📘 তাগুত > 📄 ইসলামী নাম দিয়ে দল গঠন (বা ফিরকা) করা হারাম বিদয়াত

📄 ইসলামী নাম দিয়ে দল গঠন (বা ফিরকা) করা হারাম বিদয়াত


ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ উনার বিখ্যাত পুস্তকদ্বয় (MAJMOO-UL-FATAWA and AL-UQOOD-UD-DURREEYAH-Letters from the prison) এ লিখেছেন যারা ইসলামের নামে দল গঠন বা দলাদলি (ফিরকাবাজি) করে তারা 'আহলুল সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ'র অর্ন্তভূক্ত নয় বরং তিনি তাদের নাম দিয়েছেন 'আহলুল ফিরকা ওয়াল বিদয়াহ'। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা হাদীসের ভাষায় হত্যাযোগ্য গর্হিত অপরাধ। কুরআনের বহু আয়াত এবং হাদীসে রাসূল দ্বারা প্রমাণিত আমরা সমস্ত বিশ্বের মুসলিমরা একই জাতি এবং এক উম্মাহ। ভাষা, সম্পদ, গায়ের রঙ যাই হোক না কেন সমস্ত দুনিয়ার মুসলিমরা উম্মতে মুহাম্মদ (সাঃ) এবং আমাদের রব এবং ইলাহ হলেন এক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা। আজ ইহুদী, খৃষ্টান আর হিন্দুচক্রের বানানো জাতিসংঘের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে পঞ্চাশের আরো অধিক দেশে ভাগ করে আমাদের মাথার উপর তাবেদার, জাতীয়তাবাদী, তাদেরই পোষ্য কুকুর তাগুত সরকারদের বসিয়ে রেখেছে। আমাদের নিজেদের মাঝে হিংসা বিদ্বেষের বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে তারা তামাশা দেখছে আর যখন যার উপর ইচ্ছা নিজেদের আক্রোশ পূরণ করছে। মুসলিমরা আজ আল্লাহর শরীয়াহ দিয়ে নিজেদের রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারছে না। পালন করতে পারছে না জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া হুকুম আহকাম সমূহ। সমস্ত দুনিয়ার মুসলিমরা নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, দারিদ্রতার করালগ্রাসে পড়ে আছে। অথচ মুসলিমদের পায়ের নীচেই আল্লাহ তাআলা দিয়ে রেখেছেন দুনিয়ার সকল প্রাকৃতিক সম্পদের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ। কত আশ্চর্যের ব্যাপার সম্পদ মুসলিমদের আর বড়লোক ইহুদী খৃস্টান আর পৌত্তলিকরা! এসকল দুরাবস্থার অন্যতম কারণ হল, মুসলিমদের মাঝে দলাদলি আর ফিরকাবাজি ও কুরআন সুন্নাহর প্রকৃত জ্ঞানের অভাব। যারা কুরআন সুন্নাহ কিছুটা বুঝার চেষ্টা করে তারা নিজেরাই একটা দল বানিয়ে নেয় ইসলামের নামে। অথচ উম্মাহকে বিভক্তি করা হারাম। আমরা জানি ৫২টি দেশ মিলে আঠার শতকে একটি দেশ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট (UNITED STATES OF AMERICA)। ঐক্য তাদেরকে বর্তমানে অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। ২০০০ সালে আমাদের চোখের সামনে সমস্ত ইউরোপ মিলে (E.U) ইউরো গঠন করল। তারা কি সাদা চামড়া বলে এক হয়েছে? কখনও নয়, কারণ যদি তাই হোত তবে বসনিয়ান মুসলিম আর আলজেরিয়ান ও চেচনিয়ান মুসলিমদের তারা এভাবে গনহত্যা কখনও করতো না। তারা ঐক্য গঠন করেছে কারণ তারা খ্রীস্টান। দুনিয়ায় হিন্দুদেরও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আছে হিন্দুস্থান। দুনিয়ায় ভ্রান্ত আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত শিয়াদের একটি রাষ্ট্র আছে-ইরান। আর আমরা মুসলিমরা বিভ্রান্ত জাতির মত পথ হারা হয়ে ঘুরে মরেছি আর রোজই ইসলামের নামে নতুন দল গঠন করেছি। অথচ কুরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণা: "যারা কাফের তারা একে অপরের সহযোগী (এবং) যদি তোমরা (সারা দুনিয়ার মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধভাবে) তা না কর [সহযোগী না হও, এক উম্মাহ হিসাবে এক খলিফার নেতৃত্বে (সর্ব্বোচচ মুসলিম নেতা পুরো মুসলিম বিশ্বের) আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করে তওহীদ বা একত্ববাদের প্রতিষ্ঠা না কর] তাহলে পৃথিবীতে সৃষ্টি হবে ফিতনা, ফাসাদ, বিপর্যয় ও বিশৃংখলা (শিক্ক হবে প্রতিষ্ঠিত)।” (আল-আনফাল ৪ ৭২-৭৩) [Translation taken from: THE NOBLE QURAN by DR. MD. MUHSIN KHAN; P-241 (V.8; 73) It has been mentioned in tafsir At-Tabari ]

