📘 তাগুত > 📄 মুসলিম ও কাফেরের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য

📄 মুসলিম ও কাফেরের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য


প্রত্যেক মুসলমান নিশ্চয়ই একথা জানে যে, আল্লাহ্ তা'য়ালা মুসলমানকে পছন্দ করেন এবং কাফেরকে অপছন্দ করেন। মুসলমানের গোনাহ্ ক্ষমা করা হবে কাফেরের অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। মুসলমান জান্নাতে যাবে এবং কাফের জাহান্নামে। কিন্তু মুসলমান এবং কাফেরের মধ্যে এতখানি পার্থক্য কেন হলো, সেই সম্বন্ধে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা আবশ্যক। কাফের ব্যক্তিরা যেমন হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান, মুসলমানরাও তেমনি তাঁর সন্তান। মুসলমানদের মত তাদেরও হাত-পা, চোখ-কান সবই আছে। তাদের জন্ম এবং মৃত্যু মুসলমানদের মতই হয়। যে আল্লাহ্ মুসলমানদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাদেরকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তাহলে মুসলমান কেন জান্নাতে যাবে আর তারা কেন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে? একথাটি বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখা আবশ্যক। মুসলমানদের এক একজনের নাম রাখা হয়েছে আবদুল্লাহ, আবদুল হামিদ বা তদনুরূপ অন্য কোন নাম, অতএব তারা মুসলমান। আর কিছু লোকের নাম রাখা হয়েছে দীলিপ, জগদীশ, জন প্রভৃতি, কাজেই তারা কাফের; কিংবা মুসলমানগণ খাৎনা করায়, আর তারা তা করায় না। মুসলমান গরুর গোশত খায়, তারা তা খায় না- শুধু এটুকু কথার জন্যই মানুষে মানুষে এতবড় পার্থক্য হতে পারে না। আল্লাহ্ তায়ালাই যখন সমস্ত মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সকলকেই তিনি লালন-পালন করেন তিনি এতবড় অন্যায় কখনও করতে পারেন না। কাজেই তিনি এ রকম সামান্য বিষয়ের কারণে তাঁর সৃষ্ট এক শ্রেণীর মানুষকে অকারণে দোযখে নিক্ষেপ করবেন তা কিছুতেই হতে পারে না।

বস্তুত উভয়ের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য কেবলমাত্র কুফরি ও ইসলামের। ইসলামের অর্থ-আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা এবং কুফরীর অর্থ আল্লাহকে অস্বীকার করা, অমান্য করা ও আল্লাহ্ তাআলার অবাধ্য হওয়া। মুসলমান ও কাফের উভয়ই মানুষ, উভয়ই আল্লাহ তা'য়ালার সৃষ্ট জীব, তাঁরই আজ্ঞাবহ দাস। কিন্তু তাদের একজন অন্যজন অপেক্ষা এজন্য শ্রেষ্ঠ যে, একজন নিজের প্রকৃত মনিবকে চিনতে পারে, তার সাথে কাউকে শরীক করে না, তাঁর আদেশ পালন করে এবং তাঁর অবাধ্য হওয়ার দুঃখময় পরিণামকে ভয় করে। কিন্তু অন্যজন নিজ মনিবকে চিনে না এবং তাঁর আদেশ পালন করে না, এজন্যই সে অধঃপাতে চলে যায়। এ কারণেই মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ্ তা'য়ালা সন্তুষ্ট এবং কাফেরের প্রতি অসন্তুষ্ট, মুসলমানকে জান্নাতে দেয়ার ওয়াদা করেছেন এবং কাফেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার ভয় দেখিয়েছেন।

"যেসব লোক ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে, নিঃসন্দেহে তারাই সৃষ্টির সেরা। তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্যে, যে তার পালনকর্তাকে ভয় করে।" (সূরা বাইয়্যেনা: ৭-৮)

মুসলমানকে কাফের হতে পৃথক করা যায় মাত্র দু'টি জিনিসের ভিত্তিতেঃ প্রথম, ইল্ম বা জ্ঞান; দ্বিতীয়, আমল বা কাজ। অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলমানকে প্রথমেই জানতে হবে যে, তার প্রকৃত মালিক কে? কি তাঁর আদেশ ও নিষেধ? কিসে তিনি সন্তুষ্ট হন আর কিসে তিনি অসন্তুষ্ট হন এসব বিস্তৃতভাবে জেনে নেয়ার পর মালিকের মর্জিমত চলবে, তার মন যদি মালিকের ইচ্ছার বিপরীত কোন বস্তুর কামনা করে তবে সে নিজের মনের কথা না শুনে মালিকের কথা শুনবে। কোন কাজ যদি নিজের কাছে ভাল মনে হয়, কিন্তু মালিক সেই কাজটিকে ভাল না বলেন, তবে তাকে মন্দই মনে করবে। আবার কোন কাজ যদি নিজের মনে খুব মন্দ বলে ধারণা হয়, কিন্তু মালিক তাকে ভাল মনে করেন এবং কোন কাজ যদি নিজের পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে হয় অথচ মালিক যদি তা করার হুকুম দেন, তবে তার জান ও মালের যতই ক্ষতি হোক না কেন, তা সে অবশ্যই করবে। আবার কোন কাজকে যদি নিজের জন্য লাভজনক মনে করে, আর মালিক তা করতে নিষেধ করেন তবে তাতে দুনিয়ার সমস্ত ধন-সম্পত্তি লাভ করতে পারলেও তা সে কখনই করবে না। ঠিক এ ইলম ও এরূপ আমলের জন্যই মুসলমান আল্লাহ্ তা'য়ালার প্রিয় বান্দাহ। তার ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হয় এবং আল্লাহ তা'য়ালা তাকে সম্মান দান করবেন। উল্লেখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে কাফের কিছুই জানে না এবং জ্ঞান না থাকার দরুনই তার কার্যকলাপ ও তদ্রনরূপ হয় না। এ জন্য সে, আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ এবং তাঁর অবাধ্য বান্দাহ। ফলত সে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হবে।

যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়, অথচ কাফেরদের মতই জাহেল বা অজ্ঞ এবং আল্লাহ্ তা'য়ালার অবাধ্য, এমতাবস্থায় কেবল নাম, পোশাক ও খানা-পিনার পার্থক্যের কারণে সে কাফের অপেক্ষা কোনভাবেই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না, আর কোন কারণেই সে ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ তা'য়ালার রহমতের হকদার হতে পারে না। এরশাদ হচ্ছেঃ

"ইহাদিগকে জিজ্ঞাস কর, যে জানে ও যে জানে না ইহারা উভয় কি কখনো সমান হতে পারে? বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরাই তো নসীহত কবুল করিয়া থাকে।" (যুমার: ৯)

"প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল ইলম সম্পন্ন লোকেরাই তাঁহাকে ভয় করে।" (ফাতির: ২৮)

ইল্ম (জ্ঞান) হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি যে বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন তাকে ইলম বা জ্ঞান দান করেন। এটা সেই জ্ঞান যা ওহী হিসাবে মহান আল্লাহ্ নাযিল করেছিলেন রাসূল (সাঃ) এর প্রতি কিতাব ও সুন্নাহর জ্ঞান এবং এর থেকে উদ্ভুত শাখা প্রশাখাসমূহ। ওহীর এই জ্ঞান এতই মর্যাদাপূর্ণ যে একে ইলম শরীফ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।

"আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাত নাযিল করেছেন এবং তোমাকে এমন জ্ঞান জানিয়ে দিয়েছেন যা তোমার জানা ছিল না। বস্তুতঃ তোমার প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ বিরাট।" (আন নিসা: ১১৩)

এটাই হচ্ছে সেই জ্ঞান যাহা মৃত হৃদয়কে জীবন্ত ও আলোকিত করে এবং বিপন্ন মানবতাকে অন্ধকারের গভীর থেকে আলোতে নিয়ে আসে।

"যে ব্যক্তি প্রথমে মৃত ছিল, পরে আমরা তাহাকে জীবন দান করিলাম এবং তাহাকে সেই রৌশনী দান করলাম যাহার আলোক-ধারায় সে লোকদের মধ্যে জীবন-যাপন করে, সে কি সেই ব্যক্তির মত হইতে পারে, যে ব্যক্তি অন্ধকারের মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছে এবং তাহা হইতে কোনক্রমেই বাহির হয়না? কাফেরদের জন্য এই রকমই তাহাদের আমলকে চাকচিক্যময় বানাইয়া দেওয়া হইয়াছে।" (সূরা আন'আম: ১২২)

যাদেরকে কুরআনে বলা হয়েছে সবচেয়ে ভাল এবং সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী তারা হচ্ছে সেইসব লোক যারা ইল্ম অর্জন করে, সে অনুযায়ী আমল করে ও অন্যদের কাছে তা পৌছিয়ে দেয় (আহলুল ইলম)। কিন্তু দলীল রয়েছে যে, যারা ইলম অনুযায়ী আমল করে না তারা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত।

"হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা কেন সেই কথা বল যাহা কার্যতঃ কর না? আল্লাহ্র নিকট ইহা অত্যন্ত ক্রোধ উদ্রেককারী ব্যাপার যে, তোমরা বলিবে এমন কথা যাহা কর না" (আস-সাফ: ২-৩)

ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর 'মাজমুআ আল-ফাতওয়াতে' বলেন যে যারা ইল্ম অর্জন করে তাঁরা হচ্ছেন আম্বিয়া কেরামের উত্তরাধিকারী ও রাসূল (সাঃ) এর খলিফা। তাঁরা সেই মাটির মত যেখানে পানি জমা হয় ও সবুজ ঘাস জন্মে। আল্লাহ ঈমানদারগণকে সেই জ্ঞান দান করেন যা তারা জানত না, এরশাদ হচ্ছেঃ

"যেমন (এই দিক দিয়া তোমরা কল্যাণ লাভ করিয়াছ যে,) আমি তোমাদের প্রতি স্বয়ং তোমাদেরই মধ্য হইতে একজন রসূল পাঠাইয়াছি, যে তোমাদিগকে আমার আয়াত পড়িয়া শুনায়; তোমাদের জীবন পরিশুদ্ধ ও উৎকর্ষিত করিয়া তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেয় এবং যেসব কথা তোমাদের অজ্ঞাত, তাহা তোমাদিগকে জানাইয়া দেয়।” (বাকারাহ:- ১৫১)

আল্লাহ তাঁর রাসূল (সাঃ) কে শিক্ষা দিয়েছেন যেন তিনি ইলম বৃদ্ধির জন্য (আল্লাহর) কাছে প্রার্থনা করেন:

"আর দোয়া কর, হে পরোয়ারদিগার! আমাকে আরও অধিক ইলম দান কর।" (তা-হাঃ ১১৪)

জ্ঞানের মধ্যে তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের জ্ঞানই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ তাওহীদের জন্যই আল্লাহ তার বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয। এরশাদ হচ্ছেঃ

"হে নবী জেনে রাখো- আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই (লা ইলাহা ইলাল্লাহ)। ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার ত্রুটির জন্য এবং মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত।” (মুহাম্মদ: ১৯)

বিষয়টা খুবই সহজ বুঝার জন্য। একজন ডাক্তারের ঘরে জন্মেছে বলেই উনার ছেলে যেমন ডাক্তার নয় অর্থাৎ ডাক্তারের ছেলে বলে রুগি দেখে ওষুধ দিতে পারে না কিংবা দিলেও কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না। তাকে অবশ্যই ডাক্তার হবার জন্য যে ইলম আবশ্যক তা কষ্ট করে হলেও হাসিল করতে হবে। এবং প্র্যাকটিস করতে হবে রুগি দেখার জন্য। ঠিক তেমনি মুসলিমের ঘরে জন্মেছে বলেই মুসলিম নয়। ইসলাম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান হাসিল করতে হবে এবং সে অনুযায়ী আমল করলেই মুসলিম হওয়া যাবে। ইসলাম কোন জাতি, বংশ বা সম্প্রদায়ের নাম নয়। কাজেই বাপ হতে পুত্র এবং পুত্র হতে পৌত্র আপনা-আপনিই তা লাভ করতে পারে না। হিন্দুদের মাঝে ব্রাহ্মণের পুত্র মুর্খ এবং চরিত্রহীন হলেও কেবলমাত্র ব্রাহ্মণের পুত্র বলেই সে ব্রাহ্মণের মর্যাদা পেয়ে থাকে এবং উচ্চ বংশ বলে পরিগণিত হয়। আর চামারের পুত্র জ্ঞানী ও গুণী হয়েও নীচ ও হীন থেকে যায়। কারণ সে চামারের মত নীচ জাতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে। এখানে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন:

"তোমাদের মধ্যে যে লোক আল্লাহ তা'য়ালাকে বেশী ভয় করে এবং সকলের অধিক তাঁর আদেশ পালন করে চলে সে-ই তাঁর কাছে অধিক সম্মানিত।”

হযরত ইবরাহীম (আঃ) একজন মূর্তিপূজারীর ঘরে জন্ম লাভ করেছিলেন; কিন্তু তিনি আল্লাহ তা'য়ালাকে চিনতে পেরে তাঁর আদেশ পালন করলেন; এজন্য আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে এবং তার বংশধরের মাঝে যারা মুসলিম তাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত জগতের রিসালাত, নবুয়ত ও খেলাফত অর্থাৎ নেতা বা ইমাম (খলীফা) করে দিয়েছেন।

"স্মরণ কর, যখন ইবরাহীমকে তাহার রব বিশেষ কয়েকটি ব্যাপারে যাচাই করিলেন এবং সেই সব কয়টি ব্যাপারেই সে উত্তীর্ণ হইল, তখন তিনি বলিলেন, "আমি তোমাকে সকল মানুষের নেতা করিতে চাহি।” ইবরাহীম বলিল-"আমার সন্তানদের প্রতিও কি এই ওয়াদা? তিনি উত্তরে বলিলেন,-"আমার এই প্রতিশ্রুতি যালেমদের [ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশে যারা মুসলিম নহে শিরককারী] সম্পর্কে নহে।" (আল বাকারা: ১২৪)

"আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরদিগকে সমগ্র দুনিয়াবাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য দান করিয়া (ও নিজের নবুয়ত ও রিসালাতের জন্য) মনোনীত করিয়াছিলেন।" (সূরা আলে-ইমরান: ৩৩)

"তাহা হইলে ইহারা অন্যান্য লোকদের প্রতি [মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের] কি শুধু এইজন্য হিংসা পোষণ করে যে, আল্লাহ্ তাহাদিগকে বিশেষ অনুগ্রহ দান করিয়াছেন? যদি তাহাই হয় তবে তাহারা যেন জানিয়া রাখে যে, আমরা তো ইবরাহিমের সন্তানদিগকে কিতাব ও বুদ্ধি-বিজ্ঞান দান করিয়াছি এবং বিরাট রাজ্য দিয়াছি।" (সূরা নিসা: ৫৪)

