📘 তাগুত > 📄 ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি বিষয়

📄 ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি বিষয়


ক) ইলমুত তাওহীদ (তাওহীদের জ্ঞান) এবং খ) আমালুত তাওহীদ (তাওহীদের আমল)।

(ক) ইলমুত তাওহীদ (আল্লাহর একত্ববাদের জ্ঞান): তাওহীদ শব্দের অর্থ এককীকরণ। কোন জিনিসকে এক করা। আকীদার দৃষ্টিতে তাওহীদ হচ্ছে, আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে তাঁকে একক ও নিরঙ্কুশ মর্যাদা দেয়া। যেমন তিনিই শুধু স্রষ্ঠা আর কেউ নয়। তিনিই একমাত্র রব আর কেউ নয়। উপকার করার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই। বিপদ-সঙ্কট থেকে বাঁচানোর ক্ষমতা তিনি ছাড়া আর কারো নেই। ইবাদত পাওয়ার অধিকার একমাত্র তাঁর। ভয় করতে হবে শুধু তাঁকেই। নির্ভর করতে হবে শুধু তাঁরই উপর। এভাবে আল্লাহকে একক সত্ত্বা ও ক্ষমতাবান হিসেবে বিশ্বাস করার নাম হচ্ছে তাওহীদ। তাওহীদ বা একত্ববাদের বিপরীত বিষয়ই হচ্ছে শিরক বা শরীক করা। আলাহর তাআলার সাথে শিরক করে তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণকারীর জন্য জান্নাত হারাম ঘোষণা করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে পাকে।

তাওহীদের প্রকারভেদ: শেখ মুহাম্মদ আলী আল রিফাই তাওহীদের প্রকারভেদের আলোচনায় বলেন তাওহীদকে চার ভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। যথাঃ ১) তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ, ২) তাওহীদ আল-উলুহিয়্যাহ, ৩) তাওহীদ আল আসমাউস সিফাত, ৪) তাওহীদ আল-হাকীমিয়াহ।

(১) তাওহীদ আর-রুবুবিয়াহ্ : আলাহই একমাত্র রব। তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, তিনি একমাত্র অনন্তকাল থাকবেন। তিনি একমাত্র অদৃশ্য ও ভবিষ্যতের ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন (আলেমুল গায়েব)। তিনিই একমাত্র রিযিকদাতা ও নিরাপত্তাদানকারী। তিনিই জীবন-মৃত্যুর মালিক। তিনিই মাতৃগর্ভে শিশুর প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত। তিনিই জানেন কখন বৃষ্টি হবে। তিনিই জানেন মানুষ আগামীকাল কি উপার্জন করবে। তিনিই সবার মৃত্যুর সময় ও স্থান নির্ধারণকারী। আল্লাহর এই গুণাগুণসমূহ সামগ্রিকভাবে 'তাওহীদ আল-রুবুবিয়াহর' অন্তর্গত।

যদি কেউ এই ধারনা পোষণ করে যে আমেরিকা বা জাতিসংঘ (ইউ, এন) তার নিরাপত্তা বিধান করবে অথবা তার ব্যবসা বা তার মনিব বা সরকার তাকে রিযিক দিবে, জ্যোতিষ বা ভাগ্যগণনাকারী তার ভবিষ্যত বলে দিবে; তাহলে সে "তাওহীদ আল-রুবুবিয়াহকে' অস্বীকার করল।

(২) তাওহীদ আল-উলুহিয়াহ : একমাত্র আলাহ সুবহানাহু তা'য়ালা ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করা (হুকুমের অনুসরণ) যাবে না। সকল ইবাদত (যেমন- নামায, রোযা, কোরবানী বা ত্যাগ) কেবলমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য।

যদি কেউ কোন পূণ্যবান মৃত ব্যক্তি বা কবরের (মাজার) কাছে অথবা কোন ধর্মীয় নেতার (পীর, ফকির) কাছে তার মনের আকাঙ্খা পুরণের জন্য প্রার্থনা করে এবং তাদের নিকট সওয়াবের উদ্দেশ্যে দান করে তবে সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অস্বীকার করলো। যা একটি প্রকাশ্য কুফরী এবং 'তাওহীদ আল উলুহিয়ার' পরিপন্থী।

(৩) তাওহীদ আল-আসমাউস সিফাত: আমরা জানি যে, আল্লাহর নিরানব্বইটি সুন্দর নাম রয়েছে যার প্রত্যেকটি পৃথক পৃথকভাবে আলাহর গুণ-সমূহকে প্রকাশ করে। এই গুণবাচক নামসমূহের প্রত্যেকটির উপর ঈমান আনা ফরয। এই নামসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপনই 'তাওহীদ আল-আসমাউস সিফাত' যেমন আর রহমান (একমাত্র দয়াবান) শুধু আল্লাহ তায়ালাই।

(৪) তাওহীদ আল হাকিমিয়াহ: আলাহই একমাত্র আইনদাতা এবং এই বিশ্বজগতে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেউ আইন প্রণয়ণের অধিকার রাখে না। অন্য কথায়, ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবী একমাত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হতে হবে। যদি আমরা মনে করি যে, আল্লাহর আইন (শরীয়াহ) যা রাসূল (সাঃ) ও খিলাফায়ে রাশেদার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা সেকেলে, অপ্রয়োজনীয়, নিকৃষ্ট এবং আল্লাহর আইনের (শরীয়াহ) তুলনায় ব্রিটিশ বা আমেরিকান আইন বা অন্য যে কোন মতাদর্শ বা জীবনব্যবস্থা (যেমন-গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষবাদ ইত্যাদি) এগুলির যে কোনটি যদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় তাহলে এই ধারণা পোষণকারী ব্যক্তির লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ঘোষণা কার্যকর হবে না। এই ধারণাই কুফরী এবং 'তাওহীদ আল হাকিমিয়াহর” প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

তাওহীদের গুরুত্ব ও মর্যাদা

আল্লাহর চিরন্তন শাশ্বত দ্বীন-ইসলামের মূল ভিত্তি হচ্ছে তাওহীদ। তাওহীদের দিকে ডাকার জন্যই আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাদের সকলকে আল্লাহ একই দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন আর তা হচ্ছে তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর বিরোধী সব কিছুকে বর্জন করে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদতের দিকে আহবান জানানো। আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেনঃ

"আমি সকল জাতির কাছে রাসুল পাঠিয়েছি। তারা সবাই নিজ নিজ জাতিকে এ বলে আহবান জানিয়েছেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।" (নাহল: ৩৬)

উক্ত আয়াতে তাগুতকে বর্জন ও আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাই হচ্ছে তাওহীদ। তাওহীদের স্বীকৃতি ছাড়া কেউ মুসলমান হতে পারেনা। তাওহীদ ছাড়া কোন আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই রাসূলের উত্তরসুরীগণ মানুষকে সর্বপ্রথম তাওহীদের দিকে আহবান জানাবে। তাওহীদ গ্রহণ করলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য আমলের দিকে আহবান জানাবে।

হযরত মুআজকে রাসূল (সাঃ) ইয়ামানের উদ্দেশ্যে পাঠানোর সময় তাঁকে এভাবে নসিয়ত দেনঃ "তাদের তুমি প্রথম যে বিষয়ের দিকে দাওয়াত দিবে তাহলো তারা যেন আল্লাহকে (ইলাহ হিসেবে) একক মর্যাদা দেয় যদি তারা এ বিষয়টি স্বীকার করে নেয়, তার পর তাদেরকে জানাবে যে আল্লাহ্ দিনে ও রাতে পাঁচবার নামায ফরজ করেছেন।' (বুখারী)

একজন মুসলমান তাওহীদের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে আর তাওহীদ নিয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় হয়। এভাবে যে মুসলমানের শুরু ও শেষ হবে তাওহীদ, সে জান্নাতে যাবে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: 'যার শেষ কথা হবে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' (হাকেম, ইরওয়াউর গালীল-আলবানী)।

আল্লাহ আমাদের রব ও ইলাহ। আমরা তাঁর বান্দা ও দাস। বান্দার উপর যেমন আল্লাহর হক আছে। তেমনি আল্লাহর উপরও বান্দার হক রয়েছে। উভয় পক্ষের হক সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রাঃ) কে লক্ষ্য করে বলেনঃ "তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহর হক এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কি? আমি বললাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'বান্দার উপর আল্লাহর হক হচ্ছে শুধু মাত্র তাঁরই ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হচ্ছে যে তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে না তাকে শাস্তি না দেয়া।' (বুখারী ও মুসলিম)

(খ) আমালুত তাওহীদ (তাওহীদের আমল): ইহা দুইভাবে বিভক্ত- (১) ইবাদত (ব্যক্তিগত উপাসনা) ও (২) মুয়ামালাত

(১) ইবাদাত : বান্দা এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ইবাদত। এই ইবাদতের উদ্দেশ্য শুধু একটাই আর তা হলো শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কে সন্তুষ্ট করা।

উদাহরণ: পাক পবিত্রতা, সালাত (নামায) সওম (রোজা), হজ্জ ইত্যাদি। [এই ইবাদতের ব্যাপারে কোন ইজতিহাদ করা যাবে না শুধুমাত্র ইজতিহাদ বায়ানি বর্ণনা সংক্রান্ত ইজতিহাদ। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই। সালাত পড়ার (ফরজ ওয়াজিব অংশ ব্যতিক্রম ছাড়া অন্যান্য) বর্ণনা সংক্রান্ত কিছুটা মতপার্থক্য থাকতে পারে।]

(২) মুয়ামালাত (Transactions) বান্দা এবং সমাজের মধ্যকার সম্পর্ক সংক্রান্ত ইবাদতকে অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম আহকাম গুলিকে মুয়ামালাত বলে। এখানে আল্লাহর ইবাদত সম্পন্ন হয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হালাল হারাম ও শরয়ী হুকুম মানার মাধ্যমে।

উদাহরণ: বেচা কেনা (Sales), নিকাহ (বিবাহ), তালাক, হুদুদ আলাহর আইন অনুযায়ী বিচার ফায়সালা, ইসলামী শিক্ষা ইত্যাদি।

সমাজের বিধান সমূহ (Systems of society) :

১) নিজামুল হুকুম (Nizamul hukum) (Ruling system of Islam) [ইসলামী শাসন ব্যবস্থা]

২) নিজামুল ক্বাদা (Nizamul Qadaa) (Systems of Judgement) [ইসলামী বিচার ব্যবস্থা]

৩) নিজামুল ইকতিসাদ (Nizamul Iqtisaad) (Systems of Economic) [ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা]

৪) নিজামুল ইজতিমা (Nizamul Ijtimaa) (Social System) [ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা]

৫) নিজামুল জিহাদ ওয়া শিয়ার (Nizamul Jihad wa Siyar) (Forieng Policy of Islam) [ইসলামী বিদেশনীতি]

৬) নিজামুল উকুবাত (Nizamul Uqobat) (Punishement) [ইসলামী শাস্তি ব্যবস্থা বা হুদুদ।]

৭) নিজামুল তালিম/তারবিয়া (Nizamul Taleem/Tarbeah) [ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা]

অতএব উপরের আলোচনা থেকে দেখলাম যে, শুধুমাত্র নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাতের নামই ইবাদত না। নামায, রোজা, যাকাতের বিষয়ে যেমন কোরআনে অহি রয়েছে তেমনি মুয়ামালাত সম্পর্কিত অর্থাৎ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, অর্থনীতি ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, শাস্তি ব্যবস্থা সম্পর্কিত আয়াত (অহি) আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা কোরআনে নাজিল করেছেন। এ সকল আয়াতকে না মেনে শুধুমাত্র নামায রোজার যাকাত ও হজ্জের আয়াতগুলিকে মান্য করলে ইবাদত পরিপূর্ণ হবে না এবং অন্যান্য এ সকল সামাজিক বিষয়ে আল্লাহর হুকুমগুলিকে বাদ দিয়ে কুফর সমাজ ব্যবস্থার (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র মোতাবেক) দেয়া পদ্ধতি সন্তুষ্ট চিত্তে অনুসরণ করার অধিকার আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা আমাদেরকে দেননি। যারা ইবাদতকে শুধুমাত্র নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জে সীমাবদ্ধ রেখে জীবনের বাকি সকল অংশে মানুষের দেয়া নিয়মের (Man made laws) উপর চলে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন

"তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর? তারপর তোমাদের মধ্য থেকে যারাই এমনটি করবে তাদের শাস্তি এ ছাড়া কি হতে পারে যে, দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত হবে এবং আখেরাতে তাদেরকে কঠিনতম শাস্তির দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে?" (বাকারাঃ ৮৫)

অতএব আমাদেরকে পরিপূর্ণ রূপে সকল ক্ষেত্রে ইবাদতের বা আল্লাহর হুকুম সমূহের অনুসরণ করতে হবে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন :

"হে মু'মিনগণ! তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করিও না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (বাকারা ২০৮)

"না, হে মুহাম্মদ, তোমার রবের নামের শপথ, ইহারা কিছুতেই ঈমানদার হইতে পারে না, যতক্ষন না তাহারা তাহাদের পারস্পরিক মতভেদের বিষয় ও ব্যাপার সমূহে তোমাকে বিচারপতি রূপে মানিয়া লইবে। অতঃপর তুমি যাহাই ফায়সালা করিবে সে সম্পর্কে তাহারা নিজেদের মনে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করিবে না, বরং উহার সম্মুখে নিজদিগকে পূর্ণরূপে সোপর্দ করিয়া দিবে।” (নিসা: ৬৫)

আপনাকে জানতে এবং বুঝতে হবে যে, চেতনা লাভের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আলাহর আইন অনুযায়ী চলা এবং তাঁরই নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করার নামই হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত। আপনি একথা বলতে পারেন না যে, আমি অমুক সময় আল্লাহর বান্দাহ আর অমুক সময় আল্লাহর বান্দাহ নই। এখানে আপনি এ প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে এ নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত ইত্যাদিকে কি বলা যায়? এগুলি অবশ্যই আপনার উপর আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে হুকুম করা সবচেয়ে জরুরী অবশ্যই পালনীয় ফরজ ইবাদতসমূহ। এ ইবাদাতগুলোকে আপনার ওপর ফরয করে দেয়া হয়েছে এজন্য যে, প্রতি মূহূর্তে ও প্রত্যেক অবস্থায় আল্লাহর ইবাদাত (হুকুমের অনুসরণ) করার স্মরণ আপনি এ ইবাদত সমূহের মাধ্যমে লাভ করবেন। নামায আপনাকে দৈনিক পাঁচবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তুমি আলাহ তাআলার দাস- তাঁরই বন্দেগী করা তোমার কর্তব্য; রোযা বছরে একবার পূর্ণ একটি মাস আপনাকে এ বন্দেগী করার জন্যই প্রস্তুত করে, যাকাত আপনাকে বার বার মনে করিয়ে দেয় যে, তুমি যে অর্থ উপার্জন করেছো তা আল্লাহর দান, তা কেবল তোমার খেয়াল-খুশী মত ব্যয় করতে পার না। বরং তা দ্বারা তোমার মালিকের হক আদায় করতে হবে। হজ্জ মানব মনে আল্লাহ প্রেম ও ভালবাসা এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির এমন চিত্র অঙ্কিত করে যে, একবার তা মুদ্রিত হলে সমগ্র জীবনেও মন হতে তা মুছে যেতে পারে না। এসব বিভিন্ন ইবাদাত আদায় করার পর আপনার জীবনের প্রতিটি সময় এবং কাজ একমাত্র আল্লাহর হুকুমের সীমার মধ্যে আনতে পারেন, তবেই আপনার নামায প্রকৃত নামায হবে, রোযা খাঁটি রোযা হবে, যাকাত সত্যিকার যাকাত এবং হজ্জ আসল হজ্জ হবে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ উদ্দেশ্য হাসিল না হলে কেবল রুকু-সিজদাহ, অনাহার-উপবাস, হজ্জের অনুষ্ঠান পালন করা এবং যাকাতের নামে টাকা ব্যয় করলে আপনার কিছুই লাভ হবে না। বাহ্যিক ও আনুষ্ঠানিক ইবাদাতগুলোকে মানুষের একটি দেহের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এতে প্রাণ থাকলে এবং চলাফিরা বা কাজ-কর্ম করতে পারলে নিঃসন্দেহে তা জীবিত মানুষের দেহ, অন্যথায় তা একটি প্রাণহীন দেহ মাত্র। লাশের চোখ, কান, হাত, পা সবকিছুই বর্তমান থাকে; কিন্তু প্রাণ থাকে না বলেই তাকে আপনারা মাটির গর্তে পুতে রাখেন। তদ্রূপ নামাযের আরকান-আহকাম যদি ঠিকভাবে আদায় করা হয় কিংবা রোযার শর্তাবলী যদি যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়, কিন্তু হৃদয় মনে আল্লাহর ভয়, আল্লাহর প্রেম-ভালবাসা এবং তাঁর দাসত্ব ও আনুগত্য করার ভাবধারা বর্তমান না থাকে- ঠিক যে জন্য এসব আপনার ওপর ফরজ করা হয়েছিল, তবে তাও একটি প্রাণহীন ও অর্থহীন জিনিস হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

📘 তাগুত > 📄 আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষ যাদের ইবাদত করে

📄 আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষ যাদের ইবাদত করে


কুরআন পাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তিন প্রকার গোমরাহ হবার কথা আলোচনা করেছেন অর্থাৎ মানুষ আল্লাহর ইবাদত (হুকুমের অনুসরণ) বাদ দিয়ে তিন প্রকার ইলাহর ইবাদত করে। যথাঃ

প্রথম পথ হচ্ছে : মানুষের নিজের নফসের খাহেশ

"আল্লাহর দেয়া বিধান পরিত্যাগ করে যে ব্যক্তি নিজের নফসের ইচ্ছামত চলে তার অপেক্ষা অধিক গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? এ ধরনের যালেম লোকদেরকে আল্লাহ্ কখনই সৎপথের সন্ধান দেন না।" (আল-কাসাস: ৫০)

এর অর্থ এই যে, মানুষকে গোমরাহ করার মত যত জিনিস আছে তার মধ্যে মানুষের নফসই হচ্ছে তার সর্বপ্রধান পথভ্রষ্টকারী শক্তি। যে ব্যক্তি নিজের খাহেশাতের দাসত্ব করবে, আল্লাহর বান্দাহ হওয়া তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কারণ যে কাজে টাকা পাওয়া যাবে, যে কাজ করলে সুনাম ও সম্মান হবে, যে জিনিসে অধিক স্বাদ ও আনন্দ লাভ করা যাবে, কেবল সে কাজই করতে সে প্রাণ-পণ চেষ্টা করবে। সেসব কাজ করতে যদি আল্লাহ্ নিষেধও করে থাকেন, তবুও সে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না। আর এসব জিনিস যেসব কাজে পাওয়া যাবে না সেসব কাজ করতে সে কখনও প্রস্তুত হবে না। আল্লাহ তাআলা যদি সেই কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবুও সে তার কিছুমাত্র পরোয়া করবে না। এমতাবস্থায় একথা পরিষ্কার করে বলা যেতে পারে যে, সে আল্লাহ্ তাআলাকে তার ইলাহ রূপে স্বীকার করেনি বরং তার নফসকেই সে তার একমাত্র ইলাহের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। কাজেই এমন ব্যক্তি কোন প্রকারে আল্লাহর হেদায়াত লাভ করতে পারে না। কুরআন শরীফে একথা অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে।

“(হে নবী!) যে ব্যক্তি নিজের নফসের খাহেশাতকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে, তুমি কি তার সম্পর্কে ভেবে দেখেছ? তুমি কি এ ধরনের মানুষের পাহারাদারী করতে পার? তুমি কি মনে কর যে, এদের মধ্যে অনেক লোকই (তোমার দাওয়াত) শোনে এবং বুঝে? কখনও নয়। এরা তো একেবারে জন্তু-জানোয়ারের মত বরং তা অপেক্ষাও এরা নিকৃষ্ট।” (আল-ফুরকান ৪৩-৪৪)

যে ব্যক্তি নফসের দাস, সে যে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট তাতে কোন প্রকার সন্দেহ থাকতে পারে না। কোন পশুকে আপনারা নির্ধারিত সীমালংঘন করতে দেখবেন না। প্রত্যেক পশু সেই জিনিসই আহার করে এবং ঠিক সেই পরিমাণ খাদ্য খায় যে পরিমাণ আল্লাহ তাআলা তার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু এই মানুষ এমনই এক শ্রেণীর পশু যে, সে যখন নফসের দাস হয়ে যায়, তখন সে এমন সব কাজ করে যা দেখে শয়তানও ভয় পেয়ে যায়। মানুষের পথভ্রষ্ট হওয়ার এটাই প্রথম কারণ।

দ্বিতীয় পথ হচ্ছে: বাপ-দাদার রসম-রেওয়াজ

বাপ-দাদা হতে যেসব রসম-রেওয়াজ, যে আকীদা-বিশ্বাস ও মত এবং চাল-চলন ও রীতিনীতি চলে এসেছে তার প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকার দরুন মানুষ তার গোলাম হয়ে যায়। আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষাও তাকে বেশী সম্মানের যোগ্য বলে মনে করে। সেই রসম-রেওয়াজের বিপরীত আল্লাহর কোন কোন হুকুম যদি তার সামনে পেশ করা হয়, তবে সে অমনি বলে ওঠে বাপ-দাদারা যা করে গেছে, আমার বংশের যে নিয়ম বহুদিন হতে চলে এসেছে, আমি কি তার বিপরীত কাজ করতে পারি? পূর্ব-পুরুষদের নিয়মের পূজা করার রোগ যার মধ্যে এতখানি, আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হওয়া তার পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। বাস্তব ক্ষেত্রে তার বাপ-দাদা এবং তার বংশের লোকেরাই তার ইলাহ হয়ে বসে। সে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করলে তা যে মিথ্যা দাবী হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কুরআন মজীদে এ সম্পর্কে বড় কড়াকড়িভাবে সাবধান করে দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে:

"যখনই তাদেরকে বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহ্ তাআলার হুকুম পালন করে চল, তখন তারা শুধু একথাই বলে উঠেছে যে, আমাদের বাপ-দাদারা যে পথে চলেছে, আমরা কেবল সে পথেই চলবো। কিন্তু তাদের বাপ-দাদারা যদি কোন কথা বুঝতে না পেরে থাকে এবং তারা যদি সৎপথে না চলে থাকে, তবুও কি তারা তাদের অনুসরণ করবে?” (বাকারা: ১৭০)

সাধারণভাবে প্রত্যেক যুগের জাহেল লোকেরা এ ধরনের গোমরাহীতে ডুবে থাকে। হযরত মূসা (আঃ) যখন সেই যুগের লোকদেরকে আল্লাহর শরীয়তের প্রতি দাওয়াত দিয়েছিলেন তখনও তারা একথাই বলেছেনঃ "আমাদের বাপ-দাদারা যে পথে চলেছে তুমি কি সেই পথ হতে আমাদেরকে ভুলিয়ে নিতে এসেছো?" (ইউনুস: ৭৮) হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন তাঁর গোত্রের লোকদেরকে শিরক হতে ফিরে থাকতে বললেন, তখন তারাও একথটি বলেছিলঃ "আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এই দেবতারই পূজা করতে দেখেছি।” (আম্বিয়া: ৫৩) মোটকথা প্রত্যেক নবীরই দাওয়াত শুনে সেই যুগের লোকেরা শুধু একথাই বলেছে, "তোমরা যা বলছো তা আমাদের বাপ-দাদার নিয়মের বিপরীত। কাজেই আমরা তা মানতে পারি না।" এসব কথা প্রকাশ করার পর আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা হয় বাপ-দাদারই নিয়ম প্রথার অনুসরণ কর, না হয় খাঁটিভাবে কেবল আমারই হুকুম মেনে চল; কিন্তু এ দুটি জিনিস একত্রে ও এক সাথে কখনও পালন করতে পারবে না। দু'টি পথের মধ্যে মাত্র একটি পথ ধরতে পারবে। মুসলমান হতে চাইলে সবকিছু পরিত্যাগ করে কেবল আমার হুকুম পালন করে চলতে থাক।

তৃতীয় পথ হচ্ছেঃ মানুষ যখন আলাহর হুকুম ছেড়ে দিয়ে মানুষের হুকুম পালন করতে শুরু করে এবং ধারণা করে যে, অমুক ব্যক্তির হাতে আমার রিযক, কাজেই তার হুকুম অবশ্যই পালন করা উচিত অথবা অমুক ব্যক্তির শক্তি ও ক্ষমতা অনেক বেশী, এজন্য তার কথা অনুসরণ করা আবশ্যক; কিংবা অমুক ব্যক্তি বদ দোয়া করে আমাকে ধ্বংস করে দিবে অথবা অমুক ব্যক্তি আমাকে নিয়ে বেহেশতে যাবে, কাজেই সে যা বলে তা নির্ভুল মনে করা কর্তব্য অথবা অমুক আলেমরা আমার দলের নেতা অনেক জ্ঞানবান ব্যক্তিবর্গ উনারা যা বলে তা নির্ভুল, উনারা কোন ভুলই করতে পারে না, উনারা কি কম জানে অতএব তাদের হুকুম অবশ্যই পালন করা উচিত (যদিও তারা শিরকের পথে নিয়ে যায়) অথবা এই দলের মাধ্যমে আমি ইসলামে এসেছি (যদিও দলের কর্মসূচী শিরর্কের সাথে মিশে তারা ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছে) অতএব আমি এ দল কখনও ছাড়তে পারবো না। অথবা অমুক জাতি আজকাল খুব উন্নতি করছে, কাজেই তাদের নিয়ম অনুসরণ করা উচিত, তখন সে কিছুতেই আল্লাহর হেদায়াত অনুযায়ী কাজ করতে পারে না।

"তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ করে চল তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহ্র পথ হতে ভুলিয়ে ভ্রান্ত পথে নিয়ে যাবে।" (আনআম ১১৬)

অর্থাৎ মানুষ সোজা পথে ঠিক তখনই থাকতে পারে যখন তার আল্লাহ্ কেবলমাত্র একজনই হবে। যে ব্যক্তি শত শত এবং হাজার হাজার লোককে 'রব' বলে স্বীকার করবে সে সোজা পথ কখনই পেতে পারে না। ওলেমা, মাশায়েখ, আমীর, দল, নেতাকে তাকলিদ বা অন্ধ অনুসরণের মাধ্যমে তাদের ইবাদত করা শুরু করে মানুষ। এরশাদ হচ্ছে

"তারা নিজেদের ওলামা-মাশায়েখদেরকে আল্লাহ্র পরিবর্তে নিজেদের রব বানিয়ে নিয়েছিলো, এমনি করে মসীহ ইবনে মারিয়ামকেও। অথচ তাদের এক ইলাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার নির্দেশ দেয়া হয় নি। (তওবা: ৩১)

আদি ইবনে হাতিম (রাঃ) (যিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নাসারা ছিলেন) রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমরা তো কখনো ওলামা-মাশায়েখ, পাদ্রী পুরোহিতদের পূজা করি নি। জবাবে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন; তারা যে জিনিসকে হালাল জ্ঞান করেছে, তোমরা কি তাকে হালাল জ্ঞান কর নি? আর তারা যে জিনিসকে হারাম করেছিল, তোমরা কি তাকে হারাম বানিয়ে নাও নি? (আহমদ, আত-তিরমিজী, ইবনে জারীর)

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসে রাসূল (সাঃ) থেকে জানলাম যে, আলেম ও নেতাদের অনুসরণের একটা সীমা রয়েছে। যখনই তারা আল্লাহর দেয়া সীমা অতিক্রম করে মানুষকে (অনুসারিদের) শিরক কুফর করার বা হালাল হারাম পরিবর্তন করার নির্দেশ দেয় তখনই আবুল হাকাম (জ্ঞানের পিতা) পরিণত হয় আবু জেহেলে (মূর্খের পিতায়)। অর্থাৎ এই সকল আলেম, নেতা ও পীরেরা আল্লাহর দাস হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর রব হিসেবে যে অধিকার (হালাল-হারামের বিধান দেওয়া) তা নিজেরা পরিবর্তন করে নিজেদের মনের মত করে হালাল হারামের সংজ্ঞা দেয় এবং সীমালংঘনকারী তাগুতে পরিণত হয়। যারা তাদেরকে অনুসরণ করল তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে ঐ সমস্ত সীমালংঘণকারী তাগুতদেরকে নিজেদের ইলাহ বানিয়ে মুশরিকে পরিণত হয়। তাই আলেম যা বলল তা দলিল নয় বরং আলেম যা বলল তা প্রমাণের জন্য কুরআন সুন্নাহর দলিল দরকার। যদি মনে করি এত বড় আলেম ভুল বলল তবে মনে রাখা দরকার যে শুধুমাত্র রাসূল (সাঃ) মাসুম ছিলেন এবং তাকেই একমাত্র অনুসরণ করা যাবে আর কেউ নয়। ইবলিসও অনেক বড় আলেম এবং আবেদ ছিল কিন্তু সবচেয়ে বড় পথভ্রষ্টতা তার দ্বারাই শুরু।

অনেকে মনে করে এই দলে এসে আমি ইসলাম পেয়েছি। অতএব যাই হোক এই দল ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় যদিও দলের কর্মসূচী শিরকের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এই লোক আল্লাহকে আল-হাদী (হেদায়েত দানের একমাত্র অধিকারী) না ভেবে দল তাকে হেদায়াত দিয়েছে ভাবে অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার জায়গায় তার দল তার ইলাহতে পরিণত হয়।

এই তিনটি বড় বড় 'দেবতা' মানুষের ইলাহ হবার দাবী করে বসে আছে। যে ব্যক্তি মুসলমান হতে চায় তাকে সর্বপ্রথম এই তিনটি 'দেবতাকেই' অস্বীকার করতে হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি এ তিন প্রকারের দেবতাকে, নিজের মনের মধ্যে বসিয়ে রাখবে এবং এদের হুকুম মত কাজ করবে, আল্লাহর প্রকৃত বান্দাহ হওয়া তার পক্ষে বড়ই কঠিন। ওপরে যে তিনটি 'দেবতার' উল্লেখ করছি, এদের দাসত্ব করাই হচ্ছে আসল শিরক। আপনারা পাথরের দেবতা ভাংগিয়েছেন, ইট ও চুনের সমন্বয়ে গড়া মূর্তি ও মূর্তিঘর আপনারা ধ্বংস করেছেন; কিন্তু আপনাদের বুকের মধ্যে যে মূর্তিঘর বর্তমান রয়েছে, সেই দিকে আপনারা মোটেই খেয়াল করেননি। অথচ মুসলমান হওয়ার জন্য এ মূর্তিগুলোকে একেবারে চূর্ণ করে দেয়াই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা দরকারি কাজ ও সর্বপ্রথম শর্ত।

📘 তাগুত > 📄 আল্লাহর হুকুম পালন করা দরকার কেন

📄 আল্লাহর হুকুম পালন করা দরকার কেন


একজন মানুষ জিজ্ঞেস করতে পারে যে, আল্লাহর হুকুম পালন করারূদরকারটা কি? তিনি কি আমাদের আনুগত্য পাবার মুখাপেক্ষী? দুনিয়ার রাজা-বাদশাহরা যে রকম নিজেদের হুকুমাত চালাবার জন্য লালায়িত, আল্লাহ্ কি তেমন লালায়িত?

দুনিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান রাজকর্মচারীগণ তো শুধু নিজেদেরই স্বার্থের জন্য লোকদের ওপর তাদের হুকুমাত চালায়- কিন্তু আল্লাহ তাআলার কোন স্বার্থ নেই, তিনি সকল রকম স্বার্থের নীচতা হতে পবিত্র। প্রাসাদ তৈরি করা, মোটর গাড়ী ক্রয় করা কিংবা আপনাদের টাকা-পয়সায় বিলাস-ব্যসন বা আরাম-আয়েশের সামগ্রী সংগ্রহ করার কোন প্রয়োজনই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নেই। তিনি পাক, তিনি কারো মোহতাজ বা মুখাপেক্ষী নন। দুনিয়ার সবকিছুই তাঁর, সমস্ত ধন-সম্পদের তিনিই একমাত্র মালিক। তিনি আপনাদেরকে তাঁর হুকুম মেনে চলতে এবং তাঁর আনুগত্য করতে বলেন, শুধু আপনাদেরই মংগলের জন্য- আপনাদেরই কল্যাণ করতে চান তিনি। তিনি মানুষকে 'আশরাফুল মাখলুকাত' করে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর এ শ্রেষ্ঠ মাখলুক বা বিরাট সৃষ্টি মানুষেরা শয়তানের গোলামী করুক, অন্য মানুষের দাস হোক এটা তিনি মোটেই পছন্দ করেন না।

"হে আদম সন্তানগণ! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের ইবাদত করোনা, কেননা, সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন"। (ইয়াসীন: ৬০)

তিনি যে মানুষকে দুনিয়ায় তাঁর প্রতিনিধি বানিয়েছেন, তারা মূর্খতার অন্ধকারে ঘুরে মরুক এবং পশুর মত নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী চলে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হোক-এটাও তিনি চান না। এজন্যই তিনি মানুষকে বলেছেনঃ

"দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে কোন জোর-যবরদস্তি নেই। হেদায়াতের সোজা পথ গোমরাহীর বাঁকা পথ হতে ভিন্ন করে একেবারে পরিষ্কার করে দেখানো হয়েছে। এখন তোমাদের মধ্যে যারাই মিথ্যা ইলাহ এবং ভ্রান্ত পথে চালনাকারীদেরকে (তাগুত) ত্যাগ করে কেবল এক আল্লাহ্ প্রতিই ঈমান আনবে, তারা এত মযবুত রজ্জু ধারণ করতে পারবে, যা কখনই ছিঁড়ে যাবার নয়। আলাহ্ সবকিছুই শুনতে পান এবং সবকিছুই তিনি অবগত আছেন। যারা ঈমান আনলো তাদের রক্ষাকারী হচ্ছেন আল্লাহ্ তাআলা, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে মুক্তি দান করে আলোকের উজ্জলতম পথে নিয়ে যান। আর যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদেরকে রক্ষা করার ভার তাদের মিথ্যা তাগুত ও গোমরাহকারী নেতাদের ওপর অর্পিত হয়। তারা তাদেরকে আলো হতে পথভ্রষ্ট করে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। তারা দোযখে যাবে ও সেখানে তারা চিরদিন থাকবে।" -(বাকারাহ: ২৫৬-২৫৭)

আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্য মিথ্যা ইলাহর হুকুম মানলে ও তাদের আনুগত্য করলে মানুষ কেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, আর কেবল আল্লাহর আনুগত্য করলেই কেন আলোকোজ্জল পথ লাভ করা যাবে তা আপনাদের বিচার করে দেখা প্রয়োজন।

আপনারা দেখছেন, দুনিয়ায় আপনাদের জীবন অসংখ্য রকম সম্পর্কের সাথে জড়িত। আপনাদের প্রথম সম্পর্ক আপনাদের দেহের সাথে। হাত, পা, কান, চোখ, জিহবা, মন, মগজ এবং পেট সমস্ত আল্লাহ্ তাআলা আপনাদেরকে দান করেছেন আপনাদের খেদমত করার জন্য। কিন্তু এগুলো দ্বারা আপনারা কিভাবে খেদমত নিবেন, তা আপনাদেরই বিচার করতে হবে। এরা সবাই আপনার চাকর এদের দ্বারা আপনি ভাল কাজও করাতে পারেন, আর পাপের কাজও করাতে পারেন। এরা আপনার কাজ করে আপনাকে উচ্চতম মর্যাদার মানুষেও পরিণত করতে পারে আবার এরা আপনাকে জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট ও নীচ জীবও বানিয়ে দিতে পারে।

অতঃপর আপনার নিকটতম সম্বন্ধ আপনার ঘরের লোকদের সাথে--বাপ-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন সকলের সাথে। এদের ওপর আপনার কি 'হক' (অধিকার) আছে এবং আপনার ওপরই বা এদের কি অধিকার আছে, তা আপনার ভাল করে জেনে নেয়া দরকার। মনে রাখবেন, এদের সাথে আপনার ব্যবহার সুষ্ঠু হওয়ার ওপরই আপনার দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ-শান্তি ও সফলতা নির্ভর করে।

এরপর আসে দুনিয়ার অন্যান্য অগণিত লোকের সাথে আপনার সম্পর্কের কথা। অনেক লোক আপনার পাড়া-পড়শী, বহুলোক আপনার বন্ধু, কতগুলো লোক আপনার দুশমন। আপনি কারোও কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেন এবং কাউকে আপনি কিছু দেন। কেউ আপনার বিচারক আর আপনি অন্য কারো বিচারক। আপনি কাউকে হুকুম দেন আবার আপনাকে কেউ হুকুম দেয়। আপনাকে এমনভাবে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হতে হবে যেন আপনি কারো হক নষ্ট করেননি, কারোও ওপর যুলুম করেননি, কেউ আপনার বিরুদ্ধে কোন নালিশ করে না, কারোও জীবন নষ্ট করার দায়িত্ব আপনার ওপর নেই এবং কারো জান-মাল ও সম্মান আপনি অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেননি।

এখন আপনারা চিন্তা করুন যে, আপনাদের দেহের সাথে, আপনার পরিবারের লোকদের সাথে এবং দুনিয়ার অন্যান্য সমস্ত লোকের সাথে সঠিক সম্পর্ক রাখার জন্য জীবনের প্রতি ধাপে আপনার জানা চাই যে, কোনটা মিথ্যা? সুবিচার কি এবং যুলুম কি? আপনার ওপর কার কি পরিমাণ অধিকার আছে এবং আপনারই বা কার ওপর কি পরিমাণ অধিকার আছে? কিন্তু এসব কিছুর জ্ঞান আপনি কোথায় পেতে পারেন? এটা যদি আপনি আপনার মনের কাছে জানতে চান, আপনার মন নিজেই অজ্ঞ ও মূর্খ, নিজের স্বার্থ ও অসৎ কামনা ছাড়া আর কিছু জানা নেই। সে তো বলবেঃ মদ খাও, যেনা কর, হারাম উপায়ে টাকা রোযগার কর। কারণ এসব কাজে খুবই আনন্দ আছে। সে বলবে, সকলেরেরই হক মেরে খাও, কাউকে হক দিও না। কারণ তাতে লাভ ও আছে, আরাম ও আছে। মন যা চায়, যদি কেবল তাই করেন, এতে আপনার দ্বীন-দুনিয়া সবকিছু নষ্ট হবে।

দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে এই যে, আপনারই মত অন্য মানুষের ওপর একান্তভাবে নির্ভর করবেন তারা যেদিকে চালায়, আপনি অন্ধভাবে সেদিকেই চলবেন। এ পথ যদি অবলম্বন করেন, তবে কোন স্বার্থপর লোক এসে আপনাকে তার নিজের ইচ্ছামত পরিচালিত এবং নিজের স্বার্থোদ্বারের জন্য ব্যবহার করতে পারে, এর খুবই আশংকা আছে। অথবা কোন যালেম ব্যক্তি আপনাকে হাতিয়ার স্বরূপ গ্রহণ করে আপনার দ্বারা অন্যের ওপর যুলুম করাতে পারে। মোটকথা, অন্য লোকের অনুসরণ করলেও আপনি জ্ঞানের সেই জরুরী আলো লাভ করতে পারেন না, যা আপনাকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে, ন্যায় ও অন্যায় বলে দিতে পারে এবং আপনার জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে।

এরপর যেখান থেকে আপনি আপনার এ অত্যাবশ্যক জ্ঞানের আলো লাভ করতে পারেন। সেই উপায়টি হচ্ছে আপনার ও নিখিল জাহানের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলা সবকিছুই অবগত আছেন, সবকিছুই দেখতে পান, প্রত্যেকটি জিনিসের প্রকৃতি তিনি ভাল করেই জানেন ও বুঝেন। একমাত্র তিনিই বলে দিতে পারেন যে, কোন জিনিসে আপনার প্রকৃত উপকার, আর কোন জিনিসে আপনার আসল ক্ষতি হতে পারে, কোন কাজ আপনার করা উচিত, কোন কাজ করা উচিত নয়। আল্লাহ তাআলার কোন কিছুর অভাব নেই, তাঁর কোন স্বার্থ নেই, তিনি কারোও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। তিনি ধোঁকা দিয়ে (নাউযুবিল্লাহ) আপনার কাছ থেকে তাঁর নিজের কোন স্বার্থ আদায় করবেন না। কারণ তিনি পাক-পবিত্র, তিনি সবকিছুর মালিক, তিনি যা কিছু পরামর্শ দিবেন তার মধ্যে তাঁর নিজের স্বার্থের কোন গন্ধ নেই এবং তা কেবল আপনারই উপকারের জন্য। এছাড়া আল্লাহ তাআলা ন্যায় বিচারক, তিনি কখনও কারো ওপর অবিচার করেন না। কাজেই তাঁর সকল পরামর্শ নিশ্চয়ই নিরপেক্ষ, ন্যায় ও ফলপ্রসূ হবে। তাঁর আদেশ অনুযায়ী চললে আপনার নিজের ওপর বা অন্য কারো ওপর কোন যুলুম হবার আশংকা নেই।

আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে যে আলো পাওয়া যায়, তা থেকে কল্যাণ লাভ করা দু'টি জিনিসের ওপর একান্তভাবে নির্ভর করে। প্রথম জিনিস এই যে, আল্লাহ তাআলা এবং তিনি যে নবীর মাধ্যমে এ আলো পাঠিয়েছেন সেই নবীর প্রতি আপনাকে প্রকৃত ঈমান আনতে হবে, আপনাকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর রাসূল যে বিধান ও উপদেশ নিয়ে এসেছেন, তা সম্পূর্ণ সত্য; তার সত্যিকার উপকারিতা যদি আপনি অনুভব করতে না-ও পারেন তবুও আপনাকে একথা বিশ্বাস করতে হবে।

দ্বিতীয়ত ঈমান আনার পর আপনি আপনার জীবনের প্রত্যেকটি কাজেই আল্লাহর সেই বিধান অনুসরণ করে চলবেন। কারণ তাঁর প্রতি ঈমান আনার পর কার্যত তাঁর অনুসরণ না করলে সেই আলো হতে কিছুমাত্র ফল পাওয়া যেতে পারে না। মনে করুন, কোন ব্যক্তি আপনাকে বললো, অমুক জিনিসটি বিষ, তা প্রাণীর প্রাণ নাশ করে; কাজেই তা খেও না। আপনি বললেন, হাঁ ভাই, তুমি যা বলেছ তা খুবই সত্য, তা যে বিষ এবং তা প্রাণ ধ্বংস করে, তাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু এ সত্য জেনে-শুনে বিশ্বাস করে এবং মুখে স্বীকার করেও আপনি তা খেলেন। এখন বিষের যা আসল ক্রিয়া তা তো হবেই। জেনে খেলেও হবে, না জেনে খেলেও হবে। আপনাকে যে কাজের হুকুম দেয়া হয়েছে, কেবল মুখে মুখে তাকে সত্য বলে স্বীকার করেই বসে থাকবেন না বরং তাকে কাজে পরিণত করবেন। আর যে কাজ করতে আপনাকে নিষেধ করা হয়েছে, শুধু মুখে মুখে তা থেকে ফিরে থাকার কথা মেনে নিলে চলবে না, বরং আপনার জীবনের সমস্ত কাজ-কারবারেই সেই নিষিদ্ধ কাজ হতে ফিরে থাকতে হবে। এজন্য আল্লাহ তাআলা বার বার বলেছেনঃ

"আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম মেনে চল।" (আন নিসা: ৫৯)

"যদি তোমরা রাসূলের অনুসরণ কর, তবেই তোমরা সৎপথের সন্ধান পাবে।" (সূরা আন নূর: ৫৯)

"যারা আমার রাসূলের হুকুমের বিরোধিতা করছে, তাদের ভয় করা উচিত যে, তাদের ওপর বিপদ আসতে পারে।" -(সূরা আন নূরঃ ৬৩)

শেখ জায়েদ ফাহিম (জুনায়েদ) এ প্রসঙ্গে বলেন, কেবল আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলেরই আনুগত্য করা উচিত; এর অর্থ এই নয় যে, কোন মানুষের হুকুম আদৌ মানতে হবে না। অন্য যে কোন বৈধ আনুগত্য প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই আনুগত্য কেননা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের আনুগত্য করার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে।

১) আমরা শুধুমাত্র তারই আনুগত্য করতে পারি যার আনুগত্য করার হুকুম স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন: যেমন খলিফাহ (আমীরুল মুমিনীন এবং শুধুমাত্র তার নিয়োগকৃত আমীরগণ), পিতামাতা, স্বামী ইত্যাদি। যখনই আল্লাহ তাঁর ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য করার কথা বলেছেন তখনই সেই আনুগত্যকে তিনি তাওহীদ অথবা শরীয়াহ অথবা তার নিজের আনুগত্যের সাথে সম্পর্কিত করেছেন।

"আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহার কর।” (আল-বাকারাহঃ ৮৩)

"আমরা মানুষকে নিজেদের পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু তারা যদি আমার সাথে এমন কোন (মাবুদকে) শরীক বানানোর জন্য চাপ দিয়ে থাকে যাকে তুমি (আমার শরীক) বলে জান না, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না আমারই দিকে তোমাদের সকলকে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি তোমাদিগকে জানাব যে তোমরা কি করছিলে!" (লোকমানঃ ১৫)

এই একই নিয়ম রাসূল (সাঃ) এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়েছে। “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের (সাঃ) আনুগত্য করবে সে সেইসব লোকদের সংগী হবে যাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা নিয়ামত দান করেছেন তারা হচ্ছে আম্বিয়া, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎলোকগণ।" (আন-নিসা ৬৯)

পক্ষান্তরে "যে আল্লাহ ও রাসূলের (সাঃ) নাফরমানী (অবাধ্যতা) করবে এবং তার নির্ধারিত সীমাসমূহকে লংঘন করবে তাকে আল্লাহ আগুনে নিক্ষেপ করবেন, সেখানে সে সব সময় থাকবে আর ইহা তার জন্য অপমানকর শাস্তি বিশেষ”। (আন-নিসা ১৪)

অনেক আয়াতে রাসূল (সাঃ) যে আল্লাহ সুবহানুতায়ালার কর্তৃত্ব ও হুকুমের অধীন তা পরিষ্কারভাবে দেখানো হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ "হে নবী! আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না।" (আহযাব-১)

অধিকন্তু নবীর আনুগত্য শর্তহীন কেননা নবী (সাঃ) কাজ করতেন ওহীর ভিত্তিতে ও তার হুকুম ও ছিল ওহীর ভিত্তিতে। "যে রাসূলের (সাঃ) আনুগত্য করল সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্য করল।" (নিসা: ৪০)

এবং নবী (সাঃ) বলেন: "যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল এবং যে আমার অবাধ্যতা করল সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল এবং যে আমার আমীরের (খলীফা বা আমীরুল মুমেনীন এবং তার নিয়োগকৃত বৈধ আমীরগণ) আনুগত্য করল সে আমার আনুগত্য করল এবং যে আমার আমীরের অবাধ্যতা করল সে আমার অবাধ্যতা করল।" (বুখারী কিতাবুল আহকাম এবং মুসলিম কিতাবুল ইমারাহ)

আল হারিস আল আশয়ারী রাসূল (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন আল্লাহ আমাকে পাঁচটি কাজের হুকুম দিয়েছেন এবং আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজের হুকুম দিচ্ছি। শুনা ও মানা, জিহাদ, হিজরাত ও জামায়াতবদ্ধ হওয়া কেননা যে আল-জামায়াহ (সমস্ত দুনিয়ার মুসলিমদের শুধুমাত্র একটি শরয়ী জামায়াহ বা জামায়াতুল মুসলিমীন) থেকে এক বিঘত দূরে সরে যায় সে ইসলামের রজ্জু গলা থেকে খুলে ফেলে। (আহমাদ ৪/১৩০,২০২)

শেষোক্ত দুই হাদীসে দেখানো হয়েছে যে খলিফার আনুগত্যের মাঝে নবীর আনুগত্য ও নবীর আনুগত্যের মাঝে আল্লাহর আনুগত্য নিহিত। এটা এই আয়াত থেকে পরিষ্কারঃ "হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং সে সব লোকদেরও আনুগত্য করো, যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব সম্পন্ন। আর যদি তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে মীমাংসার জন্য বিষয়টিকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের নিকট প্রত্যার্পন করো যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান এনে থাকো। এটাই মঙ্গলজনক এবং পরিণতির দিক দিয়ে এটাই উত্তম।" (সূরা নিসা-৫৯)

