📘 তাগুত > 📄 বিদয়াত কত প্রকার

📄 বিদয়াত কত প্রকার


সাধারণভাবে মুসলিম সমাজের প্রচলিত ধারণা হলঃ বিদয়াত দুপ্রকার। একটি হল ভাল বিদআত। আর দ্বিতীয়টির নাম মন্দ বিদয়াত, কেউ কেউ দ্বিতীয়টির নাম দিয়েছে ঘৃণ্যও জঘন্য বিদআত। কিন্তু বিদয়াতের এই বিভাগও বোধ হয় একটি অভিনব বিদয়াত। কেননা বিদয়াতকে ভাল ও মন্দ এই দুইভাবে ভাগ করার ফলে বহু সংখ্যক বিদয়াতই ভাল বিদয়াত হওয়ার পারমিট নিয়ে ইসলামী আক্বীদা ও আমলের বিশাল ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে অগোচরে। রাসূলের যুগে বিদয়াত-এর মধ্যে কোন 'হাসানা' ভাল দিক পাওয়া যায়নি। সাহাবী ও তাবেঈনের যুগেও নয়, রাসূলের বাণীতেও বিদয়াতকে এভাবে ভাগ করা হয়নি।

তাহলে মুসলিম সমাজে বিদয়াতের এ বিভাগ কেমন করে প্রচলিত হল? এর জবাব পাওয়া যাবে হযরত উমর ফারুকের (রাঃ) একটি কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে। এসম্পর্কে বুখারী শরীফের হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। আবদুর রহমান ইবনে আবদুল কারী বলেনঃ "আমি হযরত উমর (রাঃ)-এর সাথে রমযান মাসে মসজিদে গেলাম। সেখানে দেখলাম লোকেরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে নিজের নিজের নামায পড়ছে। আবার কোথাও একজন নামায পড়ছে, আর তার সঙ্গে পড়ছে কিছু লোক। তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেনঃ আমি মনে করছি এ সব নামাযীকে একজন ভাল ক্বারীর পিছনে একত্রে নামায পড়তে দিলে খুবই ভাল হত। পরে তিনি তাই করার ফয়সালা করেন এবং হযরত উবাই ইবনে কায়াবের ইমামতিতে জামায়াতে নামায পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এই সময় এক রাত্রে আবার উমর ফারুকের সাথে আমিও বের হলাম। তখন দেখলাম লোকেরা একজন ইমামের পিছনে জামায়াতবদ্ধ হয়ে তারাবীহর নামায পড়ছেন। এ দেখে হযরত উমর (রাঃ) বললেনঃ এতো খুব ভাল বিদয়াত।"

হাদীসের শেষভাগে উল্লিখিত উমর ফারুক (রাঃ)-এর কথাটিই হল বিদয়াতকে দুভাগে ভাগ করার বাক্যটি হল نعمت البدعة هذه এর শাব্দিক তরজমা হলঃ এটা একটা উত্তম বিদয়াত। আর একটি বিদয়াত যদি উত্তম হয়, তাহলে আপনা আপনি বোঝা যায় যে, আর একটি বিদয়াত অবশ্যই খারাপ হবে। এ হল এ ব্যাপারের মূল ইতিহাস। এখন অবস্থা হচ্ছে এই যে, যে কোন বিদয়াতকে সমালোচনা করলে বা সে সম্পর্কে আপত্তি তোলা হলে, তাকে বিদয়াত বলে ত্যাগ করার দাবি জানান হলে অমনি জবাব দেয়া হয়, "হ্যাঁ, বিদয়াত তো বটে, তবে বিদয়াতের সাইয়্যেয়া নয়, বিদয়াতে হাসানা' অতএব ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। বস্তুত বিদয়াতের মারাত্মক দিক-ই হচ্ছে এই। এ কারণে বাস্তবতার দৃষ্টিতে রাসূলের বাণী كل بدعة ضلالة 'সব বিদয়াত-ই গোমরাহী' অর্থহীন হয়ে যায়। কেননা যদি সব বিদয়াত-ই গোমরাহী হয়ে থাকে, তাহলে কোন বিদয়াত-ই হিদায়াত হতে পারে না। কিন্তু বিদয়াতের ভাগ বন্টন তার বিপরীত কথাই প্রমাণিত হয়। তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, রাসূলের (সাঃ) কথা সব বিদয়াতেই গোমরাহী ঠিক নয়। কোন কোন বিদয়াত ভালও আছে। (নাউজুবিলাহ মিন জালিক)। রাসূলের কথার বিপরীত ব্যাখ্যা দানের মারাত্মক দৃষ্টান্ত এর চেয়ে আর কিছু হতে পারে না।

আমাদের বক্তব্য এই যে, মূলত বিদয়াতকে 'হাসানা ও 'সাইয়্যেয়া' দুভাগে ভাগ করাই ভুল। আর হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর কথা দ্বারা-ও এ বিভাগ প্রমাণিত হয় না। কেননা উমর ফারুকের কথার অর্থ মোটেই তা নয়, যা মনে করা হয়েছে। জামায়াতের তারাবীহ নামায পড়া মোটেই বিদয়াত (নতুন আবিষ্কার) নয়। রাসূলের জামানায় তা পড়া হয়েছে। রাসূলে করীম (সাঃ) দু'তিন রাত তারাবীহর নামায নিজেই ইমাম হয়ে পড়িয়েছেন একথাই সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণিত। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ নবী করীম (সাঃ) মসজিদে নিজের নামায পড়ছিলেন। বহু লোক তাঁর সঙ্গে নামায পড়ল। দ্বিতীয় রাত্রিতেও সে রূপ হল। এতে করে এ নামাযে খুব বেশী সংখ্যক লোক শরীক হতে শুরু করল। তৃতীয় বা চতুর্থ রাত্রে যখন জনগণ পূর্বানুরূপ একত্রিত হল, তখন নবী করীম (সাঃ) লোকদের বললেনঃ তোমরা যা করেছ তা আমি লক্ষ্য করেছি। আমি নামাযের জন্যে মসজিদে আসিনি শুধু একটি কারণে। তা হল, এভাবে জামায়াতবদ্ধ (তারাবীহ) নামায পড়লে আমি ভয় পাচ্ছি, হয়ত তা তোমাদের উপর ফরযই করে দেয়া হবে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ এ ছিল রমযান মাসের ব্যাপার। (বুখারী ও মুসলিম) এ হাদীস অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, জামায়াতের সাথে তারাবীহ নামায পড়াবার কাজ প্রথম করেন নবী করীম (সাঃ) নিজে। করেন পর পর তিন রাত্র পর্যন্ত। আর রাসূল (সাঃ) একবার যে কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে সে কাজ করতে নিষেধও করে যাননি সে কাজ কিভাবে বিদয়াত হবে।

তা হলে হযরত উমর (রাঃ) জামায়াতের সাথে তারাবীহ পড়াকে 'বিদয়াত' বললেন কেন? বলা হয়েছে এ কারণে যে, নবী করীম (সাঃ)-এর সময় জামায়াতের সাথে তারাবীহর নামায পড়া ২-৪দিন পর বন্ধ হয়ে যায়, তারপর বহু কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর খিলাফত আমলে এ নামায জামায়াতের সাথে নতুন করে চালু করা যায়নি। এরপর হযরত উমর ফারুকের সময় এ জিনিস চালু হয়। এ হিসেবে একে বিদয়াত বলা ভুল কিছু হয়নি এবং তাতে করে তা সেই বিদয়াতও হয়ে যায়নি যা সুন্নাতের বিপরীত, যার কোন দৃষ্টান্ত রাসূলের (সাঃ) যুগে পাওয়া যায় না। উমর ফারুক (রাঃ) যিনি বিদআতের সবচেয়ে বড় বিরোধী ছিলেন, তিনি বিদয়াত চালু করেছেন কিংবা তাঁর সামনে রাসূল (সাঃ) একবারও করেননি কিংবা অনুমোদন দেননি এমন বিদয়াতী কাজ করেছে লোকেরা আর তিনি কিছু বলেননি একথা অবিশ্বাস্য।

📘 তাগুত > 📄 কয়েকটি বড় বড় বিদয়াত

📄 কয়েকটি বড় বড় বিদয়াত


বিদয়াত সনাক্ত করার উপায়
যে কোন কিছু পরিমাপের জন্য একটি মাপকাঠি বা স্কেল রয়েছে। যেমন ঘরের মেঝের লম্বা মাপার জন্য মিটার এবং গজের ফিতা রয়েছে। রোগীর জ্বর পরিমাপের জন্য থার্মোমিটার রয়েছে। ঠিক তেমনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইসলাম দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোগ করা যে কোন বিষয় (বিদ'আত) সনাক্ত করার জন্য একটা মাপকাঠি বা স্কেল দিয়েছেন। আর এই মাপকাঠি হল আল কুরআন ও সহীহ হাদীস। বড় আলেম, বুযুর্গ, পীর বাবা, মুরুব্বী যা কিছু বলল বা করলো বা করতে উপদেশ দিল আমার কাছে আল্লাহর তরফ থেকে যে মাপকাঠি বা স্কেল (কুরআন ও সুন্নাহ) দেয়া আছে তাতে যাচাই করে দেখবো। যদি তা কুরআন ও সুন্নাহতে কোথাও না পাওয়া যায় এবং সাহাবী, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনরা এ সকল কাজ করেছেন বলে যদি কোন দলিল না থাকে তবে আমি নিশ্চিত হতে পারি এগুলো সব বিদ'আত। কারণ বুযুর্গ, আলেম, পীরবাবা যা বলে তাই দলিল না, তারা যা বলছে বা করছে বা করতে বলছে তা প্রমাণের জন্য কোরআন আর সুন্নাহর দলিল দরকার। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন: "আমার সময়ের লোক অর্থাৎ সাহাবাগণ, তারপর আগমনকারী (তাবেঈন) ব্যক্তিগণ তারপর আগমনকারী (তাবে-তাবেঈন) ব্যক্তিগণ উত্তম।" (বুখারী ও মুসলিম) ইমাম ইব্রাহীম নখঈ বলেন, "কোন ব্যক্তি বা দলের গুনাহগার হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে তার আমল সাহাবায়ে কিরামের আমলের বিপরীত।"

অতএব, সাহাবাগণ, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈন গন যেসব কাজ করেননি সেই সব কাজ আলেম, অলি-আল্লাহ, হুজুর কেবলা, পীরবাবার নামে সওয়াবের আশায় শুরু করার নামই বিদ'আত। এখানে আমরা বর্তমান সমাজে বহুল প্রচলিত কিছু বড় বড় বিদয়াতের নাম উল্লেখ করব যেগুলির কোরআন আর সুন্নাহর কোন দলিল তো নাই উপরন্তু সাহাবা, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনদের মাঝেও কেউ কোনদিন এ সকল কাজ করেছে বলে দলিল পাওয়া যায়নি। এ সকল বিদ'আতের কিছু কিছু বিষয় আছে যা সরাসরি শিরক, কোন কোনটি কুফর আর কোন কোনটি হারাম পর্যায়ে পড়ে।

কয়েকটি বড় বড় বিদয়াত
১। তাওহীদ আকিদায় শিরক এর বিদ'আত
২। মানুষের তৈরী কুফর আইন পালনে শিরক-এর বিদ'আত।
৩। দ্বীন পবিত্র বস্তু পক্ষান্তরে রাজনীতি হল নোংরা বিষয়, তাই দ্বীনকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে। এ ধরনের চিন্তা কথা ও কাজও সম্পূর্ণ কুফরী বিদয়াত।
৪। আল্লাহ্র নৈকট্য লাভে অসীলা ধরা শিরকই বিদআত। (তাগুত বইয়ের ২য় খন্ডে উপরোক্ত চারটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে)
৫। মাজার স্পর্শ করে বরকত নেয়া, এতে চাদোয়া টাঙ্গানো, বাতি জ্বালানো, ফুল, খুশবু বা গোলাপজল ছিটানো। নজর নিয়াজ পাঠানো, মাজারকে তাওয়াফ করা, মাজার থেকে পিছনমুখী হয়ে বের হওয়া, মাজার কেন্দ্রিক পুকুরে মাছ, কচ্ছপ, কুমীর ইত্যাদিকে শ্রদ্ধা জানানো এ সকল কাজ কোন কোনটি শিরকী, কোনটি কুফরী এবং হারাম বিদ'আত। এসব কাজের মাধ্যমে মাজার মুর্তিতে পরিণত হয়। আর তখন মাজারে এসব করার অর্থ হবে মুর্তির ইবাদত করা। শিব নারায়নের পূজা আর এ ধরনের পূজার মধ্যে কোনই ব্যবধান নেই। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “হে আল্লাহ্ আমার কবরকে মুর্তি (প্রতিমা) বানিও না।” (আহমদ)
৬। বালা-মুছিবত, চোখের অনিষ্টতা, রোগ শোক থেকে রক্ষা পাবার নিমিত্তে কড়ি-কাটি, তাগা-তাবিজ, বৃক্ষের জড়মূল, পাথর এ বিশ্বাসে ঝুলানো যে এগুলো নিজগুণে তাকে রক্ষা করতে পারবে। এসব কার্যাদি শিরকের অন্তভুক্ত। রাসূল (সাঃ) বলেন "যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করবে আল্লাহ্ তাকে পূর্ণতা দেবেন না। আর যে কড়ি ব্যবহার করবে আল্লাহ্ তাকে মঙ্গল দান করবেন না।” (মুসনাদে আহমদ, হাকেম) হাদীসটি বিশুদ্ধ। "যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করল সে শিরক করল।" (আহমদ, ত্ববরানী)
৭। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা এবং রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) মিলাদের মাহফিলে উপস্থিত হন এ ধরনের আকিদা পোষণ করা প্রথম কাজটি হারাম বিদআত আর দ্বিতীয় আকিদাটি শিরকী বিদ'আত: মিলাদ একটি বিদয়াত বা কুসংস্কার। এটি ইসলাম বহির্ভূত। বাড়াবাড়ি মূলক নতুন ইবাদত। যা ৬০৪ হিজরীতে ইরাকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। মৌলিক বিদয়াত সমূহের সুতিকাগার হল ইরাক। খৃষ্টান সম্প্রদায় ঈসা (আঃ) মিলাদ পালন করে থাকে। ইংরেজী সনকে আরবীতে মীলাদী সন বলা হয়। কেননা মিলাদ তথা জন্মদিন থেকে এ সনের গননা শুরু হয়েছে। মুসলিম সমাজে এ কুসংস্কার খৃষ্টান সমাজ থেকে অনুপ্রবেশ করেছে। রাসূল (সা) শেখানো সালাত ও সালাম তথা দরূদকে ত্যাগ করে তদস্থলে এ কুসংস্কারটি আবিস্কার করা হয়েছে। খৃষ্টান সম্প্রদায় ঈসা (আঃ)-কে সম্মান করতে গিয়ে তাওহীদের সীমানা লংঘন করেছে। নবীকে তারা বানিয়েছে ইলাহ ও মাবুদ। অতিভক্তির এটাই কুফল। খৃষ্টানদের মতই অতি ভক্তি প্রদর্শন করা হয় রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি। অথচ তিনি কঠোরভাবে এ অতিভক্তি থেকে নিষেধ করে গেছেন। "তোমরা আমাকে নিয়ে তেমন বাড়াবাড়ি করো না যেমনি বাড়াবাড়ি করেছিল খৃষ্টানরা মাসীহ ইবনু মারইয়ামকে নিয়ে।” (বুখারী)। মীলাদ পন্থীরা এ নিষিদ্ধ বাড়াবাড়িটাই করছে। রাসূল (সাঃ) এর প্রতি প্রত্যেক সালাতেই দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা হয়। প্রতিটি দুআর শেষে তাঁর জন্য সালাম প্রেরণ করা হয়। যখনই কোথাও তার নাম উচ্চারিত হয় মুসলিম মাত্রই তার জন্য পাঠ করে দরূদ ও সালাম। প্রতিটি হাদীস পড়ার সময় তার জন্য প্রেরণ করা দরূদ ও সালাম। সকাল সন্ধ্যায় জুময়ার দিনে শত কোটি মুসলমান তার জন্য দরূদ ও সালাম প্রেরণ করে থাকে। অতএব বিদয়াত পন্থায় তাঁকে সম্মান জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। খৃষ্টানদের অনুসরণে মীলাদ নামে আল্লাহকে বাদ দিয়ে নবীর ইবাদত যারা করছে তারা নবীর সম্মান করছে না বরং নবীর আদর্শের সাথে শত্রুতা পোষণ করছে। সকল বিদয়াতই শয়তানের আবিস্কার।
৮। কেবল কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে বাগদাদ, আজমীর সিলেটসহ দূর-দূরান্ত সফর করা হারাম বিদআত ৪ রাসূল (সঃ) কবর পরিদর্শন (জিয়ারত) করার উদ্দেশ্যে যাত্রায় বের হওয়া নিষিদ্ধ করেছেন। অন্যান্য ধর্মে এই ধরনের প্রথা পৌত্তলিক তীর্থযাত্রার ভিত্তি রচনা করে। আবু হুরায়রাহ এবং আবু সাঈদ আল-খুদরী উভয়ে বর্ণনা দিয়েছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছিলেন, "মসজিদুল হারাম (মক্কার কা'বা), রাসূলের মসজিদ এবং আল্-আকসা মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে ভ্রমন করিও না।" [বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ] এ হাদীসটি আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম অর্থাৎ অমান্য করা হারাম। একদা আবু বসরা আল-গিফা'রী এক ভ্রমন থেকে ফিরে আসার সময় আবু হুরায়রাহর সঙ্গে দেখা হলে আবু হুরায়রাহ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি কোথা থেকে এলেন। আবু বসরা উত্তর দিলেন যে, তিনি আত-তুর (at-Toor) থেকে আসছেন যেখানে তিনি সালাত আদায় করেছেন। আবু হুরায়রাহ বললেন, "তুমি রওয়ানা দেবার আগে যদি আমি তোমাকে ধরতে পারতাম। কারণ আমি আল্লাহর রাসূলকে (সঃ) বলতে শুনেছি, 'তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের জন্য ভ্রমন করিও না'...। [আহমদ]
৯। চিত্রকর্ম ও মূর্তি নির্মাণ ৪ যারা চিত্রকর্ম করে ও মূর্তি নির্মাণ করে তাদের এবং তার পাশাপাশি যারা ঐগুলি প্রদর্শনের জন্য ঝুলিয়ে রাখে, তাদের সম্পর্কে শেষ পয়গম্বর রাসূল (সাঃ) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, আল্লাহ পরবর্তী জীবনে তাদের চরম শান্তি দিবেন। রাসূলের (সাঃ) স্ত্রী আয়েশা বিনতে আবু বকর বলেন, "একদিন রাসূল (সাঃ) আমাকে দেখতে এলেন এবং আমার নিভৃত কক্ষটি পাখাওয়ালা ঘোড়ার ছবি বিশিষ্ট একটি উলের পর্দা দিয়ে ঢাকা ছিল। পর্দাটি দেখে তাঁর মুখের রং পরিবর্তন হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, "হে আয়েশা, যারা আল্লাহর সৃষ্টি করা কাজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তারা কিয়ামতের দিনে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে। তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তারা যা সৃষ্টি করেছিল সে গুলির মধ্যে প্রাণ আনতে বলা হবে।" রাসূল (সাঃ) আরও বলেন, "যে সব বাড়ীতে ছবি এবং মূর্তি রয়েছে সে সব বাড়ীতে ফেরেশতারা কখনই প্রবেশ করে না।” তখন আয়েশা বললেন, "কাজেই আমরা (পর্দাটি) কেটে টুকরা টুকরা করে ফেললাম, এবং এর থেকে একটা বা দুটা বালিশ বানালাম।” [আল বুখারী এবং মুসলিম সংগৃহীত]
১০। কবরস্থানে কোরআন পড়ার অনুমতি নেই: কারণ রাসূল (সাঃ) অথবা তাঁর সাহাবাগণ পড়েছেন বলে কোন প্রমাণ নেই। বিশেষ করে রাসূলের (সাঃ) স্ত্রী আয়েশা যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন কবরস্থানের যেয়ে কি পড়তে হবে, তিনি সালাম (শান্তির সম্ভাষণ) এবং প্রার্থনা করতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে আল্-ফাতিহা পড়তে বলেননি। আবু হুরায়রাহ আরও বর্ণনা দেন যে, রাসূর (সাঃ) বলেছিলেন: "তোমাদের গৃহকে কবরস্থান বানিও না কারণ যে গৃহে সূরা আল্-বাকারা পড়া হয় শয়তান সে গৃহ থেকে পালিয়ে যায়।” [আত-তিরমিযী, আবু দাউদ] এই ধরনের বর্ণনা কবরস্থানে কোরআন না পড়ার ইঙ্গিত বহন করে। গৃহে কোরআন পাঠ করা উৎসাহিত করা হয়েছে এবং গৃহকে কবরস্থানে পরিণত করা (অর্থাৎ কবরস্থানে কোরআন পাঠ করা উচিত নয়) নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১১। তথাকথিত মারিফাতের দাবীদার ভ্রান্ত সুফী মতবাদে বিশ্বাসীরা মনে করে বিশ্ব পরিচালনায় আল্লাহর সাথে তাদের ভাষায় বিভিন্ন গাউস, কুতুব, আবদাল, আওতাদের হাত আছে (নাউযুবিল্লাহ)। এ বিশ্বাস শরীয়ত পরিপন্থী শিরক ও কুফরী বিদ'আত: আলাহ তায়ালা বলেনঃ "বলুন সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোন সন্তান রাখেন, না তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন শরীক আছে এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোন সাহায্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং আপনি সসম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করুন।" (বনী ইসরাঈল: ১১১) বিশ্ব জাহানের কোন কাজে সৃষ্টির হাত আছে এটা বিশ্বাস করলে কাফের হয়ে যাবে। হাদীসে কুদসীতে রয়েছে- আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, "যে ব্যক্তি বলল ওমুক ওমুক নক্ষত্রের স্থানচ্যুত হওয়ার কারণে আমরা বৃষ্টিপাত পেয়েছি, তাহলে সে আমার সাথে কুফর করল এবং গ্রহ নক্ষত্রের উপর ঈমান আনল।” (মুসলিম) বৃষ্টি হওয়ার পেছনে গ্রহ নক্ষত্রের হাত আছে বলে বিশ্বাসকারী ব্যক্তি যেমন উক্ত হাদীস অনুসারে কাফের তেমনি বিশ্ব পরিচালনার কোন কাজে গাউস, কুতুব ইত্যাদির হাত আছে বলে বিশ্বাসকারী ব্যক্তিও কাফের।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহঃ) গাউস সম্পর্কে বলেছেন : গাউস বা গিয়াস শব্দ ব্যবহারের উপযোগী একমাত্র আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লাহ ব্যতীত আর কেহ নয়। তিনিই একমাত্র অসহায়ের সহায়ক। অতএব কারও জন্য জায়েয নয় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে ফরিয়াদ পেশ করে, তা সেই ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার অতি নিকটতম ফেরেশতা, কোন প্রেরিত নবী হোক না কেন। কারও নিকট রুজীর ব্যাপারে, জীবনে উন্নতির ব্যাপারে সাহায্য চাওয়া বৈধ নয়।
