📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 নবীজীর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে আল্লাহর অংশীদারিত্বের সম্পর্ক নেই

📄 নবীজীর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে আল্লাহর অংশীদারিত্বের সম্পর্ক নেই


আল্লাহ তাআলা কেবল ইখলাসপূর্ণ আমলই কবুল করেন, যেখানে অন্য কারও অংশ নেই

সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيْهِ مَعِي غَيْرِي، تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ. 'আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- শরীকদের মধ্যে আমিই শিরক থেকে সর্বাধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি কোনও আমল করে এবং তাতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, তবে আমি তাকে তার শিরকসহ প্রত্যাখ্যান করি'!

অর্থাৎ যেভাবে অন্যরা নিজেদের যৌথ বস্তুকে পরস্পরের মাঝে বণ্টন করে নেয় আমি তেমন করি না। আমি অমুখাপেক্ষী। সুতরাং কেউ কোনও আমল করে তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করলে আমি আমার অংশও নেই না। বরং পুরোটাই ত্যাগ করি এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই। এই হাদীস থেকে জানা গেল, কেউ যদি কোনও কাজ আল্লাহর জন্য করে, অতঃপর সেই কাজই আবার অন্য কারও জন্য করে, তাহলে তার উপর শিরক সাব্যস্ত হয়ে যায়। এটাও জানা গেল, মুশরিক যে ইবাদত আল্লাহর জন্য করে, সেটাও আল্লাহ কবুল করেন না, বরং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন!

টিকাঃ
৩৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৮৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২০২। ইবনে মাজাহর বর্ণনার শব্দ এমন- '...আমি ঐ আমল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; যাকে সে শরীক করেছে আমলটি তার জন্য হবে'। -অনুবাদক

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 শিরকের ক্ষেত্রে আল্লাহ কাউকেই ছাড় দেন না

📄 শিরকের ক্ষেত্রে আল্লাহ কাউকেই ছাড় দেন না


রূহের জগতে গৃহীত অঙ্গীকার

মুসনাদে আহমাদে হযরত আবুল আলিয়া থেকে বর্ণিত আছে- عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، فِي قَوْلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ: ﴿وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ﴾ الْآيَةَ [الأعراف : ১৭২]، قَالَ : جَمَعَهُمْ فَجَعَلَهُمْ أَزْوَاجًا ، ثُمَّ صَوَّرَهُمْ فَاسْتَنْطَقَهُمْ فَتَكَلَّمُوْা، ثُمَّ أَخَذَ عَلَيْهِمُ الْعَهْدَ وَالْمِيْثَاقَ، وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ، أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ? قَالَ: فَإِنِّي أُشْهِدُ عَلَيْكُمُ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالْأَرَضِينَ السَّبْعَ، وَأُشْهِدُ عَلَيْكُمْ أَبَاكُمْ أَدَمَ أَنْ تَقُوْলُوْا يَوْমَ الْقِيَامَةِ : লَمْ نَعْلَمْ بِهَذَا، اِعْلَمُوا أَنَّهُ لَا إِلَهَ غَيْرِي، وَلَا رَبَّ غَيْرِي، فَلَا تُشْرِكُوا بِيْ شَيْئًا، وَإِنِّي سَأُرْسِلُ إِلَيْكُمْ رُسُلِي، يُذَكِّرُونَكُمْ عَهْدِي وَمِيْثَاقِيْ، وَأُنْزِلُ عَلَيْكُمْ كُتُبِي، قَالُوْا : شَهِدْنَا بِأَنَّكَ رَبُّنَا وَإِلهُنَا ، لَا رَبَّ لَنَا غَيْرُكَ ، وَلَا إِلَهَ لَنَا غَيْرُكَ.

