📘 তাগুত > 📄 বিদয়াত

📄 বিদয়াত


সুন্নাত হচ্ছে তা-ই, যা বিদয়াতের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কেননা এ সুন্নাতের বিপরীতই হচ্ছে বিদয়াত। ইমাম রাগেব 'বিদয়াত' শব্দের অর্থ লিখেছেনঃ কোনরূপ পূর্ব নমুনা না দেখে এবং অন্য কিছুর অনুসরণ না করেই কোন কার্য নতুনভাবে সৃষ্টি করা। অর্থাৎ শরীয়াত প্রবর্তক যে কথা বলেন নি সে কথা বলা এবং তিনি যা করেন নি এমন কাজকে আদর্শরূপে গ্রহণ করা-তা-ই হচ্ছে বিদয়াত। এমন সব কাজ করা বিদয়াত, যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। কুরআন মজিদে এ বিদআত শব্দটি আল্লাহ্ সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়েছে দুটো আয়াতে।

"আসমান-যমীনের সম্পূর্ণ নবোদ্ভাবনকারী, নতুন সৃষ্টিকারী।” (আল-বাকারা)

"তিনি তো আসমান-যমীনের নব সৃষ্টিকারী।" (আনআম: ১০১)

এ দুটো আয়াতেই আল্লাহ্ তা'য়ালাকে 'আসমান যমীনের বদীউন'-পূর্ব দৃষ্টান্ত পূর্ব উপাদান ও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সৃষ্টিকারী বলা হয়েছে। সূরা 'আল-কাহাফ'-এর এক আয়াতে 'বিদয়াত' শব্দের এ অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায়। ইরশাদ হচ্ছেঃ

"বল হে নবী, আমি আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের কথা কি তোমাদের বলব? তারা হচ্ছে এমন লোক, যাদের যাবতীয় চেষ্টা সাধনাই দুনিয়ার জীবনে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে আর তারাই মনে মনে ধারনা করে যে, তারা খুবই ভাল কাজ করেছে।" (আল কাহাফ: ১০৩-১০৪)

বিদয়াতপন্থীরাও ঠিক এমনি। তারা যেসব কাজ করে, আসলে তা আল্লাহর দেয়া নীতির ভিত্তিতে নয়। তা সত্ত্বেও তারা তাকেই নেক আমল এবং বড় সওয়াবের কাজ বলে মনে করে।

হযরত ইরবাদ ইবনে সারিয়া (রাঃ) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেন "তোমাদের অবশ্যই অনুসরণ করে চলতে হবে আমার সুন্নাত এবং হিদায়াত প্রাপ্ত সত্যপন্থী খলীফাদের সুন্নাত! তোমরা তা শক্ত করে ধরবে, দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে থাকবে (যেন কোন অবস্থায়ই তা হাতছাড়া হয়ে না যায়, তোমরা তা থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিচ্যুত হয়ে না পড়)"। (মুসনাদে আহমদ)

কুরআন মজীদে দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'য়ালা ঘোষণা করেছেনঃ

"আজকের দিনে তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ-পরিণত করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সম্যকভাবে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম-মনোনীত করলাম।" (আল-মায়েদা ৩)

এ আয়াত থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন-ইসলাম পরিপূর্ণ। তাতে নেই কোন অসম্পূর্ণতা, কোন কিছুর অভাব। এ দ্বীনে বিশ্বাসী ও এর অনুসরণকারীদের কোন প্রয়োজন হবে না এ দ্বীন ছাড়া অন্য কোন দিকে তাকাবার, বাইরের কোন কিছু এতে শামিল করার এবং ভিতর থেকে কোন কিছু বাদ দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়ার কেননা এতে মানুষের সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অতএব না তাতে কোন জিনিস বৃদ্ধি করা যেতে পারে, না পারা যায় তা থেকে কোন কিছু বাদ দিতে। এ দুটোই দ্বীনের পরিপূর্ণতার বিপরীত এবং আলাহর উপরোক্ত ঘোষণার স্পষ্ট বিরোধী। ইসলামী ইবাদতের ক্ষেত্রে সওয়াবের কাজ বলে এমন সব অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করা, যা নবী করীম (সাঃ) ও সাহাবায়ে কিরামের জামানায় চালু হয়নি এবং তা দেখতে যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন তা স্পষ্টই বিদয়াত, তা দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতার কুরআনী ঘোষণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ কারণেই ইমাম মালিক বলেছিলেনঃ "সেকালে যে কাজ দ্বীনি কাজ বলে ঘোষিত ও নির্দিষ্ট হয়নি, আজও তাকে দ্বীনি কাজ বলে মনে করা যেতে পারে না।"

অতীতকালের নবীর উম্মতদের দ্বারা নবীর উপস্থাপিত দ্বীন বিকৃত ও বিলীন হয়ে যাওয়ারও একমাত্র কারণই ছিল যে, তারা নবীর প্রবর্তিত ইবাদতে মনগড়াভাবে নতুন জিনিস শামিল করে নিয়েছিল। কিছুকাল পরে আসল দ্বীন কি, তা চিনবার আর কোন উপায়ই থাকল না।

'দ্বীন' তো আল্লাহর দেয়া এবং রাসূলের উপস্থাপিত জিনিস। তাতে যখন কেউ নতুন কিছু শামিল করে, তখন তার অর্থ এই হয় যে, আল্লাহ্ বা রাসুলে করীম (সাঃ) যেন বুঝতেই পারছিলেন না দ্বীন কিরূপ হওয়া উচিত আর এরা এখন বুঝতে পারছে, তাই নিজেদের বুঝমত সব নতুন জিনিস এর মাঝে শামিল করে এর ত্রুটি দূর করতে চাইছে এবং অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করে তুলছে। আর এর ভিতর থেকে কিছু বাদ-সাদ দিয়ে একে যুগোপযোগী করে তুলতে চাইছে। এরূপ কিছু করার অধিকার তাকে কে দিল? আল্লাহ্ দিয়েছেন? তাঁর রাসূল দিয়েছেন? ---না, কেউ ই দেয় নি, নিজ ইচ্ছে মতই সে করেছে। ঠিক এ দিকে লক্ষ্য করেই হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) বলেছেন। "যে ইবাদত সাহাবায়ে কেরাম করেন নি, সে ইবাদত তোমরা কর না। তাকে ইবাদত বলে মনে কর না, তাতে সওয়াব হয় বলেও বিশ্বাস কর না।"

এ বিদয়াত এমনই এক মারাত্মক জিনিস, যা শরীয়তের অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া ও রাসূলের প্রদর্শিত ফরজ ওয়াজিবকে পর্যন্ত বিকৃত করে দেয়। শরীয়াতের ফরজ ওয়াজিবের প্রতি অন্তরে থাকে না কোন মান্যতা গণ্যতার ভাবধারা। শরীয়াতের সীমালংঘন করার অভ্যাস হতে থাকে। শরীয়াত বিরোধী কাজগুলোকে তখন মনে হতে থাকে খুবই উত্তম। যে লোক ইসলামে কোন বিদয়াত উদ্ভাবন করবে এবং তাকে ভাল ও উত্তম মনে করবে, সে যেন ধারণা করে নিয়েছে যে, নবী (সাঃ) রিসালাত ও নবুয়‍্যাতের দায়িত্ব পালন করেন নি, খেয়ানত করেছেন। কেননা তিনি যদি দায়িত্ব পালন করেই থাকেন, তাহলে ইসলাম ও সুন্নাত ছাড়া আর তো কোন কিছুর প্রয়োজন পরে না। সব ভালই তো তাতে রয়েছে।

সত্যিকারভাবে যে দ্বীন রাসূলের নিকট থেকে পাওয়া গেছে, ঠিক তা-ই পালন করে চলা উচিত সব মুসলমানের। না তাতে কিছু কম করা উচিত, না তাতে কিছু বেশী করা সঙ্গত হতে পারে। কুরআনের নিগেক্ত আয়াতে এ কথাই বলা হয়েছে 'আহলি কিতাব কে লক্ষ্য করে।

"হে আহলি কিতাব! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কর না আর আল্লাহ্ সম্পর্কে প্রকৃত হক ছাড়া কোন কথা বল না।”

বিদয়াত কিভাবে চালু হয়

বিদয়াত চালু হওয়ার মূলে চারটি কার্যকরণ লক্ষ্য করা যায় প্রথমটি : এই যে, বিদয়াতী তা নিজের থেকে উদ্ভাবিত করে সমাজে চালিয়ে দেয়। পরে তা সাধারণভাবে সমাজে প্রচলিত হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়টি: কোন আলিম ব্যক্তিই হয়ত শরীয়তের বিরোধী একটা কাজ করেছেন, করেছেন তা শরীয়তের বিরোধী জানা সত্ত্বেও; কিন্তু তা দেখে জাহিল লোকেরা মনে করতে শুরু করে যে, এ কাজ শরীয়তসম্মত না হয়ে যায় না। এভাবে এক ব্যক্তির কারনে গোটা সমাজেই বিদয়াতের প্রচলন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়টি : এই যে জাহিল লোকেরা শরীয়াত বিরোধী কোন কাজ করতে শুরু করে। তখন সমাজের আলিমগণ সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে থাকেন, তার প্রতিবাদও করেন না, সেকাজ করতে নিষেধও করেন না। বলেন না যে, এ কাজ শরীয়াতের বিরোধী তোমরা এ কাজ কিছুতেই করতে পারবে না। বিরুদ্ধতা না করার ফলে সাধারন লোকদের মনে ধারণা জন্মে যে, এ কাজ নিশ্চয়ই নাজায়েয হবে না, বিদয়াত হবে না। হলে কি আর আলিম সাহেবরা তার প্রতিবাদ করতেন না। এভাবে সমাজে সম্পূর্ণ বিদয়াত বা নাজায়েয কাজ শরীয়াতসম্মত কাজরূপে পরিচিত ও প্রচলিত হয়ে পড়ে।

চতুর্থটি: বহুকাল পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমকৃত ও রাসূল (সাঃ)-এর প্রদর্শিত কোন একটি সুন্নাত তা সমাজের লোকদের সামনে বলা হয়নি, প্রচার করা হয়নি। তখন সে সম্পর্কে সাধারণের ধারণা হয় যে, এ কাজই নিশ্চয়ই জায়েয নয়, হুকুম হলে আলিম সাহেবরা কি এতদিন তা বলতেন না! এভাবে একটি শরীয়াতসম্মত কাজকে শেষ পর্যন্ত শরীয়ত বিরোধী বলে লোকেরা মনে করতে থাকে আরএ-ও একটি বড় বিদয়াত। যেমন- কুরআন আর সুন্নাহর সুস্পষ্ট হুকুম শুধুমাত্র ইসলামী আইন বা শরীয়াহ মুতাবিক রাষ্ট্রীয় সংবিধান হওয়া, শুধুমাত্র আলাহর আইন দ্বারা বিচার ফায়সালা করা, দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) থাকুক আর না থাকুক সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে এক খলিফার নেতৃত্বে একত্রিত থাকা এবং ইসলামের নামে ফিরকা বা দলাদলি না করা ইত্যাদি। এ সকল কাজ সমূহের ফরয হুকুম থাকা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজের বেশীরভাগ লোকই জানে না যে তারা সকলে আল্লাহর ফরয হুকুম পালন করা ছেড়ে দিয়েছে এবং বিদয়াত নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। ফলে তারা শির্ক কুফর ও বিদয়াতে পতিত আছে।