এখানে একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের মালিক। তিনি যদি তাঁর অনুগত দাসদের ইবাদতে খুশী হয়ে কাউকে মর্যাদার আসনে বসান তাহলে অন্যান্য দাসদের এ ব্যাপারে কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। যেমনি ইব্রাহিম (আঃ) এর (আল্লাহর জন্য) কুরবানীতে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা যখন সমস্ত দুনিয়ার নেতৃত্ব দিতে চাইলেন (তার আগে থেকেই তিনি নবী ও রাসূল ছিলেন) তখন ইব্রাহিম (আঃ) উনার বংশধরদের মাঝেও যেন নেতৃত্ব দেয়া হয় তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তার বান্দা ইব্রাহিম (আঃ) এর দোয়া কবুল করলেন। কিন্তু পরিষ্কার শর্ত দিয়ে দিলেন যে- এ নেতৃত্ব শুধুমাত্র তার বংশধরদের মাঝে যারা মুসলিম হবে তাদের জন্য অর্থাৎ তার বংশধরদের মাঝে কোন কাফের, মুশরিক এ নেতৃত্বের দাবীদার হতে পারবে না। পরবর্তীতে তাঁর দুই ছেলে ইস্হাক (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এবং তার বংশধরের মাঝে নবুয়ত, রেসালাত ও খেলাফতের দায়িত্ব অর্পন করলেন। এর ফলশ্রুতিতে ইব্রাহিম (আঃ) এর এক ছেলে ইসহাক (আঃ) এবং তার ছেলে ইয়াকুব (আঃ) নবী ছিলেন এবং ইয়াকুব (আঃ)-এর বংশধরদের নামই বনী ইসরাইল এবং তাদের মাঝেই মুহাম্মদ (সাঃ) আসার আগ পর্যন্ত সমস্ত নবী, রাসুল এবং নেতৃত্ব (খেলাফত) এসেছে। রাসূল (সাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসঃ

"ইসরাইলের বংশধরদের কাছে অব্যাহতভাবে নবী পাঠানো হয়েছিল। বনি ইসরাইলের বংশধরগণের মাঝে নবীগণ শাসন ব্যবস্থা [TASOOSUHUM] প্রতিষ্ঠিত রাখতেন। একজন নবী ইন্তেকাল করলে আরেকজন নবীকে উনার খলিফা (প্রতিনিধি) হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। আমার পরে আর কোন নবী পাঠানো হবে না, তবে তোমাদের আমার পরে বহু খলিফাহ আসবেন। সাহাবীরা মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ঐ সময় আপনি আমাদিগকে কি করার নির্দেশ দেবেন, তিনি জবাব দিলেন, প্রথমজনকে আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি (বাইয়াহ) দেবে এবং এর পরের সর্ব প্রথমকে। তাদেরকে তাদের অধিকার দেবে, কেননা আল্লাহ্ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন তারা (খলিফা) তাদের লোকদের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পূরণ করেছে কি না।” [আল-বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত]

আবার ইব্রাহিম (আঃ) এর ছেলে ইসমাঈল (আঃ) নবী ছিলেন এবং তার বংশই কুরাইশ এবং এ কুরাইশ বংশেই শেষ নবী রাসূল (সাঃ) এসেছিলেন। ইব্রাহিম (আঃ) এর মুসলিম বংশধরদের প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নেতৃত্বের ওয়াদা মোতাবেক কুরাইশ বংশকে কিয়ামত পর্যন্ত খলিফার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যাহা রাসূল (সাঃ) কর্তৃক নিম্নলিখিত সিহাহ সিত্তাহ হাদীস গ্রন্থসমূহের সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, এ 'আমর' অর্থাৎ খেলাফত কুরাইশদের মধ্যে সর্বদা বিরাজমান থাকবে। এমনকি তাদের মধ্য থেকে দু'জন লোক অবশিষ্ট থাকলেও। (সহীহ আল-বুখারী: হাদীস নং-৬৬৪১)

[বিঃ দ্রঃ অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা একথা প্রমানিত যে, মুসলিমদের সর্বোচ্চ নেতা খলিফা বা আমীরুল মুমিনীননকে অবশ্যই মুসলিম কুরাইশ হতে হবে। এটা সাহাবা এবং আলেমদের এজমা। দুনিয়ার বুকে খারিজী আকিদার মুরতাদরা প্রথম রাসূল (সাঃ)-এর এই হুকুম অমান্য করে। তাদের অভিমত ছিল কুরাইশ ও অকুরাইশ যে কাউকে মুসলিম জনগণ খলিফা নিযুক্ত করতে পারবে। মুতাজিলা ও মুর্জিয়া আকীদার লোকজন বিভ্রান্তিতে আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে এই আকীদা পোষণ করে যে কোন কুরাইশই খলিফা হতে পারবে না, কুরাইশ ছাড়া যে কোন মুসলিম খলিফা হতে পারবে। আরেকটা বিষয় বুঝতে হবে যে, খলিফার অধীনে অন্যান্য যে কোন আমির হওয়ার জন্য কুরাইশ কিংবা আরব হওয়ার শর্ত নয়। নাক কাটা হাবশীকেও আমির (খাস) পদে খলিফা নিয়োগ দিলে তার আনুগত্য করা মুসলিম জনগণের জন্য ওয়াজিব। খাস আমির হল যে কোন বিশেষ কাজের জন্য খলিফার নিয়োগ করা আমির যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন যে কোন অঞ্চলের আমীর কিংবা কোন সেনাবাহিনীর আমির কিংবা কোন সফরের আমীর। আর আম আমীর হল সকল মুসলিমের সর্বোচ্চ নেতা বা একমাত্র আমীর বা আমীরুল মু'মীনীন অর্থাৎ খলিফা। এই খলিফার নেতৃত্বে মুসলিম জনগণকে ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক সবসময় একত্রে থাকতে হবে। অর্থাৎ খলিফা থাকার জন্য ইসলামী রাষ্ট্র শর্ত নয়।]