'সূরা আরাফের ১৭২ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত উবাই ইবনে কা'ব রাযি. বলেন, আল্লাহ তাআলা বনী আদমকে একত্র করে তাদেরকে বিভিন্ন দলে ভাগ করেছেন এবং আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর বাকশক্তি দিয়েছেন। তখন তারা কথা বলেছে। এরপর তিনি তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং তাদের নিজেদেরকেই নিজেদের উপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তখন তারা এক বাক্যে উত্তর দিয়েছে- অবশ্যই, আপনিই আমাদের প্রভু! আল্লাহ বললেন- আমি তোমাদের উপর সাত আসমান ও সাত জমিন এবং তোমাদের পিতা আদমকে সাক্ষী রাখছি, যেন কিয়ামতের দিন বলতে না পার যে, আমরা তো এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। সুতরাং জেনে রাখ! আমি ছাড়া কোনও উপাস্য নেই; আমি ছাড়া কোনও প্রতিপালক নেই; আমার সাথে কাউকে শরীক করো না! অতিসত্ত্বর আমি তোমাদের নিকট আমার রাসূলদের পাঠাব, যারা তোমাদেরকে তোমাদের এই অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেবে এবং তোমাদের নিকট আমার কিতাবসমূহ নাযিল করব! তারা বলল- আমরা সাক্ষ্য দিলাম, আপনিই আমাদের প্রভু ও উপাস্য! আপনি ছাড়া আমাদের কোনও প্রভু বা উপাস্য নেই'!

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা সূরা আরাফে ইরশাদ করেছেন- وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ اَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْমَ الْقِيمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ হذی غُفِلِينَ أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ وَ كُنَّا ذُرِّيَّةً মূর্তির بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ 'এবং (হে রাসূল! মানুষকে সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দাও) যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদেরকে বের করেছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী বানিয়েছিলেন (আর জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে) আমি কি তোমাদের রব্ব নই? সকলে উত্তর দিয়েছিল, কেন নয়? আমরা সকলে (এ বিষয়ে) সাক্ষ্য দিচ্ছি, (এবং এ স্বীকারোক্তি আমি এজন্য নিয়েছিলাম) যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পার যে, 'আমরা তো এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম'। কিংবা এরূপ না বল যে, শিরক (-এর সূচনা) তো বহু পূর্বে আমাদের বাপ-দাদাগণই করেছিল, আর আমরা ছিলাম তাদেরই পরবর্তী বংশধর। তবে কি বিভ্রান্ত লোকদের কৃতকর্মের কারণে আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন?'

এ হলো আয়াতের তরজমা। এর ব্যাখ্যায় উবাই ইবনে কা'ব রাযি. বলেন- আল্লাহ তাআলা সমস্ত আদম সন্তানকে এক জায়গায় একত্র করেছেন এবং তাদের মাঝে শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। যেমন- নবীদের এক দল, ওলীদের এক দল, শহীদদের এক দল, নেককারদের এক দল, অনুগতদের এক দল এবং নাফারমানদের এক দল। অনুরূপভাবে কাফেরদেরকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। যেমন- ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, হিন্দু ও অগ্নিপূজক ইত্যাদি। অতঃপর তাদের সকলের আকৃতি বানিয়েছেন। অর্থাৎ দুনিয়াতে প্রত্যেককে যে আকৃতিতে বানানোর ইচ্ছা সেই আকৃতিতেই সেখানে তাদেরকে হাজির করেছেন। কেউ সুশ্রী, কেউ কুশ্রী, কেউ বোবা, কেউ বধির, কেউ অন্ধ ইত্যাদি। তারপর তাদেরকে বাকশক্তি দিয়েছেন।

তারপর সকলকে জিজ্ঞাসা করেছেন- আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তখন সকলেই স্বীকার করেছে যে, আপনি আমাদের প্রতিপালক। এরপর তাদের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, আমি ছাড়া কাউকে প্রতিপালক ও ইলাহ জানবে না এবং আমি ছাড়া কাউকে মানবে না! তখন সকলেই অঙ্গীকার করেছে। আর আল্লাহ তাআলা এ কথার উপর আসমান-জমিন ও হযরত আদমকে সাক্ষী বানিয়েছেন। সাথে বলে দিয়েছেন, এই স্বীকারোক্তি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য নবীগণ আগমন করবে এবং সমূহ কিতাব নাযিল করা হবে।