বিদয়াত প্রচলিত হওয়ার আর একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। আর তা হল এই যে, মানুষ স্বভাবতই চিরন্তন শান্তি ও সুখ-বেহেশত লাভ করার আকাঙক্ষী। আর এ কারণে সে বেশী বেশী নেক কাজ করতে চেষ্টিত হয়ে থাকে। দ্বীনের হুকুম আহকাম যথাযথ পালন করা কঠিন বোধ হলেও সহজসাধ্য সওয়াবের কাজ করার জন্যে লালায়িত হয় খুব বেশী। আর তখনি সে শয়তানের ষড়যন্ত্রে পড়ে যায়। নিজ থেকেই মনে করে নেয় যে, এগুলো সব নেক কাজ, সওয়াবের কাজ। সেগুলো শরীয়াতের ভিত্তিতেও বাস্তবিকই সওয়াবের কাজ কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবার মত ইল্মী যোগ্যতাও যেমন থাকে না, তেমনি সে দিকে বিশেষ উৎসাহও দেখানো হয় না। কেননা তাতে করে চিরন্তন সুখ লাভের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। আর তাতেই তাদের ভয়।

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বিশ্বাস করতেন যে, শিরক তাওহীদের পরিপন্থী আর বিদয়াত সুন্নাতের বিপরীত। শির্ক 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু কালেমার' এই প্রথম অংশের অস্বীকৃতি। আর বিদয়াত হচ্ছে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' কালেমার এই শেষাংশের বিপরীত এবং অন্তর থেকে তার অস্বীকৃতি।”

মুসনাদে দারেমী হাদীস গ্রন্থে হযরত হিসনের উদ্ধৃতি রয়েছেঃ "জনগণ তাদের দ্বীনের মধ্যে যে বিদয়াতই চালু করে আল্লাহ্ তা'য়ালা তাদের নিকট থেকে অনুরূপ একটি সুন্নাত তুলে নিয়ে যান। পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর তা ফিরিয়ে আনেন না।"

📘 তাগুত > 📄 শীয়া, খারেজী, মুর্জিয়া ও মুতাযিলা ফিরকা সমূহ

📄 শীয়া, খারেজী, মুর্জিয়া ও মুতাযিলা ফিরকা সমূহ


হিজরীর পয়ত্রিশ সনে ওসমান (রাঃ) এর শাহাদতের পর আলী (রাঃ) এর বায়আত সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে মুসলিম জাতির মধ্যে দলীয় কোন্দল ও ঘরোয়া বিবাদের সুত্রপাত হয়। ঐ সময় মুসলিম সমাজে দলীয় কোন্দলের ইন্ধন যোগানোর জন্য এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য যে দুষ্ট শ্রেণীর লোক ইসলামে অনুপ্রবেশ করে উহাদের অধিকাংশ অগ্নিপূজক ও ইয়ামানের ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের লোক ছিল। ইসলামে অনুপ্রবেশকারীগণ মুসলিম সম্প্রদায়ের আকীদা, সাহাবাগণ (রাঃ) সম্পর্কে এবং তাওহীদী আকিদায় গন্ডগোল সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মতামত যাহির করে এক কুহেলিকার সৃষ্টি করেছে। এরা কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। এক শ্রেণীর মতে- আলী (রাঃ) হচ্ছেন স্বয়ং খোদা (নাউযু বিল্লাহ)। এরা আলীর (রাঃ) আমলেই আত্ম প্রকাশ করে। আলী (রাঃ) এদের মুখচেনা পান্ডাগুলিকে ধরে আগুনে পুড়িয়ে মারেন। কিন্তু আবর্জনা শেষ হয়নি। এই দলের সদস্যরা যুগ যুগ ধরে এই ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কথা প্রচার করে আসছিল। সে সময় হিন্দুদেরকে বুঝানোর জন্য এরা বলেছিল যে, আলী হলেন বিষ্ণুর দশম অবতার। এরা আলীর নামে একখানা কিতাব রচনা করে নেয়। উহার নাম রাখা হয় মাহদী পুরান। উহাতে উমাচারী বুদ্ধমত এমন কতগুলি শ্লোক, মন্ত্র ও টীকা লিখানো হয় যা সাধারণের বোধগম্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দুদেরকে উহা গ্রহণে আগ্রহী করা। অপর দলের মতে আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের অংশীদার। আলীর নিকট এমন অনেক গোপন ইলম বা তথ্য ছিল যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল মাত্র তাকে দিয়ে গেছেন। এই সংবাদ প্রমাণ করার জন্য তারা নিম্নে তথ্য রচনা করেছে। "আমি ও আলী একই নূরে সৃজিত হয়েছি”। এই হাদিসটি জাফর ইবনে আহম্মদ ইবনে আলী নামক ব্যক্তির প্রস্তুতকৃত। হারুন (আঃ) মুসা (আঃ) এর যেমন নবুয়তের অংশীদার ছিলেন, এই হিসাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমস্ত গোপন কথা আলী (রাঃ) নিকট বা মাধ্যমে বলেছেন। তারা এই প্রসঙ্গে কুরআন চল্লিশ পারা বলে দাবী করে তন্মধ্যে দশ পারা আলীর (রাঃ) নিকট ওয়াহী হয় অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দিয়ে যান। এই সুবাদে তারা একটি হাদীস বানিয়েছে যা বহুল প্রচারিত। "আমি ইলমের শহর, আলী উহার দরজা। অতএব ইলমের ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রবেশপ্রার্থী যেন দরজায় এসে পৌঁছায়।” অর্থাৎ আলীর (রাঃ) মাধ্যমে উহা অর্জন করে। এবং উক্ত ইলম কেবলমাত্র আলীর (রাঃ) ভক্ত শীয়াদের নিকটই আছে। এই হাদীস সম্পর্কে হাদীসশাস্ত্রে পন্ডিতগণ মন্তব্য করেছেন। ইমাম বুখারী (রাঃ) বলেন: উহার কোনও সঠিক সূত্রই নেই। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেন: উহা প্রত্যাখ্যাত কথা।

শায়খুল ইসলাম ইমাম তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি শীয়া মতবাদের আবিস্কার করেছে, তার ধর্মীয় মনোভাবের ভিত্তি আদৌ ছিল না, বরং তার উদ্দেশ্য বড়ই অসৎ ছিল। বলা হয়, সে যিনদীক ও মোনাফেক ছিল, পরে ইসলাম স্বীকার করে তলে কুফরী মত প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল। এদের মাযহাবের ভিত্তি হল মিথ্যা কথার উপর। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম দিয়ে মিথ্যা কথা শরীয়তের বাণী বলে প্রচার করা এবং সহীহ হাদীস সমূহকে অস্বীকার করা। (মাজমু আতুল ফাতাওয়া এদোদশ খন্ড ৩১ পৃষ্ঠা।)

শীয়াদের বদনীতির মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক নীতি হল, ব্যক্তি বিশেষকে বাড়াতে বাড়াতে এতদূর পৌছানো যে, যেন তারা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে এজেন্ট বা মাধ্যম স্বরূপ। তাই এরা এদের বোযর্গ নামীয় শ্রেণীকে এমন সব উপাধিতে উল্লেখ করে যা কেবল অতিরঞ্জিতই নয়, বরং ইসলামী রীতির বর্হিভূত। এ পরিপেক্ষিতে শীয়ারা তাদের ধর্মীয় নেতাদেরকে বাবুল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহ আয়াতুল্লাহ ইত্যাদি খেতাবে ভূষিত করে অর্থাৎ আল্লাহর নিকট পৌছানোর জন্য এরাই সোপন স্বরূপ। আল্লাহ তা'আলাকে পাবার জন্য এদের দরজায় ধর্ণা দিতে হবে; পরিত্রাণ পাওয়া; হক না না হক পথের সবকিছুর এরাই মাধ্যম; এমনকি জগতের সবাই এদের মুখাপেক্ষী, তাই এদের কতিপয় লোককে গাউস উপাধী দেয় কাউকে কুতুব বলে থাকে। শীয়ারা মুসলিমদের আকীদা লন্ডভন্ড করার জন্য বিভিন্ন কথা জাল করেছে এবং হাদীসের নামে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছে যার ফলে সাধারণ লোক তো দূরের কথা, অনেক আলেমও ধোঁকা খাচ্ছে।

খারেজী
শীআ মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী মতবাদের অধিকারী দলটি ছিল খারেজী। এরা ইসলামে সর্বপ্রথম বিদআতী দল এদের বক্তব্যের মধ্যে ছিল। মু'মিন হবে নিখুত খাটি। যে ব্যক্তি ঐরূপ না হবে সে কাফির- চিরজাহান্নামী। তাদের মতে পাপ কুফরীর সমার্থক। সকল কবীরা গুণাহকারীকে এরা কাফের বলে আখ্যায়িত করে (যদি তারা তওবা করে গুণাহ থেকে প্রত্যাবর্তন না করে) উপরন্তু সাধারণ মুসলমানকেও এরা কাফের বলতো। কারণ, প্রথমত, তারা পাপমুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, পূর্বোক্ত সাহাবীদেরকে তারা কেবল মুমিনই স্বীকার করতো না, বরং নিজেদের নেতা বলেও গ্রহণ করতো।

খলীফাকে কুরাইশী বংশোদ্ভূত হতেই এ কথা তারা স্বীকার করতো না। তারা বলতো, কুরাইশী, অ-কুরাইশী-যাকেই মুসলমানরা নির্বাচিত করে, সে-ই বৈধ খলীফা।

কুরআনকে তারা ইসলামী আইনের মৌলিক উৎস হিসেবে মানতো। কিন্তু হাদীস এবং ইজমার ক্ষেত্রে তাদের মত সাধারণ মুসলমান থেকে স্বতন্ত্র ছিল।

এদের সবচেয়ে বড় দল আযারেকা নিজেদের ছাড়া অন্য সকল মুসলমানকে মুশরিক বলতো। এদের মতে নিজেদের ছাড়া আর কারো আযানে সাড়া দেয়া খারেজীদের জন্য জায়েজ নয়। অন্য কারো জবাই করা পশু তাদের জন্য হালাল নয়; কারো সাথে বৈবাহিক সম্পর্কও জায়েয নয়। খারেজী আর অ- খারেজী একে অন্যের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। এরা অন্য সব মুসলমানের বিরুদ্ধে জিহাদকে ফরযে আইন মনে করতো। তাদের স্ত্রী-পুত্র হত্যা করা এবং ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করাকে 'মোবাহ' মনে করতো। তাদের নিজেদের মধ্যকার যেসব লোক এ জিহাদে অংশ গ্রহণ করে না, তাদেরকেও কাফের মনে করতো। তারা তাদের বিরোধীদের ধন-সম্পদ আত্মসাত করাকে হালাল মনে করতো। মুসলমানদের প্রতি তাদের কঠোরতা এমন পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, মুসলমানদের তুলনায় তাদের কাছে অমুসলিমরা অধিক নিরাপত্তা লাভ করতো।

মুর্জিয়া
শিআ এবং খারেজীদের চরম পরস্পর-বিরোধী মতবাদের প্রতিক্রিয়া একটি তৃতীয় দলের আকারে প্রকাশ পেয়েছে। এ দলটিকে মুর্জিয়া বলে অভিহিত করা হয়।

এক: কেবল আল্লাহ এবং রাসূলের মা'রেফাতের নামই ঈমান। আমল ঈমানের মূলতত্ত্বের পর্যায়ভূক্ত নয়। তাই, ফরয পরিত্যাগ এবং কবিরা গুণাহ করা সত্ত্বেও একজন লোক মুসলমান থাকে।

দুই: নাজাত কেবল ঈমানের ওপর নির্ভরশীল। ঈমানের সাথে কোন পাপাচার মানুষের ক্ষতি করতে পারে না। কেবল শিরক থেকে বিরত থেকে তাওহীদ বিশ্বাসের ওপর মৃত্যু বরণই মানুষের নাজাতের জন্য যথেষ্ট।

