📘 তাইসিরু মুছত্বালাহুল হাদীস 📄 প্রথম পাঠ : মুহাদ্দিস-এর আদাব বা গুণাবলী

📄 প্রথম পাঠ : মুহাদ্দিস-এর আদাব বা গুণাবলী


১. ভূমিকা: যেহেতু ইলমুল হাদীসের খেদমতে নিয়োজিত থাকা, আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য লাভের জন্য নিবেদিত আমল সমূহের মধ্যে একটা সর্বোত্তম আমল এবং পেশার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পেশা। সেহেতু যিনি এ মহান কাজে জড়িত এবং এর প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত তাঁর উত্তম স্বভাব ও উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া বাঞ্ছনীয়। তিনি মানুষকে যা শিক্ষা দেন তার বাস্তব প্রতিচ্ছবি ও দৃষ্টান্ত তাঁর মধ্যে বিদ্যমান থাকতে হবে। অপরকে সৎকাজের আদেশের পূর্বে নিজে তার উপর আমল করবেন, এটাই প্রত্যাশিত।

২. মুহাদ্দিস এর জন্য আবশ্যকীয় গুণাবলী (ক) বিশুদ্ধ ও খাঁটি নিয়ত। তাঁর হৃদয়-মন পার্থিব লক্ষ্য উদ্দেশ্য, যেমন নেতৃত্বলাভ অথবা খ্যাতি অর্জন থেকে পবিত্র হবে। (খ) তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য হবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাদীস প্রচার ও প্রসার করা। আর তার উদ্দেশ্য হবে এর বিনিময়ে আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি ও তাঁর কাছ থেকে উত্তম পুরস্কার প্রাপ্তি। (গ) ইল্ম অথবা বয়সে তাঁর চেয়ে বড় ও উত্তম ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি হাদীস রিওয়ায়াত করবেন না। (ঘ) তাঁর নিকট হাদীস সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা হলে, তিনি তাঁর সঠিক জবাব দেবেন। আর সে বিষয়ে তাঁর জ্ঞান না থাকলে তিনি এমন কোন ব্যক্তির সন্ধান তাঁকে দেবেন, যাঁর কাছে বিষয়টির সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে। (ঙ) কারো নিয়ত বিশুদ্ধ নয় মনে করে তাঁর নিকট হাদীস রিওয়ায়াত থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়। বরং তাঁর নিয়তের বিশুদ্ধতা কামনা করা উচিত। (চ) সমর্থ ও যোগ্যতা থাকলে হাদীস লিখানো ও শিক্ষা দেওয়ার মজলিস অনুষ্ঠিত করা, কেননা এটা রিওয়ায়াতে হাদীস-এর সর্বোচ্চ স্তর।

৩. দরসে হাদীসের মজলিসে বসার আদব সমূহ (ক) পাক-পবিত্র হয়ে সুগন্ধি লাগিয়ে এবং ভালভাবে দাঁড়ি আঁচড়িয়ে আদব ও মর্যাদার অনুভূতি নিয়ে দরসে হাদীসের মাজলিসে বসা উচিত।
(খ) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাদীসের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে তাযীমের সাথে প্রশান্ত চিত্তে অত্যন্ত ভয় ভীতির সাথে দরসে হাদীসের মজলিসে বসবে।
(গ) মজলিসে উপস্থিত সকলের উপরই সমান দৃষ্টি রাখা উচিত। কারো উপর কাউকে প্রাধান্য দেয়া ঠিক নয়।
(ঘ) মজলিসের প্রারম্ভে পরিসমাপ্তিতে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর দরূদ পাঠ করা উচিত। স্থান বিশেষে দু'আ প্রার্থনা করাও দরকার।
(ঙ) এমন ব্যাখ্যা অথবা এমন হাদীস পেশ করা অনুচিত যা উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বুঝতে অক্ষম।
(চ) বিরল কোন উপদেশ অথবা ঘটনা দ্বারা ইল্লা (হাদীস লিখানো) শেষ করা উচিত, যাতে হৃদয় সতেজ হয় এবং স্মৃতি শক্তির স্বচ্ছতার পাথেয় হয়।

৪. মুহাদ্দিসের বয়স: দরসে হাদীসের জন্য মুহাদ্দিসের বয়স কত হওয়া উচিত এ ব্যাপারে ইমামদের মতভেদ রয়েছে।
(ক) এজন্য কেউ কেউ পঞ্চাশ বছর এবং কেউ কেউ চল্লিশ বছর নির্দিষ্ট করেছেন। আবার কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
(খ) বিশুদ্ধ অভিমত হলো, তিনি যখন এ কাজের যোগ্য বিবেচিত হবেন এবং যখন এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে, তখন তিনি দরসে হাদীসের মজলিস অনুষ্ঠিত করতে পারবেন। তাঁর বয়স যাই হোক না কেন।

৫. এ বিষয়ের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী (ক) আলজামিউ লিআখলাকিররাবী ওয়া আদবিস সামি, প্রণেতা খতীব বাগদাদী। (খ) জামিউ বায়ানিল ইল্মি ওয়া ফাদলিহি ওয়ামা ইয়াম্বাগী ফী রিওয়ায়াতিহি ওয়া হামলিহি, প্রণেতা ইবনে আবদুল বার।