"তোমাদের এ উম্মত হচ্ছে একই উম্মত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমাকেই তোমরা ভয় করো। কিন্তু পরে লোকেরা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে নিয়েছে। প্রত্যেক দলের কাছে যা কিছু আছে তার মধ্যে তারা নিমগ্ন হয়ে গেছে। ভালোই, তাহলে ছেড়ে দাও তাদেরকে, ডুবে থাকুক নিজেদের গাফিলতির মধ্যে একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত। তারা কি মনে করে, আমি যে তাদেরকে অর্থ ও সম্মান দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছি, তা দ্বারা আমি তাদেরকে কল্যাণ দানে তৎপর রয়েছি! না তাহা নয়, আসল ব্যাপার সম্পর্কে তাদের কোন চেতনাই নেই"। (আল-মুমিনুন ৪৫২-৫৬)

"তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য (দলাদলি) সৃষ্টি করো না।" (আশ শুরা-১৩)

"আর তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করো, তোমরা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (আলে ইমরান: ১০৩) রাসূল (সাঃ) এ সমস্ত ফিরকার নেতা এবং তাদের দলের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেনঃ হুদাইফাহ্ বিন আল-ইয়ামান (রাঃ) থেকে দুটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে (বুখারী ও মুসলিম) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসের শেষ অংশে রাসূল (সাঃ) বলেছেন: তারপর আমি (হুদাইফাহ্ বিন আল-ইয়ামান) জিজ্ঞেস করলাম ঐ আংশিক ভালোর পর কি আবার মন্দ আসবে? তিনি (সাঃ) জবাব দিলেন "হ্যাঁ দোজখের আগুনের ফটকের আহবানকারীরা (অর্থাৎ ইসলামীদলের নামধারী ফিরকার নেতারা), যে ব্যক্তিই তাদেরকে ইতিবাচক জবাব দেবে (অর্থাৎ তাদের বানান ইসলামী দলে বা ফিরকায় যোগ দিবে) তারা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।” আমি তখন তাকে তাদের সম্পর্কে আমাদের কাছে বিবরণ দিতে বললাম, তিনি বললেন, "তারা আমাদের জাতির লোক হবে, এবং আমাদের ভাষায়ই কথা বলবে।” (অথাৎ মুসলিম জাতির লোক এবং ইসলামের ভাষায় কথা বলবে) আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- আমি যদি সে সময় বেঁচে থাকি তাহলে আপনি আমাকে কি উপদেশ দেবেন, তিনি (সাঃ) বললেন, মুসলমানদের মূল অংশের (জামায়াহতুল মুসলিমীন) এবং তাদের ইমামের (খলিফাহ) সাথে লেগে থাকবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম যদি কোন জামায়াহ বা ইমাম (খলিফা) না থেকে তাহলে কি করবো। তিনি জবাব দিলেন "সকল দল থেকে বেরিয়ে যাও এমনকি সেক্ষেত্রে যদি তোমাকে তোমার (তুমি যখন তোমার ঐ অবস্থায় থাক) কাছে মৃত্যু না আসা পর্যন্ত গাছের তলায় বসে থাকতে হয় তবুও।” (BUKHAARI: vol. 4 [no.803] and vol. 9 [no. 206]. MUSLIM [no. 4553]) (বুখারীর হাদীসে বর্ণিত) রাসূল (সাঃ) পুরো উম্মাহকে একটি মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করেছেন, একটি শরীরের মাথা একটি হয় অর্থাৎ একজন আমিরুল মুমিনীন বা খলিফার নেতৃত্বে সমস্ত উম্মাহকে সর্বাবস্থায় একত্রিত থাকা আমাদের জন্য ফরয হুকুম। খলিফাকে বাইয়াত না দিয়ে মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ থাকা বিষয়টি এত জরুরী যে তার জন্য দরকার হলে একজন মুসলিমকেও হত্যা করতে হতে পারে। আবু সা'ঈদুল খুদরী কর্তৃক বর্ণিত যে নবী (সাঃ) বলেছেন "যদি দুজন খলিফাহ আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি (বাইয়াহ) নেন তবে তাদের শেষোক্ত জনকে হত্যা কর।" (মুসলিম কিতাবুল ইমারাহ)

