📘 তাগুত বিষয়ে বিস্তারিত > 📄 তাগুতী কোর্টে বিচারপ্রার্থী হওয়ার বিধান (এ আলোচনা অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত)

📄 তাগুতী কোর্টে বিচারপ্রার্থী হওয়ার বিধান (এ আলোচনা অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত)


আল্লাহর শরিয়তবিরোধী আইনই তাগুত। তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া কুফর। কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন, "তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ করনি, যারা দাবি করে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তার প্রতি তারা ইমান রাখে? অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তাদেরকে আদেশ করা হয়েছিল, তারা যেন তাগুতকে অস্বীকার করে।" [সুরা নিসা: ৬০] এ আয়াতে তাদের ইমানকে নাকচ করা হয়েছে, যারা গাইরুল্লাহর কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তারা নিজেদের মুমিন বলে ধারণা করে। শাইখুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের পৌত্র ইমাম সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন, "এই আয়াতে এ বিষয়ের দলিল রয়েছে যে, তাগুতের কাছে- তথা কিতাব ও সুন্নাহ ব্যতীত অন্যকিছুর কাছে বিচারপ্রার্থনা না করা ফরজ বিধানগুলোর অন্যতম। তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনাকারী ব্যক্তি মুমিন নয়, এমনকি মুসলিমও নয়া' [তাইসীরুল আযীযিল হামীদ (তাহকিক:
ড. উসামাহ আল-উতাইবী), পৃষ্ঠা: ৯৬৩] ইমাম সুলাইমানের এ বক্তব্যে ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে।
কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর আইনকে অহংকারবশত প্রত্যাখ্যান করে, কিংবা আল্লাহর আইনকে অপছন্দ করে, কিংবা ব্যবসাবাণিজ্য, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতিতে আল্লাহর আইনের প্রবেশকে অপছন্দ করে এবং এ বিশ্বাস নিয়ে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, তাহলে সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর আইনের চেয়ে অন্য আইনকে ভালো মনে করে, কিংবা সমপর্যায়ের মনে করে, কিংবা আল্লাহর আইনের বিপরীত আইন দিয়ে ফায়সালা করা বৈধ মনে করে এবং এসব বিশ্বাসের কোনো একটি নিয়ে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, তাহলেও সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। এগুলো সবই ব্যক্তির বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত এবং এগুলোর প্রত্যেকটি সর্ববাদিসম্মত অভিমত, এ বিষয়ে উলামাদের কোনো মতানৈক্য নেই।
কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের প্রতি সন্তোষ নিয়ে এবং স্বীয় কৃতকর্মের দরুন নিজেকে পাপী হিসেবে বিশ্বাস রেখে তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, সে ব্যক্তি ফাসেক, বড়ো গুনাহগার, তবে কাফির নয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়‍্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এ ধরনের ব্যক্তিদের ব্যাপারে বলেছেন, "হালালকে হারাম করা ও হারামকে হালাল করার ক্ষেত্রে তাদের ইমান ও আক্বীদাহ সুসাব্যস্ত থাকে। কিন্তু তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের (তাগুতদের) অনুসরণ করে। যেমন একজন মুসলিম এমন পাপকর্ম সম্পাদন করে, যেগুলোকে সে পাপ বলে বিশ্বাস রাখে। সুতরাং এদের বিধান হবে তাদের অনুরূপ গুনাহগারদের মতোই।' [মাজমূ'উ ফাতাওয়া, ৭/৭০]
