📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার আদেশ
মুসলিম হলো যে আল্লাহর আদেশ মেনে চলে এবং তাঁর আদেশ লংঘন করে না। আল্লাহ তায়ালার আদেশ দুই প্রকার। তাকভিনী (সৃষ্টিগত) ও তাশরিয়ী (শরীয়ত গত) আদেশ।
১. তাকভিনী (সৃষ্টিগত) : বাধ্যতামূলকভাবে আদেশ নিষেধ পালন করাই হলো তাকভিনী (সৃষ্টিগত) ইসলাম। যেমন, সূর্যের প্রতি আল্লাহর আদেশ হচ্ছে উদয় হওয়া, অস্ত যাওয়া, আলো ও উষ্ণতা দেয়া ইত্যাদি। সূর্যের শক্তি নেই এই আদেশ অস্বীকার করার। সেরূপে বায়ুর প্রতি আদেশ প্রাণী জগতকে জীবিত রাখা। পানির প্রতি আদেশ তৃষ্ণার্তকে পানি দিবে। এরূপ মানুষের প্রতি সৃষ্টিগত আদেশ হলো জিহ্বা কথা বলবে, কান কথা শুনবে, চোঁখ দেখবে। মানুষের ক্ষমতা নেই জিহবা দ্বারা দেখার বা কান দিয়ে কথা বলার অর্থাৎ এই আদেশ লংঘন করার। আর এটাই হলো তাকভিনী (সৃষ্টিগত) ইসলাম।
২. তাশ্রিয়ী (শরীয়তগত) : যে সব আদেশ নিষেধ যা পালনের জন্মগত বা সৃষ্টিগত কোন বাধ্যবাধকতা নেই তাই হচ্ছে তাশরিয়ী আহকাম। যা স্বাধীন ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। যেমন মানুষ এক আল্লাহর ইবাদত করবে না অন্য কারো ইবাদত বা হুকুমের অনুসরণ করবে তা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। শুধুমাত্র মানুষ ও জ্বীনকে এই ধরনের স্বাধীনতা আল্লাহ্ তা'য়ালা দান করেছেন।
সুতরাং আনুগত্য করার নাম হলো ইসলাম। ইসলাম ও মুসলিম হবার বিষয়টি শুধুমাত্র মানুষ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম কোন এক বিশেষ সৃষ্টির নয়, গোটা সৃষ্টি জগতের দ্বীন হলো ইসলাম। সূর্য, চন্দ্র, সবই আল্লাহর আহকাম পুরোপুরি মেনে চলে। অতএব সূর্য সেও মুসলিম, চন্দ্র সেও মুসলিম। তারকারাজি, বায়ু, পানি সবাই মুসলিম। আগুনের প্রতি আল্লাহর হুকুম আলো দিবে, তাপ দিবে, জ্বালাবে। আগুনের এখতিয়ার নেই অন্য কাজ করার। কিন্তু এই আগুনেই যখন ইব্রাহিম (আঃ) কে নমরুদ ও তার সঙ্গী সাথীরা ফেলেছিল, তখন আগুনের প্রতি আল্লাহ তায়ালার হুকুম ছিলঃ "হে আগুন ইব্রাহীমের প্রতি সু-শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।" আল্লাহর হুকুমে আগুন ইব্রাহীম (আঃ)-এর জন্য তার বৈশিষ্ট পরিবর্তন করেছিল এবং উনাকে জ্বালাবার বদলে আরাম ও শান্তি দিয়েছিল। তাই আগুন মুসলিম।
"(সত্য অস্বীকারকারীর দল কি) আল্লাহ্র দ্বীনের পরিবর্তে অন্য কোন দ্বীনের অনুসন্ধান করে? অথচ আকাশমন্ডলী এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে তারা সকলেই আল্লাহর দ্বীনের অনুগত।” (আলে-ইমরানঃ ৮৩)
"সাত আসমান পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্ তায়ালার তাসবীহ পাঠ করে। এ সৃষ্টিজগতে এমন কোন বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসার সাথে পবিত্রতা ও মহত্ত্ব বর্ণনা করে না। কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ (পবিত্রতা ও মহত্ত্ব বর্ণনা) বুঝতে পারোনা।" (বনী ইসরাঈল: ৪৪)
"তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে, বস্তুত: আল্লাহই এক সত্তা যাকে সেজদা করে সকলেই, যারা আছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে এবং সেজদা করে সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পাহাড়, পর্বত, বৃক্ষরাজি, চতুষ্পদ জন্তু ও বহুসংখ্যক মানুষ।” (সূরা আল হাজ্জ: ১৮) [সেজদা করার প্রকৃত মর্ম, তাদের প্রতি আল্লাহ্র আরোপিত আইন, কানুন, বিধি, ব্যবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে মেনে চলা।]
অতএব জ্বীন ও মানুষ ব্যতীত সব সৃষ্টি আল্লাহর মুসলিম (আনুগত্যশীল) তাদের সকলের দ্বীন হলো ইসলাম।
আবার অনেক সময় একই সাথে উপরোক্ত দু' ধরনের আহকামের উপস্থিতি দেখা দেয়। যেমনঃ (মানুষের ক্ষেত্রে) আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে চোখ দিয়েছেন যেন মানুষ চোখ দ্বারা দেখবে কিন্তু চোখের জন্য আল্লাহর শরীয়ী হুকুম চোখ যেন কোন নিষিদ্ধ বিষয় বা কাজ না দেখে, তবে এই হুকুমের অনুসরণ নির্ভরশীল যে ব্যক্তিকে চোখ দেয়া হয়েছে তার ইচ্ছার উপর। আবার কান দ্বারা শুনবে কিন্তু নিষিদ্ধ কথা শুনবে না। এখানে দেখা যাচ্ছে প্রথম অংশটি তাকভিনী যা বাধ্যতামূলক এবং পরের অংশটি তাশরিয়ী (শরীয়তগত) যা মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এখন আসল কথা হলো যারা আহকামে এলাহী (আল্লাহর দেয়া শরীয়ত) মানে না তাদের জন্য “মুসলিম” শব্দটি ব্যবহার করা চলবে না। অথচ তারা তাকভিনী (সৃষ্টিগত) আহকাম মেনে চলছে।
📄 বর্তমান যুগে ইসলাম যেভাবে অনুশীলন করা হয়
