📄 আরবী অনুবাদের ভূমিকা
আরবী অনুবাদের ভূমিকা
-হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ، وَخَاتَمِ النَّبِيِّينَ، وَإِمَامِ الْمُتَّقِينَ، قَائِدِ الْغُرُ الْمُحَجَّلِينَ، مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَصَحْبِهِ الْغُرِّ الْمَيَامِيْنِ، وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ، مِنَ الْأَئِمَّةِ الْمُهْتَدِينَ ، وَالدُّعَاةِ الْمُصْلِحِيْنَ الْمُجَدِّدِيْنَ لِهَذَا الدِّيْنِ، الَّذِيْنَ لَمْ يَزَالُوْا يَنْفُوْنَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِيْنَ، وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ، وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ، جَزَاهُمُ اللهُ عَنِ الْإِسْلَامِ وَالْمُسْلِمِينَ ، أَفْضَلَ مَا جَزَى الْعُلَمَاءَ الرَّاسِخِيْنَ، النَّائِبِينَ عَنِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِينَ، أَمَّا بَعْدُ.
দীর্ঘকাল থেকে আমরা এমন একটি কিতাব প্রকাশের তীব্র প্রয়োজন অনুভব করে আসছিলাম, যার মানহাজ হবে স্বচ্ছ, ভাষা হবে অত্যন্ত সাবলীল, ভূমিকা হবে খুবই সুন্দর, সর্বোপরি কিতাবটি হবে সহজবোধ্য। কিতাবটির প্রতিটি ছত্র থেকে রচয়িতার ইখলাস ও সত্যনিষ্ঠা প্রকাশিত হবে। আল্লাহ তাআলা যে লক্ষ্যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং যে উদ্দেশ্যে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করা, তাঁরই জন্য কেবল ইবাদত করা, তাঁকেই ভয় করা ও তাঁর কাছেই আশা করা, সাহায্য কেবল তাঁর কাছেই চাওয়া এবং তাঁর নিকটই কাকুতিমিনতি করা ইত্যাদি—এগুলো সম্পর্কে সমসাময়িক লোকদের অজ্ঞতা দেখে এবং যেসব আকীদা-বিশ্বাস ও রসম-প্রথাকে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য আসমানী ধর্মসমূহ আগমন করেছে ও যেগুলো থেকে মুক্ত করার জন্য কিতাবসমূহ নাযিল হয়েছে ও রাসূলগণ প্রেরিত হয়েছেন সেসবের ছড়াছড়ি দেখে লেখকের মনে যে ব্যথা সৃষ্টি হয়েছে কিতাবের পাতায় পাতায় তা ঠিকরে পড়বে।
১৩৯৩ হিজরীর যিলহজ্জ মাসে মদীনায় অবস্থানকালে শাহ ইসমাঈল শহীদ রহ.-এর কিতাব তাকবিয়াতুল ঈমানের আরবী অনুবাদ করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা হযরত শাইখুল হাদীস যাকারিয়া কান্ধলভী রহ.-কে নির্দ্বিধ সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেন। কারণ এই কিতাবটি তাওহীদের দাওয়াত ও সত্যপ্রকাশের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ভারত উপমহাদেশের কত লোককে-যে এর মাধ্যমে উপকৃত করেছেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই। নিঃসন্দেহে তাদের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন হবে।
তৎকালীন মুসলিমদের ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা থেকে দূরত্ব, হিন্দু পৌত্তলিকতার প্রতি নমনীয়তা ও জাহিলী আচার-প্রথার প্রতি ঝুঁকে পড়া দেখে লেখক যারপরনাই ব্যথিত ও মর্মাহত হন। কিতাবটি তাঁর সেই আহত ও ক্ষতবিক্ষত হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়েছে। কিতাবের প্রভাব ও মাকবুলিয়ত আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইসলামের জন্য লেখকের অশ্রু-ক্রন্দন এবং জাহিলিয়াত থেকে মুক্ত করে দ্বীনের পুনর্জাগরণ ও কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হুকুমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর রক্ত-বিসর্জন।