কিন্তু যে ব্যক্তি তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে বাধ্য হয়, তার কোনো গুনাহ নেই। কারণ সে নিরুপায়। এ বিষয়ে আল্লামাহ সুলাইমান আর-রুহাইলী চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, "একটি বিষয় অবশিষ্ট রয়ে গেছে। যে বিষয়ে উলামারা আলোচনা করেছেন, আর মানুষদেরও এরূপ আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করাও জরুরি। সেটা হলো বাধ্য বা নিরুপায় হলে আল্লাহর শরিয়তবিরোধী আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার বিধান। মানুষ যখন নিরুপায় হয়; যেমন কোনো মুসলিম ব্যবসায়ী কোনো একজন কাফির ব্যবসায়ীর সাথে ওই কাফিরের দেশে বাণিজ্যিক লেনদেনে লিপ্ত হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের মাঝে বিবাদ দেখা দিয়েছে।
এখন কোনো মুসলিম দেশের শরয়ী কোর্টের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া সেই ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা ঘটনা ঘটেছে কাফির রাষ্ট্রে। এখন সেই মুসলিমের সামনে দুটো পথ হয় সে কাফির রাষ্ট্রের কোর্টে বিচারপ্রার্থী হবে, যেসব কোর্ট আল্লাহর শরিয়তবিরোধী আইন দিয়ে ফায়সালা করবে, আর নাহয় সে নিজের হক জলাঞ্জলি দিবে। তার সামনে এ দু পথের যেকোনো একটি খোলা রয়েছে। কেউ এর চেয়েও নিরুপায় হতে পারে। যদি সেই কাফির ব্যবসায়ী তার দেশের কোর্টে মামলা দায়ের করে, তাহলে এক্ষেত্রে মুসলিম ব্যবসায়ীর কোনো এক্তিয়ার থাকে না-সে মামলা দায়ের করবে, কি করবে না। মামলা দায়ের হয়ে গেছে, সে এখন (কোটে যেতে) বাধ্য।
নিরুপায় হওয়ার আরও একটি দৃষ্টান্ত, যা ইউরোপে বসবাসরত মুসলিমদের মাকে পাওয়া যায়। যেমন কোনো ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে পরিত্যাগ করল এবং তাকে তালাক দিতেও অস্বীকার করল। এখন এ মহিলা হয় দীর্ঘজীবন কাটিয়ে দেবে ঝুলন্ত অবস্থায়, যে না বিবাহিত, আর না তালাকপ্রাপ্ত; থাকবে ফিতনা ও মুসিবত নিয়ে। অন্যথায় সে ওই সকল রাষ্ট্রের কোর্টে বিচার দায়ের করবে, যেসব কোর্ট তার পক্ষে ফায়সালা দেবে। সে আছে নিরুপায় অবস্থায়।
এক্ষেত্রে কিছু উলামা বলেন, মুসলিম ব্যক্তি তার হক বিসর্জন দেবে, যে পর্যন্ত না তার নিরুপায় অবস্থা প্রবল আকার ধারণ করছে। তাঁরা বলেন, তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার ব্যাপারটি বিপজ্জনক, বিধায় ওই সকল কোটে মামলা উত্থাপন করা না- জায়েজ, যে পর্যন্ত না তার নিরুপায় অবস্থা চরমে পৌঁছে, যখন বিলকুল তার আর কোনো এক্তিয়ার থাকে না। যেমনটি আমি দ্বিতীয় উদাহরণে উল্লেখ করেছি। কাফিরের তরফ থেকে মামলা উঠানো হয়ে গেছে, মামলায় না এসে কোনো উপায় নেই। অন্যথায় সে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হয়তো তার সমুদয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। অথবা আমরা যে মহিলার উদাহরণ দিলাম, সে যদি তরুণী হয় এবং এরকম অবস্থা চলতে থাকলে নিজের দ্বীন ও ইজ্জতের ব্যাপারে সে ক্ষতির আশঙ্কা করে, তাহলে তখন জায়েজ আছে (তাগুতী কোর্টে মামলা দায়ের করা)।
তবে অধিকাংশ উলামার মতে- আর এ মতটিই প্রাধান্যযোগ্য সেসব আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে বৈধ আছে। যথা:
১ম শর্ত: সে এসব আইনকে অপছন্দ করবে, এসবের প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। বরং তার অন্তর এ বিষয়ের প্রতি প্রশান্ত থাকবে যে, কেবল আল্লাহর শরিয়তই হক। কিন্তু সে নিরুপায়। সে বাধ্য হয়ে ঘৃণা নিয়ে সেসব আইনের কাছে গমন করছে।
২য় শর্ত: ক্ষতির ব্যাপারটা সুনিশ্চিত হতে হবে, কল্পিত বা সম্ভাব্য হওয়া যাবে না। বরং সুনিশ্চিত ও বাস্তবিক হতে হবে।