এদেশের মুসলিম সমাজের একটি শ্রেণী আছে যারা শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীকে (রহঃ) গাউসে আযম বা সাইয়েদুল আগাওয়াস বলে মন্তব্য করে থাকে। অথচ তার যামানায় বা তার সন্তান সন্ততিদের মধ্যে ঐ ধরনের কথার কোন অস্তিত্ব ছিল না। ইহা নাসারাদের মতই নীতি। ঈসার (আঃ) আসমানে উঠে যাওয়ার পর তাকে নাসারারা আল্লাহর আসনে বসিয়েছিল। অথচ তিনি উহার কোনই খবর রাখেন না, যেমন কুরআনে পাকে সূরা মায়েদার ১১৬ থেকে ১২২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন।
১২। কবরের উপর গম্বুজ, সৌধ বা গৃহ নির্মাণ হারাম বিদ'আত ৪ রাসূল (সাঃ) কবর চুনকাম করা, তাদের উপর কাঠামো নির্মাণ তাদের উপর লেখা অথবা মাটির উচ্চতা হতে উপরে উঠানো নিষেধ করেছেন। তিনি আরও শিখিয়েছেন যে, কবরের উপর নির্মিত যে কোন কাঠামো ভেঙ্গে ফেলতে হবে এবং কবর মাটির সাথে মিলিয়ে ফেলতে হবে।
আলী ইবনে আবি তালেব (রাঃ) বর্ণনা দেন যে, তিনি কোন মূর্তি দেখলেই তা ধ্বংস করার জন্য রাসূল (সাঃ) আদেশ দেন। আলী (রাঃ) আরো বলেন, যে সব কবর আশেপাশের জমীন থেকে হাতের তালুর প্রশস্থতার চেয়ে উঁচু সেগুলিও রাসূল (সাঃ) সমান করে দিতে আদেশ দিয়েছিলেন। [মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী] রাসূল (সাঃ) কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূলের (সাঃ) স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) উল্লেখ করেন যে, যখন আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) ইন্তেকালের সময় হয়ে আসে, তখন তিনি তাঁর মুখমন্ডলে উপর তাঁর ডোরা কাটা আলখাল্লা টেনে দিয়ে বলেছিলেন, "আলাহর অভিশাপ পড়ুক ইহুদী এবং খৃষ্টানদের উপর যারা তাদের পয়গম্বদের কবরকে প্রার্থনার স্থান বানিয়েছে। [বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, আন্‌-নাসায়ী]
১৩। রাশিচক্রে বিশ্বাস করা শিরকী ও কুফরী বিদ'আত: রাসুল (সাঃ) বলেছেন- "যে ব্যক্তি কোন গণক অথবা জ্যোতিষীর কাছে গমন করল এবং সে যা বলল তা বিশ্বাস করল তাহলে সে মুহাম্মাদের উপর যা নাযিল হয়েছে তার সাথে কুফর করল।" (আহমদ, মুসলিম)
১৪। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিস্তম্ভ, প্রতিকৃতি, নেতৃবৃন্দের মাজার ও তাতে পুস্পস্তবক অর্পন, এক মিনিট নিরবতা পালন করা বিদ'আত: (ক) পুষ্পস্তবক অর্পণঃ মুহাম্মদ (সাঃ) আনিত দ্বীনে পুষ্প স্তবক অর্পনের কোন বিধান নেই। মৃতদের জন্য পুষ্প স্তবক অর্পণ খৃষ্টান জাতির সংস্কৃতি। হিন্দু ধর্মেও মুর্তি বেদীতে পুষ্প স্তবক অর্পন করা হয়। মূলত পুষ্পস্তবক অর্পণ মূর্তি পূজার অংশ। এটি একটি ইবাদত যা মূর্তিকে দেয়া হয়। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি সংস্কৃতিতে যে সম্প্রদায়ের অনুসরণ করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।" (আবু দাউদ)
(খ) এক মিনিট নিরবতা পালনঃ "আবু বকর রাদিয়াল্লাহ আনহু (হজ্জের মওসুমে) যায়নাব নামক আহমাস গোত্রীয় এক মহিলার কাছে গেলেন। তিনি দেখলেন, সে কথা বলে না। তিনি বললেন, সে কথা বলে না কেন? লোকেরা বলল-তার হজ্জটি এমন যাতে সে নিরবতা পালন করছে। আবু বকর তাকে বললেন-তুমি কথা বল। তোমার এ নিরবতা পালন অবৈধ। এটি জাহেলিয়াত (শিরক ও অজ্ঞতা) যুগের কাজ। অতঃপর সে মহিলাটি কথা বলল।" (বুখারী)
১৫। কুকুরের ঘেউ ঘেউ, পেঁচার ডাক, যাত্রাকালে খালি কলসী, পিছন দিয়ে ডাকাকে, ঝাড়ু দেখাকে অশুভ লক্ষণ মনে করা বিদআত ৪ রাসূল (সাঃ) বলেছেন- "কোন কিছুকে অশুভ মনে করা শিরক।” [আবু দাউদ, তিরমিযি]
১৬। মান্যবর ব্যক্তিদের সামনে প্রবেশকালে মাথা নিচু করা কিংবা কদমবুসি (পায়ে ধরে সালাম) এবং কেউ ঢুকলে উঠে দাঁড়ানো ইত্যাদি করা বিদ'আতঃ সম্মানার্থে মাথা অবনমিত করার দ্বারা আল্লাহর ইবাদত করা হয়। যেমন রুকু করা, মানে আল্লাহর সামনে মাথা অবনমিত কর। এটি একটি ইবাদত। আল্লাহর ইবাদতের কোন অংশ অপর কাউকে দেয়া শিরক। যা নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ বলেন "তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ।"
১৭। কোন ওলি বা বুজুর্গ নিঃসন্তানকে সন্তান দিতে পারে এ বিশ্বাস করা শিরকী বিদ'আত ৪ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহীদের অংশকে এরূপ সুরক্ষিত করেছেন যাতে শির্কের ছোট বড় যাবতীয় অংশ হতে উম্মাতগণ সতর্ক হয়ে যায়। একজন লোক এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিল: আল্লাহ যদি চান, আর আপনিও যদি চান তাহলে এ কাজ হবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন: তুমি আমাকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে দিলে? বরং কেবল আল্লাহ যদি চান তাহলে উহা হবে, তিনি না চাইলে কিছুই হবে না। নাসায়ী শরীফে সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এই হাদীস বর্ণিতঃ "আমি একমাত্র আমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করি এবং অন্য কাহাকেও আমি তার সাথে অংশী করছি না।"
সন্তান দেওয়া আল্লাহর রুবুবিয়াতের একটি কাজ। মানুষ যেমন কারও রূযী, হায়াত, বাড়াতে পারে না, অনুরূপ নবী ফেরেশতা ওলী আলেম যেই হোক না কেন নিঃসন্তানকে সন্তান দিতে পারে না। এরশাদ হচ্ছে- "আকাশসমূহ ও পৃথিবীর কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্রই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ ক্ষমতাশীল।" (সূরা আশ শূরা: ৪৯-৫০)
১৮। মানত মানায় শিরক এর বিদয়াত: "তোমরা যা কিছু খরচ কর বা মানত মান, আল্লাহ্ তার সবকিছুই জানেন। আর জালিমদের জন্যে কোন সাহায্যকারী কেউ নেই।" (আল বাকারা) তাফসীরে মাযহারীতে এ আয়াতের ব্যাখ্যা লিখা হয়েছে এভাবেঃ মানত হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর জন্যে করবে বলে কোন কাজ নিজের জন্যে বাধ্যতামূলক করে নেবে শর্তাধীন কিংবা বিনা শর্তে। মানত হতে হবে কেবল আল্লাহর জন্যে। যে মানত হবে মাত্র আল্লাহর জন্যে, কুরআনের ঘোষণানুযায়ী কেবল তাই জায়েয; যে মানত খালিসভাবে আল্লাহর জন্যে নয়, তা কুরআনের দৃষ্টিতে কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়। ইমাম আহমদ মুসনাদে এবং তিবরানি তাঁর الاوسط গ্রন্থে বর্ণনা করেছেনঃ নবী করীম (সাঃ) এক কঠিন গরমের দিনে লোকদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। এ সময় তিনি একটি একটি লোককে (সম্ভবত কোন মরুবাসীকে) রোদের খরতাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন-কি ব্যাপার; তোমাকে রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি কেন? লোকটি বলল-'আমি মানত করেছি'-'আপনার ভাষণ শেষ না হওয়া আমি রোদে দাঁড়িয়ে থাকব। তখন নবী করীম (সাঃ) বললেনঃ "বসে পড়ো, এটা তো কোন মানত হল না মানত তো শুধু তাই , যা আল্লাহর সন্তোষ হাসিল করার উদ্দেশ্য হবে।” (মুসনাদ আহমদ, তিবরানি) "হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ "মানত মানব-সন্তানকে কোন ফায়দাই দেয় না। দেয় শুধু তাই যা তার তকদীরে লিখিত হয়েছে। বরং মানত মানুষকে তার তকদীরের দিকেই নিয়ে যায়। অতঃপর কৃপণ ব্যক্তির হাত থেকে আল্লাহ্ কিছু খরচ করান। তার ফলে সে আমাকে (আল্লাহকে) এমন এমন কিছু দেয়, যা এর পূর্বে সে কখনও দেয়নি।" (বুখারী)
১৯। মৃত লোকদের নিকট সাহায্য চাওয়া শিরকী বিদয়াতঃ শায়খুল ইসলাম ইমাম তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন: মানুষ জাতির মধ্যে শির্ক দুই প্রকারে উৎপত্তি হয়েছে। প্রথমতঃ যা বহু আলেমের মধ্যে স্থান পেয়েছে তা হল সৎ লোকের কবরের তাযীম করা। এই উদ্দেশ্যে উহা করা হয় যে, ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহর পক্ষ হতে নূর, জ্যোতি এবং বরকত নাযিল হতে থাকে; ঐ ব্যক্তির প্রতি নিজেকে পূর্ণভাবে মুতাওয়াজ্জাহ্ (নিবদ্ধ) করতে পারলে ভক্তের অন্তরে ঐ জ্যোতি ও বরকত নাযিল হবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর শির্ক হল তারকাপূজারী আমদানীতে। গাইরুল্লাহর ইবাদতের কারণে শয়তান শ্রেণী তাদের সাহায্য করে এবং তাদের অভাব অভিযোগ পূরণ করে। ইরশাদ হচ্ছে- "আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবেনা, যে তোমার ভাল করতে পারবেনা মন্দও করতে পারবেনা। বস্তুতঃ তুমি যদি এমন কাজ করো তাহলে তুমিও জালেমদের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যাবে।” (ইউনুছঃ ১০৬) "তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর উপাসনা করে, যা তাদের না করতে পারে কোনো ক্ষতি, না করতে পারে কোনো উপকার। আর তারা বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে অবহিত করতে চাও, যে সম্পর্কে তিনি আসমান ও যমীনের মাঝে অবহিত নন? তিনি পুতঃপবিত্র ও মহান সে সমস্ত জিনিস থেকে, যে গুলোকে তোমরা শরীক করছো।" (ইউনুছ: ১৮)