📘 তাইসিরু মুছত্বালাহুল হাদীস 📄 দ্বিতীয় পাঠ : হাদীস শিক্ষার্থীর আদাব বা গুণাবলী

📄 দ্বিতীয় পাঠ : হাদীস শিক্ষার্থীর আদাব বা গুণাবলী


১. ভূমিকা: হাদীস অন্বেষণকারী বা শিক্ষার্থীর গুণাবলী দ্বারা এখানে ঐসব সুমহান গুণাবলী ও উন্নত নৈতিক চরিত্রকে বুঝানো হয়েছে, যা এ ইলমের মর্যাদার কারণেই একজন তালিবুল হাদীস (হাদীস অন্বেষণকারী)-এর মধ্যে বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। কেননা তিনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাদীস অন্বেষণকারী। এসব আদাব বা গুণাবলীর মধ্যে কিছু এমন রয়েছে যা ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আর কিছু শুধু ছাত্রের জন্য প্রযোজ্য।

২. উভয়ের জন্য প্রযোজ্য আদবসমূহ (ক) বিশুদ্ধ ও খালিস নিয়তে হাদীস অন্বেষণ বা শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। (খ) তাঁর লক্ষ্য উদ্দেশ্য দুনিয়া অন্বেষণ তথা পার্থিব লোভ-লালসা থেকে মুক্ত হতে হবে। ইমাম আবূ দাউদ ও ইবনে মাজাহ্ (র) আবু হুরাইরা (রা) থেকে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "যে ব্যক্তি পার্থিব উদ্দেশ্যে ঐ ইল্ম শিক্ষা করে যা দ্বারা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করা যায় সেই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন জান্নাতের গন্ধ পর্যন্ত পাবে না।" (গ) তিনি হাদীস থেকে যা কিছু শুনবেন, সে অনুযায়ী আমল করবেন।

৩. শুধু ছাত্রের জন্য প্রযোজ্য আদবসমূহ (ক) হাদীস বুঝা ও তা সংরক্ষণের জন্য একমাত্র আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওফীক কামনা করতে হবে। আর তা সহজ সরল করে দেখার জন্যও তার সাহায্য ও করুণা প্রার্থনা করতে হবে। (খ) হাদীস অধ্যয়নের কাজে তিনি পরিপূর্ণভাবে নিজকে নিয়োজিত রাখবেন এবং তা অর্জনের জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। (গ) তাঁকে তাঁর শহরের এমন উস্তাদের নিকট থেকে হাদীস শ্রবণ শুরু করতে হবে যিনি ইলমুস সনদ বিষয়ে ও দীনদার হিসেবে সবার শ্রেষ্ঠ। (ঙ) ইলমের মর্যাদা ও এর মাহাত্ম্যের কারণে তাঁর শিক্ষক ও সতীর্থদের তা'যীম ও সম্মান করতে হবে। তাঁর উস্তাদের সন্তুষ্টির প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে। আর তাঁর শিক্ষকের পক্ষ থেকে কোন দুঃখ-কষ্ট আরোপিত হলে তাও দ্বিধাহীনচিত্তে বরদাশত করতে হবে। (চ) তাঁর ভাই ও সাথীদের ঐ পথের সন্ধান দিতে হবে যে পথ অবলম্বনে তিনি উপকৃত হয়েছেন, সফলতা অর্জন করেছেন। তাঁদের কাছে কোন কিছু গোপন করা ঠিক নয়। কেননা ইলমের উপকারিতা ছাত্রদের কাছে গোপন রাখা একটা নিন্দনীয় কাজ। এতে ছাত্রদের মধ্যে অজ্ঞানতা সৃষ্টি হয়, এটা সঠিক নয়, কেননা ইলম অন্বেষণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তা প্রচার ও বিস্তার করা। (ছ) বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ার কারণে তার চেয়ে কম বয়সী অথবা কম মর্যাদাসম্পন্ন উস্তাদের নিকট থেকে ইলম অর্জন কিংবা গ্রহণের ব্যাপারে লজ্জা করা অনুচিত। (জ) হাদীস শুধু শুনা অথবা লেখাই যথেষ্ট নয়। বরং এর অন্তর্নিহিত ভাব এবং তাৎপর্য অনুধাবন করাও কর্তব্য। এটা তার নিকট কষ্টসাধ্য মনে হলেও তা করা দরকার। কেননা পরিশ্রম ছাড়া সফলতা অর্জন সম্ভম নয়। (ঝ) হাদীস শ্রবণ, সংরক্ষণ ও বুঝার ক্ষেত্রে সহীহ বুখারী ও মুসলিমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সুনানে আবূ দাউদ, তিরমিযী ও নাসাঈ অধ্যয়ন করা উচিত। অতঃপর বাইহাকীর সুনানে কুবরা, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী মুসনাদ, ও জামি গ্রন্থ সমূহের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। যেমন, মুসনাদে আহমাদ এবং মুয়ান্না-ই মালিক। ইলাল গ্রন্থের মধ্যে দারা কুতনীর কিতাবুল ইলাল। রিজাল গ্রন্থের মধ্যে ইমাম বুখারীর আত্তারীখুল কাবীর এবং ইবনে আবু হাতিমের আলজারহু ওয়াতাদীল গ্রন্থ। নাম সংরক্ষণের গ্রন্থের মধ্যে ইবনে মা'কুল-এর গ্রন্থ এবং গারীবুল হাদীস-এর মধ্যে ইবনুল আছীর এর আননিহায়াহ গ্রন্থ পর্যায়ক্রমে অধ্যয়ন করা উচিত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px