তিনি দুআর সাথে দাওয়াত দিয়েছেন, জিহাদের সাথে চেষ্টাপ্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন এবং সত্যের সাক্ষ্যপ্রদানের সাথেসাথে সত্যের জন্য শাহাদাত বরণ করেছেন। এসব সম্ভব হয়েছে খাঁটি তাওহীদ, চূড়ান্ত ইখলাস এবং পূর্ণ সততা ও বিশ্বস্ততার বদৌলতে। আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন- مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَّنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا 'মুমিনদের মধ্যেই এমন লোক আছে, যারা আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতিকে সত্যে পরিণত করেছে এবং তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা তাদের (প্রাণের) নাজরানা আদায় করেছে এবং আছে এমন কিছু লোক, যারা এখনও প্রতীক্ষায় আছে, আর তারা (তাদের ইচ্ছার ভেতর) কিছুমাত্র পরিবর্তন ঘটায়নি'।
এসব কারণে তাঁর কিতাবের প্রভাব, খ্যাতি ও প্রচার-প্রসার এত বেশি হয়েছে, যা কেবল বড় বড় মুখলিস আলেমে বাআমলের কিতাবাদির ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
এই কিতাবের শক্তিমত্তার রহস্য হলো কিতাবটি বাস্তবতাকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় তুলে ধরেছে, যথাযথভাবে রোগ নির্ণয় করেছে এবং শিরকের বিভিন্ন নিদর্শন ও পদস্খলনের স্থানসমূহ চিহ্নিত করে দিয়েছে। অনুরূপভাবে কিতাবটি উম্মতের শিরায় হাত রেখে আকীদার দুর্বলতা নির্ণয় করতে পেরেছে এবং মুসলিমদের মাঝে পীর-বুযুর্গদের সম্মানের ক্ষেত্রে যে সীমালঙ্ঘন দেখা দিয়েছে এবং পৌত্তলিক সমাজ ও জাহিলী আচার-প্রথার যে বিস্তার ঘটেছে, তা যথাযথ ধরতে পেরেছে।
মানুষের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের রোগ-সমস্যাগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা না হয় এবং তারা যেসব আচার-প্রথায় আক্রান্ত হয়ে গেছে ও যেসব ব্যক্তি, স্থান ও নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছে, সেগুলোকে নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা সাধারণ ওয়াজ-নসীহত ও লিখনের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না, বরং সেগুলোকে তারা উপেক্ষা করে চলে এবং ভাবভঙ্গিমায় প্রকাশ করে যে, ওই বক্তা বা লেখক তাদেরকে উদ্দেশ্য করেনি, তারা তো পূর্বের মুশরিক ও জাহিলী যুগের মূর্তিপূজকদেরকে উদ্দেশ্য করেছে!
কিন্তু এই লেখক যেহেতু তাদের বাস্তব জীবনকে স্পর্শ করেছে, তাদের ভেতরের রোগ-ব্যাধির উপর হাত রেখেছে এবং তাদের ফেতনায় আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করেছে, তাই তাদের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বরং তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং তাঁর প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছে।
আসলে গভীর অনুভূতিতে সমৃদ্ধ চিন্তাশীল-মুখলিস প্রত্যেক দাঈর অবস্থাই এমন হয়, যিনি কুরআনের স্বাদ আস্বাদন করেছেন এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবীদের পথ-পন্থাকে যথাযথ ধরতে পেরেছেন। ফলে মানুষ খুশি হবে নাকি বেজার হবে, তার কোনও পরোয়া করেন না। তার একমাত্র চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় কুরআনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, তার রব্বকে খুশি করা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করে অন্তরকে প্রশান্ত করা।