হযরত নূহ (আঃ)-এর পুত্র একজন নবী ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিল; কিন্তু সে আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারল না বলে তাঁর অবাধ্য হয়ে গেল। এজন্য তার বংশমর্যাদার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হলো না। উপরন্তু যে শাস্তি দেয়া হলো, সমস্ত দুনিয়া তা হতে শিক্ষা লাভ করতে পারে। এরশাদ হচ্ছেঃ

"এবং নূহ তাঁর রবকে বললেন, পরওয়ারদিগার! আমার পুত্র অবশ্যই আমার পরিবারভুক্ত, আর আপনার ওয়াদা সত্য এবং আপনি মহাজ্ঞানী। প্রতুত্তরে আল্লাহ্ বলেন, নূহ, সে তোমার পরিবার ভুক্ত নয়, কারণ তার কার্যকলাপ সৎলোকদের মত নয় আর তুমি যে বিষয়ের তাৎপর্য অবগত নও সে বিষয়ে আমার নিকট কোন আবেদন করো না। [হুদ: ৪৫-৪৭]

নূহ (আঃ) ও হযরত লূত (আঃ)-এর বিবিদের কাহিনীও কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দু'জন মহান নবীর বিবিগণ ভিন্ন আকীদা পোষণ করতেন এবং শিরকে লিপ্ত ছিলেন। সেজন্য উভয় পয়গাম্বরই তাঁদের বিবিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরশাদ হচ্ছেঃ

"কাফিরদের শিক্ষা গ্রহণের জন্যে আল্লাহ্ তাআলা নূহ ও লূতের বিবিগণের উদাহরণ পেশ করেছেন। এ দু'জন নারী আমার দু' নেক বান্দার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু তারা খেয়ানত করেছিল। তাই তাদের স্বামীগণও তাদেরকে আল্লাহ্ পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারেনি। উভয় নারীকে আদেশ দেয়া হয়, যাও অন্যান্যদের সাথে তোমরাও জাহান্নামে প্রবেশ কর।" (আত তাহরীম: ১০)

মিসরের অত্যাচারী ও আল্লাহদ্রোহী বাদশা ফিরাউনের বিবির কাহিনীও ঈমানদারদের নমুনা হিসেবে পেশ করা হয়েছে।

"ঈমানদারদের নসিহত করার জন্যে আল্লাহ্ তাআলা ফিরাউনের স্ত্রীর বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি দোয়া করেছিলেন, পরওয়ারদিগার! বেহেশতে তোমার নিকটে আমার জন্যে একখানা ঘর তৈরী কর, আমাকে ফিরাউন ও তার সকল অপকর্মের পরিণাম থেকে মুক্তি দাও এবং যালেমদের অনিষ্টকারিতা থেকেও আমাকে নিরাপদ রাখ।" (আত তাহরীম: ১১)

যাদের ইলম ও আমল নেই, তাদের নাম আবদুল্লাহই হোক, আর আবদুল হামিদ হোক, দীলিপ কুমারই হোক, আর জগদীশই হোক, আল্লাহ তাআলার কাছে এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই- এরা কেউই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ পাবার অধিকার পেতে পারে না।

📘 তাগুত > 📄 মুসলিমদের কেন এ পরিণতি

📄 মুসলিমদের কেন এ পরিণতি


মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণকারী নিজেদের মুসলমান বলে মনে করে এবং সেই মুসলমানের উপর আল্লাহ্ তাআলার রহমত বর্ষিত হয় বলে বিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে এই দুনিয়ায় মুসলমানদের যে দুরাবস্থা হচ্ছে তা একবার খেয়াল করে দেখা আবশ্যক।

আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের কাছে কিতাব পাঠিয়েছেন, তা পড়ে মুসলমানগণ প্রকৃত মালিককে চিনতে পারে; কিন্তু ঐ কিতাবে যা লিখিত আছে, তা জানার জন্য মুসলমানগণ একটুও চেষ্টা করেছে কি? আল্লাহ্ তাআলা তাদের প্রতি রাসূল পাঠিয়েছেন, তিনি মুসলিম হওয়ার উপায় ও নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর নবী দুনিয়ায় এসে কি শিক্ষা দিয়েছেন, তা জানার জন্য তারা কখনও যত্নবান হয়েছি কি? আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে ইজ্জত লাভ করার পথের সন্ধান বলে দিয়েছেন, কিন্তু তারা সেই পথে চলছে কি? যেসব কাজ মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে, আল্লাহ তাআলা তা এক এক করে বলে দিয়েছেন, কিন্তু মুসলমান কি সেসব কাজ ত্যাগ করেছে? এ প্রশ্নগুলোর কি উত্তর হতে পারে?

