📄 শিরক ও অন্যান্য গুনাহের মাঝে মৌলিক পার্থক্য
অর্থাৎ মানুষ আল্লাহকে ভুলে অনেক গুনাহই করে থাকে। যেমন- হালাল-হারামের মাঝে ভেদাভেদ না করা, চুরি বা অন্য কোন অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া, নামায-রোযা ছেড়ে দেওয়া, পরিবার-পরিজনের হক নষ্ট করা, মা-বাবার সাথে বেয়াদবি করা ইত্যাদি। কিন্তু যে শিরকে লিপ্ত হয় সে সবচেয়ে বড় পাপী। কারণ সে এমন পাপে লিপ্ত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তা কখনোই ক্ষমা করবেন না। অন্য সব গুনাহ আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দেবেন।
এ আয়াত থেকে বোঝা গেল, শিরকের গুনাহ মাফ করা হবে না। এর যে নির্ধারিত শাস্তি আছে তা ভোগ করতেই হবে।
টিকাঃ
২৯. শিরকের গুনাহ মাফ করা হবে না-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যদি তাওবা না করে মারা যায়, তাহলে শিরকের গুনাহ মাফ করা হবে না। কিন্তু যদি মৃত্যুর পূর্বে যথাযথ পন্থায় শিরক থেকে তাওবা করে নেয়, তাহলে নিশ্চয়ই মাফ করে দেওয়া হবে। -অনুবাদক
📄 প্রকাশ্য শিরক খোদাদ্রোহিতার শামিল, যা আল্লাহর আত্মসম্মানবোধকে নাড়া দেয়
অতঃপর শিরক যদি চূড়ান্ত পর্যায়ের হয়, যা দ্বারা মানুষ কাফের হয়ে যায় তাহলে তার শাস্তি হলো, সে চিরকাল দোযখে থাকবে- কখনো বের হতে পারবে না। আর যদি এরচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হয় তাহলে তার জন্য আল্লাহর নিকট নির্ধারিত শাস্তি ভোগ করবে। এছাড়া অন্যান্য যেসব গুনাহ আছে, সেগুলোর যে শাস্তি আল্লাহর নিকট নির্ধারিত রয়েছে সেক্ষেত্রে আল্লাহর মর্জি- চাইলে শাস্তি দেবেন আর চাইলে মাফ করে দেবেন। সুতরাং বোঝা গেল যে, শিরক থেকে বড় কোনও গুনাহ নেই।
এর উদাহরণ হলো, প্রজারা বাদশার রাজত্বে বিভিন্ন অন্যায়- অপরাধ করে থাকে। যেমন- চুরি-ডাকাতি করা; চৌকি পাহারার সময় ঘুমিয়ে যাওয়া; রাজকীয় সভার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না হওয়া; যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া; সরাকারি অর্থ পৌঁছাতে অবহেলা করা ইত্যাদি। বাদশার নিকট এই সকল অপরাধের নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে। তবে তিনি চাইলে পাকড়াও করেন আর চাইলে ক্ষমা করে দেন।
এগুলোর বিপরীতে আরেকটি অপরাধ হলো এমন যা দ্বারা বিদ্রোহ প্রকাশ পায়। যেমন- কোন গভর্নর-মন্ত্রী-আঞ্চলিক নেতা বা কোন চামারের হাতে আনুগত্যের শপথ করে তাকে বাদশা ঘোষণা করে, তার জন্য সিংহাসন ও মুকুট তৈরি করে, তার সাথে রাজকীয় উপাধি ব্যবহার করে, তার জন্য রাজকীয় অনুষ্ঠান ঘোষণা করে এবং তাকে শাহী উপঢৌকন পেশ করে-তো এই অপরাধটি সকল অপরাধ থেকে বড় গণ্য হবে এবং এর নির্ধারিত শাস্তি তাকে ভোগ করতেই হবে।
আর যে বাদশা এই অপরাধের শাস্তি দিতে অবহেলা করে, বুঝতে হবে তার বাদশাহীর মধ্যেই ত্রুটি আছে। ফলে বুদ্ধিমান লোকেরা এমন বাদশাকে আত্মমর্যাদাহীন বলে।
অতএব বাদশাদের বাদশা সর্বশক্তিমান খোদাকে ভয় করা দরকার, যিনি সর্বাধিক আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। এ কথা কল্পনাও করা যায় না যে, তিনি শিরককারীদের ব্যাপারে বেখবর থাকবেন; তাদেরকে শাস্তি দেবেন না! আল্লাহ সকল মুসলিমদের উপর রহম করুন এবং শিরকের মুসিবত থেকে তাদেরকে হেফাজত করুন!