বর্তমানে ইসলাম কয়েকটি অনুষ্ঠানের রূপ নিয়েছে। মানুষ কিছু ইবাদাতের সমষ্টির নাম দিয়েছে ইসলাম। জীবনের অন্যান্য বিষয়ের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। বর্তমান সময়ে মানুষের কর্মজীবনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে- ১. ইবাদতের বিশেষ বিশেষ সময়ে একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর ইবাদত করা। ২. অতপর জীবনের অন্যান্য ব্যাপারে গাইরুল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করবে, অর্থাৎ শিরক, কুফরী, হারাম, হালাল ইত্যাদির তোয়াক্কা করবে না। অথচ, সাহাবারা তাদের গোটা সত্তাকে আল্লাহর নিকট পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। তাঁদের চিন্তা, চেতনা এবং কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র এক আল্লাহর আনুগত্য হয়ে গিয়েছিল।
"সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল, এই যে ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী রাসূলগণের উপর; আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।” (সূরা বাকারাহ্: ১৭৭)
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন, মুমিন হওয়ার আকাংখা করা এবং মুমিনের মত অবয়ব বানিয়ে নিলেই ঈমান সৃষ্টি হয় না, বরং ঈমান সেই সুদৃঢ় আকীদা যা হৃদয়ের মাঝে পূর্ণরূপে বদ্ধমূল হয়ে যায় এবং যাবতীয় কাজ তার সত্যতার সাক্ষ্য বহন করে।
ইসলামের দাবি: আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এরশাদ করেনঃ
“ওহে যারা ঈমান এনেছো পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর।” (বাকারা: ২০৮)
ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশের অর্থ হচ্ছে ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে মানতে হবে। আমাদের জীবনের সকলের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান অনুসরণ করতে হবে। ইসলামের কিছু বিধান মানা আর কিছু বর্জন করা চলবে না। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবেই মানতে হবে। ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে মানার ব্যাপারে একজন মুসলমানের মূল বক্তব্য হবেঃ
"নিশ্চয় আমার নামায, আমার ইবাদতসমূহ এবং আমার জীবন ও আমার মৃত্যু ঐ আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজাহানের রব। তাঁর কোন শরীক বা অংশীদার নেই। এভাবেই আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আত্মসমর্পণকারী ও আনুগত্যশীল।" (আন-আম: ১৬২-১৬৩)
একজন সত্যিকার মুসলমান সেই যার সকল ইবাদত ও তার জীবনের সকল কাজকর্ম হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। এক মুহূর্তের জন্যও সে আল্লাহর আনুগত্যের বহির্ভূত হবেনা। সে কখনো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আমৃত্যু সে শিরকমুক্ত থাকবে। আর তার মৃত্যুও হবে ইসলামের উপর। এদিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এরশাদ করেছেন:
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমনভাবে ভয় করা দরকার ঠিক তেমন ভাবে ভয় করো। আর তোমরা অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।" (আলে ইমরান: ১০২)
📄 আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম
ইসলাম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীন। ইসলাম ছাড়া আর কোন দ্বীন আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এর প্রমাণ হলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেনঃ
"নিশ্চয় আল্লাহ্র কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম"। (আলে ইমরানঃ ১৯)
"কেউ যদি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন চায় তা কখনো গ্রহণযোগ্য হবেনা।" (আলে ইমরান: ৮৫)
যদি একদল মানুষকে (পুরুষ, মহিলা, শিশু) উলঙ্গ অবস্থায় কোন গহিন অরণ্যে রেখে আসা হয় এবং কয়েক মাস পরে সেখানে দেখা যাবে যে তারা নিজেদের মাঝে একটা জীবন ব্যবস্থা কায়েম করেছে। অর্থাৎ তারা পোশাক পরিধান করবে, বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে, সামাজিক এবং পারিবারিক জীবন ব্যবস্থা কায়েম করবে। অথচ একদল, গরু, ছাগল, হাতী বা বাঘকে সেই স্থানে রেখে কয়েক মাস পরে গেলে দেখা যাবে যে তারা যেই অবস্থায় রাখা ছিল সেই অবস্থায় রয়েছে হয়ত শুধু প্রজনন বৃদ্ধি ঘটেছে এতটুকুই। অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) 'আশরাফুল মাখলুকাত' বা সৃষ্টির সেরা জীব বানিয়েছেন, তা শক্তির দিক থেকে কিংবা আকারের দিক থেকে নয় বরং জ্ঞানের দিক থেকে এবং সুন্দরতম অবয়বের দিক থেকে অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে সেই ক্ষমতা দিয়েছেন যে মানুষ তার চিন্তা ভাবনা ও জ্ঞান দিয়ে হাজার রকম নিয়ম কানুন বানাতে পারবে। কিন্তু প্রতি যুগেই মানব জাতির জন্য আল্লাহর হুকুম হল মানুষ যেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানই মেনে নেয়। এটাই তার ইবাদত বা হুকুমের অনুসরণ মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি, এটাই তার দুনিয়ার জীবনের পরীক্ষা। এরই জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেদিন থেকে দুনিয়াতে প্রথম মানুষ পাঠালেন সেদিনই তাকে জানিয়ে দিলেন-
