📄 কাফের ও কুফর
"তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতপর তোমাদের মধ্য থেকে কেউ কাফের কেউ মুমিন। (সূরা আত তাগাবুন : ২)
কুফর অর্থ কোন কিছুকে গোপন করা। 'কুফর' হচ্ছে এক ধরনের মুর্খতা বরং কুফরই হচ্ছে আসল মুর্খতা। মানুষ আল্লাহকে না চিনে মুর্খ হয়ে থাকলে তার চেয়ে বড় মুর্খতা আর কি হতে পারে? শরীয়তের ভাষায় কুফর বলতে যা বুঝায় তা এখানে আলোচনা করবো। রাসূল (সাঃ) যে শরীয়ত আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে নিয়ে এসেছেন তার মূল বিষয় সমূহ যেগুলি অপরিহার্য, অপরিবর্তনীয় এবং অলঙ্ঘনীয় (অবশ্যই পালনীয় এবং পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই এবং পালন না করলে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে) হুকুম রূপে মেনে চলার জন্য মানব জাতির কাছে উপস্থাপন করেছেন সেগুলোর যে কোন একটি বিষয়কে অস্বীকার করা বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করাকে কুফরী কাজ বা কুফরী বলে এবং যে ব্যক্তি এই কুফরীতে লিপ্ত হবে সে কাফেরে পরিণত হবে। অর্থাৎ ইসলাম বিরোধী কোন বিধানকে বিশ্বাস করা এবং নবী (সাঃ) এর আনীত বিধানকে কিংবা বিধানের যে কোন একটি বিষয়কে অস্বীকারকারী ব্যক্তি কাফের। আবার ইসলামকে মানে এবং ইসলামের বিরোধী হুকুম-গুলিকেও মানে এমন ব্যক্তিও মুশরিক কাফের।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে সকল নবীর উম্মতকে এবং আমাদেরকে ইসলাম নামক দ্বীন দিয়েছেন; এই ইসলাম দ্বীনের জন্য রাসূলদের মাধ্যমে জীবন পদ্ধতি বা শরীয়ত নাজিল করেছেন। একটি শরীয়ত নাজিল করার পর যতদিন পর্যন্ত দুনিয়ার মানুষ সেটাকে অমান্য করা শুরু না করেছে এবং বিকৃত না করে ফেলেছে ততদিন পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা আরেকটি শরীয়ত নাজিল করেননি। ঠিক এইভাবে ইহুদী এবং খৃষ্টানরা যথাক্রমে মুসা (আঃ) এবং ঈসা (আঃ) এর উপর প্রেরিত তাওরাত ও ইনজিল কিতাবকে অমান্য করে বিকৃত করতে শুরু করার পর শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে, রাসূল হিসেবে আসমানি কিতাব 'আল কুরআন' এবং সুনির্দিষ্ট শরীয়ত দিয়ে পাঠিয়েছেন দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত। আল্লাহ বলেন:
"এবং বাস্তবিকই এই কিতাবে আমি কোন কিছুই বাদ দেই নাই।" (আন'আম : ৩৮)
এবং "নিশ্চয়ই আমি আত্মসমর্পণকারীদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ, পথনির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ (হে নবী) তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি। (নাহল: ৮৯)
রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে যে শরীয়ত নিয়ে এসেছেন তাতে মানব জীবনের সকল অধ্যায়ের সুস্পষ্ট নিয়ম পদ্ধতি বিস্তারিত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে। কিভাবে শারীরিকভাবে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করতে হবে (নামায, রোজা, হজ্ব, ইত্যাদি), কিভাবে ব্যক্তি জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে আল্লাহতায়ালার ইবাদত বা হুকুমের অনুসরণ করতে হবে তা হুকুম আকারে রাসূল (সাঃ)-এর উপর নাজিলকৃত শরীয়তের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া আছে। অর্থাৎ ব্যবসা বাণিজ্য (সুদ বিহীন এবং যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা-ইসলামী অর্থনীতি) কিভাবে করতে হবে; সমাজে বসবাসের জন্য-বিয়ে কিভাবে করতে হবে, সম্পত্তি কিভাবে বন্টন হবে, পিতা-মাতার হক, আত্মীয়ের হক, মুসলিম প্রতিবেশী এবং দরিদ্রের হক, সন্তানদের হক কিভাবে রক্ষা করতে হবে (ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা)। কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক জ্ঞান বিজ্ঞানের শিক্ষা কিভাবে অর্জন করতে হবে (ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা)। আল্লাহর দৃষ্টিতে যে সকল কাজ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত সে সকল অপরাধের জন্য কিভাবে শাস্তি দিতে হবে (ইসলামী হুদুদ বা শাস্তি ব্যবস্থা)। মানুষের পারস্পরিক বিষয়াদি সংক্রান্ত যাবতীয় ঝগড়া, বিবাদের বিচারের ফয়সালা শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত এবং মুহাম্মদ (সাঃ) প্রদর্শিত পদ্ধতিতে কিভাবে করতে হবে (ইসলামী বিচার ব্যবস্থা)। ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ কেমন হবে এবং কিভাবে ইসলামী সংবিধান যার মূল তাওহীদের ঘোষণা "আল্লাহর সার্বভৌমত্ব" দ্বারা দেশ, জনগন এবং প্রশাসন পরিচালিত হবে (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা)। এবং ইসলামী রাষ্ট্র না থাকলেও কিভাবে সমস্ত দুনিয়ার মুসলিমরা এক খলিফার নেতৃত্বে একত্রিত ভাবে থাকবে (অর্থাৎ ছোট ছোট দল বানিয়ে বিভক্ত হয়ে যেন না যায়) ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের কিভাবে চেষ্টা করবে, কিভাবে দারুল কুফরের (শুধুমাত্র আল্লাহর আইন দ্বারা যেখানে দেশ পরিচালিত হয় না অর্থাৎ যেদেশে মানব রচিত আইনের সংবিধান দ্বারা সংসদ ও দেশ চলে) থেকে দারুল ইসলামের (শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক আল্লাহর আইন দ্বারা যে দেশ পরিচালিত হয়) দিকে হিজরত করতে হবে, এক খলিফা বা আমিরুল মুমিনীনের নেতৃত্বে কিভাবে জিহাদ করতে হবে। অমুসলিম জনগন এবং অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে মুসলিমদের আচরন কিভাবে করতে হবে (ইসলামী বিদেশনীতি)। আল্লাহ তায়ালা যে সকল খাদ্য এবং কাজকে হারাম করেছেন যেমন-শুকরের মাংস, মদ, আল্লাহর নামে যবেহ না দেয়া পশুর মাংস, ইত্যাদি অনুরূপ সুদ, ঘুষ, জুয়া, লটারী ইত্যাদি বিষয়াদি থেকে কিভাবে বেচে থাকতে হবে। কোন কোন কাজ আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে নিষিদ্ধ যেমন-কবীরা গুনাহ সমূহ, কোন কোন কাজ একজন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় এবং ইসলামে প্রবেশের শর্তসমূহ কি এবং ইসলাম গ্রহনের পর ফরজ ওয়াজিব দায়িত্ব সমূহ কি কি এবং কোন কোন কাজ মানদুব ও মুবাহ তা কুরআন ও সুন্নাহের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা শেষ নবী রাসূল (সাঃ) এর দ্বারা মুসলিমদের জন্য যে শরীয়ত নাযিল করেছেন অর্থাৎ জীবন-যাপন পদ্ধতি দিয়েছেন তাতে হুকুম আকারে বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়েছেন।
এখন যে সকল ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) আনীত ও প্রদর্শিত শরীয়তের পুরোটা বা যে কোন একটি বিষয়কে অস্বীকার করবে সে কাফের।
"আর যারা কাফির, তাদের জন্য রয়েছে দুর্গতি এবং তিনি তাদের কর্ম বিনষ্ট করে দিবেন। এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের আমলসমূহ ব্যর্থ করে দেবেন।” (মুহাম্মদ ৮-৯)
আবার অনেক সময় মানুষ রাসূল (সাঃ) এর শরীয়ত মানে এবং মানব রচিত আইন কানুন ও মানে সে শিরককারী মুশরিক কাফের। তার প্রমাণ নিলিখিত আয়াত
"যে কেউ রাসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফিরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়।" (আন-নিসা ১১৫-১১৬)
এ আয়াত দ্বারা পরিস্কার রূপে প্রমাণিত হয় যে রাসূলের প্রদর্শিত পথের বিরোধিতা করা এবং মুমিনদের পথ ছেড়ে অন্য কোন পথ গ্রহণ করা শিরক। এর শাস্তি হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম স্থান জাহান্নামে বন্দি করে রাখা। এ বিষয়ের ওপর এদিক দিয়ে আলোচনা হতে পারে যে এটা আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে প্রমাণিত কি না? যদি আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের কথা নির্ধারিত হয়, তাহলে তা নিয়ে কানাঘুষা করা এবং হেকমতের পরিপন্থী আখ্যা দেয়া, একে যুগের পরিপন্থী বলা এবং তা ছেড়ে নিজের মনগড়া পথের বা অন্য কারুর অন্ধ অনুকরণে অন্য পথের আশ্রয় নেয়া সুষ্পষ্ট শিরক। আল্লাহ্ শিরককে কখনোই ক্ষমা করবেন না।
কয়েক প্রকার কাফেরের উদাহরণ
প্রথম প্রকার কাফের: আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বে অস্বীকারকারী ব্যক্তিঃ-যে ব্যক্তি নাস্তিকতাবাদে বিশ্বাসী অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বকেই যে অস্বীকার করে কিংবা সন্দেহে লিপ্ত ব্যক্তি কাফের। এ ধরনের মানুষ নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে আল্লাহকে চেনেনি এবং নিজের নির্বাচন ক্ষমতার সীমানার মধ্যে সে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের লোক হচ্ছে কাফের। 'কুফর' শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে কোন কিছু ঢেকে রাখা বা গোপন করা। এ ধরনের লোককে 'কাফের' (গোপনকারী) বলা হয়, কারণ সে তার আপন স্বভাবের উপর ফেলেছে অজ্ঞতার পর্দা। সে পয়দা হয়েছে ইসলামী স্বভাব নিয়ে। তার সারা দেহ ও দেহের প্রতিটি অংগ কাজ করে যাচ্ছে ইসলামী স্বভাবের উপর। তার পারিপার্শ্বিক সারা দুনিয়া চলছে ইসলামের পথ ধরে। কিন্তু তার বুদ্ধির উপর পড়েছে পর্দা। সারা দুনিয়ার এবং তার নিজের সহজাত প্রকৃতি সরে গেছে তার দৃষ্টি থেকে। সে এ প্রকৃতির বিপরীত চিন্তা করেছে। তার বিপরীতমুখী হয়ে চলবার চেষ্টা করেছে।
এ জাতীয় ব্যক্তিদের অনেকেই ডারউইন বাদে বিশ্বাসী এবং এদের ধারণা তাদের পূর্ব পুরুষ আগে বানর ছিল এবং বানরের বংশ পরম্পরায় তারা মানুষে পরিণত হয়েছে। এদের আকল বুদ্ধি যে কি পরিমাণ লোপ পেয়েছে তা স্বাভাবিক চিন্তার সকল মানুষই তাদের যুক্তিকে হাস্যকর বলে প্রমাণ করতে পারবে।
দ্বিতীয় প্রকার কাফের: এরা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতে বিশ্বাস করে। কিন্তু আল্লাহর হুকুম পালনের ক্ষেত্রে এরা নানাবিধ সংশয়ে লিপ্ত এবং রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) আনীত শরীয়ত যা আলাহ তায়ালার হুকুম আহকামের সমষ্টি তা তারা মানতে নারাজ। এরাও হাক্কানী কাফের যদিও এরা আল্লাহর কিছু কিছু ফরজ হুকুম পালন করে যেমন-নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হজ্জে যায়, কিন্তু জীবনের সকল স্তরে তারা আল্লাহর হুকুম পালনে নারাজ। এদের কাফের হওয়ার উদাহরণ ইবলিসের কাফের হওয়ার অনুরূপ। আমরা কুরআন সুন্নাহ থেকে জানতে পারি ইবলিসের নিলিখিত স্বভাবগুলি।