২০। অলৌকিক ক্রিয়ান্ড ঘটানো বিদয়াত ৪ বিশ্বলোকের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্। এ সবের ওপর কর্তৃত্বও চলে একমাত্র আল্লাহ্রই। আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ ধরনের কিছু কিছু কাজ করার অনুমতি দেন কখনও কখনও, যে ধরনের কাজকে আমরা "অলৌকিক কাজ' বলে থাকি। এর কতগুলো কাজ এমন, যা নবী-রাসূলের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়। এগুলোকেই ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় 'মুজিযা'। তা হয় স্বয়ং আল্লাহর কুদরাতে ও ইচ্ছায়; নবী-রাসূলের ইচ্ছায় নয়। কারামত মানে সম্মান-মর্যাদা; কিন্তু এখানে যে কারামতের কথা বলা হচ্ছে, তা এসব নয়। তা হল কোন পীর বা অলী আল্লাহ্ কোন অঘটন ঘটিয়েছে, কোন অস্বাভাবিক কাজ সাধন করে মুরীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে, কে শূন্যে উড়ে গেছে, কে পানির উপর দিয়ে পায়ে হেটে সমুদ্র পার হয়েছে, কে জেলখানার বন্দী থাকা অবস্থায় প্রতিদিন কাবায় গিয়ে নামায পড়েছে, এ সব প্রচারণার মানে কি? এ সব যে একেবারে ফাঁকা বুলি, কেবল অজ্ঞ-মুর্খদের জন্যে তা বলা হয়, তাদের মধ্যেই তা প্রচার করা হয়, এটা যে-কোন সুস্থ বুদ্ধির মানুষই স্বীকার করবেন। মোটকথা, অলী-আলাহ হলেই যে তার কারামত-মানে অলৌকিক ঘটনা ঘটবার ক্ষমতা থাকতে হবে, কারামত হলেই যে সে অলী আল্লাহ্ গণ্য হবে। সব কথাই ভিত্তিহীন। কুরআন-হাদীসে এসব কথার কোনই দলীল নেই। সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় 'দাজ্জাল' অনেক 'কারামত' দেখাবে তাই বলে কি সে অলি আল্লাহ? আল্লাহ তা'য়ালা দাজ্জালকে কাফের বলেছেন। মূর্খ পীরেরা ততোধিক মূর্খ মুরীদের সামনে নিজেদের যে সব 'কারামত' জাহির করে, প্রকাশ করে যেসব অলৌকিক (?) কাণ্ড-কারখানা, সেগুলো সুস্পষ্টভাবে কুফরি ও শিরকী কথাবার্তা আর কাজ।
২১। সমাজে নারীদের নেতৃত্ব এবং প্রাধান্য বিদয়াত ৪ ইসলামী সমাজে নারীর মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত, কুরআন দ্বারা ঘোষিত এবং রাসূলে করীম (সাঃ) দ্বারা বাস্তবায়িত। তাতে নারীদের নারী হিসেবে মর্যাদা ও অধিকার পুরাপুরি স্বীকৃত। কিন্তু নারীদের মর্যাদা পুরুষদের উপরে নয় নীচে; প্রথম নয় দ্বিতীয়; নিরংকুশ নয়, শর্তাধীন। এ পর্যায়ে কুরআনের ঘোষণা:
"পুরুষগণ নারীদের উপরে প্রতিষ্ঠিতঃ আল্লাহ্ কতক মানুষকে অপর কতক মানুষের উপর অধিক মর্যাদা দিয়েছেন এই নিয়মের ভিত্তিতে এবং এজন্যও যে, পুরুষরাই তাদের ধন-সম্পদ নারীদের জন্য ব্যয় করে।" (আন নিসা ৪ ৩৩)
রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেনঃ আমার পরে আমার উম্মাতের জন্য সর্বাধিক ক্ষতিকর ফিতনা পুরুষদের উপর আসতে পারে নারীদের প্রাধান্যের কারণে। হযরত আবু বকর (রাঃ) নবী করীম (সাঃ) এর কথাটি বর্ণনা করেছেন: যে জনসমষ্ঠি তাদের সামষ্ঠিক গুরুত্বপূর্ণ ও কর্তৃত্ব কোন নারীকে অর্পন করবে, তা কখনই কোন কল্যাণ লাভ করতে পারে না।
২২। কুলখানি, চল্লিশা, জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা বিদয়াত এরূপ অনুষ্ঠানাদি যা কিনা বর্তমানে আমাদের সমাজে ফরয ওয়াজিবের মত পালন করা হয় তা সম্পূর্ণ বিদয়াত। কারণ এ এরকম কুলখানি, চল্লিশা, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার দলিল কুরআনে যেমন নেই, হাদীসেও তেমনি নেই। এমনকি সাহাবা, তাবেঈন, তাবে তাবেঈনরা তাদের বাপ, মা, দাদা, দাদী আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের মৃত্যুতে এ রকম কুলখানি, চল্লিশার আয়োজন করেছেন বলে কোন দলিলই নেই। এটা সুস্পষ্ট বিদয়াত। অর্থাৎ ভন্ড মাওলানাদের টাকা খাওয়ার ব্যবস্থা।
এ বিদআতটি এসেছে হিন্দুদের থেকে। কেউ মারা গেলে হিন্দুরা চার দিনের দিন চৌঠা. চল্লিশ দিন পরে শ্রাদ্ধ পালন করে এবং বৎসর শেষে মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিতে তারা স্মরণ পূজার মাধ্যমে মিঠাই বন্টন করে এবং অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এরূপ অনুষ্ঠানাদি পালন মুসলিমদের জন্য পছন্দ করতেন তবে অবশ্যই রাসূল (সাঃ) এর মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দিতেন। অতএব যেহেতু এ সকল কাজের কোন দলিল নেই তাই সকলের উচিৎ একযোগে এ সকল বিদয়াত নিজেদের পরিবারের মাঝে ত্যাগ করা এবং এ সকল বিদয়াতী অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।
২৩। পয়সা দিয়ে মৃতদের উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করানো হারাম, বিদয়াত : পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মৃতদের ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোরআন খতম করানো বা অন্য কোন দোয়া-কালাম ও অযিফা পড়ানো হারাম। কারণ, এর উপর কোন ধর্মীয় মৌলিক প্রয়োজন নির্ভরশীল নয়। এখন যেহেতু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কুরআন পড়া হারাম, সুতরাং যে পড়বে এবং যে পড়াবে সে-ই যখন কোন সওয়াব পাচ্ছে না, তখন মৃত আত্মার প্রতি কি পৌছবে? কবরের পাশে কুরআন পড়ানো বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোরআন খতম করানোর রীতি সাহাবী, তাবেয়ীন এবং প্রথম যুগের উম্মতগণের দ্বারা কোথাও বর্ণিত বা প্রমাণিত নেই। সুতরাং এগুলো নিঃসন্দেহে বিদ'আত। (মারেফুল কুরআন, পৃঃ ৩৫)
২৪। শবে বরাত পালন করা বিদয়াত : শবে বরাত সংক্রান্ত কোন সহীহ হাদীস নির্ভরযোগ্য কোন হাদীস গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। হাদীস হিসাবে যেটাকে দলিল পেশ করা হয় সেটা মওজু বা বানানো হাদীস। শবে কদর সংক্রান্ত কুরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে কিন্তু শবে বরাতের কোন উল্লেখ নেই। হিন্দুদের দেওয়ালি (কালি পূজার) অনুরূপ করে পটকা ফুটিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে শিরনী রুটির সমাহারে মনগড়া ইবাদত সমূহের মাধ্যমে শবে বরাত নামক বিদয়াতী অনুষ্ঠানটি এই উপমহাদেশে ব্যাপক প্রচলিত হয়েছে।
২৫। মহরম মাসে আশুরার দিন এবং তার আগের অথবা পরের দিন রোযা রাখা ব্যতীত অন্য যে কোন অনুষ্ঠানাদি আশুরার নামে পালন করা বিদয়াত।
২৬। ঈদে মিলাদুন্নবি, পালন করা হারাম বিদয়াত এবং জশনে জুলুস ইত্যাদি পালন করা শিরক ও বিদয়াত।
২৭। কাফের, পৌত্তলিক, ইহুদী ও খৃষ্টানদের নববর্ষ, ভ্যালেন্টাইন ডে, থার্টি ফাষ্ট নাইট, বৈশাখী মেলা, র‍্যাগ ডে ইত্যাদি উদযাপন করা হরাম, বিদয়াতঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যে ব্যক্তি অনারবীয় দেশে বসবাস করে সে যদি সে দেশের নববর্ষ, মেহেরজান উদযাপন করে এবং বাহ্যিকভাবে তাদের সাথে সাদৃশ্য রাখে এবং এ অবস্থায় সে মৃত্যু বরণ করে তবে কিয়ামতের দিন তাকে তাদের (কাফেরদের) সাথে হাশর করা হবে। (বায়হাকী, সনদ বিশুদ্ধ। মাজমুয়াতুত তাওহীদ ২৭৩)
২৮। নব উদ্ভাবিত নিলিখিত যিকিরসমূহ বিদয়াত ৪ (ক) শুধু 'লা ইলাহা' (খ) শুধু 'ইলালাহ' (গ) শুধু 'আলাহ আলাহ্' (ঘ) শুধু 'হু হু' করা। (ঙ) শুধু নাসিকার সাহায্যে শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে যিকির।
একই সূরে সম্মিলিতভাবে যিকির করা বিদ'আত। স্পেনের বিখ্যাত মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনুল ওয়াযযাহ (মৃঃ ২৭৬ হিজরী) রেওয়ায়েতকৃত হাদীসঃ "সাহাবী ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর জীবিত অবস্থায় এইরূপ অবস্থা ঘটেছিল। তার কুফায় অবস্থানকালে জনৈক ব্যক্তি এসে তাকে সংবাদ দিল যে, মসজিদে এক আজব নতুন কর্ম দেখে এলাম। কতকগুলি লোক মসজিদে জামায়েত হয়েছে। উহাদের একজন উপস্থিত মন্ডলীকে সম্বোধন করে বলেছে যে, তোমরা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দশবার জোরে জোরে পাঠ কর।' আল্লাহু আকবার জোরে জোরে দশবার পাঠ কর, দশবার করে জোরে জোরে দরূদ পাঠ কর। এর ফলে উপস্থিত জনমন্ডলীরা একই সাথে একই আওয়াজে সুরে ঐ রূপ নিয়মে কালেমা, যিকির এবং দরূদ পাঠ করছে। ঘটনাটা বড় নতুন লাগল দেখে আপনাকে জানালাম। সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তথায় তাড়াতাড়ি উপস্থিত হয়ে তাদেরকে বললেনঃ তোমরা আমায় চিন কি? আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ। তোমরা কি অধিক হিদায়াত প্রাপ্ত নাকি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাহাবাগণ হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত? তোমরা যে নিয়মে এই যিকির করছ উহা আমি তথা সাহাবীগণ রাসূল (সাঃ) এর যুগে কখনো দেখেনি। তারপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ আমি তোমাদেরকে বিদ'আতী ছাড়া আর কিছু মনে করি না। তিনি তাদেরকে- 'তোমরা বিদ'আতী, তোমরা বিদ'আতী এই কথা বার বার বলতে থাকেন এবং মসজিদ হতে বের করে দিলেন। এরপর হতে সাহাবী ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন: যদি তোমরা কেহ কারো কোন নীতি অনুসরণ করে চলতে চাও তাহলে সে যেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ঐ সমস্ত সাহাবাগণের (রাঃ) নীতি অনুসরণ করে যারা ইন্তেকাল করেছেন, যেহেতু বিদ্যাবুদ্ধি, অন্তরের শুদ্ধতায়, আল্লাহভীরুতায় তারাই ছিলেন রাসূল (সাঃ) এর উম্মতের সেরা মনীষী। (সুনানে দারেমী)