দ্বিতীয় শতাব্দীর সূচনালগ্নে মুসলিম সমাজে ও মুসলিমদের মন-মস্তিষ্কে ইমাম হাসান বসরীর প্রভাব এবং তাঁকে উপেক্ষা করতে না পারার কারণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আমি 'রিজালুল ফিকরি ওয়াদ্দাওয়াহ' গ্রন্থে যা লিখেছি, সেটা এখানে উল্লেখ করে দেওয়া সমীচীন মনে হচ্ছে। আমি লিখেছি- 'তিনি স্পর্শকাতর শিরায় আঘাত করেছেন, সমাজের গভীরে প্রবেশ করে তার রোগ নির্ণয় করেছেন এবং দয়ালু, কোমল ও কল্যাণকামী ডাক্তারের ন্যায় সমালোচনা করেছেন। তাঁর সমাজে অসংখ্য দাঈ এবং ওয়ায়েজ ছিল, কিন্তু সমাজ তাঁর প্রতি যেভাবে ঝুঁকেছে সেভাবে আর কারও প্রতি ঝুঁকেনি। কারণ তিনি তাদের অন্তরকে স্পর্শ করেছেন এবং জীবনের গভীরে প্রবেশ করে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন'।
এসব কারণে আমরা এই কিতাবটিকে সহজ-সাবলীল ও যুগোপযোগী রীতিতে আরবী ভাষায় অনুবাদের জন্য নির্বাচন করেছি। আর শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. চেয়েছেন, এই কাজের সূচনাটা যেন মসজিদে নববীতে হয়। ১৩৯৩ হিজরীর যিলহজ্জের শেষে এক বরকতময় মুহূর্তে, বুধবার মধ্য দুপুরের পূর্বক্ষণে আল্লাহ তাআলা সেটার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি ভূমিকার প্রথম কয়েক লাইন বাবে রহমত ও বাবে জিবরীলের মধ্যবর্তী একটি স্থানে বসে লিখেছি, যা তখন আগন্তুক হাজী সাহেবান ও তাসবীহ-দরূদে মশগুল বান্দাদের দ্বারা কানায় কানায় পূর্ণ ছিল, আর পরিবেশটি ছিল শান্ত, নীরব ও মুহাব্বতপূর্ণ।
আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি যে, এই কাজের সূচনাটি এই মসজিদে হয়েছে, যা থেকে এই নূর চারদিকে ছড়িয়েছে এবং তাওহীদ ও দাওয়াত ইলাল্লাহর তরঙ্গ বিশ্বের আনাচকানাচে পৌঁছেছে। অতঃপর অন্ধকারকে দূরীভূত করেছে, অন্তরসমূহকে ঈমান ও নূরে-তাওহীদের ফয়েজ দ্বারা সিঞ্চিত করেছে, আত্মাগুলোকে পরিশুদ্ধ করেছে, জমিন তার প্রভুর আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে এবং বান্দাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণতা লাভ করেছে। আল্লাহ তাআলা স্বল্প সময়ে সাধ্যমত কাজটি সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে দিন। সকল প্রশংসা আল্লাহর তাআলার জন্য যার কুদরতে সকল নেক কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে।
এখানে সাইয়্যেদ আবদুল হাই হাসানী (১৩৪১ হিজরী) রহ.-এর 'নুযহাতুল খাওয়াতির' থেকে চয়ন করে লেখক শাহ ইসমাঈল শহীদের জীবনীটা উল্লেখ করে দেওয়া সমীচীন মনে হচ্ছে, যেন পাঠক জানতে পারে যে, উলূমে দ্বীনিয়ায় লেখকের অবস্থান কত উঁচু ও মজবুত ছিল। ইসলামের জন্য তার কী পরিমাণ কুরবানী ছিল এবং আকীদার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে তিনি কতটা আপোষহীন ছিলেন। যথার্থই বলা হয়েছে, 'রচয়িতার জীবনী মূলত রচনার বংশপরিচয়'। এ কারণে মুসলিম লেখকবৃন্দ জীবনী বিষয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং অনেক উপকার করেছেন।
