📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : রাবীগণের পরিচয়
১. সাহাবায়ে কিরাম এর পরিচয়
সংজ্ঞা: যিনি মুসলিম অবস্থায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনিই সাহাবী।
সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম ই আদিল। আহলুসসুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সম্মিলিত মতানুযায়ী সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন আবূ বাকর সিদ্দীক (রা) অতঃপর উমর (রা)। সাহাবীদের সংখ্যা এক লাখ চৌদ্দ হাজারের অধিক ছিল।²⁰⁶ সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারী সাহাবী হলেন আবূ তুফাইল আমির ইবনে ওয়াছিলাহ্ আললাইছী (১১০ হি.)।²⁰⁷
২. তাবিঈদের পরিচয়
যিনি মুসলিম অবস্থায় কোন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনিই তাবিঈ। তাবিঈগণের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িব। মুখদারামুন হলেন তাঁরা, যাঁরা জাহিলিয়্যাতের যুগ ও নবী করীম (সা)-এর যুগ পেয়েছেন কিন্তু তাঁর দর্শন লাভ করেননি।
৩. ভাই-বোনদের পরিচয়
এর উপকারিতা হলো যাতে দু'জন রাবীর পিতার নাম এক হওয়াতে যেন এ সন্দেহ সৃষ্টি না হয় যে, এরা দু'জন পরস্পর ভাই। যেমন সাত ভাই-এর উদাহরণ: নুমান, মা'কিল, আকীল, সুওয়াইদ, সিনান, আবদুর রহমান ও আবদুল্লাহ (রা) এঁরা সবাই মিকরান এর পুত্র এবং মুহাজির সাহাবী ছিলেন।²¹¹
৪. মুত্তাফিক ও মুফতারিক
রাবীর নিজের নাম ও পিতার নাম লিখায় এবং উচ্চারণে এক হওয়া অথচ তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি। যেমন- খলীল ইবনে আহমাদ নামের ছয় ব্যক্তি আছেন।
৫. মু'তালিফ ও মুখতালিফ
রাবীর নাম, লকব ও কুনিয়াত লিখায় মিল এবং উচ্চারণে গরমিল হওয়া। যেমন- সালাম এবং সাল্লাম (তাশদীদসহ)।
৬. মুতাশাবিহ
রাবীদের নাম লেখা ও উচ্চারণে এক হওয়া এবং পিতার নাম লেখায় এক ও উচ্চারণে বিভিন্ন হওয়া অথবা এর উল্টো হওয়া।
৭. মুহমাল
কোন রাবী কর্তৃক এমন দু'ব্যক্তি থেকে হাদীস রিওয়ায়াত করা যাঁদের নাম এক ও অভিন্ন, আর অন্য কোন উপায়ে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা যায় না।
৮. মুবহামাত
ঐ রাবী যাঁর নাম মতন অথবা সনদের মধ্যে অস্পষ্ট থাকে। যেমন- পুরুষ (রজুলুন) অথবা নারী (ইমরাআতুহু) শব্দ উল্লেখ করা।
৯. উদান
ঐসব রাবী যাঁদের কাছ থেকে শুধুমাত্র একজন রাবী ব্যতীত অন্য কেউ রিওয়ায়াত করেননি।
১০. একাধিক নাম অথবা গুণসম্পন্ন রাবী
ঐ রাবী যিনি একাধিক নাম অথবা উপাধি বা কুনিয়াতে ভূষিত হয়েছেন। যেমন- মুহাম্মাদ ইবনে আস সায়িব আল কালবীকে কেউ কেউ আবু নাদর বা আবু সাঈদ নামে ডাকেন।
১১. একক নাম, উপনাম ও লকব
রাবীর এমন নাম যা অন্য কারো নেই। যেমন- সাহাবীদের মধ্যে সানদার।
১২. উপনামে প্রসিদ্ধ রাবী
যিনি উপনামে (কুনিয়াত) পরিচিতি লাভ করেছেন। যেমন- আবু তুরাব হযরত আলী (রা)-এর উপাধি।
১৩. লকব-এর পরিচয়
গুণাবলী যা ব্যক্তির মর্যাদা বা অমর্যাদার ইঙ্গিত বহন করে। যেমন- গুনদুর (মুহাম্মাদ ইবনে জা'ফর)।
১৪. পিতা ছাড়া অন্যের সাথে সম্পৃক্ত রাবী
যাঁরা মা অথবা দাদার সাথে পরিচিত। যেমন- মুহাম্মাদ ইবনে হানফিয়্যাহ।
১৫. প্রকাশ্যের পরিপন্থি নসব
