📄 ৪. দাসত্ব ও নতিস্বীকারনির্দেশক তাযীমসমূহ আল্লাহর সাথে খাস
চতুর্থ বিষয়, আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের শিখিয়েছেন- দুনিয়াবী কাজ-কর্মে আল্লাহকে স্মরণ রাখবে এবং তাঁর প্রতি তাযীম প্রকাশ করবে। এতে ঈমান ঠিক থাকবে এবং কাজে বরকত হবে।
যেমন- কঠিন কাজে আল্লাহর জন্য মানত করা; বিপদাপদে তাঁকে ডাকা; তাঁর নামে প্রতিটি কাজ শুরু করা; সন্তান জন্ম নিলে তাঁর শোকর আদায়ের লক্ষ্যে পশু জবাই করা এবং তার নাম 'আবদুর রহমান', 'আবদুল্লাহ', 'আতাউল্লাহ', 'খোদাবখশ' (হেবাতুল্লাহ), কন্যা হলে 'আমাতুল্লাহ' বা 'আতিয়্যাতুল্লাহ' ইত্যাদি রাখা।
অনুরূপভাবে ক্ষেতের ফসল ও বাগানের ফলফলাদির কিছু অংশ তাঁর নামে রেখে দেওয়া; সম্পদ ও পশু-পালের কিছু অংশ তাঁর নামে উৎসর্গ করা; তাঁর নামে যে পশুকে তাঁর ঘরাভিমুখে নিয়ে যাওয়া হয় তার বিশেষ আদব রক্ষা করা, অর্থাৎ তার উপর আরোহণ বা বোঝা বহন না করা; পানাহারের ক্ষেত্রে তাঁর হুকুম অনুসরণ করা, অর্থাৎ যেগুলোর আদেশ করেছেন সেগুলো করা এবং যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকা; দুনিয়াতে যত কল্যাণ-অকল্যাণ আছে, যেমন- সুস্থতা-অসুস্থতা, প্রাচুর্য ও দুর্ভিক্ষ, জয়-পরাজয়, উন্নতি-অবনতি, আনন্দ-বেদনা- এ সবকিছুকে তাঁরই এখতিয়ারভুক্ত মনে করা।
নিজের কোনও ইচ্ছা প্রকাশ করতে হলে প্রথমে তাঁর ইচ্ছার কথা উল্লেখ করা, যেমন- ইনশাআল্লাহ বা আল্লাহ চাইলে আমরা অমুক কাজটি করব; তাঁর নাম এমন ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে নেওয়া, যেন তা থেকে তাঁর প্রভুত্ব ও নিজের গোলামীর অবস্থা প্রকাশ পায়, যেমন এভাবে বলা যে- আমাদের রব, আমাদের মালিক, আমাদের সৃষ্টিকর্তা; যখন কথাবার্তায় কসম খাওয়ার প্রয়োজন হবে তখন তাঁরই নামে কসম খাওয়া ইত্যাদি। এসব জিনিস আল্লাহ তাআলা স্বীয় তাযীমের জন্য বাতলিয়েছেন।
সুতরাং কেউ যদি কোনও নবী-ওলী, ইমাম-শহীদ বা ভূত-পরীদের প্রতি এরূপ সম্মান প্রদর্শন করে, যেমন- কঠিন কাজে তাদের নামে মানত করে; বিপদাপদে তাদেরকে ডাকে; বিসমিল্লাহর জায়গায় তাদের নামে কাজ শুরু করে; সন্তান হলে তাদের নামে প্রাণী উৎসর্গ করে; সন্তানের নাম 'আবদুন নবী', 'ইমামবখশ' বা 'পীরবখশ' রাখে; ফসল ও বাগানে তাদের নামে অংশ বরাদ্দ দেয়; ফল-ফসল ঘরে আসলে প্রথমে তাদের নামে উৎসর্গ করে অতঃপর নিজেরা ব্যবহার করে; সম্পদ ও পশু-পাল থেকে কিছু তাদের নামে বরাদ্দ করে সেগুলোর সাথে বিশেষ আদব রক্ষা করে, যেমন- দানা-পানি থেকে কখনো বারণ করে না এবং লাকড়ি বা পাথর দ্বারা কখনো আঘাত করে না।
