📄 প্রথম পাঠ : মাকবুল এর প্রকারভেদ
মাকবুল হাদীস মর্যাদার তারতম্য অনুসারে প্রধানত দু'ভাগে বিভক্ত। সহীহ ও হাসান। এর প্রত্যেকটি আবার দু'ভাগে বিভক্ত। লিযাতিহী ও লিগাইরিহী। এভাবে খবরে মাকবুল সর্বমোট চার ভাগে বিভক্ত হলো। যথা- ১. সহীহ্ লিযাতিহী ২. হাসান লিযাতিহী ৩. সহীহ্ লিগাইরিহী ৪. হাসান লিগাইরিহী।
সহীহ
১. সংজ্ঞা:
(ক) আভিধানিক অর্থ : সহীহ্ এটি ‘সাকীম’ (ব্যাধিগ্রস্ত) এর বিপরীতার্থক শব্দ। প্রকৃতপক্ষে শারীরিক (সুস্থতার) ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। হাদীস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে একে রূপকার্থে ব্যবহার করা হয়।
(খ) পারিভাষিক অর্থ : যে হাদীসের সনদ মুত্তাসিল (বা অবিচ্ছিন্ন), বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ, পূর্ণ সংরক্ষণকারী এবং হাদীসটি যদি শায ও মুআল্লাল না হয় এবং সনদের আদ্যোপান্ত এরূপ থাকে তবে সেটি সহীহ হাদীস।
২. ব্যাখ্যা: উল্লেখিত সংজ্ঞানুযায়ী হাদীস সহীহ্ হওয়ার জন্য যেসব বিষয় অপরিহার্য, তা নিম্নরূপ:
(ক) সনদ মুত্তাসিল হওয়া: এর মানে হলো, সনদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাবী তাঁর স্বীয় উস্তাদ থেকে সরাসরি হাদীস রিওয়ায়াত করবে।
(খ) রাবী আদালাত সম্পন্ন হওয়া: অর্থাৎ সনদের প্রত্যেক রাবী মুসলিম, বালিগ ও আকিল হবেন এবং তিনি ফাসিক ও অসভ্য হবেন না।
(গ) রাবী সংরক্ষণ শক্তি সম্পন্ন হওয়া: অর্থাৎ সনদের প্রত্যেক রাবীকেই পূর্ণ সংরক্ষণ শক্তিসম্পন্ন হতে হবে। চাই এটা স্মৃতি শক্তির মাধ্যমে হোক কিংবা লিখার মাধ্যমে।
(ঘ) শায না হওয়া: এর মানে কোন সিকাহ্ রাবী, তাঁর চেয়েও অধিক সিকাহ্ রাবীর বিপরীত রিওয়ায়াত করবেন না।
(ঙ) মুআল্লাল না হওয়া: অর্থাৎ এমন গোপন সূক্ষ্ম ত্রুটিকে ইল্লাত বলা হয়, যা হাদীস সহীহ্ হওয়ার ব্যাপারে অন্তরায় সৃষ্টি করে। কিন্তু বাহ্যত হাদীসটিকে ত্রুটিমুক্ত বলে মনে হয়।
৩. হুকুম: হাদীস বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত মতানুযায়ী এর ওপর আমল করা ওয়াজিব। উসূলবিদ ও ফকীহদের মতানুযায়ী খবরে সহীহ শারীআতের দলীল হিসেবে স্বীকৃত। কোন মুসলিমের পক্ষে একে বর্জন করার অবকাশ নেই।
৪. সহীহ হাদীসের স্তর: সহীহ হাদীসের সাতটি স্তর পরিলক্ষিত হয়। যথা, (১) বুখারী ও মুসলিম-এর রিওয়ায়াত (সর্বোচ্চ স্তরের)। (২) তারপর শুধু বুখারীর রিওয়ায়াত। (৩) অতঃপর শুধু মুসলিম এর রিওয়ায়াত। (৪) তারপর ঐসব রিওয়ায়াত, যা বুখারী ও মুসলিম উভয়ের শর্তের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ কিন্তু তাঁরা তা রিওয়ায়াত করেননি। (৫) অতঃপর ঐ রিওয়ায়াত, যা বুখারীর শর্তের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। কিন্তু তিনি তা রিওয়ায়াত করেননি। (৬) এরপর ঐসব রিওয়ায়াত, যা মুসলিম এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। কিন্তু তিনি তা রিওয়ায়াত করেননি। (৭) অতঃপর ঐসব রিওয়ায়াত, যা বুখারী ও মুসলিম-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। কিন্তু অন্যান্য ইমাম যেমন, ইবনে খুযাইমা ও ইবনে হিব্বান-এর নিকট তা সহীহ হিসেবে গণ্য।
হাসান
১. সংজ্ঞা:
(ক) আভিধানিক অর্থ: এটি সুন্দর বা মনোরম অর্থে ব্যবহৃত হয়।
(খ) পারিভাষিক অর্থ : হাসান ঐ হাদীসকে বলা হয়, যার সনদ মুত্তাসিল, রাবী আদালতসম্পন্ন (ন্যায়পরায়ণ) তবে স্মৃতিশক্তিতে দুর্বলতা রয়েছে। আর হাদীসটি শায ও মুআল্লাল হওয়ার ত্রুটি থেকে মুক্ত।
২. হুকুম: হাসান হাদীস কম শক্তিশালী হলেও দলীল গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি সহীহ হাদীসের সমমর্যাদাসম্পন্ন। এ কারণে সমস্ত ফুকাহায়ে কিরামই একে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এর উপর আমলও করেছেন।
৩. সহীহ্ লিগাইরিহী:
সহীহ্ লিগাইরিহী প্রকৃতপক্ষে ঐ হাসান লিযাতিহী হাদীসকে বলা হয় যা অনুরূপ আরো একটি সূত্রে কিংবা তার চেয়ে অধিক শক্তিশালী সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
৪. হাসান লিগাইরিহী:
‘হাসান লিগাইরিহী’ ঐ যঈফ রিওয়ায়াতকে বলা হয়, যা বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর দুর্বলতার কারণ রাবীর ফিস্ক অথবা মিথ্যাচারিতা নয়।
টিকাঃ
২১. বুখারী, আযান অধ্যায়।
২২. উস্তাদ থেকে আন্ শব্দ দ্বারা হাদীস রিওয়ায়াত করাকে আন্না বলা হয়।
২৩. তাদরীবুর রাবী ১ম খ. পৃ. ৭৫-৭৬।
২৪. তাঁর পিতা হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)।
২৫. অর্থাৎ ‘আলী ইবনে আবী তালিব (রা)।
২৭. গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকায় অনেক সহীহ্ হাদীসও তিনি বর্জন করেছেন।
২৮. অর্থাৎ যেসব হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসীনে কিরাম একমত।
২৯. উলূমুল হাদীস পৃ. ১৬।
৩০. অর্থাৎ আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ।
৩১. বর্তমানে এ গ্রন্থটির ওপর গবেষণা করছেন প্রখ্যাত গায়ক ড. মাহমুদ আল-মীরাহ।
৩২. আমীর আলা উদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনে বলবান এ গ্রন্থখানা সুবিন্যস্ত করে তার নাম দিয়েছেন আল-ইহসান ফী-তাকরীবি ইবনে হিব্বান।
৩৩. তাদরীবুর রাবী ১ম খ. পৃ. ১০৯।
৩৪. তাদরীবুর রাবী ১ম খ. পৃ. ১০৯।
৩৫. তাদরীবুর রাবী ১ম খ. পৃ. ১১৫-১১৬।
৩৬. পরবর্তীতে এর বিস্তারিত আলোচনা আসছে।
৩৭. উলূমুল হাদীস পৃ. ২৪
৩৮. মুআলিমুস সুনান, ১ম খ. পৃ. ১১।
৩৯. তুহফাতুল আহওয়াযায়ী, ১ম খ. পৃ. ৫১৯।
৪০. শরহু নুখবাতিল ফিকার পৃ. ২৯।
৪১. শরহু নুখবাতিল ফিকার পৃ. ২৯।
৪২. তাদরীবুর রাবী, ১ম খ. ১৬০ পৃ.।
৪৩. তুহফাতুল আহওয়াযী, ৫ম খ. পৃ. ৩০, জিহাদের ফযীলত পর্ব।
৪৪. এ গ্রন্থের পূর্ণ নাম হলো মাসাবীহুস্ সুন্নাহ। খতীব তাবরীযী এ গ্রন্থটিকে সুসজ্জিত করে তার নাম দিয়েছেন ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’।
৪৫. সুনানে আরবাআ বলতে সাহীহাইন বাদে সিহাহ সিত্তার অন্য চারখানা হাদীস গ্রন্থ।
৪৬. তাহারাত অধ্যায়ে ইমাম তিরমিযী হাদীসটি রিওয়ায়াত করেছেন।
৪৭. উলুমুল হাদীস পৃ. ৩১-৩২।
📄 দ্বিতীয় পাঠ : আমল হিসেবে খবরে মাকবুল-এর প্রকারভেদ
আমল হিসেবে খবরে মাকবুল দু'ভাগে বিভক্ত। মা'মূল বিহী ও গায়র মা'মূল। এ দু'প্রকার হাদীসের ওপর ইলমে হাদীস-এর অন্যতম দু'টি শাখার উৎপত্তি হয়েছে। যথা- মুহকাম ও মুখতালাফুল হাদীস এবং নাসিখ ও মানসুখ হাদীস।
মুহকাম ও মুখতালাফুল হাদীস
১. মুহকাম-এর সংজ্ঞা:
পরিভাষায় এমন হাদীসে মাকবুলকে মুহ্কাম বলা হয় যা অনুরূপ হাদীসের বিরোধিতা থেকে মুক্ত। অধিকাংশ হাদীসই এ প্রকারের।
২. মুখতালাফুল হাদীস-এর সংজ্ঞা:
পরিভাষায় ঐ হাদীসকে মুখতালাফুল হাদীস বলা হয়, যা অনুরূপ হাদীসের সাথে পারস্পরিক দ্বন্দ্বযুক্ত। তবে উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব।
৩. সমন্বয় সাধন:
পরস্পর বিরোধী দুটি গ্রহণীয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার জন্য নিম্নের পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে:
(ক) যদি উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হয়, তবে উভয়টির ওপর আমল করাই ওয়াজিব।
(খ) আর যদি উভয় রিওয়ায়াতের ওপর আমল করা সম্ভব না হয়, তাহলে যদি জানা যায় একটি নাসিখ এবং অপরটি মানসূখ, তবে নাসিখটি প্রাধান্য পাবে। যদি নাসিখ ও মানসূখ সম্পর্কে অবহিত হওয়া না যায়, তাহলে প্রাধান্য প্রদানের জন্য বিদ্যমান উপায়গুলো থেকে একটিকে প্রাধান্য দিতে হবে।
নাসিখ ও মানসূখ হাদীস
১. সংজ্ঞা:
শারি (বা বিধানদাতার) পক্ষ থেকে কোন নতুন বিধান দ্বারা পূর্বের বিধানকে রহিত করে দেয়াকে পরিভাষায় নাসখ বলা হয়।
২. নাসিখ ও মানসুখ চিনবার উপায়:
(ক) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্পষ্ট ঘোষণা।
(খ) সাহাবীর উক্তির মাধ্যমে।
(গ) তারীখ জানার মাধ্যমে।
(ঘ) ইজমা'র মাধ্যমে।
টিকাঃ
৪৯. জামিউত তিরমিযী কেদর অধ্যায়, ইমাম আহমাদও হাদীসটি রিওয়ায়াত করেছেন।
৫০. সহীহ্ বুখারী ২য় খ. পৃ. ৮৫৯ কিতাবুততিব।
৫১. এটি একটি সংক্ষিপ্ত কিতাব হলেও বেশ মূল্যবান। বর্তমানে এটি মুহাম্মদ যহুরী নাজ্জারের টীকাসহ কায়রো থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
৫২. ইমাম তাহাবী ফকীহ মুহাদ্দিসদের মধ্যে গণ্য। মুশকিলুল আসার গ্রন্থটি তাঁর জীবনের সর্বশেষ গ্রন্থ।
৫৩. ইমাম আবু দাউদ এ হাদীসটি রিওয়ায়াত করেছেন।
৫৪. ইমাম মুসলিম এটি রিওয়ায়াত করেছেন।
৫৫. আবু দাউদ ও তিরমিযী এ হাদীসটি রিওয়ায়াত করেছেন।