📘 তাগুত > 📄 ইসলামী নাম দিয়ে দল গঠন (বা ফিরকা) করা হারাম বিদয়াত

📄 ইসলামী নাম দিয়ে দল গঠন (বা ফিরকা) করা হারাম বিদয়াত


ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ উনার বিখ্যাত পুস্তকদ্বয় (MAJMOO-UL-FATAWA and AL-UQOOD-UD-DURREEYAH-Letters from the prison) এ লিখেছেন যারা ইসলামের নামে দল গঠন বা দলাদলি (ফিরকাবাজি) করে তারা 'আহলুল সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ'র অর্ন্তভূক্ত নয় বরং তিনি তাদের নাম দিয়েছেন 'আহলুল ফিরকা ওয়াল বিদয়াহ'। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা হাদীসের ভাষায় হত্যাযোগ্য গর্হিত অপরাধ। কুরআনের বহু আয়াত এবং হাদীসে রাসূল দ্বারা প্রমাণিত আমরা সমস্ত বিশ্বের মুসলিমরা একই জাতি এবং এক উম্মাহ। ভাষা, সম্পদ, গায়ের রঙ যাই হোক না কেন সমস্ত দুনিয়ার মুসলিমরা উম্মতে মুহাম্মদ (সাঃ) এবং আমাদের রব এবং ইলাহ হলেন এক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা। আজ ইহুদী, খৃষ্টান আর হিন্দুচক্রের বানানো জাতিসংঘের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে পঞ্চাশের আরো অধিক দেশে ভাগ করে আমাদের মাথার উপর তাবেদার, জাতীয়তাবাদী, তাদেরই পোষ্য কুকুর তাগুত সরকারদের বসিয়ে রেখেছে। আমাদের নিজেদের মাঝে হিংসা বিদ্বেষের বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে তারা তামাশা দেখছে আর যখন যার উপর ইচ্ছা নিজেদের আক্রোশ পূরণ করছে। মুসলিমরা আজ আল্লাহর শরীয়াহ দিয়ে নিজেদের রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারছে না। পালন করতে পারছে না জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া হুকুম আহকাম সমূহ। সমস্ত দুনিয়ার মুসলিমরা নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, দারিদ্রতার করালগ্রাসে পড়ে আছে। অথচ মুসলিমদের পায়ের নীচেই আল্লাহ তাআলা দিয়ে রেখেছেন দুনিয়ার সকল প্রাকৃতিক সম্পদের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ। কত আশ্চর্যের ব্যাপার সম্পদ মুসলিমদের আর বড়লোক ইহুদী খৃস্টান আর পৌত্তলিকরা! এসকল দুরাবস্থার অন্যতম কারণ হল, মুসলিমদের মাঝে দলাদলি আর ফিরকাবাজি ও কুরআন সুন্নাহর প্রকৃত জ্ঞানের অভাব। যারা কুরআন সুন্নাহ কিছুটা বুঝার চেষ্টা করে তারা নিজেরাই একটা দল বানিয়ে নেয় ইসলামের নামে। অথচ উম্মাহকে বিভক্তি করা হারাম। আমরা জানি ৫২টি দেশ মিলে আঠার শতকে একটি দেশ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট (UNITED STATES OF AMERICA)। ঐক্য তাদেরকে বর্তমানে অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। ২০০০ সালে আমাদের চোখের সামনে সমস্ত ইউরোপ মিলে (E.U) ইউরো গঠন করল। তারা কি সাদা চামড়া বলে এক হয়েছে? কখনও নয়, কারণ যদি তাই হোত তবে বসনিয়ান মুসলিম আর আলজেরিয়ান ও চেচনিয়ান মুসলিমদের তারা এভাবে গনহত্যা কখনও করতো না। তারা ঐক্য গঠন করেছে কারণ তারা খ্রীস্টান। দুনিয়ায় হিন্দুদেরও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আছে হিন্দুস্থান। দুনিয়ায় ভ্রান্ত আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত শিয়াদের একটি রাষ্ট্র আছে-ইরান। আর আমরা মুসলিমরা বিভ্রান্ত জাতির মত পথ হারা হয়ে ঘুরে মরেছি আর রোজই ইসলামের নামে নতুন দল গঠন করেছি। অথচ কুরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণা: "যারা কাফের তারা একে অপরের সহযোগী (এবং) যদি তোমরা (সারা দুনিয়ার মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধভাবে) তা না কর [সহযোগী না হও, এক উম্মাহ হিসাবে এক খলিফার নেতৃত্বে (সর্ব্বোচচ মুসলিম নেতা পুরো মুসলিম বিশ্বের) আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করে তওহীদ বা একত্ববাদের প্রতিষ্ঠা না কর] তাহলে পৃথিবীতে সৃষ্টি হবে ফিতনা, ফাসাদ, বিপর্যয় ও বিশৃংখলা (শিক্ক হবে প্রতিষ্ঠিত)।” (আল-আনফাল ৪ ৭২-৭৩) [Translation taken from: THE NOBLE QURAN by DR. MD. MUHSIN KHAN; P-241 (V.8; 73) It has been mentioned in tafsir At-Tabari ]