কোন কোন মূর্জিয়া আরও একটু অগ্রসর হয়ে বলে যে, শিরক থেকে নিকৃষ্ট যতবড় পাপই করা হোক না কেন, অবশ্যই তা ক্ষমা করা হবে।

এসব চিন্তাধারা পাপাচার ফাসেকী ও অশালীন কার্যকলাপ এবং যুলুম নির্যাতনকে বিরাট উৎসাহ যুগিয়েছে। মানুষকে আল্লাহর ক্ষমার আশ্বাস দিয়ে পাপাচারে উৎসাহী করে তুলেছে। এ চিন্তাধারার কাছাকাছি আর একটি দৃষ্টিভঙ্গি এই ছিল যে, আমর বিল মারূফ এবং নাহী আনিল মুনকার-ভাল কাজের নির্দেশ এবং খারাপ কাজে নিষেধ-এর জন্য যদি অস্ত্র ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়-তা হলে এটা একটা ফেতনা। সরকার ছাড়া অন্যদের খারাপ কাজে বাধা দেয়া নিঃসন্দেহে জায়েয-কিন্তু সরকারের যুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খোলা জায়েয নয়। আলামা আবুবকর জাসসাস এ জন্য অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করে বলেন, এসব চিন্তা যালেমের হস্ত সুদৃঢ় করেছে। অন্যায় এবং ভ্রান্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিরোধ শক্তিকে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মুরজিয়া ও জাহমিয়া মতবাদ তারা একে অপরের সহায়ক ও পরিপূরক। মুরজিয়ারা 'আমলের দিক দিয়ে ইসলামকে পঙ্গু করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়ে প্রকাশ করল যে, নামায, যাকাত, রোযা ইত্যাদি ইসলামী আদেশ সংক্রান্ত আমল সমূহের সাথে ঈমানের কোনই সম্পর্ক নেই। ফলে নামায, যাকাত বা রোযা আদায় করলে ঈমানের কোনও উন্নতি সাধিত হয় না বা এসব পুন্য কর্মের দ্বারা ঈমান বাড়ে না। অনুরূপ ব্যভিচার, মদ্যপান, জুয়া, চুরি ইত্যাদি অন্যায় কাজ ঈমানের জন্য ঈমান কমে যায় না। অতএব আমল সমূহ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহকে স্বীকার করার পর কোন গোনাহই মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। মুরজিয়ারা এভাবে শরীয়াতের অনুশাসন বাতিল করে ঈমান কেবল মুখে মুখে উচ্চারণ ও মনে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট বলে প্রচার করল। অতএব যদি কেহ নামাযও পড়ে তার ফজিলত হবে ঈমানের সাথে সম্পর্কহীন পৃথক। অর্থাৎ নামায না পড়লে বা মদ্যপান করলে ঈমানের কোন ক্ষতি হবে না। এভাবে এরা ইসলামের বিধিনিষেধ পালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট শিথিলতা ও সুবিধার আমদানী করল। এদের পর জাহমিয়া গোত্ররা বলল: ঈমান মুখে উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না, অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করাই যথেষ্ট। অর্থাৎ কেবল তাসদীক বিল জিনানা-অন্তরে অন্তরে বিশ্বাস রাখা।

ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) তাদের আক্বীদা প্রসঙ্গে বলেছেন: তাদের বিশ্বাস কালেমা শাহাদাত একবার পাঠ করার পর যত প্রকার অন্যায় করুক ঐ অন্যায়ের শাস্তি ভোগের জন্য আদৌ জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে না।

মুতাযিলা
এ সংঘাত মুখর যুগে একটি চতুর্থ মতবাদও জন্ম নেয়। খারেজী এবং মুর্জিয়াদের মধ্যে কুফর এবং ঈমানের ব্যাপারে যে বিরোধ চলে আসছিল, সে ব্যাপারে এদের নিজস্ব ফায়সালা এই ছিল যে, পাপী মুসলমান মুমিনও নয়, কাফেরও নয়, বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে। এছাড়াও অনেক মু'তাযিলা ইসলামী আইনের উৎসের মধ্য থেকে হাদীস এবং ইজমাকে প্রায় বাতিলই করে।

শায়খুল ইসলাম বলেছেন, খাওয়ারেজ ও মুতাযেলী উভয়ের বক্তব্য হল- "আমি নিশ্চিতরূপে স্বীকার করছি যে, ধর্মীয় অনুশাসনগুলি সমস্তই ঈমানের অন্ত র্ভুক্ত। অতএব যখন ধর্মীয় অনুশাসনগুলি কিয়দংশ ছেড়ে দেয়া হল তখন ঈমানের কিছু অংশ চলে গেল। অতএব যখন কিছু অংশ নষ্ট হল তখন তার ঈমান সম্পূর্ণভাবে চলে গেল। যেহেতু ঈমান অংশযুক্ত বস্ত নয়; উহার কিছু অংশ পরিত্যাগ করলে অন্যান্য অংশগুলি পালন সত্ত্বেও সে মু'মিন থাকবে না, কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে; বিধায় তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বৈধ হবে" মু'তাযিলীদের মতে সে মু'মিনও নয়, কাফিরও নয়। এই মাসআলায় মু'তাযিলীদের সাথে খারেজীদের মতপার্থক্য হয়েছে।

মুতাযেলীগণ আবূ বকর (রাঃ), ওসমান (রাঃ) ও আলী (রাঃ) এই ৪ জন খলিফার খিলাফত স্বীকার করে থাকে। খারেজীগণ আবু বকর ও ওমরের (রাঃ) খিলাফত স্বীকার করে। ওসমান ও আলীর (রাঃ) খিলাফত স্বীকার করে না। রাফেযীগণ কেবল মাত্র আলী (রাঃ) ছাড়া প্রথম তিনজন খলীফার খেলাফত আদৌ স্বীকার করে না।

📘 তাগুত > 📄 প্রচলিত তাবলীগী জামায়াতের মূল সমস্যা সমূহ

📄 প্রচলিত তাবলীগী জামায়াতের মূল সমস্যা সমূহ


প্রচলিত তাবলীগ জামায়াতে (আখতার ইলিয়াছ প্রবর্তিত) যোগ দেয়া, চিল্লা দেয়া এবং এজতেমার ময়দানে প্রতিবছর তিন দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা এবং চিন্তা করা ও বলা হজ্জের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সমাবেশ ইত্যাদি সকল কাজসমূহ সুস্পষ্ট বিদয়াত

ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্তের একটি রাজ্য হরিয়ানায় ১৩০৩ হিজরীতে জন্ম প্রচলিত তাবলীগ জামাতের প্রবর্তক আখতার ইলিয়াসের। দাবী অনুযায়ী ১৩৪৪ হিজরীতে দ্বিতীয়বার হজ্বে গেলে, মদীনায় থাকাকালীন অবস্থায় ইলিয়াস (গায়েবী) নির্দেশ পায় যে, "আমি তোমার দ্বারা কাজ নেব।” ফলে ১৩৪৫ হিজরীতে দেশে ফিরে এসে মেওয়াতের একটি গ্রাম নওহে তাবলিগী কাজ শুরু করে।

এই তাবলীগের প্রচলিত ভিত্তি স্বপ্নের উপর প্রতিষ্ঠিতঃ মাওলানা ইলিয়াস বলেন "আজকাল স্বপ্নে আমার উপর সঠিক জ্ঞানের 'ইলকা' (প্রতিফলন) হচ্ছে। সেজন্য চেষ্টা করো যাতে আমার ঘুম বেশী হয়। তাই মাথায় তেল মালিশের ফলে ঘুমে বাড়তি হল। তিনি আরও বলেন এই তাবলিগের নিয়মও আমার নিকটে স্বপ্নে প্রকাশিত হয়।" (মালফুযাতে মাওলানা ইলিয়াস ৫১ পৃষ্ঠা, তাবলীগী জামায়াত আওর উসকা নিসাব ১৩ পৃষ্ঠা-উর্দু গ্রন্থ)

মালফুযাত ইলিয়াস নামক উর্দু গ্রন্থে ৫০ পৃষ্ঠায় লেখা মাওলানা ইলিয়াসের বক্তব্য "প্রচলিত তাবলীগ জামায়াতের নিয়ম পদ্ধতি আমি স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছি।” অর্থাৎ বুঝা গেল এটা কুরআন ও সুন্নাহ ও ইজমা কিয়াস সম্মত নয়। বরং মাওলানা ইলিয়াছের কথানুযায়ী প্রচলিত ছয় উছুলী তাবলীগ জামায়াতের মূল উৎস হচ্ছে তার স্বপ্ন। তার পরবর্তী লাইনের বক্তব্য-
كنتم خير امة اخرجت للناس تامرون بالمعروف وتنهون عن المنكر وتؤمنون بالله

তাফসীর খাব মে ইয়ে এলায হুইয়ি কেহ তুম মিছলে আম্বিয়া আলাইহে ওয়াসাল্লাকে লুও কে ওয়াস্তে জাহের কি পাইয়িহু। অর্থাৎ মোঃ ইলিয়াস বলেন, "কুনতুম খাইরা উম্মাতিন এ আয়াতের তাফসীর স্বপ্ন যোগে আমার উপর এরূপ এলকা (এলহাম) হয় যে, হে ইলিয়াস তুমি নবীদের মতই মানুষের জন্য প্রেরিত হয়েছ।” এখানে "মিছিলে আম্বিয়া” দ্বারা তিনি ইলিয়াস কিসের দাবী করেছেন? কারণ আরবীতে 'মিছল' শব্দটি সমকক্ষতা বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই মোঃ ইলিয়াস নবীদের সমকক্ষ হবার দাবী করছেন কি? (নাউযুবিলাহ)। এছাড়া উর্দু মালফুজাতের ১২৫ পৃঃ লেখা রয়েছে আমি (ইলিয়াস) উত্তরাধিকার সূত্রে নবুয়্যতের তোহফা প্রাপ্ত হয়েছি (নাউযুবিল্লাহ)।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার তরফ থেকে রাসূল (সাঃ) এর আনীত দ্বীন ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ বা ভিত্তি হচ্ছে (১) কালেমা (২) নামায (সালাত) (৩) রোযা (সাওম) (৪) হজ্জ এবং (৫) যাকাত। কিন্তু মাওলানা ইলিয়াস মেওয়াতীর দাবি যে স্বপ্নে ছয় উসুল পেয়েছেঃ (১) কালেমা (২) নামায (৩) একরামুল মুসলেমিন (৪) তাসহিহে নিয়ত (৫) এলেম ও যিকির এবং (৬) তাবলীগ।

অথচ যে কোন মুসলিম রাসূল (সাঃ) আনীত পাঁচ উসুলের যে কোন একটি অস্বীকার করলে বা দ্বীন কায়েমের সুবিধার জন্য নতুন কোন উসুল সংযোগ করলে ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যায়। সূরা মায়েদা তিন নম্বর আয়াত অনুযায়ী দ্বীন পরিপূর্ণ এবং যে কেউ এ দ্বীনের মূল ভিত্তি পরিবর্তন আনার চেষ্টা অধিকার রাখে না। অথচ ইলিয়াস মেওয়াতী ইসলামের তিন স্তম্ভ বাদ দিয়ে নতুন চার স্তম্ভ সংযোজন করে মারাত্মক ফেৎনা সৃষ্টি করেছেন যা আমাদের প্রত্যেক মুসলিমদের চিন্তার বিষয়।]