"আমি হুকুম করলাম, তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও। অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়েত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হেদায়েত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোন ভয় আসবে, না (কোন কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তস্ত্র হবে। আর যে লোক তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী; অনন্তকাল সেখানে থাকবে।” (আল-বাকারা: ৩৮-৩৯)
অর্থাৎ আদম (আঃ) কে জানিয়ে দিলেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা দুনিয়াতে 'হুদা, হেদায়েত, জীবন ব্যবস্থা পাঠাবেন এবং যে মেনে নেবে অর্থাৎ মুসলিম হবে সে আবার জান্নাতে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে।
"এমন কোন জাতি ছিল না যাদের কাছে কোন সাবধানকারী (নবী) আসেনি।" (সূরা ফাতের: ২৪)
উপরের এ দুটি আয়াত একথারই সুস্পষ্ট ঘোষণা করে যে, এ দুনিয়ার মানুষের বসবাস এবং শরীয়তের আহকাম একত্রেই শুরু হয়েছে। সেই আদিকাল থেকে মানবজগত কখনো 'দ্বীন' ও 'শরীয়ত' শূন্য হয়ে পড়েনি। দ্বীন ও শরীয়াতের মধ্যে পার্থক্য এই যে, দ্বীন চিরকালই এক ছিল এক আছে এবং চিরকাল একই থাকবে; কিন্তু শরীয়াত দুনিয়ায় বহু এসেছে, বহু বদলিয়ে গেছে। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীন যা ছিল হযরত নূহ (আঃ)-এর দ্বীনও তাই ছিল, হযরত মূসা (আঃ)-এর দ্বীন যা ছিল হযরত নূহ (আঃ)-এর দ্বীনও তাই ছিল, হযরত মূসা (আঃ)-এর দ্বীনও তাই ছিল এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দ্বীনও ঠিক তাই। আর তা হচ্ছে ইসলাম। কিন্তু এই নবীগণের প্রত্যেকেরই শরীয়াতে কিছু না কিছু পার্থক্য বর্তমান ছিল। নামায এবং রোযার নিয়ম এক এক শরীয়াতে এক এক রকমের ছিল। হারাম ও হালালের হুকুম, পাক-পবিত্রতার নিয়ম, বিয়ে ও তালাক এবং সম্পত্তি বন্টনের আইন এক এক শরীয়াতের এক এক রকম ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা সকলেই মুসলমান ছিলেন। হযরত নূহ (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)-এর উম্মতগণও মুসলমান ছিলেন, আর আমরাও মুসলমান কেননা সকলের দ্বীন ইসলাম। এমন জাতি নেই যে, আল্লাহ তায়ালার হেদায়েত থেকে বঞ্চিত ও অনবহিত রয়েছে। এটা এ জন্য যে, মানুষ ছিল একটা স্বাধীন এখতিয়ার সম্পন্ন সৃষ্টি।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এবং তার বংশধর হযরত ইসমাইল (আঃ), হযরত ইয়াকুব (আঃ), হযরত ইউসুফ (আঃ) প্রমূখ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ
"শুনো সে সময়ের কথা যখন ইব্রাহীমকে তাঁর প্রভু বলেছিলেন 'মুসলিম হও অর্থাৎ আমার অনুগত হয়ে যাও।” তখন তার জবাবে তিনি বলেছিলেন 'আমি জগতসমূহের প্রভুর মুসলিম অর্থাৎ অনুগত হয়ে গেলাম।' অতঃপর এ বিষয়ে অসিয়ত করলেন ইব্রাহীম তার পুত্রদেরকে এবং ইয়াকুব তাঁর পুত্রদেরকে এই বলে, 'হে আমার সন্তনগণ! আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এই বিশেষ দ্বীনটি পছন্দ করেছেন। অতএব জীবনের শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত তোমরা মুসলিম হয়ে থেকো।..... তারা বললোঃ আমরা আপনার ইলাহর বন্দেগী করব..... এবং আমরা তাঁরই মুসলিম (অনুগত) হয়ে থাকবো।” (আল বাকারা : ১৩১-১৩৩)
কুরআন পাকে এ ধরনের বিশ্লেষণ হযরত লূত (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত সুলায়মান (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রমূখ নবীগণের সম্পর্কেও দেয়া হয়েছে। ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা দ্বীন। সকল নবী রাসূলগণের দ্বীন একটিই ছিল আর তা হচ্ছে ইসলাম। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “নবীরা ভাই ভাই আর তাঁদের সকলের দ্বীন এক।' (বুখারী ও মুসলিম) সকল নবীর অনুগত উম্মতই যে মুসলিম এ ব্যাপারে এরশাদ হচ্ছেঃ
"তিনি তোমাদের নাম মুসলিম রেখেছেন প্রথম থেকেই এবং এ কোরআনেও।" (সূরা আল হজ্জ: ৭৮)
অতএব জানলাম সকল নবী-রাসূলগণের এ দ্বীনের নাম হলো ইসলাম। তবে ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর রিসালাতের মাধ্যমে অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (সাঃ) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রাসূল। রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর তরফ থেকে শেষ আসমানী কিতাব আল কুরআন প্রাপ্ত হয়েছেন এবং শরীয়ত নিয়ে এসেছেন। যেমন কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির সকলের জন্যই তিনিই একমাত্র আদর্শ এবং উনার আনীত শরীয়ত মেনে নিয়ে আমল করলে মুসলিম থাকা যাবে। অন্যথায় কাফের হয়ে যাবে। এরশাদ হচ্ছে ৪
"আজ আমি তোমাদেরকে আনুগত্যের বিধান (জীবন বিধান) পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।” (মায়েদা : ৩)