এতে আমরা কিছু উপশিরোনাম যোগ করেছি এবং হিন্দুস্তানী কিছু শব্দ, রসম-প্রথা ও ব্যক্তির পরিচয় তুলে ধরেছি, যেন আরবী পাঠকের জন্য (অনুরূপ বাংলাভাষী পাঠকের জন্যও) কিতাবটি সহজবোধ্য হয়। অনুরূপভাবে কিতাবের এমন কিছু বাক্য ও বাচনভঙ্গির সমর্থনে উম্মাহর বিশিষ্ট উলামার কিছু উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছি, যেগুলোর সাথে অনেক লোকই অপরিচিত। আর তাদের এই অপরিচিতির কারণ হলো, সাম্প্রতিককালে প্রচলিত সংশোধনের রীতি-পদ্ধতি, যার ভিত্তি হলো মানুষের আবেগ ও ওরফের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ওপর।
ইসলাহের এই উদার পন্থা অবলম্বনের পেছনে যে মানসিকতা সক্রিয় রয়েছে তা হলো, দাওয়াতকে গভীর করার পরিবর্তে তার পরিধি প্রশস্ত করাকে প্রাধান্য দেওয়া, আকীদাকে মজবুত করার তুলনায় তা সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করা এবং ক্ষয়-ক্ষতি এড়ানোর উপর উপকারলাভকে প্রাধান্য দেওয়া। তাছাড়া মানুষের বীতশ্রদ্ধ ও বিরক্ত হওয়ার আশঙ্কা। প্রত্যেকের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, যার সে অনুসরণ করে থাকে।
পাঠক এই কিতাবে উল্লিখিত বিভিন্ন ধরনের গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা এবং হিন্দুস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আচার-প্রথার বিবরণ থেকে জানতে পারবেন যে, হিন্দু সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং জাহিলী ও স্থানীয় আচার-প্রথা হিন্দুস্তানের মুসলিম সমাজের কত গভীরে প্রবেশ করেছে এবং এ দেশের মুসলিমরা হিন্দু ও ব্রাহ্মণ দর্শনের প্রতি কতটা ঝুঁকে পড়েছে।
পুরনো ইতিহাসের পাঠকমাত্র অবগত আছেন যে, আল্লাহর জমিনে পৌত্তলিকতায় সবচেয়ে বেশি নিমজ্জিত দেশ হলো হিন্দুস্তান। হিন্দুস্তানের পৌত্তলিকতা সবচেয়ে প্রাচীন এবং মৌলিক, পক্ষান্তরে অন্যান্য অনেক দেশে তা হলো নবাগত। হিন্দুস্তানের ধর্মশাস্ত্র তো আছেই, এছাড়াও এ দেশের দর্শন থেকে নিয়ে সভ্যতা-সংস্কৃতি, ভাষা-সাহিত্য, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, বর্ষপঞ্জিকা পর্যন্ত সবকিছুই এই পৌত্তলিকতা দ্বারা মথিত হয়েছে। হিন্দুস্তান হলো শত সহস্র দেব-দেবীর ভূমি এবং পৌরাণিক গল্প-কাহিনীর উর্বর জমি। এখানে রয়েছে অসংখ্য উৎসব-পার্বণ আর ধর্মীয় ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনা ও বিভিন্ন কাল্পনিক জাতীয় বীরদের স্মরণে অগণিত শোক-সমাবেশ।
এই সবকিছুই মুসলিমদের জীবন ও আচার-অনুষ্ঠানে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং দিন যত গড়িয়েছে বিষয়টি ততই গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। আর শাসকবর্গের অবহেলা, হাদীস-সুন্নাহর চর্চা ও প্রচলন কম থাকা এবং অমুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে একই শহর-গ্রাম-গলিতে দীর্ঘ সহাবস্থানের কারণে হক-বাতিল মিশ্রিত হয়ে একাকার হয়ে গেছে।
এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা কুরআন-সুন্নাহর প্রতি দাওয়াত এবং হক-বাতিলের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য এক দল উলামায়ে দ্বীন ও দাঈকে প্রস্তুত করে দিলেন। এদের মধ্যে সর্বাগ্রে ছিলেন ইমাম আহমাদ ইবনে আবদুল আহাদ সারহেন্দী মুজাদ্দিদে আলফে সানী ও তাঁর খলীফাগণ। তাঁর পরে হাকীমুল ইসলাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ ইবনে আবদুর রহীম মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. ও তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁদের ছাত্রদের মধ্য থেকে অসংখ্য ফকীহ, মুহাদ্দিস ও বিজ্ঞ উলামাগণ।
