকে পরীক্ষা করেন এবং খারাপদের হাতে ভালোদেরকে কষ্ট দেন, যেন কাঁচা ও পরিপক্কদের মাঝে পার্থক্য হয়ে যায় এবং মুমিন ও মুনাফেক চিহ্নিত হয়ে যায়।

তাই যেমনিভাবে প্রকাশ্যে ফাসেকদের হাতে মুত্তাকীরা এবং কাফেরদের হাতে মুসলামানরা কষ্ট পায়, তখন নিজের দ্বীন রক্ষার্থে সবর করা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না, ঠিক তেমনি কখনো কখনো আল্লাহর ইচ্ছায় জিন-শয়তানদের হাতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনও ধৈর্যধারণ করতে হবে। কিছুতেই তাদের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। এই হাদীস থেকে বোঝা গেল, কোনও ব্যক্তি যদি শিরকবিমুখ হয়ে অন্যদের আনুগত্য ছেড়ে দেয়, তাদের নামে কুরবানী-মানত করাকে ঘৃণা করে, গলদ রসম-রেওয়াজকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে এবং এসব করতে গিয়ে তার জান-মাল ও সন্তানদের কোনও ক্ষতি হয়, কিংবা কোনও পীর-শহীদের নামে কোনও শয়তান ক্ষতি সাধন করে তাহলে সেক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। আর মনে করবে যে, আল্লাহ আমার দ্বীনদারীর পরীক্ষা নিচ্ছেন। যেমনি আল্লাহ তাআলা জালিমদেরকে ঢিল দিয়ে পরে পাকড়াও করেন এবং মজলুমদেরকে তাদের হাত থেকে রেহাই দেন, তেমনি জালিম জিনদেরকেও আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত সময়ে পাকড়াও করবেন এবং নেককারদেরকে তাদের অনিষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন।

টিকাঃ
৩৮. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২০৭৫। -অনুবাদক

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 শাফায়াত সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদা এবং তার খণ্ডন

📄 শাফায়াত সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদা এবং তার খণ্ডন


মনিব বিনে অন্য কারও দ্বারস্থ হওয়া গোলামের আত্মমর্যাদাহীনতা ও অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বর্ণনা করেন- قَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُوْلَ اللهِ ، أَيُّ الذَّنْبِ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ? قَالَ : أَنْ تَدْعُوَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ. 'এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল- হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? আল্লাহর রাসূল উত্তরে বললেন- আল্লাহর কোনও সমকক্ষ বা শরীক সাব্যস্ত করা অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন (এটা সবচেয়ে বড় গুনাহ)'।

অর্থাৎ আল্লাহর ব্যাপারে যেমন বিশ্বাস কর যে, তিনি সর্বত্র হাজির-নাযির এবং সকল বিষয় তাঁরই এখতিয়ারাধীন, তেমনি বিপদাপদের সময়ও এই বিশ্বাস রেখে তাঁকেই ডাকবে। এরূপ বিশ্বাস রেখে অন্য কাউকে ডাকা যাবে না, কারণ তা সবচেয়ে বড় গুনাহ। কারণ প্রথমত, এই ধারণাই সম্পূর্ণ ভুল যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হাজত পূরণের ক্ষমতা রাখে বা সর্বত্র হাজির-নাযির। দ্বিতীয়ত, আমাদের স্রষ্টা যেহেতু আল্লাহ তাআলা- তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাই আমাদের কর্তব্য হলো, নিজেদের সকল প্রয়োজনে তাঁকেই ডাকব; তাঁরই নিকট প্রার্থনা করব; অন্য কাউকে দিয়ে আমরা কী করব?!

যেমন- কেউ যদি এক বাদশার গোলাম হয়ে যায়, তাহলে সে তার সকল কাজকে ঐ বাদশার অধীন করে রাখে। অন্য কোনও বাদশার দ্বারস্থ হয় না। আর কোনও মুচির দ্বারস্থ হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না!

তাওহীদবাদী গুনাহগার তাওবা করে আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারে, কিন্তু ইবাদতগুযার মুশরিক তা পারে না।

জামে তিরমিযীতে হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ، ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا، لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً. 'আল্লাহ তাআলা বলেন- হে আদমসন্তান! যদি তুমি পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও এবং আমার সাথে কাউকে শরীক না করে থাক, তাহলে আমি পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হব'!