এ আয়াত নাযিলের দ্বারা সকল নবীর দ্বীনের (ইহুদী খৃষ্টান) অনুসারীদেরকে হুকুম করে দেয়া হয়েছে তারা যেন রাসূল (সাঃ) এর আনীত দ্বীন ও শরীয়তের উপর ঈমান এনে আমল করে। নতুবা তারা শত আমলই করুক কাফের অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে এবং চিরস্থায়ী জাহান্নাম হবে তাদের পরিণতি।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর রিসালাতের প্রতি ঈমানঃ জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ "কসম সেই সত্তার, মুহাম্মাদের জীবন যার মুষ্টিবদ্ধ! যদি মূসা (আঃ)-এর পুনরাবির্ভাব ঘটে আর তোমরা আমাকে বাদ দিয়ে তাঁর অনুসরণ করো, তবে অবশ্য তোমরা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হবে। মুসা (আঃ) যদি আমার নবুওয়াত পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন, তবে অবশ্যই আমার অনুসরণ করতেন" অপর একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ "আমার অনুসরণ ছাড়া তাঁর কোনো গত্যন্তর থাকতো না”। (দারেমী, মুসনাদে আহমদ, মিশকাত)
রাসূলুল্লাহর (সাঃ) অনুসরণ : আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ "ততোক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতোক্ষণ না তার ইচ্ছা ও খায়েশ সে শরীয়তের পূর্ণ অনুগত হয়ে যায়, যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি" (শরহে সুন্নাহ, মিশকাত)।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুহববত : আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ "ততোক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতোক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতামাতা, সন্তান-সন্তুতি ও সমস্ত মানুষের তুলনায় অধিক প্রিয় হই" (মিশকাত কিতাবুল ঈমান)।
উদাহারণ স্বরূপ বিয়ের ব্যাপারে অনেক নিয়ম কানুন আছে। হিন্দু, ইহুদী, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি বাতিল জীবন বিধানে বিয়ের অনেক ফর্মুলা আল্লাহর কিতাব বিকৃত করে মানুষ তার চিন্তা ভাবনা মিশিয়ে বের করেছে। অথচ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বিয়ের জন্য রাসূল (সাঃ)-এর শরীয়ত মোতাবেক- মুসলিমকে শুধু মুসলিমাকে বিয়ে করতে বলেছেন, দেন মোহর দিতে বলেছেন, দুইজন সাক্ষী নিতে বলেছেন, ওয়ালি নিযুক্ত বা কবুল করতে বলেছেন। এখন যদি কেউ বলে, যে কোন তিনটা শর্ত মানি আর একটা মানিনা অর্থাৎ মুসলিমা বিয়ে করবো না, হিন্দু (মুশরিকা) বিয়ে করবো অথবা মুসলিমা বিয়ে করবো কিন্তু দেন মোহর দিব না বা ধার্য্য করব না তাহলে কি এটা 'ইসলামিক' বিয়ে হবে? মোটেও না, আল্লাহর ফরজ করা কোন বিষয়কে সদিচ্ছায় ত্যাগ করলে কিংবা আংশিক নিলে সেটা আর ইসলাম থাকে না, অন্য বাতিল দ্বীন হয়ে যায়। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) এরশাদ করেছেনঃ
"তাদের কি এমন শরীক দেবতা আছে, যারা তাদের জন্যে এমন দ্বীন ঠিক করে দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ তায়ালা দেননি? ফায়সালার সময় যদি পূর্ব নির্ধারিত না থাকত, তবে তাদের ব্যাপারে ফয়সালা হয়ে যেত। নিশ্চয়ই যালেমদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আশ-শূরা-২১)
গণতন্ত্র যে একটা দ্বীন তার সবচেয়ে ছোট প্রমাণ হল গণতন্ত্র দ্বীন মোতাবেক একজন মুসলিম একজন মুশরিকাকে বিয়ে করতে পারবে তবে তাকে কাজী অফিসে না যেয়ে কুফর আদালতে যেতে হবে কারণ গণতন্ত্রী সংবিধান অনুযায়ী তাকে নাগরিক অধিকার দেয়া হয়েছে কাফের মুশরিককে বিয়ে করার।
"বিধান দেয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্।” (ইউসুফ: ৪০)
এ রকম ইসলামের হুকুমের বাইরে বিয়ে করলে আল্লাহর নিকট তাদেরকে স্বামী স্ত্রী হিসাবে গণ্য করা হয় না এবং তাদের মিলন অবৈধ সম্পর্কে পরিণত হয়। [বিঃ দ্রঃ মুশরেককে মুসলিম হওয়ার আহবান করলে এবং সে তা কবুল করলে অবশ্যই তাকে বিয়ে করা যায়। আহলে কিতাব মেয়েদের বিয়ে করার বিষয়ে ফিকাহবিদদের মাঝে এখতেলাফ বা মত পার্থক্য রয়েছে।]
এমনিভাবে আমাদের জীবনে চলার জন্য অনেক রকম বিষয়াদি রয়েছে। জীবনের প্রত্যেকটি কাজের সময় একটা প্রশ্ন এসে উপস্থিত হয়। কোন নিয়ম অনুযায়ী এ কাজ করবো? এ সময় আমরা দু'প্রকার নিয়ম দেখতে পাই। এক প্রকার হল আল্লাহর কুরআন আর রাসূলের সুন্নাত থেকে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী হুকুম বা নিয়ম পদ্ধতি। আর অন্য প্রকার হল কুরআন সুন্নাহ ব্যতীত যা কিছু আছে অর্থাৎ সেটা মানুষের নিজস্ব মাথা থেকে (শয়তানের সহযোগীতায়) বানানো অপরিপক্ক জীবন ব্যবস্থা সমূহ যা নাকি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, পুজিবাদ ইত্যাদি নানান নামে ঢংয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। মজার ব্যাপার হল এ সমস্ত মতবাদ সকল বাতিল ধর্মের অনুসারীরা (ইহুদী, খৃষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধরা) সহজে গ্রহণ করে নেয় কারণ তাদের মাঝে যেসব ধর্মগ্রন্থ আল্লাহর তরফ থেকে এসেছিল সেইগুলিকে মানুষ বিকৃত করে ফেলেছে। তাই সেখানে তারা জীবনের সকল ক্ষেত্রের সমাধান না পেয়ে ইবাদতকে কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রেখে ভগবান, গডকে মন্দিরে, গীর্জায় আর পেগোডায় নিয়ে আটকে রেখেছে এবং জীবনের বাকি সকল কাজসমূহঃ রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা মানুষ আর শয়তান দ্বারা রচিত আইনের দ্বারা সাজানো জীবন ব্যবস্থার হাতে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু জীবনের সকল বিষয়াদি পরিপূর্ণ সমাধান নিয়ে রাসূল (সাঃ) এসেছিলেন। তাই কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমকে আল-কুরআন ও রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাত (সহীহ হাদীস) থেকে জীবনের চলার পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে।