এই বিষয়ে কারও বেজার হওয়ার কিংবা সমালোচনার পরোয়া না করে লেখকের স্পষ্টবাদী ও সংবেদনশীল হওয়ার একটি বড় কারণ এটাই। কারণ তিনি খাঁটি হিন্দুস্তানী পরিবেশে এবং এই সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে বেড়ে উঠেছেন। যদি তাঁর হায়াত দীর্ঘায়িত হত এবং তিনি হিন্দুস্তানে অবস্থান করে দাওয়াতের সুযোগ পেতেন, তাহলে বিষয়টিকে ধাপে ধাপে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি হিন্দুস্তান ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, জিহাদ ও শাহাদাত ফী সাবীলিল্লাহর অদম্য স্পৃহা তাকে বাধ্য করেছিল। তিনি এই কিতাবটি রচনা করে গেছেন হুজ্জত পূর্ণ করার জন্য এবং দায়মুক্তির উদ্দেশ্যে। এবং এটাকে এমন এক বাণী বানিয়ে দিলেন, যা পরবর্তীদের মধ্যে স্থায়ী হয়ে থাকবে, যাতে মানুষ শিরক থেকে ফিরে আসে।
এই বিষয়টি কেবল ইসলামের প্রাণকেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত হিন্দুস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং হিজরী সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দিতে আরব দেশ ও মুসলিম রাজধানীসমূহে ইসলামী আকীদা তার অনেকখানি শক্তি হারিয়ে এলোমেলো হয়ে পড়েছে এবং অনেক বিদআত ও ভ্রষ্টতা এর সাথে যুক্ত হয়েছে। এর কারণ ছিল কয়েকটি। যেমন- বিভিন্ন অনৈসলামী রসম-রেওয়াজে আক্রান্ত নওমুসলিম অনারব গোত্রের প্রভাব, অনারব ও অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের অবাধ মেলামেশা, মিশর ও শামে বাতিনিয়া এবং ইসমাঈলিয়াদের শাসন ও তাদের প্রভাব। সাথে ছিল কিছু মূর্খ সূফীর শিক্ষা-দীক্ষার প্রসার।
কেউ যদি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত 'আর-রদ আলাল বাকরী' এবং 'আর-রদ আলাল আখনায়ী' পড়েন তাহলে তৎকালীন সময়ে মূর্খদের মাঝে পীর-মাশায়েখ ও বুযুর্গদের ব্যাপারে যে বাড়াবাড়ি ছিল এবং তারা যেসব ভ্রান্ত আকীদা ও জাহিলী আচার-প্রথায় আক্রান্ত ছিল, তার অনেককিছুই জানতে পারবেন।
সেই বাড়াবাড়ি ও ভ্রান্ত আকীদার অনেক প্রভাব এখনো পর্যন্ত আরবদের মাঝে বাকি রয়ে গেছে। যার জন্য হেকমতের সাথে বলিষ্ঠ ভাষায় মজবুত দাওয়াতের প্রয়োজন। এ কারণে এই কিতাবের ফায়দা কেবল হিন্দুস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এমন প্রতিটি জায়গার জন্য প্রযোজ্য, যেখানে শয়তান প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে এবং ইসলামবিরোধী বিভিন্ন আকীদা ও আচার-প্রথা ছড়িয়ে পড়েছে।
আমি আরবী অনুবাদের নাম দিয়েছি- রিসালাতুত তাওহীদ লিল- আল্লামা আশ-শাইখ ইসমাঈল আশ-শহীদ। কারণ বিষয়বস্তুর বিচারে এই নামই বেশি উপযুক্ত। যদিও লেখক নিজেই 'রদ্দুল ইশরাক' (শিরকের খণ্ডন) নামে মূল কিতাবটির আরবী অনুবাদ করিয়েছেন, তবে মূল আরবী কিতাবটির কোনও হদিস পাওয়া যায় না। আমাদের নামটি মূল নামের বেশি কাছাকাছি।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, যেন তিনি এই অনুবাদের মাধ্যমে তেমনই উপকৃত করেন যেমন মূল কিতাব দ্বারা করেছেন এবং এর দ্বারা মুমিনদের অন্তর খুলে দেন।
আবুল হাসান আলী আল-হাসানী আন-নদভী
১ রবিউল আউয়াল ১৩৯৪ হিজরী
টিকাঃ
৩. সূরা আহযাব, ২৩
৪. পৃ. ৬৩-৬৪, দামেস্ক ইউনিভার্সিটির প্রেস থেকে মুদ্রিত।
📄 লেখকের জীবনী
লেখকের জীবনী
-হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.