কাফের অর্থাৎ আল্লাহর অবাধ্য বান্দা যাদেরকে মনে করি, তারা আমাদের ওপর সকল ক্ষেত্রে বিজয়ী কেন? আমাদের ও কাফেরদের মাঝে বর্তমানে শুধু নামেই পার্থক্য রয়ে গিয়েছে। কেননা আমরা জানি যে, কুরআন আল্লাহ্ তাআলার কিতাব, অথচ আমরা কি এর সাথে কাফেরের ন্যায়ই ব্যবহার করছি না? আমরা জানি, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রকৃত শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী, অথচ তাঁর অনুসরণ করা আমরা কাফেরদের মতই ত্যাগ করেছি। আমরা জানি যে, কুরআন হল মুসলিম তথা মানব জাতির একমাত্র সংবিধান। কিন্তু আমরা মানুষের দ্বারা লিখিত সংবিধান দ্বারা সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। আমরা জানি রাসূল (সাঃ) আনীত শরীয়ত মুতাবেক বিচার ফায়সালা করতে হবে। মানুষের তৈরি করা আইনের (তাগুতের আইন) কাছে বিচার-ফায়সালা চাওয়া আলাহর সাথে শিরক হওয়া সত্ত্বেও কুফর কোর্টে বিচার ফায়সালার জন্য যাচ্ছি। মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার হুকুম দলাদলি না করে সর্বাবস্থায় (অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক) মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেককে একজন খলিফার বা আমীরুল মু'মিনীনের নেতৃত্বে একত্রিত থাকা। অথচ আমরা জাতীয়তাবাদ, দেশ, ভাষা, বর্ণে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মাঝে দলাদলি করে শত শত ভাগে বিভক্ত রয়েছি। মিথ্যাবাদীর প্রতি আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন এবং ঘুষখোরদের ও ঘুষদাতা উভয় নিশ্চিতরূপে দোযখে যাবে বলে ঘোষণা করেছেন, সুদখোর ও সুদদাতাকে জগন্য পাপী বলে অভিহিত করেছেন। চোগলখুরী ও গীবতকারীকে আপন ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন, অশ্লীলতা ও লজ্জাহীনতার জন্য কঠিন শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু এ সমস্ত কথা জানার পরও আমরা কাফেরদের মতই বেপরোয়াভাবে এসব কাজ করে যাচ্ছি। মনে হয়, যেন আমাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় বিন্দু মাত্র নেই। এ জন্য কাফেরদের তুলনায় আমরা কিছুটা মুসলমান হয়ে থাকলেও আমাদের জীবনে তার কোন প্রতিফলন আমরা পাচ্ছি না। বরং কেবল শাস্তিই পাচ্ছি নানাভাবে এবং নানাদিক দিয়ে। আমাদের ওপর কাফেরদের জয়লাভ এবং সর্বত্র আমাদের পরাজয় ও অপরাধের শাস্তি।

আল্লাহর কালাম মানুষের কাছে এ জন্য আসেনি যে, এটা পেয়েও সে দুর্ভাগ্য ও দুঃখ-মুসিবতের মধ্যে পড়ে থাকবে। পবিত্র কুরআন তো সৌভাগ্য ও সার্থকতা লাভ করার একমাত্র উৎস; আল্লাহ তাআলা নিজেই বলে দিয়েছেনঃ

طه ما انزلنا عليك القرآن لتشقى (طه : (۲۵))

"ত্ব-হা হে নবী! তোমার প্রতি কুরআন এজন্য নাযিল করিনি যে, এটা সত্ত্বেও তুমি হতভাগ্য হয়ে থাকবে।" (সূরা ত্ব-হাঃ ১-২)

কোন জাতির কাছে আল্লাহ্ কালাম বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তার লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হওয়া, পরের অধীন থাক, অপমানিত ও পদদলিত হওয়া এবং পরের দ্বারা জন্তু-জানোয়ারের মত বিতাড়িত ও নির্যাতিত হওয়া একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। এমন দুঃখপূর্ণ অবস্থা সেই জাতির ঠিক তখনই হতে পারে যখন তারা আল্লাহর কালামের ওপর যুলুম করতে শুরু করে। বনী ইসরাঈলের অবস্থা আপনাদের অজানা নয়। তাদের প্রতি তাওরাত ও ইনজিল নাযিল করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল:

"তাওরাত, ইনজিল এবং অন্যান্য যেসব কিতাব তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছিল, তারা যদি তা অনুসরণ করে চলতো, তবে তাদের প্রতি আকাশ হতে রিযিক বর্ষিত হতো এবং যমীন হতে খাদ্যদ্রব্য ফুটে বের হতো।” (মায়েদা: ৬৬)

কিন্তু তারা আল্লাহ তাআলার এসব কালামের প্রতি যুলুম করেছিল তার ফলে- লাঞ্ছনা এবং পরমুখাপেক্ষিতা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং আল্লাহ্ গযবে তারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছিল, এর কারণ এই যে, তারা আল্লাহর বাণীকে অমান্য করতে শুরু করেছিল, আর পয়গাম্বরগণকে অকারণে হত্যা করেছিল। তাছাড়া আরও কারণ এই যে, তারা আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল এবং তাদের জন্য আল্লাহ্ তাআলা যে সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, তা তারা অতিক্রম করে গিয়েছিল।" (সূরা বাকারা: ৬১)

অতএব, যে জাতি আল্লাহর কিতাব ধারণ করে থাকা সত্ত্বেও দুনিয়ায় লাঞ্ছিত, পদদলিত এবং পরের অধীন ও পরের তুলনায় শক্তিহীন হয়, নিঃসন্দেহে মনে করবেন যে, তারা নিশ্চয়ই আল্লাহর কালামের ওপর যুলুম করছে।। অতএব, আল্লাহর এ গযব হতে রেহাই পাওয়ার এছাড়া আর কোন উপায় থাকতে পারে না যে তারা আল্লাহর কালামের প্রতি যুলুম করা ত্যাগ করবে এবং ষোলআনা 'হক' আদায় করতে চেষ্টা করবে।