তবুও মুসলিমকে দলা-দলি করা যাবে না। কোরআন আর সুন্নাহতে কোথাও একবার ও বলা হয়নি দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) না থাকলে তোমরা আলাদা আলাদা ইসলামী দলে ভাগ হয়ে থাকতে পারবে। এ সংক্রান্ত সকল দলিলে তাফাররাক বা দলাদলিকে সম্পূর্ণ নিষেধ বা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে কঠোরভাবে। তাই দলাদলি করা হারাম বিদয়াত। [এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা আমাদের পরবর্তী বই আল জামায়াহ থেকে পাবেন ইনশাআল্লাহ]

📘 তাগুত > 📄 পীর মুরিদীর বিদয়াত

📄 পীর মুরিদীর বিদয়াত


ইসলামের সুন্নাতী আদর্শে আর একটি মারাত্মক ধরনের বিদয়াত দেখা দিয়েছে- তা হল পীর-মুরীদী। পীর-মুরীদীর যে সিলসিলা' বর্তমানকালে দেখা যাচ্ছে, এ জিনিস সম্পূর্ণ নতুন ও মনগড়াভাবে উদ্ভাবিত। এ জিনিস রাসূলে করীম (সাঃ)- এর যুগে ছিল না, তিনি পীর-মুরীদী করেন নি কখনো। তিনি নিজে বর্তমান অর্থে না ছিলেন পীর আর না ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর মুরীদ। সাহাবায়ে কিরামও এ পীর-মুরীদী করেন নি কখনো। তাঁদের কেউ কারো 'পীর' ছিলনা এবং কেউ ছিলো না তাদের মুরীদ। তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগেও এ পীর-মুরীদীর নাম চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু তাই নয়। কুরআন হাদীস তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এ পীর-মুরীদীর কোন দলীলের সন্ধান পাওয়া যাবে না। অথচ বর্তমানকালের এক শ্রেণীর পীর নামে কথিত জাহিল লোক ও তাদের ততোধিক জাহিল মুরীদ এ পীর-মুরীদীকে ইসলামের অন্যতম ভিত্তিগত জিনিস বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। আর এর মাধ্যমে অজ্ঞ মুর্খ লোকদের মুরীদ বানিয়ে এক একটি বড় আকারের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।