📄 মুসলিম ও কাফেরের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য
প্রত্যেক মুসলমান নিশ্চয়ই একথা জানে যে, আল্লাহ্ তা'য়ালা মুসলমানকে পছন্দ করেন এবং কাফেরকে অপছন্দ করেন। মুসলমানের গোনাহ্ ক্ষমা করা হবে কাফেরের অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। মুসলমান জান্নাতে যাবে এবং কাফের জাহান্নামে। কিন্তু মুসলমান এবং কাফেরের মধ্যে এতখানি পার্থক্য কেন হলো, সেই সম্বন্ধে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা আবশ্যক। কাফের ব্যক্তিরা যেমন হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান, মুসলমানরাও তেমনি তাঁর সন্তান। মুসলমানদের মত তাদেরও হাত-পা, চোখ-কান সবই আছে। তাদের জন্ম এবং মৃত্যু মুসলমানদের মতই হয়। যে আল্লাহ্ মুসলমানদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাদেরকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তাহলে মুসলমান কেন জান্নাতে যাবে আর তারা কেন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে? একথাটি বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখা আবশ্যক। মুসলমানদের এক একজনের নাম রাখা হয়েছে আবদুল্লাহ, আবদুল হামিদ বা তদনুরূপ অন্য কোন নাম, অতএব তারা মুসলমান। আর কিছু লোকের নাম রাখা হয়েছে দীলিপ, জগদীশ, জন প্রভৃতি, কাজেই তারা কাফের; কিংবা মুসলমানগণ খাৎনা করায়, আর তারা তা করায় না। মুসলমান গরুর গোশত খায়, তারা তা খায় না- শুধু এটুকু কথার জন্যই মানুষে মানুষে এতবড় পার্থক্য হতে পারে না। আল্লাহ্ তায়ালাই যখন সমস্ত মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সকলকেই তিনি লালন-পালন করেন তিনি এতবড় অন্যায় কখনও করতে পারেন না। কাজেই তিনি এ রকম সামান্য বিষয়ের কারণে তাঁর সৃষ্ট এক শ্রেণীর মানুষকে অকারণে দোযখে নিক্ষেপ করবেন তা কিছুতেই হতে পারে না।
বস্তুত উভয়ের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য কেবলমাত্র কুফরি ও ইসলামের। ইসলামের অর্থ-আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা এবং কুফরীর অর্থ আল্লাহকে অস্বীকার করা, অমান্য করা ও আল্লাহ্ তাআলার অবাধ্য হওয়া। মুসলমান ও কাফের উভয়ই মানুষ, উভয়ই আল্লাহ তা'য়ালার সৃষ্ট জীব, তাঁরই আজ্ঞাবহ দাস। কিন্তু তাদের একজন অন্যজন অপেক্ষা এজন্য শ্রেষ্ঠ যে, একজন নিজের প্রকৃত মনিবকে চিনতে পারে, তার সাথে কাউকে শরীক করে না, তাঁর আদেশ পালন করে এবং তাঁর অবাধ্য হওয়ার দুঃখময় পরিণামকে ভয় করে। কিন্তু অন্যজন নিজ মনিবকে চিনে না এবং তাঁর আদেশ পালন করে না, এজন্যই সে অধঃপাতে চলে যায়। এ কারণেই মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ্ তা'য়ালা সন্তুষ্ট এবং কাফেরের প্রতি অসন্তুষ্ট, মুসলমানকে জান্নাতে দেয়ার ওয়াদা করেছেন এবং কাফেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার ভয় দেখিয়েছেন।
"যেসব লোক ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে, নিঃসন্দেহে তারাই সৃষ্টির সেরা। তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্যে, যে তার পালনকর্তাকে ভয় করে।" (সূরা বাইয়্যেনা: ৭-৮)
মুসলমানকে কাফের হতে পৃথক করা যায় মাত্র দু'টি জিনিসের ভিত্তিতেঃ প্রথম, ইল্ম বা জ্ঞান; দ্বিতীয়, আমল বা কাজ। অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলমানকে প্রথমেই জানতে হবে যে, তার প্রকৃত মালিক কে? কি তাঁর আদেশ ও নিষেধ? কিসে তিনি সন্তুষ্ট হন আর কিসে তিনি অসন্তুষ্ট হন এসব বিস্তৃতভাবে জেনে নেয়ার পর মালিকের মর্জিমত চলবে, তার মন যদি মালিকের ইচ্ছার বিপরীত কোন বস্তুর কামনা করে তবে সে নিজের মনের কথা না শুনে মালিকের কথা শুনবে। কোন কাজ যদি নিজের কাছে ভাল মনে হয়, কিন্তু মালিক সেই কাজটিকে ভাল না বলেন, তবে তাকে মন্দই মনে করবে। আবার কোন কাজ যদি নিজের মনে খুব মন্দ বলে ধারণা হয়, কিন্তু মালিক তাকে ভাল মনে করেন এবং কোন কাজ যদি নিজের পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে হয় অথচ মালিক যদি তা করার হুকুম দেন, তবে তার জান ও মালের যতই ক্ষতি হোক না কেন, তা সে অবশ্যই করবে। আবার কোন কাজকে যদি নিজের জন্য লাভজনক মনে করে, আর মালিক তা করতে নিষেধ করেন তবে তাতে দুনিয়ার সমস্ত ধন-সম্পত্তি লাভ করতে পারলেও তা সে কখনই করবে না। ঠিক এ ইলম ও এরূপ আমলের জন্যই মুসলমান আল্লাহ্ তা'য়ালার প্রিয় বান্দাহ। তার ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হয় এবং আল্লাহ তা'য়ালা তাকে সম্মান দান করবেন। উল্লেখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে কাফের কিছুই জানে না এবং জ্ঞান না থাকার দরুনই তার কার্যকলাপ ও তদ্রনরূপ হয় না। এ জন্য সে, আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ এবং তাঁর অবাধ্য বান্দাহ। ফলত সে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হবে।
যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়, অথচ কাফেরদের মতই জাহেল বা অজ্ঞ এবং আল্লাহ্ তা'য়ালার অবাধ্য, এমতাবস্থায় কেবল নাম, পোশাক ও খানা-পিনার পার্থক্যের কারণে সে কাফের অপেক্ষা কোনভাবেই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না, আর কোন কারণেই সে ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ তা'য়ালার রহমতের হকদার হতে পারে না। এরশাদ হচ্ছেঃ
"ইহাদিগকে জিজ্ঞাস কর, যে জানে ও যে জানে না ইহারা উভয় কি কখনো সমান হতে পারে? বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরাই তো নসীহত কবুল করিয়া থাকে।" (যুমার: ৯)
"প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল ইলম সম্পন্ন লোকেরাই তাঁহাকে ভয় করে।" (ফাতির: ২৮)
ইল্ম (জ্ঞান) হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি যে বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন তাকে ইলম বা জ্ঞান দান করেন। এটা সেই জ্ঞান যা ওহী হিসাবে মহান আল্লাহ্ নাযিল করেছিলেন রাসূল (সাঃ) এর প্রতি কিতাব ও সুন্নাহর জ্ঞান এবং এর থেকে উদ্ভুত শাখা প্রশাখাসমূহ। ওহীর এই জ্ঞান এতই মর্যাদাপূর্ণ যে একে ইলম শরীফ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।
"আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাত নাযিল করেছেন এবং তোমাকে এমন জ্ঞান জানিয়ে দিয়েছেন যা তোমার জানা ছিল না। বস্তুতঃ তোমার প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ বিরাট।" (আন নিসা: ১১৩)
এটাই হচ্ছে সেই জ্ঞান যাহা মৃত হৃদয়কে জীবন্ত ও আলোকিত করে এবং বিপন্ন মানবতাকে অন্ধকারের গভীর থেকে আলোতে নিয়ে আসে।
"যে ব্যক্তি প্রথমে মৃত ছিল, পরে আমরা তাহাকে জীবন দান করিলাম এবং তাহাকে সেই রৌশনী দান করলাম যাহার আলোক-ধারায় সে লোকদের মধ্যে জীবন-যাপন করে, সে কি সেই ব্যক্তির মত হইতে পারে, যে ব্যক্তি অন্ধকারের মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছে এবং তাহা হইতে কোনক্রমেই বাহির হয়না? কাফেরদের জন্য এই রকমই তাহাদের আমলকে চাকচিক্যময় বানাইয়া দেওয়া হইয়াছে।" (সূরা আন'আম: ১২২)
যাদেরকে কুরআনে বলা হয়েছে সবচেয়ে ভাল এবং সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী তারা হচ্ছে সেইসব লোক যারা ইল্ম অর্জন করে, সে অনুযায়ী আমল করে ও অন্যদের কাছে তা পৌছিয়ে দেয় (আহলুল ইলম)। কিন্তু দলীল রয়েছে যে, যারা ইলম অনুযায়ী আমল করে না তারা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত।
"হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা কেন সেই কথা বল যাহা কার্যতঃ কর না? আল্লাহ্র নিকট ইহা অত্যন্ত ক্রোধ উদ্রেককারী ব্যাপার যে, তোমরা বলিবে এমন কথা যাহা কর না" (আস-সাফ: ২-৩)
ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) তাঁর 'মাজমুআ আল-ফাতওয়াতে' বলেন যে যারা ইল্ম অর্জন করে তাঁরা হচ্ছেন আম্বিয়া কেরামের উত্তরাধিকারী ও রাসূল (সাঃ) এর খলিফা। তাঁরা সেই মাটির মত যেখানে পানি জমা হয় ও সবুজ ঘাস জন্মে। আল্লাহ ঈমানদারগণকে সেই জ্ঞান দান করেন যা তারা জানত না, এরশাদ হচ্ছেঃ
"যেমন (এই দিক দিয়া তোমরা কল্যাণ লাভ করিয়াছ যে,) আমি তোমাদের প্রতি স্বয়ং তোমাদেরই মধ্য হইতে একজন রসূল পাঠাইয়াছি, যে তোমাদিগকে আমার আয়াত পড়িয়া শুনায়; তোমাদের জীবন পরিশুদ্ধ ও উৎকর্ষিত করিয়া তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেয় এবং যেসব কথা তোমাদের অজ্ঞাত, তাহা তোমাদিগকে জানাইয়া দেয়।” (বাকারাহ:- ১৫১)
আল্লাহ তাঁর রাসূল (সাঃ) কে শিক্ষা দিয়েছেন যেন তিনি ইলম বৃদ্ধির জন্য (আল্লাহর) কাছে প্রার্থনা করেন:
"আর দোয়া কর, হে পরোয়ারদিগার! আমাকে আরও অধিক ইলম দান কর।" (তা-হাঃ ১১৪)
জ্ঞানের মধ্যে তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের জ্ঞানই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ তাওহীদের জন্যই আল্লাহ তার বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয। এরশাদ হচ্ছেঃ
"হে নবী জেনে রাখো- আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই (লা ইলাহা ইলাল্লাহ)। ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার ত্রুটির জন্য এবং মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত।” (মুহাম্মদ: ১৯)