"তোমাদের এ উম্মত হচ্ছে একই উম্মত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমাকেই তোমরা ভয় করো। কিন্তু পরে লোকেরা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে নিয়েছে। প্রত্যেক দলের কাছে যা কিছু আছে তার মধ্যে তারা নিমগ্ন হয়ে গেছে। ভালোই, তাহলে ছেড়ে দাও তাদেরকে, ডুবে থাকুক নিজেদের গাফিলতির মধ্যে একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত। তারা কি মনে করে, আমি যে তাদেরকে অর্থ ও সম্মান দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছি, তা দ্বারা আমি তাদেরকে কল্যাণ দানে তৎপর রয়েছি! না তাহা নয়, আসল ব্যাপার সম্পর্কে তাদের কোন চেতনাই নেই"। (আল-মুমিনুন ৪৫২-৫৬)

"তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য (দলাদলি) সৃষ্টি করো না।" (আশ শুরা-১৩)

"আর তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করো, তোমরা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (আলে ইমরান: ১০৩) রাসূল (সাঃ) এ সমস্ত ফিরকার নেতা এবং তাদের দলের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেনঃ হুদাইফাহ্ বিন আল-ইয়ামান (রাঃ) থেকে দুটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে (বুখারী ও মুসলিম) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসের শেষ অংশে রাসূল (সাঃ) বলেছেন: তারপর আমি (হুদাইফাহ্ বিন আল-ইয়ামান) জিজ্ঞেস করলাম ঐ আংশিক ভালোর পর কি আবার মন্দ আসবে? তিনি (সাঃ) জবাব দিলেন "হ্যাঁ দোজখের আগুনের ফটকের আহবানকারীরা (অর্থাৎ ইসলামীদলের নামধারী ফিরকার নেতারা), যে ব্যক্তিই তাদেরকে ইতিবাচক জবাব দেবে (অর্থাৎ তাদের বানান ইসলামী দলে বা ফিরকায় যোগ দিবে) তারা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।” আমি তখন তাকে তাদের সম্পর্কে আমাদের কাছে বিবরণ দিতে বললাম, তিনি বললেন, "তারা আমাদের জাতির লোক হবে, এবং আমাদের ভাষায়ই কথা বলবে।” (অথাৎ মুসলিম জাতির লোক এবং ইসলামের ভাষায় কথা বলবে) আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- আমি যদি সে সময় বেঁচে থাকি তাহলে আপনি আমাকে কি উপদেশ দেবেন, তিনি (সাঃ) বললেন, মুসলমানদের মূল অংশের (জামায়াহতুল মুসলিমীন) এবং তাদের ইমামের (খলিফাহ) সাথে লেগে থাকবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম যদি কোন জামায়াহ বা ইমাম (খলিফা) না থেকে তাহলে কি করবো। তিনি জবাব দিলেন "সকল দল থেকে বেরিয়ে যাও এমনকি সেক্ষেত্রে যদি তোমাকে তোমার (তুমি যখন তোমার ঐ অবস্থায় থাক) কাছে মৃত্যু না আসা পর্যন্ত গাছের তলায় বসে থাকতে হয় তবুও।” (BUKHAARI: vol. 4 [no.803] and vol. 9 [no. 206]. MUSLIM [no. 4553]) (বুখারীর হাদীসে বর্ণিত) রাসূল (সাঃ) পুরো উম্মাহকে একটি মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করেছেন, একটি শরীরের মাথা একটি হয় অর্থাৎ একজন আমিরুল মুমিনীন বা খলিফার নেতৃত্বে সমস্ত উম্মাহকে সর্বাবস্থায় একত্রিত থাকা আমাদের জন্য ফরয হুকুম। খলিফাকে বাইয়াত না দিয়ে মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ থাকা বিষয়টি এত জরুরী যে তার জন্য দরকার হলে একজন মুসলিমকেও হত্যা করতে হতে পারে। আবু সা'ঈদুল খুদরী কর্তৃক বর্ণিত যে নবী (সাঃ) বলেছেন "যদি দুজন খলিফাহ আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি (বাইয়াহ) নেন তবে তাদের শেষোক্ত জনকে হত্যা কর।" (মুসলিম কিতাবুল ইমারাহ)

তবুও মুসলিমকে দলা-দলি করা যাবে না। কোরআন আর সুন্নাহতে কোথাও একবার ও বলা হয়নি দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) না থাকলে তোমরা আলাদা আলাদা ইসলামী দলে ভাগ হয়ে থাকতে পারবে। এ সংক্রান্ত সকল দলিলে তাফাররাক বা দলাদলিকে সম্পূর্ণ নিষেধ বা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে কঠোরভাবে। তাই দলাদলি করা হারাম বিদয়াত। [এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা আমাদের পরবর্তী বই আল জামায়াহ থেকে পাবেন ইনশাআল্লাহ]

📘 তাগুত > 📄 পীর মুরিদীর বিদয়াত

📄 পীর মুরিদীর বিদয়াত


ইসলামের সুন্নাতী আদর্শে আর একটি মারাত্মক ধরনের বিদয়াত দেখা দিয়েছে- তা হল পীর-মুরীদী। পীর-মুরীদীর যে সিলসিলা' বর্তমানকালে দেখা যাচ্ছে, এ জিনিস সম্পূর্ণ নতুন ও মনগড়াভাবে উদ্ভাবিত। এ জিনিস রাসূলে করীম (সাঃ)- এর যুগে ছিল না, তিনি পীর-মুরীদী করেন নি কখনো। তিনি নিজে বর্তমান অর্থে না ছিলেন পীর আর না ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর মুরীদ। সাহাবায়ে কিরামও এ পীর-মুরীদী করেন নি কখনো। তাঁদের কেউ কারো 'পীর' ছিলনা এবং কেউ ছিলো না তাদের মুরীদ। তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগেও এ পীর-মুরীদীর নাম চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু তাই নয়। কুরআন হাদীস তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এ পীর-মুরীদীর কোন দলীলের সন্ধান পাওয়া যাবে না। অথচ বর্তমানকালের এক শ্রেণীর পীর নামে কথিত জাহিল লোক ও তাদের ততোধিক জাহিল মুরীদ এ পীর-মুরীদীকে ইসলামের অন্যতম ভিত্তিগত জিনিস বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। আর এর মাধ্যমে অজ্ঞ মুর্খ লোকদের মুরীদ বানিয়ে এক একটি বড় আকারের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।

শরীয়াত মারিফাত : এ পর্যায়ে সবচেয়ে মৌলিক বিদয়াত হল শরীয়ত ও তরীকতকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন এবং পরস্পর সম্পর্কহীন দুই স্বতন্ত্র জিনিস মনে করা। এতোদূর পতন ঘটেছে যে, শরীয়াতকে 'ইলমে জাহের' এবং 'তরিকত বা মারিফাতকে ইলমে বাতেন বলে অভিহিত করে দ্বীন ইসলামকেই দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়া হয়েছে। এক শ্রেণীর জাহিল তরীকতপন্থী বলতে শুরু করেছে যে, ইসলামের আসলই তরীকত মারিফাত, আর এ-ই হাকীকত। এ হাকীকত কেউ যদি লাভ করতে পারল, তাহলে তাকে শরীয়াত পালন করতে হয় না, সেতো আল্লাহকে পেয়েই গেছে। তাদের মতে শরীয়াতের আলিম এক, আর মারিফাত বা তরীকতের আলিম অন্য। এই তরীকতের আলিমরাই উপমহাদেশে পীর নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। কিন্তু তাসাউফবাদীরা এ মারিফাতকে কেন্দ্র করে গোলক ধাঁধার এক প্রাসাদ রচনা করেছে। তাদের মতে মারিফাত বা ইলমে বাতেন ইসলামী শরীয়াত থেকে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জিনিস। তাদের মতে রাসূলে করীম (সাঃ) নাকি এ মারিফাত তাঁর কোন কোন সাহাবীকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, আর অনেককে দেন নি। তাঁরা আরো মনে করেন, ইলমে বাতেন হযরত আলী (রাঃ) থেকে হাসান বসরী পর্যন্ত পৌঁছেছে। আর তাঁরই থেকে সীনায়-সীনায় এ জিনিস চলে এসেছে এ কালের পীরদের পর্যন্ত। এই সমস্ত কথাই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেননা রাসূলে করীম (সাঃ) কাউকেই এ জিনিস শিখিয়ে জান নি, যা এখনকার পীর তার মুরীদকে শিখিয়ে থাকে। তিনি এরূপ করতে কাউকে বলেও যান নি। কোন দরকারী ইলম তিনি কোন কোন সাহাবীকে শিখিয়ে দেবেন, আর অনেক সাহাবীকেই তা থেকে বঞ্চিত রাখবেন- এরূপ করা নবী করীমের নীতি ও আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তা ছাড়া হাসান বসরী, আলী (রাঃ) এর সাক্ষাত পাননি, তাঁর নিকট থেকে মারিফাত শিক্ষা করা ও খিলাফতের 'খিরকা' লাভ করা তো দূরের কথা। আসলে এ কথাটাই বাতিল। শেষের জামানার ভন্ড লোকেরা এটাকে রচনা করেছে প্রচার ও কবুল করেছে। আর এ ধরনের কথা আদৌ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আলামা মুলা আলী আল-কারী আল্লামা ইবনে হাযার আল-আসকালানীর (রহঃ) (৭৭৩হিঃ-৮৫২হিজরী, যিনি বুখারী শরীফের তাফসীর বা ভাষ্য গ্রন্থ 'ফতহুল বারী' লিখেছেন) উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ সুফী ও মারিফাতপন্থীরা যে সব তরীকা ও নিয়ম-নীতি প্রমাণ করতে চায়, তা প্রমাণ হওয়ার মত কোন জিনিস-ই নয়। সহীহ, হাসান বা যয়ীফ কোন প্রকার হাদীসেই একথা বলা হয়নি যে, নবী করীম (সাঃ) তাঁর কোন সাহাবীকে তাসাউফপন্থীদের প্রচলিত ধরনে খিলাফতের' খিরকা' (বিশেষ ধরনের জামা বা পোষাক) পরিয়ে দিয়েছেন। সেরূপ করতে তিনি কাউকে হুকুমও করেন নি। এ পর্যায়ে যা কিছু বর্ণনা করা হয়, তা সবই সুস্পষ্টরূপে বাতিল। তা ছাড়া হযরত আলী হাসান বসরীকে 'খিরকা পরিয়েছেন (মারিফাতের খিলাফাত দিয়েছেন) বলে যে দাবি করা হয়, তা সম্পূর্ণরূপে মনগড়া মিথ্যা কথা।