[ বিঃ দ্রঃ এখানে একটা বিষয় বুঝা অত্যন্ত জরুরী। উলিল আমর বা আমীরের আনুগত্য বলতে কি বুঝানো হয়েছে তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে যে কেউ একটা নাম দিয়ে ইসলামী দল বা ফেরকা বানিয়ে নেয় আর আমির হয়ে এ আয়াত দেখিয়ে মুসলিম জনগণের বা তার অনুসারীদের কাছে আনুগত্য দাবি করে ও বলে আল্লাহ্ তাকে আনুগত্য করতে বলেছে এবং তার আনুগত্য না করলে জাহান্নাম যেতে হবে ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে হুদাইফাহ্ বিন আল-ইয়ামান (রাঃ) থেকে দুটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে (বুখারী ও মুসলিম) বর্ণিত একটা দীর্ঘ হাদীসের অংশ বিশেষ তুলে ধরছি। হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ তারপর আমি (হুদাইফাহ্ বিন আল-ইয়ামান) জিজ্ঞেস করলাম ঐ আংশিক ভালোর পর কি আবার মন্দ আসবে? তিনি (সাঃ) জবাব দিলেন “হ্যাঁ দোজখের আগুনের ফটকের আহবানকারীরা (অর্থাৎ ইসলামীদলের নামধারী ফিরকার নেতারা), যে ব্যক্তিই তাদেরকে ইতিবাচক জবাব দেবে (অর্থাৎ তাদের বানান ইসলামী দলে বা ফিরকায় যোগ দিবে) তারা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।” আমি তখন তাকে তাদের সম্পর্কে আমাদের কাছে বিবরণ দিতে বললাম, তিনি বললেন, "তারা আমাদের জাতির লোক হবে, এবং আমাদের ভাষায়ই কথা বলবে।” (অথাৎ মুসলিম জাতির লোক এবং ইসলামের ভাষায় কথা বলবে) আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- আমি যদি সে সময় বেঁচে থাকি তাহলে আপনি আমাকে কি উপদেশ দেবেন, তিনি (সাঃ) বললেন, মুসলমানদের মূল অংশের (জামায়াতুল মুসলিমীন) এবং তাদের ইমামের (খলিফাহ) সাথে লেগে থাকবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম যদি আল জামায়াহ এবং তার ইমাম (খলিফা) না থাকে তাহলে কি করবো। তিনি জবাব দিলেন "সকল দল থেকে বেরিয়ে যাও এমনকি সেক্ষেত্রে যদি তোমাকে তোমার (তুমি যখন তোমার ঐ অবস্থায় থাক) কাছে মৃত্যু না আসা পর্যন্ত গাছের তলায় বসে থাকতে হয় তবুও।” (BUKHAARI English/Arabic: vol. 4 [803] and vol. 9 [206]. MUSLIM [. 4553])

উপরোক্ত হাদীস থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আল-জামায়াহ জামায়াতুল মুসলিমীন এবং তার খলীফা ও তার মনোনীত আমীরের হুকুম পালন আল্লাহর হুকুম পালনেরই নামান্তর। যে কোন ইসলামী দল বা ফিরকার নেতার আনুগত্য আমার জন্য ওয়াজিব নয়। উপরন্তু আল-জামায়াহ বা জামায়াতুল মুসলিমীন এবং তার খলীফাহকে না পাওয়া গেলে এই সকল ইসলামী নামধারী ফেরকা থেকে বেঁচে থাকার হুকুম দেওয়া হয়েছে। উপরোক্ত আয়াতসমূহ ও হাদীস থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে আনুগত্য শুধু তাদেরই করা যাবে যাদের আনুগত্য করার জন্য আল্লাহ্ স্বয়ং নির্দেশ দিয়েছেন।] [কুরআন ও সুন্নাহ দলীল ভিত্তিক আল জামায়াহ ও আমীরুল মুমিনীন বা খলিফা সম্পর্কে জানতে হলে পরবর্তী বই আল জামায়াহ সংগ্রহ করুন।]

২) আমরা শুধুমাত্র সেইসব নির্দেশই মানব যা আল্লাহর হুকুম ও ইসলামের নীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল: আলী (রাঃ) রাসূল থেকে বর্ণনা করেন "(আল্লাহর) অবাধ্যতার মাঝে কোন আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধুমাত্র মারুফ কাজে (মুসলিম কিতাবুল ইমারাহ (নং ৪৫৩৬ বুখারী (ইংরেজী ভার্সন ভলিয়ম ৯ নং ২৫৯১)। নওয়াস বিন সামআন নবী (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন "স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।” (ইমাম বাগহাউই শরহে সুন্নাহ [১০/৪৪) আহমদ, আল হাকিম)

৩) আমরা তাদের আনুগত্য করব শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য এবং এই উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে তাদের আনুগত্য করব না : বল- “আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু সবই সারা জাহানের রব আল্লাহ্র জন্য।” (আনআম: ১৬২) "যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোন জীবন ব্যবস্থা অবলম্বন করতে চায় তার সেই পন্থা একেবারেই কবুল করা হবে না এবং পরকালে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (ইমরান: ৮৫)

যদি উপরোক্ত ৩টি শর্ত না পাওয়া যায় তাহলে এ সকল লোকের প্রতি আনুগত্য করার ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে শিরক বা হারাম হতে পারে। যদি এই আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য করার কোন উদ্দেশ্য বা নিয়ত যদি ঐ ব্যক্তির মধ্যে না থাকে তাহলে এটা হবে আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিরক এবং তা ইসলাম থেকে বের করে দেয় যদিও যাদের মান্য করা হচ্ছে তারা পিতা-মাতা, স্বামী বা খলীফা হয় এবং তাদের হুকুম ও ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ হয়।

আসলে এর অর্থ এই যে, আপনারা অন্ধ হয়ে কারো পিছনে চলবেন না। আল্লাহ তাআলা যা কিছু হুকুম আহকাম দিয়েছিলেন, তা সবই এখন পবিত্র-কুরআন ও হাদীসের মধ্যে নিহিত আছে। কিন্তু এ কুরআন শরীফ এমন কোন জিনিস নয়, যা নিজেই আপনাদের সামনে এসে আপনাদরকে আল্লাহর কথা বলবে ও হুকুম দান করবে এবং আপনাদেরকে আল্লাহর নিষিদ্ধ পথ হতে বিরত রাখবে। আল্লাহর মনোনীত বৈধ মানুষই আপনাদেরকে কুরআন ও হাদীস অনুসারে পরিচালিত করবে। কাজেই মানুষের অনুসরণ না করে কোন উপায় নেই। অবশ্য অপরিহার্য কর্তব্য এই যে, আপনারা কোন মানুষের পিছনে অন্ধভাবে চলবেন না। আপনারা সতর্কভাবে শুধু এতটুকুই দেখবেন যে, সেই খলিফা বা আমীরুল মুমিনীন ও উনার নিয়োগকৃত বৈধ আমীরেরা আপনাদেরকে পবিত্র কুরআন ও হাদীস অনুসারে পরিচালিত করে কি না। যদি কুরআন ও হাদীস অনুসারে চালায় তবে তাদের অনুসরণ করা আপনাদের কর্তব্য এবং তার বিপরীত পথে চালালে তাদের অনুসরণ করা পরিষ্কার হারাম।

📘 তাগুত > 📄 ইবাদত কিভাবে করতে হবে

📄 ইবাদত কিভাবে করতে হবে


"আকাশ, পৃথিবী ও দু'য়ের মধ্যবর্তী বিষয়গুলোকে আমরা ছেলেখেলার জন্যে সৃষ্টি করিনি। যদি খেলনা তৈরী করাই আমাদের উদ্দেশ্য হতো, তাহলে (অন্যবিধ উপায়ে) খেলার সরঞ্জাম সৃষ্টি করতাম।” (আম্বিয়া ১০-১২)

এই আয়াত থেকে বুঝা গেল স্রষ্টা একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার অগণিত নিয়ামক আমাদের ভোগ করতে দিয়েছেন। তিনি আমাদের থেকে যা চান তা হচ্ছে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা শুধু উনার হুকুমের অনুসরণ করব অর্থাৎ শুধুমাত্র উনার ইবাদত করব। ইবাদত করলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব (Pleasure of Allah s.w.t) এবং উনি সন্তুষ্ট হলে আমরা জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে বাঁচতে পারবো এবং চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব হবে। এখন একজন ইহুদী, খৃষ্টান, বৌদ্ধ কিংবা হিন্দুকে জিজ্ঞাস করেন কেন দুনিয়াতে এসেছে? তারাও কিন্তু আপনাকে বলবে 'গড' বা ঈশ্বর 'ভগবানের' ইবাদত করতে এসেছি। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? খ্রীস্টানদের দেখুন 'গড' এর সন্তুষ্টির জন্য পাদ্রী এবং নানরা বিয়ে করা ছেড়ে দিয়েছে। হিন্দু সন্নাসীদের দেখুন 'ভগবানের' সন্তুষ্টির জন্য উচ্চ মর্যাদার (হিন্দুদের মাঝে) পুরোহিতরা পশুর ন্যায় উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। এদের এ সকল আত্মদানে কি তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে? কখনও নয় এরা সকলে شر البرية (শাররুল বাড়িয়া) বা নিকৃষ্টতম জীব (Worst of creatures) কারণ তারা আল্লাহর হুকুমের তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছামত ইবাদতের পন্থা উদ্ভাবন করে নিয়ে নিজেরা আমল করছে এবং তাদের অনুসারীদেরকে এ সকল ভ্রান্ত আমলের দিকে ডাকছে। "রাহবানিয়াত (অত্যধিক ভয়ের কারণে গৃহীত কৃচ্ছসাধনা ও বৈরাগ্য নীতি) তারা নিজেরাই রচনা করে নিয়েছে। আমরা তাদের উপর এ নীতি লিখে ফরয করে দেইনি। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি সন্ধানে তাহারা নিজেরাই এই 'বিদ'আত' বানাইয়াছে।" (আল হাদীদ: ২৭)