বিষয়টা খুবই সহজ বুঝার জন্য। একজন ডাক্তারের ঘরে জন্মেছে বলেই উনার ছেলে যেমন ডাক্তার নয় অর্থাৎ ডাক্তারের ছেলে বলে রুগি দেখে ওষুধ দিতে পারে না কিংবা দিলেও কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না। তাকে অবশ্যই ডাক্তার হবার জন্য যে ইলম আবশ্যক তা কষ্ট করে হলেও হাসিল করতে হবে। এবং প্র্যাকটিস করতে হবে রুগি দেখার জন্য। ঠিক তেমনি মুসলিমের ঘরে জন্মেছে বলেই মুসলিম নয়। ইসলাম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান হাসিল করতে হবে এবং সে অনুযায়ী আমল করলেই মুসলিম হওয়া যাবে। ইসলাম কোন জাতি, বংশ বা সম্প্রদায়ের নাম নয়। কাজেই বাপ হতে পুত্র এবং পুত্র হতে পৌত্র আপনা-আপনিই তা লাভ করতে পারে না। হিন্দুদের মাঝে ব্রাহ্মণের পুত্র মুর্খ এবং চরিত্রহীন হলেও কেবলমাত্র ব্রাহ্মণের পুত্র বলেই সে ব্রাহ্মণের মর্যাদা পেয়ে থাকে এবং উচ্চ বংশ বলে পরিগণিত হয়। আর চামারের পুত্র জ্ঞানী ও গুণী হয়েও নীচ ও হীন থেকে যায়। কারণ সে চামারের মত নীচ জাতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে। এখানে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন:
"তোমাদের মধ্যে যে লোক আল্লাহ তা'য়ালাকে বেশী ভয় করে এবং সকলের অধিক তাঁর আদেশ পালন করে চলে সে-ই তাঁর কাছে অধিক সম্মানিত।”
হযরত ইবরাহীম (আঃ) একজন মূর্তিপূজারীর ঘরে জন্ম লাভ করেছিলেন; কিন্তু তিনি আল্লাহ তা'য়ালাকে চিনতে পেরে তাঁর আদেশ পালন করলেন; এজন্য আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে এবং তার বংশধরের মাঝে যারা মুসলিম তাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত জগতের রিসালাত, নবুয়ত ও খেলাফত অর্থাৎ নেতা বা ইমাম (খলীফা) করে দিয়েছেন।
"স্মরণ কর, যখন ইবরাহীমকে তাহার রব বিশেষ কয়েকটি ব্যাপারে যাচাই করিলেন এবং সেই সব কয়টি ব্যাপারেই সে উত্তীর্ণ হইল, তখন তিনি বলিলেন, "আমি তোমাকে সকল মানুষের নেতা করিতে চাহি।” ইবরাহীম বলিল-"আমার সন্তানদের প্রতিও কি এই ওয়াদা? তিনি উত্তরে বলিলেন,-"আমার এই প্রতিশ্রুতি যালেমদের [ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশে যারা মুসলিম নহে শিরককারী] সম্পর্কে নহে।" (আল বাকারা: ১২৪)
"আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরদিগকে সমগ্র দুনিয়াবাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য দান করিয়া (ও নিজের নবুয়ত ও রিসালাতের জন্য) মনোনীত করিয়াছিলেন।" (সূরা আলে-ইমরান: ৩৩)
"তাহা হইলে ইহারা অন্যান্য লোকদের প্রতি [মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের] কি শুধু এইজন্য হিংসা পোষণ করে যে, আল্লাহ্ তাহাদিগকে বিশেষ অনুগ্রহ দান করিয়াছেন? যদি তাহাই হয় তবে তাহারা যেন জানিয়া রাখে যে, আমরা তো ইবরাহিমের সন্তানদিগকে কিতাব ও বুদ্ধি-বিজ্ঞান দান করিয়াছি এবং বিরাট রাজ্য দিয়াছি।" (সূরা নিসা: ৫৪)
এখানে একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের মালিক। তিনি যদি তাঁর অনুগত দাসদের ইবাদতে খুশী হয়ে কাউকে মর্যাদার আসনে বসান তাহলে অন্যান্য দাসদের এ ব্যাপারে কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। যেমনি ইব্রাহিম (আঃ) এর (আল্লাহর জন্য) কুরবানীতে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু তায়ালা যখন সমস্ত দুনিয়ার নেতৃত্ব দিতে চাইলেন (তার আগে থেকেই তিনি নবী ও রাসূল ছিলেন) তখন ইব্রাহিম (আঃ) উনার বংশধরদের মাঝেও যেন নেতৃত্ব দেয়া হয় তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তার বান্দা ইব্রাহিম (আঃ) এর দোয়া কবুল করলেন। কিন্তু পরিষ্কার শর্ত দিয়ে দিলেন যে- এ নেতৃত্ব শুধুমাত্র তার বংশধরদের মাঝে যারা মুসলিম হবে তাদের জন্য অর্থাৎ তার বংশধরদের মাঝে কোন কাফের, মুশরিক এ নেতৃত্বের দাবীদার হতে পারবে না। পরবর্তীতে তাঁর দুই ছেলে ইস্হাক (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এবং তার বংশধরের মাঝে নবুয়ত, রেসালাত ও খেলাফতের দায়িত্ব অর্পন করলেন। এর ফলশ্রুতিতে ইব্রাহিম (আঃ) এর এক ছেলে ইসহাক (আঃ) এবং তার ছেলে ইয়াকুব (আঃ) নবী ছিলেন এবং ইয়াকুব (আঃ)-এর বংশধরদের নামই বনী ইসরাইল এবং তাদের মাঝেই মুহাম্মদ (সাঃ) আসার আগ পর্যন্ত সমস্ত নবী, রাসুল এবং নেতৃত্ব (খেলাফত) এসেছে। রাসূল (সাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসঃ
"ইসরাইলের বংশধরদের কাছে অব্যাহতভাবে নবী পাঠানো হয়েছিল। বনি ইসরাইলের বংশধরগণের মাঝে নবীগণ শাসন ব্যবস্থা [TASOOSUHUM] প্রতিষ্ঠিত রাখতেন। একজন নবী ইন্তেকাল করলে আরেকজন নবীকে উনার খলিফা (প্রতিনিধি) হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। আমার পরে আর কোন নবী পাঠানো হবে না, তবে তোমাদের আমার পরে বহু খলিফাহ আসবেন। সাহাবীরা মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ঐ সময় আপনি আমাদিগকে কি করার নির্দেশ দেবেন, তিনি জবাব দিলেন, প্রথমজনকে আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি (বাইয়াহ) দেবে এবং এর পরের সর্ব প্রথমকে। তাদেরকে তাদের অধিকার দেবে, কেননা আল্লাহ্ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন তারা (খলিফা) তাদের লোকদের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পূরণ করেছে কি না।” [আল-বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত]