শাহ ওয়ালী উলাহ দেহলভী এ সম্পর্কে লিখেছেনঃ মারিফাতের যেসব তরীকা, মুরাকাবা-মুশাহিদা ও যিকির এখনকার পীরেরা তাদের মুরীদদের শিখিয়ে থাকে, তা রাসূলে করীম (সাঃ) বা সাহাবায়ে কিরামের জামানায় ছিল না। উপায়-উপার্জন ত্যাগ করা, তালিযুক্ত পোশাক পরা ও বিয়ে-ঘর সংসার না করা ও খানকার মধ্যে বসে থাকা সেকালে প্রচলিত ছিল না।

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে এ দর্শনের সঠিক পরিচয় হল অদ্বৈতবাদ (হিন্দুদের আকীদার ভিত্তি)। মানে আল্লাহ্ ও জগত কিংবা স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক ও অভিন্ন বিশ্বাস করা যা কি না ভ্রান্ত আক্বিদা। যা সৃষ্টি তাই স্রষ্টা এবং যিনি স্রষ্টা তিনিই সৃষ্টি - অদ্বৈতবাদী মতাদর্শের এই গোড়ার কথা। আর তা-ই হচ্ছে হিন্দু ধর্মের তত্ত্ব, যা বর্তমানে পীর-মুরীদী ধারায় ইসলামের মারিফাত নাম ধারণ করে মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়েছে এবং এ যে স্পষ্ট শিরক তাতে এক বিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই। বস্তুত ইসলাম এক সর্বাত্মক দ্বীন, মানুষ যখন শরীয়াত মুতাবিক আমল করে, তখন হয় শরীয়াতের আমল। পীর-মুরীদী সম্পর্কে মুজাদ্দিদে আলফেসানী শরীয়াত ও মারিফাত পর্যায়ে তিনি তাঁর মাকতুবাতে লিখেছেনঃ কাল কিয়ামতের দিন শরীয়াত সম্পর্কেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তাসাউফ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞাসা করা হবে না। জান্নাতে যাওয়া ও জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া শরীয়তের বিধান পালনের উপর নির্ভরশীল।

শরীয়াতের বিধান জানার মাধ্যম-- শরীয়াতে মুহাম্মদীর নীতি ও বিধান বুঝার জন্য আমাদের সামনে দু'টি মাধ্যম রয়েছে। প্রথম হচ্ছে কুরআন মজীদ, আর দ্বিতীয় হাদীস। কুরআন মজীদ সম্পর্কে সকলেই জানেন যে, তা হচ্ছে আল্লাহর কালাম এবং তার প্রতিটি শব্দ আল্লাহর কাছে থেকে এসেছে। হাদীস বললে বুঝায় সেসব বর্ণনা, যা রাসূলে করীম (সাঃ) থেকে আমাদের কাছে এসে পৌছেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সারা জীবনই ছিল কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা। নবী হওয়ার সময় থেকে শুরু করে তেইশ বছর কাল তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কেটেছে মানুষকে শিক্ষা ও পথ নির্দেশ (হেদায়াত) দানের কাজে এবং আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জী অনুযায়ী জীবন যাপনের পদ্ধতি তিনি মানুষকে শিখিয়ে গেছেন তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে।

ফিকাহ- কুরআন ও হাদীসের বিধান সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে উলিল ইলম বা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত আলেমগণ সাধারণ লোকদের সুবিধার জন্য আইনসমূহ বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের লিখিত গ্রন্থরাজিকে বলা হয় 'ফিকাহ'। যেহেতু প্রত্যেক মানুষই কুরআন শরীফের সবগুলো সূক্ষ্ম তত্ত্ব বুঝে উঠতে পারে না এবং প্রত্যেকটি মানুষ হাদীস সংক্রান্ত বিদ্যায় এতটা পারদর্শী নয়, যাতে নিজেরা শরীয়াতের বিধান বুঝে নিতে পারে, তাই উলিল ইলমরা বছরের পর বছর মেহনত করে, চিন্তা-গবেষণা করে 'ফিকাহ' শাস্ত্র প্রণয়ন করেছেন।

তাসাউফঃ ফিকাহর সম্পর্ক হচ্ছে মানুষের প্রকাশ্য কার্যকলাপের সাথে। তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে এই যে, আমাকে যেভাবে, যে পদ্ধতিতে কোন কাজ করার বিধান দেয়া হয়েছে, সঠিকভাবে তা করছি কিনা। যদি তা সঠিকভাবে পালন করে থাকি, তা হলে মনের অবস্থা কি ছিল, তা নিয়ে ফিকাহর কিছু বলবার নেই। ইবাদতের সময় মনের অবস্থার সাথে যার সম্পর্ক সে জিনিসটিকে বলা হয় তাসাউফ (কুরআন শরীফে এ জিনিসটির নাম দেয়া হয়েছে 'তাযকিয়া' ও 'হেকমত' হাদীসে একে বলা হয়েছে 'ইহসান' এবং পরবর্তী লোকেরা একে অভিহিত করেছেন 'তাসাউফ'নামে।) যেমন কেউ সালাত আদায় করছে, সেখানে ফিকাহ কেবলমাত্র এতটুকুই দেখেছে যে, সে ঠিক মত ওযু করল কিনা। কেবলার দিকে মুখ করে দাঁড়াল কিনা, সালাতের সবগুলো অপরিহার্য শর্ত পালন করল কিনা, সালাতের মধ্যে যা কিছু পড়তে হয় তা সে পড়ল কিনা এবং যে সময়ে যে কয় রাকায়াত সালাত নির্ধারিত রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে তত রাকায়াত পড়ল কিনা। যখন এর সবগুলো শর্ত পালন করা হল তখন ফিকাহর দৃষ্টিতে তার সালাত পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এক্ষত্রে তাসাউফ দেখে যে, এ ইবাদতে তার দিলের অবস্থা কি ছিল?সে আল্লাহর দিকে নিবিষ্টচিত্ত ছিল কিনা? তার দিল পার্থিব চিন্তা-ভাবনা থেকে মুক্ত ছিল কিনা? সালাত থেকে তার অন্তরে আলাহর ভীতি, তাঁর হাযির-নাযির থাকা সম্পর্কে প্রত্যয় এবং একমাত্র তারই সন্তোষ বিধানের আকাংখা পয়দা হয়েছিল কিনা? এ সালাত তার আত্মাকে কতটা পরিশুদ্ধ করেছে? তার চরিত্র কতটা সংশোধন করেছে? তাকে কতটা সত্যসাধক ও সৎকর্মশীল মুসলিম করে তুলেছে? সালাতের সত্যিকার লক্ষ্যের পথে যেসব বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে, একজন লোক তার যতটা পরিপূর্ণতা হাসিল করল, তাসাউফের দৃষ্টিতে তার সালাত ততটা বেশী পূর্ণতা লাভ করেছে। আর সে দিক দিয়ে যতটা দুর্বলতা থেকে যাবে, তারই জন্য তার সালাতকেও ততটা দুর্বল বলে ধরা হবে।

একটি দৃষ্টান্ত থেকে এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারা যায়। যখন কোন বিশেষ ব্যক্তি কারো সাথে সাক্ষাত করে তখন সে দু'টি দৃষ্টিভংগিতে তার প্রতি নযর করে। এক হচ্ছে: লোকটি পূর্নাংগ ও স্বাস্থ্যবান কিনা; অন্ধ, কানা, খোঁড়া, তো নয়। লোকটি সুশ্রী বা কুশ্রী; তার পরিধানে ভাল কাপড়-চোপড়, না ময়লা জীর্ণ কাপড়, দ্বিতীয় হচ্ছে: তার চরিত্র কি ধরনের, তার স্বভাব ও অভ্যাস কিরূপ, তার জ্ঞান-বুদ্ধি কি প্রকারের। সে আলেম না জাহেল, সৎ না অসৎ। এর মধ্যে প্রথম নযরটি হচ্ছে ফিকাহর নযর, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাসাউফের নযর। বন্ধুত্বের জন্য যখন কোন লোককে কেউ পছন্দ করতে চেষ্টা করবে, তখন তার ব্যক্তিত্বের দু'টি দিকই যাচাই করে দেখতে হবে। তার ভেতর ও বাইরের দু'টি দিকই সুন্দর হোক এ হবে তার আকাংখা। এমনি করে ইসলামেও যে বাঞ্ছিত জীবনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে বাইরের ও ভিতরের উভয়বিধ বিশ্বাসের দিক দিয়ে শরীয়াতের বিধি-বিধানের আনুগত্য করতে হবে।