শরীয়াত মারিফাত : এ পর্যায়ে সবচেয়ে মৌলিক বিদয়াত হল শরীয়ত ও তরীকতকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন এবং পরস্পর সম্পর্কহীন দুই স্বতন্ত্র জিনিস মনে করা। এতোদূর পতন ঘটেছে যে, শরীয়াতকে 'ইলমে জাহের' এবং 'তরিকত বা মারিফাতকে ইলমে বাতেন বলে অভিহিত করে দ্বীন ইসলামকেই দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়া হয়েছে। এক শ্রেণীর জাহিল তরীকতপন্থী বলতে শুরু করেছে যে, ইসলামের আসলই তরীকত মারিফাত, আর এ-ই হাকীকত। এ হাকীকত কেউ যদি লাভ করতে পারল, তাহলে তাকে শরীয়াত পালন করতে হয় না, সেতো আল্লাহকে পেয়েই গেছে। তাদের মতে শরীয়াতের আলিম এক, আর মারিফাত বা তরীকতের আলিম অন্য। এই তরীকতের আলিমরাই উপমহাদেশে পীর নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। কিন্তু তাসাউফবাদীরা এ মারিফাতকে কেন্দ্র করে গোলক ধাঁধার এক প্রাসাদ রচনা করেছে। তাদের মতে মারিফাত বা ইলমে বাতেন ইসলামী শরীয়াত থেকে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জিনিস। তাদের মতে রাসূলে করীম (সাঃ) নাকি এ মারিফাত তাঁর কোন কোন সাহাবীকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, আর অনেককে দেন নি। তাঁরা আরো মনে করেন, ইলমে বাতেন হযরত আলী (রাঃ) থেকে হাসান বসরী পর্যন্ত পৌঁছেছে। আর তাঁরই থেকে সীনায়-সীনায় এ জিনিস চলে এসেছে এ কালের পীরদের পর্যন্ত। এই সমস্ত কথাই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেননা রাসূলে করীম (সাঃ) কাউকেই এ জিনিস শিখিয়ে জান নি, যা এখনকার পীর তার মুরীদকে শিখিয়ে থাকে। তিনি এরূপ করতে কাউকে বলেও যান নি। কোন দরকারী ইলম তিনি কোন কোন সাহাবীকে শিখিয়ে দেবেন, আর অনেক সাহাবীকেই তা থেকে বঞ্চিত রাখবেন- এরূপ করা নবী করীমের নীতি ও আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তা ছাড়া হাসান বসরী, আলী (রাঃ) এর সাক্ষাত পাননি, তাঁর নিকট থেকে মারিফাত শিক্ষা করা ও খিলাফতের 'খিরকা' লাভ করা তো দূরের কথা। আসলে এ কথাটাই বাতিল। শেষের জামানার ভন্ড লোকেরা এটাকে রচনা করেছে প্রচার ও কবুল করেছে। আর এ ধরনের কথা আদৌ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আলামা মুলা আলী আল-কারী আল্লামা ইবনে হাযার আল-আসকালানীর (রহঃ) (৭৭৩হিঃ-৮৫২হিজরী, যিনি বুখারী শরীফের তাফসীর বা ভাষ্য গ্রন্থ 'ফতহুল বারী' লিখেছেন) উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ সুফী ও মারিফাতপন্থীরা যে সব তরীকা ও নিয়ম-নীতি প্রমাণ করতে চায়, তা প্রমাণ হওয়ার মত কোন জিনিস-ই নয়। সহীহ, হাসান বা যয়ীফ কোন প্রকার হাদীসেই একথা বলা হয়নি যে, নবী করীম (সাঃ) তাঁর কোন সাহাবীকে তাসাউফপন্থীদের প্রচলিত ধরনে খিলাফতের' খিরকা' (বিশেষ ধরনের জামা বা পোষাক) পরিয়ে দিয়েছেন। সেরূপ করতে তিনি কাউকে হুকুমও করেন নি। এ পর্যায়ে যা কিছু বর্ণনা করা হয়, তা সবই সুস্পষ্টরূপে বাতিল। তা ছাড়া হযরত আলী হাসান বসরীকে 'খিরকা পরিয়েছেন (মারিফাতের খিলাফাত দিয়েছেন) বলে যে দাবি করা হয়, তা সম্পূর্ণরূপে মনগড়া মিথ্যা কথা।

শাহ ওয়ালী উলাহ দেহলভী এ সম্পর্কে লিখেছেনঃ মারিফাতের যেসব তরীকা, মুরাকাবা-মুশাহিদা ও যিকির এখনকার পীরেরা তাদের মুরীদদের শিখিয়ে থাকে, তা রাসূলে করীম (সাঃ) বা সাহাবায়ে কিরামের জামানায় ছিল না। উপায়-উপার্জন ত্যাগ করা, তালিযুক্ত পোশাক পরা ও বিয়ে-ঘর সংসার না করা ও খানকার মধ্যে বসে থাকা সেকালে প্রচলিত ছিল না।

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে এ দর্শনের সঠিক পরিচয় হল অদ্বৈতবাদ (হিন্দুদের আকীদার ভিত্তি)। মানে আল্লাহ্ ও জগত কিংবা স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক ও অভিন্ন বিশ্বাস করা যা কি না ভ্রান্ত আক্বিদা। যা সৃষ্টি তাই স্রষ্টা এবং যিনি স্রষ্টা তিনিই সৃষ্টি - অদ্বৈতবাদী মতাদর্শের এই গোড়ার কথা। আর তা-ই হচ্ছে হিন্দু ধর্মের তত্ত্ব, যা বর্তমানে পীর-মুরীদী ধারায় ইসলামের মারিফাত নাম ধারণ করে মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়েছে এবং এ যে স্পষ্ট শিরক তাতে এক বিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই। বস্তুত ইসলাম এক সর্বাত্মক দ্বীন, মানুষ যখন শরীয়াত মুতাবিক আমল করে, তখন হয় শরীয়াতের আমল। পীর-মুরীদী সম্পর্কে মুজাদ্দিদে আলফেসানী শরীয়াত ও মারিফাত পর্যায়ে তিনি তাঁর মাকতুবাতে লিখেছেনঃ কাল কিয়ামতের দিন শরীয়াত সম্পর্কেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তাসাউফ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞাসা করা হবে না। জান্নাতে যাওয়া ও জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া শরীয়তের বিধান পালনের উপর নির্ভরশীল।