আবার ইব্রাহিম (আঃ) এর ছেলে ইসমাঈল (আঃ) নবী ছিলেন এবং তার বংশই কুরাইশ এবং এ কুরাইশ বংশেই শেষ নবী রাসূল (সাঃ) এসেছিলেন। ইব্রাহিম (আঃ) এর মুসলিম বংশধরদের প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নেতৃত্বের ওয়াদা মোতাবেক কুরাইশ বংশকে কিয়ামত পর্যন্ত খলিফার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যাহা রাসূল (সাঃ) কর্তৃক নিম্নলিখিত সিহাহ সিত্তাহ হাদীস গ্রন্থসমূহের সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, এ 'আমর' অর্থাৎ খেলাফত কুরাইশদের মধ্যে সর্বদা বিরাজমান থাকবে। এমনকি তাদের মধ্য থেকে দু'জন লোক অবশিষ্ট থাকলেও। (সহীহ আল-বুখারী: হাদীস নং-৬৬৪১)
[বিঃ দ্রঃ অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা একথা প্রমানিত যে, মুসলিমদের সর্বোচ্চ নেতা খলিফা বা আমীরুল মুমিনীননকে অবশ্যই মুসলিম কুরাইশ হতে হবে। এটা সাহাবা এবং আলেমদের এজমা। দুনিয়ার বুকে খারিজী আকিদার মুরতাদরা প্রথম রাসূল (সাঃ)-এর এই হুকুম অমান্য করে। তাদের অভিমত ছিল কুরাইশ ও অকুরাইশ যে কাউকে মুসলিম জনগণ খলিফা নিযুক্ত করতে পারবে। মুতাজিলা ও মুর্জিয়া আকীদার লোকজন বিভ্রান্তিতে আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে এই আকীদা পোষণ করে যে কোন কুরাইশই খলিফা হতে পারবে না, কুরাইশ ছাড়া যে কোন মুসলিম খলিফা হতে পারবে। আরেকটা বিষয় বুঝতে হবে যে, খলিফার অধীনে অন্যান্য যে কোন আমির হওয়ার জন্য কুরাইশ কিংবা আরব হওয়ার শর্ত নয়। নাক কাটা হাবশীকেও আমির (খাস) পদে খলিফা নিয়োগ দিলে তার আনুগত্য করা মুসলিম জনগণের জন্য ওয়াজিব। খাস আমির হল যে কোন বিশেষ কাজের জন্য খলিফার নিয়োগ করা আমির যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন যে কোন অঞ্চলের আমীর কিংবা কোন সেনাবাহিনীর আমির কিংবা কোন সফরের আমীর। আর আম আমীর হল সকল মুসলিমের সর্বোচ্চ নেতা বা একমাত্র আমীর বা আমীরুল মু'মীনীন অর্থাৎ খলিফা। এই খলিফার নেতৃত্বে মুসলিম জনগণকে ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক সবসময় একত্রে থাকতে হবে। অর্থাৎ খলিফা থাকার জন্য ইসলামী রাষ্ট্র শর্ত নয়।]
হযরত নূহ (আঃ)-এর পুত্র একজন নবী ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিল; কিন্তু সে আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারল না বলে তাঁর অবাধ্য হয়ে গেল। এজন্য তার বংশমর্যাদার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হলো না। উপরন্তু যে শাস্তি দেয়া হলো, সমস্ত দুনিয়া তা হতে শিক্ষা লাভ করতে পারে। এরশাদ হচ্ছেঃ
"এবং নূহ তাঁর রবকে বললেন, পরওয়ারদিগার! আমার পুত্র অবশ্যই আমার পরিবারভুক্ত, আর আপনার ওয়াদা সত্য এবং আপনি মহাজ্ঞানী। প্রতুত্তরে আল্লাহ্ বলেন, নূহ, সে তোমার পরিবার ভুক্ত নয়, কারণ তার কার্যকলাপ সৎলোকদের মত নয় আর তুমি যে বিষয়ের তাৎপর্য অবগত নও সে বিষয়ে আমার নিকট কোন আবেদন করো না। [হুদ: ৪৫-৪৭]
নূহ (আঃ) ও হযরত লূত (আঃ)-এর বিবিদের কাহিনীও কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দু'জন মহান নবীর বিবিগণ ভিন্ন আকীদা পোষণ করতেন এবং শিরকে লিপ্ত ছিলেন। সেজন্য উভয় পয়গাম্বরই তাঁদের বিবিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরশাদ হচ্ছেঃ
"কাফিরদের শিক্ষা গ্রহণের জন্যে আল্লাহ্ তাআলা নূহ ও লূতের বিবিগণের উদাহরণ পেশ করেছেন। এ দু'জন নারী আমার দু' নেক বান্দার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু তারা খেয়ানত করেছিল। তাই তাদের স্বামীগণও তাদেরকে আল্লাহ্ পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারেনি। উভয় নারীকে আদেশ দেয়া হয়, যাও অন্যান্যদের সাথে তোমরাও জাহান্নামে প্রবেশ কর।" (আত তাহরীম: ১০)
মিসরের অত্যাচারী ও আল্লাহদ্রোহী বাদশা ফিরাউনের বিবির কাহিনীও ঈমানদারদের নমুনা হিসেবে পেশ করা হয়েছে।
"ঈমানদারদের নসিহত করার জন্যে আল্লাহ্ তাআলা ফিরাউনের স্ত্রীর বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি দোয়া করেছিলেন, পরওয়ারদিগার! বেহেশতে তোমার নিকটে আমার জন্যে একখানা ঘর তৈরী কর, আমাকে ফিরাউন ও তার সকল অপকর্মের পরিণাম থেকে মুক্তি দাও এবং যালেমদের অনিষ্টকারিতা থেকেও আমাকে নিরাপদ রাখ।" (আত তাহরীম: ১১)
যাদের ইলম ও আমল নেই, তাদের নাম আবদুল্লাহই হোক, আর আবদুল হামিদ হোক, দীলিপ কুমারই হোক, আর জগদীশই হোক, আল্লাহ তাআলার কাছে এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই- এরা কেউই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ পাবার অধিকার পেতে পারে না।