একঃ ইবলিস আল্লাহতায়ালাকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, বিধান দাতা রব হিসেবে মানত। তার প্রমাণ কুরআনের আয়াত যেখানে ইবলিস আল্লাহতায়ালাকে বলেছে সে (ইবলিস) বললোঃ "হে আমার রব! তুমি যেমন আমাকে বিপথগামী করলে ঠিক তেমনিভাবে আমি পৃথিবীতে এদের জন্য প্রলোভন সৃষ্টি করে এদের সবাইকে বিপথগামী করবো।" (সূরা হিজরঃ ৩৯) অর্থাৎ ইবলিস আল্লাহকে একমাত্র রব হিসেবে মানত।
দুইঃ ইবলিস জান্নাত, জাহান্নাম ফেরেস্তা আখেরাত এ বিশ্বাস করত। এর দলিল ইবলিসকে যখন আল্লাহর হুকুম অমান্যর কারণে [আদম (আঃ) কে সেজদা করতে অস্বীকার করেছিল। অভিশপ্ত কাফের ঘোষণা দেওয়া হল তখন ইবলিস কেয়ামত পর্যন্ত সময় চাইল আল্লাহতায়ালার কাছে, যেন সে মানুষকে পথভ্রষ্ঠ ও গোমরাহ করে তার সাথে জাহান্নামে নিয়ে যেতে পারে। তার প্রমাণ ইবলিস আরয করলো, "হে আমার রব! যদি তাই হয়, তাহলে সেই দিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও যেদিন সকল মানুষকে পূণর্বার উঠানো হবে।” [আল-হিজরঃ ৩৬-৩৭]
তিনঃ হাদীসের দলিল থেকে আমরা জানতে পারি, ইবলিস আল্লাহ তায়ালার বহু ইবাদত করেছে এবং সে অনেক বড় আলেম ছিল। কিন্তু তার এ ইলম এবং ইবাদত কোন কাজেই আসেনি যখন সে আল্লাহতায়ালার হুকুমকে অমান্য করে নিজের নফসের ইচ্ছা মত কাজ করল।
চারঃ এবার লক্ষ্য করুন আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস, আখেরাতে বিশ্বাস এবং আল্লাহতায়ালার অনেক ইবাদত করার পরেও ইবলিস আল্লাহর একটি হুকুম (আদমকে সিজদা করা) পালনে অস্বীকার করার কারনে আল্লাহতায়ালা নিজে তাকে কাফের ডেকেছেন এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী হিসেবে তার পরিণতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
যে সকল অপরাধের কারণে ইবলিস কাফের হল : (ক) ইবলিস শয়তান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছে বুঝে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে, (খ) সে নিজেকে বড় এবং উত্তম মনে করেছে, (গ) সে অহংকার করেছে, (ঘ) আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজস্ব মনগড়া যুক্তি বা লজিক (Logic) পেশ করেছে। যুক্তিটি ছিল- সে ইবলিশ আগুনের তৈরি আর আদম (আঃ) শুকনো টনটনে পচা মাটি দ্বারা সৃষ্ট। আগুন মাটি থেকে শ্রেষ্ট- এ মানদন্ড ইবলিশ তার নফস থেকে তৈরি করেছিল অথচ যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার মানদন্ডে আগুন মাটি থেকে শ্রেষ্ঠ নয়। আগুনের তৈরি ইবলিশ তাই মাটির তৈরী আদম (আঃ) কে কিভাবে সিজদা করবে। অথচ আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আঃ) সিজদার হুকুম করার পূর্বে আদম (আঃ) যে জ্ঞান ও বুদ্ধির দিক থেকে ফেরেশতা ও ইবলিসের থেকে শ্রেষ্ঠ তা প্রমাণিত করেছিলেন। কিন্তু ইবলিশ নিজের নফসের দাসত্ব করেছে আল্লাহর হুকুমকে অমান্য করে এবং প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেছে। (ঙ) এই অপরাধের জন্যে সে মোটেও অনুতপ্ত হয়নি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও করেনি। অপর পক্ষে,
আদম (আঃ) ইচ্ছাকৃতভাবে বুঝে শুনে আল্লাহর হুকুম অমান্য করেননি - ১. তিনি বিদ্রোহও করেননি, ২. অহংকারও করেননি, ৩. তিনি অপরাধ করেছেন ধোকায় পড়ে ভুল করে, ৪.. তিনি সচেতনভাবে মূলত আল্লাহর একান্ত ই অনুগত ছিলেন এবং ৫. ভুল বুঝবার সাথে সাথে অনুতপ্ত হন। আল্লাহর ভয়ে কম্পিত হন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
একজন মুমিন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য এটাই যে, তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত হবে ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দরবারে।
অতএব বর্তমানে যারা ইবলিসের ন্যায় আল্লাহকে রব হিসেবে মানে এবং আল্লাহর কিছু কিছু ফরজ হুকুম পালন বা ইবাদত করে কিন্তু আল্লাহর নাযিলকৃত যে কোন একটি হুকুমকে মানতে অস্বীকার করে তারা নিঃসন্দেহে কাফের। যেমন বর্তমান দিনে বহু সংখ্যক লোক আছে যারা নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, নামক ইবাদত সমূহ পালন করছে কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আল্লাহ যে সকল আইন দিয়েছেন তা তারা মানতে নারাজ এবং আল্লাহর আইনের তুলনায় মানুষের দ্বারা লিখিত আইনকে তারা বেশি ভাল এবং যুগ উপযোগী বলে মনে করে এবং সমাজে ও রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানুষের তৈরী করা আইনকেই প্রয়োগ করে। মানুষের তৈরী করা সংবিধান দ্বারা বিবাদ পূর্ণ বিষয়ের (ফৌজদারী মামলা সমূহ) বিচার ফয়সালা করে। তারা নিঃসন্দেহে কাফের।
“যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।---- যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালেম।----- যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসেক।” [মায়েদা ৪ ৪৪, ৪৫, ৪৭],
“না, হে মুহাম্মদ, তোমার রবের নামের শপথ, ইহারা কিছুতেই ঈমানদার হইতে পারে না, যতক্ষন না তাহারা তাহাদের পারস্পরিক মতভেদের বিষয় ও ব্যাপার সমূহে তোমাকে বিচারপতি রূপে মানিয়া লইবে। অতঃপর তুমি যাহাই ফায়সালা করিবে সে সম্পর্কে তাহারা নিজেদের মনে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করিবে না, বরং উহার সম্মুখে নিজদিগকে পূর্ণরূপে সোপর্দ করিয়া দিবে।” (নিসা: ৬৫)
তৃতীয় প্রকার কাফের : আহলে কিতাব বা ইহুদী এবং খৃষ্ঠানরা (নাসারা) আল্লাহতে বিশ্বাস করে এবং 'গড' বলে ডাকে। তারা পূর্ববর্তী নবীদেরকে যথা আদম (আঃ), ইব্রাহীম (আঃ), জাকারিয়া (আঃ) মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ), কে নবী বলে মানে [ইহুদীরা ঈসা (আঃ) ছাড়া উনার পূর্বের সকলকে নবী মানে]। তারা জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেস্তা, আখিরাতের উপরও ঈমান আনে। কিন্তু তাদের প্রধান দুইটি কুফরী কাজের জন্য আল্লাহতায়ালা তাদেরকে কাফের বলেছেন।
তাদের প্রথম কুফর হোল, শিরক মিশ্রিত আকিদা। খৃষ্ঠানরা ঈসা (আঃ) কে আলাহর পুত্র এবং মারইয়াম (আঃ) কে আল্লাহর স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহ) সাব্যস্ত করে তিন ইলাহ গ্রহণ করেছে। অপরদিকে ইহুদীরাও আল্লাহর নবী উযাইর (আঃ) এর প্রকৃত শিক্ষা বর্জন করে তাকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেছে (নাউযুবিল্লাহ)। আল্লাহতায়ালার একত্ববাদের কথা জেনেও তারা এ সকল শিরকে লিপ্ত হয়ে কাফেরে পরিণত হয়েছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এরশাদ করেছেনঃ "হে নবী! বলঃ তিনি অর্থাৎ আল্লাহ একক, অমুখাপেক্ষী, তার কোন সন্তান-সন্ত তি নেই, আর তিনি কারো সন্তান নন, আর কেউই তাঁর সমতুল্য নয়।" [সূরা ইখলাস]
দ্বিতীয় প্রকার কুফরীর ধরন, ইহুদী এবং খ্রীষ্ঠানরা শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এবং উনার উপর নাযিলকৃত শেষ আসমানি কিতাব 'আল কুরআন' কে এবং রাসূল (সাঃ) প্রদর্শিত শরীয়তকে মেনে নিতে তারা অস্বীকার করেছে। এ জন্য তারা কাফের। তাদের জন্য যে সকল আসমানি কিতাব নাযিল হয়েছিল এবং তাদেরকে যে শরীয়ত দেয়া হয়েছিল তা ইহুদী খৃষ্ঠানরা নিজেরাই অমান্য করা শুরু করেছিল এবং কিতাবগুলিকে অনেকাংশে বিকৃত করে ফেলেছিল। অতঃপর আল্লাহতায়ালা শেষ নবী রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) কে কুরআন আর সুন্নাহর মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট শরিয়ত এবং কর্মপন্থা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের ও জ্বীনদের জন্য। পূর্বের নবীদের উম্মতের উপর নাযিলকৃত সকল শরিয়ত ও কর্মপন্থা বাতিল ঘোষণা করেছেন কুরআন সম্পূর্ণ নাযিলের পর। এখন যে কেউ এটাকে অস্বীকার করবে সে হাক্কানী কাফের। তাদের কাফের হওয়ার বিষয়ে যদি কোন মুসলিম নামধারী লোক সন্দেহ করে সেও কাফের। এরশাদ হচ্ছেঃ "আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।" (সূরা বাইয়্যেনাঃ ০৬)
চতুর্থ প্রকার কাফের: মুশরিক কাফের-এই ধরনের কাফের যেমন বিধর্মী জাতিগুলির লোকসকল তেমনি মুসলিম সমাজে মুসলিম নামধারী এ ধরনের কাফের আজ চারিদিকে। এরা হল সেই কাফের যারা- আল্লাহতায়ালার রুবুবিয়্যাত (রব হিসেবে তাঁর যে সকল বৈশিষ্ট্য ও কাজ সমূহ) ও উলুহিয়াতে (ইলাহ হিসেবে একমাত্র ইবাদত পাওয়ার সর্বময় অধিকারী) আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করে শিরক করে। এদের অপর নাম মুশরিক। শিরক দুনিয়ার বুকে সবচাইতে জঘন্য অপরাধ। আর আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কুরআনে বহু আয়াতে সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন উনি শিরকের গুনাহ কোন দিনও ক্ষমা করবেন না।
"আল্লাহ্ কেবল শেরকের গুনাহই মাফ করেন না; ইহা ব্যতীত আর যত গুনাহ আছে তাহা যাহার জন্য ইচ্ছা মাফ করিয়া দেন। যে লোক আল্লাহর সহিত অন্য কাহাকেও শরীক করিল; সে তো বড় মিথ্যা রচনা করিল, এবং বড় কঠিন গুনাহের কাজ করিল।" [আন-নিসা: ৪৮]
"যদি তারা শিরক করে তাহলে তাদের সমস্ত ভাল 'আমল বরবাদ হয়ে যাবে”। (সুরা আল-আন'আম: ৮৮)
সূরা আনআমে ৮২-৮৮ আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা ১৮ জন নবীর নাম নিয়ে বলেছেন যে এরাও যদি শিরক করত তাহলে তাদের সমস্ত আমল ব্যর্থ হয়ে যেত। আখেরাতের আদালতে কোন মুসলিম ব্যক্তি যত বড় গুনাহ করুক না কেন মহান আল্লাহ্ যদি ইচ্ছা করেন তাহলে তাকে মাফ করতে পারেন। কিন্তু শিরকের গুনাহ্ তিনি কখনই মাফ করবেন না। কোন ব্যক্তি যত বড় নেককার ও যত বড় আমলদার হোক না কেন শিরকের কারণে তার সমস্ত আমল ব্যর্থ হতে বাধ্য। কেননা আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালা নবীদেরকেও এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অব্যাহতি দেননি। কারণ রাসূল (সাঃ)-কেই কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেনঃ "তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্বে গত হওয়া সমস্ত নবী-রসূলদের প্রতি এই অহী পাঠানো হইয়াছে যে, তুমি যদি শির্ক কর, তাহা হইলে অবশ্যই তোমার আমল নষ্ট হইয়া যাইবে, আর তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হইবে (জাহান্নামে যাবে)।” [যুমার: ৬৫]
ভেবে দেখুন রাসূল (সাঃ)-এর চেয়ে বেশী আমল তার উম্মতের মধ্যে থেকে কেউ কি করতে পেরেছে না পারবে। অথচ রাসূল (সাঃ) কেও আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জানিয়ে দিলেন তিনিও যদি শিরক করেন তবে তার আমল সমূহ নষ্ট হয়ে যাবে। অতএব ভাই শির্ক হল এমন এক বিষয় যা দুনিয়া ও আখেরাত বিনষ্ট করে দেয় আর শিকযুক্ত আমলের কোন মূল্য নেই কারণ শিরক করার কারণে জান্নাত হারাম হয়ে যায়।
“বস্তুত আল্লাহ্ সহিত অন্য কাহাকেও যে শরীক করিয়াছে আল্লাহ্ তাহার উপর জান্নাত হারাম করিয়া দিয়াছেন। আর তাহার পরিণতি হইবে জাহান্নাম। এই সব যালেমদের কেহই সাহায্যকারী নাই।” [আল-মায়েদা: ৭২]
শিরক করে তওবার মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন না করে কেউ যদি মারা যায় তবে তাকে কখনও আর জাহান্নাম থেকে উঠানো হবে না এবং পরিনাম তার জাহান্নাম আর জাহান্নাম। কোন দিন মাফ পাবে না। উলা-ইকা আছহা-বুন্নার, হুম ফীহা-খালিদুন "ওরাই দোযখবাসী, সেখানে তারা অবস্থান করিবে চিরকাল। (বাকারা ২৫৭)
শিরক কাকে বলে তা জানা আমাদের জন্য ফরজ। (কিভাবে শিরক হয় যদি না জানি তবে) শিরক থেকে বাচবো কিভাবে।
📄 শিরক
শির্ক অর্থ হচ্ছে অংশীদার স্থাপন করা। শরীয়তের পরিভাষায় শির্ক হলো যে সব গুণাবলী কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট, সে সব গুণে অন্য কাউকে গুণান্বিত ভাবা বা এতে অন্য কারোর অংশ আছে মনে করা। আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন জঘন্য অপরাধ। যে ব্যক্তি ইবাদতের ক্ষেত্রে বা আল্লাহর গুণাবলী ও ক্ষমতার সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে সে ব্যক্তি মুশরিক বলে গণ্য হবে। এমন ব্যক্তির অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য এবং তার কোন প্রকার সৎকর্মই গ্রহনযোগ্য হবে না। এ কারণেই রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু' আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোরভাবে হুশিয়ার করে বলেছেন, "সাবধান! আলাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে এজন্য কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয।” (ইবনু মাজাহ)
অংশীদার স্থাপন কখন প্রয়োজন হয় : অংশীদার স্থাপন করা তখনই প্রয়োজন হয় যখন কারো মাঝে কোন কিছুর অপূর্ণতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, কেউ ব্যবসায়ে কাউকে পার্টনার বা অংশীদার করতে চাইলে এ জন্যই করে যে, হয়তো তার কাছে টাকা আছে কিন্তু দক্ষতা নেই বা দক্ষতা আছে কিন্তু টাকা নেই বা টাকা ও দক্ষতা উভয়ই আছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কম বিধায় সে ব্যবসা করতে সক্ষম নয় ইত্যাদি। এক কথায় সে নিজের মধ্যে কোন অপূর্ণতা লক্ষ্য করেছে যা পূর্ণ করার জন্য তার অংশীদার প্রয়োজন হয়ে দাড়ায়। আল্লাহ কি অপূর্ণাঙ্গ (নাউযুবিলাহ)? এর উপযুক্ত জবাব স্বয়ং আলাহ তায়ালাই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।
"আল্লাহই সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনিই সব কিছু রক্ষণাবেক্ষণ করেন।" (আয যুমার: ৬২)
"যখন তিনি কোন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু এতটুকুই বলেন যে, হও, আর অমনিতেই তা হয়ে থাকে।" (আল বাকারা: ১১৭)
"তাঁর ক্রিয়াকলাপের কৈফিয়ত কাউকে দিতে হয় না।” (সূরা আম্বিয়া)
"তিনি রাজত্ব করেছেন, তাঁর সিদ্ধান্তসমূহ বিবেচনা করার কেউ নেই" (রাদ: ৪১)
শিরক কেন এত ভয়াবহ : শিরক হচ্ছে মূলত আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদারিত্বের আকীদা পোষণ করা। শিরকের মাধ্যমে আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করা হয়। এ কারণেই শিরক জঘন্যতম অপরাধ। কিছু বিষয় আছে যা কিনা আপনি নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারে শরীক করা পছন্দ করবেন না। আপনার স্ত্রী যদি বলে "তুমিও আমার স্বামী এবং সেও (অপর কোন লোককে)" তবে আপনার কি অবস্থা হবে একটু চিন্তা করুন। আমরা নিজের জন্য জীবনে অনেক বিষয়ে শরীক করা সহ্য করি না অথচ আল্লাহ তায়ালা যে সকল বিষয়কে নিজের জন্য খাস করেছেন যেমন আইন দেয়া, হালাল হারামের বিধান দেয়া, কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক বিচার ফায়সালা করা, আল্লাহর নাজিল করা আইন দিয়ে দেশ রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত করা ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহর সাথে আমরা মানুষের তৈরি করা আইন, সংবিধান ও সংসদকে মেনে নিয়ে শরিক করছি।
অন্যান্য কবিরাগুনাহে আল্লাহর সাথে শরীক করা হয় না। সেখানে হয় আদেশ লংঘন। এ ধরনের একজন অপরাধী শয়তানের প্ররোচনায় এবং নাফসের তাড়নায় আল্লাহর কোন নিষেধকে যখন লংঘন করে তখনো সে আল্লাহর নিরঙ্কুশ প্রভুত্বের বিশ্বাস পোষণ করতে পারে। কিন্তু যে শিরক করে সে কখনো নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী হতে পারে না। যদি তাই হতো তাহলে সে শিরক করতে পারতনা। শিরক ও অন্যান্য গুনাহের মধ্যে এটাই মৌলিক পার্থক্য।
আরেকটি পার্থক্য হল অপরাপর কবিরাগুনাহে গুনাহগারের মনে অপরাধবোধ থাকে। এ অপরাধবোধ এক সময় তাকে অনুতপ্ত করে তোলে, ফলে সে তাওবা করে। সকল ধরনের কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রেই এ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু শিরকের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা নেই। যে শিরক করে তার মধ্যেতো অপরাধ বোধ সৃষ্টি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। সেতো শিরক করে থাকে নেক বোধ (!) নিয়ে। তার বিশ্বাস সে যা করছে তাতে তার দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ হবে। যে মদপানকরে সে জানে যে সে মদ পান করে। যে ব্যাভিচার করে সে জানে সে ব্যাভিচার করে। যে মিথ্যা বলে সে জানে যে সে মিথ্যা বলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে শিরক করছে, সে জানেনা যে সে শিরক করছে। ফলে তার মধ্যে কখনো পাপবোধ সৃষ্টি হয় না। কখনো সে মনে করে না যে সে এমন একটি কাজ করে যাচ্ছে যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট। তার ধারণা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শিরককারীরা তাওবা করার সুযোগ পায় না। আর এ অবস্থায় তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
ইসলাম গ্রহণ করার পর কোন শিরককারীর 'আমল আল্লাহ কবুল করবেন না। (সিলসিলাতুল আহাদীসুস সহীহা-৬ষ্ট খন্ড ৮৪৮ পৃষ্টা)
রাসূল (সাঃ) এর সময় কুরাইশ বংশের কাফেররা মূলত আল্লাহর সাথে নানাবিধ শরিক নিয়ে মুশরিকে রূপান্তরিত হয়েছিল। অনেকেরই ভুল ধারণা আছে কুরাইশ কাফেররা বোধহয় আল্লাহ যে একজন 'রব' আছেন তা স্বীকার করতো না। এটা ভুল ধারণা। কুরাইশ কাফেররাও আল্লাহকে মানতো। তার সবচেয়ে বড় প্রমান তারা নাম রাখত আবদুল্লাহ্ অর্থাৎ আল্লাহর দাস "SLAVE OF ALLAH'। আল্লাহ আছেন এ কথা না মানলে কেউ আল্লাহর দাস নাম রাখতে পারে না। এছাড়াও কুরআনে পাকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রাসূল (সাঃ) কে বলেছেন কুরাইশ কাফেরদেরকে জিজ্ঞাসা করতে।
"আপনি জিজ্ঞেস করুন, আসমান ও যমীন থেকে তোমাদেরকে কে রিযিক দান করেন, কিংবা তোমাদের কান ও চোখের মালিক কে? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভিতর থেকে বের করেন, আবার কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থা করেন, তখন তারা বলে উঠবে, 'আল্লাহ্'। তখন আপনি বলুনঃ তারপরও তোমরা তাঁকে ভয় করছোনা কেন?" (ইউনুছ: ৩১)
অর্থাৎ তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করতো এবং আল্লাহর মূল গুণাবলীকে স্বীকার করতো। কিন্তু আল্লাহ্ তাদেরকে কাফের বলেছেন। কারণ তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করতো এবং সাথে সাথে আল্লাহর সাথে শরিক সাব্যস্ত করতো। তাই এদের অপর নাম মুশ্রিক।
বিধর্মী মুশরিকরা বিভিন্নভাবে আল্লাহর তা'আলার সাথে অংশীস্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে হিন্দুদের শিরকের ধরন এতই আশ্চর্য যে, তারা একটি দু'টি নয়, তেত্তিশ কোটি দেবতা গ্রহণ করেছে। আল্লাহর সৃষ্টি পাথর, গাছপালা, গরু-বাছুরকেও তারা মহান প্রতিপালকের সাথে আসনে বসাতে দ্বিধাবোধ করেনি। অপরদিকে বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরাও গৌতম বুদ্ধের মূর্তিকে রূপক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। ইহুদী ও খৃষ্টানদের শিরকের ধরন পূর্বে আলোচনা করেছি। এভাবেই কাফির মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলার সাথে একের পর এক অংশীদার স্থাপন করে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং আল্লাহর একত্ববাদের কথা জেনেও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।
মুসলমান কিভাবে মুশরিক হয়: অন্যান্য জাতি যেমন শিরকের কারণে মুশরিক হয়েছে তেমনি কোন মুসলমান শিরক করলে সেও মুশরিক বলে গণ্য হবে। শিরকের কারণে মুসলমানদের মুশরিক হবার কথা আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন-
"অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে বটে কিন্তু সাথে সাথে তারা মুশরিকও।” (ইউসুফ: ১০৬)
এর দ্বারা বুঝা গেল, মুসলমানদের দ্বারাও শিরক সংঘঠিত হচ্ছে। তবে অমুসলিমদের মত কাউকে আল্লাহর পুত্র বা স্ত্রী সাব্যস্ত করে নয় বরং ভিন্ন কায়দায়। যেমন- (ক) কবর পূজা, মাজার পূজা, পীর পূজা এবং তাদের নামে মানৎ যবেহ। (খ) মানুষের আইন রচনার অধিকার আছে বলে স্বীকার করা ও মানুষের তৈরী আইন মেনে নেয়া। (গ) জনসাধারাণকে সকল ক্ষমতার উৎস বলে আখ্যায়িত করা। (ঘ) মূর্তি-ভাস্কর্য তৈরি করা, আগুনকে সম্মান দেখানো। (ঙ) তাবিজ ব্যবহার করা, তাবিজকে বিপদের রক্ষাকারী মনে করা। (চ) কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আক্বীদা পোষণ করা। (ছ) মানুষ বা জীনকে গায়েব জানে বলে মনে করা। (জ) কাউকে পৃথিবীতে যা ইচ্ছে করার অধিকারী ভাবা। (ঝ) আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত আইন বাদ দিয়ে মানুষের দ্বারা রচিত আইনে বিচার করা এবং মানুষের তৈরিকৃত আইনের কাছে বিচার ফায়সালা চাওয়া।
📄 মুরতাদ কাকে বলে
"তোমাদের মধ্যে যে সব লোক নিজের দীন থেকে সরে যাবে আর দীনত্যাগী অবস্থায় মারা যাবে, দুনিয়ায় ও আখিরাতে তাদের সব নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। তারা জাহান্নামবাসী এবং সেখানেই তারা চিরকাল থাকবে।" (আল-বাকারা: ২১৭)
"নিশ্চয় যারা ঈমান আনলো, অতঃপর কুফরী করল, পুনরায় ঈমান গ্রহণ করল, পুনরায় আবার কুফরী করল, অতঃপর কুফরী আক্বীদা বিশ্বাস ও কর্মকান্ড বাড়তেই থাকলো। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই ক্ষমা করবেন না এবং কখনো তাদেরকে হিদায়াতের পথ দেখাবেন না।” (আন-নিসা: ১৩৭)
"নিশ্চয় আল্লাহ তা'য়ালা সেই বান্দার তাওবাহ কবুল করেন না, যে ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী প্রকাশ করে। (আহমাদ, সনদ সহীহ)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু' আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অন্ধকার রাতের মত ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হলে (কুফরী করে) বিকেলে কাফির হয়ে যাবে। বিকেলে মু'মিন হলে সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দীন বিক্রি করে বসবে। (মুসলিম কিতাবুল ঈমান)
উল্লেখিত আয়াতে কারীমা ও হাদীস দ্বারা প্রমাণ হলো যে, মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়। আবার মুসলমান হবার পর কুফরী করলে সে কাফির হয়ে যায়। যে ব্যক্তি তার দীন ও ঈমানকে প্রত্যাহার করে কাফির হয় শরীয়তের পরিভাষায় তাকেই মুরতাদ বলা হয়।
ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত, অপরিহার্যভাবে মেনে চলার জন্য নির্ধারিত এক বা একাধিক বিষয়কে অস্বীকার করলে মুসলমান মুরতাদ হয়ে যায়। যে মুসলিম ব্যক্তি ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক অপরিহার্যরূপে মেনে চলার জন্য নির্ধারিত কোন একটি বিষয়কে অস্বীকার করলো বস্তুত সে আল্লাহর কিতাবের অংশ বিশেষের প্রতি ঈমান আনলো আর অস্বীকার করলো অংশ বিশেষকে এমতাবস্থায় সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত বলেই গন্য হবে। অর্থাৎ সে মুরতাদ হয়ে যাবে।
মুসলিমদের এবং খারেজীদের আকীদার পার্থক্য
আমাদের আক্বিদার একটি বিষয় জানা সকলের জন্য অত্যন্ত জরুরী। আর তা হল, যে কোন মুসলিম ব্যক্তি শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে গুনাহ এমন কি কবীরা গুনাহ সমূহ করতে পারে। কিন্তু তাই বলে সে কাফির বা মুরতাদ হয়ে যায় না। এটা খারিজিদের আকীদা যে কেউ কবীরা গুনাহ করলে কাফের হয়ে যায়। একটি আয়াতের উদাহরণ দিলে ইনশাআল্লাহ ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।
“(হে বিশ্বাসীগণ) আর যে জন্তু আল্লাহর নামে যবেহ করা হয় নাই তাহার গোশত খাইওনা। তাহা খাওয়া ফাসেকী (একটি গুনাহ এবং আলাহর অবাধ্যতা) কাজ। শয়তানেরা নিজেদের সংগী-সাথীদের (মানুষের মাঝে) মনে নানা প্রকার সন্দেহ ও প্রশ্নাবলীর উন্মেষ করে, যেন তাহারা তোমাদের সাথে ঝগড়া করতে পারে। কিন্তু তোমরা যদি তাদের আনুগত্য স্বীকার কর [by making AI-MAITAH (a dead animal) legal by eating] তবে নিশ্চয়ই তোমরা মুশরেক।" (আল-আনআম: ১২১)
উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে দেখতে পাই, হারাম গোশত খাওয়ার একই অপরাধের জন্য একজনকে আল্লাহ তায়ালা গুনাহগার বলেছেন এবং অপরজনকে মুশরিক বলেছেন। তার অর্থ দাড়ায়, আল্লাহর হারাম করা কোন খাদ্যকে কেউ যদি হারাম জেনে এবং মেনে খায় তবে সে কবীরা গুনাহ করল। কিন্তু তার পরেও সে মুসলিম থাকে। এ অপরাধের জন্য জাহান্নামে আল্লাহর ইচ্ছামত শাস্তি ভোগ করতে হবে অথবা কেউ তওবা করলে আল্লাহ শাস্তি নাও দিতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর হারাম করা খাদ্যকে হারাম না মানে অর্থাৎ যদি সে নিজের নফসের ইচ্ছায় বা কারো কথায় এ আকিদা পোষণ করে যে, আল্লাহ হারাম করেছেতো কি হয়েছে আমি মনে করি হালাল তবে সে মুশরিক কাফেরে পরিণত হবে। উদাহরণ কেউ মদ পান করার সময় এই চিন্তা করে পান করল যে, আমি জানি মদ হারাম কিন্তু আমার পান করতে ইচ্ছে করছে তাই পান করছি তবে সে কবীরা গুনাহ করল। আবার আরেকটা লোক মদ পান করে না কিন্তু সে এই আকিদা পোষণ করে "আমি মদ খাওয়াকে হারাম মানিনা" তবে সুনিশ্চিত সে মুশরেক কাফের। এই ব্যক্তির মদকে হালাল বলার পিছে যদি নিজের নফস কাজ করে তবে নফস তার ইলাহতে পরিণত হবে। আর যদি কোন ব্যক্তি, নেতা, পন্ডিত, আলেমের কথায় যদি আল্লাহর হারাম করা যে কোন কিছুকে হালাল মনে করে কিংবা আল্লাহর হালাল করা কোন কিছুকে হারাম মনে করে তবে যার কথাকে সে আল্লাহর হুকুমের উপরে স্থান দিল সে ব্যক্তি, পন্ডিত, নেতা বা আলেম তার ইলাহতে পরিণত হবে আল্লাহর জায়গায়। অতএব সে আল্লাহর সাথে শরিক স্থাপন করে মুশরিকে পরিণত হবে। তবে এ উদাহরণ শিরকের ক্ষেত্রে ভিন্ন। অর্থাৎ কেউ যদি আল্লাহর সাথে শরিক হয় এমন যে কোন কাজ শিরক জেনে ও মেনে করল তবে সে সাথে সাথে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুশরিকে পরিণত হবে। অর্থাৎ শিরক এমন একটি গুনাহ যা কিনা জেনে করলেও যা, না জেনে করলেও একই অপরাধ। আর আল্লাহ তায়ালা শিরকের অপরাধ তওবা করে বিরত না হয়ে মারা গেলে কোন দিন ক্ষমা করবেন না। যেমন ধরুন, আপনি যে কোন অপরিচিত পরিবেশে বা ভিন্ন দেশে গেলেন। সেখানে আপনার দ্বারা কোন ব্যক্তি খুন হয়ে গেল। যদি আপনি তখন সেখানকার আদালতে বলেন, মানুষ খুন করা অপরাধ আপনি জানতেন না; তবে কি তারা আপনার দ্বারা সংঘটিত খুনের এ অপরাধ ক্ষমা করে দেবে? কখনও নয়, কারণ খুন করা যে অপরাধ আপনি সেদেশে যেয়ে নিজের প্রয়োজনে জেনে নিতে হবে। ঠিক তেমনি আল্লাহ তায়ালার দুনিয়াতে এসেছেন। এখানে আল্লাহ তায়ালার রুবুবিয়্যাতের সাথে (রব হিসেবে যে সকল বৈশিষ্ট শুধুমাত্র উনার একার) শিরক করার অপরাধ কোনদিনও ক্ষমা করা হবে না বলে আল্লাহ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছেন। অতএব নিজের প্রয়োজনে শিরক সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করা এবং শিরক থেকে বেচে থাকা আপনার আমার প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব।
ভ্রান্ত মুর্জিয়া আকিদার লোকেরা মনে করে শিরক না জেনে বা জেনে করেও একজন মুসলিম ইসলামে থাকে। তারা শিরকের অপরাধের সাথে অন্যান্য কবিরাগুনাহ সমূহ মিশ্রিত করে ফেলেছে এ উপমহাদেশে এ ভ্রান্ত আকিদা খুবই প্রচলিত। তাই মানুষ কবিরা গুনাহ করলে তা খুবই খারাপ নজরে দেখা হয় কিন্তু শিরক করলেও তার বিরুদ্ধে কোন সতর্কতা ও প্রতিবাদ নেই বললেই চলে। উদাহরণ কোন ব্যক্তি জানে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। আইন দানের ক্ষমতা একমাত্র আলাহর। এটা জেনে এবং মেনেও নিজে আইন রচনা করল কিংবা যে সকল ব্যক্তিবর্গ আইন রচনা করল তাদেরকে এবং তাদের তৈরি করা আইনকে মানল। মানুষের তৈরি করা আইনের কাছে বিচার ফায়সালা চাওয়া শিরকে আকবর জেনেও কুফর আদালতে বিচার ফায়সালার জন্য গেল, তবে সে মুশরিকে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে আল্লাহ আইন দাতা অন্তরে এ বিশ্বাস তার কাফের হওয়াকে আটকাতে পারবে না। কারণ আমরা জানি ঈমান তিনটি বিষয়ের সাথে সংযুক্ত। (১) অন্তরের বিশ্বাস (২) মুখের স্বীকৃতি এবং (৩) নেক আমল।
১) অন্তরের বিশ্বাস: এটা ঈমানের মূল বিষয়। কারণ কোন ব্যক্তি যদি মুখে কালেমার ঘোষণা দেয় এবং আমলে আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করে কিন্তু অন্তরে আল্লাহ এবং রাসূলকে অপছন্দ করে বা অস্বীকার করে কিংবা আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) যে শরীয়ত দিয়েছে তা মানতে অসন্তুষ্ট তবে সেই লোক মুনাফিক এবং তার স্থান হবে চিরকালের জন্য জাহান্নামের সর্বনিস্তরে অর্থাৎ জাহান্নামে কাফেরদেরও নীচে।
২) মুখের স্বীকৃতি: কার অন্তরে কি আছে তা আমরা খোজ করতে যেতে পারি না। অন্তরের খবর আল্লাহ জানেন। আমরা কোন মানুষকে মুসলিম কিনা যাচাই করবো তার মুখের ঘোষণা এবং নেক আমলের দ্বারা। মুখের ঘোষণা এবং আমল বা কাজ যদি শরীয়ত মুতাবেক হয় তবে কাউকে সন্দেহ করে মুনাফিক ডাকতে নিষেধ করেছেন রাসূল (সাঃ)। কিন্তু কেউ যদি কোন জবরদস্তি ছাড়া নিজের ইচ্ছায় মুখে কুফর ঘোষণা দেয় আর বলে আমার অন্তর ঠিক আছে তবে অবশ্যই তাকে আমাদেরকে কাফের বিবেচনা করতে হবে। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা সূরা তওবাতে উল্লেখ করেছেন।
"বল, তোমাদের হাসি-তামাসা ও মন-মাতানো কথাবার্তা কি আল্লাহ্, তাঁর আয়াত এবং তাঁর রসূলের ব্যাপারেই ছিল? এখন টাল-বাহানা করিও না। তোমরা ঈমান গ্রহণের পর কুফরী করেছ..." (আত-তওবাহ: ৬৫-৬৬)।
"তারা অবশ্যই কুফরী কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী করেছে।" (আত-তাওবাহ: ৭৪)
এখানে আল্লাহ এবং তার রাসূল (সাঃ) কে নিয়ে হাসি ঠাট্টা কথা বার্তা বলার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে কাফের ঘোষণা দিয়েছেন।