অতএব পরকালে এদের স্থান হবে চিরস্থায়ী জাহান্নাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এদের সম্পর্কে কোরআনে বলেনঃ

"বলুন : আমি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেব, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়; অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করছে।” [সূরা কাহাফ ১০৩-১০৪]

অর্থাৎ 'ইবাদত' করতে হবে ইলাহর ইচ্ছা অনুযায়ী দলিল মোতাবেক (কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে)। নিজের আলেম, পুরোহিত, পাদ্রী, বুজুর্গ, বাপ, দাদার এবং নিজের নফসের ইচ্ছা অনুযায়ী নয়। যিনি রব, মালিক ইলাহ তার ইচ্ছানুযায়ীই তার বান্দাকে চলতে হবে। এরশাদ হচ্ছেঃ

"তাহারা তো আদিষ্ট হইয়াছিল আল্লাহ্ আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হইয়া একনিষ্টভাবে তাঁহার ইবাদত করতে এবং সালাত কায়েম করতে ও যাকাত দিতে, ইহাই সঠিক দ্বীন।" [বাইয়্যিনাহ ০৫]

"বল, "হে অজ্ঞ ব্যক্তিরা! তোমরা কি আমাকে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করতে বলছো?" [আয যুমার: ৬৪]

আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী ইবাদত করতে হবে বুঝলাম কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা কোনটি কিভাবে বুঝবো। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন:

"আমি হুকুম করলাম, তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও। অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়েত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হেদায়েত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোন ভয় আসবে, না (কোন কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তস্ত্র হবে। আর যে লোক তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী; অনন্তকাল সেখানে থাকবে।” (আল-বাকারা: ৩৮-৩৯)

প্রত্যেক রাসূল আল্লাহ্ তাআলার তরফ থেকে শরীয়ত ও কিতাব প্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু কোন নবীই শরীয়ত ও কিতাব প্রাপ্ত হননি। তাঁরা শুধু রাসূলদের আনীত কিতাবের মাধ্যমেই তাঁদের উম্মতদেরকে পরিচালিত করতেন। অর্থাৎ সব রাসূলই নবী ছিলেন কিন্তু সব নবী রাসূল (কিতাব ও শরীয়াত প্রাপ্ত) ছিলেন না। অর্থাৎ প্রত্যেক যুগেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নবী ও রাসূল পাঠিয়ে তাদেরকে তার ইবাদতের পন্থা বলে দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন কিভাবে তিনি ইবাদত চান। "প্রতিটি কওমের জন্য রয়েছে পথ প্রদর্শক।” [রাদ: ০৭] "কোন রাসূল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শাস্তি দেই না।” (বনী ইসরাইল: ১৫) এখন আমাদের বুঝতে হবে ইবাদত করতে হলে দলিল দরকার আর দলিল হল আসমানি কিতাব (কুরআন) ও নবীর সুন্নাহ। রাসূল (সাঃ) আসার পূর্ব পর্যন্ত যত নবী ও রাসূল এসেছেন এবং তারা যে সকল আসমানি কিতাব রবের কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন তা সেই সকল নবী ও রাসূলের নিজ নিজ উম্মতের জন্য ছিল এবং যেগুলো সবই বাতিল হয়ে গেছে কুরআন নাযিলের পর। কারণ প্রথমত পূর্ববর্তী কিতাবগুলিকে আলেম ও পাদ্রীরা বিকৃত করে ফেলেছে এবং দ্বিতীয়ত শেষ নবী রাসূল (সাঃ) যে শরীয়ত নিয়ে এসেছেন আল কুরআন যা পূর্ববর্তী সকল কিতাবকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে।

"আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করিলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করিলাম হাদিস ওমর (রাঃ) ও।" [সূরা মায়েদা : ৩]

"নিশ্চয়ই আমি আত্মসমর্পণকারীদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ, পথনির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ (হে নবী) তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি। (নাহল: ৮৯)

এই আয়াতগুলি থেকে বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তারই ইবাদত করার জন্য আমাদের জন্য একটি শরীয়াত এবং একটি কর্মপথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এই কুরআনে। অর্থাৎ তিনি কিভাবে আমাদের কাছ থেকে ইবাদত চান তার জন্য আল-কোরআন নাযিল করেছেন এবং রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করেছেন যেন তিনি দেখিয়ে দিয়ে যান কিভাবে আল-কুরআন মোতাবেক ইবাদত করতে হবে। অর্থাৎ আল-কুরআন হল থিওরী এবং আল-হাদীস (সহীহ) হল প্রাকটিক্যাল।

হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ "কুরআনই ছিল রাসূলুলাহ (সাঃ)-এর চরিত্র।” (আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ)

এখন কিয়ামত পর্যন্ত আমাদরেকে আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা বানী হিসেবে শুধু আল-কুরআনকে অনুসরণ করতে হবে এবং রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহকে মেনে নিতে হবে। ইহুদী খ্রীষ্টানরা যে বানী অনুসরণ করে তা বিকৃত হয়ে গেছে এবং তা বিকৃত হবার যথেষ্ট দলিল প্রমাণ রয়েছে। তারা নিজেরাই দ্বিধাবিভক্ত কোনটা অনুসরণ করবো নিউ টেষ্টামেন্ট না ওলড টেষ্টামেন্ট। তারা বুঝে উঠতে পারছে না তিন গড কিভাবে আবার এক গড হয়ে যায়। তাদের লোকদের দ্বারা বিকৃত করা কিতাবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রচুর ভারসাম্যহীন কথা বার্তা। তাদের কিতাবের অবিকৃত থাকার কোন সনদ নাই। অথচ আল কোরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ভারসাম্য পূর্ণ কিতাব। আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা নিজেই একে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকবে।

"আমিই কুরআন অবতীর্ণ করিয়াছি এবং অবশ্য আমিই উহার সংরক্ষক।" [সূরা হিজর : ৯]

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। ধরুন দুনিয়াতে যত কিতাব আছে কোরআন সহ সব এক জায়গায় একত্রিত করে আটকে রাখি। এবার ঠিক যেইভাবে ছিল পূণর্বার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না করে দুনিয়ার কোন কিতাবটা আবার অবিকল লিখে রাখা সম্ভব তা বলতে পারেন কি? তা হল আল কোরআন। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আল কুরআনকে হেফাযত করবেন বলেছেন আর তিনি হেফাজত করেছেন মানুষের অন্তরে হেফয করার মাধ্যমে। দুনিয়াতে বর্তমানে দুই কোটি হাফেজ রয়েছে। দিন দিন আল্লাহর রহমতে হাফেজ বেড়েই চলছে কমছে না। দুনিয়ার অন্য কোন কিতাবের হাফেজ নেই। যার ফলে কোরআন বিকৃত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই এবং তা শয়তানের দল চাইলেও করতে পারছে না, সাথে সাথে ধরে ফেলা হচ্ছে (সুবহান আল্লাহ্)। এছাড়াও সম্পূর্ন বিজ্ঞানময় কোরআন। ১৪০০ বৎসর আগে রাসূল (সাঃ) যে অহি নিয়ে এসেছিলেন তা আজও জ্ঞান বিজ্ঞানের রহস্য উম্মোচনে প্রধান হাতিয়ার। বিজ্ঞানের অনেক নতুন থিওরী আসে আবার অনেকগুলি ভুল প্রমাণিত হয়ে অতল গহবরে তলিয়ে যায়। অথচ কোরআনে মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যা কিছু বলে দিয়েছেন তাই অনন্ত সত্য ও অপরিবর্তনীয়। তেমনি হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ থেকে নিয়ে দুনিয়াতে যত ধর্ম এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ আছে তা সবই বিকৃত এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও ভারসাম্যহীন। তাদের কিতাবগুলি না পড়লে বুঝবেন না তা কত কুরুচিপূর্ণ ও ভারসাম্যহীন বিষয় সম্বলিত।

"আল্লাহ অতি উত্তম কালাম নাযিল করিয়াছেন। ইহা এমন এক কিতাব যাহার সমস্ত অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। (আয যুমার: ২৩)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00