শরীয়াতে স্বপ্নের যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে, তা নিােক্ত হাদীস থেকেই প্রমাণিত। এ পর্যায়ে দুটো হাদীস উল্লেখ করতে পারে - একটি হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, নবুয়‍্যাতের কোন কিছুই বাকী নেই সবই শেষ হয়ে গেছে, এখন আছে শুধু 'সুসংবাদ-দাতাসমূহ। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ সুসংবাদ- দাতাসমূহ বলতে কি বোঝায়? নবী করীম (সাঃ) বললেনঃ তা হল ভাল স্বপ্ন। দ্বিতীয় হাদীস হল হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেনঃ ভাল স্বপ্ন নবুয়‍্যাতের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। প্রথম হাদীস থেকে শুধু এতটুকু জানা যায় যে, ভাল স্বপ্ন বান্দার জন্যে সুসংবাদ লাভের একটি মাধ্যম মাত্র। আর দ্বিতীয় হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবুয়‍্যাতের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ মর্যাদার অধিকারী হল এই 'শুভ স্বপ্ন'। তা হলে বাকি পয়তাল্লিশ ভাগ কি? তা হল রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আলাহর তরফ থেকে নবুয়‍্যাতের মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞান কুরআন ও সুন্নাহ। অতএব এই কুরআন ও সুন্নাহই হল দ্বীনের আসল ও মূল ভিত্তি। তা-ই বাস্তব জিনিস, তার মুকাবিলায় স্বপ্নকে পেশ করা কল্পনা বিলাসী লোকদেরই কাজ। যারা বাস্তব জীবনের ব্যাপারগুলোকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইচ্ছুক, তাদের কর্তব্য হল স্বপ্নের পেছনে না ছুটে কুরআন ও সুন্নাহকে ভিত্তি করে অগ্রসর হওয়া। যারা কুরআন হাদীসের বাস্তব বিধানকে ভিত্তি করে কাজ করে না, তা থেকে গ্রহণ করে না জীবন পথের নির্দেশ ও ফয়সালা; বরং যারা স্বপ্নের ভিত্তিতেই দ্বীন ও দুনিয়ার ফয়সালা গ্রহণ করে, তারা আসলেই ঈমানদার নয়, ঈমানদার নয় আল্লাহর কুরআন এবং রাসূলের সুন্নাতের প্রতি। অতএব তারা বিদয়াত পন্থী, বিদয়াতী লোক।

প্রচলিত (আখতার ইলিয়াছ প্রবর্তিত) তাবলীগী নেসাব পরিচিতি
আখতার ইলিয়াছ প্রবর্তিত তাবলীগ জামাতের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের আকৃষ্ট করার জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশের শাহারানপুর জেলার কান্ধেলাহ নিবাসী মাওলানা যাকারিয়‍্যা নয়খানা বই লেখেন উর্দু ভাষায়। ১। হেকায়েতে সাহাব ২। ফাযায়েলে নামায ৩। ফাযায়েলে তাবলীগ। ৪। ফাযায়েলে যিকর ৫। ফাযায়েলে কুরআন। ৬। ফাযায়েলে রমাযান। ৭। ফাযায়েলে দরূদ। ৮। ফাযায়েলে হাজ্জ ৯। ফাযায়েলে সাদাকাত। এর মধ্যে এক থেকে সাত নম্বর বইগুলোর একত্রে কয়েক বছর আগে নাম ছিল তাবলীগী নেসাব ১ম খন্ড এবং আট ও নয় নম্বর একত্রে নাম ছিল তাবলীগী নেসাব ২য় খন্ড। পরে "মুসলমা ঝুঁকী পাস্তী কা ওয়া-হিদ ইলজ নামক বইটি সংযোজন করে তাবলীগী নেসাবের নাম পাল্টে যায়। ফাযায়েলে আমাল নামে তা ছাপা হয়েছে। এই তাবলীগ জামাতের বযুর্গরা তাদের অনুসারীদের আল্লাহর কুরআনের অনুবাদ ও তাফসীর এবং আল্লাহর রাসূলের হাদীসের অনুবাদ পড়ার বদলে তারা তাবলীগী নেসাব তথা ফাযায়েলে আমাল পড়তে উৎসাহিত করে।

এই বইগুলো তিনভাবে বিভক্ত ১। সামান্য অংশ কুরআনের আয়াত সম্বলিত ২। কিছু অংশ হাদীস সন্নিবিষ্ট ৩। বেশী অংশ বোযর্গদের কাহিনীতে পরিপুষ্ট। প্রথমভাগে ফাযায়ালে কিতাবে সমবেত কুরআনের আয়াত সমূহের অনেকগুলিতেই ইচ্ছাকৃত তরজমা বিকৃত করা হয়েছে। যেমন - ولقد يسرنا القرآن للذكر فهل من مد كر এর অনুবাদে মাওলানা যাকারিয়া উর্দুতে (যা একই বাংলা তরযমাতুে) লিখেছে যার অর্থ দাড়ায় "আমি কালামে পাককে মুখস্ত করার জন্য সহজ করে দিয়েছি। কেউ আছে কি মুখস্তকারী"। (ফাযায়েলে আমালের ফাযায়েলে কুরআন ৫৫ পৃষ্ঠা দারুল কিতাব পৃষ্ঠা-৮৯) উক্ত আয়াতের দু'টি শব্দ 'যিকর' এবং 'মুদ্দাকির'-এর অর্থ মাওলানা যাকারিয়‍্যা করেছেন মুখস্থ করা এবং মুখস্থকারী। কিন্তু আল কুরআনের বিশ্ববিখ্যাত এবং সর্বজনমান্য তাফসীর ইবনে কাসীর এবং তাফসীর ইবনে জারীরে ওর অর্থ করা হয়েছে উপদেশ গ্রহণ এবং উপদেশ গ্রহণকারী। সূরা কামারের এই আয়াতটি একই সূরাতে চারবার উল্লেখিত হয়েছে। আর তা চারটি কাওম নূহ ও আদ এবং সামুদ ও লুত এর জাতি সমূহের দুষ্কৃতি ও তাদের চরম শাস্তির লোমহর্ষক পরিণতি বর্ণনার পর উক্ত আয়াতটি বারংবার উল্লেখ করে কোরআনের পাঠককে ঐ সব জাতির পরিণাম জেনে শিক্ষা নেবার জন্য আল্লাহ্ বলেছেন আমি উপদেশ গ্রহণের জন্য এই কুরআনকে সহজ করেছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? উক্ত আয়াতগুলোর আগে পিছের বক্তব্য সামনে রেখে ওর তরজমা 'মুখস্থ করা' ও 'মুখস্তকারী ঠিক হয় কি? অতএব এইরূপ অনুবাদক কুরআনের আয়াতের অর্থ বিকৃতকারীর পর্যায়ে পড়ে যায় না কি?

ফাজায়েলে আমলের দ্বিতীয় অংশ হাদীসে রাসূল (সাঃ)-বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ থেকে কিছু হাদীস ব্যবহার করেছে ঠিকই কিন্তু এর সাথে সাথে সব অংশেই বেশীরভাগ যয়ীফ ও মওযু হাদীস সুত্র ছাড়া বর্ণনা করেছে। এগুলির বেশীর ভাগই জাল অর্থাৎ রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা আর অবশিষ্ট হাদীসগুলি যয়ীফ এগুলি নবীজীর হাদীস কি না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অথচ রাসূল (সাঃ) বলেন তোমরা আমার তরফ থেকে একটি কথা হলেও তা প্রচার কর। আর যে ব্যক্তি (জাল হাদীস প্রভৃতির মাধ্যমে) আমার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলে সে তার ঠিকানা জাহান্নামে করে নিক। (বুখারী)

ফাযায়েলে আমলের তৃতীয় অংশ বোযর্গদের (মুরব্বী) আজগুবি, উদ্ভট, কেচ্ছাকাহিনীতে ভরপুর। নুযহাতুল মাজালিশ, রওযুল ফায়িক, মাজালিসুল আবরার, গুলশানে জান্নাত, সামিরাতে ইউসুফ যুলেখা, প্রভৃতি গ্রন্থগুলি থেকে আজগুবি সব কেচ্ছাকাহিনী সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এ সকল বই ভ্রান্ত আকীদা সূফী চরিত্রের লেখকদের দ্বারা লিখিত। এ বইগুলিতে ভক্তির অতিমাত্রায় আজগুবি উদ্ভট তথ্য লেখা আছে। যার বেশিরভাগই অবাস্তব এবং কল্পনার অতীত এবং শিরকী বিষয়ও বহু আছে। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কখনও এসব অতিভক্তি দ্বারা লিখিত কল্পনা কাহিনীগুলিতে বিশ্বাস করতে পারে না। তাই এ বইয়ের বেশীরভাগ কাহিনী অনাস্থাযোগ্য এবং অবিশ্বাস্য। সেই সঙ্গে সঠিক আকিদার বিরোধী।

একবার ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন, মানুষকে ইসলামের পথে আহবান জানানোর জন্য কুরআন ও সুন্নাহতে দলিল কম রয়েছে কি। কুরআনে পাকে আমপারার সূরা সমূহতে পরকালের জীবন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য যে কোন পথে চলার ভয়ানক পরিণতির অর্থাৎ জাহান্নামের যে সুবিস্তর বর্ণনা রয়েছে তা একজন মানুষকে ভ্রান্ত আকিদার কাজ থেকে ফিরে পরিপূর্ণরূপে ইসলামে দাখিলের দাওয়াত দেয়ার জন্য কি যথেষ্ঠ নয়। এছাড়াও মুহাম্মদ (সাঃ) এর সুন্নাহ থেকে এ সংক্রান্ত অসংখ্য বিস্তারিত বর্ণর্ণার দলিল আজ আমাদের সামনে উপস্থিত সহীহ হাদীস আকারে। তাছাড়াও রাসূল (সাঃ) এর অসংখ্য সাহাবী যাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা রাদিয়াল্লাহু আনহু (বা আল্লাহ তাদের উপর রাজি আছেন) বলেছেন, উনাদের জীবনের হাজার হাজার শিক্ষণীয় ঘটনা যা কিনা দলিল আকারে আমাদের সামনে উপস্থিত, তা কি যথেষ্ঠ নয়। কেন আশ্রয় নিতে হবে বযুর্গদের আজগুবি কিচ্ছা কাহিনীতে যা কিনা সত্য না মিথ্যা তা প্রমাণের জন্য আমাদের হাতে কোন দলিল নেই।

একজন সত্যিকার মুসলিম জানে-আলেম যা বলল তা দলিল না, আলেম বা বযুর্গ যা বলল তা প্রমাণ করার জন্য কোরআন ও সুন্নাহর দলিল দরকার। তাই বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, তিনি আমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছেন; একটি কিতাব আলাহ (আল কুরআন) ও সুন্নাতে রাসূল (সহীহ হাদীস সমূহ)। আমাদের মাঝে কিয়ামত পর্যন্ত যে কেউ এ দুটিকে আকড়ে থাকবে ইনশাল্লাহ পথভ্রষ্ট হবে না।

কল্প কাহিনীর কয়েকটি উদাহরণ উর্দু মূল বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর সহ দেয়া হল :
ফাযায়েলে আমল বইয়ের ভূমিকায় মাওলানা যাকারিয়া লিখেছেন যে- হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াছ আমাকে তাবলীগে দ্বীনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আয়াত ও হাদীস লিখিয়া পেশ করিতে আদেশ করেন। এই বুযুর্গগণের সন্তুষ্টি হাসিল করা আমার মত গোনাহগারের জন্য গোনাহ মাফি ও নাজাতের ওসীলা এই আশায় দ্রুত রচনা করতঃ এই উপকারী কিতাবখানী খেদমতে পেশ করিতেছি। (ভূমিকাটি লক্ষ্য করেছেন কি)

১। ফাযায়েলে নামাযে একজন সাইয়েদ সাহেবের কিসসা লেখা আছে যে, তিনি বার বছর পর্যন্ত একই অযুতে সমস্ত নামায পড়েছেন এবং পনের বছর তাঁর শোবার সুযোগই ঘটেনি। কয়েক দিন এমনও কাটতো যে, কোন জিনিস চাখারও সুযোগ তাঁর হোত না (ফাযায়েলে আ'মালের ফাযা-য়েলে নামায ৭২পৃঃ অনুবাদ ৭৯ পৃষ্ঠা)।
মাওলানা যাকারিয়‍্যা উক্ত ঘটনাটি বিনা বরাতে লিখেছেন। এটা তাঁর তৈরী করা কিসসা কিনা আল্লাহ জানেন। কোন যোগী, সন্ন্যাসী ও সুফীর পক্ষেও এটা সম্ভব কি যে, তিনি ফজর থেকে এশা পর্যন্ত বার বছর পেশাব-পায়খানা করেননি? আর পনের বছর মোটেই ঘুমাননি? সেই সঙ্গে তিনি অনাহারেও থেকেছেন?