অতএব প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করেছে এবং শিরককে অস্বীকার করেছে। সুতরাং শিরকের ক্ষেত্রে একে অন্যকে ঢাল বানানো উচিত নয়। না কোনও পীরকে, না কোনও উস্তাদকে, না বাপ-দাদাকে, না কোনও বাদশাকে, না মৌলভীকে, আর না কোনও বুযুর্গকে। কেউ যদি মনে করে, আমরা তো দুনিয়াতে এসে ঐ অঙ্গীকারের কথা ভুলে গিয়েছি, ভুলা কথার গ্রহণযোগ্যতা কী!- তাহলে তার এই ধারণা ভুল। কারণ অনেক কথাই মানুষ নিজে ভুলে যায়, অতঃপর নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিরা বললে বিশ্বাস করে নেয়। যেমন- নিজের মায়ের পেট থেকে জন্ম নেওয়ার কথা স্মরণ থাকে না, কিন্তু মানুষের কাছে শুনে বিশ্বাস করে নেয় এবং নিজের মাকেই মা মনে করে, অন্য কাউকে মা ডাকে না। অতঃপর কেউ যদি নিজের মায়ের হক আদায় না করে বা অন্য কাউকে মা ডাকে, তাহলে সবাই তাকে মন্দ বলে। তখন কেউ যদি এই জবাব দেয় যে, আমার জন্মের কথা তো আমার কিছুই মনে নেই, আমি তাকে মা বলে বিশ্বাস করব কীভাবে? তাহলে সবাই তাকে আহমক ও বেয়াদবই বলবে। সুতরাং যখন জনসাধারণের বলাতে মানুষের অনেক কথা বিশ্বাস হয়ে যায়, তখন নবীদের শান তো অনেক উঁচু, তাদের সংবাদে কেন বিশ্বাস হবে না?!

এই হাদীস থেকে জানা গেল, রূহের জগতেই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককে তাওহীদের আদেশবার্তা ও শিরকের উপর নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। আর সকল নবী-রাসূলগণ সেটারই সমর্থনে আগমন করেছেন এবং সকল আসমানী কিতাব সেটারই বিবরণ নিয়ে নাযিল হয়েছে। সুতরাং এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীর শিক্ষা ও এক শত চারখানা আসমানী কিতাবের ইলমের সারকথা এটাই যে, তাওহীদকে আঁকড়ে ধর, শিরক থেকে দূরে থাক; আল্লাহ ছাড়া কাউকে এমন কর্তৃত্বশীল মনে করবে না যে, কোনও কিছুতে স্বাধীনভাবে কর্তৃত্ব করতে পারে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে মালিক ও প্রতিপালক মনে করবে না যে, তার কাছে নিজের প্রয়োজন কামনা করবে।

টিকাঃ
৩৬. মুসানাদে আহমাদ, হাদীস ২১২৩২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৩২৫৫ (মুসনাদের চেয়ে কিছুটা বিস্তারিত)। হাকেম রহ. বলেছেন- হাদীসটির সনদ সহীহ। তার এই কথার উপর যাহাবী রহ. আপত্তি করেননি। - অনুবাদক
৩৭. নবীদের ও আসমানী কিতাবসমূহের এই সংখ্যা প্রাচীনকাল থেকেই প্রসিদ্ধ। কোনও কোনও মুফাস্সিরও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এর কোনও প্রমাণ বা সূত্র আমাদের জানা নাই। -নদভী

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ

📄 শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ


ফেতনা ও মুসিবতের সময় তাওহীদের আকীদাকে আঁকড়ে ধরে তার উপর অটল থাকা

হযরত মুআয বিন জাবাল রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অসিয়ত করেছেন- لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا وَإِنْ قُتِلْتَ وَحُرِّقْتَ. 'তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় এবং জ্বালিয়ে দেওয়া হয়'!

অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কাউকে মানবে না এবং কোনও জিন বা ভূত ক্ষতি করবে—এই ভয় করবে না! সুতরাং একজন মুসলিম যেমন বাহ্যিক বিপদাপদের উপর সবর করবে এবং কারও ভয়ে নিজের দ্বীনের ক্ষতি করবে না, ঠিক তেমনি জিন-ভূতের ক্ষতির উপরও ধৈর্য ধারণ করবে এবং ভয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করবে না। বরং চিন্তা করবে যে, বাস্তবে তো সবকিছুই আল্লাহর এখতিয়ারাধীন। তবে তিনিই কখনো কখনো বান্দাকে পরীক্ষা করেন এবং খারাপদের হাতে ভালোদেরকে কষ্ট দেন, যেন কাঁচা ও পরিপক্কদের মাঝে পার্থক্য হয়ে যায় এবং মুমিন ও মুনাফেক চিহ্নিত হয়ে যায়।