৩। আমল বা আল্লাহর হুকুমসমূহ কাজে পরিণত করা: কেউ যদি মুখে ঘোষণা দেয় এবং বলে অন্তর ঠিক আছে কিন্তু আমল করে না সেক্ষেত্রে কি হবে তা জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী। পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পেরেছি কাফেররা ও ইবলিশ আল্লাহকে রব মানে কিন্তু আল্লাহকে রব মানলেই কেউ মুসলিম হয় না যতক্ষণ না আল্লাহকে ইলাহ মানা হয়। অর্থাৎ ইলাহ তিনিই শুধুমাত্র যার হুকুমের অনুসরণ (ইবাদত) করা হয়। তাই আলাহ তায়ালা মুসলিম হওয়ার জন্য কালেমার "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ঘোষণা দিতে বলেছেন তাতে প্রথমেই বলেছেন কোন ইলাহ নাই আল্লাহ ছাড়া। অর্থাৎ আমাদের আমল হবে শুধুমাত্র আল্লাহর হুকুমের মোতাবেক আর কারও হুকুম অনুসরণ করা যাবে না উনার হুকুমের বদলে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, ইসলাম শুরুই হয় মুখের ঘোষণা আর ঘোষণাকে আমলে পরিণত করার মাধ্যমে। যেমন ধরুন কোন মুসলিম ব্যক্তি কালেমাহ শাহাদাতাইন ঘোষণা দেয়ার পরে যদি নামায না পড়ে এবং যাকাত না দেয় অর্থাৎ মুখে নামায ও যাকাত স্বীকার করার পরও যদি আমলে পরিণত না করে তবে বেশীর ভাগ আলেমরা একমত ঐ ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায়। ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রে তাকে এক থেকে তিনদিন সময় দিয়ে তওবা করার সুযোগ দেয়া হয়। যদি সে তওবার মাধ্যমে নামায পড়া এবং যাকাত দেয়া শুরু না করে তবে তাকে মেরে ফেলতে হবে। কিন্তু কেউ যদি রোযা না রাখে কিংবা সামর্থ হওয়ার পরও হজ্জে না যায় তবে তাকে বড় গুনাহগার হিসাবে চিহ্নিত করা যায় কিন্তু কাফের কিংবা মুরতাদ বলা যাবে না (বিস্তারিত জানার জন্য সূরা তওবা -৫ তাফসীর দেখুন)। আবার কোন ব্যক্তি জিহাদ ফরজে আইন হওয়ার পরও জিহাদে অংশগ্রহণ না করলে মুনাফেকে পরিণত হয়। উদাহরণ স্বরূপঃ
(ক) নামায অস্বীকারকারী আর নামায অস্বীকৃতি সম্পর্কে ইসলামী আইন বেত্তাগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো "যে ব্যক্তি নামাযের অপরিহার্যতায় অস্বীকার প্রসূত নামায বর্জন করলো সে মুরতাদ"।
(খ) যাকাত অস্বীকারকারী- যাদেরকে স্বীয় খিলাফতকালে আবু বাকার সিদ্দীক (রাঃ) মুরতাদ ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। "কেন তিনি এ রকম ফায়সালা নিলেন যাকাত বাইতুল মালে দিতে অস্বীকারীদের বিরুদ্ধে (কারন তারা কালেমার ঘোষণা দেয় এবং সালাত আদায় করে)" এ প্রশ্ন ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেসা করলে আবু বকর (রাঃ) সূরার তওবার নিগেক্ত আয়াত দলিল হিসেবে পেশ করেন
"অতএব, হারাম মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে গেলে মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো এবং তাদের ধরো, ঘেরাও করো এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাকো। তারপর যদি তারা তাওবা করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাহলে তাদের ছেড়ে দাও। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়" (সূরা তাওবাহ : ০৫)
অতএব কেউ অন্তরে বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে যদি মুখে কিংবা কাজে কুফরীর পথ অবলম্বন করে তবে অবশ্যই সে ইসলামের গন্ডির বাইরে চলে যাবে এবং সেই অবস্থায় তার মৃত্যু হলে কাফের মুশরিকের মৃত্যু হবে। তবে কাউকে জোর করে অত্যাচার করতে করতে মৃত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তখন তার মুখ থেকে অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত কোন কুফর কথা বা কাজ বের করা হয় যা কিনা রাসূল (সাঃ) এর সাহাবী আম্মার ইবনে ইয়াসীর (রাঃ) এর সাথে করা হয়েছিল তবে আশা করা যায় তাকে আল্লাহ মাফ করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রেও কেউ যদি শিরক কুফর বলার চেয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নেন তবে তার তাকওয়ার মান অবশ্যই অত্যন্ত মজবুত ও উচ্চ শিখরে অবস্থিত। [বিঃ দ্রঃ হাদীসে যদি কোন কাজকে কুফর বলা হয় তবে সেই কাজটি সর্বোচ্চ কুফর (আল কুফর যেই কুফর কাজ দ্বারা মুসলিম ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়) নাও হতে পারে অর্থাৎ সেই কুফরী কাজটার মাধ্যমে একজন মুসলিম কাফের নাও হতে পারে। শুধুমাত্র তার ঐ কাজটা কুফর যা কিনা কবীরা গুনাহ। যেমন হাদীসে এসেছে যখন কোন মুসলিম মদ খাওয়া যেনা করা ইত্যাদি কুফর কাজসমূহ করে তখন তার ঈমান থাকে না। কিন্তু পূর্বে সূরা আল-আনাম ১২১ আয়াতের আলোচনা থেকে জেনেছি এ কুফর কর্মগুলি দ্বারা একজন মুসলিম কাফেরে পরিণত হয় না। (খারেজীদের আকীদা অনুযায়ী উক্ত কবীরা গুনাহ সমূহের কারণে মুসলিম কাফের হয়)। অর্থাৎ হাদীসে উল্লেখিত ঐ সকল কবীরা গোনাহ বা কুফর কর্ম দ্বারা একজন মুসলিম কাফের এ পরিণত হয় না। কিন্তু কোরআনে যে সকল কথা বা কাজকে কুফর বলা হয়েছে তা হল সর্বোচ্চ কুফর যার দ্বারা একজন মুসলিম কাফের এ পরিণত হয়।]
'যিন্দীক' যে ব্যক্তি স্বীয় কুফরীর উপর ইসলামের লেবেল এঁটে দেয় বা ইসলামের সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয় এবং নিজের কুফরীটাকেই সঠিক ইসলাম বলে প্রমাণ করার চেষ্টা চালায় এবং মুসলিম জনগণকে বিভ্রান্ত করে ইসলাম থেকে বের করে জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। মুরতাদের ব্যপারে তো শরীয়তের ফায়সালা যে, তাকে তওবার কথা বলা হবে। যদি সে তওবা করে নেয়, তা হলে শাস্তি থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু যিন্দীকের ব্যাপারে ইমাম মালেক (রহ) বলেন যে, তাকে তওবার সুযোগ দেওয়া হবে না। কেননা, সে 'যানাদাক্বাহ্' অর্থাৎ কুফরীকে ইসলামরূপে প্রমাণিত করার অপচেষ্টা করছে; যা ক্ষমারঅযোগ্য অপরাধ। এরূপ ব্যক্তি শুকরের গোশুকে খাসীর গোস্ত বলে মুসলিম জনগণের মাঝে বিক্রয় করেছে, মদের উপর পবিত্র যমযমের লেবেল এঁটে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তাই এমন জঘন্য অপরাধ ক্ষমা করা যায় না। বর্তমান সময়ে যিন্দীকের উদাহরণ হল ভন্ড নবীর দাবীদার মীর্জা গোলাম আহমদের অনুসারী কাদিয়ানীরা, আশেকে রাসূল (সাঃ)-এর দাবীদার সুফী পন্থী দেওয়ানবাগী ইত্যাদি। এরা শুধু মুরতাদই নয় বরং যিন্দীকও।
📄 তাগুত
তাগুত আরবী طغیان (তুগইয়ান) শব্দ থেকে উৎসরিত। যার অর্থ সীমালংঘন করা। এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই "তাগুত" যে, আল্লাহদ্রোহী হয়েছে এবং সীমালংঘন করেছে, আর আমাদের একমাত্র রব হিসাবে আল্লাহ তায়ালার যে সকল রুবুবিয়াত বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার যে কোন একটিকে নিজে পারে বলে দাবী করে কিংবা নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছে এবং এমন বিষয়ে নিজেকে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ বানিয়েছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস। অর্থাৎ তাগুত হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে নিজেকে আল্লাহর সাথে শরীক করে আর মুশরেক হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে নিজেকে আল্লাহ তায়ালার সাথে শরীক করে না ঠিকই কিন্তু সে তাগুতকে আল্লাহ তায়ালার (যে কোন একটি কাজের বা বৈশিষ্টের) সাথে শরীক করে।
সুষ্পষ্ট ভাবে তাগুতের অর্থ হচ্ছে, কোনো মাখলুক (আল্লাহ তায়ার সৃষ্টি) কর্তৃক নিয়োক্ত তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি বিষয়কে (আল্লাহর স্থলে) নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা:
এক : রব হিসেবে যেই কাজগুলি একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালা সম্পন্ন করেন, আল্লাহর যে কোন সৃষ্ট জীব বা মানুষ যদি দাবী করে যে, সেই কাজ সমূহের যে কোন একটি সে নিজে করতে সক্ষম। যেমন- সৃষ্টি করা, রিজিক দান করা অথবা শরীয়ত (বিধান বা আইন) রচনা করা। অর্থাৎ কেউ যদি বলে, আমি সৃষ্টি করি আমি রিজিক দান করি, আমি বিধান রচনা করি সেই "তাগুত”।
দুই : আল্লাহর যে কোন সৃষ্ট জীব-মানুষ কতৃক আল্লাহ্ তায়ালার কোনো সিফাত (বা গুণ) কে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা। যেমন এলমে গায়েব জানা। যদি কেউ তা করে (অর্থাৎ বলে আমি এলমে গায়েব বা ভবিষ্যতে কি হবে জানি) তাহলে সে তাগুতে পরিণত হবে।
তিন : যে কোন ইবাদত মাখলুক বা বান্দা কর্তৃক অন্য কোন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা। যেমনঃ দোয়া, মান্নত, নৈকট্য লাভের জন্য পশু জবাই, অথবা বিচার ফয়সালা চাওয়া। যদি (কোনো মাখলুক) এসব ইবাদত (নিজের জন্য) স্বীকার করে নেয় বা মেনে নেয় অর্থাৎ কোন মানুষ তার উদ্দেশ্যে সেজদা করল, তার উদ্দেশ্যে মান্নত করল, পশু জবাই করল, তার উদ্দেশ্যে বিপদ মুক্তির জন্য কিংবা যে কোন কিছু পাওয়ার আশায় দোয়া করল এবং সে (উক্ত মাখলুক) এ সকল বিষয় নিজের জন্য মেনে নিল, তাহলে সেই তাগুত। ব্যক্তির নীরবতা বা ইবাদত গ্রহনে অস্বীকার না করাও স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে যদি না সে এ অবস্থা থেকে নিজেকে পবিত্র অথবা মুক্ত করে নেয়। অর্থাৎ যদি সে এ কথা না বলে যে এ অধিকারগুলি আল্লাহর জন্য খাস। এগুলি তোমরা আমাকে উদ্দশ্যে করে করতে পার না। যেমন ঈসা (আঃ) কে খৃষ্টানরা 'গড' এর পুত্র বলে সাব্যস্ত করে (নাউযুবিল্লাহ) উনার ইবাদত করে। কিন্তু ঈসা (আঃ) শেষ বিচারের দিনে এ ভ্রান্ত আকিদা কে অস্বীকার করবেন। কুরআনে এ বিষয়ে এরশাদ হচ্ছে-
"আল্লাহ তায়ালা যখন বলবেন, হে ঈসা ইবনে মরিয়াম, তুমি কি লোকদেরকে বলে দিয়েছিলে যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা আমাকে ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত করো? ঈসা বলবেন আপনি পবিত্র। (নবী বললেন) আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের খোজ খবর নিয়েছি। তারপরে যখন আমাকে দুনিয়া থেকে তুলে নিলেন, তখন আপনি (আল্লাহ) তাদের খোঁজ খবর রেখেছেন। আপনিই সব কিছুরই খবর রাখেন।” (সূরা আল মায়িদা: ১১৭)
অতএব ঈসা (আঃ) তাগুত হওয়ার পরিণতি থেকে বেচে গেলেন।
উপরোক্ত যে তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি বিষয়কে যদি কেউ নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে তাহলে সে তাগুত হিসেবে গণ্য হলো এবং নিজেকে আল্লাহর সমতুল্য বলে সাব্যস্ত করে নিলো।