অনুরূপভাবে পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রসম-রেওয়াজকে আঁকড়ে থাকে, যেমন- অমুক খাবার বা পোশাক অমুক শ্রেণির লোকদের জন্য নিষিদ্ধ; বীবী ফাতেমার নামে²⁶ পাকানো খাবার—পুরুষ, দাসী ও দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ নারীদের জন্য নিষিদ্ধ; শাহ আবদুল হকের²⁷ নামে পাকানো খাবার—হুক্কাখোরদের জন্য নিষিদ্ধ প্রভৃতি। দুনিয়াতে যে ভালো-মন্দ ঘটে সেগুলোকে এসব পীর-মাশায়েখদের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে এবং বলে থাকে, অমুকের উপর অমুক পীর সাহেবের অভিশাপ লেগেছে বিধায় পাগল হয়ে গেছে, কিংবা অমুক বুযুর্গ তাড়িয়ে দেওয়ার কারণে অমুক ব্যক্তি গরিব হয়ে গেছে আর অমুককে দান করার ফলে তার উন্নতি-অগ্রগতির রাস্তা খুলে গেছে; অমুক তারকার কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে; অমুক কাজটি অমুক দিন বা অমুক মুহূর্তে শুরু করার কারণে পূর্ণ হলো না।
আরও বলে থাকে- আল্লাহ ও তাঁর রাসূল চাইলে আমি আসব, পীর সাহেব চাইলে কাজটি হয়ে যাবে অথবা পীর-মাশায়েখদের ব্যাপারে বলে- 'হে মাবুদ', 'দাতা', 'খোদাদের খোদা', 'রাজত্বের অধিকারী', 'শাহেনশাহ'!; কসম খাওয়ার সময় নবী, আলী রাযি., ইমাম, পীর বা তাদের কবরের কসম খায় ইত্যাদি। এই সকল জিনিস দ্বারা শিরক সাব্যস্ত হয়। এটাকে শিরক ফিল ‘আদাত বা অভ্যাসগত শিরক বলে। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাসগত কাজ-কর্মে আল্লাহ তাআলার প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করার কথা, অনুরূপ সম্মান অন্যের জন্য করা।
টিকাঃ
২৫. এখানে গ্রন্থকার তাওহীদ ও সহীহ আকীদা থেকে উৎসারিত কিছু হিন্দুস্তানী নাম উল্লেখ করেছেন, যেমন- 'খোদাবখশ' ও 'আল্লাহ্ দিয়া' মানে আল্লাহপ্রদত্ত বা আল্লাহর দান (আরবীতে হেবাতুল্লাহ বা আতাউল্লাহ), কন্যা হলে 'আল্লাহ্দী' মানে আল্লাহপ্রদত্ত (আরবীতে আতিয়্যাতুল্লাহ)। পাঠকদের সুবিধার্থে আমরা নামগুলোকে আরবীতে রূপান্তরিত করে দিয়েছি। -নদভী
২৬. এটা এক ধরনের খাবার যা হিন্দুস্তানে হযরত ফাতেমা রাযি.-এর নামে পাকানো হয়। এই খাবার কেবল নারীদের জন্য। পুরুষরা এটা খেতে পারে না এবং এর কাছেও যেতে পারে না। -নদভী
২৭. এ দ্বারা উদ্দেশ্য- হিন্দুস্তানের চিশতিয়্যাহ তরীকার ইমাম ও বড় শাইখ হযরত আবদুল হক রুদুলভী রহ.। তিনি উধের অন্তর্গত রুদুলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাওহীদের হেফাজত, শরীয়তের প্রতি শ্রদ্ধা, ফরয ও সুন্নতের পাবন্দী, মানুষকে আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত এবং (আল্লাহর ধ্যানে) একাকিত্ব অবলম্বনের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল অনেক উঁচু। তিনি ৮৩৬ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। (তাঁর জীবনীর জন্য দ্রষ্টব্য- নুযহাতুন খাওয়াতির, ৩/২২৯- অনুবাদক) হিন্দুস্তানের মূর্খ ও সীমালঙ্ঘনকারীরা তাঁর নামে এক বিশেষ খাবার আবিষ্কার করেছে, যার নাম দিয়েছে 'শাহ আবদুল হকের তোশা বা পাথেয়'। এটা ময়দা ও চিনি দিয়ে বানানো হয়। এর বেশকিছু আদব ও নিয়মনীতি আছে, যেগুলো অত্যন্ত কঠোরতার সাথে রক্ষা করা হয়। -নদভী