অর্থাৎ এই দুনিয়াতে সকল গুনাহগাররা গুনাহ করেছে। ফেরাউন-হামান এই দুনিয়াতেই ছিল। বরং শয়তানও তো এই দুনিয়াতেই আছে। এখন মনে কর, এই সকল গুনাহগাররা যত গুনাহ করেছে, এক ব্যক্তিই ঐ পরিমাণ গুনাহ করল, কিন্তু সে শিরক থেকে বেঁচে থাকল, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার যত পরিমাণ গুনাহ আছে তত পরিমাণ ক্ষমা করবেন! এ হাদীস থেকে বোঝা গেল, তাওহীদের বরকতে সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়, যেমন শিরকের কারণে সকল নেক কাজ নষ্ট হয়ে যায়।

সত্য কথা হলো, শিরক থেকে যখন মানুষ পবিত্র হয়ে যায়- আল্লাহকে ছাড়া কাউকে মালিক মনে করে না এবং তিনি ছাড়া আর কাউকে আশ্রয়স্থল জ্ঞান করে না, তার অন্তরে এ কথা বদ্ধমূল থাকে যে, তাঁর হকে ত্রুটিকারী পলায়ন করে অন্য কোথাও আশ্রয়স্থল পায় না। তাঁর বিপরীতে কারও জোর খাটে না। তাঁর সামনে কারও সহযোগিতা চলে না এবং নিজ এখতিয়ারে কেউ কারও জন্য সুপারিশও করতে পারে না। যখন এ কথাগুলো তার মন-মস্তিষ্কে ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়ে যাবে, তখন যত গুনাহ তার থেকে প্রকাশ পাবে, সেটা হয়তো মানবীয় দুর্বলতার কারণে হবে কিংবা ভুলে হবে এবং এসব গুনাহের ভয় সর্বদা তার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। সে এসব গুনাহের কারণে এতটা লজ্জিত ও পেরেশান হবে যে, জীবন থেকেই অতিষ্ঠ হয়ে যাবে।

সন্দেহ নেই, গুনাহের কারণে এমন পেরেশানীর হালত যত বাড়বে, আল্লাহর রহমতও তত বাড়বে। সুতরাং যে ব্যক্তি পূর্ণ তাওহীদের অধিকারী, তার গুনাহও এমন ভূমিকা কাজ করে যা অন্যদের ইবাদত করতে পারে না। তাওহীদপন্থি ফাসেক, শিরককারী মুত্তাকী থেকে হাজার গুণ উত্তম। যেমন অনুগত দোষী প্রজা চাটুকার বিদ্রোহী থেকে অনেক ভালো। কারণ অনুগত ব্যক্তি তার ত্রুটির উপর লজ্জিত, আর বিদ্রোহী তার কর্মের উপর গর্বিত!

টিকাঃ
৩৯. সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৮৬১, ৭৫৩২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৩৬১২। -অনুবাদক
৪০. যারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে- তার মধ্যে লাভ-ক্ষতি এবং দেওয়া ও ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে, শাইখ আবদুল কাদের জিলানী রহ. অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় তাদের ভর্ৎসনা করেছেন। তিনি বলেন- 'তোমরা যারা আল্লাহ ও তাঁর সিদ্দীক বান্দাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ এবং মাখলুকের প্রতি মনোনিবেশ করে তাদেরকে অংশীদার সাব্যস্ত করে রেখেছ! আর কতদিন তাদের প্রতি আত্মনিয়োগ করে থাকবে? তারা তোমাদের কী উপকার করে? তাদের হাতে তো লাভ-ক্ষতি কিংবা দেওয়া- নেওয়ার কোনও ক্ষমতাই নেই! লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় তাদের মাঝে আর অন্যান্য জড়বস্তুর মাঝে কোনও পার্থক্য নেই! মালিক একজনই; ক্ষতিসাধনকারী একজনই; উপকারকারীও একজনই; আনন্দিত করা ও শান্তি দান করার ক্ষমতাও একজনের হাতেই; ক্ষমতাপ্রদানকারী এবং বশীভূতকারী একজনই; দান করেন এবং বঞ্চিত করেন একজনই; সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা তো কেবল এক আল্লাহই'! (আল ফাতহুর রব্বানী, ১৩তম মজলিস)। -নদভী
৪১. জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৪০। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হাদীসের এই অংশটি সহীহ মুসলিম (হাদীস ২৬৮৭)-সহ অন্যান্য গ্রন্থে হযরত আবূ যর রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। -অনুবাদক

ফন্ট সাইজ
15px
17px