ইমাম মালেক (রহঃ) তাগুতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ এমন প্রতিটি জিনিসকেই তাগুত বলা হয়, আল্লাহ্ তায়ালাকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়। আল্লাহ্ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয়, এমন সব কিছুই এ সংজ্ঞার অন্ত র্ভুক্ত। যে সব মাবুদ (উপাস্য) কে তাগুত হিসেবে গণ্য করা হয় সে গুলোর মধ্যে রয়েছে মূর্তি, এমন সব কবর, গাছ, পাথর ও অচেতন পদার্থ যেগুলোর উপাসনা করা হয়। আল্লাহর আইন বতীত এমন সব আইন যার মাধ্যমে বিচার-ফয়সালা চাওয়া হয়। এমন সব বিচারক তাগুতের অন্তর্ভূক্ত যারা আল্লাহর আইনের বিরোধী আইন দ্বারা মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে। শয়তান, যাদুকর, গণক (যারা এলমে গায়েবের বিষয় কথা বলে), উপাস্য হতে যারা রাজী, যারা নিজেদেরকে কোনো কিছু হালাল, হারাম করা ও আইন রচনা করার অধিকার রাখে বলে মনে করে, তারা সবাই তাগুত। তাদেরকে অস্বীকার করা ওয়াযিব, তাদের কাছ থেকে এবং তাদেরকে যারা উপাসনা করে উভয়ের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা অত্যাবশ্যক।
মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী তাফহীমুল কুরআনে সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতের তাফসীরে তাগুত সম্পর্কে বলেনঃ আভিধানিক অর্থে এমন প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে 'তাগুত' বলা হবে, যে নিজের বৈধ অধিকারের সীমানা লংঘন করেছে। কুরআনের পরিভাষায় তাগুত এমন এক বান্দাকে বলা হয়, যে বন্দেগী ও দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে নিজেই প্রভু ও খোদা হবার দাবীদার সাজে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের বন্দেগী ও দাসত্বে নিযুক্ত করে। কোন ব্যক্তি এই তাগুতকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত কোন দিন সঠিক অর্থে আল্লাহর মু'মিন বান্দা হতে পারে না।
যারা আল্লাহর আইন মানে না তারা কাফের। আর যারা আল্লাহর আইন না মানার জন্যে অন্যদেরকে বাধ্য করে তাদেরকে বলা হয় তাগুত। যারা সাধারণ মানুষ তারা কাফের হতে পারে, তাগুত হতে পারে না। কিন্তু যারা রাজ ক্ষমতায় থাকে তারা কাফের এবং তাগুত দুই-ই হতে পারে। নিজে আইন অমান্য করা এটা তো নিঃসন্দেহে কুফরী কিন্তু যারা আইন করে আল্লাহ্ আইনকে অমান্য করায়, তারা প্রকৃতপক্ষে খোদার খোদায়ী নিয়ে টানা-টানি করে। কারণ যে ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর সেই ক্ষমতা তারা ব্যবহার করতে চায়। আমরা বহু তাগুতি আইনকে খুব হালকা নজরে দেখি। কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা হালকা নজরে দেখেন না। যেমন আমরা মনে করি চুরির শাস্তি স্বরূপ হাত কাটার পরিবর্তে জেল দিলে এমনকি গুরুত্ব অপরাধ হয়। চোরের শাস্তি দেয়াই হল। কিন্তু আসল ব্যাপারটা দাঁড়ায় ভিন্নরূপ, যা মানুষ চিন্তা করে না। তা হচ্ছে এই যে, চোরের হাত কাটা আইন হচ্ছে আল্লাহর তৈরী ফৌজদারী আইন। সেটাকে বাতিল করে অন্য আইন তৈরী করার অর্থই হল আইন করে আল্লাহর আইনকে বাতিল করা। আর সুদ মদের লাইসেন্স দেয়ার অর্থ হল আল্লাহর আইনকে অমান্য করার লাইসেন্স দেয়া। এসব কাজ যারা করে তারাই হচ্ছে তাগুত। তারা যে শুধু নিজেরাই আল্লাহর আইন অমান্য করে তাই নয়, বরং তারা আইন করে অন্যদেরকেও আল্লাহর আইন অমান্য করতে বাধ্য করে। আল্লাহর কথা অনুযায়ী বুঝা গেল, যারা এই তাগুতের আইন মানে তারা আল্লাহকে মানতে পারে না। হাঁ তবে এমন কিছু মুসলমান আছে যারা আল্লাহকেও মানে তাগুতদেরকেও মানে। তারা মনে করে যে তারা ঠিকই করছে, কিন্তু আসলে যে তারা আল্লাহর সাথে শরিক করে মুশরিকে পরিণত হচ্ছে যার ফলে তাদের আল্লাহকে মানা হয় না সেই বোধ তাদের নেই। তাদের কথা সূরা নিসার মধ্যে আল্লাহ্ এইভাবে বলেছেন,
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি নাযিল হয়েছে, আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতিও ঈমান এনেছি। তারা বিবাদ পূর্ণ বিষয়কে [মীমাংসার জন্য] তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়; অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা তাকে [তাগুতকে] মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করতে চায়।" (আন নিসাঃ ৬০)
এ আয়াত থেকে বুঝা গেল যারা তাগুতকে অস্বীকার না করে (বরং তাদের আইন মেনে নিয়েই) আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাবী করে তাদের ওটা শুধু দাবীই। প্রকৃতপক্ষে তাদের ঈমানের প্রতি আল্লাহর কোন স্বীকৃতি নেই। যদি থাকত তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে তারা মনে করে একথা বলতেন না। [ বিঃ দ্রঃ রব, মালিক ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহর পরিচয় খন্দকার আবুল খায়ের- খন্দকার প্রকাশনী।
ঈমান আনার শর্তই হল-তাগুতকে অস্বীকার বা কুফরী করা
“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই। প্রকৃত শুদ্ধ ও নির্ভুল কথাকে ভুল চিন্তাধারা হতে ছাঁটাই করে পৃথক করে রাখা হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল সে এমন এক শক্ত রজ্জু ধারণ করল, যা কখনই ছিঁড়ে যাবার নয় এবং আল্লাহ সবকিছু শ্রবণ করেন ও সবকিছু জানেন।” (আল-বাকারাহ: ২৫৬)
শেখ মুহাম্মদ আলী আল রিফায়ী উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ এ আয়াতে, আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে এমন সীরাতুল মুস্তাকিম বা সহজ-সরল পথের বিবরণ দিচ্ছেন যা আমাদেরকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। এই সহজ-সরল পথ হচ্ছে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' গ্রহণ করার আগে তাগুতের প্রতি কুফরী বা অবিশ্বাস করা। অন্য কথায় আপনি 'আমি আল্লাহতে বিশ্বাস করি' (ইল্লা আল্লাহ্) বলার আগে আপনাকে তাগুত প্রত্যাখ্যান বা অবিশ্বাস করতে হবে (লা ইলাহা)।
যদি কোন ব্যক্তি বলেন, 'লা ইলাহা ইলালাহ্' এবং তিনি তখনও তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেননি, তাহলে তিনি আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) উপরোক্ত আয়াতের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন যাতে তিনি (আল্লাহ) বলেছেন: "এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল সে এমন এক শক্ত রজ্জু ধারন করল, যাহা কখনই ছিঁড়ে যাবার নয়।" এই আয়াতে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) 'মাসাকা' শব্দের পরিবর্তে 'আসতামসাকা' শব্দ ব্যবহার করেছেন। আরবীতে মাসাকা অর্থ এক হাত দিয়ে বা এক হাতের মধ্যে কোনকিছু ধরা কিন্তু এই আয়াতে 'আসতামসাকা' প্রতীকীরূপে ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ হচ্ছে উভয় হাত দিয়ে ধরা অথবা উভয় হাত দিয়ে কোনকিছুকে খুবই মজবুতভাবে ধরা। এটাকে আরো সহজ করতে যদি আমরা বলি যে, আপনি আপনার ডান হাতে কোনকিছু ধরে আছেন তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় যে আপনার বাম হাত খালি এবং আপনি আপনার বাম হাতে অন্য কিছু ধরতে পারেন। এইভাবে যদি আমরা বলি যে কেউ এক হাতে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ধরে আছে এবং আরেক হাতে তাগুত ধরে আছে তাহলে তার বিশ্বাস (ঈমান) ঠিক নেই এবং তিনি ইসলামের গন্ডির বাইরে। এ কারণে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) উপরোক্ত আয়াতে 'আসতামসাকা' শব্দ ব্যবহার করে আমাদের কাছে এটা সুস্পষ্ট করেছেন যে, আমাদেরকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' আমাদের উভয় হাত দিয়ে ধরতে হবে এবং শুধুমাত্র এক হাতে নয়।
আমরা যারা অজ্ঞ মুসলিম তারা মনে করি নামায আর রোযাই শুধু এবাদত তাই আসল ঘটনা সম্পর্কে কোন জ্ঞানই নেই। কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে মানুষের লিখিত আমলের বই নিয়ে মসজিদে মসজিদে ঘরবাড়ি ছেড়ে গাট্টি বোঝা নিয়ে রাত কাটাই। মাওলানার ওয়াজ শুনে চোখের জলে দাড়ি ভিজাই। অথচ- শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, শাস্তি ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সব তাগুতের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। এত আমল করছি যে তাগুত কাকে বলে জানিই না আর তাগুতকে অস্বীকার করা তো দূরের কথা। অথচ তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করা ব্যতিত কেউ মুসলিম হতে পারে না। বিধান বা আইন দানের একমাত্র ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালার। এরশাদ হচ্ছেঃ
"আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান (দেয়ার ক্ষমতা) নেই।” (ইউসুফ : ৪০)
"তিনি তার রাজ্যশাসনে কাউকে শরীক করেন না।” (কাহাফ : ২৬)
"তোমাদের মাঝে যে ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয় তা ফয়সালা করা আলাহর কাজ"! (আশ-শুরা ৪ ১০)
"অতএব তোমরা আল্লাহর নাযিল করা আইন মোতাবেক লোকদের পারস্পরিক যাবতীয় ব্যাপারের ফয়সালা কর, আর যে মহান সত্য তোমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছে তা হতে বিরত থেকে তাদের খাহেশতের (ইচ্ছা-কামনার) অনুসরণ করো না।" (মায়েদা : ৪৮)
"ইহারা কি আল্লাহর এমন কিছু শরীক বানিয়ে নিয়েছে যারা এদের জন্য 'দ্বীন' ধরনের কোন নিয়ম-বিধান নিদিষ্ট করে দিয়েছে যার কোন অনুমতি আল্লাহ দেন নি? ফয়সালার সময় যদি পূর্ব হতেই নিদিষ্ট করে দেয়া না হোত, তা হলে এতদিন তাদের ব্যাপারটি চুড়ান্ত করে দেয়া হোত। নিশ্চিতই এই যালেমদের জন্য পীড়াদায়ক আযাব রয়েছে।” (আশ-শুরা ৪ ২১)
তাই আপনাদের অবগতির জন্য বলতে চাই যিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জের জন্য কোরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। তিনি আলাহই সুদ, জুয়া, মদ, হারাম করেছেন কুরআনের ওহীর মাধ্যমে। যা কিনা আমাদের জনগণের সার্বভৌম সংসদ হালাল করেছে- সুদী ব্যাংকের লাইসেন্স, লটারী হাউজীর অনুমতি এবং মদের দোকানের (বারের) লাইসেন্স দানের মাধ্যমে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কোরানের অহীর এবং রাসূলের (সাঃ) মাধ্যমে পাঁচ প্রকার অপরাধের ফৌজদারী শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যথাঃ
(১) আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামকে রক্ষা করার জন্য দ্বীন ত্যাগকারী এবং দ্বীন পরিবর্তনকারী মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। সহীহ হাদীস থেকে পাওয়া যায় মুরতাদকে এক থেকে তিন দিনের সময় দিতে হবে ইসলামের সহীহ আকিদায় ফেরত আসার জন্য। না হলে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে হবে। আমাদের জনগণের সার্বভৌম সংবিধান আল্লাহর এ আইনের কোন অস্তিত্ব নেই। তাই বেরেলভি (কবর পুজারী), কাদেয়ানী, শিয়া, সাইয়েদাবাদী, আটরশি, দেওয়ানবাগির মত আরো কয়েক হাজার মুরতাদ ও জিন্দীক আমাদের চারদিকে রোজই মাথা গজিয়ে উঠছে আর কোটি কোটি সরল প্রাণ আল্লাহর বান্দা মুসলিমদের শিরক কুফর ও বিদআতে লিপ্ত করে জাহান্নামের পথ ধরাচ্ছে। অথচ খোলাফায়ে রাশেদার সময় খলিফা আলী (রাঃ) বহু খারেজী এবং শিয়া মুরতাদকে হত্যা করে মুসলিমদেরকে ইসলামের সহীহ আকিদা হতে বের হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন।
(২) মানুষের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেসাসের শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।
একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের সাথে সমাজে চলার জন্য মুয়ামিলাত সংক্রান্ত নানা বিষয়ে সম্পৃক্ত হতে হয়। শয়তানের প্ররোচনায় এবং নাফসের তারনায় একে অপরের বিরুদ্ধে নানা প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, শত্রুতা, অঙ্গহানী, খুন যখমের সৃষ্টি হতে পারে। বান্দাদের পারস্পরিক বিবাদ মিটানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা কেসাসের বিধান নাযিল করেছেন। কিন্তু বর্তমানে আল্লাহর দেয়া কেসাসের বিধান উঠানোর পরিনাম কতটা ভয়াবহ হয়েছে তা কি একবার চিন্তা করেছেন। সমাজে চারিদিকে আজ ভয়াবহ করুন চিত্র। ধরুন কোন এক ব্যক্তি কর্তৃক দ্বিতীয় ব্যক্তি অনিচ্ছায় কিংবা সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে খুন হয়ে গেল তবে ইসলামের কেসাস মোতাবেক প্রথম ব্যক্তির বিচারের ফায়সালা কাজী (জর্জ) সাহেবকে দিতে হবে দ্বিতীয় ব্যক্তির পরিবারের সাথে আলোচনা করে তাদের আল্লাহর দেয়া অধিকারের উপর। অপরাধ প্রমাণিত হলে তারা খুনের বদলী খুনের ফায়সালা নিতে পারে কিংবা মুক্তিপণ (BLOOD MONEY) আদায় করে খুনী প্রথম ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়ার ফায়সালাও চাইতে পারে। এতে উভয় পরিবারই কিছুটা হলেও নিস্কৃতি পায়। কিন্তু বর্তমান তাগুতদের তৈরি করা আইনের পরিণতি আমাদের সামনে উপস্থিত। যে মারল সে এবং তার পরিবার তো ভুক্ত ভোগী হয়ই উপরন্ত যাদের পরিবারের সদস্য মারা গেল তারা পর্যন্ত পুলিশের দৌড়ের উপর থাকে। উভয় পরিবারের উপর যেন ভয়ানক আযাব নেমে আসে। আল্লাহ তায়ালা আইন নাযিল করেছেন সাধারণ মানুষের ইনসাফ, প্রশান্তি, উপকারের জন্য। কিন্তু মানুষের তৈরিকৃত আইনে উপকার পাচ্ছে- পুলিশ, উকিল, মেজিষ্ট্রেট ও জর্জ। কারণ এক নম্বর দুনিতীবাজ দেশের কিছুদিন আগে দেয়া রিপোর্টে দেখানো হয়েছে এদেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নিতীবাজ পুলিশ ও নি আদালত। (দৈনিক ইত্তেফাক রিপোর্ট)
(৩) মানুষের আল ইলম (জ্ঞানকে) রক্ষা করার জন্য মদ পানের অপরাধের জন্য হদ বা হুদুদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।
মদ খেলে মানুষের সুস্থ বিবেক বুদ্ধি লোপ পায়। মানুষ চিন্তা করা ছেড়ে দেয় এবং নফসের দাসত্ব করা শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা মদ পানকে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং মদ পানের জন্য নির্দিষ্ট হদ বা শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। আজ দুনিয়ার জনগণের সার্বভৌম সংসদগুলি মদের দোকান (বারের) লাইন্সেস, মদ আমদানী করা ও কেনা বেচা করার লাইন্সেস দানের মাধ্যমে মদ কেনাকে সহজ প্রাপ্য ও মদ খাওয়াকে হালাল করে দিয়েছে। তাই থার্টি ফাস্ট নাইটে এবং এ জাতীয় পাশ্চাত্যের ও হিন্দুদের থেকে আমদানী করা অনুষ্ঠানগুলিতে যেমন-গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের নামে ব্যান্ডশো ও মদের আসরে কলেজ, ইউনিভার্সিটি ছাত্রদের থেকে শুরু করে সকল স্তরের মদখোর লোকেরা অংশগ্রহণ করছে। প্রতি সপ্তাহে চলছে মদের পাটি বড় ও ছোট হোটেল ও ক্লাবগুলিতে, অপরাধীদের ফ্লাট বা ম্যাসে, অভিজাত এলাকার বাড়ীগুলিতে ও মদের দোকানগুলিতে। সমাজের ধনী ও ক্ষমতাবানদের একটি দল ছুটছে এ মদের দিকে। এরাই সমাজের রক্ষক, সমাজ যাবে কোনদিকে? পরিণতি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। যারা চোখ থাকতে অন্ধ তাদের কথা আলাদা।
(৪) মানুষের বংশ এবং পরিবারকে রক্ষা করার জন্য ব্যভিচার এবং ব্যভিচারের দোষারোপের উপর শাস্তির (হুদুদের ও রজমের) ব্যবস্থা করেছেন।
আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া, ইসরাইলের কথাই একবার চিন্তা করুণ। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আলাহর কাছে জবাবদিহির ভয় ত্যাগ করে তারা কুফরী রাষ্ট্র কায়েম করেছে। উপর দিয়ে মাকাল ফলের মত যতই সৌন্দর্য মন্ডিত করে রাখুক না কেন ভিতরে তাদের অবস্থা যে কতটা জঘন্য পশুর ন্যায় তা একটু খোঁজ করলেই বেরিয়ে আসবে। মেয়েদের অধিকার বা হকের কথা চিন্তা করুন। আলাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মেয়েদেরকে একটি নিদিষ্ট মর্যাদা দিয়েছেন। মাতৃত্বের সম্মান দিয়েছেন, বোনের অধিকার এবং স্ত্রীর মর্যাদা ও হক নির্ধারণ করেছেন। অথচ কুফরী রাষ্ট্র সমূহ মেয়েদের পুরুষের সাথে সম অধিকারের নামে তাদের পরিণতি কি করেছে তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? আমেরিকা, ইউরোপ সহ সকল কুফর রাষ্ট্র সমূহে মদের দোকানে (বারে) প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় কারা মদের বোতল আর গ্লাস পরিবেশন করছে? বড় বড় জুয়ার আড্ডাগুলিতে একটা একটা করে কাপড় খুলে দর্শকদের দিকে কে উড়িয়ে দিচ্ছে? তাদের প্রতিটা ছোটবড় শহর গুলিতে যে সব ম্যাসেজ পার্লার আর বেশ্যালয় রয়েছে তাতে কারা এ সব কাজে নিয়োজিত। তাদের বানানো নগ্ন ছবিগুলিতে কাদেরকে তারা ব্যবহার করছে? এভাবে সম অধিকারের নামে মেয়েরা আজ পরিণত হয়েছে তাদের ভোগ্য পণ্যে। আমেরিকাতে প্রতিদিন গড়ে ২৫০টি মেয়ে ধর্ষন হয়- এটা তাদেরই পরিসংখ্যান। তাদের দেশের ২০% মহিলা কাজ করছে উলঙ্গ মদের দোকান, কেসিনো (জুয়ার আড্ডা) ম্যাসেজ পার্লার, বেশ্যালয় এবং নীল ছবি গুলিতে। এটা কোন ধরনের মানবাধিকার? সচেতন মানুষ কি একবার চিন্তা করবে না? আফগান মুসলিম মহিলাদের জন্য তাদের যে মায়া কান্না তা নিজেদের মেয়েদের জন্য কোথায়?
আল্লাহর দেয়া ব্যাভিচারের শাস্তির হুকুমকে পিছে নিক্ষেপ করে পাশ্চাত্যের সমাজ অবাধ মেলামেশার স্বাধীনতার নামে যে আইন বানিয়েছে তার পরিণতি আমাদের চোখের সামনে সুস্পষ্ট। বিয়ে না করে লিভিং টুগেদারের নামে বাপের পরিচয় ছাড়া যে লক্ষ লক্ষ শিশুর জন্ম নিচ্ছে তাদের বড় হয়ে মানসিক কি পরিণতি হয় তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? আমেরিকাতে ৪০% এর উপরে মহিলারা তাদের সন্তানদের পিতার পরিচয় দিতে পারছে না, ইংল্যান্ডে ৭০ লক্ষ মহিলা রয়েছে যাদের সন্তানদের কোন পিতার পরিচয় নেই। আল্লাহর্ দেয়া বিধানকে পিছে নিক্ষেপ করে যে আইন তারা বানিয়েছে তার একটা ছোট চিত্র হল এগুলি। প্রতিটা বিষয়ে যেখানেই আল্লাহর আইনকে পরিবর্তন করা হয়েছে সেখানেই সাধারণ মানুষের উপর দুঃখ দুদর্শা নেমে এসেছে। সকল জনগণ পরিণত হয়েছে কিছু তাগুত শাসকের নব্য যুগের দাস-দাসীতে। মুসলমান নামধারী দেশগুলির কাফের তাগুত সরকারগুলি আমদানী করেছে পাশ্চাত্যের কুফর শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা, বিচার পদ্ধতি, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে। ফলে মুসলিম দেশগুলিতে মুসলমান জনগণ আস্তে আস্তে নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে তাদের মন মগজে কাফেরদের নীতি ভরে নিয়েছে। তারা কথা বলে কাফেরের ভাষায়, চিন্তা করে কুফর দৃষ্টিকোণ থেকে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে পাকে বলেছেনঃ
"হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা এই আহলে কিতাবদের (ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের) মধ্যে একটি দলের কথা মানো তাহলে তারা তোমাদের ঈমান থেকে কুফরীর দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।" (আলে ইমরান : ১০০)
মুসলিম দেশগুলিতে এখনও ব্যভিচারের মাত্রা খুবই কম। কারণ ১৪০০ বৎসর পূর্বে মদিনাতে ব্যভিচারের বিরুদ্ধে যে অহি নাযিল হয়েছিল এবং রাসূল (সাঃ) সহ খলিফারা সেই ব্যভিচারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নাযিলকৃত যে রজম ও হদের শাস্তি, তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তারই সুফল আজও আমরা মুসলিমরা সমাজে পাচ্ছি। আমাদের আলহামদুলিল্লাহ এখনও সমাজের বেশি ভাগ লোকেরই চিন্তা করতে হচ্ছে না- "আমার বাচ্চার বাবা কি আমি নিজে"- যা কিনা ইউরোপ আমেরিকান ও ভারতীয় কাফেরদের জন্য প্রতিদিনের চিন্তার বিষয়। তবে যেভাবে জনগণের সার্বভৌমত্ব শুরু হয়েছে এবং বেহায়াপনা, নগ্ন চিত্র প্রদর্শনী, টিভিতে অবৈধ মেলা মেশার উৎসাহ প্রদানকারী নাটক, সিনেমা, গান, অর্ধ নগ্ন বিজ্ঞাপন, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, ফ্যাশন শো, থিয়েটারের নাটক, বিল বোডের মাধ্যমে রাস্তায় মোরে মোরে এবং বাসের গায়ে মহিলাদের অধ নগ্ন ছবি প্রদর্শনী ইত্যাদি বিষয় কিছু সময়ের মধ্যেই প্রাশ্চাত্যের সমাজের মত ব্যাভিচারের আখরা হতে বাধ্য। এ সমস্ত শুরু হওয়ার মূল কারণ ব্যভিচার সংক্রান্ত আল্লাহর আইনকে পিছে নিক্ষেপ করে মানুষের দ্বারা আইন রচনা করা।
(৫) মানুষের জান-মাল বা সম্পদ রক্ষা করার জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির উপর হুদুদের ব্যবস্থা করেছেন।
