📄 দ্বিতীয় পাঠ : জারহ্ ও তা'দীল-এর বিভিন্ন স্তর
ইবনে আবূ হাতিম তাঁর আজ্জারহু ওয়াত্তা’দীল (الجرح والتعديل) গ্রন্থের ভূমিকায় জাৱহ ও তা’দীল-এর প্রত্যেকটিকে চারটি স্তরে বিভক্ত করেছেন এবং প্রত্যেকটি স্তরের হুকুম পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর মুহাদ্দিসীনে কিরাম প্রত্যেকটির সাথে আরো দু'টো করে স্তর সংযোজন করেছেন। এ নিয়ে জারহ ও তা’দীল-এর প্রত্যেকটি মোট ছয়টি করে স্তরে বিভক্ত হয়েছে। শব্দাবলীসহ প্রত্যেকটি স্তরের বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো।
১. তা’দীল-এর বিভিন্ন স্তর ও এর জন্য নির্দিষ্ট শব্দাবলী:
(ক) রাবীর নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণে আধিক্যবোধক শব্দ অথবা আফআলু (افعل) বিশিষ্ট শব্দ প্রয়োগ করা। যেমন- অমুক নির্ভরযোগ্যতার সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত অথবা অমুক সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি।
(খ) অতঃপর নির্ভরযোগ্য অন্য যে কোন একটি বিশেষণকে জোরালোভাবে বারবার উল্লেখ করা। যেমন- অমুক সিকাহ ও নির্ভরযোগ্য অথবা অমুক স্থির ও সিকাহ।
(গ) এমন শব্দে রাবীর নির্ভরযোগ্যতা বর্ণনা করা যাতে তাঁর সিকাহ্ হওয়া প্রমাণিত হয়। যেমন- সিকাতুন (ثقة) অথবা হুজ্জাতুন (حجة) নির্ভরযোগ্য ইত্যাদি।
(ঘ) ঐ সব শব্দে রাবীর নির্ভরযোগ্যতা বর্ণনা করা যা তাঁদের ন্যায়পরায়ণতার ইঙ্গিত বহন করে। যেমন- সদুকুন (صدوق) অধিক সত্যবাদী অথবা তিনি সত্যের স্থানে অথবা ইবনে মুঈন ব্যতীত অন্য ইমামের ‘লা বা’সা বিহী’ বলা।
(ঙ) অতঃপর রাবী সম্পর্কে ঐ সব শব্দ প্রয়োগ করা যদ্দ্বারা তাঁদের নির্ভরযোগ্যতা অথবা অনির্ভরযোগ্যতা কোনটাই সুসস্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। যেমন- অমুক উস্তাদ অথবা অনেক ছাত্র তাঁর কাছ থেকে হাদীস রিওয়ায়াত করেছে।
(চ) রাবী সম্বন্ধে এমন শব্দ প্রয়োগ করা, যা তা'দীল-এর শব্দ হওয়া সত্ত্বেও জারহ এর নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। যেমন- অমুক হাদীস রিওয়ায়াতে সুস্থ অথবা তাঁর হাদীস লেখা যায়।
২. হুকুম:
(ক) প্রথম তিন স্তরের রাবীগণ গ্রহণযোগ্য যদিও তারা ক্রমানুসারে একে অপরের চেয়ে অধিক শক্তিশালী।
(খ) চতুর্থ ও পঞ্চম স্তরের রাবীগণ নির্ভরযোগ্য নয়। কিন্তু তাঁদের হাদীস লেখা যাবে। অবশ্য তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।¹⁷³
(গ) ৬ষ্ঠ স্তরের রাবীগণও গ্রহণযোগ্য নয়। তবে শুধুমাত্র সহযোগিতার জন্য তাঁদের হাদীস লেখা যাবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নয়।
৩. জারহ-এর বিভিন্ন স্তর ও এর নির্দিষ্ট শব্দাবলী:
(ক) এমন শব্দ যা শিথিলতার ইঙ্গিত বহন করে। যেমন- অমুক হাদীস বর্ণনায় শিথিল অথবা তাঁর ব্যাপারে কথা রয়েছে।
(খ) এমন শব্দ যা তাঁর গ্রহণযোগ্য না হওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত বহন করে। যেমন- অমুক গ্রহণযোগ্য নয়, অথবা তিনি দুর্বল, তিনি অনেক মুনকার হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন।
(গ) এমন শব্দ যা তাঁর হাদীস না লেখার অথবা অনুরূপ অর্থ প্রকাশ করে। যেমন- তাঁর হাদীস লেখা যায় না, তাঁর থেকে রিওয়ায়াত করা বৈধ নয় অথবা অত্যধিক দুর্বল বা প্রমাদকারী।
(ঘ) এমন শব্দ যা রাবীর উপর মিথ্যা বা অনুরূপ অভিযোগ আরোপ করে। যেমন- অমুক মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত, তিনি মাওযূ হাদীস রচনার অভিযোগে অভিযুক্ত, হাদীসচোর, অগ্রহণযোগ্য অথবা পরিত্যক্ত বা অনির্ভরযোগ্য।
(ঙ) এমন শব্দ, যা রাবীকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করে। যেমন- জঘন্য মিথ্যাবাদী, অত্যধিক ধোকাবাজ, মিথ্যা হাদীস রচনাকারী অথবা মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত।
(চ) মিথ্যার আধিক্যবোধক শব্দ: যেমন- অমুক সবচেয়ে মিথ্যাবাদী অথবা তিনি মিথ্যার সর্বশেষ প্রান্তে বা মিথ্যার মূল স্তম্ভ।
৪. এসব স্তরের হুকুম:
(ক) প্রথম দু'স্তরের রাবীদের হাদীস স্বভাবত গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু শুধু বিবেচনার (للإعتبار) জন্য তাঁদের হাদীস লেখা যাবে।
(খ) আর শেষোক্ত চার স্তরের রাবীদের হাদীসও গ্রহণযোগ্য নয়, আর তা লেখাও যাবে না এবং বিবেচনার যোগ্যও নয়।
টিকাঃ
১৭৩. এখানে পরীক্ষা নিরীক্ষার অর্থ হচ্ছে সিকাহ রাবীর বিপরীতে তাঁদের হাদীস রেখে তাঁদের স্মরণশক্তি যাচাই বাছাই করা। আর এরূপ রাবীদের সম্পর্কে কারো কারো মন্তব্য তাদের হাদীস হাসান। আর হাসান গ্রহণযোগ্য। এটা ভুল ধারণা এটা জারহ ও তা'দীল এর ইমামদের পরিভাষা। ইবনে হাজার তাকরীবুত তাহযীব গ্রন্থে সদৃক (صدوق) শব্দটি একটি বিশেষ পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞাতা।