📘 তাইসিরু মুছত্বালাহুল হাদীস 📄 প্রথম পাঠ : খবরে মুতাওয়াতির

📄 প্রথম পাঠ : খবরে মুতাওয়াতির


আমাদের কাছে পৌঁছানোর সনদের মানদণ্ডে খবর-এর প্রকরণ। আমাদের নিকট পৌছার দিক দিয়ে খবরকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়, ১. সনদের প্রতিটি স্তরে যদি বর্ণনাকারীর সংখ্যা নির্ধারিত কোন সংখ্যায় সীমিত না থাকে তবে সেই খবর (বা হাদীস) হচ্ছে মুতাওয়াতির। ২. বর্ণনাকারী সংখ্যা যদি নির্ধারিত কোন সংখ্যায় সীমিত হয়ে যায়, তবে তা আহাদ।

১. সংজ্ঞা
(ক) আভিধানিক অর্থ : আরবী মুতাওয়াতির শব্দটি আত তাওয়াতুর মাসদার থেকে ইসমে ফায়িল। অর্থ পরম্পরা, পরপর বা ক্রমান্বয়ে আসা। অবিরাম বৃষ্টি বর্ষণকে আরবীতে ‘তাওয়াতুরুল মাতার’ বলা হয়ে থাকে।
(খ) পারিভাষিক অর্থ : (মুতাওয়াতির ঐ খবরকে বলা হয়) যা এত বিপুল সংখ্যক রাবী বর্ণনা করেছেন যে তাঁদের পক্ষে কোন একটি মিথ্যা বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সাধারণত অসম্ভব।
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ এমন সনদবিশিষ্ট হাদীস অথবা খবরকে মুতাওয়াতির বলা হয়, যে সনদের সকল স্তরে বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এত অধিক যে, তাঁরা সম্মিলিত বা সর্বসম্মতভাবে সেই খবরটিকে মনগড়াভাবে তৈরি করে নিবে, এমনটি সুস্থ-স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি অসম্ভব মনে করে।

২. শর্তাবলী:
(ক) রিওয়ায়াতটি বিপুল সংখ্যক রাবী কর্তৃক বর্ণিত হবে। গ্রহণযোগ্য মতানুসারে এর সর্বনিম্ন সংখ্যা হলো দশজন।
(খ) সনদের সকল স্তরেই এ আধিক্য বিদ্যমান থাকবে।
(গ) তাঁদের মিথ্যা বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রকৃতিগতভাবে অসম্ভব মনে হবে।
(ঘ) তাঁদের বর্ণিত খবরটির ভিত হবে ইন্দ্রিয় নির্ভর। যেমন- আমরা শুনেছি বা দেখেছি অথবা স্পর্শ করেছি ইত্যাদি।

৩. হুকুম: মুতাওয়াতির দ্বারা ইলমে যরুরী তথা ইলমুল ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস) অর্জিত হয়, যার সত্যতার বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকে না। একারণে প্রত্যেকটি খবরে মুতাওয়াতিরই মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য। এর রাবীদের অবস্থা পর্যালোচনা করার কোন প্রয়োজন নেই।

৪. প্রকারভেদ: খবরে মুতাওয়াতির দু’ভাগে বিভক্ত।
(ক) মুতাওয়াতিরে লাফযী: যে বর্ণনায় বর্ণিত বিষয়ের শব্দ ও অর্থ উভয়টিই মুতাওয়াতির। যেমন: ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় আমার উপর মিথ্যারোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা খুঁজে নেয়।’
(খ) মুতাওয়াতিরে মা’নভী: যে বর্ণনায় বর্ণিত বিষয়টি শব্দগত নয়, বরং অর্থগত দিক দিয়ে মুতাওয়াতির। যেমন- দু’হাত তুলে দু’আ করা সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণিত প্রায় একশটি হাদীস।

৫. মুতাওয়াতির হাদীসের অস্তিত্ব: খবরে ওয়াহিদ-এর তুলনায় মুতাওয়াতির-এর সংখ্যা খুবই কম। যেমন- হাওযে কাওসার সংক্রান্ত হাদীস, মোজার উপর মাসাহ সংক্রান্ত হাদীস ইত্যাদি।

৬. এ বিষয়ের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী:
(ক) আলআযহারুল মুতানাছিরাহ ফিল আশ্বারিল মুতাওয়াতিরা - ইমাম সুয়ূতী।
(খ) কুফুল আযহার - ইমাম সুয়ূতী।
(গ) নাযমুল মুতানাসিরি মিনাল হাদীসিল মুতাওয়াতির - মুহাম্মাদ ইবনে জা’ফর আল কাতানী।

টিকাঃ
৫. তাদরীবুর রাবী, ২য় খ. পৃ. ১৭৭।
৬. এটা ঐ সময় হতে পারে যখন সংখ্যাধিক্যের সাথে সাথে তাঁরা বিভিন্ন দেশ, জাতি ও মাযহাব ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত হন।
৭. তাদরীবুর রাবী ২য় খ. পৃ. ১৮০।

📘 তাইসিরু মুছত্বালাহুল হাদীস 📄 দ্বিতীয় পাঠ : খবরে আহাদ

📄 দ্বিতীয় পাঠ : খবরে আহাদ


১. সংজ্ঞা
(ক) আভিধানিক অর্থ: আল আহাদ শব্দটি আহাদুন এর বহুবচন, অর্থ, এক। এক ব্যক্তির রিওয়ায়াতকে খবরে ওয়াহিদ বলা হয়।
(খ) পারিভাষিক অর্থ : যে রিওয়ায়াত মুতাওয়াতির এর শর্তে উত্তীর্ণ নয়, তাকেই আহাদ বলা হয়।⁸

২. হুকুম: খবরে ওয়াহিদ দ্বারা ইলমে নযরী বা তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ হয়। অর্থাৎ খবরে ওয়াহিদের জ্ঞান তত্ত্ব ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল।

৩. বর্ণনাকারী সংখ্যার বিবেচনায় খবরে ওয়াহিদ এর প্রকারভেদ:
(ক) মাশহুর
(খ) আযীয
(গ) গারীব

খবরে মাশহুর
১. সংজ্ঞা
(ক) আভিধানিক অর্থ: মাশহুর এটি ইসমে মাফউল। যখন একটি বিষয় প্রকাশ ও প্রচার লাভ করে তখন তাকে এ নামে অভিহিত করা হয়।
(খ) পারিভাষিক অর্থ : যে হাদীসের বর্ণনার প্রত্যেক স্তরে অন্তত তিনজন বা তার অধিক রাবী বিদ্যমান, কিন্তু রাবীদের সংখ্যা মুতাওয়াতির এর পর্যায়ে পৌঁছেনি তাকে মাশহুর বলা হয়।

২. উদাহরণ: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী, ‘আল্লাহ্ তা’আলা বান্দাদের কাছ থেকে ইলম ছিনিয়ে নেন না, বরং তিনি আলিমদেরকে উঠিয়ে নিয়ে ইলম উঠিয়ে নেন।’

৩. মুস্তাফীয: এর পারিভাষিক অর্থে তিনটি অভিমত আছে: ১. এটি ‘মাশহুর’-এর সমার্থক শব্দ। ২. এটি ‘মাশহুর’ এর তুলনায় খাস। ৩. এটি মাশহুর এর তুলনায় আম।

৪. অ-পারিভাষিক মাশহুর: এর দ্বারা ঐ সব মাশহুর হাদীসকে বুঝানো হয়েছে যা লোক মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে কিন্তু বাস্তবে মাশহুর এর শর্তাবলী তাতে নেই। যেমন:
(ক) শুধু মুহাদ্দিসীনে কিরামের নিকট মাশহুর: যেমন রাসুলুল্লাহ (সা) এর এক মাস পর্যন্ত বদ দু’আ করার হাদীস।¹⁰
(খ) মুহাদ্দিস আলিম এবং সর্বসাধারণের নিকট মাশহুর: ‘মুসলিম ঐ ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।’¹¹
(গ) শুধু ফুকাহায়ে কিরামের নিকট মাশহুর: ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপ্রিয় হালাল হচ্ছে তালাক।’¹²
(ঘ) উসূলবিদদের নিকট প্রসিদ্ধ: ‘আমার উম্মতের ওপর থেকে ভুল-ভ্রান্তি ও বল প্রয়োগ জনিত গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়েছে।’
(ঙ) ব্যাকরণবিদগণের নিকট মাশহুর: ‘সুহাইব খুব ভাল লোক, যদি সে আল্লাহকে ভয় না করতো তবে আল্লাহ তাকে হিফাযত করতেন না।’ (এটি ভিত্তিহীন)
(চ) সর্বসাধারণের নিকট প্রসিদ্ধ: ‘তাড়া-হুড়া করা শয়তানের কাজ।’

৫. খবরে মাশহুর-এর হুকুম: পারিভাষিক মাশহুর আযীয ও গারীব হাদীসের ওপর প্রাধান্য পাবে।

৬. এ বিষয়ের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী:
(ক) আলমাকাসিদুল হাসানাহ্ - সাখাবী (র)।
(খ) কাশফুল খাফায়ি ওয়া মুযীলুল ইল্বাস - আজলুনী।
(গ) তামীযুত তাইয়িবি মিনাল খাবীসি - ইবনে দীবা আশ শাইবানী।

টিকাঃ
৮. নুযহাতুন নযর পৃ. ২৬
১০. বুখারী ও মুসলিম।
১১. বুখারী ও মুসলিম।
১২. হাকিম তাঁর ‘আলমুসতাদরাক’ গ্রন্থে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যাহাবীও একে সহীহ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে তাঁর শাব্দালী নিম্নরূপ - মা আহাল্লাল্লাহু শাইআন আবগাযা ইলাইহি মিনাত তালাক।

ফন্ট সাইজ
15px
17px