📄 লেখকের জীবনী
লেখকের জীবনী
-হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.
মুজাহিদে ইসলাম শাইখ আল্লামা ইসমাঈল শহীদ ইবনে আবদুল গনী ইবনে ওলীউল্লাহ ইবনে আবদুর রহীম উমরী দেহলভী। মেধা, বিচক্ষণতা, সাহস, হিম্মত ও দ্বীনের ব্যাপারে অবিচলতা ও আপোষহীনতার ক্ষেত্রে তিনি দুনিয়ার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
তিনি ১১৯৩ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়ালে দিল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তার পিতা ইন্তিকাল করেন। ফলে তিনি চাচা শাইখ আবদুল কাদের ইবনে ওলীউল্লাহ দেহলভীর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন এবং তার কাছেই পাঠ্যতালিকার কিতাবাদি পড়েন। অনুরূপভাবে অপর দুই চাচা শাইখ রফীউদ্দীন ও শাইখ আবদুল আযীযের কাছ থেকেও পরিপূর্ণভাবে উপকৃত হয়েছেন এবং দীর্ঘকাল তাদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। ফলত তিনি আকলী ও নকলী উভয় ইলমে অথৈ সাগরে পরিণত হন।
অতঃপর তিনি ইমাম শহীদ সাইয়্যেদ আহমাদ ইবনে ইরফান বেরেলভী রহ.-এর সান্নিধ্য গ্রহণ করেন এবং তার কাছ থেকে তাসাওউফের দীক্ষা লাভ করেন। ১২৩৭ হিজরীতে তার সাথে হারামাইনের সফরে যান এবং হজ্জ ও যিয়ারত শেষ করে তার সাথেই হিন্দুস্তানে ফিরে আসেন। এসে তার নির্দেশে (দ্বীনী দাওয়াতের উদ্দেশ্যে) দুই বছর বিভিন্ন শহর-উপশহর-গ্রাম চষে বেড়ান। তখন তার কাছ থেকে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয়।
তারপর ১২৪১ হিজরীতে সীমান্তবর্তী এলাকায় সফর করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেন। তিনি সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদের উজির ও উপদেষ্টার মত ছিলেন। সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করতেন এবং বড় বড় যুদ্ধে নিজেও অংশগ্রহণ করতেন। পরিশেষে ইয়াগিস্তানের বালাকোটে শাহাদাত বরণ করেন।
তিনি ছিলেন যামানার বিস্ময় এবং এক বিরল প্রতিভা। ছিলেন ভেতরে-বাহিরে আল্লাহমুখী, তালীম ও ইবাদতে সদা মশগুল, বিনয়ী ও সজ্জন, মহৎ ও পবিত্র, সাহসী ও দ্বীনী বিষয়ে অনড়, শুদ্ধভাষী ও জ্বালাময়ী বক্তা। কোনও সংশয়বাদী বা বিচ্যুত স্বভাবের লোক তার সাথে যখন বসত, তিনি তার জাদুময়ী বয়ান দ্বারা আগুন-পানিকে একাকার করে দিতেন। ফলে ওই ব্যক্তি প্রস্থানের সময় তার কাছ থেকে সন্তুষ্টচিত্তে বিদায় নিত।
সমসাময়িক লোকদের সাথে তার কিছু গণ্ডগোল হয়েছিল এবং তার ব্যাপারটি একটি বহুলালোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। তাকে কেন্দ্র করে তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে বেশকিছু ফেতনা হয়েছে। তার ব্যাপারে লোকেরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আরেকদল তার শানে বাড়াবাড়ি করেছে। আর প্রত্যেক কালজয়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
শাইখ মুহসিন ইবনে ইয়াহইয়া তুরহাতী 'আল-ইয়ানিউল জানী' গ্রন্থে বলেন- তিনি ছিলেন আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর, সুন্নাহ রক্ষায় আপোষহীন। সুন্নাহর প্রতি দাওয়াত দিতেন, সুন্নাহ পরিত্যাগ করলে রাগ করতেন এবং বিদআত ও বিদআতীদের কঠোর সমালোচনা করতেন।