মুজাহিদে ইসলাম শাইখ আল্লামা ইসমাঈল শহীদ ইবনে আবদুল গনী ইবনে ওলীউল্লাহ ইবনে আবদুর রহীম উমরী দেহলভী। মেধা, বিচক্ষণতা, সাহস, হিম্মত ও দ্বীনের ব্যাপারে অবিচলতা ও আপোষহীনতার ক্ষেত্রে তিনি দুনিয়ার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
তিনি ১১৯৩ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়ালে দিল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তার পিতা ইন্তিকাল করেন। ফলে তিনি চাচা শাইখ আবদুল কাদের ইবনে ওলীউল্লাহ দেহলভীর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন এবং তার কাছেই পাঠ্যতালিকার কিতাবাদি পড়েন। অনুরূপভাবে অপর দুই চাচা শাইখ রফীউদ্দীন ও শাইখ আবদুল আযীযের কাছ থেকেও পরিপূর্ণভাবে উপকৃত হয়েছেন এবং দীর্ঘকাল তাদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। ফলত তিনি আকলী ও নকলী উভয় ইলমে অথৈ সাগরে পরিণত হন।
অতঃপর তিনি ইমাম শহীদ সাইয়্যেদ আহমাদ ইবনে ইরফান বেরেলভী রহ.-এর সান্নিধ্য গ্রহণ করেন এবং তার কাছ থেকে তাসাওউফের দীক্ষা লাভ করেন। ১২৩৭ হিজরীতে তার সাথে হারামাইনের সফরে যান এবং হজ্জ ও যিয়ারত শেষ করে তার সাথেই হিন্দুস্তানে ফিরে আসেন। এসে তার নির্দেশে (দ্বীনী দাওয়াতের উদ্দেশ্যে) দুই বছর বিভিন্ন শহর-উপশহর-গ্রাম চষে বেড়ান। তখন তার কাছ থেকে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয়।
তারপর ১২৪১ হিজরীতে সীমান্তবর্তী এলাকায় সফর করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেন। তিনি সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদের উজির ও উপদেষ্টার মত ছিলেন। সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করতেন এবং বড় বড় যুদ্ধে নিজেও অংশগ্রহণ করতেন। পরিশেষে ইয়াগিস্তানের বালাকোটে শাহাদাত বরণ করেন।
তিনি ছিলেন যামানার বিস্ময় এবং এক বিরল প্রতিভা। ছিলেন ভেতরে-বাহিরে আল্লাহমুখী, তালীম ও ইবাদতে সদা মশগুল, বিনয়ী ও সজ্জন, মহৎ ও পবিত্র, সাহসী ও দ্বীনী বিষয়ে অনড়, শুদ্ধভাষী ও জ্বালাময়ী বক্তা। কোনও সংশয়বাদী বা বিচ্যুত স্বভাবের লোক তার সাথে যখন বসত, তিনি তার জাদুময়ী বয়ান দ্বারা আগুন-পানিকে একাকার করে দিতেন। ফলে ওই ব্যক্তি প্রস্থানের সময় তার কাছ থেকে সন্তুষ্টচিত্তে বিদায় নিত।
সমসাময়িক লোকদের সাথে তার কিছু গণ্ডগোল হয়েছিল এবং তার ব্যাপারটি একটি বহুলালোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। তাকে কেন্দ্র করে তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে বেশকিছু ফেতনা হয়েছে। তার ব্যাপারে লোকেরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আরেকদল তার শানে বাড়াবাড়ি করেছে। আর প্রত্যেক কালজয়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
শাইখ মুহসিন ইবনে ইয়াহইয়া তুরহাতী 'আল-ইয়ানিউল জানী' গ্রন্থে বলেন- তিনি ছিলেন আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর, সুন্নাহ রক্ষায় আপোষহীন। সুন্নাহর প্রতি দাওয়াত দিতেন, সুন্নাহ পরিত্যাগ করলে রাগ করতেন এবং বিদআত ও বিদআতীদের কঠোর সমালোচনা করতেন।