তাই যেমনিভাবে প্রকাশ্যে ফাসেকদের হাতে মুত্তাকীরা এবং কাফেরদের হাতে মুসলামানরা কষ্ট পায়, তখন নিজের দ্বীন রক্ষার্থে সবর করা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না, ঠিক তেমনি কখনো কখনো আল্লাহর ইচ্ছায় জিন-শয়তানদের হাতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনও ধৈর্যধারণ করতে হবে। কিছুতেই তাদের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। এই হাদীস থেকে বোঝা গেল, কোনও ব্যক্তি যদি শিরকবিমুখ হয়ে অন্যদের আনুগত্য ছেড়ে দেয়, তাদের নামে কুরবানী-মানত করাকে ঘৃণা করে, গলদ রসম-রেওয়াজকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে এবং এসব করতে গিয়ে তার জান-মাল ও সন্তানদের কোনও ক্ষতি হয়, কিংবা কোনও পীর-শহীদের নামে কোনও শয়তান ক্ষতি সাধন করে তাহলে সেক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। আর মনে করবে যে, আল্লাহ আমার দ্বীনদারীর পরীক্ষা নিচ্ছেন। যেমনি আল্লাহ তাআলা জালিমদেরকে ঢিল দিয়ে পরে পাকড়াও করেন এবং মজলুমদেরকে তাদের হাত থেকে রেহাই দেন, তেমনি জালিম জিনদেরকেও আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত সময়ে পাকড়াও করবেন এবং নেককারদেরকে তাদের অনিষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন।

টিকাঃ
৩৮. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২০৭৫। -অনুবাদক

📘 তাকবিয়াতুল ঈমান তাওহীদের পয়গাম 📄 শাফায়াত সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদা এবং তার খণ্ডন

📄 শাফায়াত সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদা এবং তার খণ্ডন


মনিব বিনে অন্য কারও দ্বারস্থ হওয়া গোলামের আত্মমর্যাদাহীনতা ও অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বর্ণনা করেন- قَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُوْلَ اللهِ ، أَيُّ الذَّنْبِ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ? قَالَ : أَنْ تَدْعُوَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ. 'এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল- হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? আল্লাহর রাসূল উত্তরে বললেন- আল্লাহর কোনও সমকক্ষ বা শরীক সাব্যস্ত করা অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন (এটা সবচেয়ে বড় গুনাহ)'।

অর্থাৎ আল্লাহর ব্যাপারে যেমন বিশ্বাস কর যে, তিনি সর্বত্র হাজির-নাযির এবং সকল বিষয় তাঁরই এখতিয়ারাধীন, তেমনি বিপদাপদের সময়ও এই বিশ্বাস রেখে তাঁকেই ডাকবে। এরূপ বিশ্বাস রেখে অন্য কাউকে ডাকা যাবে না, কারণ তা সবচেয়ে বড় গুনাহ। কারণ প্রথমত, এই ধারণাই সম্পূর্ণ ভুল যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হাজত পূরণের ক্ষমতা রাখে বা সর্বত্র হাজির-নাযির। দ্বিতীয়ত, আমাদের স্রষ্টা যেহেতু আল্লাহ তাআলা- তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাই আমাদের কর্তব্য হলো, নিজেদের সকল প্রয়োজনে তাঁকেই ডাকব; তাঁরই নিকট প্রার্থনা করব; অন্য কাউকে দিয়ে আমরা কী করব?!

যেমন- কেউ যদি এক বাদশার গোলাম হয়ে যায়, তাহলে সে তার সকল কাজকে ঐ বাদশার অধীন করে রাখে। অন্য কোনও বাদশার দ্বারস্থ হয় না। আর কোনও মুচির দ্বারস্থ হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না!

তাওহীদবাদী গুনাহগার তাওবা করে আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারে, কিন্তু ইবাদতগুযার মুশরিক তা পারে না।

জামে তিরমিযীতে হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ، ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا، لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً. 'আল্লাহ তাআলা বলেন- হে আদমসন্তান! যদি তুমি পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও এবং আমার সাথে কাউকে শরীক না করে থাক, তাহলে আমি পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হব'!