📘 তাগুত > 📄 মুসলিম কাকে বলে

📄 মুসলিম কাকে বলে


মুসলমান কাকে বলে এবং মুসলিম শব্দের অর্থ কি, একথা প্রত্যেক মুসলমানকে সর্বপ্রথমেই জেনে নিতে হবে। কারণ মানুষ্যত্ব কাকে বলে এবং মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য কি, তা যদি মানুষের জানা না থাকে, তবে সে জানোয়ারের মত কাজ করতে শুরু করবে। অনুরূপভাবে যদি কেউ একথা জানতে না পারে যে, মুসলমান ও অমুসলমানের মধ্যে কেমন করে পার্থক্য করা যায়, তবে সে তো অমুসলমানের মত কাজ-কর্ম করতে শুরু করবে। অতএব, প্রত্যেক মুসলমানকে এবং মুসলমানের প্রত্যেকটি সন্তানকেই ভাল করে জেনে নিতে হবে যে, সে যে নিজেকে নিজে মুসলমান মনে করে এ মুসলমান হওয়ার অর্থ কি? মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে কি পরিবর্তন ও পার্থক্য হয়ে যায়? তার ওপর কি কর্তব্য ও দায়িত্ব এসে পড়ে? ইসলামের কোন সীমার মধ্যে থাকলে মানুষ মুসলমান থাকতে পারে এবং কোন সীমা অতিক্রম করলেই বা সে মুসলমান হতে খারিজ হয়ে যায়? এসব কথা না জানলে মুখ দিয়ে সে মুসলমানীর যতই দাবী করুক না কেন, তার মুসলমান থাকা সম্ভব নয়।

মুসলিম কাকে বলে একথাটি ভাল করে বুঝার জন্য সর্ব প্রথম আপনাকে কুফর ও ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আল্লাহর হুকুম পালন করতে অস্বীকার করাকেই 'কুফর' বা কাফেরী বলা হয়; আর কেবলমাত্র আল্লাহর হুকুম পালন করে চলা এবং আল্লাহর দেয়া পবিত্র কুরআনের বিপরীত যে নিয়ম, যে আইন এবং যে আদেশই হোক না কেন তা অমান্য করাকেই বলা হয় ইসলাম। ইসলাম এবং 'কুফরের' এ পার্থক্য কুরআন মজীদের নিম্নলিখিত আয়াতে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে:

"আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে যারা ফায়সালা করে না তারাই কাফের।" (সূরা মায়েদা : ৪৪)

আদালত ও ফৌজদারীতে যেসব মোকদ্দমা উপস্থিত হয় কেবল শুধুমাত্র সেই সবের বিচার-ফায়সালা কুরআন-হাদীস অনুসারে করার কথা এখানে বলা হয়নি। বরং প্রত্যেকটি মানুষ তার জীবনের প্রত্যেকটি কাজের সময় যে ফায়সালা করে সেই ফায়সালার কথাই এখানে বলা হয়েছে। প্রত্যেকটি ব্যাপারেই আপনাদের সামনে এ প্রশ্ন ওঠে যে, এ কাজ করা উচিত কি উচিত নয়, অমুক কাজ এ নিয়মে করবো কি আর কোন নিয়মে করবো? এসময় আপনাদের কাছে সাধারণত দু' প্রকারের নিয়ম এসে উপস্থিত হয়। এক প্রকারের নিয়ম আপনাদেরকে দেখায় আল্লাহর কুরআন এবং রাসূলের সুন্নাহ। আর এক প্রকারের নিয়ম উপস্থিত করে আপনদের নফস, বাপ-দাদা হতে চলে আসা নিয়ম-প্রথা অথবা মানব রচিত আইন। এমতাবস্থায় যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া নিয়ম বাদ দিয়ে অন্যান্য পন্থা অবলম্বন করে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, প্রকৃতপক্ষে সে কুফরির পথই অবলম্বন করে। যদি সে তার সমস্ত জীবন সম্বন্ধে এ সিদ্ধান্ত করে নেয় এবং কোন কাজেই যদি আল্লাহর দেয়া নিয়ম অনুসরণ না করে তবে সে পুরোপুরিভাবে কাফের। যদি সে কতক কাজে আল্লাহর হেদায়াত মেনে চলে আর কতকগুলো নিজের নফসের হুকুম মত কিংবা বাপ-দাদার প্রথা মত অথবা মানুষের রচিত আইন অনুযায়ী করে তবে যতখানি আল্লাহ্ আইনের বিরুদ্ধাচারণ করবে, সে ঠিক ততখানি কুফরির মধ্যে লিপ্ত হবে। এ হিসেবে কেউ অর্ধেক কাফের কেউ চার ভাগের এক ভাগ কাফের। মোটকথা, আল্লাহর আইনের যতখানি বিরোধিতা করা হবে ততখানি কুফরী করা হবে, তাতে সন্দেহ নেই। কুরআন শরীফে বলা হয়েছে:

"তোমরা কি আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য করতে চাও? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিস ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক তাঁরই আনুগত্য করে যাচ্ছে। আর সকলেই তাঁর কাছে ফিরে যাবে।" (আলে ইমরান: ৮৩)