শরীয়াতের বিধান জানার মাধ্যম-- শরীয়াতে মুহাম্মদীর নীতি ও বিধান বুঝার জন্য আমাদের সামনে দু'টি মাধ্যম রয়েছে। প্রথম হচ্ছে কুরআন মজীদ, আর দ্বিতীয় হাদীস। কুরআন মজীদ সম্পর্কে সকলেই জানেন যে, তা হচ্ছে আল্লাহর কালাম এবং তার প্রতিটি শব্দ আল্লাহর কাছে থেকে এসেছে। হাদীস বললে বুঝায় সেসব বর্ণনা, যা রাসূলে করীম (সাঃ) থেকে আমাদের কাছে এসে পৌছেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সারা জীবনই ছিল কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা। নবী হওয়ার সময় থেকে শুরু করে তেইশ বছর কাল তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কেটেছে মানুষকে শিক্ষা ও পথ নির্দেশ (হেদায়াত) দানের কাজে এবং আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জী অনুযায়ী জীবন যাপনের পদ্ধতি তিনি মানুষকে শিখিয়ে গেছেন তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে।

ফিকাহ- কুরআন ও হাদীসের বিধান সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে উলিল ইলম বা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত আলেমগণ সাধারণ লোকদের সুবিধার জন্য আইনসমূহ বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের লিখিত গ্রন্থরাজিকে বলা হয় 'ফিকাহ'। যেহেতু প্রত্যেক মানুষই কুরআন শরীফের সবগুলো সূক্ষ্ম তত্ত্ব বুঝে উঠতে পারে না এবং প্রত্যেকটি মানুষ হাদীস সংক্রান্ত বিদ্যায় এতটা পারদর্শী নয়, যাতে নিজেরা শরীয়াতের বিধান বুঝে নিতে পারে, তাই উলিল ইলমরা বছরের পর বছর মেহনত করে, চিন্তা-গবেষণা করে 'ফিকাহ' শাস্ত্র প্রণয়ন করেছেন।

তাসাউফঃ ফিকাহর সম্পর্ক হচ্ছে মানুষের প্রকাশ্য কার্যকলাপের সাথে। তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে এই যে, আমাকে যেভাবে, যে পদ্ধতিতে কোন কাজ করার বিধান দেয়া হয়েছে, সঠিকভাবে তা করছি কিনা। যদি তা সঠিকভাবে পালন করে থাকি, তা হলে মনের অবস্থা কি ছিল, তা নিয়ে ফিকাহর কিছু বলবার নেই। ইবাদতের সময় মনের অবস্থার সাথে যার সম্পর্ক সে জিনিসটিকে বলা হয় তাসাউফ (কুরআন শরীফে এ জিনিসটির নাম দেয়া হয়েছে 'তাযকিয়া' ও 'হেকমত' হাদীসে একে বলা হয়েছে 'ইহসান' এবং পরবর্তী লোকেরা একে অভিহিত করেছেন 'তাসাউফ'নামে।) যেমন কেউ সালাত আদায় করছে, সেখানে ফিকাহ কেবলমাত্র এতটুকুই দেখেছে যে, সে ঠিক মত ওযু করল কিনা। কেবলার দিকে মুখ করে দাঁড়াল কিনা, সালাতের সবগুলো অপরিহার্য শর্ত পালন করল কিনা, সালাতের মধ্যে যা কিছু পড়তে হয় তা সে পড়ল কিনা এবং যে সময়ে যে কয় রাকায়াত সালাত নির্ধারিত রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে তত রাকায়াত পড়ল কিনা। যখন এর সবগুলো শর্ত পালন করা হল তখন ফিকাহর দৃষ্টিতে তার সালাত পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এক্ষত্রে তাসাউফ দেখে যে, এ ইবাদতে তার দিলের অবস্থা কি ছিল?সে আল্লাহর দিকে নিবিষ্টচিত্ত ছিল কিনা? তার দিল পার্থিব চিন্তা-ভাবনা থেকে মুক্ত ছিল কিনা? সালাত থেকে তার অন্তরে আলাহর ভীতি, তাঁর হাযির-নাযির থাকা সম্পর্কে প্রত্যয় এবং একমাত্র তারই সন্তোষ বিধানের আকাংখা পয়দা হয়েছিল কিনা? এ সালাত তার আত্মাকে কতটা পরিশুদ্ধ করেছে? তার চরিত্র কতটা সংশোধন করেছে? তাকে কতটা সত্যসাধক ও সৎকর্মশীল মুসলিম করে তুলেছে? সালাতের সত্যিকার লক্ষ্যের পথে যেসব বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে, একজন লোক তার যতটা পরিপূর্ণতা হাসিল করল, তাসাউফের দৃষ্টিতে তার সালাত ততটা বেশী পূর্ণতা লাভ করেছে। আর সে দিক দিয়ে যতটা দুর্বলতা থেকে যাবে, তারই জন্য তার সালাতকেও ততটা দুর্বল বলে ধরা হবে।