অর্থাৎ এই দুনিয়াতে সকল গুনাহগাররা গুনাহ করেছে। ফেরাউন-হামান এই দুনিয়াতেই ছিল। বরং শয়তানও তো এই দুনিয়াতেই আছে। এখন মনে কর, এই সকল গুনাহগাররা যত গুনাহ করেছে, এক ব্যক্তিই ঐ পরিমাণ গুনাহ করল, কিন্তু সে শিরক থেকে বেঁচে থাকল, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার যত পরিমাণ গুনাহ আছে তত পরিমাণ ক্ষমা করবেন! এ হাদীস থেকে বোঝা গেল, তাওহীদের বরকতে সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়, যেমন শিরকের কারণে সকল নেক কাজ নষ্ট হয়ে যায়।

সত্য কথা হলো, শিরক থেকে যখন মানুষ পবিত্র হয়ে যায়- আল্লাহকে ছাড়া কাউকে মালিক মনে করে না এবং তিনি ছাড়া আর কাউকে আশ্রয়স্থল জ্ঞান করে না, তার অন্তরে এ কথা বদ্ধমূল থাকে যে, তাঁর হকে ত্রুটিকারী পলায়ন করে অন্য কোথাও আশ্রয়স্থল পায় না। তাঁর বিপরীতে কারও জোর খাটে না। তাঁর সামনে কারও সহযোগিতা চলে না এবং নিজ এখতিয়ারে কেউ কারও জন্য সুপারিশও করতে পারে না। যখন এ কথাগুলো তার মন-মস্তিষ্কে ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়ে যাবে, তখন যত গুনাহ তার থেকে প্রকাশ পাবে, সেটা হয়তো মানবীয় দুর্বলতার কারণে হবে কিংবা ভুলে হবে এবং এসব গুনাহের ভয় সর্বদা তার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। সে এসব গুনাহের কারণে এতটা লজ্জিত ও পেরেশান হবে যে, জীবন থেকেই অতিষ্ঠ হয়ে যাবে।

সন্দেহ নেই, গুনাহের কারণে এমন পেরেশানীর হালত যত বাড়বে, আল্লাহর রহমতও তত বাড়বে। সুতরাং যে ব্যক্তি পূর্ণ তাওহীদের অধিকারী, তার গুনাহও এমন ভূমিকা কাজ করে যা অন্যদের ইবাদত করতে পারে না। তাওহীদপন্থি ফাসেক, শিরককারী মুত্তাকী থেকে হাজার গুণ উত্তম। যেমন অনুগত দোষী প্রজা চাটুকার বিদ্রোহী থেকে অনেক ভালো। কারণ অনুগত ব্যক্তি তার ত্রুটির উপর লজ্জিত, আর বিদ্রোহী তার কর্মের উপর গর্বিত!

টিকাঃ
৩৯. সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৮৬১, ৭৫৩২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৩৬১২। -অনুবাদক
৪০. যারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে- তার মধ্যে লাভ-ক্ষতি এবং দেওয়া ও ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে, শাইখ আবদুল কাদের জিলানী রহ. অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় তাদের ভর্ৎসনা করেছেন। তিনি বলেন- 'তোমরা যারা আল্লাহ ও তাঁর সিদ্দীক বান্দাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ এবং মাখলুকের প্রতি মনোনিবেশ করে তাদেরকে অংশীদার সাব্যস্ত করে রেখেছ! আর কতদিন তাদের প্রতি আত্মনিয়োগ করে থাকবে? তারা তোমাদের কী উপকার করে? তাদের হাতে তো লাভ-ক্ষতি কিংবা দেওয়া- নেওয়ার কোনও ক্ষমতাই নেই! লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় তাদের মাঝে আর অন্যান্য জড়বস্তুর মাঝে কোনও পার্থক্য নেই! মালিক একজনই; ক্ষতিসাধনকারী একজনই; উপকারকারীও একজনই; আনন্দিত করা ও শান্তি দান করার ক্ষমতাও একজনের হাতেই; ক্ষমতাপ্রদানকারী এবং বশীভূতকারী একজনই; দান করেন এবং বঞ্চিত করেন একজনই; সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা তো কেবল এক আল্লাহই'! (আল ফাতহুর রব্বানী, ১৩তম মজলিস)। -নদভী
৪১. জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৪০। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হাদীসের এই অংশটি সহীহ মুসলিম (হাদীস ২৬৮৭)-সহ অন্যান্য গ্রন্থে হযরত আবূ যর রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। -অনুবাদক

ফন্ট সাইজ
15px
17px