টিকাঃ
৩০. হিন্দুস্তানী রাজা-বাদশারা নির্দিষ্ট কিছু দিনে অনুষ্ঠান পালন করত। এসব দিনে বাদশা ফকির-মিসকীনদেরকে দান-খয়রাত করত। এই দিনগুলোর মধ্যে একদিন সিংহাসনে বসত এবং স্বর্ণ-রূপা দ্বারা তাকে পরিমাপ করে সেই স্বর্ণ- রূপা গরিবদের মাঝে বণ্টন করা হত! ঐ দিন দ্বারা তারিখ নির্ধারণ করা হত, বলা হত- সিংহাসনে আরোহণের বছর! এজাতীয় অনুষ্ঠান বাদশাহীর প্রতীক ও বড়ত্ব-মহত্ত্বের নিদর্শনে পরিণত হয়েছিল। এই অনুষ্ঠান কেবল সিংহাসন- অধিপতির সাথেই খাস ছিল; কোন প্রজাসাধারণ এতে তার সাথে সম-শরীক হতে পারত না। -নদভী
৩১. হিন্দুস্তানে মোঘল ও মোঘলদের বাইরে অন্যান্য সম্রাটদেরও রীতি ছিল যে, আমীর, শাহী মহলের ব্যক্তিবর্গ ও প্রজাদের মধ্যে বিশিষ্টজনেরা সম্রাটদেরকে নগদ উপঢৌকন পেশ করত এবং তা ডান হাতের তালুতে রেখে বিশেষ পন্থায় উপস্থাপন করত। অতঃপর সম্রাট তা গ্রহণ করে বা তার উপর কেবল হাত রেখে তাদের নিকট আবার ফিরিয়ে দিত। তখন তারা তা দ্বারা বরকত হাসেল করত এবং নিজেদের জন্য বড় সৌভাগ্য বিবেচনা করত! এর নাম দেওয়া হয়েছিল 'নযর'। এটাকে রাজত্বের প্রতীক এবং প্রজাদের ভালোবাসা ও সম্মানের নিদর্শন গণ্য করা হত। -নদভী
📄 আল্লাহর আত্মমর্যাদাবোধ এবং ক্রোধ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের সাক্ষ্য
শিরক চরম জুলুম এবং কোনও বস্তুকে অপাত্রে রাখার শামিল
সূরা লুকমানে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَإِذْ قَالَ لُقْمُنُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعִظُهُ يَبْنَى لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشَّরْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ 'এবং (সেই সময়কে) স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশচ্ছলে বলেছিল, হে বাছা! আল্লাহর সাথে শিরক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম'।
আল্লাহ তাআলা হযরত লুকমানকে প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা দান করেছিলেন। তাই তিনি বুঝেছিলেন, একের হক অপরকে দেওয়া চরম অন্যায়। আর যে আল্লাহর হক তাঁর কোনও মাখলুককে দিল, সে মূলত সবচেয়ে মহান সত্তার হক অতিক্ষুদ্র সত্তাকে দিল। এর উদাহরণ অনেকটা এমন, যেন কেউ বাদশার মুকুট নিয়ে কোন মুচির মাথায় পরিয়ে দিল- তো এরচেয়ে বড় বেইনসাফি এবং অন্যায় আর কী হতে পারে! আর নিশ্চিতভাবে জেনে রাখা দরকার, ছোট-বড় সকল মাখলুক আল্লাহর মহত্ত্ব-বড়ত্বের সামনে একজন মুচির চাইতেও ক্ষুদ্র ও অতিতুচ্ছ।
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হলো যে, শরীয়ত দ্বারা যেমন এ কথা জানা যায় শিরক সবচেয়ে বড় গুনাহ, তেমনি আকল ও যুক্তি দ্বারাও উপলব্ধি করা যায় শিরক সকল অপরাধের চেয়ে বড় অপরাধ। এ জন্যই তো মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় দোষ হলো, বড়দের সাথে বেয়াদবি করা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَمَا أَرْসَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ 'আমি তোমার পূর্বে এমন কোনও রাসূল পাঠাইনি, যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করিনি যে, 'আমি ছাড়া অন্য কোনও মাবুদ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর'।
অর্থাৎ যত নবী আগমন করেছেন সকলে এই বার্তাই নিয়ে এসেছেন যে, একমাত্র আল্লাহকে মান, অন্য কাউকে মানবে না। এ আয়াত থেকে জানা গেল, শিরক থেকে বাঁচা ও তাওহীদকে আঁকড়ে ধরাই হলো নাজাতের একমাত্র পথ। এছাড়া সবই হলো পথভ্রষ্টতা।