২। তাবলীগী নেসাব ও পরোক্ষ শির্কের প্রাদুর্ভাব : ফাযায়েলে দরূদ শরীফের ছেচল্লিশ নম্বর কাহিনীতে লেখা আছেঃ হযরত সুফিয়‍্যান সওরী একটি যুবককে দেখেন যে, সে যখনই একটি পা তুলছিল কিংবা রাখছিল তখনই সে পড়ছিল; আল হুম্মা সলি-আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মদ। সওরী সাহেব যুবকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার এই দরূদ কি জিনিস? ছেলেটি বললো, আমি আমার মায়ের সাথে হজ্জে গিয়েছিলাম। তিনি সেখানে মারা যান। তাঁর মুখ কালো হয়ে যায় এবং তাঁর পেট ফুলে যায়। যার ফলে আমি অনুমান করলাম যে, কোন বড় গোনাহ হয়েছে। তাই আমি আল্লাহ জাল্লা শা-নুহুর কাছে দুআর জন্য হাত তুললাম। ফলে দেখলাম যে, তাহামাহ (হিজায) থেকে একখন্ড মেঘ এল। তা থেকে একজন লোক বের হল। তিনি তাঁর মুবারক হাতটি আমার মায়ের মুখে ফেরালেন। যার কারণে তা উজ্জ্বল হয়ে গেল। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কে? যিনি আমার এবং আমার মায়ের বিপদ দূর করলেন? তিনি বললেন, আমি তোর নবী মুহাম্মদ (সাঃ)। আমি বললাম, আমাকে কোন অসিয়্যত করুন। তখন হুযুর (সাঃ) বললেন, যখনই তুমি কোন পদক্ষেপ রাখবে কিংবা তুলবে তখনই পড়বেঃ আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আ-লা আলি মুহাম্মদ (ফাযায়েলে আমালের দরূদ ১০৯ পৃষ্ঠাও তাবলীগী নেসাবের ফাযায়েলে দরূদ ১২০-১২১ পৃষ্ঠা।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইন্তেকালের পর তাঁর পক্ষে কারো বিপদের গায়েবী খবর জানার ধারণা পোষণ করা শিরক। তাঁর ইন্তেকালের পর মেঘের মধ্যে তাঁর উড়ে এসে কারো বিপদ উদ্ধার করার ধারণাও শিরক।

৩। হেকায়াতে সাহাবাতে লেখা হয়েছেঃ- রাসূল (সাঃ) একবার শিঙ্গী লাগান এবং যে রক্ত বের হয়, তা তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরকে দেন যে এটাকে কোথাও পুঁতে দাও। তিনি গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন যে, তা পুঁতে দিয়েছি। হুযুর শুধালেন, কোথায়? বললেন, আমি পান কোরে নিয়েছি। হুযুর বললেন, যার শরীরে আমার রক্ত যাবে তাকে জাহান্নামের আগুন ছুঁতেই পারবে না। কিন্তু লোকদের দ্বারা তোমার ধবংস রয়েছে এবং তোমার দ্বারা লোকদেরও (ফাযায়েলে আমালের হেকায়াতে সাহাবাহ ১৭২ পৃষ্ঠা এবং তাবলীগী নেসাবের হেকায়াতে সাহাবাহ ১৭৯ পৃষ্ঠা, বাংলা অনুবাদ ২১৪-২১৫পৃষ্ঠা)।

রক্ত সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন, "তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য হারাম করেছেন মৃত জন্তু ও রক্ত এবং শুকরের মাংসকে" (নাহল ৪ ১১৫)। এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় রাসূল (সাঃ) কখনও এমন কিছু হালাল করেননি যা আল্লাহ্ হারাম করেছেন।

৪। ফাযায়েলে সাদাকাত ও আজগুবি কেচ্ছার সংঘাত : ফাযায়েলে সাদকাতে আছে, শায়খ আবু ইয়াকুব সানুসী বলেন, আমার কাছে এক মুরীদ এল এবং বলতে লাগলো যে, আমি কাল যোহরের সময় মরে যাব। তাই দ্বিতীয় যোহরের সময় সে মসজিদুল হারামে এল, তাওয়াফ করলো এবং কিছুদূর গিয়ে মরে গেল। আমি তাকে গোসল দিলাম। এবং দাফনও করলাম। যখন আমি তাকে কবরে রাখলাম, তখন সে চোখ মেলে দিলো। আমি বললাম যে, মরার পরও জীবন আছে নাকি? সে বললো আমি জ্যান্ত রয়েছি। আর আল্লাহর প্রত্যেক প্রেমিকই জ্যান্ত থাকে। (ফাযা-য়েলে সাদাকাত ২য় খন্ড, ৪৭৬ পৃষ্ঠা) উক্ত ঘটনাবলীর মত বহু অবান্তর ও আজগুবি কেচ্ছাকাহিনী রয়েছে মাওলানা যাকারিয়‍্যা রচিত ফাযা-য়েলে আ'আমালের বিভিন্ন ফাযা-য়েল গ্রন্থে।

৫। রাসূলুল্লাহর মাজার থেকে গায়েবী আওয়াজ: মাওলানা যাকারিয়্যা লিখেছেন, হযরত আলী বলেন যে, জানাযা তৈরী করার পর সবচেয়ে আগে আমিই সামনে বাড়লাম। এবং আমি গিয়ে আরজ করলাম হে আল্লাহর রাসূল! এই আবূ বাকর, এখানে দাফন হবার জন্য অনুমতি চাচ্ছেন।' তখন আমি দেখলাম, একদমে হুজরার দরজা খুলে গেল এবং একটি আওয়াজ এলো-'বন্ধুকে বন্ধুর কাছে পৌঁছে দাও।' (ফাযায়েলে সাদাকাত, ৯৫০ পৃষ্ঠা) ঐ আওয়াজ কি রাসূলুললাহর, না কার?

কিছু আকীদা সংক্রান্ত বিষয়ঃ
১. 'আরাওয়াহে-সালা' গ্রন্থের রচয়িতা লিখেছেন, শাহ আবদুর রহীম ভেলায়‍্যাতী সাহেবের এক মুরীদ ছিল। যার নাম ছিল আবদুল্লাহ খান। সে রাজপুত কওমের লোক ছিল। ইনি হযরতের খাস মুরীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার অবস্থা ছিল এই যে, কারো ঘরে যদি (স্ত্রী) গর্ভবতী হতো এবং তাবিজ নেবার জন্য সে আসতো তাহলে তিনি বলে দিতেন যে, তোমার ঘরে ছেলে হবে কিংবা মেয়ে। আর তিনি যা বলে দিতেন তা-ই-হতো। (আরওয়াহে সালা-সাহ্, ১৮৫ পৃষ্ঠার বরাতে ব্রেলভী-দেওবন্দী, ১৯ পৃষ্ঠা)

২. আমার দাদা মাওলানা ইসমাঈল সাহেবের ইন্তেকাল হলে নিযামুদ্দীন থেকে দিল্লী পর্যন্ত সাড়ে তিন মাইল ভিড় লেগে যায়। একজন 'সাহেবে কাশফ' (অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন) বুজর্গ দেখছেন যে, মাওলানা ইসমাঈল সাহেব বলেছেন আমাকে তাড়াতাড়ি বিদায় কর। আমি অতি লজ্জিত। কারণ হুযুর (সাঃ) তাঁর সাহাবাদের সাথে আমার অপেক্ষায় রয়েছে।' (মাওলানা ইলয়্যাস আওর উন কা দ্বীনি দাওয়াত, ৪৭ ও ৪৮ পৃষ্ঠার ভাবার্থ)

উক্ত দুটি বিষয়ে বিশ্বাস করলে ঈমান ঠিক থাকবে কি?

প্রচলিত তাবলীগ জামাতের (আখতার ইলিয়াছ প্রবর্তিত) কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে মূল সমস্যা সমূহ
প্রথম সমস্যা : ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির বা স্তম্ভের তিনটিকে (দ্বীন কায়েমের সুবিধার কথা চিন্তা করে) পরিবর্তন করে অতিরিক্ত চারটি স্তম্ভ যুক্ত করে দ্বীনের মধ্যে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। যা কি না সম্পূর্ণ নাজায়েয ও সুস্পষ্ট বিদয়াত। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক ভাষনে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেনঃ জেনে রাখ সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। আর সর্বোত্তম কর্মবিধান হচ্ছে মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপস্থাপিত জীবন-পন্থা। পক্ষান্তরে নিকৃষ্টতম জিনিস হচ্ছে নবোদ্ভাবিত মতাদর্শ আর প্রত্যেক নবোদ্ভাবিত মতাদর্শই সুস্পষ্ট গোমরাহী। (মুসলিম) যে লোক এমন আমল করল, যার অনুকূলে ও সমর্থনে আমার উপস্থাপিত শরীয়াত নয় (অর্থাৎ যা শরীয়াত মুতাবিক নয়) সে আমল অবশ্য প্রত্যাখ্যান যোগ্য। (মুসলিম)

দ্বিতীয় সমস্যা ৪ যে অঞ্চলে বা স্থানে শুধুমাত্র আল্লাহর দেয়া শরীয়াহ মুতাবেক দেশ ও জাতি পরিচালিত হয়-তাকে দারুল ইসলাম বা ইসলামী রাষ্ট্র বলে। তাবলীগ জামাতের গত ৭০ বৎসরের কর্মসূচীতে কোনদিনও দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিার কোন কর্মসূচী নেই। তাই হিজরত নেই, জিহাদ নেই, আছে শুধু দুনিয়া বিরাগী সন্ন্যাসী বানানোর কর্মসূচী। তাই মুসলিম নামধারী ইসলাম বিরোধী বাতিল অপশক্তি যারা আল্লাহর দেয়া বিধানকে পিছে নিক্ষেপ করে মানুষের তৈরী করা আইন দিয়ে দেশ রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত করে তারা আখতার ইলিয়াছ প্রবর্তিত প্রচলিত তাবলীগ জামায়াতকে খুবই পছন্দ করে এবং নিজেরাও তাবলীগে মাঝে মাঝে তিন দিন সময় লাগায় কিংবা চিলায় যায়। কারন ঐ সমস্ত লোক হিন্দু খ্রীষ্টানদের মত যে বাতিল আকিদায় বিশ্বাসী [অথাৎ দ্বীনদারি অংশের মহাপ্রভু আল্লাহ আর দুনিয়াদারী অংশের মহাপ্রভু মানুষের তৈরিকৃত আইন। তার বিরুদ্ধে তাবলীগ জামায়ত একটা টু শব্দও করে না। অথচ ইসলাম দ্বীন পরিপূর্ণ। এ দ্বীনের কিছু অংশের উপর আমল করা আর কিছু অংশ বাদ দেয়ার পরিণতি সম্পর্কে কালামে পাকে এরশাদ হচ্ছেঃ "তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর?” তোমাদের যারাই এরকম করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা এবং কিয়ামতের দিন তারা কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। (বাকারা ৪৮৫)