একটি দৃষ্টান্ত থেকে এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারা যায়। যখন কোন বিশেষ ব্যক্তি কারো সাথে সাক্ষাত করে তখন সে দু'টি দৃষ্টিভংগিতে তার প্রতি নযর করে। এক হচ্ছে: লোকটি পূর্নাংগ ও স্বাস্থ্যবান কিনা; অন্ধ, কানা, খোঁড়া, তো নয়। লোকটি সুশ্রী বা কুশ্রী; তার পরিধানে ভাল কাপড়-চোপড়, না ময়লা জীর্ণ কাপড়, দ্বিতীয় হচ্ছে: তার চরিত্র কি ধরনের, তার স্বভাব ও অভ্যাস কিরূপ, তার জ্ঞান-বুদ্ধি কি প্রকারের। সে আলেম না জাহেল, সৎ না অসৎ। এর মধ্যে প্রথম নযরটি হচ্ছে ফিকাহর নযর, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাসাউফের নযর। বন্ধুত্বের জন্য যখন কোন লোককে কেউ পছন্দ করতে চেষ্টা করবে, তখন তার ব্যক্তিত্বের দু'টি দিকই যাচাই করে দেখতে হবে। তার ভেতর ও বাইরের দু'টি দিকই সুন্দর হোক এ হবে তার আকাংখা। এমনি করে ইসলামেও যে বাঞ্ছিত জীবনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে বাইরের ও ভিতরের উভয়বিধ বিশ্বাসের দিক দিয়ে শরীয়াতের বিধি-বিধানের আনুগত্য করতে হবে।

এ দৃষ্টান্ত থেকে ফিকাহ ও তাসাউফের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে পারা যায়। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, পরবর্তী যামানায় যেখানে জ্ঞান ও চরিত্রের বিকৃতি হেতু বহুবিধ অনাচার জন্ম লাভ করেছে সেখানে তাসাউফের পবিত্র রূপকেও বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। বিভ্রান্ত জাতিসমূহের কাছ থেকে ইসলাম বিরোধী দর্শনের (গ্রীক দর্শন, প্রাচীন মিশরিয় দর্শন ও ভারতীয় বেদান্ত দর্শন) শিক্ষা লাভ করে মানুষ তাকে তাসাউফের নামে ইসলামের মধ্যে দাখিল করে নিয়েছে। কুরআন ও হাদীসে যার অস্তিত্ব নেই, এমনি বহু বিচিত্র ধরনের বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতি তারা তাসাউফের নামে চালিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের লোকেরা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে শরীয়তের আনুগত্য থেকে মুক্ত করে নিয়েছে। তাঁদের মতে তাসাউফের সাথে শরীয়তের কোন সম্পর্ক নেই। এখানে আরেকটি ভিন্নতর জগত বিরাজ করছে। পীর ও সুফীরাই এ ধরনের মত পোষণ করে থাকে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিপ্রসূত। অথচ পূর্বের কোন যুগেই 'ইলমে তাসাউফ বা শুধু তাসাউফ এ নামের কোন ইলম ইসলামে ছিল না, মুসলমানরা জানত না। 'ইসলামে শরীয়াত ও মারিফত দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়'-এ ধারণা এক অতি বড় বিদয়াত। যেমন অতি বড় বিদয়াত হচ্ছে ইসলামে ধর্ম আর রাজনীতিকে দুই বিচ্ছিন্ন জিনিস মনে করা। ধর্ম ও রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন করে রাজনীতির ক্ষেত্রে ফাসিক ফাজির-জালিম লোকদের কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছে। আর দ্বীনকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে শুধু নামায-রোযা, হজ্জ ও যাকাতের মধ্যে। অনুরূপভাবে শরীয়াত আর তরীকতকে বিচ্ছিন্ন করে সৃষ্টি হয়েছে এক শ্রেণীর জাহেল পীর। মুসলিম সমাজে চলেছে পীরবাদ নামে এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মুশরিকী প্রতিষ্ঠান। এ পীরবাদ চিরদিনই ফাসিক-ফাজির-জালিম শাসকদের, রাজা-বাদশাদের আশ্রয়ে লালিত-পালিত শাখায় পাতায় সুশোভিত হয়েছে। সাধারণত পীরেরা চিরদিনই এ ধরনের শাসকদের সমর্থন দিয়েছে। তারা কোন দিনই জালিম-ফাসিক শাসকদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করে নি। বরং সব সময়ই 'আল্লাহ আপকা হায়াত দারাজ করে' বলে দু'হাত তুলে তাদের জন্য দোয়া করেছে।