'আল-হিত্তাহ বিযিকরিস সিহাহিস সিত্তাহ' গ্রন্থে শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভীর আলোচনা করতে গিয়ে সিদ্দীক হাসান খান কন্নৌজী বলেন- তার নাতী মৌলভী মুহাম্মাদ ইসমাঈল শহীদ কথায় ও কর্মে তার দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন এবং দাদার অসমাপ্ত কাজ আঞ্জাম দিয়ে তার দায়িত্ব আদায় করেছেন। আল্লাহ তাআলা তার নেক কাজের উত্তম পুরস্কার দান করুন। তিনি ইসলামে কোনও নতুন পন্থা আবিষ্কার করেননি, যেমনটি মূর্খরা মনে করে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتٰبَ وَ الْحُكْمَ وَ النُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُوْنِ اللهِ وَ لكِنْ كُونُوا رَبّٰنِّينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَبَ وَ بِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُونَ
'কোনও মানুষের জন্য সঙ্গত নয় যে, আল্লাহ তাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করবেন আর সে তা সত্ত্বেও মানুষকে বলবে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার বান্দা হয়ে যাও। এর পরিবর্তে (সে তো এটাই বলবে যে,) তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও, তোমরা যে কিতাব শিক্ষা দাও ও যা-কিছু নিজেরা পড়, তার ফলস্বরূপে'।
তিনি অনেক মৃত সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং অনেক শিরক ও বিদআতকে নির্মূল করেছেন। পরিশেষে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন এবং আকাঙ্খার চূড়ান্ত শিখরে উপনীত হয়েছেন।
টিকাঃ
৫. সূরা আলে ইমরান, ৭৯
📄 রচনাবলি
রচনাবলি
তিনি বেশকিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার হলো 'আস-সিরাতুল মুস্তাকীম'। ফারসী ভাষায় রচিত এই গ্রন্থে মূলত তার শাইখ সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদের বাণী ও আমল সংকলন করেছেন। এতে দুটি অধ্যায় রয়েছে তার শাগরেদ শাইখ আবদুল হাই ইবনে হেবাতুল্লাহ সিদ্দীকী বুরহানভী রচিত।
২. 'ইযাহুল হাক্কিস সরীহ ফী আহকামিল মাওতা ওয়াদ্বরীহ'। এতে সুন্নাত-বিদআতের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।
৩. 'মানসাবে ইমামাত'। নবুওয়াত ও ইমামাতের মাকাম ও মানসিবের তাহকীকে অদ্বিতীয় একটি কিতাব।
৪. 'মাবহাসু ইমকানিন নাযীরি ওয়ামতিনা'ঈন নাযীর' (পুস্তিকা)। এগুলো সবই ফারসী ভাষায় রচিত।
৫. উসূলে ফিকহ বিষয়ে একটি আরবী মুখতাসার।
৬. রদ্দুল আশরাকি ওয়াল বিদা'। আরবী রিসালাটি দুটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন।
৭. তানবীরুল আইনাইন ফী ইসবাতি রফঈল ইয়াদাইন (আরবী)।
৮. সিলকে নূর (উর্দু)। বিবিধ বিষয়ে।
৯. তাকবিয়াতুল ঈমান। উর্দু ভাষায় তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এটা মূলত 'রদ্দুল আশরাকি ওয়াল বিদা' গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।
১০. 'আবাকাত'। দর্শন ও হিকমত শাস্ত্রে রচিত। এতে তার মেধা ও এই শাস্ত্রে তার সক্ষমতা ফুটে উঠেছে।
স্যার সাইয়্যেদ আহমাদ খান 'আসারুস সানাদীদ' গ্রন্থে বলেন- তিনি মানতিক শাস্ত্রে একটি পুস্তিকা রচনা করেন, যাতে তার দাবি ছিল যে, শাক্লে রাবে' হলো সবচেয়ে সহজবোধ্য আর শাক্লে আউয়াল তার বিপরীত। এই দাবির স্বপক্ষে তিনি এমনসব দলীল হাজির করেছেন, সমসাময়িকদের মধ্যে কেউ সেগুলো খণ্ডন করার সাহস করেনি।
টিকাঃ
৬. মাওলানা সাইয়্যেদ মানাযির আহসান গীলানী রহ. একই নামে এর উর্দু অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে এই অনুবাদটি পাওয়া যায়। অনলাইনে এর পিডিএফও সহজলভ্য। -অনুবাদক
📄 মৃত্যু
মৃত্যু
১২৪৬ হিজরীর ২৪ যিলকদে বালাকোট রণাঙ্গনে তিনি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতবরণ করেন। তার কবর সেখানে সুপরিচিত।
টিকাঃ
৭. আল্লামা সাইয়্যেদ আবদুল হাই হাসানী রহ-এর 'নুযহাতুল খাওয়াতির ওয়া বাহজাতুল মাসামিয়ি ওয়ান নাওয়াযির' গ্রন্থের ৭ম খণ্ড থেকে সংগৃহিত।