অথচ প্রচলিত এই তাবলীগ জামাত মানুষকে কুরআন ও সুন্নাহর দলিল বিহীন মনগড়া ভ্রান্ত আমলের দিকে শুধু ডাকছে। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা, ইসলামী অর্থনীতি, ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা, ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা, ইসলামী বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি মুয়ামালাত সম্পর্কিত আল্লাহর ফরজ করা ইবাদত সমূহের বিষয়ে তারা শুধু নীরবই নয় বরং তাদের বক্তব্য দ্বীন পবিত্র বস্তু পক্ষান্তরে রাজনীতি হল নোংরা বিষয়; তাই দ্বীনকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে।

এ ধরনের চিন্তা, কথা ও কাজ সম্পূর্ণ নাজায়েয। হিন্দু, খৃষ্টান আর বৌদ্ধদের আকীদা হল তারা ভগবান, গডকে মন্দিরে আর গীর্জায় আটকে রাখে এবং বিশেষ বিশেষ দিনে ও সময়ে তাদের কাছে হাজির হয়ে ইবাদতের দায় দায়িত্ব সম্পন্ন করে। আর জীবনের বাদ বাকি অংশ মানুষের তৈরী করা আইনের অধীনে ছেড়ে দেয়। এ রকম বিশ্বাস, কথাও কাজ আল্লাহর 'তাওহীদ আল হাকিমিয়ার' সাথে সুস্পষ্ট শিরক। এই পুস্তকের আলোচনা থেকে আশা করি আপনাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে আমাদের জীবনের দ্বীনদারী এবং দুনিয়াদারি উভয় ক্ষেত্রেরই মহাপ্রভু হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা। অতএব উনার কিছু আয়াতের উপর আমল করব আর বাদ বাকি হুকুমগুলিকে পাশ কাটিয়ে চলে যাব এবং লোকজনকে সেগুলো থেকে বিরত রাখব এ কাজগুলি নিশ্চিত মুনাফিকী কাজ এবং এর পরিণতি জাহান্নামের সর্বনি স্তর। আল্লাহ তা'য়ালা হুকুম করেছেন
"হে মু'মিনগণ! তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করিও না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" (বাকারা ২০৮)

ইহুদী, খৃষ্টান আর মুশরিকরা তো চায়ই আমরা শুধুমাত্র খাস কিছু ইবাদতে মশগুল থাকি যা কিনা শুধু মসজিদ কেন্দ্রিক ও গাট্টি বোঝা নিয়ে মসজিদে পড়ে থাকি আর ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম, জিহাদ, হিজরতের মত ইবাদতসমূহ ত্যাগ করি। তাহলেই দুনিয়ায় রাজত্ব চলবে তাদের (ইহুদী মুশরেক ও তাদের তাবেদার তাগুতদের)। অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইব্রাহীম (আঃ) কে নমরুদ নামক জালেম শাসকের কাছে, মুসা (আঃ) কে ফেরাউনের দরবারে এবং মুহাম্মদ (সাঃ)কে আবু জেহেল, আবু লাহাব নটী জালেম সমাজপতিদের নিকট সরাসরি তাওহীদের (আল্লাহর একত্ববাদের) দাওয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। এরশাদ হচ্ছেঃ
"তিনি প্রেরণ করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন সহকারে, যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন, যদিও মুশরিকরা অসহ্যকর (অপ্রীতিকর) মনে করে।" (সূরা আত-তাওবা: ৩৩)

রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) যতদিন নিজে চুপচাপ ইবাদত করেছিলেন ততদিন কুরাইশ কাফেররা উনার বিরোধিতা করেনি। কিন্তু যখনই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার হুকুমে মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর একত্ববাদকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করার আহবান জানিয়েছিলেন আর তখনি মুহাম্মদ (সাঃ) এবং উনার সঙ্গীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এ ছিল তাওহীদের দাওয়াত যা কুরআনের ভাষায় মুশরিক কাফেররা কখনই পছন্দ করবে না। পরবর্তী বইটিতে (তাগুত ২য় খণ্ড) তাওহীদের বিস্তারিত আলোচনা থেকে ইনশাআল্লাহ আপনাদের কাছে পরিষ্কার হবে যে প্রচলিত এই তাবলীগ জামাত মানুষকে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক তাওহীদের দিকে আহবান করছে কি? ইসলামে প্রবেশের প্রথম শর্ত তাওহীদের কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। লা করতে হবে ইলাহ দাবীদারদের সাথে, আল্লাহর উপর ঈমান আনার আগে (ইল্লাল্লাহ)। এই ইলাহা দাবীদার তাগুত কারা তা তাদের কাছে কি সুস্পষ্ট? তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন তাগুত কি, কে তাগুত এবং কিভাবে তাগুতের সাথে কুফরী বা 'লা' করতে হবে। দেখবেন তাদের অধিকাংশ লোকই উত্তরে কি বলছে। অথচ কুরআনে পাকে আল্লাহ তা'য়ালা সূরা আল-বাকারাহ ২৫৬ আয়াতে শর্ত দিয়ে দিয়েছেন যে, তাগুতকে অস্বীকার করা ছাড়া কেউ মুসলিম হতে পারবে না। যে তাগুতের পরিচয় জানে না সে কিভাবে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং নিশ্চিত সে নানা প্রকার শিরকের মধ্যে পতিত রয়েছে। আর শিরককারী যত আমলই করুক না কেন তার সকল আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে। কারণ কুরআনে পাকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে জানিয়ে দিয়েছেনঃ
"আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এ অহী নাযিল হয়েছে যে, যদি আপনি আল্লাহ্র সাথে শরীক সাব্যস্ত করেন, তাহলে আপনার সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আর আপনি ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের অন্ত র্ভুক্ত হয়ে যাবেন।” (আয-ঝুমারঃ৬৫)

অতএব মানুষকে তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না দিয়ে বেশি বেশি (দলিল ছাড়া) আমল করানো অরণ্যের রোদন ছাড়া কিছুই নয়।

তৃতীয় সমস্যা ৪ ইসলামে বাতিলের বিরুদ্ধে জিহাদ আল্লাহর তরফ থেকে একটি ফরজ হুকুমঃ
"তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দ্বীন একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়।” (সূরা বাকারা: ১৯৩)
"তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়ত কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয় তো বা কোন একটা বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহ্ জানেন, তোমরা জাননা।" (সূরা বাকারা: ২১৬)

যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা জিহাদকে ফরয (অবস্থা পরিপ্রেক্ষিতে ফরযে আইন ও ফরযে কেফায়া) করে দিলেন মুসলিমীনদের জন্য এবং জানিয়ে দিলেন জিহাদের কল্যাণের বিষয়ে অথচ তাবলিগ জামাত সর্ববস্থায় জিহাদকে অপছন্দ করে এবং জিহাদকে কিভাবে পাশ কাটানো যায় তার জন্য ভ্রান্ত যুক্তি দাড়া করিয়েছে। এটা কি মুনাফিকের নমুনা নয় কি? জিহাদের বিষয়ে তাদের বক্তব্য "বাতি জালালে অন্ধকার আপনিই দূর হয়, অন্ধকারকে পিটিয়ে দূর করার দরকার নেই।" জিহাদের বিরুদ্ধে তাদের এ যুক্তি তাদের ফাযায়েলে আমলের কিছু ঘটনা থেকে বের হয়ে আসে। তাদের এ বক্তব্য দ্বারা মনে হচ্ছে খোদ রাসূল (সাঃ) যেন বুঝতেই পারেননি যে, দাওয়াত দিয়েই ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হয়ে যেত। অযথা উনি নিজে ২৭টি জিহাদে অংশ গ্রহণ করে বোধ হয় মস্ত বড় ভুলই করে ফেলেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তাই আজ দুনিয়াতে যখন ইহুদী, খ্রীষ্টান আর হিন্দু চক্র মিলে মুসলিম নিধন অভিযান চালিয়েছে সর্বত্র; নির্বিচারে হত্যা করছে মুসলিম নারী, শিশু এবং পুরুষদেরকে। লুণ্ঠিত হচ্ছে মা বোনদের ইজ্জত, জোরদখল করা হচ্ছে মুসলিমদের ভূমি, কোথাও আল্লাহর আইন (শরীয়াহ) কায়েম করার চেষ্টা করা হলে আক্রমণ করা হচ্ছে এক যোগে। এমতাবস্থায় প্রচলিত এই তাবলীগ জামাতের আলেম নেতারা এ বিষয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করেন না। নিজেরা যেমন চোখ বন্ধ করে রাখেন তেমনি তাদের অনুসারীদেরকে এ ব্যাপার থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখতে বলেন। এ থেকে কি এটা প্রমাণিত হয় না এটা ইহুদী চক্রান্ত? মুসলমানদের কাপুরুষ ও জিন্দালাশ বানানোর প্রচেষ্টা। শুধু তাই নয়, জিহাদ ও হিজরতের শরয়ী অর্থ বিকৃত করে গাট্টি বোঝা নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার নাম দিয়েছে নফসের সাথে জিহাদ (যাকে তারা বলে জিহাদে আকবর) আর মসজিদে মসজিদে ঘুরাফিরা করাকে নাম দিয়েছে হিজরত। এটা আখতার ইলিয়াছী তাবলিগ জামাতের মুরুব্বীদের মনগড়া জিহাদ ও হিজরতের ব্যাখ্যা।

কুরআন সুন্নাহর দলিল বিহীন তাবলীগ জামাআতের লেখনি চালনায় প্রধান মুবালিগ মাওলানা যাকারিয়া রচিত ফাযা-য়েলে আ'মাল প্রমাণ করে যে, তাঁদের নিকটে বিভিন্ন আমলের ফযীলত জিহাদের চেয়েও বেশী!

ক। তাউস বলেন, বাইতুল্লাহকে দেখা অতি উত্তম সেই ব্যক্তির ইবাদতের চেয়েও যে ব্যক্তি রোযাদার, রাত জাগরণকারী এবং আল্লাহর রাহে জিহাদকারী হয় (ফাযায়েলে হাজ্জ ৭৭ পৃষ্ঠা)। এই বর্ণনা সাক্ষ্য দেয় যে, কাবা শরীফকে নিছক দেখাটাই জিহাদের চেয়ে বেশি ফযীলাতময়। কুরআন ও হাদীস থেকে এ দাবীর প্রমাণে কোন দলীল আছে কি?