এ দৃষ্টান্ত থেকে ফিকাহ ও তাসাউফের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে পারা যায়। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, পরবর্তী যামানায় যেখানে জ্ঞান ও চরিত্রের বিকৃতি হেতু বহুবিধ অনাচার জন্ম লাভ করেছে সেখানে তাসাউফের পবিত্র রূপকেও বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। বিভ্রান্ত জাতিসমূহের কাছ থেকে ইসলাম বিরোধী দর্শনের (গ্রীক দর্শন, প্রাচীন মিশরিয় দর্শন ও ভারতীয় বেদান্ত দর্শন) শিক্ষা লাভ করে মানুষ তাকে তাসাউফের নামে ইসলামের মধ্যে দাখিল করে নিয়েছে। কুরআন ও হাদীসে যার অস্তিত্ব নেই, এমনি বহু বিচিত্র ধরনের বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতি তারা তাসাউফের নামে চালিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের লোকেরা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে শরীয়তের আনুগত্য থেকে মুক্ত করে নিয়েছে। তাঁদের মতে তাসাউফের সাথে শরীয়তের কোন সম্পর্ক নেই। এখানে আরেকটি ভিন্নতর জগত বিরাজ করছে। পীর ও সুফীরাই এ ধরনের মত পোষণ করে থাকে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিপ্রসূত। অথচ পূর্বের কোন যুগেই 'ইলমে তাসাউফ বা শুধু তাসাউফ এ নামের কোন ইলম ইসলামে ছিল না, মুসলমানরা জানত না। 'ইসলামে শরীয়াত ও মারিফত দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়'-এ ধারণা এক অতি বড় বিদয়াত। যেমন অতি বড় বিদয়াত হচ্ছে ইসলামে ধর্ম আর রাজনীতিকে দুই বিচ্ছিন্ন জিনিস মনে করা। ধর্ম ও রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন করে রাজনীতির ক্ষেত্রে ফাসিক ফাজির-জালিম লোকদের কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছে। আর দ্বীনকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে শুধু নামায-রোযা, হজ্জ ও যাকাতের মধ্যে। অনুরূপভাবে শরীয়াত আর তরীকতকে বিচ্ছিন্ন করে সৃষ্টি হয়েছে এক শ্রেণীর জাহেল পীর। মুসলিম সমাজে চলেছে পীরবাদ নামে এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মুশরিকী প্রতিষ্ঠান। এ পীরবাদ চিরদিনই ফাসিক-ফাজির-জালিম শাসকদের, রাজা-বাদশাদের আশ্রয়ে লালিত-পালিত শাখায় পাতায় সুশোভিত হয়েছে। সাধারণত পীরেরা চিরদিনই এ ধরনের শাসকদের সমর্থন দিয়েছে। তারা কোন দিনই জালিম-ফাসিক শাসকদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করে নি। বরং সব সময়ই 'আল্লাহ আপকা হায়াত দারাজ করে' বলে দু'হাত তুলে তাদের জন্য দোয়া করেছে।

শরীয়তের বিধি-বিধানের সাথে সম্পর্ক থাকবে না, ইসলামে এমন কোন তাসাউফের স্থান নেই। কোন সুফীরই সালাত, সওম, হজ্জ ও যাকাতের আনুগত্য থেকে মুক্তি লাভের অধিকার নেই। সমাজ-জীবন, নৈতিক দায়িত্ব, চরিত্র, পারস্পরিক আদান-প্রদান, অধিকার, কর্তব্য ও হালাল-হারামের সীমানা সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূল যে নির্দেশ দিয়েছেন কোন পীর বা সুফীরই সেই নিয়মের বিরোধী কার্যকলাপের অধিকার নেই। যে ব্যক্তি সঠিকভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর আনুগত্য করে না এবং তাঁর নির্ধারিত কর্মপদ্ধতির অনুসরণ করে না, মুসলিম সুফী বলে পরিচয় দেয়ার যোগ্য সে নয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি সত্যিকার প্রেমই হচ্ছে তাসাউফ এবং প্রেমের দাবী হচ্ছে এই যে, কেউ যেন আল্লাহর বিধান ও তার রাসূলের আনুগত্য থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত না হয়। ইসলামী তাসাউফ শরীয়াত থেকে স্বতন্ত্র কিছু নয়, বরং শরীয়াতের বিধানসমূহকে সর্বাধিক আন্তরিকতা ও সৎসংকল্প সহকারে পালন করা এবং অন্ত রের ভিতরে আল্লাহর প্রেম ও ভীতির মনোভাব সিক্ত ও সঞ্জীবিত করার নামই হচ্ছে তাসাউফ।

শরীয়াত আর তরীকতকে যারা দুটো জিনিস মনে করে নিয়েছে এবং তরীকতের অর্থহীন অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় যারা নিমগ্ন হয়েছে, মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহঃ) তাদেরকে জাহেল ও বিভ্রান্ত লোক বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আজ জাহেল পীরেরা নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থের জন্যে এবং শরীয়াত পালন ও কায়েমের দায়িত্বপূর্ণ কাজ থেকে দূরে খানকা শরীফের চার দেয়ালের মধ্যে সহজ ও সস্তা সুন্নাত পালনের অভিনয় করার জন্যে শরীয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন 'তরীকত' নামের এ নতুন বস্তুর প্রচলন করে চলেছে। পীরদের মুরীদ বানাবার ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন হচ্ছে কাশফ ও ইলহামের দোহাই। পীরেরা যখন বলেঃ আমার কাশফ হয়েছে, ইলহাম যোগে আমি একথা জানতে পেরেছি, তখন জাহেল মুরীদান ভক্তিতে গদগদ হয়ে পীরের কদমবুসি শুরু করে। কিন্তু এসব জিনিস যে পীর-মুরীদীর ব্যবসা চালাবার জন্যে হয়, তা বুঝবার ক্ষমতা এই মুর্খ পীরদের মুরীদদের নেই।

কিন্তু জাহেল পীরেরা শরীয়াতের ধার ধারে না। তারা ইলহামের দোহাই দিয়ে জায়েয-নাজায়েয, হালাল-হারাম ও ফরয-ওয়াজিব ঠিক করে ফেলে। আর অন্ধ মুরীদরা তাই মাথা পেতে মেনে নেয়, শরীয়াতের হুকুমের প্রতি তাকাবার খেয়ালও জাগে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়- পীর ও সূফী লোক নিজেরা যেমন সাধারণত জাহেল হয়ে থাকে, মুরীদদেরকেও তেমনি জাহেল করে রাখতে চায় এবং তাদের দ্বীন ইসলাম ও ইসলামী শরীয়াত সম্পর্কে কুরআন হাদীস থেকে জ্ঞান অর্জন করার জন্যে কখনো হিদায়াত দেয় না। পীর কিবলা মুরীদকে মুরাকাবা করতে বলবে, আল্লাহর যিকির করতে বলবে এবং হাজার বার করে বানানো দরূদ শরীফের অজীফা' পড়তে বলবে; কিন্তু আল্লাহর কালাম দ্বীন- ইসলামের মূল উৎস কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করতে তার তরজমা ও তাফসীর বুঝতে এবং আল্লাহর কথার সাথে গভীরভাবে পরিচিত হতে কখনই বলবে না। মোগলদের ইসলাম-বিরোধী শাসনামলে মুজাদ্দিদে আলফেসানী যখন দ্বীন- ইসলাম প্রচার এবং বাতিলের প্রতিবাদ শুরু করেন, তখন বাতিল পীরেরা তাঁর এ কাজের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায়।
বস্তুত বায়আত করা সুন্নাত মুতাবিক কাজ বটে; কিন্তু পীর-মুরীদীর বায়আত সম্পূর্ণ বিদয়াত, যেমন বিদয়াত স্বয়ং পীর-মুরীদী। বায়আত দিতে হবে এবং বায়আত না দিয়ে মারা গেলে জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে সহীহ হাদীস দ্বারা একথা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু এই বায়আত দিতে হবে সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে শুধুমাত্র একজন আমীরুল মুমিনীন বা খলিফাকে আনুগত্য করার শপথের জন্য। যেমন নবী করীম (সাঃ)-এর ইন্তিকালের পর খলীফা নির্বাচনী সভায় হযরত উমর ফারুক (রাঃ) সর্বপ্রথম বায়'আত করলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর হাতে। চিশতীয়া, নকশাবন্দীয়া, মুজাদ্দিদীয়া ও মুহাম্মদীয়া তরীকায় ফকীর হাকীরের হাতে বায়আত লওয়ার বর্তমানকালে প্রচলিত এই সিলসিলা এল কিভাবে, এ বায়আতের সাথে নবী করীম (সঃ) সাহাবাদের বায়আতের সম্পর্ক কি? মিল কোথায়? আসলে এ হচ্ছে ইসলামের একটি ভাল কাজকে খারাপ ক্ষেত্রে ও খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার মত ব্যাপার। আর এ কারণেই পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে হাতে হাতে কিংবা পাগড়ী ধরে অথবা পাগড়ী ধরা লোকের গায়ে গা মিলিয়ে বায়আত করা, বায়আত করা নানা তরীকায় মুরাকাবা করার জন্যে- সম্পূর্ণ বিদয়াত। আরো বড় বিদয়াত হল মুরীদ ও পীরের কুরআন বাদ দিয়ে 'দালায়েলুল খায়রাত' নামে এক বানানো দরূদ সম্বলিত কিতাবের তিলাওয়াতে মশগুল হওয়া। মনে হয় এর তিলাওয়াত যেনো একেবারে ফরয। কিন্তু শরীয়াতে কুরআন ছাড়া আর কিছু তিলাওয়াত করাকে বড় সওয়াবের কাজ মনে করা, কুরআন অপেক্ষা অন্য কোন মানবীয় কিতাবকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা সুস্পষ্টরূপে এক বড় বিদয়াত।

কোন মতে একজন লোক যদি একবার 'পীর' নামে খ্যাত হতে পারল, অমনি তাঁর বড় পুত্র অবশ্যই তাঁর গদীনশীন হবে। কিন্তু পীরের গদী কোনটি, যার উপর বড় সাহেব 'নশীন' হন। পীর কি কোন জমিদার যে, তার মৃত্যুর পর তার বড় পুত্র বাবার স্থলে জমিদার হয়ে বসবে। ইসলামে নেই কোন জমিদারী, বাদশাহী; নেই দ্বীন নিয়ে এখানে কোন দোকানদারী ব্যবসা চালাবার অবকাশ। কেউ পীর নামে খ্যাত অমনি তার ছেলেরা 'শাহ' বলে অভিহিত হতে শুরু করে। 'শাহ' মানে বাদশাহ। পীর সাহেব নিজে একজন বাদশাহ; আর তাঁর ছেলেরা হল খুঁদে বাদশাহ, বাদশাহজাদা। এই চিরন্তন নিয়ম আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। এ থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, পীর-মুরীদীর প্রথাটাই আগাগোড়া একটা জাহিলিয়াতের প্রথা। এ প্রথার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এ প্রথা কিছু মাত্র ইসলামী নয়। এই পীর ও তার মুরীদরা, এ পীরের সমর্থকরা, হাদিয়া তোহফা ও টাকা-পয়সা যারা দেয়, তারা সকলেই রাসূলে করীম (সাঃ)-এর ঘোষণানুযায়ী আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রাসূলে করীম (সাঃ) এর চারটি কথার তৃতীয় কথা হচ্ছেঃ আল্লাহ্ তা'য়ালা অভিশপ্ত করিয়াছেন সেই ব্যক্তিকে যে বিদয়াতকারী বা বিদয়াতপন্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, সম্মান করেছে এবং সাহায্য সহযোগীতা দিয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00