শরীয়তের বিধি-বিধানের সাথে সম্পর্ক থাকবে না, ইসলামে এমন কোন তাসাউফের স্থান নেই। কোন সুফীরই সালাত, সওম, হজ্জ ও যাকাতের আনুগত্য থেকে মুক্তি লাভের অধিকার নেই। সমাজ-জীবন, নৈতিক দায়িত্ব, চরিত্র, পারস্পরিক আদান-প্রদান, অধিকার, কর্তব্য ও হালাল-হারামের সীমানা সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূল যে নির্দেশ দিয়েছেন কোন পীর বা সুফীরই সেই নিয়মের বিরোধী কার্যকলাপের অধিকার নেই। যে ব্যক্তি সঠিকভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর আনুগত্য করে না এবং তাঁর নির্ধারিত কর্মপদ্ধতির অনুসরণ করে না, মুসলিম সুফী বলে পরিচয় দেয়ার যোগ্য সে নয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি সত্যিকার প্রেমই হচ্ছে তাসাউফ এবং প্রেমের দাবী হচ্ছে এই যে, কেউ যেন আল্লাহর বিধান ও তার রাসূলের আনুগত্য থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত না হয়। ইসলামী তাসাউফ শরীয়াত থেকে স্বতন্ত্র কিছু নয়, বরং শরীয়াতের বিধানসমূহকে সর্বাধিক আন্তরিকতা ও সৎসংকল্প সহকারে পালন করা এবং অন্ত রের ভিতরে আল্লাহর প্রেম ও ভীতির মনোভাব সিক্ত ও সঞ্জীবিত করার নামই হচ্ছে তাসাউফ।

শরীয়াত আর তরীকতকে যারা দুটো জিনিস মনে করে নিয়েছে এবং তরীকতের অর্থহীন অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় যারা নিমগ্ন হয়েছে, মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহঃ) তাদেরকে জাহেল ও বিভ্রান্ত লোক বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আজ জাহেল পীরেরা নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থের জন্যে এবং শরীয়াত পালন ও কায়েমের দায়িত্বপূর্ণ কাজ থেকে দূরে খানকা শরীফের চার দেয়ালের মধ্যে সহজ ও সস্তা সুন্নাত পালনের অভিনয় করার জন্যে শরীয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন 'তরীকত' নামের এ নতুন বস্তুর প্রচলন করে চলেছে। পীরদের মুরীদ বানাবার ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন হচ্ছে কাশফ ও ইলহামের দোহাই। পীরেরা যখন বলেঃ আমার কাশফ হয়েছে, ইলহাম যোগে আমি একথা জানতে পেরেছি, তখন জাহেল মুরীদান ভক্তিতে গদগদ হয়ে পীরের কদমবুসি শুরু করে। কিন্তু এসব জিনিস যে পীর-মুরীদীর ব্যবসা চালাবার জন্যে হয়, তা বুঝবার ক্ষমতা এই মুর্খ পীরদের মুরীদদের নেই।