বর্তমানে পশ্চিমা অপশক্তির প্রচারনায় আমাদের মনে ঢুকেছে যে, চুরি করলে কারো হাত কেটে ফেলা বর্বরতা। ইসলাম যে কোন অপরাধকে তার গোড়া থেকে উৎখাত করে দেয়। যেমন চোরের হাত কাটা-একজন চোরের ধরুন একটি মোবাইল চুরি করার সুযোগ আসল। তখন সে চিন্তা করে যদি চুরি করতে পারি তাহলে এ মোবাইলটা আমার আর যদি ধরা পড়ি তবে হয়ত বর্তমানে মানুষের তৈরী আইনের বিচারে তিন থেকে ছয় মাস জেল খানায় বসে বসে খাব। কিন্তু যদি আল্লাহর আইন থাকতো তবে অবশ্যই চোরটা চিন্তা করত দশবার যে, যদি মোবাইলটা চুরি করতে ধরা পড়ি তবে ডান হাতের কব্জি কাটা যাবে। জীবনে বেচে থাকলে হয়ত মোবাইল কিনার পয়সা কামানো যাবে কিন্তু ডান হাতের কব্জি আর ফেরত আসবে না। অতএব অবশ্যই অবশ্যই এটা ফেতরাত মানুষের চুরির প্রবণতা সমাজ থেকে একেবারে দূরুভীত হবে। সেই ১৪০০ বৎসর পূর্বে যখন মদিনাতে চোরের হাত কাটার হুকুম হয়েছিল তখন থেকে ৩০০ বৎসরে কয়জন লোকের হাত কাটা হয়েছিল চুরির অপরাধে আপনারা জানেন কি? মাত্র ৬ জনের। আশ্চর্য হলেও সত্য আজও আরব বিশ্বে চুরি নেই বললেই চলে। এটাই আল্লাহ তায়ালার আইন, যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন কিভাবে সমাজে অপরাধ গোড়া থেকে দূরুভীত করতে হবে।
[বিঃ দ্রঃ-জগতের সাধারণ আইনে অপরাধ সম্পর্কিত সব শাস্তিকেই 'দন্ডবিধি' নামে অভিহিত করা হয়। 'ভারতীয় দণ্ডবিধি' 'বাংলাদেশ দন্ডবিধি' ইত্যাদি নামে যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে সর্বপ্রকার অপরাধ ও সব ধরনের শাস্তিই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত এরূপ নয়। ইসলামী শরীয়তে অপরাধের শাস্তিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে : হুদুদ, কেছাছ ও তা'যীরাত অর্থাৎ দন্ডবিধি। যেসব অপরাধের দরুন অন্য মানুষের কষ্ট অথবা ক্ষতি হয়, তাতে সৃষ্টজীবের প্রতিও অন্যায় করা হয় এবং স্রষ্টারও নাফরমানী করা হয়। তাই এ জাতীয় অপরাধে 'হক্কুল্লাহ' (আল্লাহর হক) এবং 'হক্কল আবদ' (বান্দার হক) উভয়টিই বিদ্যমান থাকে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উভয়ের কাছেই অপরাধী বলে বিবেচিত হয়। একথা জানা জরুরী যে, ইসলামী শরীয়ত বিশেষ বিশেষ অপরাধ ছাড়া অবশিষ্ট অপরাধসমূহের শাস্তির কোন পরিমাণ নির্ধারণ করেনি; বরং খলিফার নিয়োগকৃত বিচারকের অভিমতের উপর ছেড়ে দিয়েছে। বিচারক স্থান, কাল ও পরিবেশ বিবেচনা করে অপরাধ দমনের জন্যে যেরূপ ও যতটুকু শাস্তির প্রয়োজন মনে করবেন, ততটুকুই দেবেন। যেসব অপরাধের কোন শাস্তি কুরআন ও সুন্নাহ নির্ধারণ করেনি, বরং বিচারকদের অভিমতের উপর ন্যস্ত করেছে, সেসব শাস্তিকে শরীয়তের পরিভাষায় 'তাযিরাত' তথা দন্ড বলা হয়। পক্ষান্তরে যেসব অপরাধের শাস্তি কুরআন ও সুন্নাহ নির্ধারণ করে দিয়েছে সেগুলো দু'রকম- কুরআন পাক যেসব অপরাধের শাস্তিকে আল্লাহর হক হিসেবে নির্ধারণ করে জারি করেছে, সেসব শাস্তিকে 'হুদুদ' বলা হয় এবং যেসব শাস্তিকে বান্দার হক হিসেবে জারি করেছে,, সেগুলোকে 'কেছাছ' বলা হয়। পক্ষান্তরে যেসব অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করেনি, সে জাতীয় শাস্তিকে বলা হয় 'তাষীর' 'দন্ড'। দন্ডগত শাস্তিকে অবস্থানুযায়ী লঘু থেকে লঘুতর, কঠোর থেকে কঠোরতর এবং ক্ষমাও করা যায়। এ ব্যাপারে বিচারকদের ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক। কিন্তু হুদুদের বেলায় কোন সরকার, শাসনকর্তা অথবা বিচারকই সামান্যতম পরিবর্তন, লঘু অথবা কঠোর করার অধিকারী নয়। স্থান ও কাল ভেদেও এতে কোন পার্থক্য হয় না এবং কোন শাসক ও বিচারক তা ক্ষমাও করতে পারেনা। শরীয়তে হুদুদ মাত্র পাচঁটি : ডাকাতি, চুরি, ব্যভিচার ও ব্যভিচারের অপবাদ এ চারটির শাস্তি কুরআনে বর্ণিত রয়েছে। পঞ্চমটি মদ্যপানের হদ। এটি সাহাবায়ে কেরামের এজমা তথা ঐক্যমত্য দ্বারা প্রমাণিত। এভাবে মোট পাঁচটি অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত ও হুদরূপে চিহ্নিত হয়েছে। এসব শাস্তি যেমন কোন শাসক ও বিচারক ক্ষমা করতে পারেনা, তেমনি তওবা করলেও ক্ষমা হয়ে যায় না। তবে খাঁটি তওবা দ্বারা আখেরাতের গোনাহ মাফ হয়ে সেখানকার হিসাব-কিতাব থেকে অব্যহতি লাভ হতে পারে। তন্মধ্যে শুধু ডাকাতির শাস্তির বেলায় একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। ডাকাত যদি গ্রেফতারীর পূর্বে তওবা করে এবং তার আচার-আচরণের দ্বারাও তওবার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায়, তবে সে হুদ থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু গ্রেফতারীর পরবর্তী তওবা ধর্তব্য নয়। অন্যান্য হুদুদ তওবা দ্বারা মাফ হয় না। এ তওবা গ্রেফতারীর পূর্বে হোক অথবা পরে। সব দন্ডনীয় অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়ের অনুকূলে সুপারিশ শ্রবণ করা যায়; কিন্তু হুদুদের বেলায় সুপারিশ করা এবং তা শ্রবণ করা দুই-ই নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ (স) এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হুদুদের শান্তি সাধারণত কঠোর। এগুলো প্রয়োগ করার আইনও নির্মম। অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই তা পরিবর্তন ও লঘু করা যায় না এবং কেউ ক্ষমা করারও অধিকারী নয়। কিন্তু সাথে সাথে সামগ্রিক ব্যাপারে সমতা বিধানের উদ্দেশ্যে অপরাধ এবং অপরাধ প্রমাণের শর্তাবলীও অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। নির্ধারিত শর্তাবলীর মধ্যে থেকে যদি কোন একটি শর্তও অনুপস্থিত থাকে, তবে হুদ অপ্রযোজ্য হয়ে যায়। অর্থাৎ, অপরাধ সামান্যতম সন্দেহ পাওয়া গেলেও হদ প্রয়োগ করা যায় না। এ ব্যাপারে শরীয়তের স্বীকৃত নীতি হলো- 'সন্দেহের অবস্থায় হুদুদের শাস্তি রহিত হয়ে যায়'।]
মুসলিমদের সংবিধান পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। যেই সংবিধান দিয়ে মুসলিম খলিফারা এক হাজারেরও বেশী সময় পর্যন্ত সম্পূর্ণ উম্মাহকে শান্তিতে পরিচালিত করেছেন। অতএব এই কুফরী আইন যারা রচনা করেছে এবং এই কুফর আইন দ্বারা যারা দেশ পরিচালনা পূর্বে করেছে এবং বর্তমানে করছে তারা সকলেই তাগুত। আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ তাদের প্রত্যাখ্যান করা।
কাফের কুফরী করে আল্লাহ তায়ালার সাথে উনাকে ইলাহ মেনে নেয়ার ব্যাপারে এবং উনার হুকুম আহকাম অনুসারে চলার ব্যাপারে। তাই আল্লাহ তায়ালা আমাদের মুসলিমদের হুকুম দিয়েছেন তাগুতের সাথে কুফরী বা কুফর-বিত তাগুত করার জন্য অর্থাৎ তাগুতের হুকুম অনুসরন করতে নিষেধ করেছেন এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করে তার থেকে নিরাপদ দূরুত্ব বজায় রাখার হুকুম করেছেন। প্রতিটি যুগেই নবী পাঠানোর উদ্দেশ্যে ছিল একটাই আর তা হচ্ছে
"আমি প্রত্যেক উম্মতে একজন রাসূল পাঠিয়েছি, আর তাহার সাহায্যে সকলকে সাবধান করিয়া দিয়াছি, যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগুত থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকো। অতঃপর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোককে আল্লাহ হেদায়েت করেছেন, আর কিছু সংখ্যক লোকের জন্য গোমরাহী অবধারিত হয়ে গেলো। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমন করো, আর লক্ষ্য করো মিথ্যারূপকারীদের কি রকম পরিণতি হয়েছে।” (সুরা নাহল- ৩৬)
যারা তাগুতের বাহিনীতে কর্মে নিয়োজিত তাদের সম্পর্কে নিােক্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন-
"যারা ঈমানদার তারা তো যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহেই পক্ষান্তরে যারা কাফের তারা লড়াই করে তাগুতের পক্ষে। সুতরাং তোমরা জেহাদ করতে থাক শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে; শয়তানের চক্রান্ত একান্তই দুর্বল।" (সূরা নিসা ৪ ৭৬)
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ শেষ যামানায় যালেম শাসক, ফাসেক মন্ত্রী, অনিষ্টকারী বিচারক এবং মিথ্যাবাদী ফকীহদের আবির্ভাব ঘটাবে। তোমাদের মধ্যে যারা সে যুগে বেঁচে থাকবে তারা যেনো এদের কর আদায়কারী না হয়। তাদের কোনো সরদারী জমিদারী গ্রহণ না করে এবং পুলিশ ও নিরাপত্তা বিভাগে কোনো পদ গ্রহণে রাজী না হয়। (তাবরানী) { এন্তেখাবে হাদীস পৃষ্ঠা-৭২ আধুনিক প্রকাশনী।
যারা তাগুতের আইন (মানুষের দ্বারা লিখিত আইন) দ্বারা বিচার ফয়সালা করে আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পর্কে বলেছেন- "যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।” [মায়েদা: ৪৪]
"তারা বিবাদ পূর্ণ বিষয়কে [মীমাংসার জন্য] তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়; অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা তাকে [তাগুতকে] মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করতে চায়।" (আন নিসা: ৬০)
যারা তাগুতকে অস্বীকার করে নির্যাতিত নিষ্পেষিত অবস্থায় রয়েছেন তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা নিলেক্ত আয়াতের মাধ্যমে চিরস্থায়ী জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন
“যারা তাগুতের বন্দেগী থেকে (ইবাদতের ক্ষেত্রে বা হুকুমের অনুসরনের ক্ষেত্রে) পাশ কাটাইয়া রইল (দূরে থাকে) এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে (অনুতপ্ত হয়ে), তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ। অতএব, সুসংবাদ দিন আমার সেই বান্দাদেরকে” (যুমার: ১৭)
তাগুতের বন্দেগী বা তাগুতের হুকুমের অনুসরনকারীদের ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
"বল : আমি কি নির্দিষ্ট করিয়া সেই সব লোকের নাম বলিব, যাহাদের পরিণতি আল্লাহর নিকট ফাসেক লোকদের পরিণতি হইতেও নিকৃষ্টতম হইবে? তাহারা সেই লোক যাহাদের উপর আল্লাহ্ অভিশাপ বর্ষণ করিয়াছেন, যাহাদের উপর তাঁহার অসন্তোষ নাযিল হইয়াছে, যাহাদের মধ্য হইতে কিছু লোককে বানর ও শুকর বানাইয়া দেওয়া হইয়াছে, যাহারা 'তাগুতের বন্দেগী করিয়াছে; তাহাদের অবস্থা অধিকতর খারাপ এবং তাহারা 'সওয়াউস-সাবীল' হইতে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হইয়া বহুদুরে গিয়া পড়িয়াছে।” (আল-মায়েদা ৬০)
"যারা ঈমান আনে আল্লাহ তাদের সাহায্যকারী ও সহায়। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর মধ্যে নিয়ে আসেন। আর যারা কুফরীর পথ অবলম্বন করে তাদের সাহায্যকারী ও সহায় হচ্ছে তাগুত। সে তাদেরকে আলোক থেকে অন্ধকারের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। এরা আগুনের অধিবাসী। সেখানে থাকবে এরা চিরকালের জন্য।" (সূরা আল বাকারাহ : ২৫৭)