আল্লাহর ইবাদতের অর্থ কেবল এটাই নয় যে, দিন-রাত পাঁচবার তাঁর সামনে সিজদা করলেই ইবাদতের যাবতীয় দায়িত্ব প্রতিপালিত হয়ে যাবে। বরং দিন-রাত সর্বক্ষণ একমাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করে চলাকেই প্রকৃতপক্ষে ইবাদত বলে। যে কাজ করতে তিনি নিষেধ করেছেন, তা হতে ফিরে থাকা এবং তিনি যা করতে আদেশ করেছেন তা পূর্ণরূপে পালন করাই হচ্ছে ইবাদত। কারণ হুকুম দেয়ার ক্ষমতা তো কেবলমাত্র আল্লাহ্ তাআলার, "আল্লাহর হুকুম ছাড়া মানুষ অন্য কারো হুকুম মানতে পারে না।” মানুষের ইবাদত-বন্দেগী তো কেবল তিনিই পেতে পারেন, যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যার অনুগ্রহে মানুষ বেঁচে আছে। আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই তাঁর হুকুম পালন করে চলছে। একটি পাথর অন্য পাথরের হুকুম মত কাজ করে না, একটি গাছ আর একটি গাছের আনুগত্য করে না, কোন পশু অন্য পশুর হুকুমদারী করে চলে না। কিন্তু মানুষ কি পশু, গাছ ও পাথর অপেক্ষা নিকৃষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা তো শুধু আল্লাহর আনুগত্য করবে, আর মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে অন্য মানুষের নির্দেশ মত চলতে শুরু করবে? একথাই কুরআনের উপরে উল্লেখিত দুইটি আয়াতে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। মুসলমানের সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছেঃ

"ঐ ব্যক্তির কথা হইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে এবং নিজে নেক আমল করে ও বলে যে, নিশ্চয় আমি মুসলমানদের মধ্য হইতে একজন"। (হা-মিম সিজদাহঃ ৩৩)

📘 তাগুত > 📄 মুসলিমের বৈশিষ্ট্য

📄 মুসলিমের বৈশিষ্ট্য


'মুসলিম' তাকেই বলে যে আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলে এবং তার আদেশ লংঘন করে না। আমাদের ৭০% অথবা ৯৫% মুসলিম হওয়ার কোন সুযোগ নেই। আমাকে ১০০% মুসলিম হতে হবে অর্থাৎ 'আল ইসলাম' কে ১০০% মেনে নিয়ে নিজেকে পেশ করতে হবে। তবে হ্যাঁ হুকুম পালনের ক্ষেত্রে অর্থাৎ আমলের ক্ষেত্রে কমবেশী ভুলভ্রান্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক কারণ শয়তান ও তার সঙ্গী সাথীরা আমাদের পিছনে লেগে আছে সর্বক্ষণ। এরশাদ হচ্ছেঃ

"হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদিগকে কিছুতেই প্রলুব্ধ না করে- যেভাবে তোমাদের পিতামাতাকে সে জান্নাত হইতে বহিষ্কৃত করিয়াছিল, তাহদিগকে তাহাদের লজ্জাস্থান দেখাবার জন্য বিবস্ত্র করেছিল। সে নিজে এবং তাহার দল তোমাদিগকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাহাদিগকে দেখিতে পাও না। যাহারা ঈমান আনে না, শয়তানকে আমি তাহদের অভিভাবক করিয়াছি।” (সূরা আরাফ-২৭)

সে (শয়তান) বলল "আপনি আমাকে যেমন গোমরাহীতে নিমজ্জিত করিয়া দিয়াছেন, আমিও এখন আপনার সত্য সরল পথে এই লোকদের জন্য ওৎ পাতিয়া থাকবো এর পর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।" (আল-আরাফ: ১৬-১৭)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, সেই মহান আল্লাহর শপথ, যিনি শয়তানের ষড়যন্ত্রকে কুমন্ত্রণার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। (আবু দাউদ)

শয়তানের ফাঁদে পরে মুসলিমের দ্বারা কোন ভুল হয়ে গেলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা অনুতপ্ত হৃদয়ে তওবার মাধ্যমে ক্ষমারও ব্যবস্থা রেখেছেন।

"তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্যে ক্ষমাশীল। (বনী ইসরাঈল: ২৫)

"তিনিই তাঁহার বান্দাহগণের নিকট হইতে তওবা কবুল করেন এবং গুনাহ সমূহ ক্ষমা ও মার্জনা করেন। অথচ তোমাদের সব কাজ-কর্ম সম্পর্কে তিনি অবহিত।” (আশ-শুরা: ২৫)

কিন্তু একজন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হতে হবে 'সামি'না ওয়া আত্বা'না" শুনলাম এবং মানলাম (HEAR & OBEY) অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহর (সহীহ হাদীস) সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমপর্ণ করতে হবে। এরশাদ হচ্ছেঃ

"রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও। সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহ্ প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি (সামি'না ওয়া আত্বা'না)। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।” (বাকারাহ: ২৮৫)

"যখন মুমিনদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য তাদেরকে আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তারা একথাই বলে : আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম মূলতঃ তারাই সফল কাম।" (আন নূরঃ ৫১)

"যাহারা মনোযোগ সহকারে কথা শুনে এবং উহার মধ্যে যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করে। ইহারাই সেই লোক যাহাদিগকে আল্লাহ হিদায়াত দিয়েছেন। এবং উহারাই বোধ শক্তি সম্পন্ন।" (আয যুমার: ১৮)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00