খ। হযরত আয়িশা (রাযিঃ) হুযুর (সাঃ) কে শুধালেন, কেউ কি শহীদ না হয়েও শহীদের সাথী হতে পারে? হুযুর (সাঃ) বললেন, যে ব্যক্তি দিনরাতে বিশবার মরণকে স্মরণ করে সে হতে পারে (মাওত কী য়‍্যা-দ ১৩ পৃষ্ঠার বরাতে তাবলীগ জামাআত ১৫৫ পৃষ্ঠা)। এই বরাতহীন হাদীসটি প্রমাণ করে যে, কেবল মরণের বিশবার স্মরণ জিহাদের সমতুল্য। এটা জাল হাদীস।

চতুর্থ সমস্যা ৪ চেল্লা ফারসী শব্দ। যার শাব্দিক অর্থ চল্লিশ। সূফী ও পীরদের ভাষায় চেল্লা বলা হয় কোন একটি বিশেষ জায়গায় অবস্থান করে কিছু বিশেষ আমল চল্লিশ দিন ভরে অভ্যাস করা। মুহাম্মদ ইলিয়াস ঐ চেল্লাকেই সুকৌশলেই তার তাবলীগী মিশনে লাগিয়েছেন। তবে তিনি তার চেল্লায় একটু তারতম্য ঘটিয়েছেন। তা হল এই যে, তাদের তাবলীগী চেল্লা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কিংবা খানকায় বসে নয়। বরং তা তাবলীগী গাশত (ফারসী ভাষায়) বা ঘোরাফেরায় হবে। তাবলীগী গাশতের সময় এই তাবলীগের লোকেরা কতিপয় নিয়ম আবিষ্কার করেছে। ১। আমীর, ২। রাহবার (পথ প্রদর্শক) ৩। মুতাকাল্লিম (কথা বলনে ওয়ালা) নির্বাচন। এ তিন ব্যক্তি নির্বাচন তাদের মনগড়া কাজ। কারণ কোথাও কোন দল প্রেরণের নেতা একজনকেই নির্বাচন করা রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাত। একই দলের তিন রকমের নেতা নির্বাচন সুন্নাত পরিপন্থি।

তাবলীগ জামাতের লোকেরা বলে দারুল ইসলাম নেই তাই আমরা রাসূলের (সাঃ) মক্কী জীবনের অবস্থায় রয়েছি। তাই শুধু দাওয়াত দিতে হবে। এ জাতীয় মনগড়া কথা, চিন্তা বিদয়াত। কেননা রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবারা (রাঃ) মক্কাতে থাকাকালীন সময় আল কুরআন এবং রাসূল (সাঃ) এর উপর অবতীর্ণ শরীয়তের কিছু অংশ তখন নাযিল হয়েছিল, তাই উনাদের শরীয়তের সকল হুকুম-আহকাম (অহি নাজিল সম্পন্ন হয়নি বলে) পালন করতে হয়নি। কিন্তু আমাদের বর্তমান অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল কুরআন ও সুন্নাহের মাধ্যমে শরীয়তের সকল হুকুম আহকাম আমাদের সামনে উপস্থিত এবং আমাদের যথাসাধ্য তা পালনের হুকুম রয়েছে।

আল্লাহতায়ালার হুকুম নামায কায়েম কর যখন আমরা পালন করার সিদ্ধান্ত নেই তখন প্রথমে আমরা কোরআন ও সুন্নাহ থেকে রাসূল (সাঃ) প্রদর্শিত পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিয়ে সেই পদ্ধতিরই অনুসরণ করে নামায কায়েমের চেষ্টা করি। কেউ নিজের থেকে কখনই পাচ ওয়াক্ত নামাযকে ৬ বা ৭ ওয়াক্ত বানিয়ে নেইনা কিংবা প্রতি রাকাতে দুইটা সিজদার জায়গায় ৩ বা ৪টা সেজদা দেয়ার নিজস্ব কোন পদ্ধতি বানিয়ে নেই না। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার আল্লাহতায়ালা যখন সেই কোরআনেই বললেন দ্বীন কায়েম কর তখনই প্রত্যেকে কিংবা যে কোন আলেম কিংবা বুজুর্গ লোক নিজে নিজে দ্বীন কায়েমের একটা পদ্ধতি উদ্ভাবন করে নিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করতে লেগে যায়। আর এর থেকেই শুরু হয় দলাদলি বা গ্রুপিং। অথচ আল্লাহতায়ালা বলেছেন,
"তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করো এবং তাতে অনৈক্য (দলাদলি) সৃষ্টি করো না। (আশ শুরা : ১৩)

রাসূল (সাঃ) এর ওফাতের পর কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র (দারুল ইসলাম) থাকাকালীন কিংবা দারুল ইসলাম না থাকলে দ্বীন কিভাবে প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করতে হবে এ ব্যাপারে কুরআন আর সুন্নাতে সুস্পষ্ট দলিল উপস্থিত।

আল হারিস আল-আশয়ারী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী (সাঃ) বলেছেন: "আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাকে যে পাঁচটি কাজ সম্পাদনের আদেশ দিয়েছেন আমি তোমাদেরকে সেই পাঁচটি কাজের আদেশ দিচ্ছি। (১) আল-জামায়াহ, (২) শ্রবণ, (৩) মেনে চলা, (৪) হিজরাহ ও (৫) জিহাদ। কেননা যে ব্যক্তিই আল-জামায়াহ ত্যাগ করে সে তার গলা থেকে ইসলামের বন্ধন খুলে ফেলে। এক ব্যক্তি বললোঃ হে আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) নবী (সাঃ), এমন কি সে যদি রোজা রাখে ও নামাজ পড়ে তবুও? নবী জবাব দিলেন, 'এমনকি সে যদি রোজা রাখে ও নামাজ পড়ে তবুও। আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, 'এমনকি সে যদি মুসলিম হওয়ার দাবি করে! আল্লাহ্ তোমাদেরকে যা বলে ডেকেছেন তাকে যদি তাই বলে ডাক আল-মুসলিমীন, আল-মুমিনীন, আলার বান্দা"। (আহমদ)

হাদীসে রাসূল (সাঃ) থেকে উনার হুকুম মোতাবেক সমস্ত মুসলিমরা আল জামায়াহর খলিফাকে বাইয়াত দিতে হবে। যে কেউ কুরআন সুন্নাহ থেকে কিছু আয়াত ও হাদীসে রাসূল নিয়ে দল বানিয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিদয়াত। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহ এবং তাফসীর ইবনে কাসীর মোতাবেক এ খলিফা বা আমীরুল মুমিনীনকে নিলিখিত বৈশিষ্ট মন্ডিত হতে হবে। যথা পুরুষ লোক হওয়া, আযাদ হওয়া, বালিগ হওয়া, বিবেক সম্পন্ন হওয়া, মুসলমান হওয়া, সুবিচারক হওয়া, ধর্মশাস্ত্রে সুপন্ডিত হওয়া, চক্ষু বিশিষ্ট হওয়া, সুস্থ ও সঠিক অঙ্গ বিশিষ্ট হওয়া, যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া, সাধারণ অভিমত সম্পর্কে অভিজ্ঞ হওয়া এবং কুরায়েশী হওয়া ওয়াজিব। [তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খন্ড পৃঃ ২২২]

সমস্ত মুসলিমকে এ আমিরুল মুমিনীন এর কাছে দারুল ইসলাম থাকাকালীন সময়ে এবং না থাকলেও (দুর্বল অবস্থায়) বাইয়াত দিয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে লেগে থাকতে হবে। কারন অন্য সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে খলিফাকে বাইয়াত ছাড়া মৃত্যু জাহিলীয়াতের মৃত্যু: ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তিই খলিফাহর সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে, সে কোন প্রকার অব্যাহতি ছাড়াই আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। যে ব্যক্তি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি (বাইয়াহ) ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করে।" (মুসলিম)

উক্ত হাদীসে কোথাও দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) না থাকলে সমস্ত মুসলিম একজন খলিফার নেতৃত্বে থাকতে পারবে না এই রকম কোন শর্ত দেওয়া হয়নি। বরং কুরআন আর সুন্নাহ থেকে সুস্পষ্ট যে কখনও মুসলিমদের তাফাররুক বা দলাদলি করা যাবে না। কোন ইসলামী নাম দিয়ে দল বানানো হারাম। যেমন মুহাম্মদ আখতার ইলিয়াস তাবলীগ জামায়াত বানিয়েছেন। মুহাম্মদ আখতার ইলিয়াস কি আমিরুল মুমিনীন ছিলেন? সহীহ হাদীস মুতাবেক তাঁর আমিরুল মুমিনীন হওয়ার যোগ্যতা নেই। তিনি তার জামায়াতকে আল জামায়াহ কোথাও বলেননি। তার বানানো তাবলীগ জামায়াত কুরআন হাদীসের দলিল মুতাবেক আল জামায়াহ নয় অতএব এটা একটা ফেরকা।

এ গ্রন্থের প্রথম দিকে উল্লেখিত হাদীসদ্বয় থেকে জানতে পারি রাসূল (সাঃ) এর পর খলিফারা আসবেন কিংবা দুনিয়াতে কোন খলিফা না থাকলে হাদীস মোতাবেক খলিফার বৈশিষ্ট্য পূরণ করে (যা উপরে তাফসীর ইবনে কাসীর থেকে বর্ণিত হল) এমন একজনকে বাইয়াত দানের মাধ্যমে খলিফা নিযুক্ত করতে হবে। একই সময়ে একের অধিক অর্থাৎ দুইজন খলিফাকে বাইয়াত দেয়া হলে প্রথম দেখতে হবে কোন খলিফা হক এবং তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন। দুইজন খলিফাই যদি হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তবে যেই খলিফাকে প্রথমে বাইয়াত দেয়া হয়েছে উনি থাকবেন এবং প্রয়োজনহলে (যদি দ্বিতীয় জন প্রথমজনকে বাইয়াত দিতে অস্বীকার করে) দ্বিতীয় খলিফাকে হত্যা করতে হবে যা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

আবু সা'ঈদুল খুদরী কর্তৃক বর্ণিত যে নবী (সাঃ) বলেছেন "যদি দুজন খলিফাহ আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি (বাইয়াহ) নেন তবে তাদের শেষোক্ত জনকে হত্যা কর।” (মুসলিম কিতাবুল ইমারাহ)

একজন মুসলিমকে হত্যা করা শিরকের পর সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ। অথচ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এত বেশি জরুরী যার জন্য প্রয়োজনে একজন মুসলিমকে হত্যা করা জায়েজ করা হয়েছে। অতএব মুসলিম উম্মাহকে দলা-দলি করে ভাগ করা যাবে না। এবং আমাদের কাজ খলিফাকে বাইয়াত দিয়ে আল জামায়াহর সাথে লেগে থাকা।

আল জামায়াহর খলিফার দায়িত্ব কুরআন সুন্নাহ মুতাবেক আমাদেরকে পরিচালিত করা। কিভাবে দাওয়াত দিতে হবে, ইসলামী রাষ্ট্র না থাকলে কিভাবে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠর চেষ্টা করা যায়, কখন হিজরত করতে হবে, কিভাবে মুসলিমদের একত্রিত করা যায়, কিভাবে নামায কায়েমও যাকাত আদায় করা যায়, কিভাবে মুসলিমদের বিবাদপূর্ণ বিষয় কুরআন সুন্নাহ দিয়ে বিচার-ফায়সালা করা যায়। কিভাবে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের কাজের বাধা দেয়া যায়, কিভাবে নির্যাতিত উম্মাহকে রক্ষা করার জন্য জিহাদ করা যায় ইত্যাদি সবই আল-জামায়াহর খলিফার ইখতিয়ার ভুক্ত বিষয়। উনি সিদ্ধান্ত নিবেন আর আমাদেরকে তার হুকুম মত চলা ওয়াজিব ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত না উনি কোন শিরক কিংবা কুফর হুকুম দিবেন। তাই এ দাওয়াতী কাজেও খলিফার সেই পন্থাই গ্রহণ করতে হবে যা কি না আল্লাহ্ তায়ালা রাসূল (সাঃ) কে দিয়েছেন।

আল-কুরআন দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাবলীগের ক্ষেত্র পর্যায়ক্রমে তিন রকম হবে। যেমনঃ আল্লাহ্ তাঁর নবীকে বলেনঃ "আর তুমি তোমার নিকটবর্তী আত্মীয়দেরকে ভয় দেখাও” (শুআরা: ২১৪) এই আয়াত প্রমাণ করে যে, তাবলীগের প্রথম ক্ষেত্র হবে নিজের ঘরবাড়ীও পাড়া-পড়শী।