৩য় শর্ত: ক্ষতিটা বড়ো ধরনের হতে হবে। ১০ হাজার বা ২০ হাজারের মামলা হলে চলবে না; যার ফলে এরকম অর্থকড়ি হারানোর যে অনিষ্ট, তারচেয়ে ওই সকল আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়ার অনিষ্টই বড়ো হয়ে যায়। বরং ক্ষতি হতে হবে বড়ো ধরনের, যার অনিষ্ট ভয়াবহ।
৪র্থ শর্ত: ওই সমস্ত কোট ছাড়া অন্য কোনো পথ না থাকা। যেমন আমরা যে মহিলার উদাহরণ দিলাম, তার ক্ষেত্রে যদি এমন হয়, সেখানে একটি ইসলামী মারকায আছে, যা শরিয়ত অনুযায়ী বিচার-বিশ্লেষণ করবে এবং তার জন্য এমন ফায়সালা দিবে, যা থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই; তাহলে সেই মহিলার জন্য ওইসব কোটে যাওয়া জায়েজ নয় (বরং সে ওই মারকাযে যাবে)।
৫ম শর্ত: বিচারপ্রার্থী তার শরয়ী অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এরচেয়ে বেশি নিবে না। অর্থাৎ শরয়ী কোর্টে বিচারপ্রার্থী হলে তারা যে ফায়সালা দিত, তদনুযায়ী সে তার প্রাপ্য শরয়ী অধিকারটুকুই গ্রহণ করবে, এরচেয়ে বেশি নিবে না। তার শরয়ী অধিকারের চেয়ে যা অতিরিক্ত থাকে, তা গ্রহণ করা তার জন্য জায়েজ নয়, যদিও সেই কোর্ট তাকে অতিরিক্ত প্রাপ্যের ফায়সালা দিয়েছে। বরং সে তার শরয়ী অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।' [আল্লামাহ সুলাইমান আর-রুহাইলী কৃত শারহু কিতাবিত তাওহীদ, পৃষ্ঠা: ১২৯৬-১২৯৮]
নিরুপায় হলে নিজের অধিকার গ্রহণের জন্য এরূপ কোর্টে বিচারপ্রার্থী হওয়া জায়েজ আছে মর্মে মত ব্যক্ত করেছেন ইমাম ইবনু বায এবং ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুমাল্লাহ)। [মাজমূ'উ ফাতাওয়া লিবনি বাঘ, ২৩/২১৪; আশ-শারহুল মুমতি, ৪/২৪৪]
এখানে আরেকটি বিষয় রয়েছে। গাইরুল্লাহর আইন অনুযায়ী ফায়সালা দেয়, এমন কোটের কোনো আইন যদি শরিয়তের আইনের সাথে মিলে যায়, তখন এটা জেনে উক্ত কোটে বিচারপ্রার্থী হওয়া জায়েজ। অর্থাৎ শুধু ওই আইনের ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থী হওয়া জায়েজ আছে। আল্লামাহ সালিহ বিন আব্দুল আযীয আলুশ শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ) এ ব্যাপারে বলেছেন, "সে যদি জানে, এ বিষয়ে শরিয়তে তার হক আছে, তারপর এটা জেনে সে শরিয়তবিরোধী আইনের বিচারপতির কাছে মামলা দায়ের করে; কারণ সে জানে, শরয়ী আইনের সাথে উক্ত আইনের মিল রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি শরিয়তবিরোধী আইনের বিচারপতির কাছে তার বিবাদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে, যেহেতু সে জানে, শরিয়ত তাকে এক্ষেত্রে প্রাপ্য অধিকার দেবে, আবার শরয়ী আইনের সাথে এই আইনের মিলও রয়েছে; তাহলে আমার মতে বিশুদ্ধ অভিমত হলো-এ কাজ বৈধ।
কতিপয় উলামা বলেন, 'সে এ কাজ করবে না, যদিও এ মামলায় তার অধিকার রয়েছে?' মহান আল্লাহ মুনাফেকদের ব্যাপারে বলেছেন, 'হক তাদের পক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রসুলের কাছে ছুটে আসে।' (সুরা নূর: ৪৯) অতএব যে মনে করে, শরিয়তে তার জন্য অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। সে নিজের জন্য শরিয়ত ব্যতীত অন্যের কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া বৈধ মনে করে না। কিন্তু আল্লাহ তার জন্য যা বিধিসম্মত করেছেন, সেরকম কিছু তার কাছে উপনীত হলে সেকথা স্বতন্ত্র। এটা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চাওয়ার আওতাভুক্ত হবে না।" [আল্লামাহ সালিহ আলুশ শাইখ কৃত শারহু ফাতহিল মাজীদ, ৩/২৯]
অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত আলোচনা এখানেই সমাপ্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00