'আল-হিত্তাহ বিযিকরিস সিহাহিস সিত্তাহ' গ্রন্থে শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভীর আলোচনা করতে গিয়ে সিদ্দীক হাসান খান কন্নৌজী বলেন- তার নাতী মৌলভী মুহাম্মাদ ইসমাঈল শহীদ কথায় ও কর্মে তার দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন এবং দাদার অসমাপ্ত কাজ আঞ্জাম দিয়ে তার দায়িত্ব আদায় করেছেন। আল্লাহ তাআলা তার নেক কাজের উত্তম পুরস্কার দান করুন। তিনি ইসলামে কোনও নতুন পন্থা আবিষ্কার করেননি, যেমনটি মূর্খরা মনে করে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتٰبَ وَ الْحُكْمَ وَ النُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُوْنِ اللهِ وَ لكِنْ كُونُوا رَبّٰنِّينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَبَ وَ بِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُونَ
'কোনও মানুষের জন্য সঙ্গত নয় যে, আল্লাহ তাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করবেন আর সে তা সত্ত্বেও মানুষকে বলবে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার বান্দা হয়ে যাও। এর পরিবর্তে (সে তো এটাই বলবে যে,) তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও, তোমরা যে কিতাব শিক্ষা দাও ও যা-কিছু নিজেরা পড়, তার ফলস্বরূপে'।
তিনি অনেক মৃত সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং অনেক শিরক ও বিদআতকে নির্মূল করেছেন। পরিশেষে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন এবং আকাঙ্খার চূড়ান্ত শিখরে উপনীত হয়েছেন।
টিকাঃ
৫. সূরা আলে ইমরান, ৭৯
📄 রচনাবলি
রচনাবলি
তিনি বেশকিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার হলো 'আস-সিরাতুল মুস্তাকীম'। ফারসী ভাষায় রচিত এই গ্রন্থে মূলত তার শাইখ সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদের বাণী ও আমল সংকলন করেছেন। এতে দুটি অধ্যায় রয়েছে তার শাগরেদ শাইখ আবদুল হাই ইবনে হেবাতুল্লাহ সিদ্দীকী বুরহানভী রচিত।
২. 'ইযাহুল হাক্কিস সরীহ ফী আহকামিল মাওতা ওয়াদ্বরীহ'। এতে সুন্নাত-বিদআতের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।
৩. 'মানসাবে ইমামাত'। নবুওয়াত ও ইমামাতের মাকাম ও মানসিবের তাহকীকে অদ্বিতীয় একটি কিতাব।
৪. 'মাবহাসু ইমকানিন নাযীরি ওয়ামতিনা'ঈন নাযীর' (পুস্তিকা)। এগুলো সবই ফারসী ভাষায় রচিত।
৫. উসূলে ফিকহ বিষয়ে একটি আরবী মুখতাসার।
৬. রদ্দুল আশরাকি ওয়াল বিদা'। আরবী রিসালাটি দুটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন।
৭. তানবীরুল আইনাইন ফী ইসবাতি রফঈল ইয়াদাইন (আরবী)।
৮. সিলকে নূর (উর্দু)। বিবিধ বিষয়ে।
৯. তাকবিয়াতুল ঈমান। উর্দু ভাষায় তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এটা মূলত 'রদ্দুল আশরাকি ওয়াল বিদা' গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।
১০. 'আবাকাত'। দর্শন ও হিকমত শাস্ত্রে রচিত। এতে তার মেধা ও এই শাস্ত্রে তার সক্ষমতা ফুটে উঠেছে।
স্যার সাইয়্যেদ আহমাদ খান 'আসারুস সানাদীদ' গ্রন্থে বলেন- তিনি মানতিক শাস্ত্রে একটি পুস্তিকা রচনা করেন, যাতে তার দাবি ছিল যে, শাক্লে রাবে' হলো সবচেয়ে সহজবোধ্য আর শাক্লে আউয়াল তার বিপরীত। এই দাবির স্বপক্ষে তিনি এমনসব দলীল হাজির করেছেন, সমসাময়িকদের মধ্যে কেউ সেগুলো খণ্ডন করার সাহস করেনি।
টিকাঃ
৬. মাওলানা সাইয়্যেদ মানাযির আহসান গীলানী রহ. একই নামে এর উর্দু অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে এই অনুবাদটি পাওয়া যায়। অনলাইনে এর পিডিএফও সহজলভ্য। -অনুবাদক
📄 মৃত্যু
মৃত্যু
১২৪৬ হিজরীর ২৪ যিলকদে বালাকোট রণাঙ্গনে তিনি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতবরণ করেন। তার কবর সেখানে সুপরিচিত।
টিকাঃ
৭. আল্লামা সাইয়্যেদ আবদুল হাই হাসানী রহ-এর 'নুযহাতুল খাওয়াতির ওয়া বাহজাতুল মাসামিয়ি ওয়ান নাওয়াযির' গ্রন্থের ৭ম খণ্ড থেকে সংগৃহিত।