টিকাঃ
৩২. সূরা লুকমান, ১৩
৩৩. হযরত শাইখ আবদুল কাদের জিলানী রহ. (মৃ. ৫৬১হিজরী), যাঁর বেলায়াত ও বুযুর্গির ব্যাপারে দল-মত নির্বিশেষে পুরো মুসলিম উম্মাহ একমত, তিনি অত্যন্ত হাকীমানা একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন এবং যারা বালা-মুসিবত দূর করার জন্য বা কোনও উপকার লাভের জন্য গাইরুল্লাহর দ্বারস্থ হয়, তাদের নির্বুদ্ধিতাকে সূক্ষ্মভাবে চিত্রায়ণ করেছেন। তিনি বলেন- সকল মাখলুককে ঐ ব্যক্তির মত মনে কর, বিশাল রাজত্ব ও কর্তৃত্ব এবং বিরাট প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী কোনও বাদশা যার হাত বেঁধে গলায় ও পায়ে বেড়ি পরিয়েছে। অতঃপর বিশাল ও সুগভীর ঢেউবিশিষ্ট একটি স্রোতঃস্বিনী নদীর তীরে একটি সিডার বৃক্ষে তাকে শূলে চড়িয়েছে। এরপর বাদশা এমন এক শানদার ও উঁচু সিংহাসনে আরোহণ করেছে যার ধারেকাছে কারও পৌঁছা সম্ভব না। আর নিজের আশপাশে তীর-বর্শা ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রের এত বিশাল ভাণ্ডার জমা করেছে যার কোনও ইয়ত্তা নেই। তারপর এসব অস্ত্রের মধ্য থেকে যেটা চায় তার দিকে নিক্ষেপ করে- এখন কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর জন্য কি এটা সমীচীন হবে যে, এই বাদশার ভয় ও আশা ত্যাগ করে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং ঐ শূলে চড়ানো ব্যক্তিকে ভয় করবে ও তার কাছে আশা করবে?! কেউ এমন করলে সে কি আকলের আদালতে নির্বোধ ও পাগল সাব্যস্ত হবে না? (ফুতুহুল গাইব, ১৭তম মাকালা)। -নদভী
৩৪. সূরা আম্বিয়া, ২৫
📄 নবীজীর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে আল্লাহর অংশীদারিত্বের সম্পর্ক নেই
আল্লাহ তাআলা কেবল ইখলাসপূর্ণ আমলই কবুল করেন, যেখানে অন্য কারও অংশ নেই
সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيْهِ مَعِي غَيْرِي، تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ. 'আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- শরীকদের মধ্যে আমিই শিরক থেকে সর্বাধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি কোনও আমল করে এবং তাতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, তবে আমি তাকে তার শিরকসহ প্রত্যাখ্যান করি'!
অর্থাৎ যেভাবে অন্যরা নিজেদের যৌথ বস্তুকে পরস্পরের মাঝে বণ্টন করে নেয় আমি তেমন করি না। আমি অমুখাপেক্ষী। সুতরাং কেউ কোনও আমল করে তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করলে আমি আমার অংশও নেই না। বরং পুরোটাই ত্যাগ করি এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই। এই হাদীস থেকে জানা গেল, কেউ যদি কোনও কাজ আল্লাহর জন্য করে, অতঃপর সেই কাজই আবার অন্য কারও জন্য করে, তাহলে তার উপর শিরক সাব্যস্ত হয়ে যায়। এটাও জানা গেল, মুশরিক যে ইবাদত আল্লাহর জন্য করে, সেটাও আল্লাহ কবুল করেন না, বরং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন!
টিকাঃ
৩৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৮৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২০২। ইবনে মাজাহর বর্ণনার শব্দ এমন- '...আমি ঐ আমল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; যাকে সে শরীক করেছে আমলটি তার জন্য হবে'। -অনুবাদক