কিন্তু জাহেল পীরেরা শরীয়াতের ধার ধারে না। তারা ইলহামের দোহাই দিয়ে জায়েয-নাজায়েয, হালাল-হারাম ও ফরয-ওয়াজিব ঠিক করে ফেলে। আর অন্ধ মুরীদরা তাই মাথা পেতে মেনে নেয়, শরীয়াতের হুকুমের প্রতি তাকাবার খেয়ালও জাগে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়- পীর ও সূফী লোক নিজেরা যেমন সাধারণত জাহেল হয়ে থাকে, মুরীদদেরকেও তেমনি জাহেল করে রাখতে চায় এবং তাদের দ্বীন ইসলাম ও ইসলামী শরীয়াত সম্পর্কে কুরআন হাদীস থেকে জ্ঞান অর্জন করার জন্যে কখনো হিদায়াত দেয় না। পীর কিবলা মুরীদকে মুরাকাবা করতে বলবে, আল্লাহর যিকির করতে বলবে এবং হাজার বার করে বানানো দরূদ শরীফের অজীফা' পড়তে বলবে; কিন্তু আল্লাহর কালাম দ্বীন- ইসলামের মূল উৎস কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করতে তার তরজমা ও তাফসীর বুঝতে এবং আল্লাহর কথার সাথে গভীরভাবে পরিচিত হতে কখনই বলবে না। মোগলদের ইসলাম-বিরোধী শাসনামলে মুজাদ্দিদে আলফেসানী যখন দ্বীন- ইসলাম প্রচার এবং বাতিলের প্রতিবাদ শুরু করেন, তখন বাতিল পীরেরা তাঁর এ কাজের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায়।
বস্তুত বায়আত করা সুন্নাত মুতাবিক কাজ বটে; কিন্তু পীর-মুরীদীর বায়আত সম্পূর্ণ বিদয়াত, যেমন বিদয়াত স্বয়ং পীর-মুরীদী। বায়আত দিতে হবে এবং বায়আত না দিয়ে মারা গেলে জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে সহীহ হাদীস দ্বারা একথা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু এই বায়আত দিতে হবে সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে শুধুমাত্র একজন আমীরুল মুমিনীন বা খলিফাকে আনুগত্য করার শপথের জন্য। যেমন নবী করীম (সাঃ)-এর ইন্তিকালের পর খলীফা নির্বাচনী সভায় হযরত উমর ফারুক (রাঃ) সর্বপ্রথম বায়'আত করলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর হাতে। চিশতীয়া, নকশাবন্দীয়া, মুজাদ্দিদীয়া ও মুহাম্মদীয়া তরীকায় ফকীর হাকীরের হাতে বায়আত লওয়ার বর্তমানকালে প্রচলিত এই সিলসিলা এল কিভাবে, এ বায়আতের সাথে নবী করীম (সঃ) সাহাবাদের বায়আতের সম্পর্ক কি? মিল কোথায়? আসলে এ হচ্ছে ইসলামের একটি ভাল কাজকে খারাপ ক্ষেত্রে ও খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার মত ব্যাপার। আর এ কারণেই পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে হাতে হাতে কিংবা পাগড়ী ধরে অথবা পাগড়ী ধরা লোকের গায়ে গা মিলিয়ে বায়আত করা, বায়আত করা নানা তরীকায় মুরাকাবা করার জন্যে- সম্পূর্ণ বিদয়াত। আরো বড় বিদয়াত হল মুরীদ ও পীরের কুরআন বাদ দিয়ে 'দালায়েলুল খায়রাত' নামে এক বানানো দরূদ সম্বলিত কিতাবের তিলাওয়াতে মশগুল হওয়া। মনে হয় এর তিলাওয়াত যেনো একেবারে ফরয। কিন্তু শরীয়াতে কুরআন ছাড়া আর কিছু তিলাওয়াত করাকে বড় সওয়াবের কাজ মনে করা, কুরআন অপেক্ষা অন্য কোন মানবীয় কিতাবকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা সুস্পষ্টরূপে এক বড় বিদয়াত।

কোন মতে একজন লোক যদি একবার 'পীর' নামে খ্যাত হতে পারল, অমনি তাঁর বড় পুত্র অবশ্যই তাঁর গদীনশীন হবে। কিন্তু পীরের গদী কোনটি, যার উপর বড় সাহেব 'নশীন' হন। পীর কি কোন জমিদার যে, তার মৃত্যুর পর তার বড় পুত্র বাবার স্থলে জমিদার হয়ে বসবে। ইসলামে নেই কোন জমিদারী, বাদশাহী; নেই দ্বীন নিয়ে এখানে কোন দোকানদারী ব্যবসা চালাবার অবকাশ। কেউ পীর নামে খ্যাত অমনি তার ছেলেরা 'শাহ' বলে অভিহিত হতে শুরু করে। 'শাহ' মানে বাদশাহ। পীর সাহেব নিজে একজন বাদশাহ; আর তাঁর ছেলেরা হল খুঁদে বাদশাহ, বাদশাহজাদা। এই চিরন্তন নিয়ম আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। এ থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, পীর-মুরীদীর প্রথাটাই আগাগোড়া একটা জাহিলিয়াতের প্রথা। এ প্রথার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এ প্রথা কিছু মাত্র ইসলামী নয়। এই পীর ও তার মুরীদরা, এ পীরের সমর্থকরা, হাদিয়া তোহফা ও টাকা-পয়সা যারা দেয়, তারা সকলেই রাসূলে করীম (সাঃ)-এর ঘোষণানুযায়ী আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রাসূলে করীম (সাঃ) এর চারটি কথার তৃতীয় কথা হচ্ছেঃ আল্লাহ্ তা'য়ালা অভিশপ্ত করিয়াছেন সেই ব্যক্তিকে যে বিদয়াতকারী বা বিদয়াতপন্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, সম্মান করেছে এবং সাহায্য সহযোগীতা দিয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00