কোন রাবী স্থান বা পেশার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পরিচিত কিন্তু তা তাঁর প্রকৃত নসব নয়। যেমন- খালিদ আলহায্যা (তিনি মুচী ছিলেন না)।
১৬. রাবীগণের জীবন-ইতিহাস (তাওয়ারীখ)
রাবীদের জন্ম, মৃত্যু ও শিক্ষা সফরের তারিখ। তারিখ ব্যবহারের মাধ্যমেই মিথ্যাবাদীদের গোমর ফাঁস করা সম্ভব হয়।
১৭. ত্রুটি দেখা দিয়েছে এমন সিকাহ রাবী (ইখতিলাত)
অধিক বয়স বা অন্য কারণে স্মৃতিভ্রম হওয়া। যেমন- আতা ইবনে সা'য়িব। এঁদের ইখতিলাত-এর পূর্বের রিওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য।
১৮. উলামায়ে কিরাম ও রাবীদের বিভিন্ন স্তর (তাবাকা)
এমন শ্রেণীর লোক যাঁরা বয়স এবং সনদ অথবা শুধু সনদের দৃষ্টিকোণ থেকে পরস্পর নিকটবর্তী।
১৯. আযাদকৃত রাবী (মাওলা)
যিনি কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ আছেন অথবা আযাদকৃত। যেমন- ইমাম বুখারী আলজুফী (তিনি চুক্তিবদ্ধ মাওলা)।²²⁶
২০. সিকাহ্ ও দুর্বল রাবী
পূর্ণ সংরক্ষণশক্তি ও আদালাতসম্পন্ন রাবীকে সিকাহ বলা হয়। এর মাধ্যমেই সহীহ্ ও যঈফ হাদীসের পরিচয় জানা যায়।
২১. রাবীগণের জন্মস্থান ও দেশ
রাবীদের আবাসস্থলের পরিচয় জানা, যাতে অভিন্ন নামের রাবীদের মধ্যে পার্থক্য করা যায়।
টিকাঃ
১৮৪. মুকাসসিরীন (অধিক রিওয়ায়াতকারী) সাহাবীর সংখ্যা ছয় বা সাত জন।
২০৫. রাসূল (সা)-এর ওয়াফাতের পর একশ বছরের পরে কেউ সাহাবী হওয়ার দাবী করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
২০৬. আত্তাকরীর মাআততাদবীর ২য় খ. পৃ. ২২০।
২০৭. আবু তুফাইল এর মৃত্যুর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। শেষোক্ত মতটিকে ইমাম যাহাবী সঠিক বলে অভিহিত করেছেন।
২০৮. মদীনার সাতজন শ্রেষ্ঠ ফকীহ সম্পর্কে বিভিন্ন ইমামের অভিমত।
২০৯. ছোট উন্মুদ দারদা হুজাইমা ছিলেন আবু দারদার স্ত্রী।
২১০. দেখুন: আর রিসালাহ্ আল মুস্তাত্রাফাহ পৃ. ১০৫।
২১১. মিকরান এর সাত পুত্রই ছিলেন সৌভাগ্যবান মুহাজির সাহাবী।
২১২. আবুল আব্বাস আস্সাররাজ (৩১৩ হি.) তাঁর যুগের নীসাপুরের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন।
২১৩. শুধু নাম এক ও অভিন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল।
২১৪. এটি খতীব বাগদাদীর গ্রন্থে উল্লেখিত একটি আশ্চর্য উদাহরণ।
২১৫. দেখুন: শারহু নুখবাতিল ফিকর পৃ. ৬৮।
২১৬. এ গ্রন্থের একটি অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি ইস্তাম্বুলে পাওয়া যায়।
২১৭. গরমিল নূক্তাযুক্ত বা নুকতাহীন হওয়ার কারণে হতে পারে।
২১৮. নামের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে।
২১৯. এ প্রকারটি মুত্তাফিক ও মুফতারিক এবং মু'তালিফ ও মুখতালিফ এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
২২০. যেমন রাবীদের নাম উচ্চারণে পার্থক্য হওয়া কিন্তু তাঁদের পিতার নাম লিখতে ও উচ্চারণে এক হওয়া।
২২১. একে আলমুশতাবাহ আলমাকলুবও বলা হয়।
২২২. এ বিষয়ের উপর খতীব আল বাগদাদীর গ্রন্থটি অতুলনীয়।
২২৩. এটি দ্বি-বচন তাস্ঙ্গীর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
২২৪. ইমাম তিরমিযীর জন্ম তারিখের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
২২৫. দেখুন: তাদরীবুর রাবী ২য় খ. পৃ. ৩৮১।
২২৬. দেখুন: আলকামূস ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৪০৪।