দ্বিতীয় পর্যায় সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেনঃ আর (এই কুরআন দ্বারা) তুমি ভয় দেখাতে পার উম্মুল কুরা (মক্কা) বাসীদেরকে এবং ওর আশেপাশের লোকদেরকে (আনআম: ৯২)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, নিজের ঘরবাড়ী ও পাড়া-প্রতিবেশীদেরকে আল্লাহর ও জাহান্নামের ভয় দেখানোর পর ঐ পরিধি একটু বাড়িয়ে শহর ও শহরতলীতে বিস্তৃত হবে।

তৃতীয় পর্যায় সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেনঃ "তুমি বলে দাও, হে মানব সমাজ! আমি তোমাদের সবারই কাছে আল্লাহ্র দূত।" এই আয়াত প্রমাণ করে যে, প্রথম ও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তাবলীগের কাজ শেষ হলে তবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে হবে। তবে এই তৃতীয় হুকুমটি রাসূলের নায়েবদের দায়িত্ব, অর্থাৎ খলিফা তার অধীনস্থ কুরআন সুন্নাহর ইলমধারী আলেমদের নিয়ে কয়েকটি দাওয়াতী দল বানাবেন এবং উনারা খলিফার দূত হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বা রাষ্ট্রে তাবলীগ করতে যাবেন। যেমনটি রাসূল (সাঃ) মদিনায় পাঠিয়েছিলেন বিশিষ্ট সাহাবা মুসায়েব (রাঃ) কে। এটা সর্ব সাধারণের কাজ নয়। সাধারণ জনগণকে আল্লাহ্ বলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও” (সূরা তাহরীম ৬ষ্ট আয়াত)।

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, প্রত্যেক ঈমানদারই নিজেকে এবং তার পরিবারবর্গকে দ্বীনে ইসলামের তাবলীগ করবে।

উবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: "তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল এবং তোমরা প্রত্যেকেই নিজের রাখালী সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তাই যে ব্যক্তি লোকদের নেতা সেও রাখাল। তাকে তার রাখালীর জওয়াবদিহী করতে হবে। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিবারবর্গের রাখাল। তাকে তার পরিবারের রাখালীর জওয়াবদিহী করতে হবে। আর প্রত্যেক স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের ও তার সন্তানদের রাখাল। তাকে ওদের সম্পর্কে জওয়াবদিহী করতে হবে। আর কোন ব্যক্তির ক্রীতদাস তার মনিবের মালের রাখাল। তাকে ওর সম্পর্কে জওয়াবদিহী করতে হবে। তাই সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার রাখালী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" (বুখারী, মুসলিম)।

অতএব মুসলিম নামধারী প্রত্যেককেই দ্বীনে ইসলাম কি, তা জানতে হবে এবং নিজের ঘরবাড়ীতে তা প্রচার করতে হবে। তাকে প্রচলিত আখতার ইলিয়াছ প্রবর্তিত তাবলীগ জামাতের লোকদের মত নিজের ঘরবাড়ী ছেড়ে দেশ বিদেশে তাবলীগ করতে যেতে হবে না। কারণ, উপরে বর্ণিত সহীহ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, আমিরুল মুমিনীন বা খলিফা ও উনার নিয়োগকৃত আমীররা ও দাওয়াতী দলের আলেমরা ছাড়া সাধারণ জনগণকে তার অধীনস্থ ঘরবাড়ীর লোক ব্যতীত অন্যের জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে না। তাই যাঁরা নিজ নিজ ঘরে এবং নিজ গ্রাম কিংবা নিজ শহরে তাবলীগ না করে বরং চিল্লার নামে অন্য শহরে কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে ফাযায়েলে আমলের জ্ঞান নিয়ে তাবলীগ করতে যাচ্ছেন, তাঁরা দ্বীনে ইসলামের মুহাম্মদী তাবলীগী পালন করছেন কি? চিল্লা দেয়া সংক্রান্ত কুরআন সুন্নাহর কোন দলীল নেই। বরং সিহাহ সিত্তাহ গ্রন্থে নিয়ে হাদীস পাই:

আবু সুলায়মান মালেক ইবনুল হুয়াইরিস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন নবী (সঃ)-এর কাছে হাযির হলাম। আমরা ছিলাম সমবয়স্ক যুবক। আমরা একাধারে বিশ রাত তাঁর কাছে অবস্থান করলাম। তিনি অনুভব করলেন, আমরা আমাদের পরিবারে ফিরে যেতে আগ্রহী। তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, আমরা বাড়িতে কাকে কাকে রেখে এসেছি। আমরা এ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলাম। তিনি বাস্তবিকই অত্যন্ত সদয় এবং দয়াশীল ছিলেন। তিনি বলেনঃ তোমরা নিজেদের পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে যাও, তাদের দীনের জ্ঞান দান করো এবং ভালো কাজ করার নির্দেশ দাও। আর তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখেছো ঠিক সেভাবে নামায পড়ো। নামাযের ওয়াক্ত হলে তোমাদের মধ্যে একজন আযান দিবে এবং তোমাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তোমাদের নামাযে ইমামতি করবে।” (বুখারী, মুসলিম, দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)।

উক্ত হাদীসটি প্রমাণ করে ধরা বাধা নির্দিষ্ট করে চল্লিশ দিনের জন্য রাসূল (সাঃ) উনার সাহাবাদেরকে কখনই নিজের কাছে রেখে তালিম দেননি। কিংবা কোন দাওয়াতী দলকে চল্লিশ দিনের চিল্লা দিয়ে (অর্থাৎ চল্লিশ দিন অবস্থান করতেই হবে) দাওয়াত দিতে কোথাও পাঠিয়েছেন এরকম কোন দলীল নেই। সাহাবা, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন উনারা কেউ কোন দিনও চিল্লা দেননি কিংবা চিল্লা দেওয়ার কোন হুকুম দিয়েছেন বলে কোন দলীল নেই। এটা আখতার ইলিয়াসের তৈরী করা বিদয়াত।

অতএব দেখা যাচ্ছে এ তাবলীগ জামাত চিল্লা দেয়ার নামে মুসলিমদেরকে পরোক্ষভাবে দুনিয়া বিরাগী সন্ন্যাসী বানাচ্ছে। শরীয়ত মানুষকে কখনো বলে না দুনিয়াকে বর্জন কর, উপবাস ও ঘর বাড়ী সংসার পরিবার ছেড়ে অপরিচিতদের মাঝে দিনের পর দিন অতিবাহিত কর, আত্মার দাবী, শরীরের দাবী অস্বীকার করে নিজেকে কষ্ট সাধনায় নিক্ষেপ করে জীবনের সকল স্বাচ্ছন্দ সকল ঘুমকে নিজের জন্য হারাম করে দাও। একবার চিন্তা করে দেখুন ঐ সকল মা বোনদের কি অবস্থা যাদের স্বামীরা কিছুদিন পরপর চিল্লার নামে ঘর ছেড়ে বহুদিনের জন্য চলে যাচ্ছেন। স্ত্রীর হক, পিতামাতার হক, সন্তানের হক আদায় করা আল্লাহর বিধান থাকা সত্ত্বেও আপনারা কি আখতার ইলিয়াসের ও বুজুর্গ মুরুব্বিদের মন গড়া ইবাদত পদ্ধতির দিকে অন্ধভাবে ছুটছেন। বৎসর চিল্লা, জীবন চিল্লার নামে খ্রীষ্টানদের পাদ্রী, নান এবং হিন্দু সন্ন্যাসীদের মত বৈরাগ্য বাদকে হালাল করা হচ্ছে কি এ তাবলীগ জামাতের কর্মপদ্ধতিতে। অথচ হজ্জ হিজরত ও জিহাদ ছাড়া ঘর বাড়ি পরিবার ছেড়ে এভাবে মাসের পর মাসের জন্য বের হয়ে যাওয়ার বিধান আল্লাহতায়ালা দেননি। তাও হিজরতের সময় পরিবারকে সাথে নিয়ে হিজরত করা হয়। এমন কি জিহাদের ব্যাপারেও খলিফাদের নেয়া পদক্ষেপ লক্ষণীয়। যেমন ওমর ইবনুল খাত্তাব মুসলিমদের কোন বাহিনীকে জিহাদের জন্য যখন কোথাও পাঠাতেন, ছয় মাসের অধিক কাউকে বাহিনীতে রাখতেন না। নতুন লোকদের পাঠিয়ে সেই মুসলিমদের তাদের পরিবারে ফেরৎ আনাতেন। আল্লাহ আমাদের হক এবং বাতিল বুঝবার তাওফীক দিন; আমীন।

পঞ্চম সমস্যা ৪ এজতেমার নামে তিন দিনের যে জমায়াতের আয়োজন করা হচ্ছে তা আর একটি বড় বিদয়াত। ইহুদী কোম্পানী বাটার দেয়া ময়দানে প্রতিবছর যে জামায়াতের আয়োজন করা হচ্ছে এবং দেশ বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ লোক আসছে তা কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক সম্পূর্ণ অবৈধ। রাসূল (সাঃ) বলেছেন- “তিনটি মসজিদ ব্যতীত (ইবাদত বা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে) কোথাও সফর করা যাবে না। (মসজিদ তিনটি হল) মসজিদে হারাম, (কাবা ঘর) মসজিদে নববী ও মসজিদে আকছা।" (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ,)

হজ্জ-ই হচ্ছে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। প্রতি বছর মুসলমানদের শুধু হজ্জের জন্য মক্কা, মদীনায় সমবেত হওয়ার অনুমতি রয়েছে। হজ্জ ব্যতিত দুনিয়ার অন্য কোন স্থানে প্রতিবছর নিদিষ্ট করে একত্রিত হওয়া বা এস্তেমার জমায়েতের আয়োজন করা বিদয়াত। এর দ্বারা মুসলিমদের মনে হজ্জের বিকল্প চিন্তা শুরু হয়ে যায়। গরীব মুসলিমরা বর্তমানে বলা শুরু করে দিয়েছে যে- 'হজ্জে তো আর যেতে পারছি না তাই এস্তেমার যাচ্ছি; হজ্জের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সমাবেশ ইত্যাদি। অথচ সামর্থ্য না থাকলে যেমন যাকাত দিতে হয় না তেমনি হজ্জ করারও দরকার নেই। এটাই আল্লাহর হুকুম অর্থাৎ ইবাদত। এ সকল কথা কাজ ও চিন্তা ইসলামের বিরুদ্ধে কত বড় গর্হিত কাজ তা ভাষায় প্রকাশের অবকাশ রাখে না। ইহুদী, খৃষ্টান আর হিন্দু চক্রের দাপটে আর চক্রান্তে আজ দুনিয়ার বুকে দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) নেই, যেখানে আল্লাহর আইন বা শরীয়াহ কার্যকর থাকবে একজন খলিফার নেতৃত্বে। আজ আমরা নামায কায়েম ও যাকাত আদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে করতে পারছি না। সওমের পবিত্রতা রক্ষা করাও কঠিন। ঠিক সেই সময়েই এ নাস্তিক্যবাদী চক্র চাচ্ছে আমাদের ইসলামের আরেকটা স্তম্ভ হজ্জ থেকে মুসলিমদের নজর অন্য দিকে ফিরাবার। তাই তারা মদদ ও সাহায্য দিচ্ছে ও উৎসাহিত করছে বিশ্ব ইজতেমা নামক নতুন বিদয়াতকে। যেন মুসলিমদের হজ্জের থেকে চোখ ফিরানো যায়। আল্লাহ আমাদের এ সকল ইসলাম ধ্বংসকারী বিদয়াত থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00